“তুমি হ্যামার চেনো? যানাকালোতে জানতে চাইলেন ক্রোজি।
“জানি।” আফ্রিকান ভাষায় উত্তর দিলেন হেনড্রিক। দুই সপ্তাহ হ্যাঁমারের উপর প্র্যাকটিস করে এসেছেন।
চোখ পিটপিট করে তাকাল ক্রোঞ্জি। নিজের ভাষা শুনে খুশিই হয়েছে। বেরিয়ে গেছে মুখের সবকটা দাঁত। “আমি সি আর সি’র পাথর ভাঙাদের মাঝে সবচেয়ে শ্রেষ্ঠ গ্যাংটাকে চালাই” হাসতে হাসতেই বলল, “তাই তোমাকে পাথর ভাঙা শিখতেই হবে দোস্ত, নয়ত আমি তোমার মাথা ভেঙে দিব। বুঝলে?”
“বুঝতে পেরেছি।” পাল্টা হাসলেন হেনড্রিক। ক্রোঞ্জি গলা তুলে বাকিদেরকে বললেন, “হ্যামার বয়েজ সবাই এখানে আসো৷”
বেঞ্চ থেকে উঠে দাঁড়াল হেনডিকের মতই বড়সড় পাঁচজন লোক। জ্যাক হ্যামার চালানো চাট্টিখানি কথা নয়। এ কাজে প্রচণ্ড শারীরিক শক্তি দরকার হয়। তাই অন্যান্য পাথর ভাঙার দলগুলোর চেয়ে এরা ডাবল বেতন আর বোনাস পায় সাথে সম্মানও।
ইলেকট্রিক বাল্বের নিচে ব্ল্যাকবোর্ডে সবার নাম লিখে দিল ক্রোঞ্জি। সবার নিচে হেনরি তাবাকা আর একেবারে প্রথমেই বড়সড় জুলু জামা। নিজের জ্যাকেট খুলে লাইন বয়ের হাতে ছুঁড়ে মারল জামা; কালো কালো পেশি কিলবিল করে উঠল সারা শরীরে।
“হা!” হেনড্রিকের দিকে তাকিয়ে জামা তাচ্ছিল্যের স্বরে বলল, “তত মরুভূমি থেকে এক ছোট্ট ওভাম্বো শিয়াল এসেছে নাকি!” সবাই হেসে উঠল জামার কথা শুনে।
“আমি তো ভেবেছি জুলু বেবুনেরা কেবল ভ্রাকেনস বার্গের ওপর উঠে গা চুলকায় যেন তাদের গলা বহুদূর পর্যন্ত শোনা যায়।” হেনড্রিকের কথা শুনে স্তব্ধ হয়ে গেল লোকগুলো। তারপরেই অবশ্য খিকখিক করে হেসেও ফেলল।
“অল রাইট, তোমাদের মুখ বন্ধ করো।” বলে উঠল ক্রোঞ্জি, “চলো কয়েকটা পাথর ভাঙা যাক। নিজের দলকে নিয়ে চলে এল পাথরের দেয়ালের কাছে। এর আড়ালেই আছে সোনা।”
জায়গাটার ছাদ বেশ নিচু। একজন মানুষকে উবু হয়ে এগোতে হলেও পাশাপাশি বেশ চওড়া। দু’পাশেই শোনা যাচ্ছে অন্য দলের আওয়াজ। পাথরে বাড়ি খেয়ে প্রতিধ্বনি তুলছে তাদের কণ্ঠস্বর। অন্ধকারে লণ্ঠনের আলো তৈরি করেছে বিচিত্র সব নকশা। “তাবাকা!” ডাক দিল ক্রোঞ্জি, “এদিকে এসো!” সাদা রঙের ছিটে দিয়ে কোথায় কোথায় গর্ত করতে হবে তা চিহ্ন দিয়ে রেখেছে।
জেলিগনাইট চার্জের মাধ্যমে খুব হিসাব করে বিস্ফোরণ ঘটানো হল। কাটারের দল এসে পরিষ্কার করে দিল জায়গাটা। তুলে নিয়ে গেল আকরিক পাথর।
“শায়া!” ক্রোঞ্জির আদেশ পেয়ে ড্রিলের ওপর ঝুঁকে দাঁড়ালেন হেনড্রিক। মেশিনগানের মত দেখতে যন্ত্রটা পাথরের মেঝের ওপর পড়ে আছে। লম্বা হোস পাইপের মাধ্যমে মেইন হল থেকে আসছে বাতাস।
দ্রুতহাতে হেনড্রিক আর তার লাইন বয়রা মিলে যন্ত্রটাকে সাদা রঙের চিহ্নে কাছে এনে দাঁড় করিয়ে দিলেন। তারপর ড্রিলের পেছনে দাঁড়িয়ে ডান কাঁধে তুলে নিলেন যন্ত্রটা। লাইন বয়ের দল সরে যেতেই ভাল্ব খুলে দিলেন হেনড্রিক।
ফলাফলে সৃষ্টি হল, প্রচণ্ড শব্দ। মনে হচ্ছে যেন কানের পর্দা ফেটে যাবে। ড্রিলের মাত্র ইঞ্চিখানেক জায়গায় আবদ্ধ বাতাস ৫০০ পাউন্ড ওজন নিয়ে তীব্রগতিতে হুশ করে বেরিয়ে যেতেই পাথরের গায়ে গিয়ে বিঁধে গেল বিশ ফুট লম্বা স্টিলের মাথা।
কাঁধে প্রচণ্ড ঝাঁকুনি খেয়ে কেঁপে উঠলেও শক্ত হয়ে নিজের জায়গায় দাঁড়িয়ে রইলেন হেনড্রিক। কিন্তু চোখের সামনে যেন অন্ধকার দেখছেন। তারপরেও দেরি না করে শিফট বসের কথা মত তাক করলেন ড্রিলের মাথা। একটু আগে তৈরি করা গর্ত থেকে হলুদ কুয়াশা এসে ছড়িয়ে পড়ল হেনড্রিকের চোখেমুখে। কালো চামড়া বেয়ে গড়িয়ে পড়ল ঘাম। উদোম পিঠ দিয়ে যেন মাটি ঝরছে। কাঁধে এত ভারি ড্রিলের কারণে মিনিটখানেকের মধ্যেই ব্যথা হয়ে গেল সারা শরীর। ড্রিলের তীব্র ঝাঁকুনিতে এক মিনিটে হাজারবার কেঁপে উঠছে দেহতুক। ফলে বেড়ে যাচ্ছে ব্যথা। চারপাশে শব্দের কোনো কমতি নেই। তারপরেও মনে হচ্ছে তিনি কালা হয়ে গেছেন। যদিও ঠিকই টের পেলেন উপরের দিক থেকে ভেসে আসা ড্রিলের গর্জন।
দৌড়ে এল লাইন বয়। হাতলঅলা যন্ত্রটাকে প্রথম গর্ত থেকে বের করে হেনড্রিককে সাহায্য করল দ্বিতীয় দাগের কাছে নিয়ে যেতে। আবার ভাল খুলে দিলেন হেনড্রিক। সাথে সাথে শুরু হল প্রচণ্ড শব্দ আর তীব্র ঝাঁকুনি। যাই হোক আস্তে আস্তে যেন অসাড় হয়ে গেল শরীর। যেন কোকেন ভরে দেয়া হয়েছে চামড়ায়; তাই আর কিছু তেমন টের পেলেন না।
এমনিভাবেই পুরো ছয় ঘণ্টার শিফট পার হয়ে গেল। শেষ হওয়ার পর পা থেকে মাথা পর্যন্ত হলুদ কাদায় মাখামাখি হয়ে উঠে এল সবাই। এমনকি বিশালাকার জুলু জামা পর্যন্ত ঘোলাটে চোখে টলতে টলতে উঠে এল।
স্টেশনে বসে ব্ল্যাকবোর্ডে সবার নামের পাশে কাজের পরিমাণ লিখে রাখল ক্রোঞ্জি। জামা ষোলটি ড্রিল করেছে। হেনড্রি বারো; অপরজন দশ।
“হাহ!” ভূগর্ভ থেকে উপরে উঠে আসার সময় বিড়বিড় করে উঠল জামা।” প্রথম শিফটেই শিয়ালটা দুই নম্বরে উঠে এসেছে।” অবশিষ্ট শক্তি দিয়ে হেনড্রিক কোনোমতে উত্তর দিলেন, “দ্বিতীয় শিফটেই শিয়ালটা সবার উপরে উঠে যাবে।”
কিন্তু সেটা কখনোই ঘটেনি। জুলুর চেয়ে তিনি কখনোই একটা পাথরও বেশি ভাঙতে পারেননি। কিন্তু প্রথম মাসের শেষে হেনড্রিক যখন কোম্পানির বিয়ার হলে তার স্বাড়ের দল নিয়ে বসেছেন দুইটা এক গ্যালনের জগভর্তি পরিজের মত থকথকে আর পুষ্টিকর বিয়ার নিয়ে, কাছে এগিয়ে এল জামা।
