রুলফ স্ট্যান্ডার এসে মিলিয়ে দেখল তার হাতে রাখা তালিকা। বোঝ গেল গত কয়েক সপ্তাহ ধরেই সবাইকে খেয়াল করে যার যার গুণগুলোও আবিষ্কার করে রেখেছে। সবচেয়ে লম্বা ম্যানফ্রেড লাইনের সবার শেষে থাকায় ওর সামনে এসে দাঁড়িয়ে গেল রুলফ।
ম্যানফ্রেডকে এমনিতেই বাছাই করে রেখেছে। তাই জানতে চাইল,
“আগে কখনো বক্সিং খেলেছো?” কিন্তু ম্যানির উত্তর শুনে কালো করে ফেলল মুখ।
“কখনো ম্যাচ খেলিনি স্যার। কিন্তু কিছু প্র্যাকটিস আছে।”
১৯৩৬ সালের বার্লিন অলিম্পিক গেমসে দক্ষিণ আফ্রিকা থেকে যে দল যাবে, তার অন্যতম বাছাই হল রুলফ স্ট্যান্ডার। তাই ম্যানফ্রেডের কথা শুনে সিনিয়র ছাত্ররাসহ সবাই হেসে ফেলল। যাই হোক রুল উত্তরে জানাল, “অল রাইট, আমরা ফ্লাইওয়ে দিয়ে শুরু করব।” তারপর সবাইকে হটিয়ে জিমনেশিয়ামে নিয়ে এল।
হলের শেষ মাথার লম্বা একটা বেঞ্চে নবীনদেরকে বসতে দেয়া হল। যদিও সেখান থেকে রিংয়ের তেমন কিছুই দেখা যাচ্ছে না। সামনের সারিতে ভালো জায়গাগুলো দখল করল রুলফ আর তার দল।
এরই ফাঁকে ম্যানফ্রেডের নজরে এল সামনের সারিতে দাঁড়িয়ে কে যেন ওর দৃষ্টি আকর্ষণের চেষ্টা করছে। তাড়াতাড়ি সিনিয়রদের দিকে তাকাল ম্যানফ্রেড। না, ওরা রিং নিয়েই ব্যস্ত। তাই প্রথমবারের মত সরাসরি মেয়েটার দিকে তাকাল ম্যানি।
ভুলেই গিয়েছিল যে সারাহ কতটা সুন্দর। আর মাত্র কয়েক সপ্তাহের ব্যবধানে যেন আরো সুন্দরী হয়ে গেছে। উত্তেজনায় লাল হয়ে গেছে ওর গাল। চকচকে চোখে লেসের রুমাল নিয়ে হাত নাড়ল ম্যানফ্রেডের উদ্দেশে।
হাব-ভাবে কিছুই প্রকাশ না করে কেবল চোখ টিপে ছিল ম্যানফ্রেড। দুহাতে ফ্লাইং কিস ছুঁড়ে দিয়ে ধপ করে আংকেল ট্ৰম্পের বিশালাকার দেহের পাশে বসে গেল সারাহ।
“ওরা দুজনেই এসেছে!” যারপরনাই খুশি হয়ে উঠল ম্যানফ্রেড। এই মুহূর্তটার আগপর্যন্ত বুঝতেই পারেনি যে গত কয়েক সপ্তাহ কতটা একাকিতে কেটেছে। আংকেল ট্রম্পও মাথা ঘুরিয়ে তাকালেন। এমনভাবে হাসলেন যে কালো দাড়ি ভেদ করে ফুটে উঠল ঝকঝকে সাদা দাঁত।
শুরু হল প্রথম পালা : দু’জন নবীন খেলা শুরু করতেই খানিক বাদে ক্যানভাসে দেখা গেল রক্তের ছিটে। তাই দ্বিতীয় দফায় খেলা বন্ধ করে দিল রুলফ। তারপর পরাজিত ছেলেটার পিঠ চাপড়ে দিয়ে বলল, “ওয়েল ডান। যাই হোক হেরে যাওয়াতে কোনো লজ্জা নেই।”
এরপর একের পর এক ছাত্ররা এল। সকলেই চাইল সেরাটা দিতে। কিন্তু বোঝা গেল তারা কতটা আনাড়ি।
অবশেষে ম্যানফ্রেড একাই রয়ে গেল বেঞ্চে।
“অল রাইট, দেখা যাক এবার তুমি কী করতে পারো।” ওর হাতে গ্লাভস পরিয়ে দিল এক সিনিয়র। কাধ থেকে তোয়ালে ফেলে উঠে দাঁড়াল ম্যানফ্রেড। আর ঠিক তখনি চেঞ্জিং রুম থেকে বেরিয়ে এল রুলফ ট্যান্ডার। গ্লাভস পরিহিত দু’হাত তুলে সহাস্যে দর্শকদের উদ্দেশে চিৎকার করে বলল, “লেডিস অ্যান্ড জেন্টেলমেন, আমাদের শেষ প্রতিযোগিতার জন্য কোনো প্রতিদ্বন্দ্বী না থাকাতে আপনাদের অনুমতি নিয়ে আমিই তার সাথে বক্সিং করতে চাই।”
হুল্লোড় তুলল হলভর্তি দর্শক। কেউ কেউ বলল, “ওর সাথে একটু সদয় আচরণ করো রুলফ।” “বেচারাকে মেরে ফেলো না যেন” ইত্যাদি ইত্যাদি। হাত নেড়ে সবাইকে আশ্বস্ত করল রুলফ। আগ্রহ নিয়ে তাকাল মেয়েদের দিকে। তারাও ছয় ফুট লম্বা সুদর্শন রুলকে দেখে সমানে কিচির-মিচির করছে।
সামনের সারির পাশ দিয়ে হেঁটে যাওয়ার সময়ে আড়চোখে সারাহ্ আর আংকেলের দিকে তাকাল ম্যানফ্রেড।
“ওকে হারিয়ে দিও, ম্যানি। নিজের সিটে বসে চিৎকার করে উঠল সারাহ। উত্তেজনায় একবার বসছে, একবার উঠছে। পাশে থেকে আংকেলও মাথা নাড়লেন, “মাম্বার মতই দ্রুত, বাছা! র্যাটেলের মত সাহস নিয়ে। তবে আংকেলের মৃদু শব্দগুলো কেবল ম্যানিই শুনল। চিবুক তুলে রিংয়ে ঢুকতেই মনে হল নতুন উদ্যমে হালকা হয়ে গেছে দুটো পা।
রেফারির দায়িত্ব পালন করছে আরো এক সিনিয়র ছাত্র : এই কর্নারে আছেন একশ পঁচাশি পাউন্ড ওজনে ধারী কেপ অব গুড হোপ অ্যামেচার হেভিওয়েট চ্যাম্পিয়ন রুলফ স্ট্যান্ডার। আর এই কর্নারে আছে একশ তিয়াত্তর পাউন্ড ওজনের নবীন ম্যানফ্রেড ডি লা রে।”
নিজের কর্নারে দাঁড়িয়ে হালকা পায়ে নাচছে রুলফ। তারপর পরস্পরের পাশে চক্রাকারে ঘুরতে গিয়ে হেসেও ফেলল। খানিক বাদেই অবশ্য উবে গেল তার হাসি।
সামনের প্রতিদ্বন্দ্বীর চেহারায় কোনো ভীরুতার আভাসমাত্র নেই। পেশিবহুল কাঁধের ওপর সোনালি চুলের মাথা বসানো ম্যানফ্রেডের মেঘের উপর ভেসে বেড়ানো পা দুটোতে ভয়ের লেশ বলতে কিছু নেই।
“ও একটা যোদ্ধা!” রেগে উঠল রুলফ। “আমাকে মিথ্যে বলেছে, ভালোভাবেই জানে ও কী করছে।” এরপর চেষ্টা করল রিংয়ের মাঝখানে চলে যেতে কিন্তু ম্যানফ্রেড বিপজ্জনকভাবে বাম পাশে চলে আসায় সরে আসতে বাধ্য হল রুলফ।
দু’জনের একজনও এখন পর্যন্ত কোনো ঘুষি ছোড়েনি। কিন্তু নীরব হয়ে গেল সমস্ত দর্শক। সকলেই বুঝতে পারছে যে অন্য রকম একটা কিছু ঘটতে চলেছে আজ। স্তব্ধ হয়ে সবাই দেখল বদলে গেছে রুফের গা ছাড়া ভাব, ভয়ংকর হয়ে উঠেছে ওর পা। যারা ওকে চেনে দেখতে পেল রুলফের মুখ আর চোখের কোণে দুশ্চিন্তার রেখা।
