কোচের বাতাসে বারুদের গন্ধ পেল শ্বেতাঙ্গ ওভারসিয়ার। তাড়াতাড়ি চোখ ঘুরিয়ে হেনড্রিকের খোঁজ করতেই দেখা গেল কোচের মাঝখানে বসে আছেন ওভাষো।
“একটা পচা আলু পুরো বস্তাটাকেই নষ্ট করে দেয়।” তিক্ত মেজাজ নিয়ে বেল্টের সাথে লাগানো টিনের গদাটাতে হাত দিল ইনচার্জ। কেননা ছোট্ট কোচে লম্বা চাবুকটা ব্যবহার করা একটু কষ্টকর হয়ে যাবে। তার চেয়ে বরং চৌদ্দ ইঞ্চি কাঠ দিয়ে তৈরি গদাটা হাড় ভাঙা কিংবা কাউকে মেরে ফেলার জন্য যথেষ্ট। হেনড্রিককে অবজ্ঞা করার ভান করে আস্তে আস্তে কোচের ভেতরে হাঁটা শুরু করল ওভারসিয়ার। কৃষ্ণাঙ্গদের চোখে-মুখে কেমন একটা বিদ্রোহের আঁচ টের পেতেই বুঝে নিল এসব কার কাজ।
“শুরুতেই ব্যাটাকে শায়েস্তা করা দরকার ছিল। যাই হোক, শান্তি পেতে হলে আর দেরি করা যাবে না।”
আড়চোখে হেনড্রিকের দিকে তাকিয়ে কোচের দরজার কাছে গিয়েও হঠাৎ করেই থেমে গেল ওভারসিয়ার। আপন মনে হাসতে হাসতে আবার এগিয়ে এল হেনড্রিকের সিটের পাশে।
“আমার দিকে তাকা, কাফির।” চিবুক তুলে একদৃষ্টে ইনচার্জের দিকে তাকিয়ে রইলেন হেনড্রিক।
“তোর লাগেজ কই?” ভ্যাবাচ্যাকা খেয়ে গেলেন হেনড্রিক, কারণ উপরের তাকে লাগেজের মধ্যেই আছে হীরে। অবচেতনেই চোখ চলে গেল সেদিকে।
“গুড।” বস্তটাকে তুলে হেনড্রিকের সামনে মেঝের উপর আছাড় মারলো ওভারসিয়ার।
“খোল।” কোমরে হাত রেখে আদেশ দিল শ্বেতাঙ্গ।
“কাম অন।” হেনড্রিক তারপরেও বসে আছেন দেখে কুব্ধ হয়ে উঠল। লোকটা, “তাড়াতাড়ি খোল কাফির, ভেতরে কী আছে দ্যাখা।”
আস্তে করে সামনে ঝুঁকে চামড়ার বস্তার মুখটা খুলে দিলেন হেনড্রিক। তারপর আবার নিজের জায়গায় এসে সিধে হয়ে বসলেন।
উপুড় হয়ে বস্তাটাকে ধরে মেঝের উপর ভেতরের সবকিছু ফেলে দিল ইনচার্জ। প্রথমেই বের হল কম্বল, কিছু কাপড় আর চামড়ার খাপে মোড়ানো নয় ইঞ্চি লম্বা ছুরি।
“বিপজ্জনক অস্ত্র। কোচে এরকম কিছু রাখা যাবে না।”
“বলে ছুরির ফলা জানালার খাপে নিয়ে ঢুকিয়ে দুই ভাগ করে ছুঁড়ে ফেলে দিল বাইরে।
তারপরেও নড়লেন না হেনড্রিক। প্রায় এক মিনিট অপেক্ষা করেও কোনো প্রতিক্রিয়া না পেয়ে গমের আটা দিয়ে তৈরি রুটি পায়ের বুট দিয়ে উল্টে দিল ওভারসিয়ার।
“এটা আবার কোন ছাতার মাথা?” এবারে হেনড্রিক না নড়লেও তার কালো ধোঁয়াটে চোখের ঝিলিক স্পষ্ট দেখতে পেল ওভারসিয়ার। “আচ্ছা, এবার তাহলে ব্যাটাকে কাবু করা সহজ হবে।” পাউরুটিকে নাকের কাছে নিয়ে গন্ধ শুকল লোকটা।
“কাফির ব্রেড। কিন্তু কোম্পানির নিয়ম হল কোচের ভেতর কোনো খাবার রাখা যাবে না।” বিড়বিড় করেই পাউরুটিকে ও জানালা দিয়ে ছুঁড়ে বাইরে ফেলে দিল ওভারসিয়ার। সাথে সাথে নিচের স্টিলের হুইলে ঢুকে শত শত টুকরা হয়ে গেল রুটি। খিকখিক কর হেসেই আরেকটা ব্রেডের জন্যে হাত বাড়াল ইনচার্জ।
আর যায় কোথায়। বহুক্ষণ ধরে সহ্য করছিলেন হেনড্রিক। কিন্তু হীরে হারিয়ে এবার অন্ধ ক্রোধে যেন পাগলা কুত্তা হয়ে গেলেন। তবে ওভারসিয়ারও প্রস্তুত ছিল। হেনড্রিক এগোতেই গদার ফলা সোজা ধরলেন তার গলায়। আহত জায়গায় হাত দিয়ে পেছন দিক বেসামাল হয়ে পড়ে গেলেন হেনড্রিক। এরই সাথে খুলির সামনের অংশে গদার দ্বিতীয় বাড়ি খেয়েই পুরোপুরি ভারসাম্য হারিয়ে ফেললেন। আরেকটু হলেই পড়ে যেতেন। কিন্তু ওভারসিয়ার তাকে ধরে আবার সিটে বসিয়ে দিল।
ঠিক কাঠের গায়ে কাঠুরে যেমন করে কুঠার দিয়ে কোপ দেয় তেমনিভাবে হেনড্রিকের খুলির উপর আঘাত করল ইনচার্জ। চামড়া ফেটে ফিনকি দিয়ে ছুটল রক্ত। এভাবে গুনে গুনে তিনবার কোপ মারতেই জ্ঞান হারালেন হেনড্রিক।
ডান হাতে গাদাটাকে নিয়ে এবার মুখ ঘুরিয়ে কোচের বাকিদের দিকে তাকাল ওভারসিয়ার। সাথে সাথে চোখ নামিয়ে নিল আতঙ্কে হতভম্ব কৃষ্ণাঙ্গদের দল।
মেঝেতে মাথা ঠুকে পড়ে থাকায় সিটের সারির মাঝখান দিয়ে সাপের মত এঁকেবেঁকে এগোল হেনড্রিকের রক্তের ধারা। তাই দেখে হেসে উঠল নিজের পারফরম্যান্সে তপ্ত ওভারসিয়ার। ঠিক যেভাবে কাজটা করতে চেয়েছিল সেভাবেই হয়েছে।
তারপর একের পর এক রক্তমাখা পাউরুটি নিয়ে ছুঁড়ে ফেলল জানালার বাইরে। সব শেষ করে হেনড্রিকের ওপর উপুড় হয়ে শার্ট দিয়ে মুছে নিল নিজের গদা। এরপর আবার বেল্টের সাথে ঝুলিয়ে আস্তে আস্তে হেঁটে চলে গেল অন্য কক্ষে।
নিজের কোচের ব্যালকনিতে দাঁড়িয়ে আত্মপ্রসাদে হেসে ফেলল ওভারসিয়ার। যাক, সব এখন আবার শান্ত হয়ে যাবে। আর কোনো সমস্যার আশঙ্কা নেই।
কিন্তু যেই না ইনচার্জ বেরিয়ে গেল ওমনি তৎপর হয়ে উঠল মোজেসের দল। নেতার কাছ থেকে কয়েকটা আদেশ পেয়েই হেনড্রিককে তুলে নিজের সিটে বসাল। কয়েকজন গেল পানি আনতে আর মোজেস নিজে তার লাগেজ খুলে বের করে নিল বাদামি রঙা পাউডার। তারপর হেনড্রিকের খুলিতে লাগিয়ে দিল সমস্ত গুঁড়ো। ছাই আর লতা-পাতা দিয়ে তৈরি এই মিশ্রণ মাংস লাগাতেই বন্ধ হয়ে গেল রক্ত। তারপর ভেজা কাপড় দিয়ে মুছিয়ে দিল ভাইয়ের মুখ। অপেক্ষা করল কখন ফেরে হেনড্রিকের জ্ঞান, মোজসের বাবার পনের জন স্ত্রী থাকাতে তার ভাই-বোনের সংখ্যা ত্রিশেরও বেশি। কারো প্রতি তাই গোত্রের টানের উর্ধ্বে কোনো ভালোবাসা নেই আর হেনড্রিক তো এমনিতেই তার চেয়ে অনেক সিনিয়র। তবে ছোটবেলা থেকেই হেনড্রিকের নানা দুঃসাহসিকতার কাহিনি শুনে বড় হয়েছে মোজেস। সুতরাং আজ ওভারসিয়ার আর তার ভাইয়ের মধ্যে ঘটে যাওয়া ঘটনাকে টেস্টিং হিসেবে নিয়েছে কৃষ্ণাঙ্গদের এই নব নেতা। ফলাফলের ওপর নির্ভর করবে তাদের ভবিষ্যৎ সম্পর্ক। কারণ নিজের লেফটেন্যান্ট হিসেবে ইস্পাতের মত শক্ত একজনকেই চায় মোজেস ঠিক যেমন স্ট্যালিনকে বেছে নিয়েছিলেন লেনিন। একটু পরেই চোখ খুলে ঘোলা দৃষ্টিতে ভাইয়ের দিকে তাকালেন হেনড্রিক। গুঙ্গিয়ে উঠে মাথার ক্ষতে হাত বোলাতেই মনে পড়ল সবকিছু।
