এরপর সবাই এমনভাবে হুড়মুড় করে গির্জা থেকে বেরিয়ে এল যেন ভূমিকম্প কিংবা সামুদ্রিক ঝড় থেকে বেঁচে ফিরেছে। কেউ হাসছে। কেউ নার্ভাস ভঙ্গিতে হাঁটছে। সবার শেষে বের হল সেই তিন আগন্তুক। দরজার কিনারে দাঁড়ানো আংকেলের সাথে প্রত্যেকেই আবার হাত মিলিয়ে জরুরি কী যেন আলোচনাও করে নিল।
মনোযোগ দিয়ে তাদের কথা শুনে ট্রুডি আন্টির সাথে কিছু একটা পরামর্শ করে নিলেন আংকেল ট্রম্প। তারপর লোকগুলোকে জানালেন, “আপনারা এসে আমার বাসায় বসলে আমি সত্যিই সম্মানিত বোধ করব।”
অতঃপর চারজন পুরুষ বেশ ভাবগম্ভীর মুখ নিয়ে ঘরের দিকে হাঁটা ধরল। খানিক দূর থেকে তাদের পিছু নিল ট্রুডি আন্টি আর ছেলে-মেয়েদের দল। মেয়েদেরকে নির্দেশ দিতেই বিশেষ দিনের জন্য গচ্ছিত রাখা পর্দা লাগিয়ে দিল ডাইনিংরুমে। সেই সাথে টেবিলে রাখা হল মায়ের কাছ থেকে পাওয়া আন্টির কিচেন সেট।
তবে তিন আগন্তুক কিন্তু আন্টির রান্নার প্রশংসা করে একটুও সময় নষ্ট করল না। বরঞ্চ নিজেদের আলোচনা নিয়েই ব্যস্ত রইল। ছেলে-মেয়েরাও চুপচাপ গোল গোল চোখে তাকিয়ে খেয়ে উঠে গেল। এরপর পুরুষদের কফি পান আর ধূমপানের শেষে শুরু হল দ্বিতীয়বার প্রার্থনা।
এবার আংকেল উপদেশ দেবার জন্যে বেছে নিলেন, “ঈশ্বর বন্যতার মাঝেও তোমার জন্যে পথ খুঁজে রেখেছেন। নিজের সমস্ত পান্ডিত্য আর মেধা দিয়ে বললেও এবার কিন্তু আংকেল নিজের বই থেকেও বহু উদ্ধৃতি দিলেন। অন্যদিকে ম্যানফ্রেড খেয়াল করে দেখল যে একটু পরপরই পরস্পরের সাথে দৃষ্টি বিনিময় করছে আগন্তুক তিনজন।
সোমবার সকালবেলাতেই দক্ষিণের মেইল ট্রেনে চড়ে গেল তিনজন। কিন্তু এরপর প্রতিটা দিন এমনকি সপ্তাহের পর সপ্তাহ ধরে সবাই কেমন যেন আশা নিয়ে প্রতীক্ষায় রইল। এমনকি আংকেল পর্যন্ত সচরাচর যে ধরনের আচরণ করেন না তাই করলেন। প্রতিদিন সকালে পোস্টম্যানের আশায় সদর দরজায় পায়চারি করেন। যত দিন যাচ্ছে বোঝা যাচ্ছে ততই অস্থির হয়ে উঠছেন।
এমনিভাবে তিন সপ্তাহ কেটে যাবার পর হতোদ্যম আংকেল আশা ছেড়ে দেয়ার পর অবশেষে এল সেই কাঙিক্ষত চিঠি।
হল টেবিলের উপর পড়ে থাকা চিঠির খামের ওপর গির্জার হাই মডারেটরের সীল দেখেছে ম্যানফ্রেড। কিন্তু আংকেল খামটা তুলে এস্তপায়ে স্টাডিতে গিয়ে একেবারে ওর মুখের উপর দড়াম করে লাগিয়ে দিলেন দরজা। রাতের খাবারের জন্যে পাক্কা বিশ মিনিট অপেক্ষা করলেন, ট্রুডি আন্টি। তারপর আংকেলের দেখা মিলল। সে রাতে বেড়ে গেল ঈশ্বরের স্তুতি বন্দনা। চোখ পাকিয়ে ম্যানফ্রেডকে ইশারা করল সারাহ। ভ্রুকুটি করে মেয়েটাকে সাবধান করে দিল ম্যানি। যাক! অবশেষে আমেন বললেন আংকেল। কিন্তু তারপরেও সুপের চামচ না তুলেই উজ্জ্বল মুখে তাকালেন আন্টির দিকে।
“মাই ডিয়ার ওয়াইফ” আংকেল বললেন, “এতগুলো বছর ধরে তুমি অত্যন্ত ধৈর্য ধরেছো আর কখনো কোনো অভিযোগও করোনি।”
লজ্জায় লাল হয়ে গেলেন আন্টি “ছেলে-মেয়েদের সামনে কী বলছো তুমি!” কিন্তু চওড়া হল আংকেলের মুখের হাসি।
“ওরা আমাকে স্টিলেনবশে পাঠাচ্ছে।” আংকেলের ঘোষণা শুনেই সবাই একেবারে স্তব্ধ হয়ে গেল। অবিশ্বাসে তাকিয়ে আছে সবকটা চোখ।
কেপটাউন থেকে ত্রিশ মাইল দূরে অবস্থিত এই ছোট্ট গ্রাম স্টিলেনবশ। দালানকোঠাগুলো তুষারের মত ধবধবে সাদা ডাচ স্টাইলে হোয়াট ওয়াশ করা। সতেরশ শতকে গভর্নর ভ্যান স্টেলের আদেশে লাগানো সুদৃশ্য ওকের সারিঅলা রাস্তাগুলোও বেশ চওড়া।
ছোট্ট মফস্বলের চারপাশ জুড়ে আঙুরের ক্ষেত আর পেছনে যেন স্বর্গমত সুউচ্চ পবর্তমালা।
ছবির মত সুন্দর ছোট্ট এই শহর কিন্তু আফ্রিকাবাসীর দুর্গও বলা চলে। বিশ্ববিদ্যালয়ের ফ্যাকাল্টিগুলোও সবুজ ওকের নিচে অবস্থিত। এখানেই হল আফ্রিকান বুদ্ধিজীবীদের কেন্দ্রস্থল। ট্রম্প বিয়ারম্যান নিজেও এখানকার ছাত্র। বিখ্যাতদের সকলেই এখানকার সন্তান : লুই বোথা, হার্টজগ, জ্যা ক্রিশ্চিয়ান স্মুটস, স্টিলেনবশ থেকে আগত না হলে কেউই ইউনিয়ন অব সাউথ আফ্রিকার সরকারি পদে আসীন হতে পারবে না। দক্ষিণ আফ্রিকার অক্সফোর্ড আর কেমব্রিজ হল এই স্টিলেনবশ আর এখানকার গির্জার দায়িত্ব এখন দেয়া হল ট্রম্প বিয়ারম্যানকে। এখন থেকে এই সম্মানের জোরে নিজস্ব প্রতিপত্তি খাটানোর সুযোগ পাবেন আংকেল। তিনিই হবেন স্বপ্নদ্রষ্টাদের একজন। সবকিছুই এখন সম্ভবপর। মডারেটরশীপ, সাইনড কাউন্সিল সবকিছু। কোনো কিছুই এখন আর অসম্ভব নয়।
“সেই বই” হাঁফ ছাড়লেন ট্রুডি আন্টি, “আমি কখনো ভাবতেই পারিনি। বুঝতে পারিনি যে”।
“হ্যাঁ, সেই বই।” মিটিমিটি হাসছেন আংকেল,
“আর ত্রিশ বছরের কঠোর পরিশ্রম। ইকবুম স্ট্রাটের বড়সড় প্রাসাদ আর বছরে এক হাজার পাব। ছেলে মেয়েদের প্রত্যেকে পৃথক রুম আর গির্জার খরচে বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়তে পারবে। এখন থেকে আমি সবচেয়ে ক্ষমতাশালী আর মেধাবী তরুণদের সামনেই উপদেশ দিব। বিশ্ববিদ্যালয় কাউন্সিলেও থাকব। আর তুমি, মাই ডিয়ার ওয়াইফ, প্রফেসর আর সরকারের মন্ত্রীদেরকেই তোমার টেবিলে পাবে। তাদের পত্নীরা তোমার সঙ্গী হবে “ আচমকা অপরাধবোধে চুপ করে গেলেন আংকেল, “এখন আমরা সবাই প্রার্থনা করব। ঈশ্বরের কাছে অহংকার আর লোভের জন্য ক্ষমা চাইব। সবাই হাঁটু গেড়ে বসো।” চিৎকার করে উঠলেন আংকেল ট্রম্প।
