আবার যখন সবাই উঠে চেয়ারে বসার সুযোগ পেল ততক্ষণে পুরো ঠাণ্ডা হয়ে গেছে স্যুপ।
***
দু’মাস পরে বিশ্ববিদ্যালয়ের ধর্মতত্ত্ব পড়ে আসা সদ্য ডমিনির হাতে এখানকার ভার বুঝিয়ে দিয়ে স্টিলেনবশ চলে গেল পুরো বিয়ারম্যান পরিবার।
বিদায়ের দিন যেন শত মাইলের মধ্যে বসবাসকারী প্রত্যেক নারী-পুরুষ আর শিশু চলে এল ওদেরকে স্টেশনে বিদায় জানাতে। এই মুহূর্তের আগ পর্যন্ত ম্যানফ্রেড নিজেও বুঝতে পারেনি যে এদের কাছে আংকেল ট্রম্প কতটা আপন ছিলেন। নারীদের কেউ কেউ কেঁদে ফেলল। সবাই তাদের জন্যে উপহার নিয়ে এল, গির্জার স্যুট পরে এল পুরুষেরা; আংকেলের সাথে হাত মিলিয়ে তাকে ধন্যবাদ জানাল। জ্যাম, দুধের ডেজার্ট আর এত বিলটং আনল যে পুরো এক সেনাবাহিনি খাওয়ানো যাবে।
চারদিন পরে সেন্ট্রাল কেপ টাউন রেলওয়ে স্টেশনে ট্রেন পরিবর্তন করল বিয়ারম্যান পরিবার। স্টিলেনবশ রেলস্টেশনের প্লাটফর্মে স্বয়ং গির্জার ডিকন তাদের অভ্যর্থনা জানানোর জন্য দাঁড়িয়ে ছিলেন। কয়েকদিনের মাঝেই বিয়ারম্যান পরিবার উপলব্ধি করল যে নাটকীয়ভাবে বদলে গেছে তাদের প্রাত্যহিক জীবন।
একেবারে বলা যায় প্রথম দিন থেকেই বিশ্ববিদ্যালয়ের ভর্তির প্রস্তুতি নিতে আরম্ভ করে দিল ম্যানফ্রেড। ভোরবেলা থেকে শুরু করে মাঝরাত পর্যন্ত খাটুনির পর দু’মাস শেষে বসল এক সপ্তাহের যন্ত্রণাদায়ক ভর্তি পরীক্ষাতে। তারপর রেজাল্টের জন্য অপেক্ষা করাটা আরো দুরূহ হল। যাই হোক, বিয়ারম্যান পরিবার থেকে বছরের পর বছর ধরে গড়ে তোলা পড়াশোনার অভ্যাস এবারে কাজে দিল। জার্মান ভাষায় প্রথম, গণিতে তৃতীয় আর সব মিলিয়ে অষ্টম স্থান লাভ করে ভর্তি হল আইন অনুষদে।
কিন্তু বাড়ি ছেড়ে ছেলেদের হোস্টেলে উঠাতে প্রথমটাতে কঠোর আপত্তি জানিয়েছিলেন ট্রুডি আন্টি। কিন্তু বিশ্ববিদ্যালয় রেজিস্টারকে ডেকে খানিকটা ফিনান্সিয়াল অ্যারেঞ্জমেন্ট করে দেবার মাধ্যমে ম্যানফ্রেডের পক্ষ নিয়েছেন আংকেল। বলেছেন, “চারপাশে মেয়ে দেখতে দেখতে ছেলেটা কোনো এক সময়ে পাগল হয়ে যাবে। তাই ওর অন্যান্য তরুণদের সাহচর্যে গিয়ে বিশ্ববিদ্যালয় জীবন উপভোগ করা উচিত।”
তাই পঁচিশে জানুয়ারি ছাত্রদের হোস্টেলে উঠে এলেও প্রথম কয়েকটা মিনিটের মধ্যেই দমে গেল ম্যানফ্রেডের উৎসাহ। ভাবতেও পারেনি যে নবাগতদের জন্যে পুরনো ছাত্ররা কতটা মধ্যযুগীয় বর্বর অভ্যর্থনার আয়োজন করে রাখে।
নিয়ম করে দেয়া হল যে নতুনদের কেউ বিপরীত লিঙ্গের কারো সাথে কথা তো দূরের ব্যাপার সোজাসুজি তাকাতেও পারবে না। তাহলেই গলায় সেক্স ম্যানিয়াকের সাইন বোর্ড ঝুলবে। প্রতিটি কাজে কেবল সিনিয়র ছাত্র নয় এমনকি জড় বস্তুরও অনুমতি নিতে হবে। যেমন হে মহান দরজা আমি কি আপনার মধ্যে দিয়ে যেতে পারি কিংবা টয়লেট মহাশয় এই অধম আপনার উপর বসার অনুমতি চাইছে ইত্যাদি ইত্যাদি।
এখানেই শেষ নয়; প্রতি ঘন্টায় ঘন্টায় রুমে রেইড দেয় সিনিয়র ছাত্ররা। বিছানাপত্র সব মেঝেতে ফেলে পানি ঢেলে দেয়। ড্রয়ার থেকে সবকিছু বের করে ভেজা কম্বলের উপর রেখে দেয়। ফলে কাঁপতে কাঁপতে নতুন ছাত্র বেচারাদেরকে বেডরুমের বাইরের প্যাসেজের শূন্য টাইলসের উপর ঘুমাতে হয়। এর উপরে আবার সবচেয়ে সিনিয়র অনার্স চতুর্থ বর্ষের ছাত্র রুলফ স্ট্যান্ডার তার হাউজ কমিটিকে নিয়ে আসে কক্ষ পরিদর্শনের জন্য।
ইন্সপেকশন শেষে নবীনদের শাস্তি হয় এক ঘণ্টার মাঝে রুম ঝকঝকে করে রুট মার্চে যাওয়া।
যার মানে হল কেবল আন্ডারপ্যান্ট পরে মাখায় বালিশ নিয়ে ঘুমন্ত শহরের রাস্তায় হাঁটা। বালিশটা একটা দড়ি দিয়ে গলার সাথে লাগানো থাকে আর হাত দুটোও পিছমোড়া করে বেঁধে দেয়া হয়। পুনরায় হোস্টেলে ফিরতে ফিরতে বেজে যায় ভোর চারটা। বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রথম লেকচার শুরু হয় সকাল সাতটায়। বেশিরভাগ সময় নাশতা করারও ফুরসৎ মেলে না।
বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষও ছেলেদের এসব ছেলেমানুষীতে নাক গলায় না। ম্যানফ্রেডও এ সম্পর্কে শুনেছে কিন্তু ভাবতেও পারেনি যে মজাদার অত্যাচারের নিষ্ঠুরতা এতটা ভয়াবহ হবে। একবার তো একটা ছেলে সইতে না পেরে হাসপাতালে ভর্তি হয়ে আর বিশ্ববিদ্যালয়েই ফেরেনি। প্রসঙ্গটাও সবাই ভুলে যায়।
শারীরিকভাবে সুদর্শন আর বড়সড় হওয়ায় ম্যানফ্রেড প্রথম থেকেই বড় ভাইদের সুনজরে পড়ে যায়। দাঁতে দাঁত ঠেকিয়ে সমস্ত কিছু সহ্য করে যায় ম্যানি। কিন্তু দ্বিতীয় সপ্তাহে দেখা গেল কমন রুমের বোর্ডে পিন দিয়ে লাগানো নোটিশ লেখা হয়েছে :
নতুনদের সবাইকে শনিবার বিকেল চারটায় বিশ্ববিদ্যালয় জিমেনেশিয়ামে বক্সিং স্কোয়াডে অংশ নেয়ার জন্য উপস্থিত হতে হবে।
রুলফ স্ট্যান্ডার
বক্সিং ক্যাপ্টেন
বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রতিটি হলই কোনো না কোনো খেলার জন্য বিখ্যাত। তেমনি ম্যানফ্রেডের হল রেস্ট এন্ড পিস হল বক্সিংয়ের আখড়া। তাছাড়া আংকেল ট্রম্প নিজেও এখানকার বাসিন্দা ছিলেন বলে ম্যানডেও এখানেই আসতে চেয়েছে।
নির্দিষ্ট সময়ানুযায়ী জিসনেশিয়ামে আসতেই দেখা গেল জড়ো হয়েছে তিনশ’ দর্শক। সিনিয়র এক ছাত্র এসে সামরিক কায়দায় মিছিমিছি সার বেঁধে তাদেরকে দাঁড় করিয়ে টেনিস, শর্ট আর ভেস্ট পরালো। তারপর উচ্চতা অনুযায়ী লকারের সামনে দাঁড়াতে হল।
