“আরো কিছু আছে নাকি?” আগ্রহী হয়ে উঠলেন হেনড্রিক।
“সবে তো শুরু হয়েছে, ভাই।”
“এরপরে কী আছে?”
“তুমি ট্রেড ইউনিয়নের নাম শুনেছো?” জানতে চাইল মোজেস, “জানো এটা কী?”
দ্বিধায় পড়ে গেলেন হেনড্রিক, “খনি আর রেলওয়েতে কাজ করে এমন শ্বেতাঙ্গদের ট্রেড ইউনিয়ন আছে বলে শুনেছি। কিন্তু তেমন কিছু তো জানি না। ভেবেছি এসবে আমাদের তো কোনো দরকার নেই।”
“তুমি ভুল ভেবেছো ভাই।” আস্তে করে জানাল মোজেস, “আফ্রিকানস মাইন ওয়ার্কাস ইউনিয়ন নিয়ে আমাদেরকে ভাবতে হবে। এ কারণেই তুমি আর আমি গোন্ডিতে এসেছি।”
“আমি তো ভেবেছি আমরা কেবল অর্থের জন্যই এসেছি।”
“পঞ্চাশ হাজার ইউনিয়ন সদস্য প্রতি সপ্তাহে এক শিলিং করে দিচ্ছে এটা অর্থ নয়?” হেনড্রিককে দেখে হেসে ফেলল মোজেস। লোভে চকচক করছে তার ভাইয়ের মুখ।
“অনেক বিশাল পরিমাণ অর্থ হবে, ভাই!”
হানি মাইনে ওয়ার্কাস ইউনিয়ন প্রতিষ্ঠা করতে গিয়ে কেন অসফল হয়েছিল তা ভালোই মনে আছে মোজেসের। কৃষ্ণাঙ্গ শ্রমিকরা এতই সরল যে রাজনৈতিক কোনো সচেতনতাই তাদের নেই।
“গোত্রের ধারণাই আমাদের পথের সবচেয়ে বড় কাঁটা।”
হেনড্রিককে বুঝিয়ে দিল মোজেস। “কিন্তু যদি নিজ নিজ গোত্র ভুলে সবাই এক হয়ে উঠতে পারি তাহলেই অসীম হয়ে উঠবে আমাদের ক্ষমতা।”
“কিন্তু আমরা তো এক নই। বুঝতে পেরেছেন হেনড্রিক, “একজন ওভাষো থেকে একজন জুলু তো ঠিক একজন রাশান। কাজাকের কাছ থেকে একজন স্কটম্যানের মতই পৃথক।”
“হা!” হেসে ফেললেন মাজেস। “তার মানে তোমাকে যে বইটা দিয়েছিলাম তুমি সেটা পড়েছো? প্রথম যখন গোল্ডিতে এসেছি তুমি তো তখন রাশান কাজাকের নামও জানতে না”।
“পৃথিবী আর এখানে বসবাসরত মানুষদের সম্পর্কে তুমি আমাকে অনেক কিছু শিখিয়েছে” একমত হলেন হেনড্রিক, “এখন বলল কেমন করে একজন জুলু এক ওভাম্বোকে ভাই ডাকতে পারবে। কীভাবে শ্বেতাঙ্গদের হাতে কুক্ষিগত ক্ষমতাকে নিজের করে নিতে পারব আমরা?”
“এগুলোর কিছুই অসম্ভব নয়। আমাদের মতই রাশিয়াতেও বিভিন্ন গোত্র আছে। তাতার, স্লভ, ইউরোপীয়, এশিয়াটিক; কিন্তু এক মহান নেতার ছায়ায় একত্রিত হয়ে তারা আমাদের শাসকের চেয়েও বড় এক স্বৈরশাসক পরাস্থ করে দিয়েছে। তাই কৃষ্ণাঙ্গদের এমন এক নেতা দরকার যে তাদেরকে সঠিক কাজটি করতে বাধ্য করবে। এতে যদি হাজার কিংবা কোটি লোককে প্রাণও দিতে হয় তাতেও যেন কিছু না যায় আসে।”
“তোমার মতই এক নেতা ভাই?” হেনড্রিকের প্রশ্ন শুনে অদ্ভুত এক প্রহেলিকাময় হাসি দিল মোজেস।
“সবার আগে মাই ওয়ার্কাস ইউনিয়ন” বলল, যেমন করে একটা শিশু হাঁটতে শেখে তেমনভাবে প্রতি পদক্ষেপে এক পা এক পা করে। শুরুটা বেদনাদায়ক হলেও সঠিক কাজটা করতে মানুষকে বাধ্য করতে হবে।”
“আমি আসলে ঠিক নিশ্চিত নই” বিশাল গোলাকার ন্যাড়া মাথাটা দুলিয়ে হেনড্রিক জানতে চাইলেন, “আমরা আসলে কী খুঁজছি ভাই? ধন-সম্পদ না ক্ষমতা?”
“আমরা আসলে সত্যিই ভাগ্যবান।” উত্তরে মোজেস জানাল, “তুমি চাও ধন-সম্পদ আর আমি ক্ষমতা। আমি যে পথ বেছে নিয়েছি তাতে প্রত্যেকেই আমরা নিজ নিজ আকাক্ষিত বস্তু পেয়ে যাব।”
কিন্তু প্রতিটি খনিতে বাফেলোদের নির্দয় প্রচেষ্টা সত্ত্বেও ইউনিয়ন তৈরি করাটা তেমন ফলপ্রসূ হল না। কেননা কৃষ্ণাঙ্গ শ্রমিকদের লেবার অ্যাসোশিসনের ব্যাপারে সরকারের নিষেধাজ্ঞা আছে। তাই গোপনে কাজ করতে হয়। অন্যদিকে শ্রমিকরা নিজেরাও বিরোধিতা করছে। এছাড়া উদ্দেশ্য বুঝতে না পেরে ভরসার অভাবে সাধারণ শ্রমিকরা নিজের কষ্টার্জিত অর্থ দিতেও চায় না।
যাই হোক, ডা. মার্কাস আর্চারের পরামর্শ আর দিক-নির্দেশনায় ধীরে হলেও কয়েকটা খনিতে ইউনিয়ন প্রতিষ্ঠা করতে পারল বাফেলো টিম। বিভিন্ন ধরনের অত্যাচার আর কয়েকজন মারা গেলেও দেখা গেল বিশ হাজার চাঁদ দানকারী সদস্য জুটে গেল।
বিভিন্ন খনির স্বার্থ সংরক্ষণকারী চেম্বার অব মাইনসের সদস্যরা প্রথমে আঁতকে উঠেই এই ক্যানসারকে ঝেটিয়ে বিদায় করতে চাইলেও ভেবে দেখল মাটির গভীর থেকে হলুদ ধাতুটাকে তুলে আনতে হলে ঝুট-ঝামেলা কমানো দরকার। তাই শ্রমিক অসন্তোষ শুরু হলে তাদেরই স্বার্থ হানি হবে বুঝতে পেরে প্রথমেই খুব সাবধানে অনানুষ্ঠানিক এক আলোচনা সেরে নেয় আফ্রিকান মাইন ওয়ার্কাস ইউনিয়নের সেক্রেটারি জেনারেলের সাথে।
বুদ্ধিমান আর যুক্তিবাদী এই সেক্রেটারি জেনারেলের মধ্যে বলশেভিকের কোনো ছোঁয়া না দেখে যারপরনাই খুশি হয়ে ওঠে চেম্বার অব মাইনসের সদস্য বৃন্দ।
“এই লোকটার সাথে কাজ করা যাবে। কোনো সমস্যা নেই। তাছাড়া তার প্রভাবও খারাপ না। শ্রমিকদের মুখপাত্র হিসেবে যথেষ্ট ভদ্র। তাই মনে হয় না তাকে ম্যানেজ করা তেমন কষ্ট হবে। তাই প্রথম মিটিঙেই চেম্বার অব মাইনস ইউনিয়নের সন্তুষ্টি মোতাবেক কয়েকটা সমস্যা সমাধান আর ওয়ার্কাসদের লাভ হবে এমন কিছু পদক্ষেপও নিয়ে নিল।
এরপর থেকে শ্রমিকদের যেকোনো সমস্যাঁতেই মোজেস গামাকে পাঠিয়ে দিত চেম্বারে। ফলে দ্রুত তা নিকেশও হয়ে যেত। এতে শক্ত হল মোজেসের অবস্থান। তবে ইউনিয়নও কখনো কোনো সহিংস পদক্ষেপ নেয়নি।
“আমার ভাইয়েরা বুঝতে পেরেছো?” মামা জিংগার পানশালাতে অনুষ্ঠিত আফ্রিকান মাইন ওয়ার্কাস ইউনিয়নের সেন্ট্রাল কমিটির প্রথম মিটিঙে বলল মোজেস, “আমরা যখন দুর্বল তখন যদি ওরা আমাদের ওপর সর্বশক্তি দিয়ে ঝাঁপিয়ে পড়ে তাহলে আমরা চিরতরে ধ্বংস হয়ে যাব। এই স্মাট লোকটা একটা আস্ত শয়তান আর সেই হল সরকারের ধনুকের তীর। ১৯২২ সালে শ্বেতাঙ্গ ইউনিয়ন স্ট্রাইকারদের বিরুদ্ধে মেশিনগান হাতে সৈন্যদেরকে লেলিয়ে দিতেও দ্বিধা করেনি। তাহলে কৃষ্ণাঙ্গদের সাথে কী করবে ভাবো, ভাইয়েরা আমার, আমাদের রক্ত দিয়ে পৃথিবীতে পানি ছিটাবে। ধৈর্য হচ্ছে আমাদের লোকদের সবচেয়ে বড় শক্তি। সময় হচ্ছে আমাদের অস্ত্র, আর শ্বেতাঙ্গদের শত্রু। তাই আমার ভ্রাতৃবৃন্দ, ধৈর্য রাখো। একদিন এই শ্বেতাঙ্গরা ঠিকই বুঝতে পারবে যে আমরা তাদের হালের বলদ নই। আবিষ্কার করবে যে আমরা হচ্ছি। কালো কেশরঅলা সিংহ, সাদা মাংসের জন্য মরিয়া হয়ে আছি।
