আজ এখানে দারুণ এক চাল চেলেছে উটেরিক। প্রথমত জনগণের চোখে নিজের অমরত্বকে প্রমাণ করেছে সে। তার প্রজারা তাকে খুন হতে দেখেছে অথচ তার পরেই আবার নিজের মৃত্যুর প্রতিশোধ নিতে মৃত্যুর কবল থেকে ফিরে এসেছে সে। মৃদু কিন্তু দৃঢ়কণ্ঠে বলে চলেছে সেরেনা। যারা তার বিরোধিতা করেছে তাদের মধ্যে ইরাস অন্যতম। মিশরের সকল সৎ এবং সম্মানী লোকদের কণ্ঠস্বরকে স্তব্ধ করে দেওয়ার ব্যবস্থা করছে উটেরিক। সে এটাও জানতে পেরেছে যে, আমার বাবা ইতোমধ্যে তার রণতরীর বহর এবং রথ বাহিনী নিয়ে রওনা দিয়েছে। সে এবং তার সকল মিত্র রাজারা এদিকেই আসছে। এখন বাবার আক্রমণের বিরুদ্ধে লড়াই করতে রওনা দেওয়ার আগে নিজের পেছন দিকটা নিরাপদ করে রেখে যেতে চাইছে সে। আমার বাবা তার বাহিনী নিয়ে মিশর পৌঁছানোর আগে কিছুই করতে পারব না আমরা। শুধু অপেক্ষা করা ছাড়া কোনো পথ নেই আমাদের সামনে। যদি কপাল ভালো হয় তাহলে হয়তো ইরাস এবং অন্য অভিযুক্তদের দুঃখ-দুর্দশার ফটকে পাঠাবে উটেরিক এবং সে ক্ষেত্রে ওদের বাঁচানোর একটা ব্যবস্থা করতে পারব আমরা।
ইরাস এবং অন্য বন্দিদের এবার রাজকীয় প্রহরীদের তত্ত্বাবধানে মঞ্চের ওপর তুলে আনা হলো। সবার হাত বাঁধা হয়েছে পিছমোড়া করে। এক নজরেই বোঝা গেল যে সবাইকে নিষ্ঠুরভাবে পেটানো হয়েছে। অনেকেরই শরীর থেকে রক্ত ঝরছে এবং তাদের তথাকথিত নেতা ইরাস প্রায় অর্ধ অচেতন হয়ে পড়েছেন। একসময়ের সুদর্শন মুখটা এখন মারের চোটে ফুলে বীভৎস হয়ে গেছে, ফলে প্রায় চেনাই যাচ্ছে না তাকে। মাথার লম্বা সাদা চুলগুলো এখন তার নিজেরই শুকনো রক্তে ভিজে জট পাকিয়ে গেছে। শরীর থেকে সমস্ত কাপড় খুলে নেওয়া হয়েছে তার, শুধু ছোট্ট এক টুকরো নেংটি রয়েছে এখন। নগ্ন পিঠের ওপর চাবুকের নিষ্ঠুর বাড়ির দাগ। দুই প্রহরী দুই পাশ থেকে সোজা করে দাঁড় করিয়ে রেখেছে তাকে। সেই অবস্থাতেই তাকে ফারাওয়ের মুখোমুখি করা হলো।
সাথে সাথেই ইরাসের বিরুদ্ধে তীব্র বিষোদ্গারে ফেটে পড়ল উটেরিক। আরো একবার পাগলের মতো উন্মত্ত ক্রোধ জেগে উঠেছে তার ভেতরে। তার মুখ থেকে থুতুর ছিটার সাথে যে অশ্রাব্য গালিগালাজগুলো বেরিয়ে আসছে তার মতো ভয়ানক অশ্লীল কথা জীবনে খুব কমই শুনেছি আমি। ডান হাতে একটা ঘোড়া চালানোর চাবুক ধরে রেখেছে উটেরিক। নিজের কথাকে আরো ওজনদার করার জন্য সেটাকে বারবার বৃদ্ধ মানুষটার মুখের ওপর চালাচ্ছে সে। কয়েক মুহূর্তের মধ্যেই নতুন করে রক্তের ধারায় ভিজে গেল হতভাগ্য লোকটার শুভ্র দাঁড়ি, শরীরে নিচ থেকে ভার নিতে অসম্মতি জানাল পা দুটো। কিন্তু প্রহরীরা তাকে ছাড়ল না, বরং শাস্তির সবটুকু যেন তার ওপরে নিশ্চিতভাবে পড়ে সে জন্য শক্ত করে ধরে খাড়া করিয়ে রাখল তাকে।
শেষ পর্যন্ত পিছিয়ে দাঁড়াল উটেরিক। হাপরের মতো ওঠানামা করছে তার বুক, গাল বেয়ে গড়িয়ে পড়ছে ঘামের ধারা। যে চাবুকটা দিয়ে এতক্ষণ ইরাসকে পেটাচ্ছিল সেটা ফেলে দিল সে, তারপর কোমরের খাপ থেকে টেনে বের করল তলোয়ার।
ছেড়ে দাও ওকে, প্রহরীদের নির্দেশ দিল সে। হাঁটু গেড়ে বসতে দাও ব্যাটাকে, যাতে আমার কাছে মাফ চাইতে পারে। হাতের বাঁধন খুলে দাও, যাতে আমার সামনে হাত জোড় করে ক্ষমাভিক্ষা করতে পারে। বোঝা গেল এই কাজ আগেও বহুবার করেছে প্রহরীরা। দাঁত বের করে হাসতে হাসতে ফারাওয়ের নির্দেশ পালন করল তারা।
দুই হাত সামনে বাড়িয়ে দে ব্যাটা বিশ্বাসঘাতক কুকুর। মাফ চা আমার কাছে, হারামজাদা বুড়ো শয়তান, ইরাসকে উদ্দেশ্য করে চেঁচিয়ে উঠল উটেরিক। কিন্তু এখন আর কোনো কিছু শোনার বা বোঝার ক্ষমতা নেই বৃদ্ধের মাঝে। আস্তে করে বিহ্বল ভঙ্গিতে কেবল কয়েকবার মাথা নাড়লেন তিনি। কাটা ঠোঁট থেকে গড়িয়ে পড়া রক্ত নতুন করে ভিজিয়ে দিল তার দাড়ি।
ওর হাতগুলো সামনে টেনে ধরো! প্রহরীদের উদ্দেশ্য করে চেঁচিয়ে উঠল উটেরিক। আগের মতোই হাসতে হাসতে সামনে এগিয়ে এলো তারা, তারপর বৃদ্ধের কবজিতে বাঁধা লম্বা দড়ি টেনে ধরে হাতগুলো সামনে নিয়ে এলো। ইচ্ছে করেই দড়িগুলো রেখে দিয়েছিল তারা, সম্ভবত এই উদ্দেশ্যেই। দড়িতে জোরসে টান পড়তেই মঞ্চের ওপর হুমড়ি খেয়ে পড়লেন ইরাস; কিন্তু তার হাতগুলো লম্বা হয়ে রইল তার মাথার দুই পাশে।
এবার খোলা তলোয়ার হাতে সামনে এগিয়ে এলো উটেরিক। তলোয়ারের মাথাটা আলতো করে ইরাসের বাহুতে ঠেকাল সে, দূরত্ব মেপে নিল। তারপর তলোয়ারটা মাথার ওপর তুলেই এক কোপে নামিয়ে আনল। ব্রোঞ্জের তলোয়ারটা নিখুঁতভাবে দুটুকরো করে দিল ইরাসের বাম বাহুর মাংস আর হাড়। দড়ি টেনে ধরে থাকা প্রহরীরা পিছিয়ে গেল, বাহুর কর্তিত অংশ থেকে ফিনকি দিয়ে বেরিয়ে এলো তাজা রক্ত। দুর্বল একটা চিৎকার বেরিয়ে এলো ইরাসের মুখ থেকে। দর্শক জনতার মাঝেও যেন সেই চিৎকারেরই প্রতিধ্বনি শোনা গেল; ভয় আর উত্তেজনার মিশেল ঘটেছে তাদের ভেতর।
আরো একবার তলোয়ার ওপরে তুলল উটেরিক জল্লাদের অভিজ্ঞ দৃষ্টিতে মেপে নিল দূরত্ব। তারপর কোপ মারল সে। ইরাসের দ্বিতীয় বাহুও বিচ্ছিন্ন হয়ে গেল গোঁড়া থেকে। দুই হাত হারিয়ে নিজের রক্ত থেকে তৈরি হওয়া পুকুরের মাঝখানে পড়ে রইলেন ইরাস, মৃদু মৃদু গোঙানি বেরিয়ে আসছে গলা দিয়ে।
