“আমি কি এটা পড়তে পারি? প্লিজ আংকেল ট্রম্প?” ভাবল এবার হয়ত আংকেল রেগে যাবেন। কিন্তু না; নরম স্বরে বললেন, “তুমি পড়তে চাও?” প্রথমে খানিকটা আশ্চর্য হলেও পরে হেসে ফেললেন, “ওয়েল আমি তো এ কারণেই লিখেছি, যেন লোকে এ বই পড়ে।”
তারপর আচমকা ছোঁ মেরে ম্যানফ্রেডের হাত থেকে বইটাকে কেড়ে নিয়েই ডেস্কে বসে গেলেন আংকেল। নাকের উপর চশমা বসিয়ে খুলে ফেললেন প্রথম পাতা, খসখস করে কী যেন লিখলেন অতঃপর পুনরায় নিজের লেখা পড়ে নিয়ে বাড়িয়ে ধরলেন ম্যানির দিকে। দেখা গেল ভেতরে জ্বলজ্বল করছে।
ম্যানফ্রেড ডি লা রেকে,
এমন এক তরুণ যে কিনা ইতিহাস আর আফ্রিকার মাঝে সর্বযুগের জন্যে আমাদের জনগণের স্থান নির্ধারণে সাহায্য করবে। তোমার আংকেল।
ট্রম্প বিয়ারম্যান।
বুকের কাছে বইটাকে চেপে ধরেই দরজার কাছে পিছিয়ে এল ম্যানফ্রেড। ভয় পাচ্ছে আবার না জানি আংকেল ছোঁ মেরে ফিরিয়ে নিয়ে যান। এটা আমার, সত্যিই আমার জন্যে?” ফিসফিস করে উঠল ম্যানি।
“হ্যাঁ, এটা তোমার।” আংকেল মাথা নাড়তেই ধন্যবাদ জানাবার কথা টথা ভুলে এক দৌড়ে রুম থেকে বেরিয়ে এল ম্যানফ্রেড।
পরপর তিন রাত ভোর পর্যন্ত জেগে থেকে কাঁধের ওপর কম্বল চাপিয়ে কাঁপা কাঁপা মোমবাতির আলোতে পড়ে শেষ করল পুরো বই। সহজ ভাষায় লেখা পাঁচশ পাতার বইটাতে পবিত্র গ্রন্থ থেকে উদ্ধৃতি থাকলেও নেই কোনো অহেতুক বর্ণনা কিংবা বিশেষণের বাড়াবাড়ি। হৃদয় দিয়েই এর সবটুকু অনুভব করল ম্যানি। নিজ জাতির সাহস আর বীরতে গর্ববোধ করলেও ক্ষেপে উঠল তাদের প্রতি নির্যাতন দেখে। কোলের ওপর বইটাকে রেখে কাঁপা কাঁপা ছায়ার দিকে তাকাতেই যেন দেখতে পেল তার তরুণ জাতির দুর্দশা।
ঠিক তখনই মনে হল যেন ম্যানির অন্তরের ক্ষোভ টের পেয়েছেন আংকেল আর তাই নেমে এলেন নিচে। নুড়ি পাথরের উপর শোনা গেল তার পদশব্দ। তারপর শেডের ঘরে ঢুকলেন আংকেল ট্রম্প। দরজায় দাঁড়িয়ে খানিকক্ষণ সময় নিলেন মোমবাতির আলোতে চোখ সইয়ে নেয়ার জন্য। এগিয়ে এসে বসলেন ম্যানফ্রেডের পাশে।
পুরো পাঁচ মিনিট দু’জনে নিঃশব্দে বসে থাকার পর আংকেল জানতে চাইলেন,
“তুমি তাহলে পুরোটা পড়ে শেষ করেছো?”
বহুকষ্টে নিজেকে বর্তমানে ফিরিয়ে আনল ম্যানফ্রেড, “আমার মনে হয় আজ পর্যন্ত এতটা গুরুত্বপূর্ণ আর কোনো বই লেখা হয়নি।” ফিসফিস করে বলল, “ঠিক বাইবেলের মতই গুরুত্বপূর্ণ।”
“এটা একটু বেশি হয়ে গেল বাছা” তীব্র চোখে তাকাতে গিয়েও সন্তুষ্টচিত্তে নরম হয়ে গেলেন আংকেল। আগ্রহ নিয়ে ম্যানফ্রেড বলে উঠল, “জীবনে প্রথমবারের মত বুঝলাম আমি কে আর কেনই বা এখানে আছি।”
“তার মানে আমার প্রচেষ্টা ব্যর্থ হয়নি।” বিড়বিড় করে উঠলেন আংকেল। খানিক বাদে দীর্ঘশ্বাস ফেলে জানালেন, “বই লেখা কিন্তু খুব বেদনায়ক একটা কাজ। ঠিক যেন অন্ধকারের মাঝে একাকী বসে কাদা, যেখানে কেউ তোমাকে শুনতে পাচ্ছে না, তোমার বিষাদের উত্তরও দিচ্ছে না।”
“আমি আপনার কথা শুনেছি, আংকেল ট্রম্প।”
“ইয়েস, তুমিই শুনেছো কেবলই তুমি।”
যাই হোক, আংকেল ট্ৰম্পেরও ভুল হচ্ছে। বাইরের অন্ধকারে কান পেতে রয়েছে আরো বহুজন।
***
হঠাৎ করে গ্রামের মাঝে কোনো আগন্তুক এলে সেটা নিয়ে চারপাশে সাড়া পড়ে যায়। তারপর যদি হয় সংখ্যায় তিনজন তাহলে তো আর কথাই নেই। চারপাশে কেবল তাদের নিয়েই আলোচনা।
সাপ্তাহিক মেইল ট্রেনে চেপে দক্ষিণ থেকে এসেছে এই তিন আগন্তুক। কিন্তু বিধবা ভরসটারের বোর্ডিং হাউসে ঢোকার পর রবিবারের আগপর্যন্ত তাদেরকে আর দেখাই গেল না। অতঃপর ডাচ্ রিফর্মড চার্চের ডিকনদের মত সাদা নেষ্টাই আর কালো স্যুট পরে এসে বসল গির্জার বেদীর নিচে একেবারে সামনের সারিতে।
বছরের পর বছর ধরে যেসব পরিবার এই বেঞ্চগুলোতে বসত তারাও কোনো উচ্চবাচ্য না করে গিয়ে বসল পেছনের দিকে।
আগন্তুকদের উপস্থিতির কথা এমনভাবে রটে গেল যে তাদেরকে ইতিমধ্যেই “তিন পন্ডিত” নাম দেয়া হয়েছে, যারা গত কয়েক বছরে গির্জার ছায়াও মাড়ায়নি তারাও কৌতূহল নিয়ে আজ এসেছে। সবশেষ কভেন্যান্ট ডে কিংবা ডিগান’স ডেতেও এত লোক কখনো গির্জায় আসেনি।
প্রার্থনা সঙ্গীতও হল অত্যন্ত শ্রুতিমধুর। পাশে দাঁড়িয়ে মুগ্ধ হয়ে সারাহর গান শুনল ম্যানফ্রেড। ঐতিহ্যবাহী পোশাকের ঘোমটার নিচেও মেয়েটাকে দেখাচ্ছে পরীর মতন। চৌদ্দ বছর বয়সেই পরিপূর্ণতা পেয়েছে ওর নারীত্ব। যতবার ওর দিকে তাকায়, নিঃশ্বাসের কষ্টে ভোগে ম্যানি।
শেষ হল স্তবগান। জনাকয়েকের কাশির পর পুরোপুরি নিশ্চুপ হল চারপাশ। আর আংকেল ট্ৰম্পের বাণী পাঠ তো পুরো দক্ষিণ-পশ্চিম আফ্রিকা জুড়েই বিখ্যাত। বলা যায় উইন্ডহকের চলচ্চিত্র হাউজের পরেই সেরা বিনোদন হল আংকেলের উপদেশ। আর আজ তো আংকেল চমৎকার ফুরফুরে মেজাজে আছেন। বিশেষ করে প্রথম সারিতে বসা তিন আগন্তুক যারা এ তল্লাটে এসে যাজকের সাথে দেখা করার সৌজন্যটুকু পর্যন্ত করেনি, তাদেরকে দেখে কয়েকগুণ বেড়ে গেল আংকেলের আগ্রহ।
“পাপিষ্ঠের দল।” হাত মুঠো পাকিয়ে এমন এক গর্জন ছাড়লেন যে গির্জার ছাদের কাঠে বাড়ি খেয়ে সে শব্দ আবার প্রতিধ্বনি হতেই নিজেদের চেয়ারে বসেই ঝাঁকি খেলো তিন আগন্তুক; যেন তাদের ওপর কামানের গোলা পড়েছে। “অনুশোচনাহীন পাপাচারীদের দ্বারা ভরে গেছে ঈশ্বরের গৃহ” একের পর এক বাক্যের তুবড়ি ছোটালেন আংকেল। প্রথমে ভয়ংকর সব অভিযোগ তারপর আবার বিশেষ করে কণ্ঠে মুক্তির আশ্বাস এবং সবশেষে আবারো তীক্ষ্ণ আঘাত। কয়েকজন নারী তো প্রকাশ্যেই কান্না জুড়ে দিল। অবশেষে সমস্বরে আমেন আর হাল্লেলুইয়া ও হাঁটু গেড়ে প্রতিটি আত্মার জন্য প্রার্থনার মধ্য দিয়ে শেষ হল সমস্ত কিছু।
