পায়ের কাছে একটা ভেন্টিলেটরও পাওয়া গেল। প্যান্টের বেল্ট খুলে গিঁট বানিয়ে ফাসটাকে গলিয়ে দিলের নিজের এক পায়ে। তাই সোজা হয়ে শুয়ে থাকলেও কোনো ভয় নেই। ইলেকট্রিক বাল্ব লাগানো থাকায় আলোকিত হয়ে আছে নিচের বারান্দা। নিচে থেকে কেউ তাকালেই উপরে দেখতে পাবে তার মাথা আর চোখ। গাছের ওপর শুয়ে থাকা চিতা বাঘের মতই অপেক্ষা করলেন হেনড্রিক।
এভাবে কেটে গেল দুই ঘণ্টা। মাথার ওপর তারার গতি দেখে বরফের সূচের মত বিঁধছে শরীরে। কিন্তু যে কোনো শিকারের গুরুত্বপূর্ণ অংশ হল অপেক্ষা করা। আর এ ধরনের খেলা তিনি আগেও খেলেছেন।
আচমকাই নিচের দরজা থেকে ভেসে এল চাবির ঝনঝন শব্দ। আর এর ঠিক মুহূর্তখানেক পরেই উদয় হল টুপি পরা শ্বেতাঙ্গ ওভারসিয়ার। সাথে সাথে দুই কোচের মধ্যেকার ফাঁকের বারান্দায় ঝাঁপ দিলেন হেনড্রিক। লোথারের কাছে শেখা ডাবল লকের জ্ঞান কাজে লাগিয়ে জাপটে ধরলেন ইনচার্জের গলা। আরেক হাত দিয়ে লোকটার কনুই ধরে মাটি থেকে উপরে তুলে ফেললেন তার পা।
কাশি দেবার মত করে খকখক করে উঠল ওভারসিয়ার। ঠিক যেন ফাঁসিতে ঝুলছে। মাথা থেকে খসে পড়ল টুপি। উন্মাদের মত পা ছুঁড়তে ছুঁড়তে চাইছে গলার কাছের পেশিবহুল হাতটাকে ধরতে। পরস্পরের চোখ ইঞ্চিখানেক দূরতে না আসা পর্যন্ত লোকটাকে তুলে ফেললেন হেনড্রিক। তারপর রক্ত জমাটবেঁধে কালো হয়ে যাওয়া ক্ষত-বিক্ষত দাঁতের মাঢ়ি বের করে হাসলেন। ব্যালকনির আলোতে তাকে চিনে ফেলল ওভারসিয়ার, ধকধক করে উঠল লোকটার চোখ।
“ইয়েস মাই ফ্রেন্ড” ফিসফিস করে উঠলেন হেনড্রিক, “আমিই সেই কাফির।” তারপর লোকটাকে আরো ইঞ্চিখানেক তুলে ফেলে ছাদের কিনারে ঠেসে ধরলেন মাথা। ইচ্ছে করেই খুলির গোড়ায় মেরুদণ্ডতে চাপ দিচ্ছেন। হাপুনে গাথা মাছের মতই ছটফট করতে লাগল ওভারসিয়ার কিন্তু চিবুকের নিচে ধরে লোকটাকে সহজেই তুলে ফেললেন হেনড্রিক।
বুঝতে পারছেন যেকোনো মুহূর্তে ভেঙে যাবে ওভারসিয়ারের স্পাইনাল কর্ড। তাই শেষবারের মত ঝাঁকি দিয়ে আরেক ইঞ্চি তুলে ধরতেই শুকনো ডালের মত মট করে ভেঙে পড়ল লোকটার ঘাড়। হেনড্রিকের চোখের সামনে আস্তে আস্তে নিভে গেল ইনচার্জের নীল চোখের আলো।
তারপর মৃতদেহটাকে খানিক পেণ্ডুলামের মত দুলিয়ে রেলিঙের ওপারে ফেলে দিলেন। কোচের ছুটন্ত হুইলের নিচে পড়ে সাথে সাথে মাংসের কিমায় পরিণত হল ওভারসিয়ারের শরীর।
খানিক জিরিয়ে নিজের নিঃশ্বাস স্বাভাবিক হবার সময় দিলেন হেনড্রিক। ততক্ষণে আধমাইল পেছনে পড়ে গেছে লোকটার কাটা শরীর।
আবারো ভেন্টিলেটর থেকে বেল্ট খুলে কোমরে বেঁধে নিয়ে রেলওয়ে কোচের উপর দিয়ে হামাগুড়ি দিয়ে সোজা ল্যাট্রিনের জানালার উপর চলে এলেন। ভেতরে ঢুকে ঠিকঠাক বসিয়ে দিলেন জানালার পাল্লা। নিজের সিটে গিয়ে বসতেই দেখা গেল তাকিয়ে আছে মোজেস গামা। ভাইকে দেখে মাথা নেড়েই কম্বল মুড়ি দিয়ে শুয়ে পড়লেন হেনড্রিক। মিনিটখানেকের মধ্যেই ঘুমিয়ে পড়লেন।
বস, বয়দের চিৎকার-চেঁচামেচিতে ভেঙে গেল ঘুম। জেগে উঠে বুঝলেন যে ট্রেনও থেমে আছে। প্লাটফর্মের সাদা বোর্ডে গ্রামের নাম লেখা “ভ্ৰাইবাগ।”
খানিক বাদে চারপাশে ছেয়ে গেল রেলওয়ে পুলিশ। সবাইকে নামার আদেশ দিতেই প্লাটফর্মে সারি বেঁধে দাঁড়িয়ে গেল কৃষ্ণাঙ্গদের দল। নাম ডাকার পর বোঝা গেল যে কেউই অনুপস্থিত নেই।
মাথা হেলিয়ে ভাইয়ের দিকে তাকালেন হেনড্রিক। চিবুক দিয়ে ইশারা করেছেন হুইল আর তাদের কোচের বগির নিচের দিকে। সবখানে লেগে আছে রক্তের ছিটে আর লাল লাল মাংস।
তারপর সারাদিন ধরে স্টেশন মাস্টারের অফিসে জনে জনে তল্লাশি নিল পুলিশ। বিকেলের মধ্যেই অবশ্য কোনো প্রমাণ না পেয়ে ওভারসিয়ারের মৃত্যুকে দুর্ঘটনা ভেবে এ ব্যাপারে আগ্রহও হারিয়ে ফেলল।
তাই সন্ধের দিকে সবাইকে তুলে নিয়ে আবারো দুলে উঠল ট্রেন।
***
চারপাশে মানুষের উত্তেজিত কথাবার্তা শুনে ঘুম ভেঙে জেগে উঠলেন হেনড্রিক। সবার ভিড় ঠেলে জানালার কাছে যেতেই বাইরে দেখা গেল বেশ উঁচু এক পর্বত। অদ্ভুত দেখতে পবর্তমালাটা এতই সুন্দর যে, ঢেকে আছে পুরো উত্তরের আকাশ, উপরের দিকে নিখুঁত সমতল পবর্তটা দেখে সত্যিই বিস্মিত হলেন হেনড্রিক।
“এটা আবার কোন ধরনের পাহাড়?”
“গভীর নিচ থেকে কেটে আনা পাথর দিয়ে মানুষই এই পাহাড় তৈরি করেছে ভাই।”
যতদূর চোখ যায়, ঘাসের ওপর ঢেউয়ের মত ছড়িয়ে আছে সমান্তরাল পিঠের মাটির উঁচু উঁচু ভূপ। লম্বা জিরাফের মত ইস্পাত আর বিশালাকার হুইল সহ মেশিন যেন পৌঁছে গেছে আকাশে।
“একেবারে পৃথিবীর তল পর্যন্ত পৌঁছে গেছে এসব যন্ত্র। আর পাথুরে উদরের ওই হলুদ সোনার জন্যেই ঘাম ঝরায় শ্বেতাঙ্গদের দল, একে অন্যের সাথে মিথ্যে বলে, ধোঁকাবাজি এমনকি মেরে ফেলতেও দ্বিধা করে না।” হেনড্রিককে বুঝিয়ে দিল মোজেস।
সামনে ট্রেন যত এগোচ্ছে ততই বাড়ছে সকলের বিস্ময়। চারপাশে এত উঁচু দালান যে চমকে উঠল কৃষ্ণাঙ্গের দল। আর রাস্তা যেন ইস্পাতের নদী। হনহন করে ছুটছে একের পর এক গাড়ি। আকাশে উঠে যাওয়া চিমনিগুলো তৈরি করেছে কালো মেঘ। মানুষের সংখ্যা দেখে তো তাজ্জব হবার জোগাড়। লক্ষ, লক্ষ। রুপালি হেলমেট আর রাবার বুট ছাড়াও সারা গায়ে হলুদ কাদার ছিটে। দিশেহারা বোধ করল কোচের শ্রমিকরা।
