“ভাই, তুমি সাদা পাথরগুলো হারিয়ে ফেলেছ। এতক্ষণে পাখি আর ছোট ছোট জন্তু-জানোয়ার পাউরুটির টুকরোগুলোকেও খেয়ে ফেলেছে। ওগুলো চিরতরে হারিয়ে গেছে ভাই।”
“হ্যাঁ, ওগুলো হারিয়ে গেছে।” বিষণ্ণ হয়ে পড়লেন হেনড্রিক। “অনেক অনেক যুদ্ধ, রক্ত আর পরিশ্রমের পরেও বাতাসে বীজের মতই ছড়িয়ে গেছে পাথরগুলো।”
“সেগুলো আসলে অভিশপ্ত ছিল।” ভাইকে সান্তনা দিতে চাইল মোজেস, “দেখার পর থেকেই আমি বুঝতে পেরেছি যে পাথরগুলো কেবল মৃত্যু আর বিপর্যয় বয়ে আনবে, সেগুলো আসলে শ্বেতাঙ্গদের খেলনা। খরচ করা কিংবা বিক্রি যেটাই করতে যাবে ঠিক ঠিক শ্বেতাঙ্গ পুলিশের কাছে ধরা পড়ে যাবে। আর তারপরে ফাঁসির দড়ি কিংবা কারাগার জুটত তোমার কপালে।
চুপচাপ বসে কথাগুলো যে কতটা সত্য তাই ভাবছেন হেনড্রিক। কীইবা করতেন পাথরগুলো দিয়ে? কৃষ্ণাঙ্গরা তো নিজেদের জন্য জমিও কিনতে পারে না। তাছাড়া কোনো কৃষ্ণাঙ্গই মোটরগাড়িতে চড়তে পারে না।
“না, ভাই।” নরম স্বরে জানাল মোজেস, “ওগুলো তোমার জন্যে নয়। বরঞ্চ তোমার পিতৃপুরুষদের কথা ভাবো যারা তোমার মাঝে স্পৃহা ছাড়িয়ে দিয়ে মিশে গেছেন মাটিতে।”
আস্তে করে ঘোতঘোত করে উঠলেন হেনড্রিক, “তারপরেও এরকম সম্পদ গোপনে হাতে নিলেও তো কত ভালো লাগত। আমারই থাকত।”
“হিরে কিংবা শ্বেতাঙ্গদের সোনা ছাড়াও আরো গুরুত্বপূর্ণ অনেক সম্পদ আছে ভাই।”
“কোন সম্পদ?” জানতে চাইলেন হেনড্রিক।
“আমাকে অনুসরণ করো। আমি তোমাকে পথ দেখিয়ে নিয়ে যাব।”
“কিন্তু কী সেটা তো বলো।” জোর করলেন হেনড্রিক।
“সময়মত ঠিকই বুঝতে পারবে ভাই।” হেসে ফেলল মোজেস। “সম্পদ আপনাতেই আসবে। এখন আমার কথা শোনো, বোম্বু, আমার ছোট্ট ডাক্তার নারী হিসেবে আদর পেতেই বেশি পছন্দ করে। সে তোমাকে সেন্ট্রাল ব্যান্ড কনসলিডেন্টেড নামে গোল্ডিতে পাঠাবে। গভীর সব শ্যাফট আছে সেখানে। আন্ডারগ্রাউন্ডে কাজ করবে তাই নাম কামাবার চেষ্টা করো। আমি ডাক্তারের উপর প্রভাব খাটিয়ে আমাদের সেরা দশজনকে তোমার সাথে পাঠিয়ে দিব। এই সঁড়ের দল হবে তোমার যোদ্ধা। এদেরকে দিয়ে শুরু করলেও খুব তাড়াতাড়ি তোমার চারপাশে দ্রুত, শক্তিশালী আর নির্ভীকদেরকে জড়ো করে নিও।”
“ওদেরকে নিয়ে আমি কী করব?”
“তৈরি করে রাখবে। আমি শীঘ্রই ডেকে পাঠাব। খুব শীঘ্রি।”
“অন্য বঁড়দের কী হবে?”
“বোম্বু ওদেরকে আমার পরামর্শমত দশজনের দল হিসেবে অন্যান্য গোল্ডিতে পাঠিয়ে দিবে। সর্বত্রই আমাদের ছোট ছোট দল থাকবে। আস্তে আস্তে সংখ্যায় বেড়ে তারা এত বিশাল এক কালো ষাড়ের পাল হয়ে উঠবে যে সবচেয়ে ভয়ংকর সিংহও চ্যালেঞ্জ করতে ভয় পাবে।”
***
৬. আন্ডারগ্রাউন্ডে নামার পর
আন্ডারগ্রাউন্ডে নামার পর জীবনে প্রথমবারের মত প্রচণ্ড ভয় পেলেন হেনড্রিক। মনে হল কথা বলা কিংবা চিন্তার শক্তিও হারিয়ে ফেলেছেন। এমনকি চিৎকার করারও বল পাচ্ছেন না।
মাথায় বাতি লাগানো রুপালি হেলমেট আর রাবারের গামবুট, ওভারঅল পরে কৃষ্ণাঙ্গ খনি শ্রমিকদের সাথে এক লাইনে দাঁড়াবার পর থেকে এ ভয়ের সূচনা।
শ্যাফটে নামার আগে স্টিলের জালের ফোকর দিয়ে দেখা গেল পাইথনের মত কেবল, আর মাথার উপরে হেজগিয়ার। চোখ তুলে তাকাতেই মনে হল, আকাশের গায়ে ঝুলে আছে চাকা। একশ’ ফুট উপরে অনবরত ঘুরছে।
ফোকরের গেইট খুলে যেতেই হঠাৎ করে পেছনের খাঁচায় হুড়মুড় করে পড়ে গেল কৃষ্ণাঙ্গের দল, সাথে হেনড্রিক। স্যুর জন মানুষ কাঁধে কাঁধ ঠেকিয়ে দাঁড়িয়ে রইল একত্রে। দরজা বন্ধ হতেই ধপ করে নেমে গেল মেঝে। মাথার উপরকার কম্পার্টমেন্টে উঠে এল আরো সত্তর জন।
তারপর তীব্রবেগে নামতে শুরু করল খাঁচা। আতঙ্কের চোটে যেন মরে যাবার দশা। পেট গিয়ে বুঝি পাজরে আটকে গেল। অন্ধকারের মধ্যে টানেল ধরে ছুটছে এক্সপ্রেসের ট্রেনের মত খাঁচা। মাথার উপরে এত বিশাল ওজনের পাথর আছে ভাবতেই তীব্র ভয়ে মনে হল দম বন্ধ হয়ে যাবে। কানের উপরেও চাপ বাড়ছে। প্রথমে এক মাইল তারপর আরো এক মাইল নেমে গেল খাঁচা।
আচমকা থেমে যেতেই মনে হল বুঝি হাঁটু ভেঙে পড়ে যাবেন। রাবারের মত বোধ হয় হাড় থেকে মাংস খসে পড়ে যাবে। গেইট খুলতেই মেইন হলেজে নেমে এলেন হেনড্রিক। চকচকে ভেজা পাথরে মোড়া গুহার দেয়াল। সুয়ারেজ লাইনের ইঁদুরের মতন চারপাশে ছোটাছুটি করছে শত শত মানুষ।
আর আছে পানি। পায়ের নিচে ছাদ থেকে সর্বত্র পানি আর পানি ঝরে পড়ছে। গরম, আর্দ্রতা আর বদ্ধ জায়গায় দমবন্ধ হবার বোধ হওয়ায় আবহাওয়াও ভারি হয়ে আছে। মনে হচ্ছে কানের পর্দা না জানি ফেটে যায়। অতঃপর স্টোপ নামক বিশাল খোলা চেম্বারে না পৌঁছানো পর্যন্ত গেল না এই আতঙ্ক।
এখান থেকে স্বর্ণবাহী আকরিক এরই মাঝে বাইরে বেরিয়ে গেছে। গ্যাংয়ের লোকেরা হেনড্রিককে তার স্টেশনে দিয়ে গেল। এখানে বিদ্যুতের বারে নিচে অপেক্ষায় রইলেন কখন আসবে শ্বেতাঙ্গ শিফট বস্। স্টেশন হল তিন পাশেই পাথরঅলা একটা চেম্বার। প্রবেশমুখে নাম্বার। পেছনের দেয়ালের সাথে লম্বা একটা বেঞ্চ আর ল্যাট্রিন।
পুরো দল বেঞ্চে বসতেই রোল কল করল বস বয়দের দল। শ্বেতাঙ্গ শিফট বস নিউ হ্যামার বয় কোথায় জানতে চাইলে উঠে দাঁড়ালেন হেনড্রিক। তার সামনে চলে এল ক্রোঞ্জি, শিফট বস্। নাক ভাঙা লোকটা মনোযোগ দিয়ে খানিকক্ষণ হেনড্রিককে দেখল। মাথার ক্ষতচিহ্ন আর ভাঙা দাঁত দেখে বুঝতে পারল তারা দুজনেই পোড় খাওয়া শক্তপোক্ত মানুষ। উপরের সূর্যের আলোতে শ্বেতাঙ্গ-কৃষ্ণাঙ্গ বিভেদ থাকলেও মাটির এই অভ্যন্তরে সবাই কেবল মানুষ।
