পেছনে থেকে মোজেস দেখল ওভারসিয়ারের খুনি অভিব্যক্তি। হিসহিস করতে করতে ইনচার্জ জানালো, “এখানেই শেষ নয় বুঝলে।” ভাইয়ের পাশে বসে তাই হেনড্রিককে সাবধান করে দিল মোজেস, “লোকটা দেখো আবার তোমার পিছে লাগবে।” দক্ষিণের দিকে ছুটল ট্রেন।
তারপর পরদিন বিকেলবেলা আধঘণ্টার জন্য থামল ট্রেন। দু’জনে কৃষ্ণাঙ্গ বস্ বয়কে সঙ্গে নিয়ে ভিড়ে ভিড়াক্কার কোচে খাবার দিতে এল ওভারসিয়ার। সবার জন্য একই মেনু, সাদা গমের কেকের উপর এক চামচ বিন স্ট্য।
কিন্তু সোয়ার্ট হেনড্রিকের পালা আসতেই বস বয়কে সরিয়ে ওভারসিয়ার নিজে এল। হেনড্রিকের ডিশ নিয়ে ইচ্ছে করেই এক চামচ বেশি স্টু দিয়ে বলল, “গোল্ডিতে যাবার জন্য এই কাফিরের বেশি শক্তি দরকার। তারপর প্লেটটাকে বাড়িয়ে ধরল হেনড্রিকের দিকে।
তবে যেই না হেনড্রিক ধরতে যাবে, প্লেটটাকে ফেলে দিল ইনচার্জ। সোয়ার্টের পায়ের উপর ছড়িয়ে পড়ল গরম স্টু। গমের পরিজাকে পা দিয়ে মেঝেতে মেখে দিল ওভারসিয়ার। সব শেষ করে যেন কিছুই হয়নি এমন ভঙ্গিতে আবার কোমরে হাত দিয়ে দাঁড়িয়ে হাসল, বলল, “ওই কালা, একটাই। রেশন পাবি। চাইলে মেঝে থেকে চেটে খা।”
তারপর উৎসাহ নিয়ে তাকাল যে হেনড্রিক নিশ্চয় কোনো প্রতিক্রিয়া দেখাবে। কিন্তু না, চোখ নামিয়ে প্লেট থেকে বাকি পরিজা আঙুল দিয়ে বল বানিয়ে মুখে ঢুকিয়ে দিলেন হেনড্রিক।
পরাজিত হয়ে আরো ক্ষেপে গেল ওভারসিয়ার, “বেজন্ম নিগারের দল, তোরা বোধ হয় নিজের গু’ও খাবি।”
কোচের দরজাগুলোর ছিটকিনি বাইরের দিকে থাকে। চাবি থাকে ওভারসিয়ারের বেল্টে। অভিজ্ঞতা থেকে জানে যে নতুন রিক্রুটদের অনেকেই হোমসিকনেসে ভোগে। তাই ছুটন্ত কোচ থেকেও মাঝে মাঝেই লাফ দেয় নিচে। তাই রাতের বেলাও লণ্ঠন হাতে নিয়ে কোচের ভেতরে ঘুরে বেড়ায় ওভারসিয়ার। মাথা গুনে দেখার পাশাপাশি আলো ধরে প্রতিবার হেনড্রিকের ঘুমও ভাঙিয়ে দেয় ইচ্ছে করে।
সোয়াটকে জ্বালাতন করাটা যেন চ্যালেঞ্জ হিসেবে নিয়েছে ওভারসিয়ার। কিন্তু মোজেস ভাইকে থামিয়ে রাখে, “ধৈর্য ধরো ভাই। রাগকে ভেতরে সযত্নে লালন করো। যেন তুমি একে নিজের ইচ্ছেমত কাজে লাগাতে পারো।”
আস্তে আস্তে যেন প্রতিটা ব্যাপারে মোজেসের পরামর্শের ওপর নির্ভরশীল হয়ে পড়লেন হেনড্রিক। ওর বুদ্ধি এত ক্ষুরধার যে, সঠিক সময়ে জিভে সঠিক শব্দটাই চলে আসে। আর মোজেসের উপস্থিতিতে সবাই মুগ্ধ হয়ে বাধ্য হয় ওর কথা শুনতে।
আর কয়েকদিনের মধ্যেই হাতেনাতে এর প্রমাণও পেলেন। এক সাথে প্রথমে শুধু গরম কোচের মধ্যে বসে থাকা কাছাকাছি লোকগুলোই কেবল মোজেসের কথা শুনত। নতুন জায়গা আর সেখানের মালিকপক্ষ তারা কৃষ্ণাঙ্গ শ্রমিকদের কাছ থেকে কী আশা করে, না পেলে কী শাস্তি দেবে সব সুন্দর করে বুঝিয়ে বলে মোজেস। আস্তে আস্তে অন্যান্য বেঞ্চ থেকে গলা বাড়িয়ে ওর কথা শোনার জন্য আগ্রহী হয় বাকি মুখগুলো, “আরেকটু জোরে বলো গামা, যেন আমরাও শুনতে পাই।”
স্পষ্ট ভাষায় সবাইকে বুঝিয়ে বলে মোজেস, “বুঝলে, গোন্ডিতে এত কৃষ্ণাঙ্গকে একসাথে দেখবে যে পঞ্চাশটা ভিন্ন গোত্রের সবগুলো ভাষাই শুনতে পাবে। কেউ কেউ হয়ত শ্বেতাঙ্গদের মতই আমাদের দুশমন হবে। সুযোগ পেলেই তোমাদের ওপর হায়েনার মত ঝাঁপিয়ে পড়তে চাইবে। তাই নিজেকে রক্ষা করতে চাইলে সবসময় আশপাশে বিশ্বস্ত বন্ধু রাখবে। একজন নেতাও চাই। আর এর পরিবর্তে নেতাকে দিবে তোমার বিশ্বস্ততা।”
কয়েকদিনের ভেতরেই লোকগুলো উপলব্ধি করে যে, মোজেস গামাই হল সেই নেতা যে তাদেরকে সবরকম বিপদ থেকে বাঁচাতে পারবে। তাই তিন নম্বর কোচের পোত্র-প্রধান হয়ে গেল মোজেস। তাদের শঙ্কা দূর করে প্রশ্নের উত্তর দেয়ার পাশাপাশি প্রত্যেককে ভালো করে পরখ করে দেখল মোজেস। নিজের একেবারে কাছাকাছি বসার সুযোগ করে দিল আর এরাই হয়ে উঠল তার গার্ড।
এ সমস্ত কিছুই হেনড্রিকের চোখের সামনে ঘটছে। ছোট ভাইয়ের এরকম ব্যক্তিত্ব দেখে তারও বুক গর্বে ভরে উঠল। নিজস্ব ইচ্ছে-অনিচ্ছে জলাঞ্জলি দিয়ে মাথা পেতে নিলেন ভাইয়ের আজ্ঞা। আর মোজসের সাথে সাথে তারও প্রতিপত্তি বেড়ে গেল। আপন মনেই ভাবলেন, “পুরোপুরি বুঝতে না পারলেও এটুকু মনে হচ্ছে যে বৃহৎ কোনো কাজের সূচনালগ্নেই দাঁড়িয়ে আছি। তাই মোজেস গামার দেখানো পথেই আমি চলব। এর বেশি আর কোনো কিছু জানার প্রয়োজন নেই।
মনোযোগ দিয়ে মোজেসের মুখে শোনেন অজানা সব নাম আর আইডিয়ার কথা। অদ্ভুত এক উত্তেজনা আর শিহরণে যেন নেচে ওঠে রক্ত।
“লেনিন”, বলে চলে মোজেস “কোনো মানুষ নয়, ঠিক যেন পৃথিবীতে নেমে এসেছেন ঈশ্বর” ওর মুখেই শুনলেন যে উত্তরের বিভিন্ন জাতির মানুষ নাকি এই দেবতাপ্রতিম লেনিনের ছায়ায় একত্রিত হওয়ার পরে হয়ে উঠেছে দেবতারই অংশ।
পৃথিবী আগে যা কখনো দেখেনি মোজেসের মুখে সে যুদ্ধের কথা শুনে জেগে উঠল সকলের হৃদয়।
আচমকাই কোচের দরজা খুলে ভেতরে এল শ্বেতাঙ্গ ওভারসিয়ার। মুখে অট্টহাসি; কোমরে হাত দিয়ে দাঁড়ানো ইনচার্জকে দেখেই তাড়াতাড়ি নিজেদের চোখ নামিয়ে নিল কৃষ্ণাঙ্গের দল। কিন্তু মোজেসের কাছাকাছি বসে থাকা তার নির্বাচিত কয়েকজন ঠিকই টের পেল যে তাদেরকে কার সাথে কোন যুদ্ধে লড়তে হবে।
