***
“বছরগুলো কত দ্রুত পার হয়ে গেল তাই না? মনে হচ্ছে মাত্র সেদিন ট্রেনে চেপে মরুভূমি পার হয়ে গোল্ডিতে এসেছি।” রবিবারের সকালবেলাতে ব্যস্ত রাস্তায় মনোযোগ দিয়ে ফোর্ড চালাচ্ছে মোজেস। পাশে বসে সুউচ্চ খনির দিকে তাকিয়ে বলে উঠলেন হেনড্রিক। খুব বেশি জোরে কিংবা আস্তে নয়, একেবারে নিয়ম মেনে মাত্র কয়েক মাস আগে আসা নতুন প্রযুক্তির ট্রফিক লাইট অনুসরণ করে গাড়ি চালাচ্ছে মোজেস।
“কখনো অপ্রয়োজনে কাউকে তোমার দিকে আকর্ষণ করো না ভাই।” হেনড্রিককে উপদেশ দিয়ে মোজেস বলল, “শ্বেতাঙ্গ কোনো পুলিশ যেন তোমাকে থামাবার কোনো অজুহাত না পায়। এমনিতেই তোমার মোটর কার দেখে তোমাকে সে ঘৃণা করছে।”
সামনের রাস্তাটা একেবেঁকে চলে গেছে জোহানেসবার্গ কাট্রিক্লাবের দিকে। গাছের সারির ফাঁক দিকে চকচক করে উঠল কান্ট্রিক্লাবের সাদা দেয়াল। ফোর্ডের গতি ধীর করে ক্লাব প্রোপারটির মধ্যে চলে এল মোজেস। রাস্তার পাশের মাইলপোস্টে লেখা রিভোনিয়া ফার্ম।”
রাস্তাটা অসমান হওয়াতে ফোর্ডের হুইল ছোটাল ধূলিঝড়। দুপাশেই পাঁচ থেকে দশ একরের ছোট ঘোট প্লট। আর একেবারে শেষ মাথায় ডা. মার্কাস আর্চারের সম্পত্তি। তিনি অবশ্য খামার গড়ে তোলার কোনো চিন্তাই করেননি। ঘোড়া-মুরগি কিংবা সবজির ক্ষেত কিছুই নেই। কেবল চারপাশে চওড়া বারান্দাঅলা সিঙ্গেল একটা চারকোনা দালান।
গাম গাছের নিচে আরো চারটি গাড়ি দেখা যাচ্ছে। ফোর্ড থামিয়ে দিল মোজেস।
“ঠিকই বলেছো ভাই, বছরগুলো বড় বেশি দ্রুত পার হয়ে গেল। মানুষ যখন কোনো উদ্দেশ্যের পেছনে ছছটে তখন এমনই হয়। বদলে যাচ্ছে আমাদের চারপাশের পৃথিবী। ঘটে গেছে যুগান্তকারী সব ঘটনা। রাশিয়ার বিপ্লবের পর উনিশ বছর কেটে গেছে, ট্রাঙ্ক দেশান্তরে গেছে। রাইনল্যান্ড নিয়ে নিয়েছে হিটলার আর ইউরোপে তো যুদ্ধের কথা হচ্ছে, যে যুদ্ধ পুঁজিবাদের অভিশাপ ধ্বংস করে বিপ্লবকে বিজয়ী করে তুলবে।”
হেসে ফেললেন হেনড্রিক, “এগুলো নিয়ে আমাদের না ভাবলেও চলবে।”
“তুমি আবারও একটা ভুল করলে ভাই। এসব নিয়েই আমাদের সবচেয়ে বেশি ভাবা দরকার।”
“আমি তো কিছুই বুঝতে পারছি না।”
“তাহলে আমি তোমাকে সাহায্য করব।” ভাইয়ের হাত স্পর্শ করল মোজেস, “চলল ভাই, তোমাকে নতুন করে পৃথিবী দেখতে শেখাবো।” ফোর্ডের দরজা খুলে নেমে এল মোজেস। সাথে হেনড্রিক। দুজনে একসাথে এগোল পুরনো বাড়িটার দিকে।
চোখ-কান খোলা রেখে মুখটাকে বন্ধ রাখাটাই বুদ্ধিমানের কাজ হবে। বুঝলে ভাই।” সামনের বারান্দার সিঁড়িতে পা দিয়ে ভাইকে বুঝিয়ে বলল মোজেস। এভাবেই তুমি অনেক বেশি কিছু শিখতে পারবে।”
দু’ভাইকে দেখে তাড়াতাড়ি সিঁড়ি দিয়ে নেমে এলেন মার্কাস। মোজেসকে দেখে খুশিতে চকচক করে উঠল ডাক্তারের চেহারা। মোজেসের কোমরে হাত দিয়ে হেনড্রিকের দিকে তাকিয়ে বললেন,
“তুমি নিশ্চয় হেনরি, আমরা তোমার কথা প্রায়ই বলি।”
“আপনার সাথে আমার আগেও দেখা হয়েছিল ডাক্তার।”
“সে তো বহু বছর আগে।” মাথা নেড়ে আর্চার জানালেন, “আর তুমি আমাকে মাকাম নামেই ডাকবে। তুমি তো আমাদের পরিবারেরই সদস্য।” মোজেসের দিকে তাকাতেই ডাক্তারের চোখে ফুটে উঠল গভীর আকুলতা। হেনড্রিকের মনে হল যেন কোনো নব পরিণীতা বধূ স্বামীর জন্য অস্থির হয়ে আছে।
হেনড্রিক জানেন যে মোজেস এখানে মার্কাসের সাথেই বসবাস করে। আর এই সম্পর্ক নিয়ে তার কোনো মাথাব্যথাও নেই। গত কয়েক বছরে তাদের সফলতার পেছনে মার্কাসের উপদেশ আর সহযোগিতা যে কতটা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে তিনি তাও ভালো করেই জানেন। ভাইয়ের জায়গায় থাকলে তিনিও যে তাই করতেন এ ব্যাপারে কোনো সন্দেহ নেই।
“মোজেস তোমাকে আরো আগে কেন আনেনি তাই বুঝতে পারছি না।” খেলার ছলে মোজেসের হাতে চাপড় মারলেন আর্চার।
“অনেক গুরুত্বপূর্ণ সব ব্যক্তি এখানে আছেন যাদের সাথে তোমার আরো আগেই দেখা হওয়াটা উচিত ছিল। এখন চলো। তোমার সাথে ওদের পরিচয় করিয়ে দিই।” হেনড্রিকের হাত ধরে রান্নাঘরের ভেতর দিয়ে টেনে নিয়ে গেলেন আর্চার।
রান্নাঘরের লম্বা হলুদ কাঠের টেবিলে বসে আছেন এগারোজন লোক। পাঁচজন শ্বেতাঙ্গ হলেও বাকিরা সকলে কষ্ণাঙ্গ। একেবারে তরুণ থেকে শুরু করে পকূকেশ বৃদ্ধ পর্যন্তও আছে। টেবিলের পাশ দিয়ে হেঁটে সবার সাথে হেনড্রিককে পরিচয় করিয়ে দিল মোজেস। একেবারে মাথায় বসে আছে,
“ইনি হচ্ছেন রেভারেন্ড জন ডিউব। কিন্তু তুমি হয়ত তাকে মাফুকুজেলো নামে ডাকতে শুনেছো।”
বিস্ময় আর শ্রদ্ধায় স্তব্ধ হয়ে গেলেন হেনড্রিক।
“বাবা!” সুদর্শন বৃদ্ধ জুলুকে অভিনন্দন জানালেন হেনড্রিক। জানেন যে এই রেভারেন্ড জুল জাতির রাজনৈতিক নেতা। দ্য ম্যান অব ন্যাটাল নামক সংবাদপত্রের সম্পাদক ছাড়াও তার সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ পরিচয় হল লোকটা দক্ষিণ আফ্রিকা মহাদেশের কৃষ্ণাঙ্গ জাতিসমূহের মুখপাত্র হিসেবে একমাত্র সংগঠন আফ্রিকান ন্যাশনাল কংগ্রেসের প্রেসিডেন্ট।
“আমি তোমাকে চিনি।” আস্তে করে জানালেন জন ডিউ, “তুমি নতুন ট্রেড ইউনিয়নের জন্য অনেক গুরুত্বপূর্ণ সব কাজ করেছে। স্বাগতম, মাই সন।”
জন ডিউব থাকাতে রুমের বাকিদের প্রতি তেমন একটা আগ্রহ বোধ করলেন, না হেনড্রিক। যদিও মাত্র বছর বিশেকের এক কৃষ্ণাঙ্গ তরুণকেও দেখা যাচ্ছে।
