“হিরেগুলো?” নিচু গলায় জানতে চাইলেন হেনড্রিক।
“নেই।”
“খুজতে হবে তাহলে।” মাথা নাড়ল মোজেস।
“না। এতক্ষণে ঘাসের বীজ হয়ে মিশে গেছে। কোথায় পড়েছে সেটাও জানি না। আর তাছাড়া, ভাই, আমরা হলাম এই কোচের বন্দি। তাই ফিরে যাবার উপায় নেই। হিরেগুলোর কথাও ভুলে যাও।”
চুপচাপ বসে ভাইয়ের দেখানো যুক্তি নিয়ে ভাবলেন হেনড্রিক। এদিকে মোজেসও অপেক্ষা করছেন। এবার সে কোনো আদেশ দেয়নি।
কিংবা কোন পথনির্দেশও না। দেখা যাক হেনড্রিক নিজে ওর কাছে আসেন কিনা।
“তুমি ঠিকই বলেছো ভাই” অবশেষে সিদ্ধান্ত নিলেন হেনড্রিক “হিরেগুলো চলে গেছে। কিন্তু এ কাজ যে করেছে তাকে আমি দেখে ছাড়ব।”
কোনো রকম আবেগ-উত্তেজনা না দেখিয়ে মোজেস চুপ করে বসে রইল।
“এত চালাকির সাথে ওকে খুন করব যে আর কেউ কিছু টের পাবে না।” এখনো কথা বলছে না মোজেস। সে যে রকম হবে ভেবেছিল, হেনড্রিক সেভাবেই এগোচ্ছেন। তারপরেও আরেকটা ব্যাপার বাকি রয়ে গেছে। দেখা যাক হেনড্রিক নিজে সেটা টের পান কিনা।
“তোমার কি মনে হয় ভাই? এই সাদা কুত্তাটাকে মেরে ফেলা উচিত না আমার?” মোজেস গামার অনুমোদন চাইলেন হেনড্রিক। নিজেকে তিনি সত্যিই ভাইয়ের হাতে সমর্পণ করেছেন। হেসে ফেলল মোজেস। ভাইয়ের বাহুতে হাত রেখে বলল, “হ্যাঁ, তাই উচিত ভাই।”
এরপর পরবর্তী এক ঘণ্টা আর কোনো কথাবার্তা না বলে নিজের সিটে গুম হয়ে বসে রইলেন হেনড্রিক। মাঝে মাঝে কেবল প্রচণ্ড ব্যথা সহ্য করতে না পেরে মাথায় হাত বোলাচ্ছেন। খানিক বাদে উঠে গিয়ে জানালাগুলো চেক করে চলে এলেন ল্যাট্রিনের সামনে। ভেতরে ঢুকে দরজা আটকে দিয়ে পরীক্ষা করলেন খোলা গর্ত। নিচে দেখা যাচ্ছে শাঁই শাঁই করে ছুটে চলা পাথুরে ট্রেন লাইন। ল্যাট্রিনে জানালা ও একটা স্কু লাগানা কাঠের ফ্রেমে তারের জালি দেয়া পাল্লা।
সবকিছু চেক করে চুপচাপ নিজের সিটে এসে ফিসফিস করে মোজেসকে বললেন, “সাদা বেবুনটা আমার ছুরি নিয়ে গেছে। আমার আরেকটা লাগবে।”
মোজেস কিছু জিজ্ঞেস করল না। এটাও টেস্টেরই অংশ। দেখতে চায় কারো সাহায্য ছাড়া হেনড্রিক সফল কিংবা বিফল হয়ে কেমন আচরণ করে। কেবল পাশের কয়েকজনকে বলে দিতেই বেঞ্চের নিচে দিয়ে হেনড্রিকের হাতে পৌঁছে গেল একটা ছুরি।
ছুরি নিয়ে ল্যাট্রিনে ঢুকে জানালার পাল্লার আটটা ক্রু সাবধানে, খুলে ফেললেন হেনড্রিক। তারপর অপেক্ষা করলেন কখন কোচ ডানদিকে মোড় নেয় সেজন্যে। খোলা জানালা দিয়ে মুখ বের করে নিশ্চিত হয়ে নিলেন যে সে সময় এসেছে।
কোচের ছাদের দু’পাশেই উঁচু মতন বর্ডার দেয়া। জানালা বেয়ে উঠে ছাদে চলে এলেন হেনড্রিক। সামনের কোচ ডানদিকে বেঁকে যাওয়ায় জানালা দিয়ে তাকে কেউই উঠতে দেখল না। চোখ বন্ধ করে জানালা থেকে ছাদের কিনার ধরে দাঁড়িয়ে সবকিছু মুখস্থ করে নিলেন হেনড্রিক। তারপর কোচের উপরের অংশ দেখে আবার ল্যাট্রিনে নেমে এলেন। ফ্রেমটাকে আবার জানালার উপর লাগিয়ে রাখলেও গুলোকে ঢিলে করে রেখে দিলেন।
পরের দিন খুব ভোরবেলা খাবারের ট্রলি নিয়ে এল ওভারসিয়ার আর তার বেয়ারা। তারপর অন্ধকার নামার আগে খালি ডিশ নিতে এল বেয়ারাদের একজন।
“কাল রাতেই তোমরা গোল্ডি পৌঁছে যাবে। সেখানকার শ্বেতাঙ্গ ডাক্তার তোমার ক্ষতের চিকিৎসা করে দিবেন।” খানিকটা সহানুভূতি নিয়েই জানাল বেচারা, “অনেক শক্ত একটা শিক্ষা পেয়ে গেলে দোস্ত, লোকটাকে আর ঘাটাইও না।” যাবার আগে বন্ধ করে দিল কোচের দরজা।
সূর্যাস্তের সময় জানালা দিয়ে বাইরে তাকালেন হেনড্রিক। মালভূমিতে উঠে আসায় বদলে গেছে চারপাশের প্রকৃতি। ঘাসের রঙ বাদামি আর নদী ভাঙনের চোটে লাল হয়ে গেছে মাটি।
সারা জীবন গৃহহীন বন্য জীবন করে অভ্যস্ত হেনড্রিক বেড়া দিয়ে আলাদা করা মানুষের বসতি দেখে বিরক্তিতে নাক কুঁচকালেন। আশপাশের গ্রাম দেখে মনে হচ্ছে উইন্ডহকের মতই বিশাল।
“গোল্ডির দেখা পাওয়া পর্যন্ত অপেক্ষা করো।” জানিয়ে দিল মোজেস। বাইরে রাত নেমে আসতেই ঠাণ্ডা থেকে বাঁচতে গায়ে-মাথায় কম্বল জড়িয়ে ফেলল কোচের সবাই।
ওভারসিয়ার তার প্রথম রাউন্ড শেষ না করা পর্যন্ত অপেক্ষা করলেন হেনড্রিক। এবার তার চোখের ওপর আলো ফেললেও ঘুমের ভান করলেন না আর। বরঞ্চ শূন্য চোখে পিটপিট করে তাকালেন। তারপর ইনচার্জ দরজায় তালা দিয়ে চলে যেতেই নিজের সিটে উঠে বসলেন।
অন্যদিকে মোজেসও জেগে রইল, কিন্তু কিছু বলল না। সোজা ল্যাট্রিনে গিয়ে স্ক্রগুলো খুলে ফেললেন হেনড্রিক। রাতের ঠাণ্ডা হাওয়া এসে লাগতেই শিরশির করে উঠল মাথার ক্ষত। কয়লার ধোয়া থেকে চোখ বাঁচানোর জন্য অন্ধের মত উপরে উঠে ধরে ফেললেন কোচের ছাদের কিনার।
মোটামুটি মসৃণভাবেই উঠে এলেন উপরে। খানিক থেমে বিশ্রাম নিয়ে। হাঁপানি বন্ধ হতেই হামাগুড়ি দিয়ে এগোলেন সামনের কোচের উদ্দেশে।
ঝকঝক করছে রাতের আকাশ। তারার আলোয় রুপালি হয়ে আছে চারপাশ। বাতাসের ঝাঁপটা সামলে ছুটন্ত রেলের ওপর ভারসাম্য রেখে দাঁড়ালেন হেনড্রিক। হঠাৎ করেই মনের মাঝে কেমন যেন কু ডাক ডাকতেই দেখলেন সামনে থেকে ছুটে আসছে গাঢ় একটা অবয়ব। একেবারে ঠিক সময়ে শুয়ে পড়তেই মাথার উপর দিয়ে হুশ করে চলে গেল পানির ট্যাংকি। মিনিটখানেক বিশ্রাম নিয়ে ধাতস্থ হয়েই আবার ছাদের কিনার দিয়ে নিচে উঁকি দিলেন। পেট পেতে শুয়ে তাকাতেই দেখা গেল নিচে ব্যালকনি। এক কোচ থেকে আরেক কোচে যেতে হলে এখান দিয়েই পার হতে হবে। তাই কেউই হেনড্রিকের নজর এড়িয়ে পার পাবে না।
