এবার উটেরিকের বাম পাশে এসে দাঁড়াল জেনারেল পানমাসি। অপেক্ষমাণ রথগুলোর একটাকে সামনে এগিয়ে আসতে নির্দেশ দিল সে। রথের চালক তার গাড়িটাকে মঞ্চের গোড়ায় নিয়ে এলো। রক্তের গন্ধ পেয়ে উত্তেজিত হয়ে ছটফট করতে শুরু করল তার রথের সাথে বাঁধা ঘোড়া চারটি। ওদিকে দুই প্রহরী তখন ইরাসের দুই গোড়ালিতে দড়ি বাঁধার কাজ শেষ করে ফেলেছে। এবার দড়ির অপর প্রান্তগুলো রথচালকের হাতে তুলে দিল তারা। সেগুলো রথের শেষ প্রান্তের সাথে শক্ত করে বেঁধে ফেলল চালক। তারপর মঞ্চ থেকে লাফ দিয়ে নেমে পড়ল উটেরিক। রথচালক নিজের জায়গা ছেড়ে দিল তার জন্য, রথে উঠে দাঁড়াল ফারাও। লাগামে ঝাঁকি দিল সে, সাথে সাথে ছুটতে শুরু করল ঘোড়াগুলো। ইরাসের পঙ্গু দেহটাও রথের পেছনে পেছনে হিঁচড়ে আসতে লাগল। ব্যথায় চিৎকার করে উঠলেন ইরাস। প্রথমে নিজের নগ্ন ক্ষতবিক্ষত দেহটাকে মাটির ওপর কোনোমতে সোজা করে রাখার চেষ্টা করলেন তিনি, কেটে ফেলা হাতের অবশিষ্ট অংশ ব্যবহার করে মাঠের ওপর পড়ে থাকা পাথর এবং অন্যান্য বস্তু থেকে নিজেকে সামলে রাখতে চাইলেন। কিন্তু রথটা যখন মাঠের ভেতর দ্বিতীয় চক্কর দেওয়া শুরু করল তখন ধীরে ধীরে দুর্বল হয়ে পড়েছেন তিনি, আর রক্ষা করতে পারছেন না নিজেকে। মাটিতে বারবার বাড়ি খেতে লাগল তার মাথা, এবং এভাবেই একসময় প্রাণের শেষ চিহ্নটুকু মুছে গেল তার চোখ থেকে। এবার টেনে-হিঁচড়ে তার মৃতদেহটাকে মঞ্চের কাছে নিয়ে এলো ফারাও উটেরিক, লাফ দিয়ে নেমে দাঁড়াল রথ থেকে।
অপরাজেয় ফারাও, বাকি অপরাধীদের কী শাস্তি দেওয়া হবে? উটেরিক মঞ্চের ওপর উঠে আসতে তাকে জিজ্ঞেস করল জেনারেল পানমাসি। কথাটা বলার সময় খোলা তলোয়ার দিয়ে বাকি ঊনত্রিশজন বন্দির দিকে ইঙ্গিত করল সে। জবাইয়ের জন্য পাঠানো শূকরের মতো হাত আর পা এক করে বেঁধে ফেলে রাখা হয়েছে তাদের সবাইকে।
নিরাসক্ত দৃষ্টিতে তাদের দিকে একবার তাকাল উটেরিক। আজকের দিনের জন্য যথেষ্ট পরিশ্রম করেছি আমি। এই বিশ্বাসঘাতকের দলটাকে দুঃখ-দুর্দশার ফটকে পাঠিয়ে দাও। ওখানে যেসব বিশেষজ্ঞ রয়েছে তারা আশা করা যায়। এদের উপযুক্ত ব্যবস্থা করতে পারবে।
যত দ্রুত সম্ভব আনন্দের বাগানে ফিরে যেতে হবে আমাদের, যাতে উটেরিকের বন্দিদের স্বাগত জানানো যায়, রামেসিস আর সেরেনাকে সতর্ক করে দিলাম আমি। আবার রথে উঠল ফারাও আর তার সঙ্গীরা, তারপর ময়দান থেকে বের হয়ে গেল। সোনালি প্রাসাদের দিকে চলতে শুরু করল তাদের রথ বাহিনী।
*
জনাকীর্ণ পথ দিয়ে বেশ কষ্ট করে চলতে হলো আমাদের, তবে শহরের প্রধান ফটক পার হয়ে পাহাড়ের মাঝ দিয়ে বাকি রাস্তার প্রায় পুরোটাই দৌড়ে পার হলাম। পথ সংক্ষেপ করে নিলাম মাঝে মাঝেই বিভিন্ন ঝরনা পার হয়ে এবং খাড়া ঢাল বেয়ে উঠে স্বাভাবিক সময়ের আগেই জায়গামতো পৌঁছে গেলাম। জানি যে, আমাদের পেছনেই আছে উটেরিকের বন্দিদের বহনকারী রথের দল এবং খুব তাড়াতাড়ি পৌঁছে যাবে তারাও। আমার এবং রামেসিসের সাথে সেরেনাকে তাল মিলিয়ে চলতে দেখে আরো একবার অবাক হয়ে গেলাম আমি। মাঝে মাঝে, এমনকি আমাদেরও পেছনে ফেলে দিতে লাগল ও। তবে হ্যাঁ, আমাদের দুজনের চাইতে ওর শরীর অনেক হালকা। আমরা যখন পৌঁছলাম তখন লুক্সর থেকে বন্দিদের বহনকারী রথ বাহিনীর পৌঁছতে আর এক ঘণ্টাও বাকি নেই। সত্যি কথা বলতে, পর্যবেক্ষণের দায়িত্বে থাকা প্রহরীরা যখন শহরের দিক থেকে আসা রথের সারি সম্পর্কে আমাদের সাবধান করল তখনো আমি ভুগের ছদ্মবেশ নেওয়া শেষ করে উঠতে পারিনি।
দ্রুত কাজ শেষ করে প্রধান দরজার দিকে এগিয়ে গেলাম আমি, তারপর বরাবরের মতোই সেই ভয়ংকর কথাটা শুনিয়ে দ্রুত বন্দিদের ভেতরে নিয়ে এলাম। সেরেনার তৈরি করা আনন্দের বাগানে ঢুকতেই সবাই অবাক হয়ে গেল। যেন স্বর্গে প্রবেশ করেছে, এমন দাঁড়াল সবার চেহারার অবস্থা। তার ওপর আমি যখন ডুগের ছদ্মবেশ খুলে আত্মপ্রকাশ করলাম এবং রামেসিসকে সবার সামনে নিয়ে এলাম তখন সবার কী অবস্থা হলো তা সহজেই অনুমেয়। বন্দিদের মধ্যে সবাই আমাকে এবং রামেসিসকে খুব ভালো করেই চেনে, কারণ বহুদিন ধরে লুক্সরে থেকেছি আমরা। তা ছাড়া আমরা দুজনই গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তি। তবে উটেরিকের কাছ থেকে সবাই শুনেছিল যে আমরা মারা গেছি, ফলে আমাদের জীবিত দেখে প্রচণ্ড রকমের অবাক হয়ে গেল তারা। সবাই আমাদের ঘিরে ধরল, কে কার আগে আমাদের জড়িয়ে ধরতে পারে তার প্রতিযোগিতা শুরু হয়ে গেল তাদের মাঝে। মৃত্যুর মুখ থেকে তাদের বাঁচানোর জন্য শত মুখে আমাদের ধন্যবাদ দিতে লাগল সবাই।
পরিস্থিতি বুঝে নিয়ে মিশরের ভবিষ্যৎ ফারাও হিসেবে রামেসিসের নাম প্রস্তাব করার জন্য কেবল সামান্য ইশারা করা লাগল আমাকে, বাকিটা সহজেই বুঝে নিল সবাই। বর্তমানে যে ঘৃণিত ব্যক্তিটি মিশরের সিংহাসনে বসে আছে এবং যে তাদের মৃত্যুদণ্ডে দণ্ডিত করেছে তাকে সরিয়ে রামেসিসকে বসানোর প্রস্তাবে সবাই খুশি হয়েই রাজি হয়ে গেল।
প্রথমেই একজন দুজন করে সবাই রামেসিসের সামনে হাঁটু গেড়ে বসল এবং তাকে ফারাও হিসেবে স্বীকার করে নিল। তারপর সবাই সমস্বরে রামেসিসের জয়ধ্বনি দিতে লাগল এবং তার প্রতি আনুগত্যের শপথ নিতে লাগল। তাদের আনন্দ এবং উত্তেজনা চরমে পৌঁছানোর পর যখন থিতিয়ে আসতে শুরু করল তখনই চূড়ান্ত চালটা চালোম আমি।
