“তুমি আসলে এর কোনো অংশ চাও না, এমনকি সবচেয়ে বড় অংশটুকুও না।” দুহাত দু’পাশে ছড়িয়ে যেন গোটা দিগন্তকেই আলিঙ্গন করবেন হেনড্রিক এমনভাবে বললেন, “তুমি এর সবটুকু চাও। পুরো ভূমি আর এর সমস্ত কিছু!” বিস্ময় মাখা কণ্ঠে ভাইয়ের ঘোষণা শুনে হেসে ফেললেন মোজেস।
যাক ভাই তাহলে এবারে বুঝতে পেরেছে।
***
দুজনে চুপচাপ আবার নেমে ফোর্ডের কাছে চলে এলেন। গাড়িতেও কেউ কোনো কথা বললেন না। ড্রেকস ফার্মের কাছাকাছি এক লেভেল ক্রসিংয়ে গাড়ি থামতেই শীতের সকালে ছেঁড়া কাপড় গায়ে এক কৃষ্ণাঙ্গ শিশু এসে ফোর্ডের সাইড উইন্ডো দিয়ে মোজেসের দিকে বাড়িয়ে ধরল একটা ভাঁজ করা নিউজ পেপার। জানালার কাঁচ নামিয়ে বাচ্চাটার দিকে তামার মুদ্রা ছুঁড়ে দিয়েই পেপারটাকে দু’জনের মাঝখানে রেখে দিলেন মোজেস।
আগ্রহ নিয়ে ভাজ করা কাগজটা মেলে ধরলেন হেনড্রিক। হেড লাইনে লেখা :
দক্ষিণ আফ্রিকা দল বার্লিন অলিম্পিক গেমসের জন্যে নির্বাচিত হয়েছে।
পুরো জাতির শুভ কামনা রইল তাদের প্রতি।
সংবাদের নিচে সাঁটা ছবিটাকে দেখেই ফোকলা দাঁতে হেসে ফেললেন হেনড্রিক, “আমি এই শ্বেতাঙ্গ ছেলেটাকে চিনি।”
“আমিও।” মোজেসও সায় দিল। দুজনেই ছবিগুলোর লম্বা সারির মধ্যে ভিন্ন ভিন্ন ছবির দিকে তাকিয়ে আছেন।
***
ম্যানেফ্রেড জানে যে আংকেল ট্রম্প বহু রাত অব্দি জেগে কাজ করে। যতবার মাঝরাতে ব্লাডারের চাপে ওর ঘুম ভেঙে যায়, বাইরে আউট হাউজের পথে এলে ততবার ঘুমকাতুরে চোখে দেখতে পায় যে আংকেলের স্টাডিতে তখনো বাতি জ্বলছে।
এরকম একবার ট্রুডি আন্টির বাধাকপির বাগানের মধ্যে দিয়ে এসে জানালার শার্সির ভেতরে উঁকি দিতেই দেখা গেল যে লোমওয়ালা বিশাল এক ভালুকের মত ডেস্কে বসে আছেন আংকেল। একগাদা কাগজ যত্রতত্র এমনভাবে ছড়িয়ে আছে যেন এইমাত্রই হারিকেন বয়ে গেছে ডেস্কের ওপর দিয়ে। খসখস করে কীসব যেন লিখে চলেছেন আংকেল। ম্যানফ্রেড ভেবেছিল হয়ত গির্জায় বক্তৃতা দেবার জন্য খসড়া লিখছেন। কিন্তু প্রায় দু বছর ধরে রাতের পর রাত কেন এত পরিশ্রম করছেন সেটা ভেবে দেখেনি।
তারপর একদিন সকালবেলা ধূলিমাখা পথ বেয়ে বাইসাইকেল চালিয়ে এল এক কৃষ্ণাঙ্গ পোস্টম্যান : সাথে একগাদা স্ট্যাম্প আর স্টিকার লাগানো মোমের সিলওয়ালা বাদামি কাগজে মোড়ানো বিশাল এক প্যাকেট। হলের ছোট্ট টেবিলটার উপর বিশাল প্যাকেটটাকে রেখে দিলেন ট্রুডি আন্টি। বিস্ময় নিয়ে তাকিয়ে রইল ছেলে-মেয়ের দল। তারপর যেই না বিকেল পাঁচটায় ঘোড়া ছুটিয়ে আংকেল এলেন, সবার আগে দৌড়ে গেল সারাহ্, হাঁপাতে হাঁপাতে বলল, “পাপা তোমার জন্য পার্সেল এসেছে।”
প্যাকেটটাকে পরীক্ষা করে জোরে জোরে লেবেল পড়ে শোনালেন আংকেল। পেছনে আগ্রহ নিয়ে দাঁড়িয়ে আছে সবাই। তারপর ওয়েস্টকোটের পকেট থেকে মুক্তোর হাতল লাগানো পেন নাইফ বের করে ইচ্ছে করেই নাটুকে ভঙ্গিতে বুড়ো আঙুলের ডগায় ফলার ধার পরীক্ষা করে নিলেন আংকেল। অবশেষে সাবধানে প্যাকেটের দড়ি কেটে খুলে ফেললেন বাদামি মোড়ক।
“বই!” দীর্ঘশ্বাস ফেলল সারাহ। বোঝা গেল এটা কিছুতেই আশা করেনি। তাই মেয়েরা একে একে রুম থেকে চলে গেলেও বাকি রয়ে গেল কেবল ম্যানফ্রেড।
একই বইয়ের মোটা মোটা ছয়টা কপি। লাল বোর্ডে বাঁধানো; সোনালি হরফের টাইটেল চকচক করছে। এদিকে অত্যন্ত মনোযোগ দিয়ে ম্যানফ্রেডের প্রতিক্রিয়া দেখার জন্যে অপেক্ষা করছেন আংকেল। তবে একেবারে উপরের বইটার মলাটে টাইটেল দেখে খানিকটা বিমর্ষ হয়ে গেল ম্যানিঃ দ্য আফ্রিকানার : হিজ প্লেস ইন হিস্ট্রি অ্যান্ড আফ্রিকা।
যে ভাষা এখনো তেমন সমাদৃত হয়নি সেই আফ্রিকান ভাষায় লেখা দেখে ম্যানফ্রেড বেশ অবাক হল। কারণ গুরুত্বপূর্ণ সব কিছুই সাধারণত ডাচ্ ভাষায় লেখা হয়। মুখ ফসকে কথাটা বলেও ফেলত। কিন্তু ঠিক সে সময়েই লেখকের নামের দিকে চোখ পড়তেই বিস্ময়ে বলা যায় ছানাবড়া হয়ে গেল ওর চোখ। আংকেল টুম্প।”
বিনয়ে বিগলিত হয়ে মিটিমিটি হাসলেন আংকেল।
“আপনি লিখেছেন।” গর্বে ভরে উঠল ম্যানির বুক, “আপনি একটা বই লিখেছেন।”
“ইয়েস, বাছা” বিশাল থাবা দিয়ে বইগুলো তুলে নিজের স্টাডির দিকে হাঁটা ধরলেন আংকেল। তারপর ডেস্কের ওপর জড়ো করে রাখতেই অবাক হয়ে দেখলেন যে ম্যানফ্রেডও পিছুপিছু স্টাডিতে চলে এসেছে।
“অ্যায়াম সরি, আংকেল” ম্যানফ্রেড বুঝতে পারল এভাবে আসাটা ঠিক হয়নি; জীবনে এর আগে কেবল একবারই এ রুমে ঢোকার সুযোগ পেয়েছিল তাও আবার আংকেলের হুকুমে “আমি আপনাকে না জিজ্ঞেস করেই চলে এসেছি। ভেতরে আসব?”
“ইতিমধ্যেই ভেতরে এসে গেছে।” খানিকটা কড়া হতে চাইলেন আংকেল, “যাই হোক, থাকো তাহলে কিছুক্ষণ।”
পেছনে হাত দিয়ে ডেস্কের পাশে এসে দাঁড়াল ম্যানফ্রেড। এ বাসায় এসেই লেখাপড়ার প্রতি শ্রদ্ধা দেখাতে শিখেছে ম্যানফ্রেড। জেনেছে বই হল মানুষের সবচেয়ে বড় সম্পদ।
“আমি কি একটু ছুঁয়ে দেখতে পারি?” জানতে চাইলে মাথা নাড়লেন আংকেল। আঙুল দিয়ে লেখকের নাম স্পর্শ করল ম্যানফ্রেড : “দ্য রেভারেন্ড টুম্প বিয়ারম্যান।”
তারপর একেবারে উপরের বইটাকে হাতে তুলে নিল। যদিও দুরুদুরু বুকে ভাবছে যেকোনো মুহূর্তেই হয়ত গর্জন করে উঠবেন আংকেল। যাই হোক সেরকম কিছুই হল না। পাতা উল্টে সস্তা হলদে কাগজের উপর ছাপা অক্ষরগুলোর দিকে একদৃষ্টে তাকিয়ে রইল ম্যানি।
