গত পাঁচ বছরে চেম্বার অব মাইনসের সাথে কাজের পাশাপাশি ব্যক্তিগত সন্তুষ্টিও কম নয়। পার্টির সাথে তার সম্পর্ক খুব সাবধানে গোপন করা হলেও যতই দিন যাচ্ছে মার্কাসজমের প্রতি ততই প্রবল হচ্ছে ডাক্তারের আস্থা আর এক্ষেত্রে কাজগুলো এখন অনেক গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে। দক্ষিণ আফ্রিকার শ্রেণি ও গোত্রভিত্তিক বিভেদ, দরিদ্র কৃষ্ণাঙ্গ শ্রমিক সমাজের সাথে শ্বেতাঙ্গ বুর্জোয়াদের সম্পদের আকাশ-পাতাল ফারাক দেখে এই দেশকে আরো ভালেবেসে সাহায্য করার জন্য মরিয়া হয়ে উঠেছেন ডাক্তার।
আর এখন তো মিশরীয় দেবতার মত তরুণ মোজেসকে দেখে রীতিমত অস্থির হয়ে উঠেছেন আর্চার।
“তুমি ইংরেজি বলতে পারো তাই না?” জিজ্ঞেস করতেই মাথা নাড়ল মোজেস।
নিজের আবেগ লুকিয়ে রাখা কঠিন হয়ে পড়াতে মঞ্চের দিকে ফিরে গেলেন ডাক্তার। চক হাতে ব্ল্যাকবোর্ডে লিখতে গিয়ে কেঁপে উঠল আঙুল।
বিভিন্ন ধরনের পরীক্ষার মধ্যে দিয়ে কেটে গেল পুরো বিকাল। সবাইকে বিভিন্ন লেবেলে ভাগ করার পর মেইন স্ট্রিমে রইল কেবল একজন। মোজেস গামা। প্রথমটার মতই একের পর এক কঠিন সব পরীক্ষা উতরে গেল এই তরুণ। ডাক্তার আর্চার নিশ্চিত হয়ে গেলেন যে, তিনি এক দুর্লভ প্রতিভা আবিষ্কার করেছেন।
পাঁচটার মধ্যে সবাই বিদায় নিলেও রেজিস্ট্রার চেক করে মোজেসকে কাছে ডাকলেন ডাক্তার। “গামা! তোমাকে দিয়ে আমি আরেকটা কাজ করাতে চাই।”
বারান্দার শেষ মাথায় নিজের অফিসে মোজেসকে নিয়ে চলে এলেন মার্কাস।
“তুমি লেখাপড়া জানো গামা?”
“ইয়েস ডাক্তার।”
“এটা আসলে আমার থিওরি যে একজন লোকের হাতের লেখা দেখে তার ব্যক্তিত্ব সম্পর্কে ধারণা পাওয়া যায়। তাই আমি চাই তুমি আমার জন্যে কিছু লিখো।”
ডেস্কে পাশাপাশি বসে মোজেসের দিকে বিভিন্ন বইপত্র এগিয়ে দিলেন ডাক্তার। সহজভাবে গল্প করতে করতে জানালেন, “এই লেখাগুলোই আমি ব্যবহার করি।”
নার্সারি ছড়া লেখা কার্ড এগিয়ে দিলেন ডা, মার্কাস। তারপর ঝুঁকে এলেন মোজেসের কাছে। বড় বড় অক্ষরে স্বাচ্ছন্দ্যে সার্বিক শব্দগুলো লিখে ফেলল। মোজেস। বোঝা গেল মানসিক শক্তির দিক থেকে এই তরুণ কতটা বলীয়ান।
হাতের লেখা দেখার ছলে আস্তে করে মোজেসের উরুতে হাত রাখলেন ডাক্তার। খানিকটা চমকে উঠল মোজেস। সাবধানে কলমটা নামিয়ে প্রথমবারের মত সোজাসুজি তাকাল ডাক্তারের সবুজ চোখ জোড়ার দিকে।
“গামা” কাঁপা কাঁপা কণ্ঠে ডাক্তার জানালেন, “তুমি এত বুদ্ধিমান যে কোদাল দিয়ে মাটি তুলে তার অপচয় করা উচিত নয়।” আস্তে আস্তে হাত বাড়িয়ে মোজেসের পা স্পর্শ করলেন মার্কাস।
একদৃষ্টিতে তাকিয়ে রইল মোজেস। অভিব্যক্তির পরিবর্তন না হলেও আস্তে করে ফাঁক করে দিল দুটো পা। দেখে তো ঠকঠক করে উঠল ডাক্তারের বুক।
“আমি তোমাকে আমার পার্সোনাল অ্যাসিস্ট্যান্ট করে নিব, গামা।” ফিসফিস করে মার্কাস জানাতেই এই প্রস্তাবের গুরুত্ব ভেবে দেখল মোজেস। কৃষ্ণাঙ্গদের প্রবেশাধিকার নেই এমন সব অঞ্চলেও এখন আর কেউ ওকে ঠেকাতে পারবে না। গোল্ড মাইনিং শিল্পের সব শ্রমিকদের ফাইল চাইলেই পাওয়া যাবে। চোখের পলকে হাতে এসে যাবে সব সুযোগ। আর এই যে ডাক্তারের চাহিদা তা নিয়েও ওর কোন মাথাব্যথা নেই। যদি এই শ্বেতাঙ্গ তার কাছে নারী হিসেবেই আসতে চায়, তাতেও আর কোনো সমস্যা নেই।
“ইয়েস ডাক্তার, আমি আপনার সাথে কাজ করব।” উত্তরে জানিয়ে দিল মোজেস।
***
ব্যারাক রুমে শেষরাতে সকল লেফটেন্যান্টকে নিজের কাছে ডেকে নিল মোজেস। বলল, “শীঘই তোমরা এখান থেকে গোল্ডিতে চলে যাবে। তবে হয়ত সবাই একসাথে থাকার সুযোগ নাও পেতে পারো। কেউ হয়ত ভূ-গর্ভে কাজ পাবে, কেউ উপরের প্ল্যান্টে। কিন্তু ভুলবে না যে আমরা সবাই ভ্রাতা। তোমাদের নিয়ে আমার অনেক জরুরি কাজ আছে। তাই আমিই তোমাদের খুঁজে বের করব। সেভাবেই প্রস্তুত থাকবে যেন ডাক দিলেই আমার কাছে চলে আসতে পারো। ঠিক আছে?”
“এহ হে!” সমস্বরে সকলে জানাল নিজেদের ইচ্ছে “আমরা তোমার ছোট ভাই। তাই যা বলবে শুনব।”
“সবসময় মনে রাখবে যে আমিই তোমাদের বড় ভাই। আমি তোমাদের কারো কোনো ক্ষতি হতে দিব না। তোমাদের বিরুদ্ধে সকল কর্মের প্রতিশোধ নেয়া হবে। ইতিমধ্যেই দেখেছে যারা আমাদের ভ্রাতৃসংঘের সাথে লড়তে আসবে তাদের কী হবে।”
“আমরা দেখেছি” সকলেই বিড়বিড় করে উঠল, “আর তা হল মৃত্যু।”
“হ্যাঁ, মৃত্যু।” সবাইকে নিশ্চয়তা দিল মোজেস। “বিশ্বাসঘাতকতা করলেই মৃত্যু।”
“সকল বিশ্বাসঘাতকদের মৃত্যু।” সবাই মিলে আরো একবার একত্রে চিৎকার করে উঠল। মোজেস গামার মোহনীয় জাদুশক্তি সবাইকে কজা করে ফেলেছে।
“আমি আমাদের ভ্রাতৃসংঘের জন্য একটি প্রতীক খুঁজে পেয়েছি। মোজেস জানাল, আর তা হল ষাড়, কালো আর শক্তিশালী। সবাই এটাকে ভয় পায়। আমরাই হলাম সেই ষাঁড়ের দল।”
“আমরা হলাম ষাঁড়ের দল” অত্যন্ত গর্বিত বোধ করল উপস্থিত কৃষ্ণাঙ্গরা, “সবাই এখন আমাদেরকে ভয় পাওয়া শিখবে।”
“গোপন এসব চিহ্নের মাধ্যমে আমরা আমাদের লোকদের চিনে নিব।”
ডান হাত দিয়ে চিহ্নটা দেখিয়ে দিল মোজেস, “এভাবেই তোমার সামনে এলে তুমি তোমার ভ্রাতাকে ঠিকই চিনে নিতে পারবে।
অন্ধকার ব্যারাকে পরস্পরের সাথে হাত মিলিয়ে সবাই একে অন্যকে অভিবাদন জানাল। সূচনা হল এক নতুন ভাতসংঘ “আমি শীঘ্রই তোমাদেরকে ডাক দিব। কিন্তু তার আগে পর্যন্ত শ্বেতাঙ্গরা যা বলে তোমাদেরকে তাই করতে হবে। কঠোর পরিশ্রম করে শিখতে হবে। সময় আসলে যেন তা কাজে লাগাতে পারো সেভাবেই তৈরি থাকতে হবে। তারপর সবাইকে যার যার বাঙ্কে পাঠিয়ে দিয়ে একসাথে বসল হেনড্রিক আর মোজেস। ফিসফিস করে বলল,
