“কোথায় এসেছি আমরা?” জানতে চাইলেন হেনড্রিক।
এমন এক শহরে যেটাকে কেউ পাত্তা দেয় না; যে শহরের মানুষের অস্তি ত্বই নেই।”
হেড লাইটের আলো পড়তেই সামনে পিছনে দেখা গেল অদ্ভুত সব দৃশ্য। একদল কৃষ্ণাঙ্গ ছেলে-মেয়ে মিলে রাস্তার কুকুরকে তাড়া করেছে। পথের ধারে পড়ে আছে মাতাল কিংবা মরা মানুষের দেহ, কারোগেটেড টিনের দেয়ালের একপাশে হামাগুড়ি দিয়ে জলবিয়োগ করছে কোনো এক নারী, আগুনের পাশে বসেই টিনের পাত্রে করে খাচ্ছে এক পরিবার; গাড়ির আলো দেখে বড় বড় চোখ করে তাকাল সবাই। বোঝা যাচ্ছে চারপাশে এরকম আরো হাজার হাজার আছে।
“এটা হল ড্রেকস ফার্স।” জানাল মোজেস। “শ্বেতাঙ্গদের গোল্ডির পাশেই গড়ে ওঠা শহরতলী।”
“কতজন আছে?”
“পাঁচ হাজার দশ হাজার কেউ জানে না, জানতে চায়ও না।” ফোর্ড থামিয়ে হেডলাইট আর ইঞ্জিনের সুইচ বন্ধ করে দিল মোজেস।
আশপাশে নীরবতা নেমে এলেও ঠিক যেন নিস্তব্ধ হল না। ভেসে আসছে অসংখ্য টুকরো টুকরো আওয়াজ। ছোট্ট শিশুর কান্না, নারীকণ্ঠের গান, পুরুষদের গালাগালি, নাকডাকা, জুয়া খেলাসহ আরো বহু শব্দ।
ফোর্ড থেকে বের হয়ে অন্ধকারেই হাঁক দিল মোজেস। সাথে সাথে বস্তিগুলো থেকে চলে এল ডজনখানেক বাচ্চা ছেলে-মেয়ের দল।
“আমার মোটরগাড়ি পাহারা দাও।” আদেশ দিয়েই ছোট্ট একটা কয়েন ছুঁড়ে দিল মোজেস। শূন্যে থাকতেই বাতাস থেকে লুফে নিল ছেলে-মেয়েদের দলের একজন।
“বাবা!” শিশুকণ্ঠের কিচির-মিচির শুনতে শুনতেই ভাইকে নিয়ে শ’খানেক গজ দূরের বস্তিতে চলে এল মোজেস। কাছে এগোতেই বেড়ে গেল নারী কণ্ঠের গানের শব্দ। অন্যান্য আরো বহু কণ্ঠের আওয়াজের পাশাপাশি নাকে এল পুরনো মদ আর খোলা চুলায় মাংস ভাজার ঘ্রাণ।
লম্বা একটা নিচু দালানের সামনে পৌঁছে গেল দুই ভাই। মোজেস দরজায় নক্ কতেই তার চেহারার উপর ঝলসে উঠল লণ্ঠনের আলো।
“তো ভাই” হেনড্রিকের হাত ধরে খোলা দরজার ভেতরে ঠেলে দিল মোজেস, “এটা হচ্ছে তোমার প্রথম সনদবিহীন পানশালা। যা যা প্রমিজ করেছি এখানে তুমি তার সবকিছু পাবে; নারী, এবং মদ।”
ঘরের ভেতরে মানুষের এত গাদাগাদি ভিড় যে তামাকের নীল ধোয়ার কুয়াশাতে হারিয়ে গেছে দূরের দেয়াল। ঘামে আর উত্তেজনায় চকচক করছে কালো মুখগুলো। খনির শ্রমিক লোকগুলোর কেউ কেউ এত মদ খেয়েছে যে মেঝের ওপর নিজের বমির মাঝেই শুয়ে পড়েছে। শ্বেতাঙ্গ নারীদের অনুকরণে মুখে রঙ মেখেছে বিভিন্ন গোত্র থেকে আসা কৃষ্ণাঙ্গ নারীর দল। নাচ গানের সাথে কোমর দুলিয়ে খুঁজে নিচ্ছে খদের।
কিন্তু আশ্চর্যের ব্যাপার হল মোজেসকে দেখেই যেন জাদুর মত কাজ হল। সবাই দু’পাশে সরে তাকে পথ করে দিল। ভাইয়ের পেছন পেছন এগোলেন হেনড্রিক। অবাক হয়ে গেলেন ভেবে যে মাত্র কয়েক মাসেই মোজেস কতটা সম্মান অর্জন করে নিয়েছে এদের কাছ থেকে।
পানশালার একেবারে কোনার দরজায় দাঁড়িয়ে আছে এক গার্ড। কুৎসিত চেহারার লোকটাও মোজেসকে চিনতে পেরে অভিবাদন জানাল। তারপর ক্যানভাসের পর্দা তুলে ওদেরকে ভেতরে যেতে দিল।
এ রুমটাতে তেমন ভিড় নেই। উপরন্তু কাস্টমারদের জন্য বেঞ্চ আর টেবিলও দেখা যাচ্ছে। এখানকার মেয়েগুলোও বেশ তী। কোনার দিকের পৃথক একটা টেবিলে বসে আছে বিশালাকার এক কৃষ্ণাঙ্গী। চর্বির ভাজে ঢাকা পড়ে আছে বড়সড় এই জুলু নারীর স্নিগ্ধ সৌন্দর্য। সামনের টেবিলের ওপর জড়ো হয়ে আছে তামা আর রুপার কয়েন, বিভিন্ন রঙা ব্যাংক নোটের ছোঁড়া আর প্রতি মিনিটে আরো অর্থ এনে জড়ো করছে তরুণী মেয়েদের দল।
মোজেসকে দেখেই নিখুঁত সাদা দাঁত দেখিয়ে পার্সেলিনের মত হেসে উঠল সর্দার রমণী। তারপর কোনোরকমে গড়িয়ে উঠে দাঁড়িয়ে হাতির মত উরু দুলিয়ে এগিয়ে এল মোজেসের কাছে। কপালে হাত ঠেকিয়ে এমনভাবে গামাকে অভিবাদন জানাল যেন সে কোনো গোত্রপতি।
“ইনি মামা জিংগা” হেনড্রিকের সাথে পরিচয় করিয়ে দিল মোজেস, “ড্রেকস ফার্মের সবচেয়ে বড় পানশালা আর পতিতালয়ের মালিক। কদিন বাদে হয়ে উঠবেন কেবল একমাত্র।”
আর ঠিক তখনই হেনড্রিক বুঝতে পারলেন যে, টেবিলের বেশিরভাগ পুরুষই তাঁর পূর্বপরিচিত। বাফেলো টিমের সদস্যরাও হেনড্রিককে দেখে সহাস্যে এগিয়ে এল কাছে। অপরিচিতদের কাছে তার পরিচয় দেয়ার সময় বলল,
“এই হল হেনরি তাবাকা। যে কিনা সেই শ্বেতাঙ্গ ওভারশিয়ারকে খতম করেছিল—
নতুনদের চোখেও স্পষ্ট শ্রদ্ধা দেখতে পেলেন হেনড্রিক।
“আমার ভাই গত তিন মাসে কোনো ভালো পানীয় কিংবা নারীর স্পর্শ পায়নি।” মাঝখানের টেবিলের মাথায় বসে জানাল মোজেস।
খিকখিক করে হেসে ফেলল মামা জিংগা, “আমার মেয়েরা ফোর্ডসবাগ থেকে শুরু করে বাপসফন্টেইন পর্যন্ত বিখ্যাত। এমনকি অনেক শ্বেতাঙ্গও তাদের খোঁজে এখানে আসে।”
“তাদের জন্য হয়ত ভাল” একমত হল মোজেস, “কিন্তু আমার ভাইয়ের জন্য নয়।”
কেপ ব্র্যান্ডির বোতল নিয়ে মেয়েদের একজনকে দু’ভাইয়ের কাছে পাঠিয়ে দিল মামা জিংগা।
অতঃপর ভোর হবার পরে ড্রেকস ফার্স থেকে টলতে টলতে বেরিয়ে এলেন হেনড্রিক আর মোজেস। ফোর্ডের কাছে আসতেই দেখা গেল তখনো গাড়িটাকে ঘিরে রেখেছে ছেলে-মেয়েদের দল। গত রাতেই মামা জিংগার পানশালার পেছনের রুমে বসে পরবর্তী করণীয় সম্পর্কে পরিকল্পনা সেরে নিয়েছে দুই ভাই। নিজ নিজ লেফটেন্যান্টকে ডেকে বুঝিয়ে দিয়েছে যার যার এরিয়া আর দায়িত্ব।
