তারপর কার্টিজ পেপারগুলোকে পুড়িয়ে ফেললেন হেনড্রিক। এরপর ভাইয়ের দিকে তাকিয়ে মাথা নাড়তেই পারিজের নরম গোলাটাকে চুলায় বসিয়ে দিল মোজেস। বুদবুদ ওঠা শুরু করতেই হীরেগুলোকে থকথকে পারিজে ঢেলে দিলেন হেনড্রিক। ফলে পারিজ ঠাণ্ডা হলেই শক্ত ময়দার মধ্যে গোপন হয়ে যাবে হীরে। এভাবে একের পর এক গোলাকার রুটি বানিয়ে চামড়ার ব্যাগে ভরে আবারো ঘুমন্ত গ্রামে ফিরে এল দুই ভাই।
সকাল হতেই আবার গ্রাম ছেড়ে বেরিয়ে পড়ল মোজেস আর হেনড্রিক। প্রথম মাইল পর্যন্ত কেঁদে-কেটে গান গেয়ে সঙ্গ দিল গ্রামের নারীরা। তারপর মাথার ওপর বোঝা নিয়ে দিগন্তের ওপাশে হারিয়ে গেল দুই ভাই। কয়েকদিন বাদেই পায়ে হেঁটে রিক্রুটমেন্ট স্টেশন পৌঁছে গেল দুজনে। মরুভূমির এক কিনারে প্রত্যন্ত এক রাস্তায় এক রুমের জেনারেল ডিলার স্টোর থেকেই আফ্রিকার বিভিন্ন অংশে কৃষ্ণাঙ্গ শ্রমিক সরবরাহ করা হয়।
হেনড্রিক আর মোজেস গিয়ে দাঁড়াতেই তাদের শূন্য আর ভাবলেশহীন দৃষ্টির দিকে তাকালেন ট্রেডার। জানতে চাইলেন, “নাম?”
“হেনরি তাবাকা।” মোজেসের সাথে আত্মীয়তা কিংবা লোথার ডি লা রে আর তার চুরির সাথে যেন কোনো সখ্যতা প্রকাশ না পায় তার জন্য নিজেই এ নাম বেছে নিয়েছেন হেনড্রিক।
“নাম?” এবারে মোজেসের দিকে তাকালেন ট্রেডার।
“মোজেস গামা।”
“তোমরা আগে কখনো খনিতে কাজ করেছো? ইংরেজি বলতে পারো?”
“ইয়েস, বাসি…।” দাঁত বের করে হেসে ফেললেন ট্রেডার।
“গুড! ভেরি গুড! এরপর গোল্ডি থেকে ঘরে ফিরে এলেই দেখবে বড়লোক হয়ে গেছ।” তারপর কার্ড আর বাসের টিকিট ধরিয়ে দিয়ে বললেন,
“বাস তাড়াতাড়ি এসে পড়বে। বাইরে অপেক্ষা করো।”
পুরো আটচল্লিশ ঘণ্টা ট্রেডিং স্টোরের পাশে অপেক্ষা করার পর নীল ধোয়া উড়িয়ে এল রেলওয়ে বাস।
নিজেদের যৎসামান্য লাগেজ ঠেলেঠুলে উপরে তুলে দিল দুই ভাই। যদিও একগাদা হাঁড়ি-পাতিল, বাক্স, ছাগল আর জ্যান্ত হাঁস-মোরগে আগে থেকেই ভর্তি হয়ে আছে বাসের ছাদ। তারপর কোচে চড়ে শক্ত কাঠের বেঞ্চিতে বসে পড়ল দু’জনে।
সারি সারি কৃষ্ণাঙ্গ প্যাসেঞ্জার নিয়ে দুদিন বাদে বাস এসে পৌঁছালো উইন্ডহকের শহরতলীতে। বিশালাকার আয়তনের এক কৃষ্ণাঙ্গ ওভারসিয়ার সবাইকে নিয়ে গেইটের ভেতরে ঢুকাল। শ্বেতাঙ্গ স্টেশন ম্যানেজার অবশ্য তাদের সবাইকে নিয়োগ দিলেন কেবল হাড়জিরজিরে এক বুড়োকে ছাড়া।
হেনড্রিককে দেখেই চেয়ারে সিধে হয়ে বসলেন ম্যানেজার, “তোমার নাম কি?”
“তাবাকা।”
“ইংরেজি বলতে পারো?” চোখ সরু করে তাকালেন ম্যানেজার। ঝামেলাবাজদের খুঁজে বের করতে তিনি ওস্তাদ। এটাই তার কাজ। কারো চোখের দিকে তাকালে তিনি তাদের ভেতরকার বুদ্ধিও টের পান।
“পুলিশের সাথে তোমার কোনো ঝামেলা আছে? হয়ত কারো গরু চুরি করেছো? কিংবা ভাইয়ের বউয়ের সাথে ফষ্টিনষ্টি?”
সোজা-সাপ্টা তাকিয়ে রইলেন হেনড্রিক।
“আমাকে উত্তর দাও।”
“না”
“আমার সাথে কথা বলার সময় বাস ডাকবে। বুঝতে পেরেছো?”
“ইয়েস, বাস।” সাবধানে উত্তর দিলেন হেনড্রিক। টেবিলের ওপর রাখা পুলিশ ফাইলটা খুলে আস্তে আস্তে পাতা উল্টালেন ম্যানেজার। মাঝে মাঝে আবার চোখ তুলে হেনড্রিকের চেহারার অপরাধবোধের কোনো ছায়া পাওয়া যায় কিনা তাও দেখে নিলেন।
“ক্রাইস্ট, ওদের গা থেকে এত গন্ধ আসছে।” টেবিলের ওপর ফাইলটাকে ছুঁড়ে বিয়ারের বোতল আর গ্লাস নিয়ে অফিসে ঢুকে গেলেন ম্যানেজার, “ওদেরকে সরিয়ে নিয়ে যাও।”
দুই ভাইয়ের ভাগ্য ভালোই বলতে হবে। কারণ কাঁটাতারের পেছনকার কুঁড়েঘরগুলোয় গত দশদিন ধরে অপেক্ষা করছে তিনশ’ কৃষ্ণাঙ্গ। এবার তাদের পরবর্তী যাত্রার সুযোগ এসেছে। সে রাতেই তিনটা রেলওয়ে কোচে সবাইকে তুলে দেয়া হল।
“তাড়াতাড়ি উঠে পড়ো সবাই। স্টিমার অপেক্ষা করছে। তোমাদের গোল্ডিতে নিয়ে যাবে।”
কোচে ওঠার পর দেখা গেল আরেকজন শ্বেতাঙ্গ ইনচার্জ, রোদে পোড়া লম্বা লোকটার শার্টের হাতা গোটানো থাকায় দেখা যাচ্ছে বাইসেপস। চুলগুলো সোনালি, কপালের ওপর নেমে এসেছে কালো টুপি। হাতের চাবুকটা দিয়ে কোনো কারণ ছাড়াই একটু পর পর পাশ দিয়ে যাওয়া কৃষ্ণাঙ্গের খালি পায়ে বাড়ি দিচ্ছে। ব্যথা পেয়ে তাড়াতাড়ি সরে যাচ্ছে বেচারা কৃষ্ণাঙ্গ।
হেনড্রিক কাছে যেতেই তামাক খেয়ে কালো হওয়া দাঁত দেখিয়ে হাসল ইনচার্জ। ক্যাম্প ম্যানেজার তাকে আগেই সাবধান করে দিয়েছিলেন। তাই এবারে চাবুক উঁচিয়ে হেনড্রিকের হাঁটুর পেছনে খোলা জায়গায় মারল লোকটা।
সাথে সাথে দাঁড়িয়ে গেলেন হেনড্রিক। মাথা ঘুরিয়ে তাকালেন ওভারসিয়ারের নীল চোখের দিকে।
“ইয়েস!” নরম স্বরে হেনড্রিককে উত্তেজিত করতে চাইল ইনচার্জ। চোখে প্রচণ্ড আগ্রহ। চাইছে সবার সামনেই হেনড্রিককে এক হাত দেখে নিতে। এই কোচে চড়ে পাঁচদিনের পথ পাড়ি দিতে হবে। তাই সব সময় প্রথমেই সবাইকে শায়েস্তা করতে চায় ইনচার্জ। একজনকে কজা করতে পারলেই বাকিরাও সিধে হয়ে যায়।
“এসো, কাফির।” গলা নিচু করে ব্যক্তি হিসেবে হেনড্রিককে অপমান করতে চাইল ইনচার্জ। নিজের এসব কাজ সে সত্যিই উপভোগ করে।
কিন্তু হেনড্রিক তার চেয়েও দ্রুত এক লাফ দিয়ে কোচের সিঁড়িতে উঠে পড়ায় লোকটার চাবুক এবার হেনড্রিকের পায়ে না লেগে বাতাসে শিস কাটল।
