হেনড্রিকের সামনে এক গ্যালনের একটা জগ রেখে বলল, “এই মাসে আমরা একসাথে পাথর ভেঙেছি তাই না শিয়াল?”
“আগামী মাসে তার চেয়েও বেশি হবে, কি বলিস বেবুন?”
হেনড্রিকের কথা শেষ হতেই দু’জনে অট্টহাসিতে ফেটে পড়ল।
ষাড়ের দলের ভ্রাতৃসংঘের প্রথম জুলু সদস্য হল জামা। এরকম গোত্রগত বাধা টপকানো সচরাচর সবার জন্যে সহজ ছিল না।
***
পুরো তিন মাস কেটে যাবার পর আবার ভাইয়ের দেখা পেলেন হেনড্রিক। তবে ততদিনে সি আর সি খনির কৃষ্ণাঙ্গ শ্রমিকদের ওপর নিজের প্রভাব প্রতিষ্ঠা করে ফেলেছেন। জামা হল তার লেফটেন্যান্ট। জুলু, ম্যাটাবেল প্রভৃতি গোত্রের লোকেরাও এখন ষাড়ের সদস্য। বাফেলো টিমে যোগ দেয়ার জন্য একমাত্র শর্ত হল বিশ্বস্ততা আর ক্লার্ক, বস বয় কিংবা কোম্পানি পুলিশ হলেও চলবে।
আর যারা বাধা দিল কিংবা প্রত্যাখ্যান করল তাদের ফলাফল হল ভয়াবহ। যেমন এরকম একজন জুলু বস বয় মেইল হলেজের মোল তলা থেকে পড়ে মারা গেল। পাথরের নিচে পড়ে কাদা হয়ে গেল থেতলানো শরীর।
কোম্পানি পুলিশের একজন প্রত্যাখ্যান করাতে নিজের সেন্ট্রি বক্সেই ছুরির ঘা খেয়ে মারা গেল। আরেকজন রান্নাঘরের উনুনে জীবন্ত পুড়ে গেছে।
তাই অবশেষে যখন মোজেসের দূত বার্তা নিয়ে এল তখন বিনা বাধাতেই মিটিংয়ের জন্যে বাইরে চলে এলেন হেনড্রিক।
যদিও সরকারের কঠোর নিয়ম হল কৃষ্ণাঙ্গ শ্রমিকেরা কাঁটাতারের ঘেরা খনির ভেতরেই থাকবে। চেম্বার অব মাইনস আর জোহানেসবার্গ শহর পিতাদের ধারণা শত শত হাজার হাজার কৃষ্ণাঙ্গ পুরুষদেরকে স্বর্ণের খনিতে যত্রতত্র ঘুরে বেড়াবার অধিকার দেয়ার মানে হবে খাল কেটে কুমির ডেকে আনা। এর পূর্বে ১৯০৪ সালে চাইনিজ কুলীদেরকে এনে এরকম ধাক্কা খেয়েছিল প্রশাসন। স্বর্ণখনি জুড়ে আইন অমান্য করা, জুয়া খেলা আর নারী সংসর্গ নিয়ে ঝামেলা এত বেড়ে গিয়েছিল যে ১৯০৮ সালে বিপুল পরিমাণ টাকা গচ্চা দিয়েও চাইনিজদেরকে জাহাজে করে স্বদেশে পাঠিয়ে দেয়া হয়েছিল, তারপর থেকে শ্রমিকদের কম্পাউন্ডে থাকার ওপর কড়াকড়ি নিয়ম আরোপ করেছে সরকার।
তবে সি আরসির গেইট দিয়ে হেনড্রিক এমনভাবে বেরিয়ে গেলেন যেন তিনি অদৃশ্য। তারার আলোয় খালি মাঠ পেরিয়ে আগাছা ভরা রাস্তা ধরে হেঁটে চলে এলেন এক পরিত্যক্ত শ্যাফটের মাথায়। মরচে পড়া করোগেটেড শেডের পিছনে পার্ক করে আছে একটি কালো ফোর্ড সেজান। হেনড্রিক এগোতেই জ্বলে উঠল হেডলাইট। গায়ের ওপর তীব্র আলো পড়তেই যেন জমে গেলেন হেনড্রিক।
তারপরেই অবশ্য বাতি নিভে গেল। শোনা গেল মোজেসের কণ্ঠস্বর, “দেখতে পেয়েছি ভাই।”
পরস্পরকে দেখে দৌড়ে গিয়ে জড়িয়ে ধরলেন দু’জনেই। খানিক বাদে হেনড্রিক হেসে জানালেন, “হাহ।” তুমি তাহলে এখন শ্বেতাঙ্গদের মতই গাড়ি চালাও।”
“এই মোটর কার বোরর সম্পত্তি।” হেনড্রিককে গাড়ির কাছে নিয়ে যেতেই ভেতরে ঢুকে চামড়ার মোড়া আসনে আরাম করে শ্বাস ফেললেন। “হাঁটার চেয়ে তো ভালো।”– “এখন আমাকে বলল ভাই সিআরসিতে কী ঘটছে?” হেনড্রিক নিজের লম্বা একখানা রিপোর্ট শেষ না করা পর্যন্ত মনোযোগ দিয়ে শুনলেন মোজেস। তারপর মাথা নেড়ে বলল,
“তুমি আমার মনোবাসনা বুঝতে পেরেছে। আমি ঠিক এটাই। চেয়েছিলাম। ভ্রাতৃসংঘে সমস্ত গোত্র থেকেই তোক নিতে হবে। স্বর্ণখনির প্রতিটি ক্ষেত্রে, প্রতিটি গোত্রে আমাদেরকে পৌঁছাতে হবে।”
“এসব তুমি আগেও বলেছো” ঘেত ঘেত করে উঠলেন হেনড্রিক।
“কেন সেটা কিন্তু কখনোই বলোনি ভাই। আমি তোমার ওপর ভরসা রাখি কিন্তু আমি যাদেরকে জড়ো করেছি সবার কেবল একটাই জিজ্ঞাসা, কেন? এই কাজে আমাদের লাভ কী? ভ্রাতৃসংঘ থেকে আমরা কী পাবো?”
“আর তুমি কী উত্তর দিয়েছে ভাই?”
“আমি শুধু বলেছি যে ধৈর্য ধরতে হবে। উত্তরটা না জানলেও এমন ভাব করেছি যেন আমি জানি। আর ওরা যদি বাচ্চাদের মত বেশি ঘ্যানঘ্যান করে আমিও দেই প্যাদানি।” একথা শুনে হেসে ফেলল মোজেস। কিন্তু হেনড্রিক মাথা নেড়ে জানালেন, “হেসো না ভাই, ওদেরকে এভাবে মেরে বেশিদিন চুপ করিয়ে রাখতে পারব না।”
ভাইয়ের কাঁধে হাত রাখল মোজেস, “তোমাকেও আর বেশিদিন অপেক্ষা করতে হবে না। কিন্তু এখন বলো সিআরসিতে এত মাস ধরে কাজ করার পর তুমি কোন জিনিসটা সবচেয়ে বেশি মিস করেছো?”
উত্তরে হেনড্রিক জানালেন, “নারী সঙ্গ।”
“ঠিক আছে রাত শেষ হবার আগেই পেয়ে যাবে। আর কিছু?”
“ভালো মদের জন্য পেটের ভেতরটা যেন চুলকাচ্ছে।”
“ভাই”, সিরিয়াস ভঙ্গিতে মোজেস জানাল, “তোমার প্রশ্নের উত্তর তুমি নিজেই দিয়ে দিয়েছে। ভ্রাতৃসংঘ থেকে তোমার লোকেরা এইসব কিছুই পাবে। শিকারি কুকুরদের মুখে টোপ হিসেবে দেয়া হবে অর্থসহ সবকিছু। তবে বাফেলো টিমের হর্তাকর্তারা আরো অনেক অনেক কিছু পাবে।” ফোর্ডের ইঞ্জিন চালু করল মোজেস।
গাড়ি নিয়ে দক্ষিণে শ্বেতাঙ্গদের পাড়ায় চলে আসতেই পরের রাস্তাগুলো হয়ে পড়ল সরু আর ভাঙাচোরা। যেখানে-সেখানে খানা-খন্দ। তারপরই আবার শহরের আলো পেছনে ফেলে ফোর্ড চলে এল তেরপলে ঢাকা বস্তির ধারে। খড়ির চুলার আগুনে চারপাশে জমেছে কমলা ধোয়া। গায়ে গায়ে লাগানো কারাগেটেড টিনের লেন দেখে মনে হচ্ছে বুঝি সেনাবাহিনির মত বড়সড় দল।
