“মিসেস কোর্টনি মি, এন্ডারসন আর গাইলস লাইনে আছেন।”
“ঠিক আছে নাইজেল” তারপর নিজের ধীরস্থির ভাব দেখে নিজেই অবাক হয়ে গেলেন, “মি. অ্যান্ডারসন আপনার জন্যে একটা পারচেজ অর্ডার আছে।”
দুপুরের মধ্যে এরকম সাতটা পৃথক ফার্মে ফোন করে মোট সাড়ে পাঁচ মিলিয়ন পাউন্ডের গোল্ড মাইনিং শেয়ার কিনে নিলেন সেনটেইন। অবশেষে আর স্থির থাকতে পারলেন না।
সেক্রেটারিকে বাকি দুটো ফোন বাতিলের আদেশ দিয়ে চলে এলেন প্রাইভেট বাথরুমে।
সাথে সাথে মুখে হাত দিয়ে হড়হড় করে বমি করে দিলেন পোর্সেলিনের বেসিনে। ধুয়ে-মুছে গেল লজ্জা, আতঙ্ক আর অপরাধবোধ। গলা আর বুক এত জ্বালা করে উঠল যেন অ্যাসিডে ঝলসে গেছে সবকিছু।
***
সেই শাসার ছোটবেলা থেকেই বড়দিন তাদের জন্য বিশেষ একটা দিন। কিন্তু এবার সেনটেইনের ঘুম ভাঙল একরাশ মন খারাপ নিয়ে।
নাইট গাউন পরিহিত অবস্থাতেই নিজের স্কাইটে বসে ছেলের সাথে উপহার বিনিময় করলেন।
মাকে নিজের হাতে তৈরি কার্ড আর ফ্রাঙ্ক মরিয়াকের নতুন নভেল উপহার দিল শাসা; কাভারে লেখা,
“যাই ঘটুক না কেন আমরা দুজন একসাথেই আছি।” –শাসা
আর ছেলেকে গগলসসহ লেদারের ফ্লাইং হেলমেট দিলেন সেনটেইন। দেখে তো শাসা মহা বিস্মিত। তার মানে মা এখন আর ফ্লাইংকে মানা করবেন না।
“হ্যাঁ, বাবু, তুমি চাইলে ফ্লাইং শিখতে পারো।”
“কিন্তু খরচ? মানে
“সে চিন্তা তুমি আমার উপর ছেড়ে দাও।”
“না মা।” দৃঢ় ভঙ্গিতে মাথা নাড়ল শাসা, “আমি আর শিশু নই মা। এখন থেকে যতটা পারি তোমাকে সাহায্য করব। তাই তোমার জন্য, আমাদের জন্যে দুর্বিসহ কিছু হোক তা চাই না।”
তাড়াতাড়ি ছেলেকে জড়িয়ে ধরে গালে গাল ঘষলেন সেনটেইন। যেন ছেলে তার চোখের পানি দেখতে না পায়।
“আমরা মরুভূমির সন্তান ডার্লিং। আমাদের কিছু হবে না।”
তারপর সারাদিন অতিথি আপ্যায়ন আর হাসি-ঠাট্টায় মেতে থাকলেও কাটল না মনের মেঘ। পরিচারকদেরকে দেখার বাহানায় চলে এলেন পর্দা ঘেরা স্টাডিতে। আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে দেখলেন নিজের যোদ্ধার প্রতিবিম্ব।
দুপুরের ঠিক আগে আগে বিশপস-এর হেড মাস্টার ফাদার ক্যামন আসাতে অবশ্য সত্যিই খানিকক্ষণের জন্য ভুলে গেলেন সব দুশ্চিন্তা। মা ছেলেকে এক পাশে টেনে নিয়ে ফাদার জানালেন,
“মিসেস কোর্টনি আপনার ছেলে তো স্কুলে বেশ বিখ্যাত হয়ে গেছে। যদিও আমাদের সাথে আর মাত্র সামনের বছরটাই আছে। যাই হোক, ওকে আমরা নতুন বছরের জন্যে স্কুলের হেড আর বোর্ড অব গভর্নরের হেড হিসেবে নির্বাচন করেছি।”
সাথে সাথে ছেলেকে জড়িয়ে ধরলেন উল্লসিত সেনটেইন, “মা, প্রিন্সিপ্যালের সামনে নয়।” লজ্জা পেয়ে মাকে আস্তে করে শাসিয়ে দিল শাসা।
“শুধু তাই না মিসেস কোর্টনি, আপনাকেও আমন্ত্রণ জানানো হয়েছে। বোর্ডে আপনিই হবেন প্রথম নারী।”
তৎক্ষণাৎ রাজি হতে মন চাইলেও চোখের সামনে আর্থিক দুর্দশার চিত্র। ভেসে উঠতেই দ্বিধায় পড়ে গেলেন সেনটেইন, “আমি সত্যিই অনেক সম্মানিত বোধ করছি হেড মাস্টার। কিন্তু আমি উত্তরটা আপনাকে নিউ ইয়ারের পরে জানাব।”
তারপর সবশেষ অতিথি চলে যাবার পর পুরো পরিবার নিয়ে পোলো ফিল্ডে নেমে এলেন। সকল স্টাফ, তাদের পরিবার, পিতা-মাতা নিয়ে হাজির হলেন মাঠে। পেনশনভুক্ত বয়স্ক স্টাফরাও এলেন। সবাইকে খামে ভরে ক্রিসমাস বোনাস দিলেন সেনটেইন। বয়স্ক নারীদের অনেকেই জড়িয়ে ধরায় কেঁদে ফেললেন আবেগাপ্লুত সেনটেইন।
শাসা তাই বাদকদলকে ইশারা দিল চমৎকার কিছু বাজিয়ে শোনাবার জন্য। “আলবামা”-র সুরের সাথে সাথে এস্টেটের মিষ্টি ওয়াইন খেয়ে আবার হাসি-আনন্দে মেতে উঠল সবাই।
ওয়েল্টেভ্রেদের বড়দিনের আরেকটা ঐতিহ্য হল পারিবারিক ডিনার। সেই ছয় বছরের জন্মদিনের পর থেকে এ দিনে নিউ স্টেটমেন্ট থেকে আবৃতি করে শোনায় শাসা। তারপর মা-ছেলে মিলে আবার উপহার বিলি করে সবার জন্য।
বীফ, টার্কির রোস্ট আর ব্ল্যাক ক্রিসমাস পুডিং দিয়ে ডিনার সারার পর সবাই যে যার বেডরুমে চলে গেল। আর এই ফাঁকে জানালা গলে কটেজে চলে এলেন সেনটেইন।
ব্লেইন অপেক্ষা করছেন। সোজা তাই কর্নেলের দিকে দৌড়ে এলেন তিনি, “আমরা সবসময় একসাথে থাকতে পারি না।”
***
নিউ ইয়ারস ডে’তে কোনো সংবাদপত্র প্রকাশ না পেলেও প্রতি ঘন্টায় রেডিওতে খবর শুনছেন সেনটেইন। কিন্তু বুলেটিনে কোনো রাজনৈতিক খবরই নেই। এদিকে ব্লেইনও নিজের নির্বাচনী কাজ নিয়ে ব্যস্ত।
দিন শেষে গভীর রাত পর্যন্ত পড়াশোনা করে ঘুমাতে যাবার পরেও ভয়ংকর সব দুঃস্বপ্ন দেখলেন। তাই ভোরের আলো ফোঁটার আগেই ঘুমের চেষ্টা বাদ দিয়ে উঠে পড়লেন। রাইডিং বুট পরে অন্ধকারেই ঘোড়া ছুটিয়ে চলে এলেন পাঁচ মাইল দূরের ক্লেয়ারমন্ট স্টেশনে।
প্লাটফর্মে অপেক্ষা করতেই ভ্যান থেকে ছুঁড়ে দেয়া হল নিউজ পেপারের বান্ডিল। সাথে সাথে বিলি করার জন্যে হুমড়ি খেয়ে পড়ল কৃষ্ণাঙ্গ শিশুদের দল, তাদের একজনকে রুপার শিলিং দিয়ে একটা পত্রিকা নিয়ে নিলেন সেনটেইন।
আগ্রহ নিয়ে পাতা উল্টাতেই যেন কেঁপে উঠল পায়ের নিচের মাটি। হেডলাইনে লেখা—
দক্ষিণ আফ্রিকা গোল্ড স্ট্যান্ড পরিহার করেছে। ফলে গোল্ড মাইনগুলোর জন্যে এ এক বিশাল সু-সংবাদ।
কোনো রকমে নিচের ছোট কলামগুলোতে চোখ বুলিয়ে আবার ফিরে এলেন ওয়েল্টেলেদেনে। ঘোড়া নিয়ে সোজা পাথরের দেয়ালের উপর উঠে ছুটে বেড়ালেন আঙুর ক্ষেতের মাঝখানে, ওয়েল্টেভ্রেদেন তার, এ সবকিছু ভার। আনন্দে যেন দিশেহারা হয়ে গেলেন সেনটেইন।
