“মেয়েরা কোথায়?” হঠাৎ হেনড্রিকের প্রশ্নটা শুনেই হেসে ফেলল মোজেস।
“কোন মেয়ে ভাই?”
“কেন? আমাদের গোত্রের কৃষ্ণাঙ্গ মেয়েরা?”
“তুমি যে ধরনের মেয়েদের চেন এখানে সেরকম কেউ নেই। এখানে সবাই শুধু স্বর্ণ খোঁজে।”
আরো একবার সবাইকে খেদিয়ে নিয়ে ঢোকানো হল বেড়ার ওপাশের সাদা ব্যারাক বিল্ডিংয়ে। সারি সারি দালানের সাইনবোর্ডের মাথার উপরে লেখা :
উইটওয়াটারস্রান্ড নেটিভ লেবার অ্যাসোসিয়েশন।
কয়েকজন বস বয়ের দল এসে সবাইকে কাপড় খুলে ফেলার নির্দেশ দিল। মুখে সারাক্ষণ হাসি ধরে রেখে জানাল, “তোমরা তো সাথে করে চুল দাড়ির মধ্যে জন্তু-জানোয়ারও নিয়ে এসেছে। কিন্তু বুঝলে ভায়া, এখানে তো তোমাদের উকুনের কোনো ঠাই নেই।” তারপর সবার মাথায় নীল রঙা মলম মাখিয়ে হাতে ধরিয়ে দিল কার্বলিক সাবান।
গোসল সারার পর সবাইকে চেক করে দেখলেন বিশেষজ্ঞ ডাক্তারদের দল।
“তোমার মাথা আর মুখে কী হয়েছিল?” হেনড্রিককে দেখে জানতে চাইলেন এক ডাক্তার, “না, না, ঠিক আছে বলতে হবে না, আমি জানতে চাইনা। বোঝা গেল এ ধরনের ক্ষত আগেও দেখেছেন, “ট্রেনের ওই বজ্জাত ইনচার্জগুলো তো? ঠিক আছে। ডেন্টিস্টের কাছে পাঠিয়ে দিচ্ছি কিন্তু মাথায় আর সেলাই দেয়া যাবে না, দেরি হয়ে গেছে। মোহনীয় দাগগুলোকে বয়ে বেড়াতে হবে তোমার। এসব বাদ দিলে তুমি কিন্তু বেশ সুদর্শন বুঝলে?” হেনড্রিকের চকচকে কালো পেশির ওপর চাপড় দিলেন ডাক্তার, “তোমাকে আন্ডারগ্রাউন্ডে কাজ দিব। বোনাসও পাবে।”
এরপর সবাইকে ধূসর-রঙা ওভারঅল, বুটের পাশাপাশি ভূরিভোজনও করানো হল।
“আমি যে রকম ভেবেছিলাম, সে রকম তো নয়। খাবার ভালো, সাদা লোকগুলোও হাসছে। ট্রেনের মত কোনো মারধর নেই।” আয়েশ করে স্ট্যাপে চামচ ডোবালেন হেনড্রিক।
“ভাই, গাধারাই কেবল নিজের গরু মারে। আর এই সাদা লোকগুলো গাধা নয়।” অন্যান্য ওভাষোদের একজন নিজের উদ্যোগে মোজেসের খালি প্লেট নিয়ে রান্নাঘর থেকে ভরে নিয়ে এল। আজকাল এসব আর তাকে বলতে হয় না। ওর অনুগত কৃষ্ণাঙ্গের দল নিজেদের দায়িত্ব মনে করেই তা করে দেয়। তার উপরে আবার ওভারসিয়ারের মৃত্যুতে মোজেস আর তার লেফটেন্যান্ট সম্পর্কে রটে গেল বহু বীরত্বের কাহিনি।
পরদিন ঘুম ভাঙতেই গমের কেক আর দুধ খেয়ে সবাই ছুটল ক্লাসরুমে।
“দেশের প্রতিটি কোনা থেকে চল্লিশটি ভিন্ন ভিন্ন গোত্রের মানুষ এসেছে এখানে।” শ্রদ্ধাবনত কৃষ্ণাঙ্গরা, সরে মোজেস আর হেনড্রিকের বলার জায়গা করে দিল। “এখন ওরা আমাদেরকে গোল্ডির নিজস্ব ভাষা শেখাবে যেন সবাই একই ভাষায় পরস্পরের সাথে যোগাযোগ করতে পারে।”
বয়স্ক এক জুলু বস বয় নাম ফানাকালো হল তাদের ইনস্ট্রাকটর; যার নামের অর্থ হল লাইক দিস। লাইক দ্যাট। কয়েক সপ্তাহ পর দেখা গেল সবাই ফানাকালো নামটা ভুলে গিয়ে ওকে এই নামটাই দিয়ে দিল লাইক দিস! লাইক দ্যাট।
হেলমেট, লণ্ঠন, হাঁতুড়ি, কোদাল, সেফটি রেইল, চেঁছে ফেলার যন্ত্র, বিভিন্ন পোশাকসহ প্রতিটি আইটেম ডিসপ্লে করে দেখাল ফানাকালো, তারপর একে একে আমি, তুমিসহ শেখাল হাত, মাথা, পাসহ সবকিছুর ইংরেজি প্রতিশব্দ।
সারা সকাল ভাষা শেখার পর লাঞ্চের পর সবাইকে বিশ জনের দলে দলে ভাগ করে পাঠিয়ে দেয়া হল আরেক ক্লাসরুমে। ওয়াল টু ওয়াল লম্বা টেবিলের ওপাশে দাঁড়িয়ে হাসিমুখে সবাইকে স্বাগত জানাল আদা রঙা চুল-দাড়ি আর সবুজ চোখের এক শ্বেতাঙ্গ। ডাক্তারের মত পোশাক পরিহিত লোকটার ইংরেজি কেবল মোজেস আর হেনড্রিকই বুঝছে। যদিও তারা কাউকেই নিজেদের এ দক্ষতার কথা বলেনি। বরঞ্চ চোখেমুখে ভ্যাবাচ্যাকা ভাব ফুটিয়ে তুলে লোকটার কথা শুনল দুই ভাই, “অল রাইট, আমার নাম ডা, মার্কাস আর্চার এবং আমি একজন মনোবিজ্ঞানী। এখন তোমাদের বুদ্ধিমত্তার একটা পরীক্ষা নিয়ে দেখব যে কে কোন কাজের জন্যে উপযুক্ত। ঠিক আছে? এক বস বয়ের দিকে তাকিয়ে ডাক্তার মাথা নাড়তেই সে বাকিদেরকে অনুবাদ করে বোঝাল যে, “এই লাল মানুষটা যা বলছে করো। যেন আমরা বুঝতে পারি যে তোমরা কতটা আহাম্মক। বুঝলে?”।
প্রথম পরীক্ষাটা হল ব্যক্তির মেকানিক্যাল শেপ সম্পর্কে ধারণা কতটুকু জানার জন্য কাঠের বিভিন্ন গড়নের ব্লক একটা নির্দিষ্ট ফ্রেমে আটকানোর পাজল।
এ পর্যন্ত ১,১৬,৮১৬ জনের পরীক্ষা নিয়েছেন ডাক্তার। কিন্তু কেউই আড়াই মিনিটের আগে শেষ করতে পারেনি। অথচ আজ মোজেস মাত্র এক মিনিট ছয় সেকেন্ডে মিলিয়ে ফেলেছে পুরো পাজল। ডায়াস থেকে নেমে মোজেসের কাছে গেলেন ডাক্তার। ব্লকগুলোকে ঠিকঠাকভাবে সাজানো হয়েছে দেখে মনোযোগ দিয়ে তাকালেন ওর অভিব্যক্তিহীন অবয়বের দিকে।
এমনিতেই রুমে ঢোকার সাথে সাথে মোজেসের দৈহিক গঠন দেখে মুগ্ধ হয়েছেন কালো চামড়াপ্রিয় ডা. মার্কাস। এই কারণেই পাঁচ বছর আগে আফ্রিকায় চলে এসেছেন হোমা সেক্সয়াল ডাক্তার আর্চার।
ম্যাগডালিন কলেজের থার্ড ইয়ারে পড়াকালীন নিজের এই গোপন সত্য টের পেয়েছেন ডাক্তার, আর যে মানুষটা এই আনন্দের সাথে তাকে পরিচয় করিয়ে দিয়েছেন তার কাছেই পেয়েছেন কার্ল মার্কস আর স্লাদিমির ইলিচ লেনিনের কম্পানিস্ট পার্টি। আর ব্রম্নমবেরির কমরেডদের সাহচর্য পেলেও লন্ডনে কখনোই মন বসাতে পারেননি ডাক্তার। তাই পরবর্তীতে ম্যানচেষ্টার বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ইন্ডাস্ট্রিয়াল সাইকোলজির ওপর পড়াশোনা করেছেন। আফ্রিকান খনি শ্রমিকদের জন্যে কাজ করার সুযোগও করে দিয়েছে পার্টি। আর এতদিন নেশার পর্যায়ে পৌঁছে গেছে তার কৃষ্ণাঙ্গ প্রীতি। তাই সাউথ আফ্রিকান কম্যুনিস্ট পার্টির প্রয়োজনে সানন্দে সাড়া দিতে রাজি হয়ে গিয়েছেন ডা, আর্চার।
