কমেডি

অলস ওয়েল দ্যাট এন্ডস ওয়েল

রুসিলন ফরাসি সাম্রাজ্যের অধীনস্থ একটি প্রদেশ। সেখানকার শাসনকর্তা কাউন্টের মৃত্যুর পর নতুন কাউন্ট হলেন তারই যুবক পুত্র বারট্রাম। তার বাবা ছিলেন এক সাহসী যোদ্ধা। যুদ্ধে বীরত্ব দেখিয়ে তিনি ফরাসি সম্রাটের প্রিয়পাত্র হয়ে উঠেছিলেন। কাউন্টের মৃত্যুর খবর শুনে মনে খুব আঘাত পেলেন ফরাসি রাজ। তিনি তার প্রৌঢ় অমাত্য লর্ড লাফিউকে রুসিলনে পাঠালেন কাউন্টের ছেলে বারট্রামকে রাজসভায় নিয়ে আসতে। বারট্রামের বিধবা মার কানে যথাসময়ে পৌঁছে গেল সে খবরটা। ছেলেও তার বাবার মতো সাহসী, যুদ্ধবিদ্যায় পারদশী। সে সময় পার্শ্ববতী দেশগুলির ফ্রান্সের সঙ্গে ঝগড়া-বিবাদ লেগেই থাকত। কাজেই যুদ্ধ-বিগ্রহের প্রয়োজনেই যে বারট্রামকে নিয়ে যাওয়া হবে তা বুঝতে বাকি রইল না বিধবা কাউন্টেসের। যথা সময়ে লর্ড লাফিউ এলেন রুসিলনের প্রাসাদে! এগিয়ে গিয়ে তাকে সাদর অভ্যর্থনা জানাল বারট্রাম। লর্ড লাফিউকে দেখেই কান্নায় ভেঙে পড়লেন কাউন্টেস। লাফিউ এর কারণ জানতে চাইলে তিনি দুচোখমুছে ধরা গলায় বললেন, মি লৰ্ড, আপনি তো জানেন সামান্য কিছুদিন আগে আমি স্বামীহারা হয়েছি। এখন ছেলে বারট্রামই আমার একমাত্র অবলম্বন। ও যদি যুদ্ধে চলে যায় তাহলে আমার কী অবস্থা হবে, কীভাবে আমার দিন কাটবে–এসব ভেবেই কাদছি আমি।

তাকে আশ্বস্ত করে লর্ড লাফিউ বললেন, আপনি মিছামিছিই ছেলের জন্য চিন্তা করছেন কাউন্টেস। যুদ্ধ করতে গিয়ে যদি ওর কোনও ক্ষতি হয়, তাহলে স্বয়ং সম্রাট আপনার ভরণপোষণের দায়িত্ব নেবেন।

কাউন্টেস বললেন, আমি শুনেছিলাম সম্রাট খুব অসুস্থ। তা এখন তিনি কেমন আছেন?

মনোেবল ভেঙে পড়ছে। এমন কি রাজবৈদ্যের উপর ভরসা রাখতে না পেরে কদিন আগে তাকেও বিদায় করে দিয়েছেন। দুরারোগ্য রোগের দরুন হতাশা সম্বল করে কোনও মতে বেঁচে আছেন তিনি।

এ কথা শুনে আক্ষেপের সুরে কাউন্টেস বললেন, আজ যদি হেলেনার বাবা জীবিত থাকতেন তাহলে তিনি অবশ্যই সম্রাটকে সারিয়ে তুলতে পারতেন।

কার কথা বলছেন কাউন্টেস? জানতে চাইলেন লর্ড লাফিউ। কাউন্টেসের পাশে বসে একটি সুন্দরী যুবতি চুপচাপ চোখের জল ফেলছিল। তাকে দেখিয়ে কাউন্টেস বললেন, আমি এরই কথা বলছি। এর নাম হেলেনা। ওর বাবা গেরার্দ দ্য নিরবোন ছিলেন একজন নামি চিকিৎসক। বাবার মৃত্যুর পর থেকেই ও আমার কাছে আছে, লেখা-পড়া শিখছে। তাছাড়া আরও অনেক গুণ আছে ওর।

মার কাছ থেকে বিদায় নিয়ে হেলেনাকে বললেন কাউন্ট বারট্রাম, হেলেনা, আমি যাচিছ। এখন থেকে মার দেখা-শোনার সব ভার রইল তোমার উপর। আর তুমিও নিজের শরীরের যত্ন নেবে। —এই বলে লর্ড লাফিউয়ের সাথে চলে গেলেন।

আশ্রিতা হলেও কাউন্টেসের ছেলে বারট্রামকে ভালোবাসে হেলেনা, যদিও তার মতো বংশমর্যাদা ও সামাজিক প্রতিষ্ঠা তার নেই। নামি চিকিৎসক হলেও হেলেনার বাবা ছিলেন সমাজের এক সাধারণ স্তরের লোক। এই সামাজিক ব্যবধানের দরুন বারট্রামকে ভালোবাসলেও সে তার স্ত্রী হবার স্বপ্নও দেখেন। ওদিকে বারট্রামও জানেনা হেলেনা তাকে এত ভালোবাসে। মৃত্যুর আগে হেলেনার বাবা তাকে হাতে-কলমে শিখিয়ে গিয়েছিলেন অনেকদুরারোগ্য ব্যাধির চিকিৎসা পদ্ধতি। দুস্তপ্রাপ্য শেকড়-বাকড় আর জড়িবুটির গুণাগুণ। সম্রাটের দূরারোগ্য ব্যাধির বিবরণ শুনে সে স্থির করল। প্যারিসে গিয়ে সম্রাটের চিকিৎসা করবে। তার বিশ্বাস, বাবার শেখানো চিকিৎসা পদ্ধতিতে সম্রাট অবশ্যই আরোগ্যলাভ করবেন। তার মনে এই আশাও উকি দিল প্যারিসে গেলে হয়তো বারট্রামের সাথে তার দেখাও হয়ে যেতে পারে।

হেলেন যে বারট্রামকে ভালোবাসে এ কথা অজানা নেই। কাউন্টেসের একদিন তিনি মুখ ফুটেই বললেন, হেলেনাকে তিনি পুত্রবধূ হিসেবে চান। তিনি তাকে প্যারিসে গিয়ে সম্রাটের চিকিৎসা করার অনুমতি দিলেন। সেই সাথে প্রয়োজনীয় টাকা-কড়ি আর কয়েকজন বিশ্বস্ত লোকও দিয়ে দিলেন তার সাথে।

 

শুরুতে রাজি না হলেও যখন শুনলেন হেলেনা গেরার্ড দ্য নিরবোনের মেয়ে, সম্রাট রাজি হলেন তাকে দিয়ে নিজের চিকিৎসা করাতে। তবে শর্ত রইল দু-দিনের মধ্যে সম্রাট সুস্থ হয়ে না। উঠলে প্ৰাণদণ্ড হবে হেলেনার। আর সম্রাট সুস্থ হয়ে উঠলে রাজসভার যে কোনও অভিজাত যুবককে বিয়ে করতে পারবে হেলেনা। সম্রাট নিজে দাঁড়িয়ে সে বিয়ে দেবেন। হেলেনা রাজি হল সম্রাটের প্রস্তাবে।

হেলেনার দেওয়া ওষুধ খেয়ে দুদিনের মধ্যেই পুরোপুরি সুস্থ হয়ে উঠলেন সম্রাট। তার মনে হল তিনি যেন নতুন জীবন ফিরে পেয়েছেন। এবার সম্রাটের আদেশে রাজসভার অবিবাহিত অভিজাত যুবকেরা সবাই সারি দিয়ে দাঁড়াল একপাশে। সম্রাট হেলেনাকে বললেন, সে এদের মধ্য থেকে কাউকে স্বামী হিসেবে বেছে নেয়।

তাদের মধ্যে খুঁজতে খুঁজতে হেলেনার চোখে পড়ল রুসিলনের কাউন্ট বারট্রামকে। সে সরাসরি তার কাছে গিয়ে বলল, আমি আপনাদের আশ্রিতা। সেহেতু আপনাকে আমার স্বামীরূপে ভেবে নেবার সাহস বা অধিকার আমার নেই। আমি শুধু এটুকু আশ্বাস দিতে পারি। যতদিন বেঁচে থাকব। প্ৰাণ দিয়ে আপনাদের সেবা করে যাব।

তুমি ঠিক লোককেই বেছে নিয়েছ হেলেনা–বললেন সম্রাট। তারপর বারট্রামের দিকে চেয়ে তিনি বললেন, কাউন্ট বারট্রাম, এবার তুমি স্ত্রী হিসেবে গ্রহণ করা হেলেনাকে।

আমায় মাফ করবেন সম্রাট, বললেন কাউন্ট বারট্রাম, আমি ফ্রান্সের এক অভিজাত বংশের ছেলে, রুসিলনের কাউন্ট। আর হেলেনা এক সাধারণ ঘরের মেয়ে। বংশকৌলিন্য বলে ওর কিছু নেই। ও দেখতে সুন্দরী, অনেক গুণ আছে ওর–তা সত্ত্বেও ওকে বিয়ে করা আমার পক্ষে সম্ভব নয়। ওকে বিয়ে করলে অভিজাত সমাজে আমার মাথা নিচু হয়ে যাবে।

গভীর স্বরে সম্রাট বললেন, দেখ, কাউন্ট বারট্রাম! তুমি অভিজাত বংশের ছেলে হলেও আমার অধীনস্থ এক সামস্ত রাজা ছাড়া আর কিছু নও। এ কথা মনে রেখ রাজা কখনও তার প্ৰজার অবাধ্যতা সহ্য করে না। আর তার সাথে এটাও জেনে রাখা সম্রাট হিসেবে অধীনস্থ সমস্তরাজার পাত্রী নির্বাচনের অধিকার আমার আছে। সেই অধিকার অনুযায়ী আমি তোমায় আদেশ দিচ্ছি হেলেনাকে তুমি স্ত্রী হিসেবে মেনে নেবে।

এরপর বারট্রাম সাহস পেলেন না সম্রাটের আদেশ অগ্রাহ্য করার। পরদিন রাজকীয় সমারোহে গির্জায় তার বিয়ে হয়ে গেল হেলেনার সাথে। সম্রাটের আদেশে তাকে বিয়ে করতে বাধ্য হলেও বারট্রাম যে তাকে মন থেকে মেনে নেয়নি। সে কথা জানতে পেরে হতাশ হল হেলেনা।

এবার হেলেনার থেকে দূরে সরে থাকার এক উপায় খুঁজে বের করলেন বারট্রাম। শত্রুর সাথে মোকাবিলার জন্য ফ্লোরেন্সের ডিউক তার জ্ঞাতিভাই ফরাসি সম্রাটের সাহায্য চেয়েছিলেন। সম্রাট সসৈন্যে বারট্রামকে ফ্লোরেন্সে যাবার অনুমতি দিলেন। যাবার সময় হেলেনাকে ডেকে বারট্রাম বললেন, দ্যাখ, আমি ফ্লোরেন্সে যাচ্ছি যুদ্ধ করতে। কিছুদিন সেখানে আমায় থাকতে হবে। সম্রাটের আদেশেই আমি বাধ্য হয়ে তোমায় বিয়ে করেছি। কিন্তু মনের দিক থেকে তোমায় মেনে নিতে পারছি না।

হেলেনা বলল, তাহলে এখন আমি কী করব?

বারট্রাম বললেন, আমি মাকে একটা চিঠি লিখে দিচ্ছি। তুমি সেটা নিয়ে তার কাছে চলে যাও।

হেলেনা সম্রাটের দুরারোগ্য ব্যাধি সারাতে সক্ষম হয়েছে, বারট্রামের সাথে হেলেনার বিয়ে দিয়েছেন সম্রাট-এ খবর শুনে খুব খুশি হলেন কাউন্টেস। কিন্তু তার চেয়েও বেশি দুঃখ পেলেন যখন শুনলেন হেলেনার সাথে দুর্ব্যবহার করেছে বারট্রাম। মাকে লেখা চিঠিতে বারট্রােম একথাও উল্লেখ করেছেন যে শুধুমাত্র সম্রাটের আদেশেই হেলেনাকে বিয়ে করতে বাধ্য হয়েছে, আর তার থেকে দূরে সরে থাকার জন্য ফ্লোরেন্সে যাচ্ছেন যুদ্ধ করতে। চিঠির শেষাংশে বারট্রাম হেলেনাকে উদ্দেশ করে লিখেছেন, …যদি কখনও আমার হাতের আঙুল থেকে আংটি খুলে নিতে পার আর আমার সন্তানের জননী হতে পোর, তবেই আমায় স্বামী বলে ডাকার ক্ষমতা পাবে তুমি।

হেলেনাকে সাস্তুনা দিয়ে কাউন্টেস বললেন, তুমি কিছু ভেবো না। আমার ছেলের ব্যবহারের জন্য আমি লজ্জিত। তবে ঈশ্বরকে ধন্যবাদ, তোমাকে ছেলের বউ করে আমার শখ তিনি মিটিয়ে দিয়েছেন। বারট্রামের মতো আমিও তোমাকে নিজের সস্তান বলে ভেবে এসেছি। এখন থেকে ছেলের বউ হিসেবে তুমি আগের মতোই আমার কাছে থাকবে। আমার সমস্ত সম্পত্তিতে বারট্রামের মতো তোমারও সমান অধিকার আছে। আমার কথা বিশ্বাস কর হেলেন, আমি বলছি একদিন সব ঠিক হয়ে যাবে।

কিন্তু হেলেনা মোটেও আশ্বস্ত হতে পারল না। কাউন্টেসের কথা শুনে। এভাবেই কয়েকদিন কেটে গেল। একদিন সকালে ঘুম ভেঙে হেলেনাকে আর খুঁজে পেলেন না কাউন্টেস। তাকে উদ্দেশ করে লেখা হেলেনার একটি চিঠি তার হাতে তুলে দিল গোমস্তা রোনাল্ডো। সেই চিঠিতে লেখা আছে — মা! আমারই জন্য আপনার ছেলে দেশত্যাগী হয়েছে। সে অপরাধে প্ৰায়শ্চিত্ত করতে আমি খালি পায়ে যাচ্ছি সেন্ট জ্যাকুইসে তীৰ্থ করতে। দয়া করে এ খবরটা আপনার ছেলেকে জানাবেন। অনুগ্রহ করে আপনি আমায় ভুল বুঝবেন না। বাবার মৃত্যুর পর আপনি আমায় আশ্রয় দিয়ে যে উপকার করেছেন তার জন্য আমি আপনার কাছে চিরকৃতজ্ঞ হয়ে রইলাম। ইতি —
হতভাগিনী হেলেনা।

 

ডিউকের সেনাবাহিনীর নেতৃত্ব দিয়ে ফ্লোরেন্সের যুদ্ধে বারট্রাম জয়লাভ করলেন। মায়েরচিঠি পেয়ে তিনি জানতে পারলেন তাদের প্রাসাদ ছেড়ে চলে গেছে হেলেনা। তিনি নিশ্চিন্ত হলেন এই ভেবে যে আপদ বিদেয় হয়েছে। এরপর তিনি রুসিলনে ফেরার আয়োজন করতে লাগলেন। কিন্তু ইতিমধ্যে হেলেনা যে ফ্লোরেন্সে এসে পৌঁছেছে সে খবর তখনও পর্যন্ত জানতেন না। তিনি! সেন্ট জ্যাকুইসে তীর্থযাত্রা করতে হলে ফ্লোরেন্সের মাঝ দিয়েই যেতে হয়। ফ্লোরেন্সে এসে এক বিধবা মহিলার কাছে আশ্রয় নিল হেলেনা। পরদিন সেই তাকে নিয়ে গেলেন ডিউকের সামরিক বাহিনীর কুচকাওয়াজ দেখাতে। সেনাবাহিনীর পুরোভাগে বারট্রামকে দেখে চমকে উঠল হেলেনা।

বারট্রামের সাথে তার পরিচয় করিয়ে বিধবা ভদ্রমহিলা হেলেনাকে বললেন, ইনি কাউন্ট বারট্রাম। নবপরিণীতা স্ত্রীর কাছ থেকে দূরে সরে থাকার জন্য ইনি ফ্রান্স থেকে ফ্লোরেন্সে এসেছেন। লড়াই করতে। ভদ্রমহিলার কথার জবাব না দিয়ে চুপ করে রইল হেলেনা। ভদ্রমহিলা বলেই চললেন, আমার মেয়েকে কাউন্ট বারট্রাম খুবই ভালোবাসেন। কিন্তু তিনি বিবাহিত হবার দরুন আমার মেয়ের কাছে বিয়ের প্রস্তাব করতে পারছেন না। আগামী কালই তিনি দেশে চলে যাবেন। তাই উনি চাইছেন আজ রাতে মেয়ের সাথে দেখা করতে। কিন্তু আমার মেয়ে তাকে মোটেও পছন্দ করে না। সে রাজি নয় তার সাথে দেখা করতে।

বাড়ি ফিরে এসে হেলেনা সেই ভদ্রমহিলাকে বললেন, দেখুন, আমার নাম হেলেনা। কিছুদিন আগে আমারই সাথে বিয়ে হয়েছে কাউন্ট বারট্রামের। আমার কাছ থেকে দূরে সরে থাকতেই উনি ফ্রান্স ছেড়ে ফ্লোরেন্সে এসেছেন। এবার আপনি আর আপনার মেয়ে — দুজনে সাহায্য করলে আমি ফিরে পেতে পারি। আমার স্বামীকে।

কী সাহায্য তুমি চাও? জানতে চাইলেন ভদ্রমহিলা।

হেলেনা বলল, আপনি এখনই কাউন্ট বারট্রামকে খবর পাঠান যে আপনার মেয়ে তার সাথে দেখা করতে রাজি আছে।

এর ফল কী হবে তা ভেবে দেখেছ? জানতে চাইলেন ভদ্রমহিলা।

হ্যাঃ আমি ভেবে দেখেছি, বলল হেলেনা, খবর পেলে কাউন্ট অবশ্যই এসে যাবেন আজি রাতে। তবে আপনার মেয়ের পোশাক পরে আমি দেখা করব তার সাথে আমার উদ্দেশ্য কাউন্টের আঙুলে যে আংটিটি রয়েছে তা খুলে নেওয়া। তিনি বলেছেন। আংটি খুলে নিতে পারলেই উনি আমায় স্ত্রীর সম্মান দেবেন। আপনি অনুগ্রহ করে কাউন্টকে জানিয়ে দিন যে তার স্ত্রী হেলেনা অর্থাৎ আমি আর বেঁচে নেই।

হেলেনার দুঃখের কাহিনি শুনে ভদ্রমহিলা তাকে সহানুভূতি জানিয়ে আশ্বাস দিলেন তার পরিকল্পনা রূপায়ণে তিনি অবশ্যই তাকে সাহায্য করবেন।

 

সেদিন গভীর রাতে সাজগোজ করে কাউন্ট এসে হাজির হলেন সেই মহিলার বাড়িতে। তিনি সোজা ঢুকে গেলেন তার মেয়ে ডায়নার ঘরে। সেখানে তখন ডায়ানার পোশাক পরে অপেক্ষা করছিল হেলেনা। তিনি তাকে চিনতে পারলেন না। ডায়ানা ভেবে তিনি তাকে প্রেম নিবেদন করতে লাগলেন। শেষমেশ তাকে বিয়ের প্রস্তাব দিলেন। সুযোগ পেয়ে প্রেমের নিদর্শন হিসেবে বারট্রামের একটি আংটি চাইল হেলেনা। শুরুতে রাজি না হলেও শেষমেশ আঙুল থেকে আংটিটা খুলে নিজেই পরিয়ে দিলেন হেলেনার আঙুলে। সারারাত ডায়না-বেশী হেলেনার সাথে কাটালেন বারট্রাম। সকাল হবার আগেই তিনি বিদায় নিয়ে যাত্রা করলেন রুসিলনের পথে। সেই একই দিনে ভদ্রমহিলা ও তার মেয়ে ডায়ানাকে সাথে নিয়ে হেলেনাও রওনা দিলেন রুসিলন অভিমুখে।

এদিকে বৃদ্ধ কাউন্টেসের অসুস্থতার কথা শুনে ফরাসি সম্রাট স্বয়ং এসেছেন তাকে দেখতে। হেলেনার মৃত্যুসংবাদ শুনে মনে খুব আঘাত পেলেন কাউন্টেস। হেলেনাকে পরিত্যাগ করার জন্য সম্রাট খুবই বাকা-ঝকা করলেন বারট্রামকে। এরই মধ্যে ডায়ানাকে বিয়ে করার সমস্ত ব্যবস্থা ঠিক করে রেখেছেন বারট্রাম। কিন্তু তার আগেই হেলেনা এসে হাজির সেখানে। তার হাতে নিজের আংটি দেখে চমকে উঠলেন বারট্রাম। তিনি হেলেনার কাছে জানতে চাইলেন আংটিটা সে কোথায় পেয়েছে। হেলেনা বলল ফ্লোরেন্সে সেই ভদ্রমহিলার বাড়িতে তিনি সারারাত তার সাথেই কাটিয়েছেন। কিন্তু তার পরনে ডায়ানার পোশাক থাকায় বারট্রাম তাকে চিনতে পারেননি। সে রাতে বারট্রাম নিজেই তার হাতে পরিয়ে দিয়েছেন সেই আংটি। হেলেনা বারট্রামকে এও জানাল যে সে তার সন্তানের জননী হতে চলেছে। বারট্রাম যে সে রাতে হেলেনার সাথেই কাটিয়েছেন তা সমর্থন করল। ডায়ানা ও তার মা। সব কথা শোনার পর কাউন্ট আর দ্বিধা না করে বৈধ স্ত্রী হিসেবে গ্রহণ করলেন হেলেনাকে।

অ্যাজ ইউ লাইক ইট

অ্যাজ ইউ লাইক ইট
মূল রচনা: উইলিয়াম শেকসপিয়র
পুনর্কথন: মেরি ল্যাম্ব
অনুবাদ: অর্ণব দত্ত

সেকালের ফ্রান্স বিভক্ত ছিল একাধিক প্রদেশে (যেগুলিকে বলা হত ডিউক-শাসিত রাজ্য)। এমনই এক প্রদেশ শাসন করতেন জনৈক প্রবঞ্চক, যিনি তাঁর দাদা তথা রাজ্যের ন্যায়সঙ্গত শাসককে বলপূর্বক উচ্ছেদ করে মসনদ দখল করেছিলেন।

স্বরাজ্য থেকে বিতাড়িত হয়ে উক্ত ডিউক জনাকতক বিশ্বস্ত অনুচর নিয়ে আশ্রয় নিয়েছিলেন আর্ডেনের বনে। সহমর্মী স্বেচ্ছানির্বাসিত এই সব বন্ধুদের নিয়ে সেই বনেই বাস করছিলেন মহান ডিউক। আর তাঁদের জমি ও রাজস্বভাগ ভোগদখল করে ফুলে ফেঁপে উঠছিলেন সেই প্রবঞ্চক। ধীরে ধীরে বনের সরল নিরুদ্বেগ জীবনযাত্রা রাজোচিত জাঁকজমকপূর্ণ অনুষ্ঠানবহুল জীবনযাত্রার তুলনায় প্রিয়তর হয়ে উঠল তাঁদের কাছে। তাঁরা বসবাস করতে লাগলেন সেকালের ইংল্যান্ডের রবিন হুডের মতো। রোজই রাজসভার কোনো না কোনো সম্ভ্রান্ত ব্যক্তি আসতেন বনে। নিরুদ্বেগে কাটিয়ে যেতেন কিছুটা সময়। তাঁদের কাছে সেই সময়টুকু মনে হত সুবর্ণযুগ। গ্রীষ্মে প্রকাণ্ড বুনো গাছের শীতল ছায়ায় শুয়ে থাকতেন তাঁরা। খেলা করতেন বুনো হরিণের সঙ্গে। বনের এই অবলা হরিণগুলিকে তাঁরা এত ভালবাসতেন যে, খাদ্যের প্রয়োজনে এগুলিকে হত্যা করতে খুব কষ্ট হত তাঁদের। শীতের হিমেল বাতাস ডিউককে তাঁর দুর্ভাগ্যের কথা স্মরণ করিয়ে যেত। তিনি সহ্য করতেন। ধৈর্য ধরতেন। বলতেন, “এই যে হিমেল হাওয়া আমার শরীরে কাঁপন ধরাচ্ছে, এরাই আমার সত্যিকারের সভাসদ। এরা চাটুকথা বলে না। সত্যি কথা বলে প্রতিনিয়ত আমাকে আমার প্রকৃত অবস্থাটা দেখিয়ে দেয়। এরা কামড় বসায় তীক্ষ্ণ দাঁতে। কিন্তু সে দাঁত এদের অকৃতজ্ঞের দাঁত নয়। মানুষ দুর্ভাগ্য চায় না। কিন্তু দুর্ভাগ্য মানুষকে কতই না অমূল্য সম্পদ দিয়ে যায়। অশুভের মধ্যেও লুকিয়ে থাকে শুভ। যেমন গরল থেকেও পাওয়া যায় জীবনদায়ী ওষুধ, অমৃত।” সবকিছু থেকেই একটা না একটা নীতিবাক্য ঠিক টেনে বার করতেন ডিউক। এই জনহীন বনের সব কিছুই তাঁর চোখে মঙ্গলময় ঠেকত। তাই তিনি গাছের মধ্যে খুঁজে পেতেন ভাষা, বহমান সোঁতার মধ্যে খুঁজে পেতেন পুথি, পাথরের মধ্যে দেখতেন উপদেশমালা আর সব কিছুর মধ্যে পেতেন পরম ভালকে।

নির্বাসিত ডিউকের রোজালিন্ড নামে একটি মেয়ে ছিল। প্রবঞ্চক ডিউক ফ্রেডেরিক তার বাবাকে বিতাড়িত করলেও, রোজালিন্ডকে নিজের মেয়ে সেলিয়ার সঙ্গিনী হিসেবে রেখে দিয়েছিলেন। দুই বোন একে অপরকে খুব ভালবাসত। তাদের জন্মদাতাদের পারস্পরিক বিবাদ তাদের ভালবাসার বাঁধন আলগা করে দিতে পারেনি। রোজালিন্ডের বাবাকে রাজ্যচ্যূত করে তাঁর প্রতি যে অবিচার করা হয়েছিল, সেই ক্ষত রোজালিন্ডের মন থেকে মুছে দেওয়ার যথাসাধ্য চেষ্টা করত সেলিয়া। বাবার নির্বাসন এবং এক মিথ্যা প্রবঞ্চকের দাক্ষিণ্যে জীবনধারণের গ্লানি রোজালিন্ডকে গ্রাস করলেই সেলিয়ে এগিয়ে আসত তাকে সান্ত্বনা দিতে।

একদিন ডিউকের এক দূত এসে জানালো, মল্লযুদ্ধ দেখার ইচ্ছে থাকলে মেয়েরা যেন তক্ষুনি রাজপ্রাসাদ-লাগোয়া রাজসভায় চলে আসে; কারণ, একটি মল্লযুদ্ধের আসর বসতে চলেছে সেখানে। সেলিয়া ভাবল, সেখানে গেলে অন্তত রোজালিন্ড একটু আমোদ পাবে। তাই সে রাজি হয়ে গেল।

আজকাল মল্লযুদ্ধ মানে গেঁয়ো চাষাভুষোদের খেলা। কিন্তু সেকালে এই খেলা ছিল রাজসভার একটি প্রিয় অবসর বিনোদন। রাজকুমারী সহ অন্যান্য অভিজাত রমণীরা এই খেলা দেখতে আসতেন। সেলিয়া ও রোজালিন্ড গেলেন সেই মল্লযুদ্ধের আসরে। কিন্তু গিয়ে যা দেখলেন, তাতে তাদের বুক ফেটে গেল। আসরের একদিকে এক অভিজ্ঞ মল্লযোদ্ধা, যিনি কিনা তাঁর মতো বহু দক্ষ যোদ্ধাকে প্রতিযোগিতার আসরে নিকেশ করেছেন; আর অন্য দিকে তাঁর বিরুদ্ধে নামা একটি অত্যন্ত অল্পবয়সী যুবক। ছেলেটির বয়স ও অভিজ্ঞতা, দুইই এত অল্প ছিল যে সবাই ধরেই নিয়েছিল, এই আসরেই তার ভবলীলা সাঙ্গ হতে চলেছে।

মেয়ে সেলিয়া ও ভাইঝি রোজালিন্ডকে দেখে ডিউক বললেন, “এই যে, আমার মায়েরাও গুটিগুটি পায়ে মল্লযুদ্ধ দেখতে এসেছো দেখছি। তবে আজকের খেলা তোমাদের ততটা ভাল লাগবে না। ঠিক সমকক্ষ যোদ্ধাদের মধ্যে তো আর যুদ্ধ হচ্ছে না। ছেলেটাকে দেখে দয়া হচ্ছে আমার। ওকে বুঝিয়ে সুঝিয়ে আসর থেকে সরিয়ে আনতে পারলেই মঙ্গল হয়। তা মায়েরা, তোমরা একবার ওর সঙ্গে কথা বলে দ্যাখো না, যদি ওকে বোঝাতে পারো।”

কাজটি সৎ। তাই ওদের বেশ মনে ধরল। প্রথমে সেলিয়া এসে তরুণ আগন্তুকটির সঙ্গে কথা বলল। অনুরোধ করল প্রতিযোগিতা থেকে সরে দাঁড়াতে। তারপর রোজালিন্ড এসে মিষ্টি কথায় তাকে বুঝিয়ে বলল এই প্রতিযোগিতা কেন তার পক্ষে বিপজ্জনক। কিন্তু সেই মিষ্টি কথার ফল হল উল্টো। যুবক তার সংকল্প তো ত্যাগ করলই না, বরং সুন্দরীদের সামনে নিজের শৌর্যপ্রদর্শনের একটা অদম্য ইচ্ছে চেপে বসল তার মনে। সে সবিনয়ে সেলিয়া ও রোজালিন্ডের অনুরোধ ফিরিয়ে দিল। মেয়েরা তো মহাশঙ্কিত হয়ে উঠল। শেষে যুবক বলল, “আপনাদের মতো সুন্দরীদের অনুরোধ ফিরিয়ে দিতে আমার খুবই খারাপ লাগছে। আপনাদের শুভেচ্ছা দৃষ্টি এই প্রতিযোগিতায় আমার সহায়ক হোক। পরাজিত হলে জানবেন, আমি মহৎ কেউ ছিলাম না। আমার মৃত্যু হলে জানবেন, এক মৃত্যুপিপাসীর মৃত্যু হয়েছে। তাতে কারো কোনো ক্ষতি হবে না। আমার জন্য কাঁদার কেউ নেই। আমার জন্য জগতের কিছুই আটকাবে না। জগতে আমার কিছুই নেই। বরং যে জায়গাটুকু আমি দখল করে আছি, সেটুকু খালি হয়ে গেলে, সেখানে যোগ্যতর কেউ আসতে পারবে।”

এক নির্বান্ধব পরিবেশ থেকে মুক্তি পাওয়ার জন্য ছেলেটি মৃত্যুকে আলিঙ্গন করতে চাইছিল দেখে ছেলেটির প্রতি সবচেয়ে বেশি কষ্ট হচ্ছিল রোজালিন্ডের। সে দেখল, ছেলেটি তো তারই মতো হতভাগ্য। রোজালিন্ডের দয়া হচ্ছিল ছেলেটির প্রতি। খেলার কঠিন মুহুর্তগুলির প্রতি তার একনিষ্ট মনযোগই বলে দিচ্ছিল, সে সেই মুহুর্তেই ছেলেটির প্রেমে পড়ে গিয়েছিল।

দুই সুন্দরী অভিজাত রমণীর দয়া দেখে আগন্তুক যুবকের সাহস ও শক্তি দুইই বেড়ে গিয়েছিল। সে বিস্ময় সাধন করে প্রতিযোগীকে সম্পূর্ণ পরাভূত করল। লোকটার নড়াচড়া করার তো দূরের কথা, কথা বলারও ক্ষমতা রইল না।

ডিউক ফ্রেডেরিক তরুণ আগন্তুকের সাহস ও দক্ষতা দেখে মুগ্ধ হলেন। ছেলেটিকে নিজের তত্ত্বাবধানে রাখার মানসে তার নাম ও পিতৃপরিচয় জানতে চাইলেন।

আগন্তুক জানালো যে, সে স্যার রোল্যান্ড ডে বয়েজের ছোটো ছেলে অর্ল্যান্ডো।

অর্ল্যান্ডোর বাবা স্যার রোল্যান্ড ডে বয়েজ বছর কয়েক আগেই মারা গিয়েছিলেন। কিন্তু বেঁচে থাকতে তিনি ছিলেন নির্বাসিত ডিউকের এক অনুগত প্রজা ও বিশ্বস্ত বন্ধু। অর্ল্যান্ডো তার নির্বাসিত দাদার বন্ধুপুত্র জানা ফ্রেডেরিকের মন গেল বিষিয়ে। একরাশ বিরক্তি নিয়ে তিনি বেরিয়ে গেলেন। দাদার বন্ধুদের নামও শুনতে চাইতেন না তিনি। ছেলেটির বীরত্ব তাঁকে মুগ্ধ করেছিল বলে তিনি শুধু এইটুকু বলে গেলেন, অর্ল্যান্ডো অন্য কারোর ছেলে হলে তাঁর ভাল লাগত।

রোজালিন্ড কিন্তু তার বাবার পুরনো বন্ধুর ছেলেকে দেখে খুব খুশি হল। সে সেলিয়াকে বলল, “আমার বাবা স্যার রোল্যান্ড ডে বয়েজকে খুব ভালবাসতেন। যদি আগে জানতাম যে, এই যুবক তাঁর ছেলে, তাহলে চোখের জলে তাঁকে স্বাগত জানাতুম।”

দুই বোন তখন গেল যুবকের কাছে। ডিউকের হঠাৎ-অসন্তোষে ছেলেটি কিঞ্চিৎ হতভম্ব হয়ে পড়েছিল। দু’বোনে মিলে নরম কথায় তাকে উৎসাহিত করল। চলে আসার সময় আর একবার ফিরে এসে রোজালিন্ড তার বাবার মৃত বন্ধুর ছেলের সঙ্গে দু’টো ভদ্রতার কথা বলল। নিজের গলার হার খুলে সে বলল, “মহাশয়, আমার এই উপহার গ্রহণ করুন। আমার এই হতভাগ্য দশা না হলে, আপনাকে আরও মূল্যবান কিছু উপহার দিতাম।”

অন্তঃপুরে নিভৃত আলাপের সময় রোজালিন্ড ঘুরে ফিরে শুধু অর্ল্যান্ডোর কথাই বলতে লাগল। সেলিয়া বুঝতে পারল, তার বোন সুদর্শন তরুণ মল্লযোদ্ধাটির প্রেমে পড়েছে। সে রোজালিন্ডকে বলল, “এও কী সম্ভব? এত সহজে তুই ওর প্রেমে পড়ে গেলি?” রোজালিন্ড বলল, “ডিউক, মানে আমার বাবা, ওঁর বাবাকে খুব ভালবাসতেন কিনা!” সেলিয়া বলল, “তোর বাবা ওর বাবাকে ভালবাসতেন বলেই তুই ওর প্রেমে পড়ে গেলি। আমার বাবা তো ওর বাবাকে অপছন্দ করতেন। কই, আমার তো ওকে খারাপ লাগেনি!”

এদিকে রোল্যান্ড ডে বয়েজের ছেলেকে দেখে ফ্রেডেরিক উঠলেন খেপে। তাঁর মনে পড়ে গেল, অভিজাত রাজপুরুষদের মধ্যে অনেকেই নির্বাসিত ডিউকের বন্ধু ছিলেন। ভাইঝির প্রতিও হঠাৎ তাঁর রাগ হতে লাগল। কারণ, সবাই ওর গুণের প্রশংসা করত আর ওর বাবার দুর্ভাগ্যের জন্য ওর প্রতি সহানুভূতি দেখাত। সেলিয়া আর রোজালিন্ড অর্ল্যান্ডোকে নিয়ে কথা বলছে, এমন সময় ফ্রেডেরিক সেই ঘরে এসে হাজির হলেন। দৃষ্টিতে আগুন ছিটিয়ে ফ্রেডেরিক রোজালিন্ডকে প্রাসাদ ছেড়ে নির্বাসিত বাবার কাছে চলে যেতেআদেশ করলেন। সেলিয়া বাবাকে নিবৃত্ত করার চেষ্টা করল। কিন্তু তার কথায় কান না দিয়ে ফ্রেডেরিক বললেন, রোজালিন্ডের মতো মেয়ের সঙ্গে তার থাকা উচিত নয়। সেলিয়া বলল, “তেমন হলে ওকে রেখে দেওয়ার কথা আদৌ তুলতাম না। আগে ছোটো ছিলাম। তাই ও কেমন মেয়ে বুঝতাম না। কিন্তু আজ এত দিন ধরে একসঙ্গে খেয়ে, ঘুমিয়ে, খেলে, লেখাপড়া করে আমি ও আসলে কেমন মেয়ে তা বুঝতে পারি। ওকে ছাড়া আমি থাকতে পারব না।” ফ্রেডেরিক বললেন, “তুই বোকার মতো ওর সালিশি করছিস। ওর রূপ, ওর ওই চুপ করে থাকা, ওর ধৈর্য দেখে লোকেরা ওর প্রতি সহানুভূতি দেখায়। ও চলে গেলে তোকে রূপে গুণে আরও মহীয়সী মনে হবে। তাই ওর হয়ে কথা বলিস না। জেনে রাখিস, আমার আদেশের নড়চড় হবে না।”

রোজালিন্ডকে কাছে রেখে দেওয়ার জন্য বাবার কাছে সেলিয়ার সব আবেদনই নিষ্ফল হয়ে গেল। তখন সে নিজে রোজালিন্ডের পাশে দাঁড়াল। সেই রাতেই বাবার প্রাসাদ থেকে পালিয়ে এক বন্ধুকে সঙ্গে নিয়ে আর্ডেনের বনে রোজালিন্ডের বাবাকে খুঁজতে যাওয়ার প্রস্তাব দিল।

যাত্রা শুরুর আগে সেলিয়ার মনে হল, দামি পোষাক পরে দুই অল্পবয়সী মেয়ের রাস্তায় চলা নিরাপদ হবে না। সে গ্রামের মেয়েদের পোষাক পরে বের হওয়ার কথা বলল। রোজালিন্ড বলল, সবচেয়ে ভাল হবে, যদি তাদের একজন পুরুষ সাজে। তাই ঠিক হল। রোজালিন্ড দীর্ঘকায়া। সে গ্রাম্য যুবকের ছদ্মবেশ নিল। সেলিয়া পরল গ্রাম্য মেয়ের পোষাক। দুইজনে সাজল ভাই-বোন। রোজালিন্ড হল গ্যানিমিড আর সেলিয়া হল এলিয়েনা।

অনেক দূরের পথ আর্ডেনের বন। ডিউক-রাজ্যের সীমানার বাইরে। তাই এই দীর্ঘপথের রাহাখরচ হিসেবে কিছু টাকাপয়সা ও ধনরত্নও সঙ্গে নিল তারা। তারপর রওনা হল বনের উদ্দেশ্যে।

পুরুষবেশে লেডি রোজালিন্ড (বা যাঁকে এখন গ্যানিমিড বলাই ভাল) পুরুষালি দৃপ্ত ভঙ্গিমায় চলতে লাগল। সেলিয়া তার সত্যিকারের বন্ধু। বিশ্বস্ত বন্ধুত্বের প্রতিদানস্বরূপ সিলিয়া তার নতুন ভাইয়ের সঙ্গে এই কষ্টদায়ক যাত্রায় অংশ নিল। তার আচরণে লোকে মনে করল, এই ছেলেটি সত্যিই এলিয়েনা নামে এক সুকুমারী গ্রাম্য বালিকার দাদা কঠোর-হৃদয় গ্রাম্যযুবক গ্যানিমিড।

পথে তারা কয়েকটা আরামদায়ক সরাই আর ভাল থাকার জায়গা পেয়েছিল। কিন্তু আর্ডেনের বনে পৌঁছে তারা সেরকম কিছুই পেল না। গ্যানিমিড এতক্ষণ মজার মজার কথা বলে বোনের চিত্তবিনোদন করতে করতে আসছিল। এইবার খাবার আর আশ্রয়ের জন্য সেও কাতর হয়ে পড়ল। এলিয়েনার কাছে স্বীকার করল, পুরুষবেশ ফেলে মেয়েদের মতো চিৎকার করে কাঁদতে ইচ্ছে করছে তার। এলিয়েনা বলল, ক্লান্তিতে তা পা অবশ হয়ে আসছে। মেয়েরা দুর্বল, তাই তাদের স্বাচ্ছন্দ্যের ব্যবস্থা করা আর সান্ত্বনা দেওয়া পুরুষদেরই কাজ – এই কথা ভেবে পুরুষালি ভাব দেখিয়ে গ্যানিমিড বলল, “আয়, এলিয়েনা, বোন আমার। আর একটুখানি। এই তো আমরা আর্ডেনের বনের কাছে এসেই পড়েছি।” কিন্তু কল্পিত পুরুষত্ব আর আরোপিত সাহস আর তার সঙ্গ দিল না। আর্ডেনের বনে তারা এসে পোঁছেছিল বটে। কিন্তু ডিউক এই বনের কোথায় আছেন তা তো আর তাদের জানা ছিল না। তারা ভাবল যে তারা বোধহয় পথ হারিয়েছে। খিদেয়, ক্লান্তিতে, অবসাদে হতোদ্যম ও মৃতপ্রায় হয়ে ঘাসের উপর বসে পড়ল। এমন সময় একটি গ্রাম্য লোক সেই খান দিয়ে যাচ্ছিল। তাকে দেখে গ্যানিমিড আর একবার পুরুষের ভাব করে গম্ভীরভাবে বলল, “রাখাল, এই নির্জন স্থানে আমাদের বিশ্রামস্থলের বড়ো প্রয়োজন। আমার এই ছোটো বোনটি যাত্রার ক্লান্তিতে আর ক্ষুধায় অবশ হয়ে আর চলতে পারছে না। আমাদের এমন কোনো জায়গায় নিয়ে যেতে পারো, যেখানে আমরা দু’টি খেয়ে বিশ্রাম করতে পারব। তার বদলে যা চাও দেবো।”

লোকটি বলল যে, সে রাখাল নয়, এক রাখালের পরিচারক মাত্র। তার প্রভুর বসতবাড়িখানা খুব শীঘ্রই বিক্রি করে দেওয়া হবে। তাই সেখানে থাকা-খাওয়ার খুব একটা সুরাহা হওয়া সম্ভব নয়। তবে চাইলে তারাই বাড়িটা কিনে নিতে পারে। থাকা-খাওয়ার একটা সুরাহার আশায় তাদের দেহে নতুন বলসঞ্চার হল। তারা লোকটির সঙ্গে চলে গেল। কিনে নিল সেই রাখালের বাড়ি ও তার ভেড়ার পাল। যে লোকটি তাদের রাখালের বাড়িতে নিয়ে এসেছিল, তাকে তারা পরিচারক নিযুক্ত করল। এইভাবে ভাগ্যক্রমে তারা একটি পরিষ্কার পরিচ্ছন্ন কুটির পেয়ে গেল। খাওয়ার চিন্তাও আর রইল না। তারা ঠিক করল, যতক্ষণ না বনের মধ্যে কোথায় ডিউক আছেন তা জানতে পারে, ততক্ষণ তারা সেখানেই থাকবে।

দীর্ঘযাত্রার ক্লান্তি দূর হল বিশ্রামে। ধীরে ধীরে তারা তাদের নতুন জীবনে অভ্যস্থ হয়ে পড়ল। তারা রাখাল-রাখালিনীর ছদ্মবেশ নিলেও, নিজেদের সত্যিকারের রাখাল-রাখালিনীই ভাবতে লাগল। মাঝে মাঝে গ্যানিমিড অবাক হয়ে ভাবত, সে কিনা ছিল বাবার বন্ধুপুত্র বীর অর্ল্যান্ডোর প্রেমে পাগলিনী লেডি রোজালিন্ড। ভাবত, অর্ল্যান্ডো না জানি কত দূরে। আসলে, তারা যত দীর্ঘপথই পেরিয়ে আসুক না কেন, বাস্তবে অর্ল্যান্ডো ছিল তাদের কাছেই, ওই আর্ডেনের বনেই। কিছুদিন পরেই তারা সেকথা জানতে পারে। কিন্তু এমন আশ্চর্য ঘটনা কিভাবে ঘটল, আগে সেটাই শোনো।

মৃত্যুর সময় স্যার রোল্যান্ড শিশু অর্ল্যান্ডোর দেখাশোনার ভার দিয়ে যান তার বড়োদাদা অলিভারকে। ভাইকে লেখাপড়া শিখিয়ে তাঁদের প্রাচীন বংশের সুযোগ্য উত্তরসূরি করতে তুলতে বলে যান তিনি অলিভারকে। কিন্তু দাদা হিসেবে অলিভার ছিল নিতান্তই অযোগ্য। সে তার কর্তব্য পালন করেনি। মৃত্যুশয্যায় শায়িত পিতার আদেশকে সম্পূর্ণ অগ্রাহ্য করে ভাইকে স্কুলে না পাঠিয়ে বাড়িতেই চরম অবহেলার মধ্যে রেখে দেয় সে। তা সত্ত্বেও রক্তের সূত্রে প্রাপ্ত সহজাত গুণে অর্ল্যান্ডো অনেকাংশেই তার বাবার মতো হয়ে উঠেছিল। প্রথাগত শিক্ষা না থাকলেও তাকে মার্জিত রুচিসম্পন্ন যুবকই মনে হত। শিক্ষাবিহীন এই ভাইটির রুচিবোধ ও মার্জিত আচরণকে ঈর্ষা করতেন। শেষ পর্যন্ত তিনি ভাইকে শেষ করে দিতে গেলেন। লোক লাগিয়ে ভাইকে পূর্বকথিত সেই বিখ্যাত বহুঘাতী মল্লযোদ্ধাকে দ্বন্দ্বযুদ্ধে আহ্বান জানানোর জন্য উসকাতে লাগলেন। দাদার এহেন নিষ্ঠুরতাই অর্ল্যান্ডোকে জীবনের প্রতি বিতৃষ্ণ করে তুলেছিল।

কিন্তু অলিভারের ষড়যন্ত্রে অর্ল্যান্ডোর কোনো ক্ষতিই হল না, বরং তার খ্যাতি আরও বেড়ে গেল; আর তাই দেখে অলিভারের ঈর্ষার সীমা রইল না। তিনি ঠিক করলেন, অর্ল্যান্ডোর ঘরে আগুন দিয়ে তাকে পুড়িয়েই মারবেন তিনি। কিন্তু তাঁর বাবার এক বুড়ো বিশ্বস্ত চাকর তাঁর এই সংকল্পের কথা শুনে ফেলল। স্যার রোল্যান্ডের সঙ্গে অর্ল্যান্ডোর অনেক মিল ছিল বলে সে অর্ল্যান্ডোকে খুব ভালবাসত। বুড়ো বাড়ি থেকে বেরিয়ে পড়ল। ডিউকের প্রাসাদ থেকে ফেরার পথে অর্ল্যান্ডোর সঙ্গে তার দেখা হয়ে গেল। তার নতুন মালিকের শয়তানি ফন্দির কথা স্মরণ করতেই সে বিহ্বল হয়ে পড়ল: “ওগো দাদাবাবু, মিষ্টি সোনা দাদাবাবু আমার, স্যার রোল্যান্ডের স্মৃতি তুমি। কেন তুমি এমন গুণের মানুষ? কেন তুমি এত সুন্দর, এত শক্তিশালী, এত সাহসী? কেন ওই মল্লযোদ্ধাকে আহ্বান করে হারাতে গেলে? তোমার খ্যাতির কথা যে তোমার আগেই বাড়ি পোঁছে গেছে।” অর্ল্যান্ডো এসব কথার অর্থ বুঝতে না পেরে জিজ্ঞাসা করল, কী হয়েছে। বুড়ো তখন বলল, তার শয়তান দাদা লোকমুখে ডিউকের প্রাসাদে তার জয়ের খবর পেয়ে আরও ঈর্ষান্বিত হয়ে রাতে তার ঘরে আগুন লাগিয়ে তাকে হত্যা করার পরিকল্পনা করেছে। বুড়ো তাকে তক্ষুনি পালিয়ে যেতে বলল। অর্ল্যান্ডোর টাকাপয়সা কিছু নেই জেনে অ্যাডাম (সেই বুড়োর তা-ই নাম ছিল) তাকে নিজের গোপন টাকার থলিটা দিয়ে বলল, “তোমার বাবার কাছে কাজ করার সময় আমি অনেক কষ্টে এই পাঁচশো ক্রাউন সঞ্চয় করেছিলাম যাতে বুড়ো বয়সে যখন অথর্ব হয়ে পড়ব, তখন আমাকে অর্থাভাবে পড়তে না হয়। এটা নাও। বুড়ো বয়সে আমাকে ঈশ্বরই দেখবেন। এতে যা সোনা আছে, তার সবটাই তোমাকে দিচ্ছি। আর আমাকে তোমার চাকর করে নাও। আমি বুড়ো হলেও, দরকারে-অদরকারে তোমার মতো জোয়ান ছেলের সেবা করতে পারব।” অর্ল্যান্ডো বলল, “বুড়োদাদা আমার, এই বয়সেও তুমি কত আমার কথা ভাব! তোমার মতো লোক তো একালে মেলে না। চলো আমরা একসঙ্গে যাই। তোমার এই ক্ষুদ্র সঞ্চয় ফুরিয়ে যাওয়ার আগেই, আমাদের দেখভালের একটা সুরাহা করে ফেলতে হবে।”

তারপর বিশ্বাসী অ্যাডাম তার প্রিয় প্রভুপুত্র অর্ল্যান্ডোর সঙ্গে বেরিয়ে পড়ল এক অজানা ভবিষ্যতের উদ্দেশ্যে। তারাও এল আর্ডেনের বনে। সেখানে পৌঁছে গ্যানিমিড ও এলিয়েনার মতোই খাদ্যকষ্টে পড়তে হল তাদেরও। এদিক ওদিক ঘুরে জনবসতির খোঁজ করল। শেষে কিছুই দেখতে না পেয়ে ক্ষুধায় শ্রমে ক্লান্ত হয়ে বসে পড়ল মাটিতে। অ্যাডাম বলল, “দাদাবাবু গো, আর যে চলতে পারি নে। খিদেয় মরে যাচ্ছি।” সে ধরেই নিল, তার আয়ু শেষ, এখানেই তার জন্য কবর খুঁড়তে হবে। তাই সে তার প্রভুকে শেষ বিদায় জানিয়ে দিল। অর্ল্যান্ডো তার বুড়ো চাকরের এমন অবস্থা দেখে তাকে কাঁধে তুলে নিয়ে কতগুলি সুন্দর গাছের শীতল ছায়ায় এনে রাখল। বলল, “হতাশ হয়ো না, অ্যাডামদাদা, এখানে বসে একটু বিশ্রাম করো, এখনই মরার চিন্তা করতে হবে না।”

খাবারের খোঁজে বেরলো অর্ল্যান্ডো। হাজির হল ডিউকের আড্ডায়। ডিউক তাঁর সঙ্গীদের নিয়ে সেখানে ঘাসের উপর সান্ধ্যভোজে বসেছিলেন। তাঁর মাথার উপর রাজছত্র ছিল না, ছিল মাত্র বিরাট কয়েকটি গাছের ছায়া।

খিদের চোটে মরিয়া হয়ে অর্ল্যান্ডো তরবারির জোরে কেড়ে নিতে চাইল খাবার। বলল, “খবরদার, আর খাবে না। খাবারগুলো দিয়ে দাও আমাকে।” ডিউক তাঁকে জিজ্ঞাসা করলেন, অবসাদ তাকে এমন সাহসী করে তুলেছে, নাকি সে ভদ্র ব্যবহার অপছন্দ করে বলে এমন করছে। তার উত্তরে অর্ল্যান্ডো বলল যে, সে খিদেয় মরে যাচ্ছে। তখন ডিউক তাকেও ভোজসভায় আমন্ত্রণ জানালেন। এত ভদ্রভাবে তাঁকে কথা বলতে দেখে অর্ল্যান্ডো তরবারি খাপে রাখল। খাবার চেয়ে তার দুর্ব্যবহারের জন্য লজ্জায় মরে গেল। সে বলল, “অনুগ্রহ করে আমাকে ক্ষমা করুন। আমি ভেবেছিলাম, এখানে সবাই বন্য বর্বর। তাই আদেশের সুরে কথাটা বলেছিলাম। এই নেই-রাজ্যে বিষন্ন লতার আচ্ছাদনের তলায় বসে আপনারা যেই হন না কেন, সময় সম্পর্কে কী নির্লিপ্ত। হয়ত আপনাদের সুসময় ছিল কোনোদিন। আপনারা হয়ত সেইখানে ছিলেন, যেখানে গির্জায় ঘণ্টা বাজে, হয়ত কোনো বড়োমানুষের ভোজসভায় গিয়ে বসতেন, কোনোদিন হয়ত চোখের জল মুছেছেন, তাই জানেন দয়াপ্রার্থীকে দয়া করার প্রয়োজনীয়তা। তাই এখন মধুরভাষ্যে আপনি আমাকে সাদর অভ্যর্থনা জানালেন।” ডিউক উত্তর দিলেন, “ঠিকই বলেছ, আমাদের সুদিন ছিল কোনো এক সময়ে। আমরা এই বনজঙ্গলে থাকতাম না। থাকতাম নগরে-মহানগরে। সেখানে গির্জায় পবিত্র ঘণ্টাধ্বনি শোনা যেত। আমরা বড়োমানুষের ভোজসভায় বসতাম। চোখে আমাদের পবিত্র দয়া সঞ্জাত অশ্রু দেখা যেত, আমরা তাই মুছতাম। তাই এখানে এসে বসো। যা ইচ্ছা খাও। ক্ষুধা নিবৃত্ত করো।” অর্ল্যান্ডো বলল, “আমার সঙ্গে একজন বৃদ্ধ আছেন। তিনি আমাকে ভালবেসে আমার সঙ্গে অনেক দূর অবধি এসেছেন। কিন্তু আর হাঁটতে পারছেন না। বয়স ও ক্ষুধার ভারে ভারাক্রান্ত তিনি। তাঁর ক্ষুধা নিবৃত্ত না করে আমি এক কণাও দাঁতে কাটতে পারি না।” ডিউক বললেন, “যাও, তাঁকেও এখানে নিয়ে এস। তোমরা না ফেরা অবধি আমরা ভোজন আরম্ভ করব না।” হরিণী যেমন তার শাবকের জন্য ছুটে যায় খাবার আনতে, তেমনি ছুটল অর্ল্যান্ডো। অ্যাডামকে কাঁধে করে নিয়ে এল সেখানে। ডিউক বললেন, “ওহে বৃদ্ধ বোঝা, এসো বসো। তোমাদের দু’জনকেই স্বাগত জানাই।” তারা বৃদ্ধকে খাওয়াল। বৃদ্ধ ভারি খুশি হল। তার শরীর জুড়াল। আবার গায়ে বল ফিরে পেল সে। ডিউক অর্ল্যান্ডোর পরিচয় জিজ্ঞাসা করলেন। সে স্যার রোল্যান্ড ডে বয়েজের ছেলে জানতে পেরে ডিউক তাকে নিজের ছত্রছায়ায় নিয়ে নিলেন। অর্ল্যান্ডো ও তার বুড়ো চাকর ডিউকের সঙ্গে বনেই বাস করতে লাগল।

গ্যানিমিড আর এলিয়েনার বনে আগমন ও কুটির ক্রয়ের (যে কথার উল্লেখ আগেই করা হয়েছে) অল্প দিনের মধ্যেই বনে এসেছিল অর্ল্যান্ডো।

একদিন গ্যানিমিড ও এলিয়েনা অবাক হয়ে দেখল, বনের গাছে খোদিত রোজালিন্ডের নাম। সঙ্গে লটকানো রয়েছে রোজালিন্ডকে নিয়ে লেখা কয়েকটি প্রেমের চতুর্দশপদী। দুই বোনে ভাবছে এগুলি কার লেখা, এমন সময় তারা দেখা পেল অর্ল্যান্ডোর। রোজালিন্ড অর্ল্যান্ডোকে যে হারটি দিয়েছিল, সেটি দেখেই তারা ওকে চিনল।

গ্যানিমিডই যে দয়া ও মহত্বে অর্ল্যান্ডোর হৃদয়-বিজয়িনী সুন্দরী রাজকন্যা রোজালিন্ড, সেকথা টেরই পেল না অর্ল্যান্ডো। সে রোজালিন্ডের রূপের প্রশস্তি করে গাছে গাছে সনেট ঝুলিয়ে বেড়াচ্ছিল। রাখাল যুবকের সঙ্গে গল্প করতে করতে করতে তার মিষ্টি মিষ্টি কথাগুলি ভারি ভাল লাগে গেল অর্ল্যান্ডোর। গ্যানিমিডের চেহারায় রোজালিন্ডের একটা আভাস ছিল বটে। কিন্তু তার আচরণ রোজালিন্ডের মতো নম্র ছিল না। আসলে গ্যানিমিড বালক-পুরুষদের কথোপকথনের ভঙ্গি নকল করে কথা বলছিল। সে ঠাট্টা করে অর্ল্যান্ডোকে জনৈক প্রেমিকের গল্প শুনিয়ে বলল, “ছেলেটা আমাদের বনে শিকার করে আর রোজালিন্ডের নাম লিখে লিখে ছোটো গাছগুলিকে নষ্ট করে। রোজালিন্ডের প্রশস্তি গেয়ে হথর্নের উপর দীর্ঘ গীতিকবিতা আর ব্র্যাম্বলের উপর শোকগাথা লেখে। এই প্রেমিকটাকে খুঁজে পেলে আমি তার এই প্রেমরোগ সারানোর ওষুধের নাম বাতলে দেবো।”

অর্ল্যান্ডো স্বীকার করে নিল যে, সে-ই হল উক্ত প্রেমিক। গ্যানিমিডের কাছে সে ওষুধের পরামর্শ চাইল। গ্যানিমিড তাকে রোজ তার আর এলিয়েনার কুটিরে আসতে বলল। বলল, “আমি রোজালিন্ড সাজব। তুমি আমাকে প্রেম নিবেদনের ভান করবে, ঠিক যেমন আমি রোজালিন্ড হলে তুমি করতে। আমি তোমার সামনে খেয়ালি মেয়েদের হাবভাব নকল করে দেখাবো। তখন প্রেমে পড়ার জন্য তোমারই লজ্জা হবে আর তোমার রোগও যাবে সেরে।” এহেন চিকিৎসার প্রতি যদিও অর্ল্যান্ডোর খুব একটা আস্থা জন্মালো না, তবু সে গ্যানিমিডের কুটিরে যেতে ও সেই মজার প্রেম নিবেদনের খেলা খেলতে রাজি হল। তারপর থেকে প্রতিদিন অর্ল্যান্ডো গ্যানিমিড ও এলিয়েনার সঙ্গে দেখা করতে গেল। অর্ল্যান্ডো রাখাল গ্যানিমিডকে রোজালিন্ড সম্বোধন করতে লাগল। যেমন করে প্রতিদিন যুবকেরা নতুন নতুন স্তববাক্যে প্রেমিকার হৃদয় জয়ের চেষ্টা করে, তেমনি করে গ্যানিমিডের কাছে প্রেম নিবেদন করল অর্ল্যান্ডো। তবে তার প্রেমরোগ নিরাময়ে গ্যানিমিড খুব একটা সাফল্য দেখাতে পারল না।

অর্ল্যান্ডোর কাছে এ ছিল খেলা। সে তো আর ভাবেনি যে গ্যানিমিডই আসলে রোজালিন্ড। তবুও মনের সব কথা সে প্রাণ খুলে উজার করে দিল গ্যানিমিডের কাছে। খুশি হল গ্যানিমিড। সে অন্তত জানত যে, কথাগুলি ঠিক লোকের কাছেই যাচ্ছিল।

গ্যানিমিডকে সুখী দেখে এলিয়েনাও তাকে তার মতো থাকতে দিল। বাধা দিল না তার নকল প্রেম নিবেদনের খেলায়। একবারের জন্যও তাকে মনে করিয়ে দিল না যে, রোজালিন্ডের বেশে এখনও তার বাবার কাছে দেখা দেয়নি সে। যদিও অর্ল্যান্ডোর কাছ থেকে তারা জানতে পেরেছিল যে, ডিউক এই বনেই আছেন। একদিন গ্যানিমিডের সঙ্গে ডিউকের দেখা হল। তাঁদের কিছু কথাও হল। ডিউক গ্যানিমিডের পিতৃপরিচয় জানতে চাইলে সে বলল, সে ডিউকের মতোই ভদ্রঘরের ছেলে। ডিউক হাসলেন। আসলে তিনি ভাবতেও পারেননি যেই তরুণ রাখাল রাজপরিবারের সন্তান হতে পারে। ডিউককে সুখী দেখে গ্যানিমিড ঠিক করল, আরও কিছুদিন সে পরিচয় গোপন রাখবে।

একদিন সকালে গ্যানিমিডের সঙ্গে দেখা করতে যাচ্ছে অর্ল্যান্ডো, এমন সময় দেখল, একটা লোক মাটিয়ে শুয়ে রয়েছে আর তার গলার কাছে গুটিয়ে রয়েছে একটা বিরাট সবুজ সাপ। সাপটা অর্ল্যান্ডোকে দেখেই ঝোপের মধ্যে পালিয়ে গেল। অর্ল্যান্ডো একটু কাছে আসতেই একটা সিংহীকে দেখতে পেল। সিংহীটা মাটিতে মাথা রেখে গুটি গুটি পায়ে বিড়ালের মতো এগিয়ে আসছিল। ঘুমন্ত লোকটি জেগে ওঠার জন্য অপেক্ষা করছিল সে (কারণ, বলা হয়, সিংহ মৃত বা ঘুমন্তকে শিকার করে না)। ঈশ্বরই যেন অর্ল্যান্ডোকে পাঠিয়ে দিয়েছিলেন লোকটিকে সাপ ও সিংহীর হাত থেকে উদ্ধার করতে। কিন্তু লোকটার মুখের দিকে তাকাতেই সে বুঝতে পারল, যাকে সে জোড়া বিপদের হাত থেকে উদ্ধার করতে চলেছে সে আসলে তার নিজের দাদা অলিভার, যে একদিন তার সঙ্গে খারাপ ব্যবহার করেছিল, এমনকি তার ঘরে আগুন দিয়ে তাকে হত্যাও করতে চেয়েছিল। প্রথমে সে ভাবল, দাদাকে ক্ষুধার্ত সিংহীর মুখেই ছেড়ে যাবে। কিন্তু তারপরেই ভ্রাতৃপ্রেম ও স্বভাবগত দয়া তার প্রাথমিক রাগ দূর করে দিল। সে তরবারি বের করে সিংহীটাকে আক্রমণ করে তাকে হত্যা করল। দাদাকে রক্ষা করলবিষধর সাপ ও হিংস্র সিংহীর হাত থেকে । তবে সিংহীটাকে হত্যা করার আগে, সে তার তীক্ষ্ণ নখ দিয়ে অর্ল্যান্ডোর হাতে দিল আঁচড়ে।

অর্ল্যান্ডো যখন সিংহীর সঙ্গে যুদ্ধ করছিল, তখন অলিভারের ঘুম ভেঙে গেল। তিনি দেখলেন, যে ভাইয়ের প্রতি তিনি এত নিষ্ঠুরতা করেছিলেন, সে-ই কিনা নিজের জীবন বিপন্ন করে তাকে বন্য জন্তুর হাত থেকে রক্ষা করল। লজ্জা ও ধিক্কার গ্রাস করল তাঁকে। নিজের পূর্বকৃত ব্যবহারের জন্য অনুতাপ করতে লাগলেন তিনি। সজল চোখে ভাইয়ের কাছে ক্ষমা চাইলেন। তাকে অনুতপ্ত হতে দেখে অর্ল্যান্ডোর খুব ভাল লাগল। সে এককথায় দাদাকে ক্ষমা করে দিল। দুই ভাই একে অপরকে আলিঙ্গন করল। অর্ল্যান্ডোকে হত্যা করতে এসে তার সঙ্গে সত্যিকারের ভ্রাতৃপ্রেমে আবদ্ধ হলেন অলিভার।

হাতের ক্ষতস্থান থেকে প্রচুর রক্তক্ষরণ হওয়ায় অর্ল্যান্ডো দুর্বল বোধ করতে লাগল। সেদিন আর গ্যানিমিডের কাছে যেতে পারল না। বরং দাদাকে দুর্ঘটনার খবরটা গ্যানিমিডের কাছে পৌঁছে দিতে পাঠাল। অর্ল্যান্ডো বলে দিল, “ওকে আমি মজা করে রোজালিন্ড বলি।”

অলিভার গিয়ে গ্যানিমিড ও এলিয়েনাকে গিয়ে বললেন, কেমন করে অর্ল্যান্ডো তার জীবন রক্ষা করেছে। অর্ল্যান্ডের বীরত্বের কাহিনি ও তার ভাগ্যক্রমের বেঁচে যাওয়ার গল্প শেষ করে তিনি অর্ল্যান্ডোর দাদা হিসেবে আত্মপরিচয় দিলেন। জানালেন, আগে তিনি অর্ল্যান্ডোর সঙ্গে খারাপ ব্যবহার করলেও এখন আবার তাঁদের দুই ভাইয়ে মিল হয়ে গেছে।

পূর্বকৃত অপরাধের জন্য অলিভারকে এত অনুতপ্ত দেখে দয়াময়ী এলিয়েনা মুহুর্তে তাঁর প্রেমে পড়ে গেল। তাঁর কষ্টে এলিয়েনাকে সমব্যথী হতে দেখে অলিভারও এলিয়েনার প্রেমে পড়ে গেলেন। এইভাবে দু’জনের মন দেওয়া নেওয়া হয়ে গেল। এদিকে গ্যানিমিড তো অর্ল্যান্ডোর বিপদের কথা শুনে, সে সিংহীর দ্বারা আহত হয়েছে জেনে অজ্ঞানই হয়ে গেল।

জ্ঞান ফিরলে সে এমন ভান করল যেন, রোজালিন্ড নামে কোনো কাল্পনিক চরিত্রে অভিনয় করতে গিয়ে সে অজ্ঞান হয়ে গিয়েছিল। অলিভারকে বলল, “আপনার ভাই অর্ল্যান্ডোকে বলবেন, আমি কেমন সুন্দর অজ্ঞান হয়ে গিয়েছিলাম।” অলিভার কিন্তু তার দেহের পান্ডুরতা লক্ষ্য করে বুঝলেন যে ওটা অভিনয় ছিল না। যুবকের দুর্বলতা দেখে তিনি অবাক হয়ে গেলেন। বললে, “তা অভিনয় করতে হলে, পুরুষের অভিনয় করলেই তো পারো।” গ্যানিমিড উত্তরে বলল, “আমি তো তাই করি। তবে আমার নারী হওয়াই উচিত ছিল।”

অলিভার অনেকক্ষণ তাদের কাছে রইলেন। ফিরে এসে ভাইকে অনেক কথাই বললেন তিনি। কেমন করে গ্যানিমিড অর্ল্যান্ডোর আহত হওয়ার কথায় অজ্ঞান হয়ে গেল; কেমন করে তিনি সুন্দরী রাখালিনী এলিয়েনা আগ্রহে মুগ্ধ হয়ে তিনি তার প্রেমে পড়লেন, সে সব খুলে বললেন। এলিয়েনাকে বিয়ে করার ইচ্ছে প্রকাশ করলেন ভাইয়ের কাছে। বললেন, বিয়ে করে তিনি বনে রাখালের বৃত্তিই নেবেন। বাড়ি আর এস্টেটপত্র সব অর্ল্যান্ডোকে লিখে দেবেন।

অর্ল্যান্ডো বলল, “আমি রাজি। কালই বিয়েটা সেরে ফেলো। আমি ডিউক ও তাঁর বন্ধুদের আমন্ত্রণ জানাবো। যাও, রাখালিনীকে রাজি করিয়ে নাও। ও এখন একা আছে। ওই দ্যাখো, ওর দাদা এখানে এসেছে।” গ্যানিমিড তার আহত বন্ধুকে দেখতে এসেছিল। তা দেখে অলিভার এলিয়েনার কাছে গেল।

অলিভার আর এলিয়েনার প্রেম নিয়ে আলোচনা করতে লাগল অর্ল্যান্ডো ও গ্যানিমিড। বলল, দাদাকে সে রাখালিনীর কাছে পাঠিয়েছে পরের দিনই তাকে বিয়ে করার জন্য সম্মতি আদায় করতে। তারপর সে বলে ফেলল, ওই দিনই রোজালিন্ডকে বিয়ে করতে পারলে সে খুব সুখী হত।

গ্যানিমিড নিজেই যখন লেডি রোজালিন্ড তখন পরের দিনই অর্ল্যান্ডোকে বিয়ে করা তার পক্ষে মোটেও শক্ত কাজ নয়। সে বলল, তার কাকা ছিলেন এক বিখ্যাত জাদুকর। কাকার থেকে সেও কিছু জাদু শিখেছিল। সেই জাদুর বলে পরের দিনই সে রোজালিন্ডকে এনে হাজির করতে পারে।

প্রেমোন্মত্ত অর্ল্যান্ডো তার কথা খানিক বিশ্বাস করল, খানিক করল না। একবার ভাবল, গ্যানিমিড বুঝি রসিকতা করছে। গ্যানিমিড বলল, “আমার মাথার দিব্যি, আমি রসিকতা করছি না। আগামীকাল ভাল পোষাক পরে থেকো। আর ডিউক ও তাঁর বন্ধুদের তোমার বিয়েতে নেমন্তন্ন কোরো। কালই যদি রোজালিন্ডকে বিয়ে করতে চাও, তাহলে কালকেই সে এখানে এসে হাজির হবে।”

এদিকে অলিভার এলিয়েনার সম্মতি আদায় করতে পেরেছিলেন। পরদিন তাঁরা এলেন ডিউকের কাছে। সঙ্গে এল অর্ল্যান্ডোও।

ডিউক ও তাঁর বন্ধুরা এসেছিলেন দুটি বিয়েতে আমন্ত্রিত হয়ে। কিন্তু এসে দেখলেন, মাত্র একজন বধূই উপস্থিত। সকলে ভাবলেন, গ্যানিমিড অর্ল্যান্ডোর সঙ্গে রসিকতাই করেছে।

তাঁর মেয়েকে জাদুবলে হাজির করা হবে শুনে ডিউক অর্ল্যান্ডোকে জিজ্ঞাসা করলেন, ওই রাখাল ছোকরাটিকে সে বিশ্বাস করে কিনা। অর্ল্যান্ডো সে কথার কোনো সদুত্তর দিতে পারল না। এমন সময় গ্যানিমিড এসে ডিউককে বলল, ডিউক যদি নিজ কন্যার সঙ্গে অর্ল্যান্ডোর বিয়ে দিতে সম্মত হন, তবেই সে ডিউক-কন্যাকে হাজির করবে। ডিউক বললেন, “বিয়েতে যৌতুক দেওয়ার মতো রাজ্য যদি আমার হাতে থাকত, তাহলে অবশ্যই করতাম।” গ্যানিমিড অর্ল্যান্ডোকে জিজ্ঞাসা করল, “তাকে এখানে আনলে তুমি তাকে বিয়ে করবে তো?” অর্ল্যান্ডো বলল, “যদি অনেক রাজ্যের রাজা হতাম, তাহলে অবশ্যই করতাম।”

তখন গ্যানিমিড ও এলিয়েনা একসঙ্গে বেরিয়ে গেল। গ্যানিমিড তার পুরুষবেশ ত্যাগ করল। পরল নারীর বেশ। জাদুর সাহায্য ছাড়াই চকিতে সে হয়ে গেল রোজালিন্ড। এলিয়েনা তার গ্রাম্য বালিকার বেশ ত্যাগ করে রাজপোষাক পরল। সেও চকিতে হয়ে গেল লেডি সেলিয়া।

ওরা বেরিয়ে যেতেই ডিউক রাখাল গ্যানিমিডের সঙ্গে তাঁর মেয়ের চেহারাগত সাদৃশ্যের কথা বললেন অর্ল্যান্ডোকে। অর্ল্যান্ডো বলল, মিলটা সেও লক্ষ্য করেছে।

শেষকালে সবাইকে অবাক করে রোজালিন্ড ও সেলিয়া নিজ নিজ বেশে প্রবেশ করল। সবাই ভাবল জাদুর বলেই তারা সেখানে হাজির হয়েছে। কিন্তু রোজালিন্ড আর তার বাবার সঙ্গে ছলনা করল না। সে তার বাবার পায়ের কাছে হাঁটু গেড়ে বসে তাঁর আশীর্বাদ চাইল। তারপর সে তার নির্বাসন, বনে রাখালের বেশে বসবাস ও খুড়তুতো বোন সেলিয়াকে নিজের বোন বলে পরিচয় দেওয়ার কথা সব খুলে বলল।

বিবাহের জন্য দেওয়া পূর্ব অনুমতি আইনত অনুমোদন করলেন ডিউক। অর্ল্যান্ডো রোজালিন্ডকে ও অলিভার সেলিয়াকে একই দিনে বিয়ে করলেন। রাজপরিবারের বিয়েতে মহাসমারোহে কুচকাওয়াজ হয়। কিন্তু সেই বনে তেমন কিছুই করা গেল না। তা সত্ত্বেও বিবাহ উৎসবের আনন্দে এতটুকু ঘাটতি হল না। শীতল গাছের ছায়ায় ভোজসভায় তাঁরা হরিণের মাংস খেলেন। দয়ালু ডিউকের ছত্রছায়ায় প্রেমিক-প্রেমিকাদের মিলনে আনন্দের পূর্ণঘট স্থাপিত হল। এমন সময় এক দূত এল অপ্রত্যাশিত এক আনন্দ সংবাদ নিয়ে – ডিউক-রাজ্য ন্যায়সম্মত ডিউককে প্রত্যর্পিত করা হয়েছে।

মেয়ের পলায়নে যারপরনাই রেগে গিয়েছিলেন প্রবঞ্চক। তার উপর প্রতিদিনই বিশিষ্ট রাজপুরুষের আর্ডেনের বনে ন্যায়সঙ্গত ডিউকের আশ্রয়ে যোগ দিচ্ছিলেন। এত অসুবিধার মধ্যেও ন্যায়সম্মত ডিউক কীভাবে লোকের সম্মান আদায় করছিলেন দেখে দাদার প্রতি ঈর্ষা উত্তরোত্তর বৃদ্ধি পাচ্ছিল তাঁর। তিনি বিশাল এক বাহিনী গড়ে দাদাকে সপারিষদ বন্দী করার উদ্দেশ্যে বনের পথে রওনা হলেন। কিন্তু পরমেশ্বরের কৃপায় বনে প্রবেশ করার পরই ডিউকের দুষ্ট ভাইয়ের মন পরিবর্তিত হল। এক বৃদ্ধ সন্তের সঙ্গে তাঁর দেখা হয়েছিল। অনেকক্ষণ কথাও হয়েছিল দু’জনের মধ্যে। শেষ পর্যন্ত সন্ত তাঁর হৃদয়কে সম্পূর্ণ কলুষমুক্ত করতে সক্ষম হলেন। তাঁর মনে অনুতাপ জন্মাল। ঠিক করলেন, অন্যায়ভাবে দখল করা রাজ্য তিনি ত্যাগ করবেন। শেষ জীবন কাটিয়ে দেবেন কোনো ধর্মসংঘে গিয়ে। তাই প্রথমেই একজন দূত পাঠিয়ে (যার কথা বলা হল) তিনি দাদাকে তাঁর ডিউকরাজ্য ফিরিয়ে দিলেন। সেই সঙ্গে ফিরিয়ে দিলেন ডিউকের দুঃসময়ের বন্ধুবর্গের জমি ও রাজস্বভাগ।

এই অপ্রত্যাশিত আনন্দ সংবাদে রাজকন্যাদের বিবাহের উৎসবে মিলনের নতুন রং লাগল। রোজালিন্ডের বাবা ডিউকের নবলব্ধ সৌভাগ্যের জন্য সেলিয়া রোজালিন্ডকে অভিনন্দন জানাল ও আন্তরিকভাবে তার সৌভাগ্য কামনা করল। সে নিজে আর ডিউকরাজ্যের উত্তরাধিকারিণী রইল না। রোজালিন্ডের বাবা ডিউকরাজ্য ফিরে পাওয়ায় সে-ই হল রাজ্যের নতুন উত্তরাধিকারিণী। তা সত্ত্বেও দুই বোনের ভালবাসার মধ্যে এতটুকুও ঈর্ষা প্রবেশ করল না।

নির্বাসনের সময় যেসব বন্ধুরা তাঁর সঙ্গে ছিলেন, তাদের পুরস্কৃত করলেন ডিউক। এই সব বিশ্বস্ত অনুগামীরা এতদিন ধৈর্য ধরে ডিউকের দুঃসময়ের সঙ্গী হয়েছিলেন। এতদিন পরে ন্যায়সঙ্গত ডিউকের প্রাসাদে শান্তিতে ফিরতে পেরে তাঁরাও খুব খুশি হলেন।

আ মিডসামার নাইট’স ড্রিম

আ মিডসামার নাইট’স ড্রিম
মূল রচনা: উইলিয়াম শেকসপিয়র
পুনর্কথন: মেরি ল্যাম্ব
অনুবাদ: অর্ণব দত্ত
(“টেলস ফ্রম শেকসপিয়র” থেকে)

এথেন্স শহরে এক আইন ছিল। এই আইন বলে সেখানকার নাগরিকেরা নিজেদের পছন্দসই পাত্রের সঙ্গে তাদের মেয়েদের বিয়ে করতে বাধ্য করতে পারত। কোনো মেয়ে বাপের পছন্দ করা পাত্রকে বিয়ে করতে অস্বীকৃত হলে, বাপ সেই আইন প্রয়োগ করে মেয়েকে মৃত্যুদণ্ডে পর্যন্ত দণ্ডিত করার ক্ষমতা রাখত। তবে কিনা, মেয়েরা একটু-আধটু অবাধ্য হলেও, বাপেরা সাধারণত মেয়ের মৃত্যুকামনা করত না বলে, এই আইনের প্রয়োগও কদাচিৎই হত। অবশ্য, বাপ-মায়েরা তাদের কুমারী মেয়েকে এই আইনের জুজু দেখাতে ছাড়তেন না।

তবে একবার এক ঘটনা ঘটেছিল। ইজিয়াস নামে এক বৃদ্ধ এথেন্সের তৎকালীন ডিউক থিসিয়াসের কাছে নিজের মেয়ে হার্মিয়ার বিরুদ্ধে অভিযোগ জানালেন। ইজিয়াসের ইচ্ছে ছিল, হার্মিয়া ডিমেট্রিয়াস নামে এথেন্সের এক সম্ভ্রান্তবংশীয় যুবককে বিয়ে করুক। কিন্তু সে ভালবাসত লাইস্যান্ডার নামে অপর এক এথেন্সীয় যুবককে। তাই সে বাপের আদেশ অমান্য করে। ন্যায়বিচার চেয়ে ইজিয়াস তখন এলেন থিসিয়াসের কাছে। দাবি করলেন, ওই নিষ্ঠুর আইনটি প্রয়োগ করা হোক তাঁর মেয়ের উপর।

আত্মপক্ষ সমর্থন করতে গিয়ে হার্মিয়া জানালো, ডিমেট্রিয়াস তার সই হেলেনাকে ভালবাসত। হেলেনা এখনও ডিমেট্রিয়াসকে মনপ্রাণ দিয়ে ভালবাসে। কিন্তু বাপের আদেশ অমান্য করার এহেন সম্মানজনক কারণও ইজিয়াসকে টলাতে পারল না।

থিসিয়াস দয়ালু রাজা ছিলেন। কিন্তু দেশের আইন সংশোধনের ক্ষমতা তাঁর ছিল না। তিনি শুধু হার্মিয়াকে চার দিন সময় দিলেন। তাকে জানিয়ে দেওয়া হল, চার দিন পরেও যদি সে ডিমেট্রিয়াসকে বিয়ে না করার সিদ্ধান্তে অটল থাকে, তাহলে তাকে মৃত্যুদণ্ডে দণ্ডিত করা হবে।

লাইস্যান্ডার এই সব ঝুটঝামেলার কথা শুনে খুবই বিচলিত হয়ে পড়ল। কিন্তু তখনই তার মনে পড়ে গেল, এথেন্স থেকে কিছু দূরে বাস করেন তার এক মাসি। নিষ্ঠুর আইনটা যেহেতু এথেন্সের নগরসীমানার বাইরে খাটে না, সেহেতু সেখানে পালিয়ে যেতে পারলে, কেউ আর হার্মিয়াকে তার ইচ্ছের বিরুদ্ধে জোর করতে পারবে না। তাই দু’জনে ঠিক করল, হার্মিয়া চুপিচুপি তার বাড়ি থেকে পালিয়ে আসবে আর তারপর তারা লাইস্যান্ডারের মাসির বাড়ি গিয়ে তারা বিয়ে করবে। “শহর থেকে কয়েক মাইল দূরে যে বন রয়েছে, সেখানেই তোমার সঙ্গে দেখা করব। সেই যে বনে মনোহর বসন্তে আমরা হেলেনাকে নিয়ে হাঁটতে যেতাম,” লাইস্যান্ডার বলল।

হার্মিয়া সানন্দে রাজি হয়ে গেল এই প্রস্তাবে। সে তার সই হেলেনা ছাড়া আর কাউকেই তাদের পরিকল্পনার কথা জানালো না। মেয়েরা প্রেমে পড়লে কী বোকাই না হয়ে যায়! হেলেনা করল কী, মহা-অকৃতজ্ঞের মতো সব কথা ডিমেট্রিয়াসকে জানিয়ে দিল। সইয়ের সঙ্গে বিশ্বাসঘাতকতা করে তার পাওয়ার কিছুই ছিল না। শুধু নিজের লম্পট প্রেমিকের পিছু পিছু বনে যাওয়ার আনন্দটুকু পাওয়ার আশা ছিল তার, এই যা। সে জানত ডিমেট্রিয়াস হার্মিয়ার খোঁজে যাবেই।

যে বনে হার্মিয়া ও লাইস্যান্ডারের দেখা করার কথা ছিল, সেই বনটি ছিল ‘পরি’ নামে এক ধরনের ছোট্ট জীবের প্রিয় বিচরণক্ষেত্র।

পরিরাজ ওবেরন ও পরিরানি টাইটানিয়া তাঁদের সাঙ্গোপাঙ্গোদের নিয়ে সেই বনে প্রমোদবিহারে আসতেন।

যে সময়ের কথা হচ্ছে, সেই সময় পরিদের এই ছোট্ট রাজা ও রানির মধ্যে এক দুঃখজনক কলহ উপস্থিত হয়েছিল। মনোরম বনের ছায়াঘেরা চন্দ্রালোকিত পথে বিহার না করে, তাঁরা নিজেদের মধ্যে ঝগড়াঝাটি করছিলেন। আর তাইতে ভয় পেয়ে তাঁদের অনুগত ভূতপ্রেতের দল হামা দিয়ে ওক-বিচির মধ্যে লুকিয়ে পড়েছিল।

মনান্তরের কারণ ছিল, টাইটানিয়ার চুরি করে আনা একটি ছোটো ছেলে। ছেলেটির মা ছিল টাইটানিয়ার সই। সে মারা যাওয়ার পর, টাইটানিয়া ছেলেটিকে তার ধাইয়ের কাছ থেকে চুরি করে এই বনে নিয়ে এসে মানুষ করছিলেন। আর ওবেরন ছেলেটিকে নিজের বালকভৃত্য নিয়োগ করতে চাইছিলেন।

প্রেমিকযুগলের যে রাতে বনে আসার কথা, সেই রাতেই টাইটানিয়া তাঁর রাজসখিদের নিয়ে ভ্রমণ করতে করতে ওবেরন ও তাঁর অনুচরদের মুখোমুখি হন।

“জ্যোৎস্নালোকে মূর্তিমতী অকল্যাণ তুমি, হে মদমত্তা টাইটানিয়া,” বললেন পরিরাজ। টাইটানিয়া উত্তরে বললেন, “কে? হিংসুটে ওবেরন নাকি? পরিরা, দূরে থেকো। ওঁর সঙ্গে আমার সব সম্পর্ক ঘুচে গেছে জেনো।” “চোপরাও!” বললেন ওবেরন, “ভুলে যেও না, আমি তোমার স্বামী। এত সাহস তোমার, আমার মুখে মুখে কথা বলো! চুরি করে আনা ওই বাচ্চাটাকে দাও। আমি ওকে আমার বালকভৃত্য করে রাখব।”

“তোমার সে গুড়ে বালি,” টাইটানিয়া বললেন, “তোমার এই গোটা পরিরাজ্য আমাকে বেচে দিলেও আমি তোমার হাতে ছেলেটাকে ছাড়ব না।” এই বলে ক্রুদ্ধ রানি স্বামীর কাছ থেকে মুখ ফিরিয়ে চলে গেলেন। ওবেরন বললেন, “যাও, যেখানে ইচ্ছে যাও। কিন্তু জেনে রেখো, কাল সূর্য ওঠার আগেই আমি এই অপমানের শোধ তুলব।”

ওবেরন ডেকে পাঠালেন তাঁর প্রিয় অনুচর তথা প্রধান পার্ষদ পাককে।

পাক ছিল এক দুষ্টু ভূত। কেউ কেউ তাকে ডাকত ‘ভালমানুষ ভূত’ নামে। আশেপাশের গ্রামবাসীদের অতিষ্ট করে সে মজা পেত। কখনও গব্যশালায় ঢুকে দুধের উপর ভেসে বেড়াত। হালকা বায়বীয় রূপ ধরে ডুব লাগাতো মাখন মন্থনের পাত্রে। গোয়ালিনী মাখন মন্থনের চেষ্টা করত। কিন্তু পাক সেখানে এমন নৃত্য জুড়ে দিত যে, তার সব চেষ্টাই বৃথা যেত। বাদ যেত না গ্রামের ধাতুশিল্পীরাও। পাকের দুষ্টুমিতে তামা নিষ্কাষণ তাদের পক্ষে দুঃসাধ্য হয়ে উঠত। পড়শিরা এক সঙ্গে মদ খেতে বসলে, পাক কাঁকড়া-কাবাবের আকার ধারণ করে ঝাঁপ দিত মদের গ্লাসে। কোনো ভালমানুষ বুড়ি চুমুক দিলেই, তার ঠোঁট ধরে ঝুলে পড়ত পাক। বুড়ির ঝুলে-পড়া চিবুক বেয়ে সব মদ গড়িয়ে পড়ে যেত। পরে বুড়ি পড়শিদের কাছে নিজের দুঃখের বৃত্তান্ত শোনাতে গেলে, পাক এক হ্যাঁচকায় বুড়ির বসার তেপায়াটা টেনে নিত। ধপাস করে বুড়ি পড়ত মাটিতে। সবাই হো হো করে হেসে উঠত। যেন এত মজার আর কিছুই কোনোদিন দেখেনি তারা।

ওবেরন তাঁর খোসমেজাজি নিশাচর ভৃত্যটিকে ডাক দিলেন, “পাক, এদিকে এসো। যে ফুলকে মেয়েরা ‘আলসেমির প্রেম’ নামে ডাকে, আমাকে সেই ফুল এনে দাও। সেই ছোট্ট লালচে ফুলটির রস কোনো ঘুমন্তের চোখে ঢেলে দিলে, ঘুম ভাঙার পর সে প্রথম যাকে দেখে, তারই প্রেমে পড়ে যায়। টাইটানিয়া যখন ঘুমাবে, তখন আমি তার চোখে সেই রস ঢেলে দেবো। ঘুম থেকে উঠে সে প্রথম যাকে দেখবে, সিংহ, ভালুক, বদমাস বাঁদর বা নোংরা বনমানুষ হলেও, তারই প্রেমে পড়ে যাবে সে। তখন তার থেকে বাচ্চাটাকে আদায় করব। তারপর বিপরীত জাদু প্রয়োগ করে তার আগের জাদু ফিরিয়ে নেব আমি।”

দুষ্টুমি পাকের খুব প্রিয় ছিল। প্রভুর দুষ্টুবুদ্ধির কথা শুনে সে তাই আহ্লাদে আটখানা হয়ে ছুটল ফুল আনতে। ওবেরন পাকের জন্য অপেক্ষা করছেন, এমন সময় দেখলেন ডিমেট্রিয়াস ও হেলেনা বনে ঢুকছে। চুপিচুপি তাদের কথা শুনতে লাগলেন তিনি। পিছু নেওয়ার জন্য ডিমেট্রিয়াস খুব কড়া ভাষায় হেলেনাকে তিরস্কার করছিল। মৃদু প্রতিবাদ করে হেলেনা তাকে মনে করিয়ে দিচ্ছিল যে, একদিন হেলেনাকেই ডিমেট্রিয়াস তার সত্যিকারের প্রেমিকা বলে মেনে নিয়েছিল। ডিমেট্রিয়াস হেলেনাকে বন্য জন্তুর দয়ায় ছেড়ে দিয়ে চলে গেল। হেলেনাও যত দ্রুত সম্ভব তার পিছু নিল।

পরিরাজ সত্যকারের প্রণয়ীদের খুব ভালবাসতেন। হেলেনার প্রতি তাঁর দয়া হল। লাইস্যান্ডার বলেছিল, তারা হেলেনাকে নিয়ে তাদের সুখের দিনে এই বনে বেড়াতে আসত। ডিমেট্রিয়াস তখন ভালবাসত হেলেনাকে। হয়ত সেই সময়েই পরিরাজ তাকে দেখে থাকবেন। সে যাই হোক, পাক ফুল নিয়ে এলে ওবেরন তাঁকে বললেন, “বনে একটি মিষ্টি এথেন্সীয় মেয়ে এসেছে। তার প্রেমিকটি অত্যন্ত অকৃতজ্ঞ। এই ফুলের একটা অংশ নিয়ে যাও। ছেলেটিকে দেখতে পেলে, তার চোখেও এই প্রেমসুধারস একটু ঢেলে দিও। এমন সময় কোরো যখন মেয়েটি তার কাছাকাছি থাকবে। আর খেয়াল রেখো যাতে ঘুম থেকে উঠে মেয়েটিকেই আগে দেখতে পায় সে। দেখবে, ছেলেটা এথেন্সীয় পোষাক পরে আছে। তাই দেখেই চিনতে পারবে।” হাত-পা নেড়ে পাক জানিয়ে দিল, সে সব সামলে নেবে। তারপর ওবেরন চুপিচুপি গেল টাইটানিয়ার নিকুঞ্জে। টাইটানিয়া সেখানে বিশ্রাম নেওয়ার তোড়জোড় করছিলেন। উডবাইন, মাস্ক-রোজ আর ইগলেন্টাইনের চাঁদোয়ার নিচে বুনো টাইম লতা, কাউস্লিপ ফুল ও মিষ্টি ভায়োলেট ফুলের ঝোড়ের মাঝখানে ছিল টাইটানিয়ার নিকুঞ্জশয্যা। রাতের কিছুটা সময় সেখানে সাপের খোলস ঢাকা দিয়ে ঘুমাত টাইটানিয়া। খোলসটা ছোটো হলেও, টাইটানিয়ার তাতেই বেশ চলে যেত।

ওবেরন দেখলেন, রানি ঘুমানোর পর কে কী করবে, তার নির্দেশ পরিদের দিয়ে রাখছেন টাইটানিয়া। বলছিলেন, “তোদের মধ্যে কেউ মাস্ক-রোজের কুঁড়ির মধ্যে ঢুকে পোকা মারবি। কেউ বাদুড়ের সঙ্গে যুদ্ধ করে তার চামড়া ছাড়িয়ে আনবি। সেই চামড়ায় আমার ভূতেদের জন্য জামা বানাবি। কেউ নজর রাখবি ওই হুল্লোড়বাজ প্যাঁচাটার উপর। দেখিস, ওর ডাক যেন আমার কানে না আসে। কিন্তু সবার আগে আমাকে একটা গান শোনা।” তখন পরিরা তাকে এই গানটি শোনালো –

তুমি সাপকে জিভ দিয়েছো দু-দু’খানা
কাঁটাচুয়া করেছো গায়েব;
গোসাপ আর কানা-পোকারা, দুষ্টুমি কোরো না,
যাও, যাও, ঘুমান মোদের রানিসাহেব।
ফিলোমেল, ধরো তান,
শোনাও একটা ঘুমপাড়ানি গান
ঘুমপাড়ানি ঘুমপাড়ানি ঘুমপাড়ানি গান
ক্ষতি নয়, জাদু নয়, নয় কোনো মন্তর
মোদের পরিরানির কাছে আসুক নিরন্তর
রাত্রি মনোহরা আর ঘুমপাড়ানি গান।

এই মিষ্টি গানখানি শুনিয়ে পরিরা তাদের রানিকে ঘুম পাড়িয়ে দিল। তারপর চলে গেল যে যার কাজ সারতে। ওবেরন ধীরে ধীরে এগিয়ে এলেন টাইটানিয়ার কাছে। খানিকটা প্রেমরস ঢেলে দিলেন তাঁর চোখে। বললেন –

“নিদ্রাভঙ্গে দেখবে যাকে সবার আগে,
তার সঙ্গে বাঁধা পড়বে প্রেম-অনুরাগে।”

এবার দেখি কী করছে হার্মিয়া। সে তো বাপের কথা অমান্য করে ডিমেট্রিয়াসকে বিয়ে না করার সিদ্ধান্তে অটল। তাই মৃত্যুদণ্ড এড়াতে বাড়ি থেকে পালিয়ে বনে এসে দেখল, তাকে মাসির বাড়ি নিয়ে যাওয়ার জন্য অপেক্ষা করছে লাইস্যান্ডার। কিন্তু অর্ধেক পথ যেতে না যেতেই ক্লান্তিতে পা অবশ হয়ে এল তার। লাইস্যান্ডার তার খুব যত্ন করত। তাই সে ঠিক করল, সকাল না হওয়া অবধি বনেই বিশ্রাম করবে দু’জনে। নরম ফার্নের উপর শুয়ে হার্মিয়া আর তার কিছুদূরে শুয়ে লাইস্যান্ডার ঘুমিয়ে পড়ল। এমন সময় পাক দেখতে পেল তাদের। প্রভুর কথা মিলিয়ে সে দেখল, এথেন্সীয় পোষাক পরা এক যুবক একটি সুন্দরী মেয়ের কিছুদূরে শুয়ে ঘুমাচ্ছে। একসঙ্গে থাকলেও, দু’জনে শুয়েছিল আলাদা হয়ে। পাক ভাবল, তার প্রভু এদের কথাই বলেছেন তাঁকে। ঘুম থেকে উঠে যুবকটি সবার আগে মেয়েটিকে দেখবে। তাই আর কিছু না ভেবে, তার চোখেই প্রেমসুধারস ঢেলে দিল পাক। কিন্তু হল কী, হার্মিয়ার বদলে লাইস্যান্ডারের চোখে পড়ে গেল হেলেনা। হেলেনা সেখান দিয়ে যাচ্ছিল। ঘুম ভেঙে তাকে সবার আগে দেখে লাইস্যান্ডারের মন থেকে হার্মিয়ার প্রতি প্রেম গেল উবে। মায়াবলে পড়ল সে হেলেনার প্রেমে।

ঘুম ভেঙে আগে হার্মিয়াকে দেখলে লাইস্যান্ডারকে পাকের এই ভুলের খেসারত দিতে হত না। সে তো আর তার প্রিয়তমাকে বাড়তি ভালবাসতে পারে না। কিন্তু কী আর করা! তার কপালে ছিল, নিজের সত্যিকারের প্রেমিকা হার্মিয়াকে ভুলে বনের মধ্যে মাঝরাতে একা ফেলে অন্য একটি মেয়ের পিছনে ধাওয়া করা!

দুর্ঘটনাটা কীভাবে ঘটল, তা বলি। যেমনটি একটু আগে বলছিলাম, হেলেনা ডিমেট্রিয়াসের সঙ্গে তাল মিলিয়ে চলার চেষ্টা করছিল। ডিমেট্রিয়াস তো তাকে ফেলেই দৌড়ে বেড়াচ্ছিল। সেই দৌড়ে তাল মেলাতে পারছিল না হেলেনা। অল্পক্ষণ পরেই ডিমেট্রিয়াস তার দৃষ্টিপথের বাইরে চলে গেল। হতোদ্যম হয়ে একলা ঘুরতে ঘুরতে সে হাজির হল যেখানে লাইস্যান্ডার ও হার্মিয়া ঘুমাচ্ছিল। হেলেনা বলে উঠল, “এ কী! এ যে লাইস্যান্ডার! মাটিতে শুয়ে কেন? ঘুমাচ্ছে? নাকি মারা গেছে?” তারপর তাকে আলতো করে ছুঁয়ে বলল, “দোহাই আপনার, বেঁচে থাকলে চোখ মেলে তাকান।” লাইস্যান্ডার চোখ মেলে চাইল। সঙ্গে সঙ্গে শুরু হল প্রেমরসের জাদু। তক্ষুনি লম্বাচওড়া প্রেমের কথা বলে সে হেলেনার প্রতি প্রেমনিবেদন শুরু করে দিল। বলল, হেলেনার পাশে হার্মিয়াকে মনে হয়, সাদা পায়রার পাশে দাঁড়কাক। বলল, হেলেনাকে পেতে সে আগুনের উপর দিয়ে হাঁটতেও রাজি। আরও কত রকম প্রেমিক-সুলভ ভাষণ দিল সে। হেলেনা জানত, লাইস্যান্ডার তার সই হার্মিয়ার প্রেমিক ও পাণিপ্রার্থী। নিজের সম্পর্কে ওই সব কথা শুনে তার ভারি রাগ হল। ভাবল, লাইস্যান্ডার তাকে নিয়ে মজা করছে। বলেই ফেলল, “হায়! কেন জন্মালাম আমি? সকলের উপহাসের পাত্রী হওয়ার জন্য? ডিমেট্রিয়াস আমার দিকে তাকায় না। ভাল করে কথাও বলে না। সেটাই কী যথেষ্ট নয়? সেটাই কী যথেষ্ট নয় যে আপনি মশাই উড়ে এসে আমার সঙ্গে এই রকম অপমানকর খেজুরে প্রেমালাপের নাটক জুড়ে দিলেন? লাইস্যান্ডার, আপনাকে আমি ভদ্রলোক মনে করেছিলাম!”  রাগে মাথায় কথাগুলি ছুঁড়ে দিয়েই জোরে হাঁটা দিল হেলেনা। লাইস্যান্ডার ঘুমন্ত হার্মিয়াকে পিছনে ফেলে পিছু নিল তার।

ঘুম থেকে উঠে নিজেকে একা দেখে খুব ভয় পেয়ে গেল হার্মিয়া। সে বনের মধ্যে ঘুরতে লাগল। সে তো জানত না যে, লাইস্যান্ডারের কী হয়েছে বা কোথায় গেলে সে তার দেখা পাবে। এদিকে ওবেরন দেখলেন, হার্মিয়া ও প্রতিদ্বন্দ্বী লাইস্যান্ডারকে খুঁজে না পেয়ে বৃথা অন্বেষণ ছেড়ে ঘুমিয়ে পড়েছে ডিমেট্রিয়াস। পাককে প্রশ্ন করে ওবেরন বুঝতে পারলেন যে, পাক ভুল লোকের চোখে প্রেমরস ঢেলেছে। তাই নিজে গিয়ে যে যুবকটিকে তিনি খুঁজছিলেন, তার চোখে প্রেমরস ঢেলে দিলেন তিনি। ডিমেট্রিয়াসের ঘুম ভেঙে গেল। সে প্রথমেই দেখল হেলেনাকে। দেখামাত্র, লাইস্যান্ডারের মতো সেও হেলেনাকে উদ্দেশ্য করে প্রেমিক-সুলভ বক্তৃতা দিতে লেগে গেল। পিছন পিছন ছুটে এল হার্মিয়াও। পাকের দুঃখজনক ভুলের ফলে এখন তাকে তার প্রেমিকের পিছন ছুটে ছুটে বেড়াতে হচ্ছিল। এদিকে জাদুর বশে লাইস্যান্ডার আর ডিমেট্রিয়াস দু’জনেই হেলেনাকে উদ্দেশ্য করে প্রেম নিবেদন করছিল তখন।

হেলেনা তো হতবাক! সে ভাবল, লাইস্যান্ডার, ডিমেট্রিয়াস ও তার এক সময়কার সই হার্মিয়া মিলে ছক কষে তার পিছনে লেগেছে।

হার্মিয়াও হেলেনার অবস্থা দেখে অবাক। লাইস্যান্ডার ও ডিমেট্রিয়াস – দু’জনেই তখন হেলেনার স্তব করতে ব্যস্ত। হার্মিয়া কিছুতেই বুঝে উঠতে পারছিল না যে, কিসের টানে দু’জনে এক সঙ্গে হেলেনার দিকে ঝুঁকে পড়ল।

একদা অভিন্ন-হৃদয় সই হার্মিয়া ও হেলেনা পরস্পরকে তখন চোখা চোখা বাক্যবাণে বিদ্ধ করতে লাগল।

হেলেনা বলল, “নির্দয়া হার্মিয়া! তুমিই তোমার প্রেমিক লাইস্যান্ডারকে আমার পিছনে মিথ্যে প্রেম নিবেদন করার জন্য লাগিয়েছ। আর তোমার অপর প্রেমিক ডিমেট্রিয়াস, যে আমাকে লাথি মারতে বাকি রেখেছিল, সে এখন আমাকে বলছে দেবী, জলপরি, দুর্লভ, বহুমূল্য, স্বর্গীয়! কেন? কারণ, তুমিই তাকে পাঠিয়েছ, আমার পিছনে লাগতে! নির্দয়া হার্মিয়া! দু’জন পুরুষমানুষের সঙ্গে হাত মিলিয়ে তোমার এই হতভাগিনী সইয়ের পিছনে লাগতে লজ্জা হয় না তোমার? আমাদের পাঠশালার বন্ধুত্বের কথা ভুলে গেলে? হার্মিয়া, কতদিন আমরা এক আসনে বসে একসঙ্গে গান গাইতাম। একই সুতো দিয়ে মালা গাঁথতাম। জোড়া চেরিফলের মতো বেড়ে উঠেছি আমরা। আমাদের দু’জনকে আলাদা করা যেত না। আর আজ, দু’জন পুরুষমানুষকে হাত করে সইয়ের অপমান করা কী নারীসুলভ কাজ বলে তোমার মনে হয়?”

হার্মিয়া বলল, “বাহ্! তোমার এই মিষ্টি মিষ্টি কথাগুলি তো আমাকে অবাক করছে! আমি তোমার পিছনে লেগেছি? না তুমি আমার পিছনে লেগেছ?” হেলেনা পালটা বললে, “হ্যাঁ, বলো বলো! সামনে গম্ভীর মুখে আমাকে কড়া কড়া করে বলো, আর আমি পিছন ফিরলেই একে অপরের দিকে চোখ টিপে দাও আর পিছনে লাগার মজা লোটো! শরীরে বিন্দুমাত্র দয়া, মহত্ব, ভদ্রতা থাকলে কী আর আমাকে নিয়ে এমন বিশ্রী খেলা খেলতে পারতে?”

হার্মিয়া আর হেলেনা ঝগড়া করতে লাগল। এদিকে লাইস্যান্ডার আর ডিমেট্রিয়াস তাদের ছেড়ে বনে ঢুকল, লড়াই করে হেলেনাকে জয় করার অভিপ্রায় নিয়ে।

পরে যখন হার্মিয়া আর হেলেনার খেয়াল হল যে ছেলেরা তাদের ছেড়ে গেছে, তখন দু’জনে ঝগড়া থামিয়ে বনের মধ্যে নিজের নিজের প্রেমিকের সন্ধানে ঘুরতে লাগল।

পরিরাজ তাঁর ছোট্ট পাককে নিয়ে তাদের ঝগড়া শুনছিলেন। তারা চলে যেতেই তিনি পাককে বললেন, “এটা হয় তোর দোষ, নয় তোর বদমায়েশি!” পাক বলল, “বিশ্বাস করুন, অন্ধকারের রাজা, ভুল হয়ে গেছে। আপনি বলেছিলেন, এথেন্সীয় পোষাক দেখে ছেলেটিকে চিনতে। আমি তাই দেখেই ভুল করেছি। তবে কিনা, এই ভুলের জন্য একটুও দুঃখিত নই। ওদের ঝগড়াঝাটি দেখে বেশ মজা হচ্ছে।” ওবেরন বললেন, “শুনলি তো, লাইস্যান্ডার আর ডিমেট্রিয়াস মল্লযুদ্ধের উপযুক্ত জায়গা খুঁজতে গেছে। আমার আদেশ রইল, রাত্রিকে কুয়াশাচ্ছন্ন করে দে। প্রেমিকেরা এই কুয়াশায় পথ হারাক। তারা যেন একে অপরকে খুঁজে না পায়। তুই একজনকে তার প্রতিদ্বন্দ্বীর গলায় ডাক দিবি। তাকে উসকাবি। সে শত্রুর পিছু নিচ্ছে মনে করে তোর পিছু নেবে। ক্লান্ত না হওয়া পর্যন্ত তাদের ছোটাছুটি করাবি। তারপর তারা ক্লান্ত হয়ে ঘুমিয়ে পড়লে, লাইস্যান্ডারের চোখে এই অপর ফুলের রসটি ঢেলে দিবি। এতে হেলেনার প্রতি তার আকর্ষণ নষ্ট হয়ে যাবে। আবার সে হার্মিয়ার প্রতি তার পূর্বপ্রেম ফিরে পাবে। মেয়েদুটিও তাদের পছন্দসই পুরুষকে প্রেমিক হিসেবে পাবে। তখন এই সব ঘটনা তাদের স্বপ্ন মনে হবে। আমি যাই। দেখি, টাইটানিয়া আবার কোন মিষ্টি প্রেমিকের প্রেমে পড়ল!”

টাইটানিয়া তখনও ঘুমাচ্ছিলেন। ওবেরন দেখলেন, একটা ভাঁড় বনের মধ্যে পথ হারিয়ে সেখানেই শুয়ে ঘুমাচ্ছে। তিনি বললেন, “এই ছোঁড়াই আমার টাইটানিয়ার প্রেমিক হওয়ার যোগ্য!” এই বলে তিনি চট করে জাদুবলে ভাঁড়ের মাথাটা গাধার মতো করে দিলেন। তার কাঁধের উপর গাধার মাথাটা দারুণ মানিয়ে গেল। তবু কাজটা করার সময় তার ঘুম ভেঙে গেল। ওবেরনের কেরামতি অবশ্য সে ধরতে পারল না। সোজা চলে গেল নিকুঞ্জে, যেখানে পরিরানি ঘুমাচ্ছিলেন।

চোখ খুলতেই সেই ছোট্ট লালচে ফুলের জাদুর বশ হলেন টাইটানিয়া, “অহো, কোথাকার দেবদূত ও? তুমি কী সুন্দর? আচ্ছা, তুমি কী যেমন রূপবান, তেমনই বুদ্ধিমান?”

বোকা ভাঁড় বলল, “কেন, মহাশয়া? আপাতত এই বন থেকে বার হওয়ার পথ বের করার মতো বুদ্ধিটুকু পেলেই চলে যায়!”

মোহগ্রস্থা রানি বলে উঠলেন, “তুমি বনের বাইরে যেতে চেয়ো না। আমি সামান্যা পরি নই। আমি তোমাকে ভালবেসে ফেলেছি। আমার সঙ্গে এসো। এখন আমার পরিরা তোমার সেবাযত্ন করবে।”

তখন রানি তাঁর চার পরিকে নাম ধরে ডাকলেন। এরা হল মটরফুল, লূতাতন্তু, মথ ও সরষে-বীজ।

রানি বললেন, “এই ভদ্রলোকের সেবা কর। হাঁটার সময় এঁর আগে আগে যা। এঁর চোখের সামনে নৃত্য কর। এঁকে আঙুর আর খুবানি খাওয়া। আর এঁর জন্য মৌচাক ভেঙে মধু চুরি করে আন।” তারপর ভাঁড়কে বললেন, “এসো, আমার পাশে বসো। হে গর্দভ-সুন্দর, আমি তোমার মধুর রোমশ গালদু’টি নিয়ে খেলা করি! হে আমার কোমলানন্দ, এসো, আমি তোমার লম্বা লম্বা কানদুটি চুম্বন করি!”

গর্দভমুণ্ড ভাঁড় পরিরানির প্রেম নিবেদনকে অতটা গ্রাহ্য করল না। নতুন সেবাদাসেদের পেয়ে তার ভারি গর্ব হচ্ছিল। সে জিজ্ঞাসা করল, “মটরফুল, কোথায় আছিস?”

ছোট্ট মটরফুল উত্তর দিল, “এই যে মহাশয়, আমি এখানে।”

“আমার মাথাটা চুলকে দে তো,” বলল ভাঁড়। “লূতাতন্তু কোথায়?”

“এই যে এখানে, মহাশয়,” বলল লূতাতন্তু।

“বাবা লূতাতন্তু,” বোকা ভাঁড়টা বললে, “ওই থিসল পাতার উপর বসা ছোট্ট লাল মৌমাছিটাকে মেরে আমাকে মৌচাকটা এনে দে তো। দেরি করিসনি। আর দেখিস, যেন ভেঙে না যায়। চটকে গেলে আমি কিন্তু খুব কষ্ট পাব। সরষে-বীজ কোথায়?”

“এইখানে, মহাশয়,” বলল সরষে-বীজ। “কী করতে হবে বলুন।”

“কিছুই না,” বলল ভাঁড়, “বাছা সরষে-বীজ, তুই মটরফুল বাবাজিকে আমার মাথা চুলকাতে সাহায্য কর। বাছা সরষে-বীজ রে, মনে হচ্ছে আমাকে এবার নাপিতের কাছে যেতেই হবে। মুখে অনেক চুল গজিয়েছে।”

রানি বললেন, “প্রিয়তম, কী খাবে বলো। আমার এক পরি তোমাকে একপাল কাঠবিড়ালি আর তাজা বাদাম এনে দিতে পারে।”

যার মাথা গাধার, তার ক্ষুদপিপাসাও গাধারই মতো! ভাঁড় বলল, “বরং একমুঠো শুকনো মটর খাই। কিন্তু শোনো, তোমার এই লোকগুলোকে ছুটি দাও। এরা যেন আমাকে বিরক্ত না করে। একটু ঘুমাতে ইচ্ছে করছে।”

রানি বললেন, “ঘুমাও তবে; আমার বাহুতে মাথা রেখে ঘুমাও। আমি হাত দিয়ে তোমায় বাতাস করি। আহা! আমি তোমায় কতই না ভালবাসি! কতই না চাই!”

ভাঁড়টা রানির বাহুতে মাথা রেখে ঘুমাচ্ছে, এমন সময় পরিরাজ চুপিচুপি গিয়ে হাজির হল রানির সামনে।

ভাঁড়টা রানির হাতে মাথা রেখে ঘুমাচ্ছিল। রানি তার গাধামুণ্ড ফুল দিয়ে সাজিয়ে দিয়েছিলেন। তা অস্বীকার করতে পারলেন না।

ওবেরন রানিকে উপহাস করতে লাগলেন। চুরি করে আনা ছেলেটিকে দাবি করতে লাগলেন। স্বামী তাঁর নয়া প্রেমিকের সন্ধান পেয়ে গেছেন দেখে, টাইটানিয়া পড়লেন মহালজ্জায়। তিনি আর ওবেরনকে প্রত্যাখ্যান করতে সাহস পেলেন না।

এইভাবে অনেকদিন ধরে চাইতে থাকা ছেলেটিকে বালকভৃত্য করার জন্য পেয়ে গেলেন ওবেরন। তখন টাইটানিয়ার অবস্থা দেখে তাঁর দয়া হল। তিনি টাইটানিয়ার চোখে অপর ফুলটির রস বুলিয়ে দিলেন। পরিরানি ফিরে পেলেন তাঁর চেতনা। কী এক অদ্ভুত দৈত্যের প্রেমে তিনি পড়েছিলেন, সেই কথাই বার বার বলতে লাগলেন।

ওবেরন ভাঁড়ের মাথা থেকে গাধার মুণ্ডুখানা সরিয়ে নিলেন। সে তার পুরনো মাথাটা ঘাড়ের উপর নিয়ে বোকাটা বাকি ঘুমটা ঘুমালো।

পূর্ণমিলনের পর ওবেরন টাইটানিয়াকে প্রেমিক-প্রেমিকাদের ইতিকথা আর তাদের ঝগড়ার বৃত্তান্ত শোনালেন। পাক তার আগের ভুল সংশোধন করে নিয়েছিল। সে সবাইকে একে অপরের অজ্ঞাতসারে এক জায়গায় এনে ফেলে পরিরাজের দেওয়া ওষুধের সাহায্যে সযত্নে লাইস্যান্ডারের চোখ থেকে আগের জাদুটি মুছে ফেলেছিল।

প্রথম ঘুম ভাঙল হার্মিয়ার। সে দেখল, তার হারানো প্রেমিক লাইস্যান্ডার তার কাছে শুয়ে ঘুমাচ্ছে। সে অবাক হয়ে তাকিয়ে রইল তার দিকে। লাইস্যান্ডার ঘুম থেকে উঠে সর্বাগ্রে দেখল হার্মিয়াকেই। দেখামাত্র পরির জাদুতে সে হার্মিয়ার প্রতি তার হারানো প্রেম ফিরে পেল। তখন সকালে তাদের নৈশ অভিযান নিয়ে আলোচনা করতে লাগল। ভাবতে লাগল, এই সব সত্যি ঘটেছে, নাকি সবটাই একটা উটকো স্বপ্ন।

হেলেনা ও ডিমেট্রিয়াসেরও ঘুম ভাঙল। রাতে ঘুমিয়ে হেলেনার সব ক্ষোভ মুছে গিয়েছিল। ডিমেট্রিয়াস তখনও তাকে প্রেমনিবেদন করছিল। শুনে হেলেনার ভারি আনন্দ হল। ডিমেট্রিয়াসের কথাগুলি আচমকা তার কাছে বিশ্বাসযোগ্য মনে হতে শুরু করল। তাতে সে অবাক হলেও অখুশি হল না।

সুন্দরীদের মনেও আগের রাতের ঝগড়ার কোনো রেশ রইল না। তারা আবার প্রাণের সইতে পরিণত হল। আগের রাতের সব কড়া কথাগুলি ক্ষমা করে দিল। সবাই একসঙ্গে বসে ভাবতে লাগল, এবার কী করা যায়। তারা ঠিক করল, ডিমেট্রিয়াস হার্মিয়ার উপর থেকে তার দাবি প্রত্যাহার করে নেবে। সে হার্মিয়ার বাপের কাছে গিয়ে হার্মিয়ার উপর থেকে মৃত্যুদণ্ড তুলে নেওয়ার আর্জিও জানাবে। বন্ধুকৃত্য করার জন্য ডিমেট্রিয়াস যখন এথেন্সে ফেরার তোড়জোড় করছে, এমন সময় পলাতকা মেয়ের খোঁজ করতে করতে তাদের কাছে হাজির হলেন হার্মিয়ার বাপ ইজিয়াস।

ইজিয়াস বুঝলেন, ডিমেট্রিয়াস আর তার মেয়েকে বিয়ে করতে চায় না। তখন আর তিনি লাইস্যান্ডার ও হার্মিয়ার বিয়েতে আপত্তি জানালেন না। কিন্তু বললেন, বিয়ে হবে চার দিন পরে। সেই দিনই হার্মিয়ার মৃত্যুদণ্ড কার্যকর হওয়ার কথা ছিল। হেলেনাও সেই দিনই তার প্রিয়তম ও অধুনা-বিশ্বস্ত প্রেমিক ডিমেট্রিয়াসের সঙ্গে পরিণয় বন্ধনে আবদ্ধ হতে চাইল।

পরিরাজ ও পরিরানি অদৃশ্য থেকেই তাদের মিলনের সাক্ষী হয়ে রইলেন। দেখলেন তাদের প্রেমকাহিনির মিলনান্তক সমাপ্তি। এই মিলনে তাঁরা এতই খুশি হলেন যে, তাদের বিবাহ উপলক্ষ্যে সারা পরিরাজ্যে উৎসব পড়ে গেল।

এখন শোনো। কারোর যদি পরিদের এই দুষ্টুমি পছন্দ না হয়, কারোর যদি এই সব ঘটনা অবিশ্বাস্য আজগুবি মনে হয়, তাহলে তারা যেন তাদের নিজেদের স্বপ্নগুলির কথা স্মরণ করে। তারাও তো ঘুমিয়ে ঘুমিয়ে এমনই সব অভিযানের স্বপ্ন দেখে। তাই আশা করব, পাঠকেরা কেউই এই মিষ্টিমধুর নিরীহ চৈতালি রাতের স্বপ্নটিকে মনগড়া ভাববেন না।

টুয়েলফথ নাইট

দুই জমজ ভাই-বোন ভায়োলা আর সেবাস্টিয়ান বাস করত গ্রিসের মেসালিনা শহরে। এত সুন্দর তারা দেখতে যে একবার নজর পড়লে আর চোখ ফিরিয়ে নেওয়া যায় না। দুজনের মধ্যে এত মিল যে পোশাক পরার পর মাঝে মাঝে চেনা যায় না কে ভায়োলা আর কে সেবাস্টিয়ান। দুজনে খুব ছোটোবেলায় হারিয়েছে তাদের বাবা-মাকে। এমন কোনও আপনজন নেই বাড়িতে যে ওদের স্নেহ-ভালোবাসা দিয়ে ভরিয়ে দেবে। তাই ওরা নিজেরাই নিজেদেরকে ভালোবাসে। এক মুহূর্ত একে অন্যকে দেখতে না পেলে ছটফট করে ওঠে তারা।

ধীরে ধীরে বড়ো হয়ে উঠতে লাগল। তারা। যৌবনে পা দিয়ে একদিন তারা চেপে বসােল এক যাত্রীবাহী জাহাজে–গন্তব্যস্থল ইলিরিয়া। স্বাভাবিকভাবে কেটে গেল পুরো দু-দিন দু-রাত। তৃতীয় দিন ইলিরিয়ার উপকূলে এসে পৌঁছাল তাদের জাহাজ। সন্ধের পর আকাশের এক কোণে দেখা গেল একটুকরো ঘন কালো মেঘ। থমথমে হয়ে গেল অভিজ্ঞ ক্যাপ্টেন আর মাঝি-মাল্লাদের মুখ। কিছুক্ষণের মধ্যেই সে কালো মেঘ দৈত্যের মতো ফুলে-ফোঁপে উঠে ছেয়ে ফেলল। সারা আকাশ –মুহূর্তের মধ্যে শুরু হয়ে গেল প্রচণ্ড ঝড়-বৃষ্টি। মনে হল ঝড়ের দাপটে উড়ে যাবে গোটা জাহাজটা। অনেক কষ্টে মাঝি-মাল্লাদের সাহায্যে জাহাজটা নিয়ন্ত্রণে রাখলেন ক্যাপ্টেন। এবার সমুদ্র উত্তাল হয়ে উঠল ঝড়-বৃষ্টির সাথে পাল্লা দিয়ে। পাহাড়ের মতো উচু উঁচু ঢেউ এসে আছড়ে পড়ল জাহাজের উপর। প্রচণ্ড ঢেউয়ের আঘাতে ভেঙে গেল জাহাজের মাস্তুল, ছিড়ে টুকরো টুকরো হয়ে গেল পোল। মাঝি-মাল্লা আর যাত্রীদের নিয়ে অসহায়ভাবে জাহাজটা দুলতে লাগল ঢেউয়ের মাথায় ইলিরিয়ার তীরবতী হবার পর জাহাজটিকে আর বাঁচীন সম্ভব হল না। ক্যাপ্টেনের পক্ষে। ডুবে গেল জাহাজটা। অধিকাংশ মাঝি-মাল্লা আর যাত্রীরা জাহাজের সাথেই তলিয়ে গেল সমুদ্রের অতলে। ক্যাপ্টেন আর সামান্য কজন মাঝি-মাল্লার সাথে ছোটো একটা নৌকায় উঠে কোনও মতে প্ৰাণ বাঁচোল ভায়োলা। তীরে উঠেই তার মনে প্রশ্ন জাগল ভাই সেবাস্টিয়ান বেঁচে আছে কিনা।

সে জিজ্ঞেস করল ক্যাপ্টেনকে, আমার ভাই সেবাসিন্টয়ান কি বেঁচে আছে?

তাকে আশ্বস্ত করে ক্যাপ্টেন বললেন, সম্ভবত সে বেঁচে গেছে। জাহাজ ডুবির সময় লক্ষ করেছিলাম। সে একটা মাস্তুলের সাথে নিজেকে বেঁধে নিয়েছে। মনে হয়, সমুদ্রের ঢেউই তাকে তীরে এনে ফেলেছে। আশা করি, ঈশ্বরের কৃপায় সে ভালোই আছে।

ক্যাপ্টেনের কাছে জানতে চাইল ভায়োলা, আপনি কি এ জায়গাটা চেনেন?

সেটা এখান থেকে তিন ঘণ্টার পথ। ক্যাপ্টেনের কথা শুনে কিছুটা আশ্বস্ত বোধ করল ভায়োলা।

 

এবার ভাবনা এল ভায়োলার মনে; সাথে তো টাকা-কড়ি মোটেও নেই। এই বিদেশ-বিভূইয়ে কোথায় বা যাবে সে আর কেই বা তাকে সাহায্য করবে! একমাত্র ভাই-ই ছিল তার আশা-ভরসা। সে আদপে বেঁচে আছে কিনা আর বেঁচে থাকলেও সে কোথায় আছে তা জানে না! ভায়োলা। কাজেই নিজের ব্যবস্থা যে নিজেকেই করতে হবে তা স্পষ্ট বুঝতে পারল সে। দেশে ফিরে যাবার ব্যবস্থাও করতে হবে তাকেই। কিন্তু এই অজানা জায়গায় কে দেবে তাকে চাকরি? কী করে অর্থে পার্জন করবে। সে? তদুপরি সে একজন যুবতি মেয়ে। কাজের ধান্দায় রাস্তার বেরুলে অন্যরকম কিছু ঘটার সম্ভাবনা থেকে যায়।

সে ক্যাপ্টেনের কাছে জানতে চাইল, কে এই দেশের শাসক?

ক্যাপ্টেন উত্তর দিলেন, ডিউক অর্সিনো।

ভায়োলা জানতে চাইল, তিনি কী ধরনের লোক?

ক্যাপ্টেন বলল, সৎ বলতে আমরা যা বুঝি, ডিউক সে ধরনের খাটি সৎ লোক। বয়সে যুবক হলেও এখনও পর্যন্ত বিয়ে হয়নি। তিনি ভালোবাসেন অলিভিয়া নামে একজন ভদ্রমহিলাকে। কাছেই বাড়ি ভদ্রমহিলার। তিনি ডিউককে স্পষ্ট জানিয়ে দিয়েছেন যে তাকে বিয়ে করতে আদৌ ইচ্ছক নন তিনি। কিন্তু তাতেও দমে যাননি ডিউক। তিনি পরিষ্কার জানিয়ে দিয়েছেন অলিভিয়া ছাড়া আর কাউকে বিয়ে করতে রাজি নন তিনি।

ক্যাপ্টেনের কাছে জানতে চাইল ভায়োলা, অলিভিয়া কে?

ক্যাপ্টেন বললেন, সে এক সম্রাস্ত বংশীয় কাউন্টের মেয়ে। প্রায় একবছর হল মৃত্যু হয়েছে তাঁর বাবার। এরপর তার অভিভাবক হন তার দাদা। কিন্তু কিছুদিনের মধ্যে তার দাদাও মারা গেলেন। ভাইয়ের এই মৃত্যুতে প্রচণ্ড মানসিক আঘাত পেয়েছেন তিনি। নিজেও বাইরে বের হন না। আর কেউ এলে তার সাথে দেখাও করেন না।

অলিভিয়াকে চাক্ষুষ না দেখলেও তার বড়ো ভাইয়ের অকালমৃত্যুর কথা শুনে তার প্রতি সমবেদনা জাগলো ভায়োলার মনে। সাথে সাথে তার মনে এল ছোটো ভাই সেবাস্টিয়ানের কথা। সে দীর্ঘশ্বাস ফেলে বলল, লেডি অলিভিয়ার অবস্থা দেখছি আমারই মতো। উনি হারিয়েছেন তার দাদাকে আর আমি খুঁজে বেড়াচ্ছি। আমার ছোটো ভাইকে, জাহাজ ডুবির ফলে যে নিখোঁজ হয়েছে।

সায় দিয়ে ক্যাপ্টেন বললেন, সে দিক দিয়ে বিচার করলে তোমাদের দু-জনের অবস্থা প্ৰায় সমান।

ভায়োলা জানতে চাইল, আপনার কাছেই শুনলাম লেডি অলিভিয়া নাকি অগাধ ধন-সম্পত্তির মালিক। উনিই পারেন আমায় চাকরি দিতে। আপনি যদি একটু চেষ্টা করেন তাহলে হয়তো হয়ে যেতে পারে আমার একটা চাকরি।

সে না হয়। আমি চেষ্টা করব, তবে আশা কম–বললেন ক্যাপ্টেন।

ক্যাপ্টনকে মিনতি জানিয়ে ভায়োলা বলল, কিন্তু টাকা রোজগারের ব্যবস্থা আমায় যে ভাবেই হোক করতে হবে। লেডি অলিভিয়া না রাজি হলে আপনিই বরঞ্চ অনুরোধ করে দেখুন ডিউক অর্সিনোকে।

ভায়োলার কাকুতি-মিনতি শুনে ক্যাপ্টেন রাজি হয়ে গেলেন তার চাকরির জন্য ডিউককে অনুরোধ করতে। কিন্তু সমস্যা দেখা দিল অন্যদিকে–ডিউক কি রাজি হবেন ভায়োলার মত এক সুন্দরী যুবতিকে চাকরি দিতে? ব্যাপারটা আঁচ করে ভায়োলা নিজেই সমাধান করল সমস্যার, ক্যাপ্টেনের কাছ থেকে একপ্রস্থ পোশাক চেয়ে নিয়ে নিজের গায়ে চাপাল সে, তারপর আরশির সামনে দাঁড়িয়ে নিজেকে দেখতে লাগল সে। নিজেকে দেখে মনে হচ্ছিল এ যেন সে নিজে নয়, যমজ ভাই সেবাস্টিয়ানের চেহারাটাই ফুটে উঠেছে আরশিতে। এমনকি ক্যাপ্টেনও অবাক হয়ে গেলেন তাকে ওই পোশাকে দেখে। ক্যাপ্টেন বারবার বলতে লাগলেন যুবতি বলে মনেই হচ্ছে না ভায়েলাকে দেখে। ওই পোশাক পরা অবস্থায় তিনি তাকে ডিউকের কাছে নিয়ে বললেন, এ ছেলেটি আমার খুবই পরিচিত। দারুণ কষ্টের মধ্যে পড়েছে। এ বেচারা। আপনার তো নানারকম কাজ-কর্মের জন্য লোকের প্রয়োজন। দয়া করে, যদি একে একটা কাজ দেন, তাহলে খুবই উপকার হয় বেচারার।

ক্যাপ্টেনের কথায় সহমত হয়ে বললেন ডিউক, ঠিকই বলেছেন আপনি। নানারকম কাজের জন্য লোকের দরকার হয় আমার। এরপর ভায়োলার আপাদমস্তক দেখে নিয়ে বললেন ডিউক, কী নাম তোমার?

চটপট জবাব দিল ভায়োলা, আজ্ঞে হুজুর, সিজারিও।

ডিউক জানতে চাইলেন, তা তুমি মনোযোগ দিয়ে কাজ-কর্ম করবে তো?

ভায়োলা উত্তর দিল, ক্যাপ্টেনের সামনে আমি আপনাকে কথা দিচ্ছি হুজুর আমার কাজে কোনও ত্রুটি পাবেন না আপনি।

ডিউক হেসে বললেন, বেশ! আমি তোমাকে খাস সহচরের পদে বহাল করলাম। কাজটা খুব কঠিন নয়। সব সময় আমার আশে-পাশে থাকবে, ফাই-ফরমাশ খাটবে। আর কোনও কাজে পাঠালে ভালোভাবে সে কাজটা করে আসবে। কী! পারবে তো?

ভায়োলা বলল, আমায় একবার সুযোগ দিন আপনাকে সেবা করার! আশা করি সেজন্য হতাশ হতে হবে না। আপনাকে। আমি আপনার কাছে কৃতজ্ঞ রইলাম।

ডিউকের কাছে ভায়েলাকে কাজে লাগাতে পেরে স্বস্তি অনুভব করলেন ক্যাপ্টেন। ডিউকের কাছে বিদায় নিয়ে নিজের কাজে চলে গেলেন তিনি।

সিজারিওবেশী ভায়োলা আপ্ৰাণ চেষ্টা করছে ডিউককে খুশি করার। সব সময় সে ডিউকের আশে পাশে থাকে, একঘেয়েমি দূর করতে মাঝে মাঝে সে ডিউককে গান শোনায় আর ডিউকের মনখারাপ হলে সে মজার মজার কথা বলে তাকে আনন্দ দেবার চেষ্টা করে। এরই ফাকে ফাকে সেডিউকের কাছ থেকে শুনতে পায় লেডি অলিভিয়াকে তিনি কত ভালোবাসেন, হৃদয়ের গভীরে তিনি আরাধ্যদেবী রূপে বসিয়ে রেখেছেন তাকে। এত গভীরভাবে লেডি অলিভিয়াকে ভালোবাসা সত্ত্বেও তিনি যে ডিউককে মোটেও পাত্তা দেন না, এ কথা শুনে খুবই দুঃখ পায় ভায়োলা।

ডিউকের নিকটে থেকে কাজ করতে এক সময় তার প্রেমে পড়ে গেল ভায়োলা। কিন্তু তার ভালোবাসাকে সে লুকিয়ে রেখে দিল তার হৃদয়ের গভীরে, তার কোনও আঁচই পেলেন না ডিউক।

এর কয়েকদিন বাদে ডিউক একটা শিলমোহর করা খাম ভায়োলার হাতে দিয়ে বললেন, তুমি এখনই লেডি অলিভিয়ার কাছে গিয়ে এটা তাকে দেবে। আর বলবে আমি কত গভীরভাবে ভালোবাসি তাকে। তুমি তাকে এও বলবে তিনি আমার প্রতি নির্দয় হলেও আমৃত্যু আমি ভালোবেসে যাব তাকে। তোমার বয়স কম আর আমার চেয়েও দেখতে সুন্দর। তাই এ-কাজটা তোমাকে দিয়েই ভালোভাবে হবে।

এ কথা শুনে খুবই মন খারাপ হয়ে গেল ভায়োলার। ডিউককে ভালোবাসা সত্ত্বেও সে মুখ ফুটে কিছু বলতে পারছে না। তাকে। উপরন্তু ডিউকের চিঠি নিয়ে যার কাছে যেতে হবে তিনি মোটেও পাত্তা দেন না তাকে। শুধু চিঠি দেওয়াই নয়, তাকে নিজমুখে বলতে হবে ডিউক তাকে কত ভালোবাসেন, বিয়ে করতে চান তাকে।

লেডি অলিভিয়ার প্রাসাদের একতলায় থাকেন তার দূর সম্পর্কের খুল্লতাত স্যার টোরিব বেলচ্‌ আর তার ঘনিষ্ঠ বন্ধু স্যার অ্যান্ড্রু আগচিক। এরা উভয়েই পাঁড় মাতাল–এদের কেউ বিয়ে করেননি। স্যার টোবি মনে করেন অলিভিয়ার খুল্লতাত হবার দরুন এই প্রাসাদে থাকার অধিকার আছে তার। অবশ্য এ ব্যাপারে অন্য স্বার্থ রয়েছে। খুল্লতাত হবার দরুন তিনি মাঝে মাঝে নাক গলান ভাইঝির বিয়ের ব্যাপারে। কিন্তু অলিভিয়া সেটা মোটেও পছন্দ করেন না। স্যার টোবির ইচ্ছা যে ভাইঝি। বিয়ে করুক তার এক গ্রাসের ইয়ার স্যার অ্যাভু অগচিককে। বন্ধুর সাথে বিয়ে হলে তার কর্তৃত্বও বেড়ে যাবে, বন্ধুর মাধ্যমে ভাইঝির সম্পত্তির উপরও তার অধিকার বাড়বে–মনে মনে এসব স্বপ্ন দেখেন তিনি। কিন্তু খুল্লতাতের মতলব যে সুবিধার নয়, সেটা ঠিকই আঁচ করেছেন অলিভিয়া। তাই তিনি দয়া করে তাকে আর বন্ধু স্যার অ্যাভু অগচিককে থাকতে দিয়েছেন প্রাসাদের একতলায় একটি ঘরে। তবে আগে থেকেই তিনি রক্ষীদের নির্দেশ দিয়ে রেখেছেন তারা যেন একতলা ছেড়ে উপরে উঠতে না পারে। লেডি অলিভিয়া যেমন তাদের পাত্তা দেন না, তেমনি কেউ তার সাথে দেখা করতে এলে দু-বন্ধু তাকে ধমকে-ধামকে, এমন কি মার-ধর করে তাড়িয়ে দেয়। বাইরের কেউ যে অলিভিয়াকে বিয়ে করলে তাদের মৌরসীপাট্টা থাকবে না, এজন্য তারা কাজ করেন। লেডি অলিভিয়ার সাথে দেখা করার জন্য ডিউকের লোক যে প্রতিদিন প্রাসাদে আসে, সে কথাও জানে ওই দুই বদ্ধ মাতাল। তবে তারা এটা জেনে নিশ্চিত যে লেডি অলিভিয়া ডিউককে বিয়ে করতে রাজি নন।

সিজারিও-বেশী ভায়োলা এসে হাজির হল লেডি অলিভিয়ার প্রাসাদে। তাকে দেখেই এগিয়ে এল অলিভিয়ার চাকর ম্যালভোলিও ডিউক যে তার নিজস্ব লোক মারফত অলিভিয়াকে প্ৰেমপত্ৰ পাঠান সে কথা জানে সে। তাই ভায়েলাকে দেখেই ধমকে উঠল সে, যাও! যাও! এখন দেখা হবে না লেডি অলিভিয়ার সাথে।

তার এরূপ অভদ্র আচরণে ক্ষুন্ন হয়ে ভায়োলা জানতে চাইল, কোন দেখা হবে না তার সাথে?

ম্যালভোলিও জবাব দিলে, দেখা হবে না। কারণ তিনি অসুস্থ।

আরে! অসুস্থ বলেই তো তার সাথে করতে এসেছি–বলল ভায়োলা।

কী করে আর দেখা হবে! উনি তো এখন ঘুমোচ্ছেন–ম্যালভোলিও বলল।

একটুও দমে না গিয়ে ভায়োলা বলল, ঠিক আছে। আমি অপেক্ষা করছি যতক্ষণ না উনি ঘুম থেকে ওঠেন।

এবার রেগে গিয়ে বলল ম্যালভোলিও, এতো মহা ঝামেলার ব্যাপার হল দেখছি! যতই আমি বলছি উনি অসুস্থ, ততই আপনি জোর করছেন তার সাথে দেখা করার জন্য।

এ কথা শুনে ভায়োলাও একগুয়ের মতো বলল, ঠিক আছে, উনি সুস্থ হয়ে না ওঠা পর্যন্ত আমি অপেক্ষা করছি। বাধা পেয়ে তারও জেদ বেড়ে গেছে যে ভাবেই হোক সে দেখা করবে: লেডি অলিভিয়ার সাথে। কারণ ডিউক স্বয়ং তাকে পাঠিয়েছেন লেডি অলিভিয়ার সাথে দেখা করতে। তাছাড়া সে দেখতে চায় লেডি অলিভিয়ার মধ্যে এমন কী আছে যার দরুন ডিউক তাকে এত ভালোবাসেন।

এমন নাছোড়বান্দা লোক দেখে বাধ্য হয়ে ম্যালভোলিও গেল তার কর্ত্রীকে খবর দিতে। যাবার আগে সে বলে গেল, কর্ত্রী অনুমতি দিলে আপনাকে আমি নিয়ে যাব তার কাছে। ততক্ষণ পর্যন্ত অপেক্ষা করতে হবে আপনাকে।

ম্যালভোলিও বলল তার কর্ত্রীকে, ডিউকের চিঠি নিয়ে একজন লোক এসেছে আপনার সাথে দেখা করতে। আমি বসিয়ে রেখেছি!

ধমক দিয়ে লেডি অলিভিয়া বললেন তাকে, তবে আর কী? কেউ দেখা করতে এলেই বসিয়ে রাখবে তাকে। তোমাকে তো আগেই বলেছি। ডিউকের কোনও লোকের সাথে দেখা করব না আমি। এরপর একটু গলা চড়িয়ে বললেন, যাও, এখনই প্রাসাদ থেকে দূর করে দাও লোকটাকে। ম্যালভোলিও বলল, আমি তো বারবার তাকে বলছি চলে যাবার জন্য। কিন্তু সে আমার কথায় কান দিচ্ছে না। বলছে আপনার সাথে দেখা না করে সে যাবে না।

খুব অবাক হয়ে বলল অলিভিয়া, বা! বেশ মজার ব্যাপার তো! এমন নাছোড়বান্দা লোক তো দেখিনি! লোকটাকে কেমন দেখতে?

দেখে-শুনে তো মনে হয় খুবই সুন্দর, বলল ম্যালভোলিও, তবে ওকে লোক না বলে ছেলে বললেই মানানসই হয়। আপনি জানতে চাইলেন বলেই বলছি খুবই সুন্দর ছেলেটি।

ডিউকের দূতের বয়স আর চেহারার বর্ণনা ম্যালভোলিওর মুখে শুনে অলিভিয়ার খুবই আগ্রহ হল ছেলেটিকে দেখার। পাতলা একটা রেশমি ওড়নায় নিজের মুখ ঢেকে তিনি বললেন ম্যালভোলিওকে, বেশ তো! ডিউকের দূত যখন বলেছে আমার সাথে দেখা না করে যাবে না, তখন তাকে সোজা নিয়ে এস আমার কাছে। যে হুকুম বলে অলিভিয়াকে সেলাম ঠুকে চলে গেল ম্যালভোলিও। কিছুক্ষণ বাদে সিজারিওবেশী ভায়োলাকে এনে সে হাজির করুল লেডি অলিভিয়ার সামনে।

নারীর মন দেবতারাই জানেন না মানুষ তো কোন ছাড়া। ডিউক যা এতদিনেও করতে পারেননি, ভায়োলাকে মাত্র একবার দেখেই মুগ্ধ হয়ে গেলেন তিনি। ভায়োলা অনুরোধ করতে মুখের ঢাকনা সরিয়ে নিলেন তিনি। অলিভিয়ার মন ভোলাতে যে কথা তাকে বলতে শিখিয়েছিলেন ডিউক, তোতাপাখির মতো হুবহু সেগুলি আউড়ে গেল ভায়োলা। কিন্তু সে সবে কান দিলেন না। লেডি অলিভিয়া। তিনি একদৃষ্টি চেয়ে রইলেন ভায়োলার সুন্দর মুখের দিকে। এমন সুন্দর চেহারার যুবক আগে কখনও দেখেননি তিনি। কিছুক্ষণ বাদে লাজ-লজ্জা বিসর্জন দিয়ে তিনি বললেন, দেখ, তোমার মনিবের কোনও কথাই আমি শুনতে চাই না তোমার মুখ থেকে। তবে তোমার জন্য সব সময় খোলা রইল। আমার দরজা। তোমার প্রয়োজনে যখন খুশি তুমি আসতে পার এখানে।

ভায়োলা বলল, আপনি যে উদারতা দেখালেন তার জন্য অশেষ ধন্যবাদ। আপনাকে। কিন্তু শুধু শুধু এখানে এসে আর কী হবে— বলে সে বিদায় চাইল লেডি অলিভিয়ার কাছে। তবে এত তাড়াতাড়ি তাকে বিদায় দিতে ইচ্ছে করছিল না লেডি অলিভিয়ার। তাকে আরও কিছুক্ষণ আটকে রাখার উদ্দেশ্যে তিনি জানতে চাইলেন তার বংশ-পরিচয়।

উজ্জ্বল আমার বংশের ইতিহাস। তাছাড়া আমি একজন ভদ্রলোক তো বটেই। উপহারস্বরূপ লেডি অলিভিয়া তাকে কিছু টাকা দিতে চাইলে সে অস্বীকার করল তা নিতে। সে বলল, আপনি শুধু আমার প্রভুর দিকে একটু কৃপাদৃষ্টি দিন, তাহলেই সন্তুষ্ট হব আমি–এই বলে লেডি অলিভিয়ার কাছ থেকে বিদায় নিয়ে প্রাসাদ থেকে বেরিয়ে এল সে। ভায়োলা বেরিয়ে যেতেই তার জন্য মন খারাপ হয়ে গেল লেডি অলিভিয়ার। তিনি তাকে আবার দেখার জন্য ব্যাকুল হয়ে উঠলেন। তিনি হাতের আঙুল থেকে একটি দামি আংটি খুলে নিয়ে ম্যালভোলিওকে দিয়ে বললেন, তুমি এখনই ছুটে গিয়ে ডিউক অর্সিনোর দূতকে ধর। তাকে বলবে ডিউক তার মাধ্যমে যে আংটিটা আমায় পাঠিয়েছেন সেটা আমি ফেরত পাঠালাম। সেই সাথে আরও বলবে কাল যদি তিনি সময় করে এখানে আসেন, তাহলে আমি তাকে বুঝিয়ে বলব কেন আমার পক্ষে ডিউককে বিয়ে করা সম্ভব নয়। তুমি আমার হয়ে তাকে অনুরোধ করবে। কাল যেন তিনি অবশ্যই এখানে আসেন।

লেডি অলিভিয়ার কাছ থেকে আংটিটা নিয়ে প্রাসাদ থেকে বেরিয়ে এল ম্যালভোলিও। তাড়াতাড়ি হেঁটে কিছুদূর গিয়ে সে ধরে ফেলল ভায়োলাকে। মনিবানীর নির্দেশমতো তাকে সবকিছু বলে হিরের আংটিটাি গুজে দিল তার হাতে। সব কিছু শোনার পর অবাক হয়ে ভায়োলা বলল, কই! আমি তো কোনও আংটি নিয়ে আসিনি?

ম্যালভোলিও বলল, আমার কর্ত্রী তো আর মিছে কথা বলেননি। তিনি বলেছেন বলেই তো আমি এতদূর ছুটে এসেছি আপনার কাছে। কিন্তু ভায়োলা অস্বীকার করল সে আংটি নিতে।

তখন ম্যালভোলিও বলল, আপনি এটা ফেরত না নিলে রাস্তায় ফেলে যাব। ফল হবে। আজে-বাজে যে কেউ কুড়িয়ে নেবে–বলেই আংটিটি রাস্তায় ফেলে দিয়ে চলে গেল সে। অনন্যেপায় হয়ে আংটিটা তুলে নিতে হল ভায়েলাকে। লেডি অলিভিয়ার মতো ভায়োলাও এক যুবতি মেয়ে। তার বুঝতে বাকি রইল না। উনি তার প্রেমে পড়ে গেছেন। শেষমেশ ব্যাপারটা যে এরূপ দাঁড়াবে, তা সে কল্পনাও করতে পারেনি। তার ভয় হল এসব জানতে পেরে ডিউক যদি তাকে চাকরি থেকে ছাড়িয়ে দেন তাহলে কী হবে!

 

ভায়োলা না চাইলেও মনিবের আদেশে তাকে পুনরায় যেতে হল লেডি অলিভিয়ার প্রাসাদে। কিন্তু এবার ভেতরে যেতে সে কোনও বাধা পেল না। কারণ লেডি অলিভিয়া আগেই তার প্রাসাদের রক্ষী ও চাকর-বকিরদের নির্দেশ দিয়ে রেখেছেন যে গতকাল যে সুন্দর যুবকটি ডিউকের দূত হয়ে এসেছিল, সে এলে যেন তাকে নিয়ে যাওয়া হয় তার কাছে।

ডিউক যে পুনরায় তাকে প্রেম নিবেদন করেছেন এ কথা ভায়োলার মুখে শুনে বেজায় রেগে বললেন অলিভিয়া, আমি তো আগেই বলেছি ডিউকের ও সব ঘ্যানঘেনে প্রেমের কথা শুনতে মোটেও রাজি নই আমি। পরীক্ষণেই শাস্ত হয়ে বললেন, অবশ্য ডিউক ছাড়া অন্য কেউ যদি আমায় বিয়ে করতে ইচ্ছক হয়, তাহলে অনায়াসে তার কথা বলতে পার আমাকো — বলেই এমনভাবে চাইলেন ভায়োলার দিকে যে সে বেচারি লজ্জা পেয়ে গেল। সে কেশ বুঝতে পারল পুরুষবেশী তাকেই বিয়ে করতে চাইছেন লেডি অলিভিয়া। লজ্জায় সে মাথা নিচু করে দাঁড়িয়ে রইল। লেডি অলিভিয়া তাকে বললেন, তুমি কি ডিউককে ভয় পোচ্ছ? তাকে ভয় পাবার কিছু নেই। আমি যে তোমায় ভালোবেসে ফেলেছি। এ কথা লুকিয়ে রেখে আর কোনও লাভ নেই। যদি তুমি আমায় বিয়ে করতে রাজি হও, তাহলে আমি কথা দিচ্ছি, তুমিও ক্ষমতাবান হবে ডিউকের মতো।

এ কথা শুনে আর এক মুহূর্তও দাঁড়াল না ভায়োলা। সে প্রাসাদ থেকে বাইরে যাবার জন্য পা বড়াল। যেতে যেতে শুনতে পেল লেডি অলিভিয়া বলছেন তাকে, আমি তোমায় প্ৰাণাধিক ভালোবাসি সিজারিও। তুমি আবার এস। তোমার অপেক্ষায় রইলাম আমি।

সিঁড়ি দিয়ে নেমে প্রাসাদের বাইরে বেরিয়ে যাবার মুখেই ঝামেলায় পড়ে গেল ভায়োলা। এক তলার দুই বাসিন্দাদের একজন স্যার অ্যাভু অগচিক জানতে পেরে গেছেন যে ডিউকের দূত সিজারিও ছোকরাকে ভালোকেসে ফেলেছে লেডি অলিভিয়া। ব্যাপারটা যথেষ্ট ভয়ের কারণ।–লেডি অলিভিয়া সিজারিওকে বিয়ে করলে প্রাসাদ ছেড়ে চলে যেতে হবে তাদের দু-বন্ধুকে। অলিভিয়ার দূর সম্পর্কিত খুল্লতাত স্যার টোবির সাথে আলোচনা করে স্যার অ্যাভু ঠিক করেছে যে দ্বন্দ্ব যুদ্ধের মাধ্যমে সে হত্যা করবে সিজারিওকে। মূলত তার এক গেলাসের ইয়ার স্যার টোবির প্ররোচনায় সে এক নির্দিষ্ট দিনে দ্বন্দ্বযুদ্ধের আহ্বান জানিয়ে চিঠি দিল সিজারিওকে। দ্বন্দ্বযুদ্ধের আহ্বান জানিয়ে স্যার অ্যাভু যে সিজারিওকে চিঠি পাঠিয়েছে। এ কথা জেনে মনে মনে হাসল স্যার টোবিও। কারণ সে তো জানে তার বন্ধু কত ভীরু। ওদিকে ভায়োলা অর্থাৎ সিজারিও যে একজন দক্ষ তলোয়ারবাজ সে কথা জানিয়ে বন্ধুকে ভয় পাইয়ে দিল স্যার টোবি।

ওই দিনই সকালে অ্যান্টনিও নামক একজন কাপ্টেনের জাহাজে করে ইলিরিয়ায় পৌঁছেছে ভায়োলার ভাই সেবাস্টিয়ান। জাহাজ ডুবির পর ওই ক্যাপ্টেন তাকে প্ৰাণে বঁচিয়ে আশ্রয় দিয়েছেন তার নিজের জাহাজে। নানা জায়গা ঘুরে ঘুরে জাহাজ এসে পৌঁছেছে। এখানকার বন্দরে। এখান থেকে খুবই নিকটে ডিউক আর্সিনোর প্রাসাদ।

সেবাস্টিয়ান বললে, আসুন, জাহাজ থেকে নেমে একবার বন্দরটা ঘুরে দেখা যাক। সেই সাথে ডিউকের প্রাসাদটাও দেখা হয়ে যাবে।

ক্যাপ্টেন অ্যান্টেনিও বললেন, তুমি যেতে চাও যাবে। কিন্তু আমার পক্ষে যাওয়া সম্ভব নয়। সেবাস্টিয়ান এর কারণ জানতে চাইলে ক্যাপ্টেন বললেন, কারণ কিছুদিন আগে আমারই হাতে গুরুতর আহত হয়েছে ডিউকের ভাইপো। ডিউকের রক্ষীরা আমায় দেখতে পেলে সোজা জেলে ঢুকিয়ে দেবে। কাজেই একাই যেতে হবে তোমাকে।

ক্যাপ্টেনের অসুবিধার কথা শুনে সেবাস্টিয়ান স্থির করল সে একাই যাবে বন্দর দেখতে। জাহাজ থেকে নেমে যাবার আগে সেবাস্টিয়ানকে সাবধান করে বললেন ক্যাপ্টেন অ্যান্টনিও, মনে রেখা এটা বিদেশ-বিভূই। কাজেই খুব সাবধানে চলা-ফেরা করবে— বলে একটা টাকা ভর্তি থলে তার হাতে দিয়ে বললেন, এটা সাথে রােখ। এই অচেনা জায়গায় ঘুরে-ফিরে বেড়াতে হলেও অর্থের প্রয়োজন। নিজের মনে করেই এই টাকা থেকে তুমি প্রয়োজনীয় খরচ-খরচা করবে।

কী হবে এত টাকা দিয়ে? জানতে চাইল সেবাস্টিয়ান।

ক্যাপ্টেন বললেন, টাকাগুলো সঙ্গে রাখ। খিদে পেলেও তো খাবার কিনতে পয়সা লাগবে। কিছু বেশি টাকা সাথে রাখা ভালো। ক্যাপ্টেনকে ধন্যবাদ জানিয়ে জাহাজ থেকে পথে নামল সেবাস্টিয়ান।

 

ওদিকে নির্দিষ্ট দিনেই সিজারিও-বেশী ভায়োলার সাথে তলোয়ার বাজিতে নামলেন স্যার অ্যাণ্ডু। প্রচণ্ড উত্তেজনায় কঁপিছে পাঁড় মাতাল স্যার অ্যাণ্ডুর হাত–অন্যদিকে তলোয়ার ধরা সিজারিওর ডান হাত কাঁপছে ভয়ে। হয়তো ভয়ংকর একটা কিছু হয়ে যাবার ভয়ে অজ্ঞান হয়ে যেতে পারত সিজারিও। ঠিক সে সময় দেবদূতের মতো সেখানে এসে হাজির হল এক অচেনা ভদ্রলোক। স্যার অ্যাভুকে উদ্দেশ্য করে সে চেঁচিয়ে বলে উঠল, থামুন আপনি। আমার সাথে লড়বেন। এর বদলে আমি লড়ব, আপনার সাথে।

ভায়োলা তো জানে না যে এই লোকটিই ক্যাপ্টেন অ্যান্টনিও। সেবাস্টিয়ানের ফিরতে দেরি হচ্ছে দেখে ধরা পড়ার ঝুঁকি সত্ত্বেও তিনি নিজে বেরিয়েছেন তার খোঁজে। ভায়োলাকে সেবাস্টিয়ান ভেবে ভুল করেছেন তিনি। তাকে সাহায্য করতে আসার দরুন অপরিচিত ভদ্রলোককে ধন্যবাদ জানাল সিজারিও। ঠিক তখনই একদল রক্ষী এসে হাজির সেখানে। অ্যান্টনিওকে চিনতে পেরে রক্ষীদের দলপতি প্ৰেপ্তার করলেন তাকে।

সিজারিওর দিকে তাকিয়ে ক্যাপ্টেন বললেন, বন্ধু সেবাস্টিয়ান! তোমায় বাঁচাতে এসে আমি নিজেই পড়ে গেলাম বিপদে। যাকগে সে কথা। যে টাকার থলিটা তোমায় দিয়েছিলাম সেটা এবার আমায় দেও! জানি না। কদিন গারদে আমায় আটক থাকতে হবে। ওখানে তো টাকার দরকার হবে আমার।

অচেনা অজানা এক ব্যক্তির মুখে সেবাস্টিয়ানের নাম শুনে ভায়োলা বুঝতে পারল তার ভাই সেবাস্টিয়ান এখনও বেঁচে আছে আর এই লোকটি তাকে জানে। সে ভায়োলাকেই সেবাস্টিয়ান বলে ধরে নিয়েছে। যাই হোক, ভাইয়ের বেঁচে থাকার কথা শুনে স্বস্তি পেল ভায়োলা। কিন্তু টাকার থলির ব্যাপারটা বোধগম্য হল না। তার কাছে। রক্ষীদের হাতে বন্দি লোকটিকে সে বলল, আমি আপনার কাছে খুবই কৃতজ্ঞ—কারণ বিপদের সময় আপনি এগিয়ে এসেছেন আমায় বঁচাতে। কিন্তু আপনার টাকার থলির ব্যাপারটা সত্যিই আমি জানি না। তবে আমার কাছে খুবই সামান্য টাকা আছে। প্রয়োজন হলে আপনি তা নিতে পারেন–এই বলে নিজের টাকার থলিটা এগিয়ে দিল তার সামনে।

চেঁচিয়ে বলে উঠলেন ক্যাপ্টেন অ্যান্টনিও, ছিঃ সেবাস্টিয়ান! আমার জানা ছিল না তুমি এত নীচ, বেইমান! জাহাজ ডুবির পর আমি তোমায় প্রাণ বঁচিয়ে আশ্রয় দিয়েছিলাম নিজের কাছে। আর এভাবে তুমি প্রতিদান দিলে তার? অস্বীকার করলে আমাদের বন্ধুত্বকে? আরও কিছু বলতে যাচ্ছিলেন ক্যাপ্টেন, কিন্তু তার আগেই রক্ষীরা টানতে টানতে টেনে নিয়ে গেল তাকে। এখানে থাকলে পাছে স্যার অ্যাণ্ডু তার উপর চড়াও হয়, এই ভয়ে ভায়োলা পায়ে পায়ে এগিয়ে গেল ডিউকের প্রাসাদের দিকে।

 

স্যার অ্যাণ্ডু, স্যার টোবি, দু-জনের কেউই টের পাননি ভায়োলার চলে যাওয়া। কিছুক্ষণ বাদে হঠাৎ সেখানে এসে হাজির সেবাস্টিয়ান–উভয়েই তাকে ধরে নিল সিজারিও বলে। স্যার টোবি ইঙ্গিত করতেই তলোয়ার উচিয়ে তার দিকে ছুটে এল স্যার অ্যাভূ-সেবাস্টিয়ানের কোমরেও বুলিছিল তলোয়ার। শয়তানের মতো দেখতে বদখত চেহারার একটা লোক তার দিকে তলোয়ার হাতে তেড়ে আসছে দেখে সেবাস্টিয়ানও বের করল তার তলোয়ার, মোক্ষম একটা আঘাত হািনল স্যার অ্যাভুর মুখে। বন্ধুকে আহত হতে দেখে স্যার টোবিও ছুটে এল তলোয়ার হাতে–সেও জখম হল সেবাস্টিয়ানের তলোয়ারের আঘাতে।

কাছেই ছিল লেডি অলিভিয়ার প্রাসাদ। খবর পেয়ে তিনি নিজে এলেন সেখানে। আহত স্যার টোবি ও স্যার অ্যাভূ-দু-জনকেই ধমকে-ধামকে তাড়িয়ে দিলেন। রক্ষীদের আদেশ দিলেন তারা যেন উভয়ের কাউকে প্রাসাদে প্রবেশ করতে না দেয়। এবার সিজারিও ভেবে তিনি সেবাস্টিয়ানকে আহ্বান জানালেন প্ৰসাদের ভেতরে আসার। লেডি অলিভিয়ার মতো এক অপরূপ সুন্দরী মহিলার ডাকে সাড়া না দিয়ে পারল না সেবাস্টিয়ান। তার মতো একজন সাধারণ মানুষের প্রতি মহিলার অপরিসীম দয়া দেখে মনে মনে খুবই অবাক হল সেবাস্টিয়ান। সে লক্ষ করল। মহিলা তার সাথে এমনভাবে কথা বলছেন যেন সে তার পূর্বপরিচিত। সে আরও লক্ষ করল। মহিলা শুধু কথাই বলছেন না। –কথার মাঝে রয়েছে প্ৰেম নিবেদনের সুর। তবে কি মহিলা পাগল? শুরুতে এ প্রশ্নটা জেগেছিল তার মনে। কিন্তু যখন সে দেখল তিনি স্বাভাবিক ভাবে কথাবার্তা বলছেন, নির্দেশ দিচ্ছেন কাজের লোকদের– তখন সে বুঝতে পারল উনি পাগল নন, সম্পূর্ণ স্বাভাবিক। তখন সেও এমন আচরণ করতে লাগল। যাতে লেডি অলিভিয়ার মনে হল সত্যিই এবার নম্র হয়েছে সিজারিওর মন–সে সাড়া দিচ্ছে তার প্রেমের ডাকে। এ সব দেখে খুবই খুশি হলেন লেডি অলিভিয়া। পাছে সিজারিও বেহাত না হয়ে যায়, এই ভয়ে তিনি তখনই তার সাথে বাগদান পর্বটা সেরে রাখতে চাইলেন। সেও রাজি হয়ে গেল তার প্রস্তাবে। আর দেরি না করে লেডি অলিভিয়া তাকে সোজা নিয়ে গেল গির্জায় — সেখানে পাদ্রির সামনে সম্পন্ন হল বিয়ের বাগদান পর্বটা। এবার ভাবী স্বামীকে নিয়ে লেডি অলিভিয়া প্রাসাদে ফিরে এলেন। খাওয়া-দাওয়া সেরে গল্প-গুজব করে কেটে গেল কিছুটা সময়। এ সময় হঠাৎ ক্যাপ্টেন অ্যান্টনিওর কথা। তিনি বলেছিলেন সরাইখানায় অপেক্ষা করবেন তার জন্য। এতক্ষণ নিশ্চয়ই তিনি সেখানে বসে চিন্তা করছেন তার পথ চেয়ে। সরাইখানায় যাবার জন্য সে বিদায় নিয়ে এল লেডি অলিভিয়ার কাছ থেকে। যেতে যেতে সে ভাবতে লাগল তার মতো একজন সাধারণ মানুষকে রাস্তা থেকে তুলে নিয়ে গিয়ে অজানা-অচেনা রূপবতী এক ধনী মহিলা তার সাথে বিয়ের বাগদান অনুষ্ঠান সম্পন্ন করেছেন–প্রিয় বন্ধু ক্যাপ্টেনকে নিজ মুখে এ সব কথা বলে সে অবশ্যই তার সাহায্য চাইবে।

 

প্রাসাদে পৌঁছে ডিউককে অভিবাদন জানিয়ে বলল ভায়োলা, আমায় মাফ করবেন মাননীয় ডিউক। আমার শত চেষ্টা সত্ত্বেও লেডি অলিভিয়া কিছুতেই রাজি হননি। আপনার কথা শুনতে।

এ কথা শুনে বললেন ডিউক, আর তোমায় যেতে হবে না সিজারিও। এবার আমি নিজেই যাব তার সাথে কথা বলতে।

সিজারিও-বেশী ভায়োলা আর কয়েকজন রক্ষীকে সাথে নিয়ে লেডি অলিভিয়ার সাথে দেখা করতে চললেন ডিউক অর্সিনো। প্রাসাদের সামনে তার সাথে দেখা হল রক্ষীদের হাতে বন্ধু অ্যান্টনিওর সাথে। অ্যান্টনিওকে দেখিয়ে ভায়োলা বলল, কিছুক্ষণ আগে এই ভদ্রলোকই আমায় রক্ষা করেছেন দ্বন্দ্বযুদ্ধের হাত থেকে।

অবাক হয়ে ডিউক বললেন, দ্বন্দ্বযুদ্ধ? কিছুই তো বুঝতে পারছি না। আমি?

তখন ভায়োলা তাকে খুলে বলল সব কথা। শেষমেশ বলল ধরা পড়ার পর উনি একটা টাকার থলে চেয়েছিলেন তার কাছে। কিন্তু ও ব্যাপারে কিছুই জানে না সে।

এবার ক্যাপ্টেন বললেন, ছিঃ ছিঃ এমন অধঃপতন হয়েছে তোমার। এখনও না বোঝার ভান করছ?–বলেই ইশারায় ভায়োলাকে দেখিয়ে ডিউককে বললেন, মাননীয় ডিউক, জাহাজ ডুবির পর আমি ওকে জল থেকে তুলে নিয়ে এসেছিলাম আমার জাহাজে। আশ্রিত হিসেবে কয়েকমাস আমার জাহাজে কাটিয়েছে। ও। আমার জাহাজ আজই এসে পৌঁছেছে ইলিরিয়ার বন্দরে। শহর দেখতে যাবার সময় আমি ওর হাতে তুলে দিয়েছিলাম এক থলে স্বর্ণমুদ্রা। ওর ফিরতে দেরি দেখে ধরা পড়ার ঝকি সত্ত্বেও আমি নেমে এসেছি। ডাঙায়। কিছুদূর যাবার পর দেখতে পেলাম ও দ্বন্দ্বযুদ্ধ করছে এক আধাবুড়ো মাতালের সাথে। ভয় আর উত্তেজনায় তলোয়ার সুন্ধু ওর হাতটা থর থর করে কঁপিছে। তলোয়ারটা হয়তে ওর হাত থেকে পড়েই যেত যদি না আমি এগিয়ে এসে ওর হয়ে লড়াই করতে নামতাম। এমন কপাল আমার! ঠিক সে সময় আপনার রক্ষীরা এসে গ্রেপ্তার করলে আমাকে। আর এখন কিনা ও বলছে চেনেই না। আমাকে। আগে কখনও দেখেনি আমায়। তাই টাকার থলেও নেই তার কাছে। হুজুর! আমার প্রার্থনা এই বেইমানির বিচার আপনি নিজেই করুন।

ক্যাপ্টেনকে বললেন ডিউক, তুমি বলছি আজই তোমার জাহাজ ভিড়েছে ইলিরিয়া বন্দরে? কিন্তু যার বিরুদ্ধে তোমার অভিযোগ, সে তো অনেকদিন ধরে কাজ করছে আমার কাছে। তাই তোমার অভিযোগ বিশ্বাসযোগ্য বলে মেনে নিতে পারছি না। আমি–বলেই রক্ষীদলের নেতাকে ডেকে প্রশ্ন করলেন, কী অপরাধে একে ধরেছ তোমরা?

রক্ষীদলের নেতা বললেন, হুজুর! এরই সাথে লড়তে গিয়ে গুরুতর আহত হয়েছিলেন আপনার ভাইপো। সেই অপরাধে গ্রেপ্তার হয়েছেন ইনি।

ভায়োলাকে দেখিয়ে ডিউক বললেন ক্যাপ্টেন অ্যান্টনিওকে, তুমি বলছি তোমার জাহাজে ওকে আশ্রয় দিয়েছিলে। আরও বলছি তোমার জাহাজ আজই ভিড়েছে ইলিরিয়া বন্দরে। কিন্তু ও তো তারও আগে থেকে রয়েছে। আজ সকালে ওকে টাকার থলি দেবার যে কথা বলছি, সেটাও বিশ্বাসযোগ্য নয়। কথা শেষ করে ডিউক রক্ষীদের আদেশ দিলেন, এখন ওকে নিয়ে যাও। ওর বিরুদ্ধে যে সব অভিযোগ আছে তা পরে বিবেচনা করব আমি।

ডিউকের কথা শেষ হতে না হতেই নিজের প্রাসাদের ভেতর থেকে বেরিয়ে এলেন লেডি অলিভিয়া! আশেপাশের সবকিছু ফেলে ডিউক হাঁ করে চেয়ে রইলেন তার দিকে। তাকে ঐভাবে তাকাতে দেখে শুধু বিরক্তিই নয়, তার প্রতি প্ৰচণ্ড অসন্তুষ্ট হলেন লেডি অলিভিয়া। ডিউকের সাথে তার দূত সিজারিও এসেছেন এটা যেন তখনই নজরে এল লেডি অলিভিয়ার। ডিউককে ধর্তব্যের মধ্যে না এনে সরাসরি প্ৰেমালাপ শুরু করলেন সিজারিওর সাথে। সিজারিওকে যে লেডি অলিভিয়া ভালোবাসেন সেটা বুঝতে পেরে মনে মনে খুবই রেগে গেলেন ডিউক। সিজারিওকে ডেকে তিনি বললেন, এবার চল এখান থেকে। মানিবের সাথে যাবার জন্য পা বাড়িয়েছে সিজারিও ঠিক সেসময় মিনতিভরা স্বরে সিলভিয়া বললেন তাকে, তুমি চলে যেও না সিজারিও, প্রাসাদে এস। অনেক কথা আছে তোমার সাথে।

সিজারিও বলে উঠলেন, নাঃ আমার পক্ষে তা সম্ভব নয়। মনিবের সাথেই যেতে হবে আমাকে। আমি ওকে প্ৰাণাধিক ভালোবাসি। কোনও নারীকে এর চেয়ে বেশি ভালোবাসা সম্ভব নয়।

জোর গলায় বলে উঠলেন লেডি অলিভিয়া, সিজারিও! তুমি আমার স্বামী। আমার কথা রাখ। এভাবে চলে যেও না তুমি।

অবাক হয়ে বললেন ডিউক, তুমি লেডি অলিভিয়ার স্বামী?

সিজারিও উত্তর দিল, নাঃ মহামান্য ডিউক, আমি ওর স্বামী নই, আর অন্য কোনও নারীর স্বামী হতেও চাই না আমি।

লেডি সিলভিয়া বললেন, ও যে আমার স্বামী তার প্রমাণ আমি এখনই দিচ্ছি! এরপর তিনি ডেকে আনলেন সেই পাদ্রিকে1.সিজারিওকে দেখিয়ে বললেন পাদ্রিকে, আচ্ছ ফাদার, আজ সকালে কি আপনার সামনে এই যুবক সিজারিওর সাথে আমার বিয়ের বাগদান অনুষ্ঠান হয়নি?

ভালো করে সিজারিওর মুখটা দেখে নিয়ে পাদ্রি বললেন, এর সাথেই তো প্ৰায় দু-ঘণ্টা আগে তোমার বাগদান হয়েছে। বাগদান তো আমার সামনেই হল। এমন সুন্দর মুখ কি এত সহজে ভোলা যায়!

পাদ্রির কথা শুনে ডিউক নিশ্চিন্ত হলেন সে সিজারিওই লেডি অলিভিয়ার স্বামী। তিনি কল্পনাও করতে পারেননি যে তাকে এভাবে টপকে গিয়ে সিজারিও বিয়ে করবে। লেডি অলিভিয়াকে। ডিউক একবার ভাবলেন তাকে প্ৰাণদণ্ড দেবেন। পরীক্ষণেই নিজেকে সামলিয়ে নিয়ে সিজারিওকে বললেন, তুমি আমার সাথে যা করেছ তা স্রেফ বিশ্বাসঘাতকতা। যাই হোক, তুমি আর আমার সামনে এস না।

ডিউকের হুকুম শুনে কান্নায় ভেঙে পড়ল সিজারিও। যাই হোক এই বিদেশ-বিভূইয়ে তার থাকা-খাওয়ার একটা হিল্পে হয়েছিল, সাথে সাথে রোজগারও হচ্ছিল তার। এবার সে সব চলে গেল। ওদিকে সিজারিও তাকে এড়িয়ে যাবার চেষ্টা করছে দেখে মনে মনে খুবই দুঃখ পেলেন। লেডি অলিভিয়া। এরই মাঝে এসে হাজির দুই পাঁড় মাতাল স্যার টোবি আর স্যার অ্যাণ্ডু। তাদের ক্ষতস্থান থেকে দরদরি করে পড়ছে রক্ত।

সিজারিওকে দেখিয়ে তারা বলল, এই তো সেই লোক যে কিছুক্ষণ আগে জখম করেছে। আমাদের।

বিরক্তি সহকারে বললেন ডিউক, কী যা তা বলছি তোমরা! ওতো সকাল থেকেই আমার সাথে রয়েছে। তাহলে কীভাবে ও জখম করল তোমাদের?

এক সাথে বলে উঠল। স্যার টোবি আর স্যার অ্যান্ড, মহামান্য ডিউক! আমরা কেউ মিথ্যে বা বাড়িয়ে বলছি না। কিছুক্ষণ আগে ও সত্যিই আমাদের জখম করেছে।

এবার ধান্দে পড়ে গেলেন ডিউক। তাদের কথার ধরনে এমন কিছু ছিল যাতে মনে হয় না। তারা মিথ্যে কথা বলছে। আসল ব্যাপার তাহলে কী?

এই ধাঁধার মধ্যে পড়ে গিয়ে ডিউক বুঝতে পারলেন না। এবার তিনি কী করবেন। ঠিক সে সময় সমস্যার সমাধান করতে এসে হাজির ভায়োলার ভাই সেবাস্টিয়ান। দ্বন্দ্বযুদ্ধে জখম করার জন্য প্রথমেই সে ক্ষমা চাইল স্যার টোবি আর স্যার অ্যাণ্ডুর কাছে।

এবার অবাক হয়ে লেডি অলিভিয়া দেখলেন তার সামনে দাঁড়িয়ে দুজন স্বামী। তাদের উচ্চতা, গায়ের রং, এমনকি পোশাক পর্যন্ত হুবহু এক। কে যে আসল স্বামী তা বুঝে উঠতে পারলেন না তিনি।

ডিউক দেখতে পেলেন নবাগত যুবকটি দেখতে হুবহু তার পাশ্বচর সিজারিওর মতো। লেডি অলিভিয়া এবং ডিউকের মতো একই সমস্যার মধ্যে পড়ে গেলে বন্দি ক্যাপ্টেন অ্যান্টনিও [ নবাগত ছেলেটি দেখতে সেবাস্টিয়ানের মতো অথচ সেবাস্টিয়ান দাঁড়িয়ে রয়েছে ডিউকের পাশে। তাহলে এ কে? কিন্তু ভায়োলা ভুল করেনি নবাগত যুবকটিকে চিনতে। সে ছুটে এসে যুবকটির গলা জড়িয়ে ধরে কাঁদতে কাঁদতে বলল, তুমিও আমায় চিনতে পারছি না সেবাস্টিয়ান? আমি তোমার বোন ভায়োলা।

তারপর সে সবাইকে জানাল সে পুরুষ নয়, পুরুষের ছদ্মবেশে এক যুবতি নারী, নাম ভায়োলা। তার দূত সিজারিও যে আসলে একজন নারী, সে কথা খুব আশ্চর্য হলেন ডিউক। আসলে ডিউক কিন্তু মনে মনে খুবই ভালোবেসে ফেলেছেন ভায়োলাকে। যখন তিনি দেখলেন সেবাস্টিয়ানের সাথে লেডি অলিভিয়ার বাগদান হয়ে গেছে, তখন আর তার পিছনে ছুটে কোনও লাভ নেই। তার চেয়ে ভায়োলার মতো একজন নারীরত্নকে বিয়ে করে তাকে স্ত্রীর মর্যাদা দেওয়া শ্রেয়।

ভায়োলার দিকে তাকিয়ে ডিউক বললেন, ভায়োলা! তুমি কি আমায় ভালোবাস?

ডিউকের কথা শুনে লজ্জায় লাল হয়ে গেল ভায়োলা। সে কিছু না বলে চুপ করে রইল।

ডিউক আবার জিজ্ঞেস করলেন তাকে, ভালোয়া! তুমি আমায় বিয়ে করতে রাজি আছ?

লজ্জায় আর যেন মাথা তুলে দাঁড়াতে পারছে না ভায়োলা। কোনও মতে ঘাড় নেড়ে সম্মতি জানাল সে।

এবার জাঁকজমকের সাথে একই দিনে হয়ে গেল দুটি বিয়ে। এই বিয়ের আনন্দ-উৎসব উপলক্ষে ডিউক মুক্তি দিলেন ক্যাপ্টেন অ্যান্টনিওকে।

দ্য উইন্টার’স টেল

দ্য উইন্টার’স টেল
মূল রচনা: উইলিয়াম শেকসপিয়র
পুনর্কথন: মেরি ল্যাম্ব
অনুবাদ: অর্ণব দত্ত

সিসিলির রাজা লিওন্টেস তাঁর সুন্দরী সতীসাধ্বী রানি হারমায়োনিকে নিয়ে সুখে দিন কাটাচ্ছিলেন। লিওন্টেস তাঁর এই মহতী রানিটিকে খুবই ভালবাসতেন। জীবনে তাঁর কিছুরই অভাব ছিল না। কেবল মাঝে মাঝে বাল্যবন্ধু তথা সহপাঠী বোহেমিয়ার রাজা পলিজেনাসকে আরেকবার দেখার এবং তাঁকে স্ত্রীর সামনে উপস্থিত করার ইচ্ছে জাগত লিওন্টেসের মনে। দু’জনে একসঙ্গে বড়ো হয়েছিলেন। পিতার মৃত্যুর পর উভয়কেই নিজ নিজ রাজ্যে ফিরে রাজকার্য হাতে তুলে নিতে হয়। তাই অনেকদিন তাঁদের মধ্যে দেখাসাক্ষাৎ ছিল না। তবে ঘন ঘন তাঁরা পরস্পরের মধ্যে উপঢৌকন, চিঠিপত্র ও রাজদূত আদানপ্রদান ঠিকই করতেন।

অনেক অনুরোধের পর অবশেষে একদিন বোহেমিয়া থেকে সিসিলির রাজসভায় এসে লিওন্টেসের সঙ্গে দেখা করলেন পলিজেনাস।

তাঁর আগমনে লিওন্টেস তো দারুণ খুশি হলেন। রানির সঙ্গে পরিচয় করিয়ে দিলেন ছেলেবেলার বন্ধুর। তাঁর সুখ যেন পূর্ণতা লাভ করল প্রিয় বন্ধুর মিলনে। তাঁরা পুরনো দিনের স্মৃতিচারণা করতে লাগলেন। হারমায়োনিকে বলতে লাগলেন তাঁদের পাঠশালার কথা, তাঁদের ছেলেবেলার দুষ্টুমির কথা। হারমায়োনিও তাঁদের কথা শুনে খুব আনন্দ পেলেন।

এইভাবে বেশ কিছুদিন কাটিয়ে পলিজেনাস ঘরে ফেরার তোড়জোড় শুরু করলেন। তখন স্বামীর ইচ্ছানুসারে হারমায়োনি পলিজেনাসকে আরও কিছুদিন থেকে যেতে অনুরোধ করলেন।

আর তারই ফলে ঘনিয়ে এল হারমায়োনির দুঃখের দিন। পলিজেনাসকে থেকে যেতে অনুরোধ করেছিলেন লিওন্টেসও। তাঁর অনুরোধ পলিজেনাস ফিরিয়ে দিলেও, হারমায়োনির মধুর বাক্যের উত্তরে না বলতে পারলেন না তিনি। যাত্রার দিন পিছিয়ে দিলেন আরও কিছুদিন। তার ফলে এক বেয়াড়া ঈর্ষা এসে জুটল। ভেসে গেল লিওন্টেসের এতকালের ন্যায়পরায়ণতা, আদর্শবোধ, বন্ধুপ্রীতি, পত্নীপ্রেম সব। স্বামীর মন রাখতে পলিজেনাসের সেবাযত্নের ভার নিয়েছিলেন হারমায়োনি। অথচ রাজার ঈর্ষা তা দেখে বেড়েই চলল। লিওন্টেস ছিলেন এক সত্যিকারের বন্ধু, এক পত্নীনিষ্ঠ স্বামী; হলেন এক অমানবিক দানব। তাঁর রাজসভায় ক্যামিলো নামে এক লর্ড ছিলেন। তাঁকে ডেকে রাজা জানালেন নিজের সন্দেহের কথা। ক্যামিলোকে আদেশ করলেন, যেন বিষ দিয়ে পলিজেনাসকে হত্যা করা হয়।

ক্যামিলো ছিলেন সজ্জন ব্যক্তি। তিনি জানতেন, লিওন্টেসের এই সন্দেহ সম্পূর্ণ অমূলক। তাই পলিজেনাসকে বিষ দেওয়ার বদলে তাঁর কাছে গিয়ে প্রভুর আদেশের কথা খুলে বললেন ক্যামিলো। দু’জনে স্থির করলেন, তাঁরা সিসিলি রাজ্যের বাইরে পালিয়ে যাবেন। তারপর ক্যামিলোর সাহায্যে পলিজেনাস নিরাপদে তাঁর নিজের রাজ্য বোহেমিয়ায় ফিরে এলেন। সেখানেই বসবাস শুরু করলেন ক্যামিলো। অলংকৃত করলেন ক্যামিলোর রাজসভা। পরিণত হলেন পলিজেনাসের প্রধান মিত্র তথা প্রিয়পাত্রে।

এদিকে পলিজেনাসের পলায়নের সংবাদ লিওন্টেসের ঈর্ষা আরও বাড়িয়ে তুলল। তিনি চললেন হারমায়োনির মহলের দিকে। রানি তখন তাঁর শিশুপুত্র ম্যামিলিয়াসকে সঙ্গে নিয়ে বসেছিলেন। মাকে খুশি করতে ম্যামিলিয়াস তাঁর একটি ভাল-লাগা গল্প শোনাবার উপক্রম করছিল। এমন সময় কক্ষে ঢুকলেন রাজা। ছেলেকে সরিয়ে নিয়ে রানিকে নিক্ষেপ করলেন কারাগারে।

ম্যামিলিয়াস ছিল নেহাত শিশু। কিন্তু মাকে সে খুব ভালবাসত। মাকে অসম্মানজনকভাবে কারাগারে নিক্ষেপ করা হল দেখে সে মনে খুব ব্যথা পেল। আহারনিদ্রা থেকে তার রুচি গেল চলে। স্বাস্থ্য ভেঙে পড়ল। খুব রোগা হয়ে গেল সে। সবাই ভাবল দুঃখে বুঝি মারাই যাবে ম্যামিলিয়াস।

রানিকে কারাগারে নিক্ষেপ করার পর লিওন্টেস ক্লিওমেনস ও ডিওন নামে দুই সিসিলিয়ান লর্ডকে পাঠালেন ডেলফোসে – রানি অবিশ্বাসিনী কিনা, সে কথা অ্যাপোলোর মন্দিরের ওরাকল থেকে তা যাচাই করে আসার জন্য।

এদিকে কারাগারে রানি এক শিশুকন্যার জন্ম দিলেন। ভারি শান্তি পেলেন তিনি মনে সেই ফুটফুটে মেয়েটিকে দেখে। বললেন, “ওরে আমার ছোট্ট বন্দিনী সোনা, আমিও যে তোর মতোই নিষ্পাপ!”

হারমায়োনির সখি ছিলেন সিসিলিয়ান লর্ড অ্যান্টিগোনাসের স্ত্রী পলিনা। দয়াময়ী মহতী এক নারী ছিলেন তিনি। প্রভুপত্নী কারাগারে একটি শিশুর জন্ম দিয়েছেন শুনেই তিনি ছুটে গেলেন সেখানে। রানির পরিচর্যা করত এমিলিয়া নামে এক দাসী। পলিনা তাকে বললেন, “দোহাই এমিলিয়া, মহারানিকে গিয়ে বলো যে, তিনি যদি আমার উপর বিশ্বাস রেখে মেয়েটিকে আমার হাতে দেন, তাহলে আমি তাকে তার বাবার কাছে নিয়ে যাই। হয়ত এই নিষ্পাপ শিশুটিকে দেখে তাঁর মন গলে যাবে।” এমিলিয়া বললে, “আমি এক্ষুনি গিয়ে বলছি, ঠাকরুন। মহারানি আজই জিজ্ঞাসা করছিলেন, তাঁর কোনো সই মেয়েটাকে মহারাজের কাছে নিয়ে যেতে প্রস্তুত কিনা।” পলিনা বললেন, “আর তাঁকে বোলো, আমি তাঁর সপক্ষে মহারাজের সামনে সওয়াল করব।” এমিলিয়া বললে, “আপনি মহারানির জন্য কত করছেন। ভগবান আপনার ভাল করুন।” এমিলিয়া গেল হারমায়োনির কাছে। হারমায়োনি সানন্দে মেয়েকে ছেড়ে দিলেন পলিনার তত্ত্বাবধানে। তাঁর ভয় ছিল, কেউই বোধহয় মেয়েটিকে তার বাবার কাছে নিয়ে যেতে রাজি হবে না।

পলিনার স্বামী রাজাকে ভয় পেতেন। তিনি পলিনাকে রাজার কাছে যেতে বাধা দিলেন। তৎসত্ত্বেও পলিনা নির্ভয়ে সদ্যোজাত শিশুটিকে নিয়ে গেলেন রাজার কাছে। বাবার পায়ের কাছে মেয়েকে শুইয়ে পলিনা হারমায়োনির সপক্ষে অনেক কথা বললেন। অমানবিক আচরণের জন্য কঠোর তিরস্কার পর্যন্ত করলেন রাজাকে। অনুরোধ করলেন নিষ্পাপ রানি ও শিশুকন্যাটির প্রতি একটু সহৃদয়তা দেখানোর জন্য। কিন্তু পলিনার তেজস্বী প্রতিবাদে রাজার রাগ বাড়ল বই কমল না। অ্যান্টিগোনাসকে আদেশ করলেন, স্ত্রীকে তাঁর চোখের সামনে থেকে নিয়ে যেতে।

যাওয়ার সময় পলিনা মেয়েটিকে রেখে গেলেন তাঁর বাবার পায়ের কাছে। তিনি ভেবেছিলেন, একান্তে মেয়েটিকে দেখে রাজার মনে দয়ার উদ্রেক হলেও হতে পারে।

পলিনার উদ্দেশ্য সৎ ছিল। কিন্তু তিনি ভুল করেছিলেন। তিনি চলে যেতেই নিষ্ঠুর বাপ অ্যান্টিগোনাসকে আদেশ করলেন, মেয়েটিকে সমুদ্রে নিয়ে গিয়ে প্রথম যে নির্জন বেলাভূমি নজরে আসবে সেখানেই মৃত্যুমুখে ফেলে আসতে।

অ্যান্টিগোনাস ক্যামিলোর মতো সজ্জন ব্যক্তি ছিলেন না। তিনি রাজাজ্ঞা পালন করলেন অক্ষরে অক্ষরে। শিশুটিকে তুলে নিলেন একটি জাহাজে। তারপর চললেন কোনো এক নির্জন বেলাভূমির সন্ধানে। প্রথম যে জায়গাটি তাঁর নজরে আসবে, সেখানেই মেয়েটিকে ফেলে আসবেন বলে বদ্ধপরিকর ছিলেন তিনি।

হারমায়োনি অপরাধী – এই ধারণা রাজার মনে বদ্ধমূল হয়ে গিয়েছিল। তাই তিনি আর ডেলফোসের ওরাকলের পরামর্শপ্রার্থী ক্লিওমেনস ও ডিয়নের প্রত্যাবর্তনের অপেক্ষায় রইলেন না। রাজসভার সকল লর্ড ও অভিজাত পুরুষদের সামনে আদালতে রানির বিচারের আদেশ দিলেন তিনি। রানি তখনও গর্ভাবস্থা-উত্তর শারীরিক দুর্বলতা বা মূল্যবান শিশুটিকে হারানোর দুঃখ সামলে উঠতে পারেননি। এমন সময়ে দেশের সকল লর্ড, বিচারপতি ও অভিজাত পুরুষেরা একত্রিত হলেন রানির বিচার করতে। এঁরা সকলেই ছিলেন রানির প্রজা। দুঃখিনী রানি এঁদেরই সামনে দাঁড়ালেন এঁদের বিচারের রায় শোনার জন্য। ঠিক সেই সময়ে ক্লিওমেনস ও ডিয়ন উপস্থিত হলেন সেই সভায়। তাঁদের সঙ্গে ছিল ওরাকলের সিলমোহরবন্দী জবাব। লিওন্টেসের আদেশে ভাঙা হল সিলমোহর। পড়ে শোনানো হল সেই ওরাকল:- “হারমায়োনি নিষ্পাপ, পলিজেনাস নির্দোষ, ক্যামিলো এক সত্যকারের প্রজা, লিওন্টেস এক হিংসুটে ষড়যন্ত্রকারী, যা হারিয়ে গেছে, তা খুঁজে না পাওয়া গেলে, রাজা নিঃসন্তান অবস্থায় দিনযাপন করবেন।” রাজা ওরাকলটিকে গুরুত্ব দিলেন না। বললেন, ওগুলি রানির অনুচরদের অপপ্রচার মাত্র। রাজা বিচারকদের আদেশ করলেন রানির বিচার চালিয়ে যাওয়ার। লিওন্টেস বলছেন, এমন সময়ে একটি লোক এসে তাঁকে জানালো যে, মায়ের বিচার হচ্ছে শুনে দুঃখে ও লজ্জায় অকস্মাৎ প্রাণত্যাগ করেছেন রাজকুমার ম্যামিলিয়াস।

তাঁরই দুঃখে মর্মব্যথী হয়ে প্রিয় সন্তানের প্রাণত্যাগ করেছেন শুনে জ্ঞান হারালেন হারমায়োনি। লিওন্টেসের মনও ভেঙে পড়ল। এইবার দুঃখিনী রানির প্রতি কিছুটা সহানুভূতি জেগে উঠল তাঁর মনে। পলিনা ও অন্যান্য দাসীদের আদেশ করলেন, রানিকে ওখান থেকে নিয়ে গিয়ে সুস্থ করে তুলতে। খানিকবাদে পলিনা ফিরে এসে জানালেন, রানি মারা গিয়েছেন।

রানির মৃত্যুসংবাদ শুনে নিজের কঠোর মনোভাবের জন্য অনুতাপ করতে লাগলেন লিওন্টেস। ভাবলেন, তাঁরই দুর্ব্যবহারে রানির হৃদয় ভেঙে পড়েছিল। রানি নিষ্পাপ – ওরাকলের এই কথায় বিশ্বাস জন্মালো তাঁর। “যা হারিয়ে গেছে, তা খুঁজে না পাওয়া গেলে” – রাজা বুঝলেন কথাটা তাঁর কন্যা সম্পর্কে। রাজকুমার ম্যামিলিয়াস মৃত। এখন তিনি সত্যই নিঃসন্তান। গোটা রাজ্যের মূল্যেও তখন তিনি মেয়েকে ফিরে পেতে রাজি। শোক গ্রাস করল লিওন্টেসকে। এরপর বহু বছর বিষাদে, দুঃখে আর মনস্তাপেই কেটে গেল তাঁর।

এদিকে অ্যান্টিগোনাস শিশু রাজকুমারীকে নিয়ে যে জাহাজে করে চলেছিলেন, এক ঝড়ের কবলে পড়ে সেটি ভিড়ল পলিজেনাসের রাজ্য বোহেমিয়ার উপকূলে। অ্যান্টিগোনাস ঠিক করলেন মেয়েটিকে এখানেই ফেলে যাবেন।

রাজকুমারীকে কোথায় ফেলে এসেছেন, সেই খবর দিতে আর সিসিলি ফেরা হল না অ্যান্টিগোনাসের। তিনি জাহাজে ফেরার আগেই বন থেকে একটা ভালুক বেরিয়ে এসে তাঁকে টুকরো টুকরো করে ফেলল। লিওন্টেসের নিষ্ঠুর আদেশ পালন করার উপযুক্ত সাজা পেলেন তিনি।

হারমায়োনি খুব সাজিয়ে গুজিয়ে মেয়েকে পাঠিয়েছিলেন লিওন্টেসের কাছে। শিশুটির গায়ে ছিল বহুমূল্য বস্ত্র ও রত্নালঙ্কার। অ্যান্টিগোনাস পারডিটা নামটি একটি কাগজে লিখে আটকে দিয়েছিলেন মেয়েটির কাপড়ে। দুর্বোধ্য এই শব্দটি যেন শিশুটির বংশগত আভিজাত্য ও অভাবনীয় দুর্ভাগ্যের জানান দিতে লাগল।

এক মেষপালক হতভাগ্য পরিত্যক্ত শিশুটিকে খুঁজে পেল। সে ছিল দয়ালু লোক। তাই ছোট্ট পারডিটাকে তুলে এনে সে দিল তার বউয়ের হাতে। তার বউ মেয়েটির খুব যত্ন করল। কিন্তু মেষপালক ছিল গরিব। তাই পারডিটার সঙ্গে সে যে ধনরত্নগুলি পেয়েছিল, সেগুলির কথা সে কারোর কাছে প্রকাশ করল না। এলাকা ছেড়ে চলে গেল অন্যত্র। পারডিটার কয়েকটি অলঙ্কার বেচে একটা বড়ো মেষের পাল কিনে ধনী মেষপালক হয়ে বসল। পারডিটাকে সে নিজের মেয়ে হিসেবে মানুষ করতে লাগল। পারডিটাও জানল যে, সে মেষপালকেরই মেয়ে।

ধীরে ধীরে ছোট্ট পারডিটা সুন্দরী কিশোরী হয়ে উঠল। আর পাঁচটা মেষপালকের মেয়ের চেয়ে শিক্ষাদীক্ষা তার বেশি ছিল না বটে, কিন্তু তার শিক্ষাবিহীন মনে রাজরানি মায়ের থেকে উত্তরাধিকার সূত্রে পাওয়া একটা রাজকীয় ভাব ছিল। তার আচরণ দেখে মনে হত না যে, সে তার পৈত্রিক রাজসভার আবহে বেড়ে ওঠেনি।

বোহেমিয়ার রাজা পলিজেনাসের একমাত্র ছেলে ফ্লোরিজেল একদিন এই মেষপালকের কুটিরের কাছে শিকার করতে এসে মেয়েটিকে দেখতে পেল। পারডিটার রূপ, বিনয় ও রানি-সুলভ আচরণ দেখেই সে তার প্রেমে পড়ে গেল। তারপর ‘ডোরিকলস’ ছদ্মনামে এক সম্ভ্রান্ত ভদ্রলোকের ছদ্মবেশে সে বুড়োর কুটিরে নিত্য আসাযাওয়া শুরু করল। রাজপ্রাসাদ থেকে ফ্লোরিজেলের মাঝেমাঝেই উধাও হয়ে যাওয়া দেখে পলিজেনাস শঙ্কিত হয়ে উঠলেন। তিনি ছেলের পিছনে লোক লাগালেন। এবং অচিরেই জানতে পারলেন যে ছেলে তাঁর এক মেষপালকের সুন্দরী কন্যার প্রেমে পড়েছে।

পলিজেনাস ডাকলেন ক্যামিলোকে। এই সেই বিশ্বস্ত ক্যামিলো যিনি লিওন্টেসের ক্রোধ থেকে একদা তাঁর জীবনরক্ষা করেছিলেন। পলিজেনাস ক্যামিলোকে নিয়ে পারডিটার বাপ হিসেবে পরিচিত সেই মেষপালকের বাড়ি যাওয়ার ইচ্ছা প্রকাশ করলেন।

পলিজেনাস ও ক্যামিলো ছদ্মবেশে বুড়ো মেষপালকের কুটিরে এসে হাজির হলেন। সবাই সেখানে ভেড়ার লোম ছাঁটার বার্ষিক উৎসব পালন করছিলেন। পলিজেনাস ও ক্যামিলো ছিলেন অপরিচিত আগন্তুক। কিন্তু উৎসবের সময় সবাইকে স্বাগত জানানো হত বলে তাঁদেরও আমন্ত্রণ জানানো হল। তাঁরাও উৎসবে যোগ দিলেন।

সেখানে তখন শুধুই বইছিল আনন্দের স্রোত। পাতা হয়েছিল টেবিল। আয়োজন করা হয়েছিল গ্রাম্য এক ভোজসভার। বাড়ির সামনের ঘাসের উপর কয়েকটি ছেলেমেয়ে নাচছিল। কয়েকটি ছেলে দরজার কাছে দাঁড়ানো এক খেলনাওয়ালার কাছ থেকে রিবন, হাতমোজা আর খেলনা কিনছিল।

এত সব ব্যস্ততার মধ্যেও ফ্লোরিজেল আর পারডিটা এক কোণে বসে মনের আনন্দে গল্প করছিল। খেলাধূলা বা হালকা বিনোদনে তাদের মন ছিল না।

ছদ্মবেশী রাজাকে চেনা তখন তাঁর ছেলের পক্ষেও দুঃসাধ্য। এই সুযোগে রাজা কাছে গিয়ে তাদের কথোপকথন শুনতে লাগলেন। পারডিটার কথাগুলি ছিল সরল ও রাজোচিত। শুনে পলিজেনাস ভারি অবাক হলেন। তিনি ক্যামিলোকে বললেন, “ইতর সমাজে জন্ম নেওয়া কোনো মেয়েকে এমন সুন্দরী হতে দেখিনি। ওর হাবভাব, কথাবার্তা এই পরিবেশের সঙ্গে খাপ খায় না। তা অনেকটা সম্ভ্রান্তবংশীয়দের মতো।”

ক্যামিলো উত্তর দিলেন, “সত্যিই ভারী সুন্দরী মেয়েটি।”

রাজা বুড়ো মেষপালককে জিজ্ঞাসা করলেন, “আচ্ছা, বন্ধু, ওই যে ফরসাপানা ছোঁড়াটি তোমার মেয়ের সঙ্গে গপ্পো করছে, ও কে?” মেষপালক বলল, “ওরা বলে ওর নাম ডোরিকলস। ছোঁড়া বলে, ও নাকি আমার মেয়েকে ভালবাসে। সত্যি বলছি, আমার মেয়েটাও ওকে ভালবাসে। যদি ওই ডোরিকলস ছোঁড়া ওকে বিয়ে করে, তাহলে ওর জন্য আরও কিছু অপেক্ষা করছে।” মেষপালক পারডিটার অবশিষ্ট ধনরত্নের দিকে ইঙ্গিত করল। কিছু অংশ দিয়ে সে মেষের পাল কিনলেও বাকিটা পারডিটার বিয়ের জন্য তুলে রেখেছিল।

পলিজেনাস তার ছেলেকে বললেন, “এই যে, ছোকরা, শোনো! মনে হচ্ছে, কোনো কিছু তোমার মনকে এই ভোজসভা থেকে দূরে নিয়ে গেছে। আমার যখন বয়স অল্প ছিল তখন আমার প্রেমিকাকে আমি নানা উপহার দিতুম। কিন্তু তুমি তো দেখছি, খেলনাওয়ালাকে ডাকলেও না, মেয়েটাকে কিছু কিনেও দিলে না।”

তরুণ রাজকুমার তো জানত না যে, সে তার বাপের সঙ্গে কথা বলছে। সে বলে বসল, “মহাশয়, ওই সব ছোটোখাটো খেলনা ওর প্রাপ্য নয়। যে উপহার পারডিটা চায়, সে আমার হৃদয়ে বদ্ধ রয়েছে।” তারপর পারডিটার দিকে তাকিয়ে সে বলল, “শোনো, পারডিটা, এই প্রাচীন ভদ্রলোক, যিনি নিজেকে একদা প্রেমিক মনে করতেন, এঁরই সামনে আমি তোমাকে আমার মনের কথাটি বলি।” এই বলে সেই বৃদ্ধ আগন্তুককে সাক্ষী রেখে ফ্লোরিজেল পারডিটাকে বিয়ে করার প্রতিশ্রুতি দিল। তারপর পলিজেনাসকে বলল, “আপনার কাছে প্রার্থনা, আমার এই প্রতিশ্রুতির সাক্ষী থাকুন আপনি।”

“প্রতিশ্রুতি ভঙ্গ করো, যুবক,” এই বলে রাজা আত্মপ্রকাশ করলেন। এক ইতর শ্রেণির মেয়ের সঙ্গে নিজের বিয়ের সাক্ষী থাকতে বলার জন্য পলিজেনাস ছেলেকে খুব বকাঝকা করলেন। পারডিটাকে ‘মেষপালকের ঘরের ছেনাল, ভেড়ার খুঁটি’ ইত্যাদি নানা অসম্মানজনক নামে অভিহিত করলেন। ছেলের সঙ্গে সম্পর্ক রাখলে পারডিটা ও তার বাপকে নিষ্ঠুর মৃত্যুদণ্ডের ভয় দেখালেন।

প্রচণ্ড রেগে সেখান থেকে বেরিয়ে গেলেন রাজা। ক্যামিলোকে বলে দিলেন ফ্লোরিজেলকে নিয়ে আসতে।

এদিকে পলিজেনাসের বকুনি খেয়ে পারডিটার রাজকীয় সত্ত্বা জাগরিত হয়ে উঠল। সে বলল, “আমাদের সম্পর্ক ভেঙে দেওয়া হয়েছে। আমি আর ভয় পাই না। একবার কি দুই বার আমারও বলতে ইচ্ছে করছিল। ওঁকে বলতে চাইছিলাম, যে স্বার্থশূন্য সূর্য তাঁর প্রাসাদের উপর আলোকবর্ষণ করে, তা আমাদের কুটিরের কাছে মুখ লুকায় না। বরং আমাদের সবাইকে সমানভাবে দেখে।” তারপর দুঃখিতচিত্তে বলল, “কিন্তু আমার নিদ্রাভঙ্গ হয়েছে। আমি রানি হওয়ার বাসনা পোষণ করি না। আমাকে ছেড়ে দিন, মহাশয়, আমি মেষীর দুগ্ধ আহরণ করার পর একটু কাঁদতে চাই।”

দয়ালু ক্যামিলো পারডিটার দার্ঢ্য ও চারিত্রিক ঔচিত্যবোধ দেখে মুগ্ধ হলেন। বুঝলেন বাবা রাজামশাই যাই আদেশ করুন না কেন, তরুণ রাজকুমার সহজে তার প্রেয়সীকে ছেড়ে দেবে না। তাই তিনি প্রেমিকযুগলের বন্ধু হতে চাইলেন। তাঁর মনে একটা চমৎকার পরিকল্পনা ছিল।

ক্যামিলো আগেই জানতে পেরেছিলেন যে, সিসিলির রাজা লিওন্টেস এখন সত্যিই অনুতপ্ত। তাই তিনি তাঁর পুরনো প্রভু ও মাতৃভূমি দর্শনের ইচ্ছা দমন করতে পারলেন না। তিনি ফ্লোরিজেল ও পারডিটাকে তাঁর সঙ্গে সিসিলির রাজসভায় যাওয়ার প্রস্তাব দিলেন। বললেন, যতদিন না তাঁর মধ্যস্থতায় পলিজেনাস তাদের ক্ষমা করে এই বিবাহে সম্মতি দেন ততদিন সেখানে লিওন্টেস তাঁদের রক্ষা করবেন।

একথায় সবাই সানন্দে রাজি হয়ে গেল। ক্যামিলো পলায়নের তোড়জোড় করলেন। বুড়ো মেষপালককেও তাঁদের সঙ্গে নিলেন।

মেষপালক সঙ্গে নিল পারডিটার অবশিষ্ট ধনরত্ন, তার শিশুবয়সের জামাকাপড় আর তার কাপড়ের সঙ্গে যে কাগজটি বাঁধা ছিল সেটি।

নির্বিঘ্ন যাত্রার শেষে ফ্লোরিজেল, পারডিটা, ক্যামিলো ও বুড়ো মেষপালক নিরাপদে লিওন্টেসের রাজসভায় উপস্থিত হলেন। লিওন্টসে স্ত্রী হারমায়োনি ও তার সন্তানকে হারিয়ে তখনও অনুশোচনায় পুড়ছিলেন। তিনি পরম আনন্দে ক্যামিলোকে গ্রহণ করলেন এবং রাজকুমার ফ্লোরিজেলকে আন্তরিকভাবে স্বাগত জানালেন। ফ্লোরিজেল পারডিটার সঙ্গে লিওন্টেসের পরিচয় ঘটাল তার স্ত্রী রূপে। পারডিটাকে দেখে লিওন্টেস আশ্চর্য হয়ে গেলেন তাঁর মৃত রানি হারমায়োনির সঙ্গে পারডিটার চেহারার আশ্চর্য মিল দেখে। তাঁর বেদনা আরেকবার উথলে উঠল। বললেন, মেয়েকে নিষ্ঠুরভাবে নির্বাসিত না করলে, আজ তাঁর এমনই একটি ফুটফুটে মেয়ে থাকত। ফ্লোরিজেলকে বললেন, “আর তোমার বাবার মতো এক নির্ভীক বন্ধুর সাহচর্য ও ভালবাসাও হারাতে হত না আমায়। আহা! আর একবার আমি তাঁর সঙ্গে দেখা করতে চাই।”

রাজা একদিন তাঁর শিশুকন্যাকে হারিয়েছিলেন। আবার পারডিটা রাজার দৃষ্টি আকর্ষণ করল। ব্যাপার দেখে, বুড়ো মেষপালক রাজার মেয়ে হারানো আর তার মেয়ে পাওয়ার সময়টা হিসেব কষে দেখল। তার মনে হল, যে অবস্থায় সে পারডিটাকে পেয়েছিল, তাতে তার রাজকন্যা হওয়ার সম্ভাবনা উড়িয়ে দেওয়া যায় না। অন্তত তার ধনরত্ন ও অন্যান্য জিনিসপত্র সেই কথাই বলে। সে নিশ্চিত হল যে, পারডিটাই রাজার হারিয়ে যাওয়া সেই মেয়ে।

ফ্লোরিজেল, পারডিটা, ক্যামিলো ও বিশ্বস্ত পলিনার সামনে বুড়ো মেষপালক তার মেয়েটিকে খুঁজে পাওয়ার বৃত্তান্ত বর্ণনা করল। অ্যান্টিগোনাসের মৃত্যুর কথাও বলল। সে তাকে ভালুকের হাতে আক্রান্ত হতে দেখেছিল। মেষপালক শিশুর কাপড়টি দেখাল। পলিনার মনে পড়ল যে, এই কাপড়েই হারমায়োনি মেয়েটিকে রাজার কাছে পাঠিয়েছিলেন। মেষপালক যখন গয়নাগুলি দেখালো, পলিনার মনে পড়ল যে, হারমায়োনি এগুলিই মেয়ের গলায় বেঁধে দিয়েছিলেন। মেষপালক কাগজটি দেখাতে পলিনা তার স্বামীর লেখা চিনতে পারল। সকলে নিঃসন্দেহ হল যে পারডিটাই লিওন্টেসের হারিয়ে যাওয়া মেয়ে। পলিনার মনে তখন একই সঙ্গে স্বামীর মৃত্যুসংবাদের দুঃখ এবং ওরাকল পরিপূর্ণ হওয়া অর্থাৎ, রাজার হারানো উত্তরাধিকার ফিরে পাওয়ার আনন্দ তোলপাড় করতে লাগল। পারডিটাই তাঁর মেয়ে – একথা জানার পর হারমায়োনিকে হারাবার দুঃখ আবার একবার পেয়ে বসল লিওন্টেসকে। অনেকক্ষণ কথা বলতে পারলেন না তিনি। শুধু বলে গেলেন, “আহা, তোর মা, তোর মা!”

এই আনন্দবেদনাঘন মুহুর্তে ছেদ টানলেন পলিনা। তিনি লিওন্টেসকে বললেন, জুলিও রোমানো নামে এক অদ্বিতীয় শিল্পী তাঁর বাড়িতে রানির একটি মূর্তি বানিয়েছেন। সেই মূর্তি দেখলে রাজার মনে হবে, যেন স্বয়ং রানিই দাঁড়িয়ে রয়েছেন। খুব ভাল লাগবে তাঁর। একথা শুনে সকলেই তখন চললেন মূর্তিটি দেখতে। রাজা তাঁর হারমায়োনির প্রতিরূপ দেখার জন্য উৎসুক ছিলেন। পারডিটা তার মায়ের মূর্তি দেখার জন্য ব্যগ্র ছিল। মাকে সে তো কোনোদিন দেখেইনি।

পর্দা সরালেন পলিনা। মূর্তিটি একেবারে হারমায়োনির অনুরূপ। দেখে রাজার দুঃখ জেগে উঠল আর একবার। তিনি বাক্যহারা স্থবির হয়ে রইলেন অনেক ক্ষণ।

পলিনা বললেন, “আপনার স্তব্ধতা আমাকে আপ্লুত করছে, মহারাজ। একেবারে আপনার রানির মতো দেখাচ্ছে, তাই নয় কী?”

তখন রাজা বললেন, “আহা, যেমনটি ওকে প্রথম দেখেছিলুম, সেই রকমভাবেই দাঁড়িয়ে আছে। কিন্তু পলিনা, হারমায়োনিকে একটু বয়স্ক দেখাচ্ছে, ও তো এতটা বয়স্ক ছিল না।” পলিনা বলল, “শিল্পীর দক্ষতা তো এখানেই। তিনি এমনভাবে এই মূর্তি বানিয়েছেন, যাতে এটি দেখলে হারমায়োনি আজ কেমন দেখতে হতেন, তা বোঝা যায়। কিন্তু মহারাজ, এবার পর্দা ফেলব, নইলে আপনি ভেবে বসবেন, মূর্তিটি এবার নড়াচড়া করবে।”

তখন রাজা বললেন, “পর্দা ফেলো না। আহা, আমার মরণ হয় না কেন! দ্যাখো, ক্যামিলো, তোমার মনে হচ্ছে না যে, মূর্তিটার শ্বাস পড়ছে। মনে হচ্ছে না, ওর চোখের পাতার মধ্যে কেমন একটা প্রাণ রয়েছে।” পলিনা বলল, “মহারাজ, আমাকে পর্দা ফেলতেই হচ্ছে। আপনি অত্যন্ত বিহ্বল হয়ে পড়েছেন। আপনি উন্মাদ হয়ে যাবেন।” লিওন্টেস বললেন, “পলিনা, লক্ষ্মীটি, কুড়ি বছরের কথা আমাকে ভাবতে দাও। আজও মনে হয়, ওর থেকে একটা হাওয়া আসছে। আহা, কোন ছেনিতে ওমন নিঃশ্বাস ফুটে উঠেছে! লোকে যা বলে বলুক, আমি ওকে চুম্বন করব।” পলিনা বলে উঠল, “না মহাশয় না, ওর ঠোঁটের উপর রং এখনো কাঁচা রয়েছে। আপনার ঠোঁট লেগে ওই তেলরং নষ্ট করে দেবে। পর্দা ফেলি?” লিওন্টেস বললেন, “পর্দা ফেলবে? কী করে এই কুড়ি বছরের উপর পর্দা ফেলবে তুমি?”

পারডিটা হাঁটু গেড়ে বসে চুপচাপ মুগ্ধভাবে তার অপূর্ব সুন্দরী মায়ের মূর্তিটি দেখছিল। এবার সে বলল, “এখানে বসে মায়ের মূর্তিটির দিকে তাকিয়ে থাকব।”

পলিনা বললেন, “বিহ্বলতা কাটিয়ে উঠুন, আমাকে পর্দা ফেলতে দিন। আর তা না হলে, আরও আশ্চর্য কিছু দেখার জন্য প্রস্তুত থাকুন। আমি এই মূর্তিটাকে জীয়ন্ত করে তুলতে পারে। ওকে আপনাআপনি বেদি থেকে নামিয়ে আনতে পারি। ওকে দিয়ে আপনার হাত ধরাতে পারি। না, আপনি যদি ভাবেন যে, আমি কোনো অশুভ শক্তির সাহায্যে এমনটা করতে চাইছি, তাহলে আপনি ভুল ভাববেন।”

হতবাক রাজা বললেন, “তুমি ওকে দিয়ে যা করাবে, আমি তা-ই প্রাণভরে দেখব। যা বলাবে, তাই হৃদয় ভরে শুনব। শুধু ওকে জীয়ন্ত করে কথা বলাও।”

পলিনা সবকিছু প্রস্তুত করেই রেখেছিলেন। তিনি মৃদুস্বরে গান ধরলেন। এই গান তিনি এই উদ্দেশ্যেই বেঁধে রেখেছিলেন। তাঁর স্পর্শে দর্শকদের বেবাক করে মূর্তিটা নেমে এল বেদি থেকে। জড়িয়ে ধরল লিওন্টেসের গলা। কথা বলল। স্বামী আর নবলব্ধ সন্তান পারডিটার জন্য প্রার্থনা করতে লাগল।

মূর্তিটা যে লিওন্টেসের গলা জরিয়ে ধরে তার স্বামী ও সন্তানের জন্য প্রার্থনা করল, তাতে সন্দেহ রইল না। সন্দেহ রইল না যে, মূর্তিটাই স্বয়ং হারমায়োনি, অকৃত্রিম, জীবন্ত রানি।

পলিনা মিথ্যে বলেছিলেন। হারমায়োনি মারা যাননি। পলিনা রাজাকে রানির মৃত্যুসংবাদ দিয়ে রানির প্রাণরক্ষা করতে চেয়েছিলেন। তারপর থেকে হারমায়োনি দয়ালু পলিনার কাছেই থেকে যান। লিওন্টেস সেকথা ঘূণাক্ষরেও জানতে পারেননি। তাঁর প্রতি কৃত অবিচার রানি অনেক কাল আগেই ক্ষমা করে দিয়েছিলেন। কিন্তু ক্ষমা করতে পারেননি তাঁর শিশুকন্যার উপর প্রদর্শিত নিষ্ঠুরতা। তাই পারডিটাকে খুঁজে না পাওয়া পর্যন্ত তিনি আত্মগোপন করে থাকেন।

মৃত রানি ফিরে পেলেন প্রাণ। ফিরে এল হারানো মেয়ে। লিওন্টেসের বহুকালের দুঃখ ঘুচে তখন শুধুই আনন্দ আর আনন্দ।

চারিদিকে সবাই তাঁদের অভিনন্দন জানায়। নানা স্নেহবাক্য বলে। আনন্দিত পিতামাতা রাজকুমার ফ্লোরিজেলকে ধন্যবাদ জানায়, তাদের মেয়েকে ইতর শ্রেণির লোকেদের মধ্যে পেয়েও তাকে ভালবাসার জন্য। ক্যামিলো ও পলিনাও খুব খুশি হয়। খুশি হয় তাদের সেবার এমন মধুর ফল দেখে।

এই আশ্চর্য অভাবনীয় আনন্দময় পরিবেশে প্রাসাদে প্রবেশ করেন রাজা পলিজেনাস।

পলিজেনাস তাঁর ছেলে আর ক্যামিলোকে দেখতে না পেয়ে ধরে নেন যে, পলাতকেরা এখানে এসেছে। কারণ ক্যামিলো অনেক দিন ধরেই সিসিলিতে ফিরতে চাইছিলেন। পলিজেনাস দ্রুত তাঁদের পিছু নেন। শেষে এখানে যখন আসেন, সেই মুহুর্তটি লিওন্টেসের জীবনের সবচেয়ে আনন্দঘন ক্ষণ।

পলিজেনাসও আনন্দ উৎসবে যোগ দিলেন। ক্ষমা করে দিলেন বন্ধুর অন্যায় ঈর্ষা ও প্রতিহিংসাপরায়ণতা। ছেলেবেলার বন্ধুত্ব আর একবার ফিরে পেলেন দু’জনে। পারডিটার সঙ্গে ছেলের বিয়েতে তাঁর অমত হওয়ার ভয়ও দূর হল। কারণ পারডিটা তখন আর ‘ভেড়ার খুঁটি’ নয়, বরং সিসিলির রাজসিংহাসনের উত্তরাধিকারিণী।

এভাবে আমরা দেখলাম, বহুকালের দুঃখিনী হারমায়োনির তিতিক্ষার জয়। তিনি হলেন পৃথিবীর শ্রেষ্ঠ রানি ও সবচেয়ে সুখী মা। এই মহীয়সী নারী বহুকাল লিওন্টেস ও পারডিটার সঙ্গে সুখে কালাতিপাত করেছিলেন।

দ্য কমেডি অব এররস

বহুকাল ধরেই ঝগড়া-ঝাটি লেগে আছে দুটি পাশাপাশি রাজ্য সিরাকিউজ আর এফিসাসের মধ্যে। তদুপরি তাদের মনোমালিন্য আরও চরমে পৌঁছেছে সাম্প্রতিক চালু করা একটা আইন নিয়ে। একটা নতুন আইন চালু করেছেন এফিসাসের ডিউক, যা হল সিরাকিউজের কোনও নাগরিক এফিসাসে ঢুকে পড়লে তার সব টাকা-কড়ি কেড়ে নিয়ে প্রাণদণ্ড দেওয়া হবে তাকে। তবে সেই প্রাণদণ্ডে দণ্ডিত ব্যক্তির পক্ষে এফিসাসের কোনও নাগরিক যদি এক হাজার মার্ক জরিমানা দেয়, তাহলে মকুব করে দেওয়া হবে সেই ব্যক্তির প্রাণদণ্ড।

ঘটনাচক্রে সিরাকিউজের এক বৃদ্ধ সওদাগর, ইজিয়ান এসে পৌঁছালেন এফিসাসে। নতুন আইন সম্পর্কে জানা ছিল না তার। স্বাভাবিকভাবেই নিজের পরিচয় দিতে গিয়ে তিনি নিজেকে সিরাকিউজের অধিবাসী বলে উল্লেখ করলেন। সাথে সাথেই প্রহরীরা তার টাকা-কড়ি ও অন্যান্য জিনিস-পত্ৰ কেড়ে নিয়ে গ্রেফতার করল তাকে। তার হাত-পা বেঁধে প্রহরীরা তাকে হাজির করল এফিসাসের ডিউক সোলিনাসের সামনে। প্রহরীদের কাছে সব কথা শুনে ইজিয়নকে প্রাণদণ্ডে দণ্ডিত করলেন ডিউক। তিনি আরও বললেন সূর্যাস্তের আগে যদি কোনও নাগরিকতার জরিমানা স্বরূপ এক হাজার মার্ক মিটিয়ে দেয়, তবেই মকুব হবে ইজিয়নের প্রাণদণ্ড। বৃদ্ধ ইজিয়ন ভেবে পেলেন না। এমন কোনো সহৃদয় নাগরিক আছে যে তার জরিমানার টাকা মিটিয়ে দেবে। এবার ডিউক জানতে চাইলেন কেন এফিসাসে এসেছে ইজিয়ন। ডিউকের প্রশ্নের জবাবেইজিয়ন, তার জীবনের করুণ কাহিনি শোনাতে লাগলেন ডিউককে।

ইজিয়ান বলতে লাগলেন, আমি সিরাকিউজে জন্মেছি। বড়ো হয়ে আমার পেশা হিসেবে বেছে নিয়েছি ব্যবসা-বাণিজ্যকে। বিবাহিত জীবন সুখেই কেটেছে। এপিড্যামনামে আমার ব্যবসার দেখ-ভাল করত এক বিশ্বস্ত কর্মচারী। সে মারা যাবার পর অন্য কাউকে দায়িত্ব না দিয়ে আমি নিজেই চলে এলাম এপিডামনামে। সেখানে এসে ব্যবসার নানা কাজে জড়িয়ে পড়লাম। আমি। সে সব কাজ মিটিয়ে তাড়াতাড়ি বাড়ি ফেরা গেল না –। এমনকি ছমাসেও শেষ হল না সে সব কাজকর্ম। আমি বাড়ি না ফেরায় স্বভাবতই অস্থির হয়ে উঠল। স্ত্রী এমিলিয়া। আমি চলে যাবার সময় স্ত্রী এমিলিয়া ছিল গর্ভবতী-আমার জন্য সে ব্যাকুল হয়ে উঠল। শেষে থাকতে না পেরে অন্য এক জাহাজে চেপে হাজির হল আমার কাছে এপিড্যামনামে। সেখানে আসার অল্পদিন বাদেই আমার স্ত্রী যমজ ছেলের জন্ম দিলেন। ছেলে দুটি দেখতে হুবহু এক রকম। — কোনও তফাত নেই তাদের। আমরা উভয়ের নামকরণ করলাম অ্যান্টিফোলাস — একজন বড়ো অ্যান্টিফোলাস আর অন্যজন ছোটো অ্যান্টিফোলাস। এক এক সময় আমরাই বুঝে উঠতে পারতাম না ওদের মধ্যে কে বড়ো, কে ছোটো।

আমার প্রতিবেশিনী ছিলেন এক দরিদ্র মহিলা। তিনি ও আমার স্ত্রী, উভয়ে একই দিনে সন্তান প্রসব করেন। আশ্চর্যের কথা, ওই মহিলাও আমার স্ত্রীর মতো যমজ সন্তানের জন্ম দেন। দুৰ্ভাগ্যবশত যমজ সন্তান প্রসব করেই ওই মহিলা মারা যান। ওই বাপ-মা হারা ছেলে দুটিকে আমি তখন নিজ বাড়িতে নিয়ে আসি। ভেবেছিলাম বড়ো হয়ে ওই শিশু দুটি আমার দুই ছেলের চাকরের কাজ করবে। মহামান্য ডিউক! আপনি বিশ্বাস করবেন। কিনা জানি না, আমার যমজ ছেলেদুটির মতো ওই শিশু দুটিও ছিল হুবহু একই রকম। আমি তাদের নাম দিলাম বড়ো ড্রোমিও আর ছোটো ড্রোমিও।

এপিড্যামনামে কয়েক বছর বাস করার পর আমার স্ত্রী তাগাদ দিতে লাগলেন দেশে ফেরার জন্য। রোজ রোজ তাগাদা শুনে আমিও সিদ্ধান্ত নিলাম দেশে ফেরার। একদিন স্ত্রী এমিলিয়া, বড়ো অ্যান্টিফোলাস, ছোটো অ্যান্টিফোলাস, বড়ো ড্রোমিও আর ছোটো ড্রোমিওকে নিয়ে জাহাজে চেপে রওনা দিলাম দেশের উদ্দেশে। দুদিন দু রাত নির্বিয়ে কেটে গেল জাহাজে। তৃতীয় দিন দুপুর থেকেই জটিল হতে লাগল পরিস্থিতি। একফালি ঘন কালো মেঘ দেখা দিল আকাশের এক কোণে। কিছুক্ষণের মধ্যেই সেই একটুকরো মেঘ ছেয়ে ফেলল। সারা আকাশকে, সাথে সাথে শুরু হল ঝড়-বৃষ্টির দাপট। প্রতিমুহূর্তেই আমাদের মনে হচ্ছিল জাহাজটা যেন ভেঙে টুকরো টুকরো হয়ে যাবে। প্রকৃতির তাণ্ডবের হাত থেকে রক্ষা পেতে জাহাজের ক্যাপ্টেন আর মাঝি-মাল্লারা ছোটো ছোটো, নৌক জলে নামিয়ে যে যেদিকে পারে পালিয়ে গেল। এক মুহুর্তের জন্যও কেউ ভাবল না। আমাদের কথা। কী করব ভেবে পাচ্ছিলাম না, এমন সময় চোখে পড়ল পাটাতনের এক কোণে রাখা জাহাজের একটি বাড়তি মাস্তুলের উপর। আমনি মাথায় এক বুদ্ধি এসে গেল। ওই মাস্তুলের একদিকে শক্ত করে বাঁধলাম স্ত্রী এমিলিয়া, ছোটো অ্যান্টিফোলাস আর ছোটো ড্রোমিওকে, আর অন্যদিকে বাঁধলাম বড়ো অ্যান্টিফোলাস, বড়ো ড্রোমিও আর নিজেকে। এরপর যা হয় হোক ভেবে নিয়ে বাঁপিয়ে পড়লাম সমুদ্রের জলে। জলে ভেসে থাকতে কোনও অসুবিধা হল না। উদ্দেশ্যহীনভাবে আমরা ভেসে চললাম। উত্তাল সমুদ্রের বুকে। ঝড়টা যখন সবে স্তিমিত হয়ে আসছে, সে সময় ঘটে গেল এক অদ্ভূত ঘটনা। ডুবোপাহাড়ে ধাক্কা খেয়ে মাস্তুলটা ভেঙে দু-টুকরো হয়ে গেল। মুহুর্তের মধ্যে আমরা বিচ্ছিন্ন হয়ে গেলাম স্ত্রী এমিলিয়া, ছোটো অ্যান্টিফোলাস ও ছোটো ড্রোমিওর কাছ থেকে। অসহায়ভাবে চেয়ে দেখলাম ভাঙা মাস্তুলটা তাদের নিয়ে চলেছে। আমাদের উল্টোদিকে। কিছুক্ষণ বাদে দূর থেকে দেখলাম একটা ছোটো নৌকা এসে তাদের তুলে নিল সেই জাহাজে। কিছুটা আশ্বস্ত হলাম। এই দেখে যে তারা জাহাজে আশ্রয় পেয়েছে। দূর থেকে দেখে মনে হল সেটা করিস্থেরই কোনও জাহাজ। এরপর পাল তুলে যাত্রা করল সেই জাহাজটি, ধীরে ধীরে তা মিলিয়ে গেল দিগন্তের ওপারে।

পরম করুণাময় ঈশ্বরের অসীম কৃপায় আমাদেরও আর বেশিক্ষণ জলে ভেসে থাকতে হল না। ভাসতে ভাসতে কিছুক্ষণ পর আমরা এক জাহাজের সামনে এসে পৌঁছালাম। আমাদের দেখতে পেয়ে জাহাজের মাঝি-মাল্লারা নৌকা নামিয়ে আমাদের তুলে নিল। ঝড়-বৃষ্টি থেমে যাবার পর তারা আমাদের পৌঁছে দিল সিরাকিউজ বন্দরে। হে মহামান্য ডিউক! সেই থেকে আমি খুঁজে বেড়াচ্ছি স্ত্রী এমিলিয়া ও সেই শিশু দুটিকে। কিন্তু আজ পর্যন্ত তাদের দেখা পাইনি। এভাবে দিন কেটে যেতে লাগল। আজ বড়ো অ্যান্টিফোলাস আর বড়ো ড্রোমিও- উভয়েই পা দিয়েছে আঠারোয়। এখন তারা বলছে যে তারা বড়ো হয়েছে, এবার খুঁজতে বেরুবে মা-ভাইদের 1 তারা যেখানেই থাক না কেন, আমার বিশ্বাস এমিলিয়া, ছোটো অ্যান্টিফোলাস আর ছোটো ড্রোমিও সবাই জীবিত আছে। বয়সের ভারে আমার দেহ-মন খুবই ক্লান্ত, তাই ইচ্ছে সত্ত্বেও তাদের সঙ্গী হতে পারছি না। আমি। এমনিতেই প্ৰিয়জনদের হারিয়ে আমার মন ভেঙে গেছে। তার উপর যে দুজন আছে, তারাও যদি হারিয়ে যায় সেই ভয়ে আমি শুরুতে রাজি ছিলাম না তাদের প্রস্তাবে। কিন্তু অভিযানের নেশায় তাদের রক্ত গরম, তাই আমরা বারণ সত্ত্বেও পেছু হঠল না তারা। শেষমেশ অনেক বুঝিয়ে তারা আমাকে রাজি করাল। এক শুভদিনে বেরিয়ে পড়ল তারা।

ওরা চলে যাবার পর প্রিয়জনকে ফিরে পাবার আশায় দিন কাটতে লাগল আমার। দেখতে দেখতে পুরো এক বছর কেটে গেল তবুও ওরা ফিরে এল না। এভাবে একবছর কেটে যাওয়ার পর আমার আর ধৈর্যােসইল না। মনে হল, ওদের অনুমতি দিয়ে ঠিক কাজ করিনি। আমি। বেপরোয়া হয়ে আমি তাদের খুঁজতে বেরলাম জাহাজে চেপে। পাগলের মতো আমি ওদের খুঁজে বেড়ালাম এশিয়া-ইউরোপের দেশে-দেশে, বন্দরে-বন্দরে, কিন্তু কোথাও তাদের হদিস পেলাম না। হতাশ হয়ে একসময় দেশে ফেরার জন্য চেপে বসলাম জাহাজে। মাঝপথে কেন যে হঠাৎ এফিসাস বন্দরে নেমেছি তা আমি ভেবে উঠতে পারছি না। এদেশে যে এমন অদ্ভূত আইন চালু হয়েছে তা আমার জানা ছিল না। শহরে ঢুকতেই রক্ষীদের চোখে পড়ে গেলাম আমি। তারা আমায় বন্দি করে হাতকড়া পরিয়ে নিয়ে এল আপনার দরবারে। তারপর যা ঘটেছে তা তো অজানা নেই আপনার, মহামান্য ডিউক।

ইজিয়নের বেদনাভরা জীবন-কাহিনি শুনে খুবই ব্যথা পেলেন ডিউক। তিনি বললেন, দেখ, সওদাগর ইজিয়ন! তোমার জন্য আমি সত্যিই খুব দুঃখিত। কিন্তু দেশের প্রচলিত আইন ভেঙে তোমাকে মুক্তি দেওয়া আমার ক্ষমতার বাইরে। তবে তোমার মানসিক অবস্থা বিবেচনা করে পুরো একদিন সময় দিলাম। হয়তো এই এফিসাস নগরে তোমার এমন কোনও আত্মীয়-বন্ধু আছে যে জরিমানার টাকা জমা দিয়ে তোমায় খালাস করে দিতে পারে–এই বলে কারাধ্যক্ষকে ডেকে ডিউক আদেশ দিলেন, একে কারাগারে নিয়ে যাও আর শহরের নাগরিকদের জানিয়ে দাও এর প্রাণদণ্ডের কথা। যদি কোনও সহৃদয় নাগরিক এর জরিমানার টাকা দিতে রাজি হয়, তাহলে একে ছেড়ে দিতে আমার কোনও আপত্তি নেই। ডিউককে অভিবাদন জানিয়ে কারাধ্যক্ষ ইজিয়নকে নিয়ে গেলেন। কারাগারে।

 

আসুন! এবার আমরা ফিরে তোকই অতীতের দিকে। আঠারো বছর আগে ঝড়-বৃষ্টির সময় যে মাঝি-মাল্লারা এমিলিয়া, ছোটো অ্যান্টিফোলাস আর ছোটো ড্রোমিওকে জাহাজে তুলে নিয়েছিল তারা সবাইছিল আদতে জলদসু্য। জাহাজ এফিসাস বন্দরে ভিড়তেই তারা তাড়িয়ে দিল এমিলিয়াকে। তারপর তারা ছোটো অ্যান্টিফোলাস আর ছোটো ড্রোমিওকে চড়া দামে বিক্রি করে দিলে এক ধনী যোদ্ধার কাছে। সেই যোদ্ধা ছিলেন। এফিসাসের ডিউকের ঘনিষ্ঠ আত্মীয়। একদিন আত্মীয়ের বাড়িতে বেড়াতে এসে ডিউকের নজর পড়ল সেই শিশু দুটির দিকে। প্রথম দেখাতেই তার মায়া জন্মে গেল শিশু দুটির উপর। আত্মীয়টি যে দামে শিশু দুটিকে কিনেছিলেন, তার চেয়ে অনেক দাম দিয়ে তিনি তাদের নিয়ে এলেন রাজপ্রাসাদো-সেখানেই তারা মানুষ হতে লাগল। লেখাপড়ার সাথে সাথে তারা মল্লবিদ্যাও শিখতে লাগল। ওরা একটু বড়ো হবার পর ডিউক তাদের যুদ্ধবিদ্যাও শেখালেন। অল্পদিনের মধ্যেই যুদ্ধবিদ্যায় পারদর্শিতা দেখালেন ছোটো অ্যান্টিফোলাস। তখন ডিউক তার সেনাবাহিনীতে সৈনিকের পদে নিয়োগ করলেন তাকে। অল্পদিনের মধ্যেই ছোটো অ্যান্টিফোলাস তার অসাধারণ দক্ষতা দেখিয়ে ডিউকের রাজসভায় স্থায়ী আসন অর্জন করল। ক্রমে ক্ৰমে সে ডিউকের প্রিয়পাত্র হয়ে উঠল। এরপর ডিউক ছোটো অ্যান্টিফোলাসের বিয়ে দিলেন শহরের সম্রােন্ত ধনীর মেয়ে আড্রিয়ানার সাথে। আড্রিয়ানা যেমন সুন্দর দেখতে তেমনি গুণবতী। বিয়ের সময় তার শ্বশুর ছোটো অ্যান্টিফোলাসকে একটি সুন্দর বাড়িও যৌতুক হিসেবে দিলেন। আড্রিয়ানা তার নিজের অবিবাহিতা ছোটো বোন লুসিয়াকে এনে রাখল নিজের কাছে। কাজের দরুন ছোটো অ্যান্টিফোলাস যখন বাইরে থাকে, সে সময়টা বড়ো বোন আড্রিয়ানাকে সঙ্গ দেয় লুসিয়া না সাহায্য করে ঘর-দের গোছাতে। বড়ো বোন আড্রিয়ানার মতো লুসিয়াও অসাধারণ রূপসি।

রূপবতী স্ত্রী আর শ্যালিকাকে নিয়ে সুখে-স্বচ্ছন্দে দিন কটালেও মনে শান্তি নেই ছোটো অ্যান্টিফোলাসের। মার কথা মনে পড়লেই সে যেন কেমন আনমনা হয়ে যায়, সব সময় কেঁদে ওঠে তার মন। কী অদ্ভুত এই নিয়তির খেলা! মৃত্যুদণ্ডে দণ্ডিত বন্দি ইজিয়ান জানেন না যে তার ছেলে ছোটো অ্যান্টিফোলাস আর পালিত পুত্র ছোটো ড্রোমিও রাজার হালে দিন কাটাচ্ছে এই শহরে বসে।

 

কী বিচিত্র এই নিয়তির লীলাখেলা। বৃদ্ধ সওদাগরাইজিয়নকে কারাগারে নিয়ে যাবার কিছুক্ষণ বাদে একটি জাহাজ এসে ভিড়ল এফিসাস বন্দরে। সেই জাহাজে ছিল ইজিয়নের ছেলে বড়ো অ্যান্টিফোলাস আর বড়ো ড্রোমিও। জাহাজ থেকে নামার আগে এক সহৃদয় ব্যক্তি বড়ো অ্যান্টিফোলাসকে জানাল এফিসাসের নতুন আইনের কথা এবং সে এও বলল রক্ষীদের প্রশ্নের জবাবে বড়ো অ্যান্টিফোলাস যেন না বলে যে সে সিরাকিউজ থেকে এসেছে। এফিসাসের নতুন আইন অনুযায়ী কোনও সিরাকিউজবাসী সেখানে এলেই তার প্রাণদণ্ড হবে – এ কথা সে প্রথম জানতে পারল সেই যাত্রীর কাছে থেকে। এবার মাল-পত্ৰ নিয়ে তারা নেমে পড়ল ডাঙায়। রক্ষীদের প্রশ্নের জবাবে উভয়ে জানাল যে এপিড্যামনাম থেকে আসছে তারা। বন্দর থেকে বেরিয়ে এসে তারা শুনতে পেল সেইদিনই শুধু সিরাকিউজের অধিবাসী এই অপরাধে একজন বৃদ্ধ সওদাগরকে প্রাণদণ্ডে দণ্ডিত করা হয়েছে। কিন্তু তারা কেউই জানতে পারল না যে সেই বৃদ্ধ সওদাগরই ইজিয়ন।

সম্পর্কে মনিব আর চাকর হলেও মাঝে মাঝে সমবয়স্ক বন্ধুর মতো একে অপরের সাথে কথা-বার্তা বলে। কখনও মানিবের মন খারাপ হলে বড়ো ড্রোমিও চেষ্টা করে হাসি-ঠাট্টার মাধ্যমে তাকে চাঙ্গা করে তুলতে।

কদিন এ শহরে থাকতে হবে তার ঠিক নেই। কাজেই থাকা— খাওয়ার একটা নিশ্চিন্ত ব্যবস্থা করতে ব্যাকুল হয়ে উঠল বড়ো অ্যান্টিফোলাস। জাহাজে থাকাকালীন এক যাত্রীর মুখে সে শুনেছিল এই শহরের সবচেয়ে ভালো হোটেলের নাম সেন্টার হোটেল। সেই হোটেলে থাকা-খাওয়ার ব্যবস্থা করার জন্য সে বড়ো ড্রোমিওকে ডেকে পাঠিয়ে তার হাতে প্রয়োজনীয় টাকা-কড়ি দিয়ে দিল। হোটেলে থাকা-খাওয়ার ব্যবস্থা করার জন্য বড়ো ড্রোমিও বেরিয়ে যেতেই মা-ভাইয়ের খোঁজে আশপাশের কয়েকটা রাস্তায় ঘুরে বেড়াল বড়ো অ্যান্টিফোলাস। কিন্তু তাদের কোনো হদিস না। পেয়ে মন খারাপ হয়ে গেল তার। সে ভাবতে লাগিল দেশে ফিরে গিয়ে বাবাকে কী জবাব দেবে। ঠিক সে সময় সে দেখতে পেল ড্রোমিওকে। অবাক হয়ে বড়ো অ্যান্টিফোলাস বলল, কীরে! এত তাড়াতাড়ি ফিরে এলি? হোটেলের খাতায় আমাদের নাম-ধাম লিখিয়ে টাকা-পয়সা জমা দিয়েছিস তো? আমরা যে এপিডামনাম থেকে এসেছি সে কথা বলেছিস তো?

ড্রোমিও জবাব দিল, এ সব আপনি কী বলছেন? আপনার আসতে দেরি দেখেই তো গিন্নিমা আপনার খোঁজে আমায় পাঠালেন। তাড়াতাড়ি চলুন, নয়তো খাবার-দাবার জুড়িয়ে জল হয়ে যাবে।

ধমকে উঠে বলল বড়ো অ্যান্টিফোলাস, পাগলের মতো কি যা-তা বকছিস? গিঘিমা! সে আবার কে! এই কি তোর ঠাট্টা করার সময়?

বাঃ! বেশ বলেছেন তো! বলল ড্রোমিও, আমাদের গিন্নিমা মানে আপনার স্ত্রী আর সুন্দরী শ্যালিকা আপনার সাথে খাবে বলে সেই কখন থেকে অপেক্ষা করে বসে আছে। তাদেরও তো ক্ষুধা-তৃষ্ণা আছে সে কথা কেন ভুলে যাচ্ছেন?

ধমকে উঠে বলল বড়ো অ্যান্টিফোলাস, এখানে এসে তোর খুব বাড় বেড়েছে, তাই না? আরে আমি বিয়ে করলাম কবে যে আমার বউ আর শ্যালিকা অপেক্ষা করে বসে থাকবে? আর দ্যাখ! দুপুর হতে চলল, এখন এসব রসিকতা আর ভালো লাগছে না। এখন বল, হোটেলে ঘর ভাড়া নিয়েছিস তো? ঘরে আলো-হাওয়া ঢোকে তো? টাকা-পয়সা জমা দিয়েছিস?

উভয়ের চড়া গলার কথা-বার্তা শুনে কিছু কৌতূহলী মানুষের ভিড় জমে উঠল তাদের চারপাশে। তাদের দিকে এক পলক তাকিয়ে আপন মনে বলে উঠল। ড্রোমিও, এ আবার কী ফ্যাসাদে পড়া গেল! মনিবের কি মাথা খারাপ হয়ে গেল? সে মনিবের দু-হাত ধরে বলল, বিশ্বাস করুন, আমি আপনার সাথে ঠাট্টা-তামাশা করছি না। মনে হচ্ছে আপনিই বরং আমার সাথে ঠাট্টা-তামাশা করছেন। সে যাই হোক, আপনি খাওয়া-দাওয়ার পাটটা আগে মিটিয়ে ফেলুন, নইলে বাড়ির কারও খাওয়া হবে না। এ কথাটা কেন আপনি বুঝতে পারছেন না? দোহাই আপনার! এবার বাড়ি চলুন। গিন্নিমা আপনার জন্য….।

আবার বলছিস গিন্নিমা! হতভাগা, আমার সাথেইয়ার্কি হচ্ছে? বলেই সবার সামনে ড্রোমিওকে বেশ কয়েক ঘা লাগিয়ে দিল বড়ো অ্যান্টিফোলাস। মার খেয়ে একটি কথাও না বলে চোেখ মুছতে মুছতে ড্রোমিও ফিরে গেল গিন্নিমার কাছে।

কেঁদে কেঁদে গিন্নিমাকে শোনাল ড্রোমিও কীভাবে সবার সামনে রাস্তার মাঝে সে মার খেয়েছে মনিবের হাতে। সব শুনে বেজায় রেগে গেল আড্রিয়ানা। সে ধরে নিল তার স্বামী অন্য কোনও মেয়ের প্রেমে পড়েছে।

চাকরকে সাস্তুনা দিয়ে বলল, আড্রিয়ানা, মিনিবের হাতে মার খাবার জন্য তুই দুঃখ করিস না ড্রোমিও। আমি কথা দিচ্ছি। উনি ফিরে এলেই এর একটা হেস্তনেস্ত করে তবে ছাড়ব।

পাশ থেকে আড্রিয়ানার ছোটো বোন লুসিয়ানা বলে উঠল, দেখতে পাচ্ছি শুধু তোর বর নয়, তোরও মাথা খারাপ হয়েছে। আচ্ছা, তোর বর যদি সত্যিই অন্য কারও প্রেমে পড়ে থাকেন, তাহলে কি তিনি সে কথা স্বীকার করবেন? দ্যাখ, ওভাবে কাজ হবে না। এবার আমি যা বলি তা মন দিয়ে শোন। চল, ওদের হাতে-নাতে ধরতে আমরা এখনই বেরিয়ে পড়ি — ঘাড় ধরে নিয়ে আসি তোর বরকে। যদি দেখি সে কোনও সর্বনাশীর সাথে ফষ্টি-নষ্টি করছে, তাহলে সবার সামনে তার চুলের মুঠি ধরে বেশ কয়েক ঘা লাগিয়ে দিবি যাতে অন্যের সাথে প্রেম করার শখ চিরদিনের মতো মিটে যায়।

আড্রিয়ানার মনে ধরল। ছোটো বোনের কথা। সে তখনই তার সাথে বেরিয়ে গেল স্বামীর খোঁজে।

সবার সামনে ড্রোমিওকে মার-ধর করার জন্য মনটা বেশ খারাপ লাগছে অ্যান্টিফোলাসের। সে সোজা চলে এল সেন্টর হোটেলে। দেখল তার অপেক্ষায় দাঁড়িয়ে আছে ড্রোমিও। সে বলল মনিবের কথামতো ঘর ভাড়ার টাকা সে আগাম জমা দিয়েছে।

এই তো আমার কথা মতো কাজ করেছিস, বলল অ্যান্টিফোলাস, তাহলে কিছুক্ষণ আগে কেন বলছিলি। গিন্নিমা অপেক্ষা করছে, তাড়াতাড়ি বাড়ি না গেলে খাবার ঠান্ড হয়ে যাবে। — এইসব আজে-বাজে কথা? ড্রোমিও আশ্চর্য হয়ে গেল এসব কথা শুনে। এ ধরনের আজে-বাজে কথা সে মোটেও বলেনি। টাকা জমা দেবার পর হোটেল থেকে সে একদম বাইরে বের হয়নি। ঠিক সে সময় লুসিয়ানাকে সাথে নিয়ে আড্রিয়ানাও এসে হাজির সেখানে। রাস্তার লোকজনকে জিজ্ঞেস করে সে জেনেছে চাকরকে মারধর করার খানিক বাদেই তার স্বামী সোজা এই হোটেলে এসে ঢুকেছে।

সবাইকে শুনিয়ে আড্রিয়ানা জোর গলায় বলল তার স্বামীকে, কী করেছ তুমি? কেন রাস্তার মাঝে সবার সামনে ড্রোমিওকে মারধর করেছ? তাকে নাকি বলেছ তোমার বিয়েই হয়নি। আর হোটেলে থাকবে বলে টাকা জমা দিয়েছ? আমায় ছুয়ে বল তো এসব সত্যি কিনা! আমি এমন কী দোষ করেছি। যার জন্য তুমি আমায় ত্যাগ করে বাড়ি ছেড়ে চলে যেতে চাইছ? বলতে বলতে আড্রিয়ানার দু-চোখ জলে ভরে ওঠে।

আড্রিয়ানার অভিযোগ শুনে বেশ ঘাবড়ে গেল অ্যান্টিফোলাস। সে ভেবে পেল না। কীভাবে এই অস্বস্তিকর পরিস্থিতি থেকে মুক্তি পাবে। সে ঠান্ডা মাথায় আড্রিয়ানাকে বোঝাতে চাইল যে সে তার স্বামী নয়, একজন পর্যটক মাত্র। একটা বিশেষ প্রয়োজনে সে এসেছে এফিসাসে। তার এখনও বিয়েই হয়নি।

নিজের কপাল চাপড়ে আক্ষেপের সুরে বলল আড্রিয়ানা, এই সেদিনও বিয়ের পর তুমি আমায় কত ভালোবাসতে, আদর-সোহাগ করতে – এগুলো তো সামান্য কদিন আগের ঘটনা। আর এখন তুমি বলছি কিনা তোমার বিয়েই হয়নি! নিশ্চয়ই কোনও মেয়েছেলের নজর পড়েছে তোমার উপর, তাই আজি না চেনার ভান করছি। পুরুষগুলোর স্বভাবই এমন, কখন কাকে মনে ধরে তার ঠিক নেই। এরপর ছোটো বোনের দিকে তাকিয়ে আড্রিয়ানা বলল, আমার অবস্থাটা একবার ভেবে দ্যাখ লুসি, যে মেয়েমানুষ স্বামীর ভালোবাসা পায় না, তার মতো অভাগী আর কেউ নেই–বলতে বলতে কান্নায় ভেঙে পড়ল আড্রিয়ানা। এবার সত্যিই মুশকিলে পড়ে গেল অ্যান্টিফোলাস। সে আড্রিয়ানাকে যতই বলে যে সে ভুল করেছে, ততই কান্না বেড়ে যায় আড্রিয়ানার।

এবার চাপা স্বরে অ্যান্টিফোলাসকে ধমকে বলে উঠল লুসিয়ানা, আচ্ছা! আপনি কী ধরনের লোক বলুন তো! সেই তখন থেকে কীসব ছেলেমানুযি শুরু করেছেন? না হয় মানছি আপনার বিয়ে হয়নি, আর বিয়েও আপনাকে করতে হবে না। দয়া করে এবার বাড়ি চলুন। সেই কখন থেকে আপনার খাবার সাজিয়ে বসে আছে দিদি। আমাদেরও তো ক্ষুধা-তৃষ্ণা পায় না কি, আমরা রক্ত-মাংসের মানুষ নই?

লুসিয়ানার দিকে তাকিয়ে অ্যান্টিফোলাস বলল, তোমার দিদি? তাহলে তুমি কে?

ভগ্নিপতির কথায় এই প্রথম ধাক্কা খেল। লুসিয়ানা। সে অবাক হয়ে বলল, কী বলছেন আপনি? তার মনে প্রশ্ন জাগল, সত্যিই কি আড্রিয়ানার মতো তাকেও চিনতে পারেননি। অ্যান্টিফোলাস?

সে হেসে জবাব দিল, আমি আপনার আদরের শ্যালিকা লুসিয়ানা।

আমার শ্যালিকা? বললেই হল আর কী? লুসিয়ানার দিকে তাকিয়ে গলা চড়িয়ে বলল অ্যান্টিফোলাস, আরো আমার বলে এখনও পর্যন্ত বিয়েই হয়নি!

ঠান্ডা মাথায় তাকে বোঝাতে লাগল। লুসিয়ানা, বেশ, মেনে নিলাম আপনার বিয়ে হয়নি। কিন্তু তার আগে দয়া করে একবার বাড়ি চলুন। এত বেলা পর্যন্ত সবাই না খেয়ে আপনার জন্য অপেক্ষা করে আছে। রান্না খাবার-দাবারও পচে নষ্ট হবার জোগাড়। আপনিই বলুন না কেন এসব কি ঠিক হচ্ছে?

লুসিয়ানার প্রস্তাবে সায় দিয়ে বলল ড্রোমিও, কর্তা, তাই চলুন। ওরা যখন এত করে বলছেন তখন ওদের বাড়ি গিয়ে রান্না করা খাবারগুলো খেয়ে নেওয়া যাক।

রেগে গিয়ে ড্রোমিওর দিকে তাকিয়ে অ্যাস্টিফোলাস বলল, ও! তুইও ওদের দলে ভিড়েছিস!

মতো এমন একটা আকর্ষণ ছিল যা শুরুতেই আকৃষ্ট করেছে তাকে। অনেক চেষ্টা করেও সেই চুম্বকের আকর্ষণ থেকে নিজেকে মুক্ত করতে পারছে না অ্যান্টিফোলাস।

বেশ! তবে চলো—বলে উঠে দাঁড়াল অ্যান্টিফোলাস। পরীক্ষণেই কী মনে করে আড্রিয়ানার

একটা শর্ত আছে। বাড়ি গিয়ে তুমি মুখ ফুটে কাউকে বলবে না যে আমি তোমার স্বামী। ও সব আদেখলাপনা আমার মোটেই পছন্দ নয় তা কিন্তু আগেই বলে দিচ্ছি।।

তাহলে কী করতে হবে? জানতে চাইল লুসিয়ানা।

তুমি চুপ কর। তোমার সাথে কথা বলছি না বলে এক ধমকে তাকে থামিয়ে দিল অ্যান্টিফোলাস! তারপর আড্রিয়ানার দিকে ফিরে বলল, সবার সামনে তুমি এমন ভাব দেখাবে যেন আমি তোমার কেউ নই। — কোনও সম্পর্ক নেই তোমার সাথে।

কানে কানে লুসিয়ানাকে বলল আড্রিয়ানা, বুঝলি, এই ভয়টাই আমি করেছিলাম। এ নিশ্চয়ই সেই সর্বনাশীর কাজ। ও চাইছে আমার কাছ থেকে স্বামীকে ছিনিয়ে নিতে।

আঃ দিদি! এখন মাথা গরম করিস না— বলে অ্যান্টিফোলাসের দিকে তাকিয়ে হেসে বলল, শুধু এইটুকুই আপনার শর্ত? ঠিক আছে, আমরা মেনে নিলাম আপনার শর্ত। এবার দয়া করে আমাদের সাথে বাড়ি চলুন।

যতটুকু রাগ তার মাথায় জন্মেছিল, বড়ো বা সিরাকিউজের অ্যান্টিফোলাস দেখল কখন তা যেন আপনা থেকেই উধাও হয়ে গেছে, তার পরিবর্তে স্বপ্নের একটা ঘোর তাকে আচ্ছন্ন করে রেখেছে। কিন্তু সে সব ভাবার সময় এখন নেই। বাধ্য হয়ে সে ড্রোমিওকে সাথে নিয়ে এগিয়ে চলল আড্রিয়ানা ও লুসিয়ানার পেছু পেছু। এই ড্রোমিও অবশ্য তারই মতো বড়ো বা সিরাকিউজের ড্রোমিও।

 

বাড়িতে এসে পাহারা দেবার দায়িত্ব দিয়ে বড়ো ড্রোমিওকে একতলার সদর দরজার সামনে দাঁড় করিয়ে, দিল আড্রিয়ানা। তাকে নির্দেশ দিল সে যেন কাউকে ভেতরে ঢুকতে না দেয়। আর কেউ অ্যান্টিফোলাসের সাথে দেখা করতে চাইলে যেন বলে, উনি এখন খাচ্ছেন, তাই তার সাথে দেখা হবে না। এরপর অ্যান্টিফোলাস আর লুসিয়ানাকে নিয়ে খাওয়া-দাওয়া সারতে সিঁড়ি দিয়ে উপরে উঠল আড্রিয়ানা। সবার আগে ড্রোমিওকে ডেকে আড্রিয়ানা বলল, দ্যাখ। ড্রোমিও! আমরা এখন খেতে যাচ্ছি। দেখবি বাইরের লোক যেন ঘরে না ঢোকে। তাহলে কিন্তু তোর মাথা ফাটিয়ে দেব — এ কথা যেন মনে থাকে।

খেতে বসে ইচ্ছে করেই অ্যান্টিফোলাসের শর্ত ভাঙল আড্রিয়ানা। সবার সামনে বারবার স্বামী বলে ডেকে সে তাকে অস্থির করে তুলল। ওদিকে তার মতো একই ভুল করে বসল। আড্রিয়ানার পরিচারিকা নেল। কাজের মাঝে সময় পেলে এতদিন সে ছোটো ড্রোমিওর সাথে ফষ্টি-নষ্টি করত। তাকে বিয়ে করে ঘর-সংসার বাঁধিবে বলে কথাও দিয়েছিল সে। অ্যান্টিফোলাসের সাথে বড়ো ড্রোমিওকে দেখে সে ধরে নিল। এই তার পুরনো প্রেমিক। সে যেচে গিয়ে তাকে প্ৰেম-ভালোবাসার কথা শোনাতে লাগল। নেলের ভাব-সাব দেখে তার মনিবের মতো ড্রোমিও বেশ ঘাবড়ে গেল। বড়ো ড্রোমিও ধরে নিল মনিবের মতো সেও এক স্বপ্নের ঘোরের মাঝে রয়েছে। ততক্ষণে খাওয়া শেষ হয়েছে আড্রিয়ানা আর অ্যান্টিফোলাসের। খাবার ফাকে লুসিয়ানার সাথে বেশ জমিয়ে গল্প করেছে অ্যান্টিফোলাস। লুসিয়ানাকে তার খুব পছন্দ হয়েছে – তাকে নিয়ে রঙিন স্বপ্নের জাল বুনতে শুরু করেছে। কিন্তু লুসিয়ানার সাথে এই মেলামেশা মোটেও পছন্দ নয়। আড্রিয়ানার। লুসিয়ানা যে আদতে এফিসাসবাসী তার ছোটো ভাই ছোটো অ্যান্টিফোলাসের শ্যালিকা, সে কথা কিন্তু জানে না। অ্যান্টিফোলাস বা আড্রিয়ানা।

কিছুক্ষণ বাদে ছোটো ড্রোমিওকে সাথে নিয়ে বাড়ি ফিরে এল ছোটো অ্যান্টিফোলাস। তার ভীষণ অবাক লাগছে ছোটো ড্রোমিওর কথা শুনে। ছোটো ড্রোমিওর মূল বক্তব্য হল কিছুক্ষণ আগে সে তাকে তাড়াতাড়ি বাড়ি ফিরে আসার কথা বলেছে। সাথে এও বলেছে যে তার স্ত্রী ও শ্যালিকা খাবার নিয়ে তার জন্য অপেক্ষা করে আছে। সে কথা শুনে অ্যান্টিফোলাস নাকি তাকে রাস্তার মাঝে বেধড়ক মারতে শুরু করে দেয়। আর মারতে মারতে আমি তো বিয়েই করিনি, বউ আর শ্যালিকা আবার কোথা থেকে এল এ জাতীয় কথাও বলেছে তাকে।

ড্রোমিওর মুখে এসব অভিযোগ শুনে রেগে উঠে বলেছিল ছোটো অ্যান্টিফোলাস, এই হতভাগা! আমি তোকে এসব কথা বলেছি? তুই আরও বলেছিস আমি তোকে মেরেছি, বলেছি আমার স্ত্রী নেই, আমি হোটেলে থাকব, খাব? আমি আবারও বলছি। এতসব কথা তোকে বলিনি আর মারধরও করিনি। তারপরেও যদি বলিস। আমি এসব করেছি, তাহলে বলব বেশ করেছি। তোর মতো বদমাশকে মেরে ফেলাই উচিত।

ছোটো ড্রোমিওকে বেশ করে ধমকিয়ে বাড়ি ফিরে গেল ছোটো অ্যান্টিফোলাস। গিয়ে দেখল ভেতর থেকে বন্ধ রয়েছে বাড়ির সদর দরজা। সে বারবার দরজায় ধাক্কা দিল, চেঁচিয়ে ডাকতে লাগল স্ত্রী আর শ্যালিকাকে, এরপর জোরে কড়া নাড়ল। কিন্তু ভেতর থেকে কেউ দরজা খুলে দিল না। শেষমেশ ছোটো ড্রোমিও তার প্রেমিক, আড্রিয়ানার সহচরী নেল-এর নাম ধরে ডাকাডাকি করল। কিন্তু তাতেও কেউ দরজা খুলে দিল না।

এসব কাণ্ড-কারখানা দেখে বড়ো অ্যান্টিফোলাস আর বড়ো ড্রোমিওর মনে এতুটুকুও সন্দেহ রইল না যে তার এক আজব দেশে এসে পৌঁছেছে। তারা উভয়েই হাঁফিয়ে উঠেছে। এ বাড়ির পরিবেশ ও তার অধিবাসীদের হাব-ভাব দেখে। সুযোগ পেতেই তারা আড্রিয়ানা আর লুসিয়ানার চোখে ধুলো দিয়ে পালিয়ে গেল বাড়ি থেকে। ওদিকে আবার চেচামেচি করেও বাড়ির দরজা খোলাতে না পেরে রেগে বোম হয়ে আছে ছোটো অ্যান্টিফোলাস। খাওয়া-দাওয়া সারাতে সে তখনই চলে গেল তার এক বন্ধুর বাড়িতে। পথে তার সাথে দেখা হল স্যাকরান অ্যাঞ্জেলোর সাথে। এর আগে আড্রিয়ানার জন্য বহু গয়না তৈরি করেছে অ্যাঞ্জেলো। এই কদিন আগেও আড্রিয়ানার জন্য হিরে-জহরত বসানো একটা সোনার তৈরির গয়না দিয়েছে অ্যান্টিফোলাস। দেখা হতেই অ্যাঞ্জেলো জানাল যে হারখানা তৈরি হয়ে গেছে। এমনিতেই আড্রিয়ানার উপর বেজায় রেগে ছিলেন অ্যান্টিফোলাস। তিনি স্থির করলেন হারখানা আড্রিয়ানাকে না দিয়ে বরং তার বন্ধুকে উপহার দেবেন। তিনি স্যাকরাকে বললেন সে যেন হারখানা বন্ধুর বাড়িতে দিয়ে আসে। তার কথা শুনে স্যাকরা তখনই ছুটিল নিজের বাড়ির দিকে।

বাড়ি থেকে হার নিয়ে এসে কিছুদূর যাবার পর অ্যাঞ্জেলোর সাথে দেখা হয়ে গেল বড়ো অ্যান্টিফোলাসের। সে একরকম জোর করেই হারটা বড়ো অ্যান্টিফোলাসের হাতে গুজে দিয়ে বলল, এই রইল আপনার হার। আপনি যেমন বলেছেন তেমনিই করেছি। আশা করি এটা আপনার পছন্দ হবে।

অ্যাঞ্জেলোর দিকে তাকিয়ে বললেন বড়ো অ্যান্টিফোলাস, এ কি, হারটা আমায় দিচ্ছেন কেন? মনে হয় আপনি ভুল করছেন। আমি তো আপনাকে চিনিই না।

এ সব কী বলছেন আপনি, বলল অ্যাঞ্জেলো, আরে মশায়! আপনার সাথে কি আজকের সম্পর্ক নাকি আপনি ভাবছেন দামের কথা। সে আপনি পরে দিয়ে দেবেন- আমি আপনার বাড়ি গিয়ে নিয়ে আসবা–বলে অন্যদিকে চলে গেল অ্যাঞ্জেলো। এত তাড়াতাড়ি ঘটনোটা ঘটে গেল যে অ্যাঞ্জেলোকে কিছু বলা বা বাধা দেবার সময় পেলেন না বড়ো অ্যান্টিফোলাস। হারটা হাতের মুঠোয় নিয়ে সে মনে মনে বলল, এ যে সত্যিই একটা আজব দেশ তাতে কোনও সন্দেহ নেই। এখানকার বড়ো ঘরের বউ-ঝিরা অচেনা পুরুষকে বাড়ি নিয়ে গিয়ে পাশে বসিয়ে খাওয়ায়, স্বামী স্বামী বলে আদর-সোহাগ করে। আর এখানকার স্বর্ণকাররাও তেমনি! অচেনা বিদেশির হাতে দামি জড়োয়ার হার গুজে দিয়ে দাম না নিয়ে চলে যায়। আজব দেশের সব আজব ঘটনা।

বড়ো ড্রোমিও নিজেও ভাবছিল সেই একই কথা। কিছুক্ষণ আগে যে বাড়ির বউ তার মনিবকে খাওয়াতে নিয়ে গেল, সে বাড়ির কাজের মেয়ে নেল। তার সাথে এমন ব্যবহার করল যে মনে হল পরস্পর পরস্পরকে কত ভালোবাসে। সে নিজ মুখেই ড্রোমিওকে বলল যে সে তাকে বিয়ে করতে রাজি আছে।

বড়ো অ্যান্টিফোলাস বলল, আর নয় ড্রোমিও, ঢ়ের হয়েছে। নতুন কিছু ঘটার আগেই চল এখান থেকে পালিয়ে যাই। তুই এখনই জাহাজঘাটায় চলে যা। সবচেয়ে আগে যে জাহাজটা ছাড়বে, তা যে দিকেই যাক না কেন, সেটাতে আমাদের যাবার ব্যবস্থা করে আয়। তুই ফিরে এলে হোটেল থেকে আমাদের মাল-পত্ৰ, টাকা-কড়ি সব তুলে নিয়ে জাহাজে চাপতে হবে। বেশিদিন এদেশে থাকলে হয়তো আমাদের জেলেই যেতে হবে। তার চেয়ে চল, প্ৰাণ নিয়ে পালাই।

বাড়ি ফিরে অ্যাঞ্জেলো দেখল তার কাছ থেকে পাওনা টাকা আদায়ের আশায় অপেক্ষা করে আছে এক পাওনাদার। কিছুক্ষণ আগে অ্যান্টিফোলাসকে যে হারখানা সে দিয়েছে তার দাম নেওয়া হয়নি। সে স্থির করল ওই টাকাটা আদায় করে পাওনা মিটিয়ে দেবে। পাওনাদারকে অপেক্ষা করতে বলে সে চলে গেল অ্যান্টিফোলাসের বাড়ির দিকে।

বাড়ি থেকে বেরিয়ে কিছুদূর যাবার পর রাস্তাতেই অ্যাঞ্জেলোর সাথে দেখা হয়ে গেল ছোটো অ্যান্টিফোলাসের। সে তখন বন্ধুর বাড়ি থেকে খাওয়া-দাওয়া করে ফিরছিল। ছোটো অ্যান্টিফোলাসকে দেখেই অ্যাঞ্জেলো বলল, এই যে মশাই! আপনার কাছে যাচ্ছিলাম।

আমার কাছে? কেন? ব্যাপারটা আঁচ করতে না পেরে বলল অ্যান্টিফোলাস।

অ্যাঞ্জেলো বলল, বাড়ি ফিরে দেখি এক পাওনাদার বসে আছে। সে আবার পাওনা টাকা না নিয়ে এক পাও নড়বে না। বলছি কী, যে হারটা আপনি আমায় বানাতে দিয়েছিলেন, অনুগ্রহ করে যদি তার দামটা দিয়ে দেন তাহলে পাওনাটা মিটিয়ে দিতে পারি।

নিশ্চয়ই পাবে, বলল অ্যান্টিফোলাস, আগে তো হারটা আমায় দেবে। তবে তো দাম দেব। জিনিসটা না দিয়েই তুমি তার দাম চাইছ? কী করে ভাবলে জিনিসটা না পেয়ে আমি তার দাম দেব?

সে কী কথা! অবাক হয়ে দু-চোখ কপালে তুলে বলল অ্যাঞ্জেলো, এই তো কিছুক্ষণ আগে রাস্তার মাঝে হারটা তুলে দিলাম। আপনার হাতে।

রেগে গিয়ে দু-চোখ কপালে তুলে বলল ছোটো অ্যান্টিফোলাস, কী বললে, হারটা আমার হাতে দিয়েছ আর তাও আবার রাস্তার মাঝখানে! আমি তোমায় বলেছি হারটা নিয়ে বন্ধুর বাড়িতে যেতে। কিন্তু তুমি সেখানে যাওনি। তারপর তোমার সাথে এই দেখা। তুমি মিথ্যে কথা বলছি অ্যাঞ্জেলো। হারটা তুমি মোটেও দাওনি–না দিয়েই দাম চাইছ।

এবার রেগে গেল অ্যাঞ্জেলো। ছোটো অ্যান্টিফোলাসকে ধমকে উঠে বলল, কী বললেন, আমি মিছে কথা বলছি? আপনার মতো একজন ধনী লোক যে মিছে কথা বলে এভাবে গয়নাটা হাতিয়ে নেবেন তা আমার জানা ছিল না। জানলে কাজের আগেই পুরো দামটা আগাম নিয়ে নিতাম।

ধমকে উঠে বলল ছোটো অ্যান্টিফোলাস, মুখ সামলে কথা বলবে অ্যাঞ্জেলো। রাস্তার মাঝে যা-তা বলে অপমান করার ফল কিন্তু হাড়ে হাড়ে টের পাবে।

আপনি থামুন মশাই, পালটা ধমক দিল অ্যাঞ্জেলো, আপনার মতো চোর-জোচ্চোরকে আমি থোড়াই কেয়ার করি। এখনও বলছি হারের দামটা মিটিয়ে দিন, নইলে ঘোল খাইয়ে ছাড়ব আপনাকে।

এদের ঝগড়া-ঝাঁটির মাঝেই এসে পড়ল আদালতের পেয়াদা। তাকে দেখেই ছোটো অ্যান্টিফেলাসকে ইশারায় দেখিয়ে অ্যাঞ্জেলো বলল, এর ফরমায়েস মতো আমি একটা হার তৈরি করে কিছুক্ষণ আগেই এর হাতে দিয়েছি। কিন্তু ও তার দাম দিতে চাইছে না। তুমি ওকে গ্রেপ্তার করে ডিউকের আদালতে নিয়ে যাও। খানিক বাদে আমিও যাচ্ছি। সেখানে।

সে সময় অভিযোগকারীর কাছ থেকে নির্দিষ্ট সরকারি দক্ষিণা নিয়ে যে কোনও লোককে গ্রেপ্তার করতে পারত আদালতের পেয়াদা। অ্যাঞ্জেলোর কাছ থেকে যথােচিত দক্ষিণা নিয়ে সে সাথে সাথে গ্রেপ্তার করল ছোটো অ্যান্টিফোলাসকে, ছোটো অ্যান্টিফোলাস দেখল পরিস্থিতি মোটেও তার অনুকূল নয়–কাজের মানুষ হিসেবে যদিও সে ডিউকের কাছের লোক, কিন্তু আসামী হিসেবে আদালতে হাজির হলে ডিউকের সাথে তার সে সম্পর্ক থাকবে না। তাছাড়া অ্যাঞ্জেলোর অভিযোগ প্রমাণিত হলে তার মান-সম্মান- প্রতিপত্তি এমনকি পদস্থ সেনানির চাকরিটাও হয়তো তাকে খোয়াতে হবে। এতক্ষণ ধরে অবাক হয়ে তার মনিবের সাথে অ্যাঞ্জেলোর কথা কাটাকাটি শুনছিল ছোটো ড্রোমিও। এবার অ্যান্টিফোলাস তাকে বলল সে যেন আড্রিয়ানার কাছ থেকে স্বর্ণকার অ্যাঞ্জেলোর পাওনা টাকাটা নিয়ে আসে। সাথে সাথেই মনিবের বাড়িতে ছুটে গেল ছোটো ড্রোমিও। গিন্নিমা আড্রিয়ানাকে সব কথা বলতেই সে তাড়াতাড়ি সিন্দুক খুলে টাকাটা বের করে দিয়ে দিল ছোটো ড্রোমিওর হাতে। টাকাটা নিয়ে বেরিয়ে গেল ছোটো ড্রোমিও। কিছুদূর যেতেই তার সাথে দেখা হল বড়ো অ্যান্টিফোলাসের। ছোটো ড্রোমিও কিছুতেই বুঝতে পারল না। টাকা ছাড়া কীভাবে তার মনিব খালাস পেলেন। ভবিষ্যতে কাজে লাগতে পারে এই ভেবে সে পুরো টাকাটাই মনিবের হাতে তুলে দিয়ে বলল, এ টাকা গিন্নিমা পাঠিয়ে দিয়েছেন। বড়ো অ্যান্টিফোলাসের বুঝতে বাকি রইল না যে অচেনা মহিলা তাকে বাড়িতে নিয়ে গিয়ে পাশে বসিয়ে খাইয়েছেন, স্বামী বলে আদর-সোহাগ করেছেন- তিনিই পাঠিয়েছেন এ টাকাটা। সে একবার ভাবল টাকাটা মহিলাকে ফিরিয়ে দেবে, কিন্তু পরীক্ষণেই মনে হল টাকাটা ফেরত দিতে গিয়ে যদি আবার কোনও ঝামেলা বেধে যায় — এই ভেবে টাকার থলিটা সে পকেটে পুরে নিল। এরপর ছোটো ড্রোমিওকে বলল, দ্যাখ! হাতে আর বেশি সময় নেই। এই বেলা সেন্টার হোটেলে চলে যা। সেখানে থাকা-খাওয়ার জন্য যে টাকাটা জমা দিয়েছিস তা তুলে নিয়ে আয়। আর মাল-পত্র যা রয়েছে তা নিয়ে জাহাজঘাটায় চলে যাবি। একটু বাদেই জাহাজ ছাড়বে।

আবার সেই হোটেল! সেখান থেকে মালপত্র নিয়ে জাহাজে যেতে হবে? –মনিবের কথাগুলো শুনে ছোটো ড্রোমিওর বুঝতে বাকি রইলনা সত্যিই তার মনিবের মাথা খারাপ হয়ে গেছে। হোটেলে যাবার নামে সে তখনি ছুটে গেল মনিবগিন্নি আড্রিয়ানার কাছে। সব কথা খুলে বলল তাকে। তার স্বামীর যে সত্যিই মাথা খারাপ হয়েছে, সে কথা ছোটো ড্রোমিওর মতো আড্রিয়ানা ও লুসিয়ানার বুঝতে বাকি রইল না। লুসিয়ানাকে সাথে নিয়ে আড্রিয়ানা তখনই বেরিয়ে পড়লেন স্বামীর খোঁজে।

কিছুদূর যাবার পর আড্রিয়ানার চোখে পড়ল আদালতের পেয়াদা বেঁধে নিয়ে যাচ্ছে তার স্বামীকে। স্বামীর ওই অবস্থা দেখে চোখে জল এসে গেল। আড্রিয়ানার। সে তখনই ছুটে গোল স্বামীর কাছে। তাকে দেখেই তেলে-বেগুনে জ্বলে উঠল। ছোটো অ্যান্টিফোলাস। যা মুখে আসে তাই বলে গালাগাল দিয়ে বলল, ক্ষুধার জুলায় যখন আমার পেট জ্বলে যাচ্ছিল, সে সময় বারবার ডাকাডাকি করা সত্ত্বেও তুমি বাড়িতে ঢুকতে দাওনি আমায়। এমন কি গ্রেপ্তারের খবর পেয়েও তুমি আমায় ছাড়াতে টাকা পাঠাওনি। এসবের পরেও তুমি কি করে আমার স্ত্রী বলে নিজেকে দাবি করো? মরলেও নরকে ঠাই হবে না তোমার। ডিউককে বলে এবার তোমার শাস্তির ব্যবস্থা করছি।

আড্রিয়ানা বুঝে উঠতে পারল না নিজের পাশে বসিয়ে খাওয়াবার পরও কেন তার স্বামী এই অভিযোগ করছেন। আর জরিমানার টাকা! সে তো নিজেই কিছুক্ষণ আগে আলমারি খুলে বের করে দিয়েছে ছোটো ড্রোমিওর হাতে তাহলে তিনি কি করে এসব কথা বলছেন? স্বামীর মাথা যে ঠিক নেই সে ব্যাপারে কোনও সন্দেহ রইল না আড্রিয়ানা আর লুসিয়ানার মনে।

এবার পেয়াদার হাত থেকে ছাড়িয়ে নিয়ে স্বামীকে বাড়ি নিয়ে যাওয়া দরকার। আড্রিয়ানা পেয়াদাকে কথা দিল স্বামীকে বাড়ি পৌঁছে দিলেই সে তার জরিমানার টাকা দিয়ে দেবে। পেয়াদার কাছে সে এও শুনল কিছুক্ষণ আগে স্বর্ণকার অ্যাঞ্জেলো তার স্বামীকে একখানা হার দিয়েছে। কিন্তু তার স্বামী সে হারের দাম দিতে চাইছেন না, বলছেন স্বর্ণকার আদীে তাকে কোনও হার দেয়নি।। তারপর তারা উভয়ে একে অন্যকে গালাগাল দিতে শুরু করে। সে সময় সরকারি পেয়াদা সেখান দিয়ে যাচ্ছিল। অ্যাঞ্জেলো তাকে ডেকে সবকিছু জানিয়ে বলে যে সে যেন তার কাছ থেকে সরকারি দক্ষিণা নিয়ে ছোটো অ্যান্টিফোলাসকে গ্রেপ্তার করে। সেইমতো অ্যাঞ্জেলোর কাছ থেকে যথাযথ দক্ষিণা নিয়ে সে গ্রেপ্তার করে ছোটো অ্যান্টিফোলাসকে। ছোটো অ্যান্টিফোলাসকে বাড়িতে পৌঁছে দিয়ে আড্রিয়ানার কাছে থেকে টাকা নিয়ে চলে গেল পেয়াদা। এবার চেঁচিয়ে রাস্তা থেকে লোকজন ডেকে আনল আড্রিয়ানা। তার কথামতো লোকজন দড়ি দিয়ে বেঁধে রাখল ছোটো অ্যান্টিফোলাসকে। তারপর পাগলামির চিকিৎসার জন্য ডেকে নিয়ে এল এক গ্রাম্য ওঝাকে। সে সময় পাগলামির চিকিৎসার জন্য লোকেরা ওঝারই শরণাপন্ন হত।। ওঝার হাতে স্বামীকে ছেড়ে দিয়ে, বাড়ির দরজা ভালোভাবে বন্ধ করে দিয়ে এবার আড্রিয়ানা রওনা দিল অ্যাঞ্জেলোর বাড়িতে গিয়ে হারের দাম পরিশোধ করতে। কিছুদূর যাবার পর তার সাথে দেখা হয়ে গেল বড়ো অ্যান্টিফোলাসের। তাকে দেখেই আড্রিয়ানা ধরে নিল ওঝার হাত ছাড়িয়ে পালিয়ে এসেছে তার স্বামী।

সত্যি সত্যিই বড়ো অ্যান্টিফোলাসকে তখন দেখে মনে হচ্ছিল সে পাগল হয়ে গেছে। তার মাথার চুল উশকোখুশকো, হাতে খোলা তলোয়ার আর দু-চোখে পাগলের মতো হিংস্ৰ চাহনি আর তাকে তাড়া করে চলেছে শত শত লোক। আসলে তখন চারদিকে খবর ছড়িয়ে পড়েছে যে অ্যান্টিফোলাস পাগল হয়ে গেছে। তাই তাকে ধরার জন্য পেছনে লোক ছুটেছে। আড্রিয়ানা দেখতে পেল। বড়ো ড্রোমিওর হাতেও তলোয়ার-তলোয়ার উচিয়ে সে তার মনিবকে পাহারা দিয়ে যাচ্ছে যাতে কেউ তার মনিবের কাছে ভিড়তে না পারে। এ দৃশ্য দেখে আড্রিয়ানা জনতার কাছে করুণ মিনতি জানাতে লাগল তারা যেন তার স্বামীকে বেঁধে ফেলে। এদিকে অ্যান্টিফোলাসও বেশ বুঝতে পারল এভাবে তলোয়ারের ভয় দেখিয়ে বেশিক্ষণ আটকে রাখা যাবে না জনতাকে। কিছুক্ষণ বাদেই লোকেরা তার চারপাশ ঘিরে ধরে আড্রিয়ানার কথামতো দড়ি দিয়ে বেঁধে ফেলবে তাকে। এমন সময় সামনে একটা বাড়ি দেখতে পেল অ্যান্টিফোলাস। কোনও উপায় দেখতে না পেয়ে সে আর বড়ো ড্রোমিও দ্রুত সেই বাড়িতে ঢুকে পড়ল আশ্রয়ের আশায়।

সে বাড়িটা আসলে একটা মঠ, এক বৃদ্ধ সন্ন্যাসিনী সেই মঠের কর্ত্রী। লোকজনের চিৎকারচেচামেচি শুনে তিনি বাইরে বেরিয়ে এলেন। সব শোনার পর তিনি আড্রিয়ানাকে বললেন, দ্যাখ, এই মঠে কেউ আশ্রয় নিলে তাকে জোর করে ধরে নিয়ে যাবার অধিকার কারও নেই। এই মুহূর্তে তোমরা চলে যাও এখান থেকে।

সন্ন্যাসিনীর কথা শুনে আড্রিয়ানা রেগেমেগে বলল, কিন্তু যাদের মাথা খারাপ হয়েছে তাদের বেলা এ নিয়ম খাটে না। আমার স্বামীর মাথা খারাপ হয়েছে। বাড়িতে নিয়ে গিয়ে আমি তার চিকিৎসা করবে। সেখানে ওঝা অপেক্ষা করে আছে।

মঠের কর্ত্রী কিন্তু মানতে চাইলেন না আড্রিয়ানার কথা। তার স্থির বিশ্বাস, আশ্রয়ের জন্য যারা মাঠে ঢুকেছে। তাদের কেউ পাগল নয়। মেয়েটি বলছে বটে তার স্বামীর মাথা খারাপ হয়ে গেছে, কিন্তু কোথায় যেন একটা ভুল হচ্ছে বলে মনে করছেন সন্ন্যাসিনী। তাই তিনি কিছুতেই রাজি হলেন না। আড্রিয়ানার হাতে বড়ো অ্যান্টিফোলাসকে তুলে দিতে।

এদিকে সন্ধে হয়ে আসছে। বৃদ্ধ সওদাগরাইজিয়নকে তার জরিমানার টাকা জমা দেওয়ার যে সময় দিয়েছিলেন ডিউক, তার মেয়াদও ফুরিয়ে আসছে। সূর্য ডোবার আগে টাকা দিতে না পারলে প্ৰাণদণ্ড হবে ইজিয়নের। প্ৰাণদণ্ড দেবার জন্য রক্ষীরা ইজিয়নকে কারাগার থেকে বের করে। মঠের দিকে নিয়ে আসছে। যে জায়গাটায় তার প্রাণদণ্ড হবে তা মঠের ঠিক পাশেই।

প্ৰাণদণ্ড দেবার জন্য ইজিয়নকে নিয়ে চলেছে জল্লাদ। আর তার পেছনে পেছনে ডিউক চলেছেন একদল প্রহরী আর কর্মচারী নিয়ে। সে সময় মঠ থেকে বেরিয়ে এল আড্রিয়ানা। মঠের কািন্ত্ৰী তার পাগল স্বামীকে আটকে রেখেছেন বলে সে অভিযোগ জানাল ডিউকের কাছে।

ডিউক খুব দুঃখ পেলেন আড্রিয়ানার কথা শুনে। কারণ তার স্বামী অ্যান্টিফোলাস সেনাদলের এক পদস্থ সেনানি, রাজসভার নিয়মিত সভাসদ। একদিন তিনি নিজেই অ্যান্টিফোলাসের সাথে আড্রিয়ানার বিয়ে দিয়েছিলেন। তিনি মঠের কর্ত্রীকে ডেকে বললেন, অ্যান্টিফোলাস নামে যে ব্যক্তিটি আপনার মঠে আশ্রয় নিয়েছে তাকে ডেকে আনুন। ডিউকের হুকুম শুনে মঠের কর্ত্রী ভেতরে গেলেন তার আশ্রিতদের আনতে। ঠিক সে সময় ছোটো ড্রোমিওকে সাথে নিয়ে ছোটো অ্যান্টিফোলাসও হাজির হলেন সেখানে। ওঝার হাত থেকে কোনও মতে নিজেকে ছাড়িয়ে নিয়ে আড্রিয়ানার সাথে একটা ফয়সালা করতে এসেছেন তিনি। তারা আসার সাথে সাথেই বড়ো অ্যান্টিফোলাস আর বড়ো ড্রোমিওকে নিয়ে বাইরে এলেন মঠের কর্ত্রী।

এবার সবাই নিশাচুপ। অবাক হয়ে আড্রিয়ানা দেখল তার সামনে পাশাপাশি দাঁড়িয়ে আছে দুজন স্বামী। বড়ো ও ছোটো ড্রোমিও আশ্চর্য হয়ে দেখল তাদের দুজন মনিবই হুবহু একরকম দেখতে। বড়ো ও ছোটো অ্যান্টিফোলাসও দেখলেন তাদের দুজন চাকরের মাঝে এক আশ্চর্য মিল। আর ইজিয়ান যেন নিজের চোখকেই বিশ্বাস করতে পারল না যে সত্যিই তার সামনে দাঁড়িয়ে আছে দুই হারানো ছেলে আর দুই পালিত পুত্র। সে ডেকে উঠল তার দুই ছেলেকে। ডাক শুনে ঘাড় ঘোরালো বড়ো ও ছোটো অ্যান্টিফোলাস। বন্দি অবস্থায় বাবাকে দেখে অবাক হয়ে গেল তারা। ছোটো অ্যান্টিফোলাসকে ডেকে নিজের পরিচয় দিলাইজিয়ান। এতদিন পর হারানো বাবাকে পেয়ে বেজায় খুশি হল ছোটো অ্যান্টিফোলাস। এবার চমকে উঠলেন। মঠের কর্ত্রী — তিনি স্বপ্নেও ভাবেননি এতদিন বাদে আবার ফিরে পাবেন স্বামী ইজিয়নকে। আর শুধু স্বামী নয়, দুই হারানো ছেলে আর দুই পালিত পুত্রকেও ফিরে পেলেন ইজিয়নের স্ত্রী এমিলিয়া।

এমন আনন্দের দিনে ডিউক খুশি হয়ে প্রাণদণ্ড মকুব করে মুক্তি দিলেন ইজিয়নকে। স্বামীর সাথে ভুল বোঝাবুঝি মিটে গেল আড্রিয়ানার। ডিউকের সামনে আড্রিয়ানা প্রতিশ্রুতি দিলেন তিনি তার বোন লুসিয়ানার বিয়ে দেবেন ভাসুর বড়ো অ্যান্টিফোলাসের সাথে।

দ্য টু জেন্টেলমেন অব ভেরোনা

ভেরোনা ছিল ইতালির এক প্রাচীন ঐতিহাসিক শহর। দুই যুবক, প্রোটিয়াস আর ভ্যালেন্টাইন এই শহরেরই অধিবাসী। ছোটোবেলা থেকেই এই ভদ্র, শিক্ষিত, সম্পন্ন পরিবারের ছেলে দুটি একই সাথে লেখাপড়া শিখে বড়ো হয়েছে। স্বভাবতই তাদের মধ্যে গড়ে উঠেছে অন্তরঙ্গ এক বন্ধুত্বের সম্পর্ক।

প্রোটিয়াস প্রেমে পড়েছে এক সুন্দরী যুবতির—নাম জুলিয়া, তারা একে অপরকে গভীরভাবে ভালোবাসে। এদিকে প্রোটিয়াসের বন্ধু ভ্যালেন্টাইনের ধ্যান-ধারণা অন্যরকম। প্রেম, ভালোবাসা ও হৃদয়াবেগ সম্পর্কেতার মতামত আলাদা। সব সময় প্রোটিয়াসের মুখে জুলিয়ার প্রেমানিবেদনের কথা শুনে এক এক সময় ক্লান্ত হয়ে পড়ে সে। এ নিয়ে মাঝে মাঝে প্রোটিয়াসকে ঠাট্টা-তামাশা করতেও ছাড়ে না সে।

ভ্যালেন্টাইন একদিন প্রোটিয়াসকে জানাল যে সে মিলানে যাচ্ছে। তাই বেশ কিছুদিন তাদের দু-জনের মধ্যে আর দেখা-শোনা হবে না। কথাটা শুনেই বেশ মুষড়ে পড়ে প্রোটিয়াস, বন্ধুকে অনুরোধ করে যেন সে তাকেও সাথে নিয়ে যায়।

বন্ধুর অনুরোধের উত্তরে ভ্যালেন্টাইন জানোল, সেটা কী করে সম্ভব। তুমি কি ভেবে দেখেছি আমার সাথে গেলে তোমার প্রেমিকার অবস্থা কী হবে? তোমার অদর্শনে বেচারি জুলিয়া তো দমবন্ধ হয়ে ছটফট করে মারা যাবে।

ভ্যালেন্টাইনের কথার জবাবে বলার মতো কিছু না পেয়ে চুপ করে রইল প্রোটিয়াস।

এবার প্রোটিয়াসকে খোঁচা দিয়ে বলল ভ্যালেন্টাইন, অল্প বয়সে যখন প্রেমে পড়েইছ, তখন বিয়ে করে ঘর-সংসার কর! তারপর সুন্দরী বউ আর একগাদা ছেলেপেলে নিয়ে জীবনের বাকি দিনগুলি কাটিয়ে দাও একঘেয়ে বৈচিত্র্যহীন ভাবে। তোমার মতো তরুণ প্রেমে হাবুডুবু না খেলে আমি নিশ্চয়ই নিয়ে যেতম তোমাকে। তবে এখন বলতে পারব না যে জুলিয়াকে ছেড়ে আমার সাথে মিলানে চল। আর তোমার পক্ষে সম্ভবও নয় তা। কাজেই আমাকে একাই যেতে হবে। তুমি একজন প্রেমিক। দিনরাত চুটিয়ে প্রেম চালিয়ে যাও জুলিয়ার সাথে। ঈশ্বরের কাছে প্রার্থনা করি ক্ৰমাগত তোমার প্রেমের শ্ৰীবৃদ্ধি হোক।

তবে তাই হোক, বলল প্রোটিয়াস, তুমি তাহলে একাই যাও। মিলানে থাকাকালীন যদি কোনও দুর্লভ জিনিস তোমার চোখে পড়ে, তাহলে মনে করো আমার কথা। আর কোনও দুঃসময় ও সংকট পড়লে চেষ্টা করো আমায় খবর দেবার। কথা দিচ্ছি, দুঃসময়ে আমি যথাসাধ্য চেষ্টা করব তোমায় সাহায্য করার।

নিশ্চয়ই প্রোটিয়াস, আমিও কথা দিচ্ছি। তেমন অবস্থায় পড়লে চেষ্টা করব তোমায় খবর দেবার, বলল ভ্যালেন্টাইন। যথারীতি প্রিয় বন্ধুকে আলিঙ্গন করে সে রওনা দিল মিলানের পথে।

দুই

ভ্যালেন্টাইন মিলানে রওনা দেবার কিছুক্ষণ বাদেই ছুটতে ছুটতে সেখানে এসে হাজির তার খাস চাকর স্পিডি। সে ভালোবাসত লুসেট্টা নামে একটি যুবতিকে, যে আবার ছিল প্রোটিয়াসের প্রেমিকা জুলিয়ার বাড়ির পরিচারিকা। শুধুমাত্র সেজন্যই স্পিডকে ভালোবাসত প্রোটিয়াস, কারণ তার হাত দিয়েই জুলিয়াকে প্রেমপত্র পাঠােত সে। সে প্রেমপত্র স্পিড় পাচার করে দিত। তার প্রেমিকা লুসেট্টার কাছে। আর লুসেট্টা যথারীতি তা পৌঁছে দিত তার মনিবানী জুলিয়ার হাতে। এভাবে দূতাগিরির মজুরি হিসেবে স্পিড প্রায়ই প্রোটিয়াসের পকেট খসিয়ে মোটা টাকা আদায় করে নিত।

কী ব্যাপার! তুই এত হস্তদন্ত হয়ে ছুটে আসছিস কেন? স্পিডকে জিজ্ঞেস করল প্রোটিয়াস।

এসেছি আমার মানিবের খোজে, বলল স্পিড, তার সাথে আপনার কি দেখা হয়েছে?

দেখা হয়েছিল বটে, তবে তা অনেকক্ষণ আগে, বলল প্রোটিয়াস, তখন তোর মনিব জাহাজ ঘাটার দিকে এগুলো। এতক্ষণ হয়তো তার জাহাজ ছেড়েও দিয়েছে বলেই আড়াচোখে স্পিডের দিকে তাকিয়ে বলল, এই! জুলিয়ার হাতে আমার চিঠিটা পৌঁছে দিয়েছিস তো?

আজ্ঞে, দিয়েছি, মুখটিপে হেসে স্পিড বলল, তিনি একটা চিঠি দিয়েছেন। আপনাকে দেবার জন্য। তবে কিছু মনে করবেন না কত্তা, আপনার প্রেমিকাটি বেজায় কিপটে, মোটেও জল গলে না। ওর হাত দিয়ে। এই চিঠিটা আপনাকে দেবার জন্য কোনও বিকশিশ উনি দিলেন না। আমাকে।

শোন! বকশিশ না দিলেও মন খারাপ করিস না, বলল প্ৰেটিয়াস। এবার দেখি জুলিয়ার চিঠিটা। চিঠিখানা স্পিড বের করতেই তা ছোঁ। মেরে কেড়ে নিল প্রোটিয়াস। তারপর পকেট থেকে এক পাউন্ডের মুদ্রা বের করে স্পিডের হাতে দিল সে। পকেটে সেটি গুজে নিয়ে প্রোটিয়াসকে বলল, দরাজ হাতে এরূপ বকশিশ দেন বলেই তো মুখ বুজে আপনার কাজ করে দিই। আপনার প্রেমিক যেমন ভুলেও এক আধলা উপূড় করেন না, তেমনি আমার মনে হয় দুহাত উজাড় করে বিয়ের পর তিনি আপনাকে পয়সা-কড়ি দেবেন না।

চুপ হতচ্ছাড়া। স্পিডকে ধমকাল প্রোটিয়াস। তারপর নিজের মনে বিড়বিড় করে বলতে লাগল, দেখছি। এবার থেকে জুলিয়ার হাতে চিঠি পৌঁছে দেবার দায়িত্ব অন্য কাউকে দিতে হবে।

 

তিন

বকশিশ হিসেবে এক পাউন্ড প্রোটিয়াসের কাছ থেকে আদায় করে এবং সেই সাথে তার ধমক খেয়ে পালাল স্পিড। বাড়ি ফেরার পূর্বে মাঝরাস্তায় সে দাঁড়িয়ে পড়ল জুলিয়ার বাড়ির সামনে। লুসেট্টাকে ডেকে কিছুক্ষণ তার সাথে হাসি-ঠাট্টা করে জুলিয়াকে লেখা প্রোটিয়াসের চিঠিটা তার হাতে দিয়ে বিদায় নিল। কিছুক্ষণ বাদে বাড়ির সামনের বাগানে পায়চারি করতে এল জুলিয়া। সে সময় লুসেট্টাও সুযোগ বুঝে! হাজির সেখানে। মনিবানীর সাথে যেতে যেতে সে নানা প্রকার রসালো বুলি আওড়াতে লাগলে যুবতি মেয়েদের প্রেমে পড়ার স্বপক্ষে।

যেতে যেতে ঘাড় না ফিরিয়েই বলল জুলিয়া, কী ব্যাপার বল তো লুসেট্টা! হঠাৎ আজ প্রেমে পড়ার জন্য আমায় জ্ঞান দিচ্ছিস কেন? আমার তো মনে হচ্ছে পুরুষের জন্য তুই ওকালতি করছিস।

কী যে বল দিদিমণি, বলেই মূহূর্তের মধ্যে নিজেকে সামলে নেয় লুসেট্টা, মুখ টিপে হোসে বলে, আমায় তুমি ভুল বুঝে না দিদিমণি। প্রেম সব সময় পবিত্র এবং স্বৰ্গীয়; আমার আসল বক্তব্য এই যে প্রেমে পড়ার পূর্বে ভালো করে সবকিছু ভেবে দেখা প্রয়োজন।

সায় দিয়ে জুলিয়া বলল, তা ঠিকই বলেছিস; কত পুরুষই তো আমার প্ৰেম-ভালোবাসা পেতে উদগ্রীব। তাই বলে যাকে তাকে তো আমি তা বিলিয়ে দিতে পারি না।

তা তো ঠিকই দিদিমণি, লুসেট্টা সায় দেয়।

এই এগলামুর লোকটার কথাই ধর না কেন, বলল জুলিয়া, ওর সম্পর্কে তোর ধারণা কী আর লোকটাই বা কেমন?

এগলামুর লোকটা দেখতে সুন্দর আর যোদ্ধা হিসেবে বেশ সুনামও রয়েছে, লুসেট্টা বলল, তবুও আমার অভিমত ঘর-সংসার করার জন্য এ লোককে বিয়ে করা ঠিক নয়।

অরি মার্কোশিয়? পুনরায় জানতে চাইল জুলিয়া, আমার মুখের একটু হাসির জন্য তিনি তো পাগল। তাছাড়া ওর প্রচুর টাকা-কড়িও রয়েছে। সেসব খবর রাখিস তুই?

টাকার কুমির হলেও লোকটা যেন কেমন, বলল লুসেট্টা, ওর হাব-ভাব, কথা-বার্তা, চলাফেরা, সবই যেন কৃত্রিম মনে হয়। নিজস্ব বলতে যেন ওর কিছু নেই। ছোটো মুখে কথাটা হয়তো বড়োই শোনাবে দিদিমণি, তবুও যখন তুললে তখন বলেই ফেলি, আমার মতে মানুষের মতো মানুষ একজনই রয়েছেন, তিনি হলেন প্রোটিয়াস।

তুই আর কাউকে পেলি না! এত লোকের মধ্যে শেষে কিনা প্রোটিয়াস? – লুসেট্টার মুখে ও নামটা শুনে অবাক হবার ভান করে বলল জুলিয়া, আমার তো ভুলেও ওর কথা মনে হয় না। তাছাড়া ওর মধ্যে এমন কী দেখেছিস যার জন্য তুই ওর হয়ে ওকালতি করছিস?

এজন্যই বলছি দিদিমণি যে তার সমস্ত মনপ্রাণ তিনি আপনাকেই সঁপে দিয়েছেন–একমাত্র আপনিই রয়েছেন তার মনের মণিকোঠায়, সেখানে আর কারও স্থান নেই, বলল লুসেট্টা।

জুলিয়া বলল, প্রোটিয়াস তো খুবই কম কথার লোক আর যিনি কম কথা বলেন তার প্রেমও তো ক্ষণস্থায়ী হবে।

তুমি ভুল করছ দিদিমণি, জুলিয়ার দিকে তাকিয়ে বলল লুসেট্টা, যিনি কম কথা বলেন তীর হৃদয় প্রেমে ভরপুর। এরপ মানুষকে পাওয়া তো খুবই ভাগ্যের কথা। বলেই জামার ভেতর থেকে মুখবন্ধ খামটা বের করে জুলিয়ার হাতে দিয়ে বলল লুসেট্টা, মন দিয়ে ভেতরের লেখাটা পড়ুন তাহলে বুঝতে পারবেন আমার কথাটা কতদূর সত্যি।

খামের উপর চোখ বুলিয়ে জুলিয়া বলল, এ তো দেখছি চিঠি, খামের উপর আমার নাম লেখা। লুসেট্টা! এ চিঠি কে দিয়েছে?

চেগা-শোনা:; কিছুক্ষণ আগে সেই এ চিঠিটা দিয়েছে আমায়। মনে হচ্ছে আপনাকে দেবার জন্য চিঠিটা প্রোটিয়াসই দিয়েছেন স্পিডকে।

জুলিয়ার স্বভাবটাই আসলে অদ্ভুত। বহু আগেই প্রোটিয়াসের সাথে তার প্রেমের সম্পর্ক গড়ে উঠেছে। কিন্তু সে তা গোপন রাখতে চায় সবার কাছ থেকে। এর কারণ ভয় বা চাপ নয়। পরিচিতদের কাছে সে দেখাতে চায় প্রোটিয়াসের সম্পর্কে তার কোনও আগ্রহ নেই। সে জন্য লুসেট্টার হাত থেকে প্রোটিয়াসের লেখা চিঠিখান কেড়ে নিয়েই তাকে ধমকে উঠল জুলিয়া, প্রোটিয়াসের লেখা চিঠিটা কেন এনেছিস তুই! যা, এই মুহুর্তে এটা নিয়ে আমার সামনে থেকে দূর হয়ে যা। বলেই মুখবন্ধ খামটি ফিরিয়ে দিল তাকে। খামোটা নিয়ে লুসেট্টা ঘরের বাইরে বেরিয়ে যাবার কিছুক্ষণ বাদেই জুলিয়ার ইচ্ছে হল প্রোটিয়াস তাকে কী লিখেছে তা জানতে। সাথে সাথেই সে চেঁচিয়ে ডাকল লুসেট্টাকে।

জুলিয়ার স্বভাব-চরিত্র ভালোভাবেই জানত লুসেট্টা। ঠিক এই ডাকেরই অপেক্ষায় ছিল সে। সাথে সাথেই সে পড়িমড়ি করে হাজির হল। যেন কিছুই হয়নি এরূপ ভাবে বলল জুলিয়া, দেখে আয়তো ঘড়িতে কটা বাজে আর জেনে আয় ডিনারের সময় হয়েছে কিনা।

দিদিমণি! ডিনারের সময় হয়ে গেছে, বলেই প্রোটিয়াসের চিঠিটা আবার বের করে জুলিয়ার হাতে দিয়ে লুসেট্টা বলল, আসলে এটার জন্যই তুমি আমায় ডেকেছি। নাও, এবার ভালো করে পড়ে ফেল।

জুলিয়া ভীষণ রেগে গেল লুসেট্টার কথা শুনে। কোনও চিন্তা-ভাবনা না করেই সে ছিড়ে টুকরো টুকরো করে প্রোটিয়াসের চিঠিটা ফেলে দিল মেঝের উপর। মনে মনে লুসেট্টা খুব ব্যথা পেল জুলিয়ার কাণ্ড দেখে। চিঠির টুকরোগুলো কুড়িয়ে নিতে যখন সে উবু হয়ে মেঝেতে বসতে যাবে, ঠিক তখনই চেঁচিয়ে উঠল জুলিয়া, খবরদার বলছি, ভালো চাস তো ওগুলো মোটেও ছবি না। চলে যা এখান থেকে। এখন আমার কোনও দরকার নেই তোকে।

ঘর থেকে লুসেট্টা চলে যাবার পর মেঝেতে ছড়িয়ে থাকা চিঠির টুকরোগুলির দিকে তাকিয়ে দীর্ঘশ্বাস ফেলে জুলিয়া। কেন যে সে এমন হঠকারিতা করল তা ভেবে নিজেরই ওপর ক্ষুব্ধ হল সে। মাথা গরম করে এভাবে চিঠিটা ছিড়ে ফেলার জন্য সে আক্ষেপ করতে লাগল।

অনেকক্ষণ হল ঘর থেকে বেরিয়ে গেছে লুসেট্টী। ধারে কাছে কেউ নেই দেখে মেঝেতে হাঁটু গেড়ে বসলজুলিয়া। চিঠিতে প্রোটিয়াস তাকে কী লিখেছিল তা জানার জন্য সে চিঠির টুকরোগুলিকে কুড়িয়ে নিয়ে পরপর সাজিয়ে রাখার চেষ্টা করতে লাগল। হঠাৎ জুলিয়ার নজরে পড়ল একটুকরো কাগজে লেখা রয়েছে প্রেমের তিরবিদ্ধ প্রোটিয়াস। অন্যান্য কতকগুলি ছেড়া টুকরো লেখা রয়েছে মিষ্টি মিষ্টি অনেক প্রেমের বাণী। না জানি গোটা চিঠিটাতে আরও কত মিষ্টি মিষ্টি প্রেমের কথা লেখা ছিল। অযথা মাথা গরম করে চিঠিটা ছিড়ে ফেলার দরুন সেসব কিছুই সে পড়তে পেল না। নিজের আচরণে খুবই অনুতপ্ত হল জুলিয়া। সে ঠিক করল নিজের কাছে রেখে দেবে চিঠির সেই ছেড়াটুকরোগুলিকে। নিয়ম করে দু-বেলা চুমু খাবে সেগুলির গায়। আমার অন্যায়ের প্ৰায়শ্চিত্ত কি তাতেও হবে না? নিজেকে নিজেই প্রশ্ন করে জুলিয়া।

প্রোটিয়াসের বাবা অ্যান্টোনিও ধমকে উঠলেন তার বাড়ির পরিচারককে–অ্যাই ব্যাটা প্যানথিনো! তখন থেকে তোকে ডাকতে ডাকতে আমার গলা শুকিয়ে গেছে। এতক্ষণ কোথায় ছিলি?

প্যানথিনো জবাব দিল, আর্জের মঠে, আপনার ভাইয়ের কাছে।

দাবড়ে উঠলেন অ্যান্টোনিও, কেন রে হতচ্ছাড়া? এতক্ষণ কোন ঠাকুরের সেবা করছিলি মঠে বসে? নাকি আমার ভাই আটকে রেখেছিল তোকে?

না হুজুর, জবাব দেয় প্যনিথিনো, আসলে হয়েছে কি উনি তার ভাইপো অর্থাৎ আপনার ছেলের কথা খুবই চিন্তা করেন কি না, তাই সে নিয়েই কথা বলছিলেন আমার সাথে।

ভাই কী কথা বলছিল আমার ছেলের ব্যাপারে, জানতে চাইলেন অ্যান্টোনিও।

উনি বলছিলেন যে যৌবনে পা দেবার সাথে সাথে সাধারণ লোকেরা তাদের ছেলেদের বাড়ির বাইরে ছেড়ে দেয় মানুষ হবার জন্য, বলতে থাকে প্যানথিনো, সেই ছেলেদের মধ্যে কেউ যায় বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষা নিতে, কেউ যায় জাহাজে চেপে নতুন দ্বীপ আবিষ্কার করতে, আর কেউবা সেনাদলে নাম লিখিয়ে যুদ্ধে যায় সৌভাগ্যের সন্ধানে। আপনার ভাই বলছিলেন যে প্রোটিয়াসেরও সেরাপ করা উচিত ছিল। উনি আরও বলছিলেন যে প্রোটিয়াস এখন যৌবনে পা দিয়েছে। এবার যদি সে দেশ-বিদেশে না যেতে পারে, তাহলে সে পৃথিবীর কিছুই দেখতে পাবে না। পৃথিবীতে নানা ধরনের মানুষ রয়েছে। তাদের স্বভাব কেমন, সেও তার জানা হবে না। উনি আপনাকে জানাতে বলেছেন যেন প্রোটিয়াসকে আর আপনি বাড়ির মধ্যে আটকে না রাখেন।

এ সব কথা যদি আমার ভাই বলে থাকে, তাহলে সে খাটি কথাই বলেছে, সায় দিয়ে বললেন অ্যান্টোনিও, পরিশ্রম করলেই অভিজ্ঞতা অর্জন করা যায় বলে আমার বিশ্বাস। তা প্যানটিনো, আমার ছেলের ভবিষ্যৎ নিয়ে তুই যখন ভাইয়ের সাথে এত আলোচনা করিস, এত ভাবিস তার জন্য, তাহলে তুই বল কোথায় পাঠানো যায় তাকে?

এ নিয়ে আর এত ভাবন কী, বলল প্যানথিনো, আপনি নিশ্চয়ই শুনেছেন যে উন্নতিলাভের আশায় প্রোটিয়াসের বন্ধু ভ্যালেন্টাইন মিলানের রাজসভায় গেছে।

হাঁ, আমি তা শুনেছি, বললেন অ্যান্টোনিও।

কত্তা! আমার মতে প্রোটিয়াসকে সেখানে পাঠিয়ে দিলেই ভালো হয়, বলল অ্যান্টোনিও, দেশ-বিদেশের প্রচুর লোক রোজ আসে সম্রাটের রাজসভায়। অনেক কিছু সে জানতে-শিখতে পারবে। যদি সে তাদের সাথে মেলামেশা করে। তারপর বারোমাস রাজসভায় লেগেই আছে তির ছােড়া, বন্দুকবাজি, তলোয়ার লড়াই প্রভৃতি অস্ত্র প্রতিযোগিতা। সে সব প্রতিযোগিতায় যোগ দিয়ে প্রোটিয়াস যদি তার যোগ্যতা প্রমাণ করতে পারে, তাহলে সম্রাটের নজরে পড়ার সম্ভাবনা আছে।

ঠিকই বলেছ। তুমি প্যানথিনো, সায় দিয়ে বললেন অ্যান্টোনিও, আমিও চেষ্টা করছি যত তাড়াতাড়ি সম্ভব প্রোটিয়াসকে মিলানের সম্রাটের রাজসভায় পাঠাবার।

আমি বলছি কি কত্তা, খামোখা দেরি না করে কালই রওনা করে দিন ছোটো কত্তা প্রোটিয়াসকো, বলল প্যানথিনো।

কিন্তু কাল কেন? জানতে চাইলেন অ্যান্টোনিও।

ডন অ্যালফানসোকে নিশ্চয়ই আপনার মনে আছে কত্তা? বলল পানিথিনো, আগামীকাল কয়েকজন ভদ্রলোকের সাথে উনি চাকরির খোজে রওনা দিচ্ছেন মিলানে সম্রাটের দরবারে। আমি বলছি কি প্রোটিয়াসকেও আপনি কাল তাদের সাথে জাহাজে তুলে দিন।

সে তো খুবই ভালো কথা, বললেন অ্যান্টোনিও, আগামী কালই ডন অ্যালফানসো ও তার সাখীদের সাথে প্রোটিয়াসও রওনা দেবে মিলানের পথে। তাহলে আর দেরি নয়। প্যানথিখনো; ওর জামা-কাপড় আর প্রয়োজনীয় জিনিস-পত্রগুলি তুই এবেলাই গুছিয়ে বাক্সে ভরে ফ্যাল!

প্রোটিয়াস কিন্তু তখনও জানে না যে বাড়ির পুরোনো চাকরের পরামর্শ মতো তার বাবা একরকম নির্বাসন দণ্ডের মতো তাকে মিলানে পাঠাবার ব্যবস্থা করেছেন। কিছুক্ষণ আগে জুলিয়ার প্রেমপত্র পেয়ে সে খুশিতে ডানা মেলে উড়ছে কল্পনার আকাশে। বারবার ঘরিয়ে ফিরিয়ে চিঠিখানা দেখছে সে। শুরু থেকে চিঠিটা পড়ছিল প্রোটিয়াস। মাঝে মাঝে ন্যাকের কাছে নিয়ে শুকছিল তার গন্ধ; ঠিক সে সময় তাকে খজতে সেখানে এলেন তার বাবা অ্যান্টোনিও!

মন দিয়ে ছেলেকে চিঠি পড়তে দেখে অ্যান্টোনিও জিজ্ঞেস করলেন, ওটা করে চিঠি? কে লিখেছে?

কিছু না ভেবেই বলে বসিল প্রোটিয়াস, মিলান থেকে আমার এক বন্ধু ভ্যালেন্টাইন লিখেছে চিঠিটা। চিঠিটা নিয়ে এসেছে তারই এক বন্ধু।

চিঠিটা দাও তো, বলেই হাত বাড়ালেন অ্যান্টোনিও, পড়ে দেখি মিলানের কী খবর লিখেছে তোমার বন্ধু।

এই রে সেরেছে। নিজের মনে বিড়বিড় করে বলে উঠল প্রোটিয়াস, জুলিয়ার প্রেমপত্রটা এবার ওর হাতে তুলে দিতে হবে। উনি এমন ভাব দেখাচ্ছেন যেন চিঠিটা পড়তে না পারলে ওর ঘুম হবে না। আজ রাতে। এখন কী করব! সাথে সাথে নিজেকে সামলে নেয় প্রোটিয়াস। জামার হাতায় চিঠিটাকে গুজে রেখে সে বলল, কি করবে তুমি আমার বন্ধুর চিঠি পড়ে? মিলানের এমন কোনও খবর এতে নেই। যা তুমি ভাবছি। ও কেমন সুখে আছে মিলানের সম্রাটের দরবারে, দরবারে সব কাজে ওর ডাক পড়ে যখন-তখন—এই কথাই লেখা আছে চিঠিতে। সেই সাথে আমারও সেখানে যেতে লিখেছে।

সে কথা লিখেছে বুঝি? বললেন অ্যান্টোনিও, তোমার বন্ধু ভ্যালেন্টাইকে তো বেশ ভালো ছেলে বলেই মনে হচ্ছে।

নিজের মনে হাসতে হাসতে প্রোটিয়াস বলল, হাঁ, ও লিখেছে যে আমিও তার মতো সৌভাগ্যবান হতে পারি, যদি আমি মিলানে সম্রাটের দরবারে যাই।

অ্যান্টোনিও বললেন, তোমার বন্ধু যে একজন গুণী লোক তাতে কোনও সন্দেহ নেই। তুমি শুনে খুশি হবে যে তোমার বন্ধুর মত-ই আমার মত। জীবনের অনেকগুলো দিনই তুমি নিষ্কর্ম হয়ে কাটালে। এবার গা ঝাড়া দিয়ে ওঠা। আমার ইচ্ছে ভ্যালেন্টাইনের মতো তুমিও কিছুদিন মিলানে সম্রাটের দরবারে থােক। টাকা-পয়সার জন্য ভেব না। যতদিন পর্যন্ত তোমার পাকাপাকি ব্যবস্থা না হয়, আমি তোমার থাকা-খাওয়ার খরচের টাকা পাঠিয়ে দেব। তোমায় আগামীকালই রওনা হতে হবে মিলানের উদ্দেশে। হাতে মোটেও সময় নেই। তাই আর দেরি না করে চটপট তৈরি হয়ে নাও।

বাবার কথা শুনে মুখ শুকিয়ে গেল প্রোটিয়াসের। কোনোমতে সে বলল, আগামী কালই আমায় যেতে হবে? কিন্তু কী করে তা সম্ভব? তৈরি হতেও তো কমপক্ষে দুটো দিন সময়ের দরকার।

প্রোটিয়াসকে বাধা দিয়ে বললেন অ্যান্টোনিও, শুধু দুটো কেন, তৈরি হবার জন্য একদিনেরও প্রয়োজন নেই তোমার। আগে তুমি রওনা দেও, তারপর প্রয়োজনীয় সবকিছু পাঠিয়ে দেব তোমায়, এখানে একটি দিনও আর থাকার প্রয়োজন নেই; ওরে প্যানথিনো, ছোটো কত্তার জিনিসপত্র তুই সব গুছিয়ে দে, বলতে বলতে চারককে সাথে নিয়ে অ্যান্টোনিও বেরিয়ে এলেন ছেলের ঘর থেকে।

আক্ষেপ করতে করতে নিজ মনে বলতে লাগিল প্রোটিয়াস, হায় রে! এবার আমার কী হবে? আগুন থেকে বাঁচতে বাপ দিলাম। সাগরে; কিন্তু কপাল মন্দ। শেষে ডুবে মরতে হল। সেই সাগরে। বাবা রেগে যাবেন জুলিয়ার চিঠি দেখলে। তাই চেষ্টা করলাম সেটাকে বন্ধুর চিঠি বলে চালাতে। কিন্তু উলটো ফল হল তাতে। জোর করে বাবা আমায় পাঠিয়ে দিচ্ছেন সেই বন্ধুর কাছে। ফলস্বরূপ আমায় দূরে চলে যেতে হচ্ছে জুলিয়ার কাছ থেকে। আচমকাই আমার প্রেম ঢাকা পড়ে গেল মেঘের ছায়ায়।

প্রোটিয়াস জানত যে বাবার সিদ্ধান্তের নড়াচড় হবে না। তাই জুলিয়ার কাছ থেকে বিদায় নিতে সে দেখা করল তার সাথে। তারা উভয়ে হাতে হাত রেখে প্ৰতিজ্ঞা করল, যতদিন পর্যন্ত তারা বেঁচে থাকবে, উভয়ে উভয়কে ভালোবাসবে, একে অন্যের প্রতি বিশ্বস্ত থাকবে। এরপর আংটি বদল হল দুজনের। বিচ্ছেদের মুহূর্তে তারা শপথ নিল যে হাতের আংটি কখনও খুলবে না।

 

চার

বন্ধুর সম্পর্কে যা খুশি মুখে এল বলে কোনও মতে সেদিনের মতো পরিস্থিতি সামলে দিল প্রোটিয়াস, বাস্তবে কিন্তু সত্যি হয়ে দাঁড়াল তারা সে কথাটাই। দিন যাবার সাথে সাথে মিলানের ডিউকের সুনজরে পড়তে লাগল। তার বন্ধু ভ্যালেন্টাইন। এর পাশাপাশি এমন একটা ব্যাপার ঘটল যা ভাবাই যায় না। — প্রেমে পড়ল ভ্যালেন্টাইন। তার প্রেমিকা যে সে কেউ নয়, খোদ ডিউকের সুন্দরী মেয়ে সিলভিয়া, যে ভ্যালেন্টাইন ভেরোনা থাকাকালীন প্রেম থেকে সর্বদা দূরে থাকত, সেই কিনা মিলানে এসে প্রেমে পড়ে গেল ডিউকের মেয়েকে দেখে। এদিকে সিলভিয়ারও ভালো লেগে গেল স্বাস্থ্যবান সুন্দর তরুণ ভ্যালেন্টাইনকে দেখে। বলাই বাহুল্য, সুন্দরী সিলভিয়ার ডাকে সেদিন সাড়া দিয়েছিল ভ্যালেন্টাইন। এরপর থেকে সবার নজর এড়িয়ে প্রেম করতে লাগল দুজনে। সবসময় নজর রাখতে লাগল সিলভিয়া যাতে ডিউক এ ব্যাপারে কিছু টের না পান। এর একটাই কারণ — ডিউক খুবই ভালোবাসতেন ভ্যালেন্টাইনকে আর প্রায় প্রতিদিনই তাকে প্রাসাদে নিয়ে এসে তার সাথে ডিনার খেতেন। কিন্তু একমাত্র মেয়ে সিলভিয়ার বিয়ে তিনি আগেই ঠিক করে রেখেছিলেন তার এক তরুণ সভাসদ ঘুরিওর সাথে। ডিউকের সভাসদ হলেও এই থুরিও ছিল মাথামোটা লোক, খুব কমই ছিল তার বুদ্ধিাশুদ্ধি। এ কারণে বাপের পছন্দসই ভাবী পত্রিকে মোটেই পছন্দ করত না সিলভিয়া। থুরিওর সাথে দেখা হলেই সে তার প্রতি অবজ্ঞার ভােব প্রকাশ করত নানা ভাবে।

এরই মধ্যে একদিন প্রোটিয়াস এসে হাজির মিলানে। তার সাথে ডিউকের পরিচয় করিয়ে দিতে গিয়ে প্রোটিয়াসের স্বভাব-চরিত্র সম্পর্কে এমন সব প্রশস্তি গাইলেন ভ্যালেন্টাইন যা শুনে মুগ্ধ হয়ে গেলেন ডিউক। তিনি তাকে আমন্ত্রণ করলেন সভায় যাবার জন্য। এরপর ডিউক একদিন ভ্যালেন্টাইন এবং প্রোটিয়াস—উভয়কেই তার প্রাসাদে ডিনারের জন্য আমন্ত্রণ জানালেন।

একদিন বন্ধুর সাথে ডিউকের প্রাসাদে এল প্রোটিয়াস। ডিউকের মেয়ে সিলভিয়ার সাথে সেখানে তার পরিচয় করিয়ে দিলে ভ্যালেন্টাইন। এরই মাঝে একসময় প্রোটিয়াসকে একপাশে সরিয়ে এনে জানতে চাইল তার প্রেমিকা জুলিয়া কেমন আছে। সেই সাথে অকুণ্ঠে স্বীকারও করল। ভ্যালেন্টাইন এযাবত সে যা এড়িয়ে গেছে, সেই প্রেমই তাকে গ্ৰাস করেছে মিলানে আসার পর। সে উপলব্ধি করতে পেরেছে প্রেমের শক্তি কত ব্যাপক। ভ্যালেন্টাইন যে সিলভিয়ার প্রেমে পড়েছে তা মুখ ফুটে স্বীকার না করলেও প্রোমের প্রতি তার এই নতুন দৃষ্টিভঙ্গি দেখে তা বুঝতে অসুবিধা হল না প্রোটিয়াসের। কিন্তু সিলভিয়ার সাথে পরিচয় হবার পর সম্পূৰ্ণ পালটে গেছে তার মন। মন থেকে জুলিয়াকে সরিয়ে দিয়ে তার জায়গায় সিলভিয়াকে পেতে উদগ্রাব প্রোটিয়াস। আর প্রোটিয়াস ও এ ব্যাপারে সচেতন যে এ নিয়ে তাকে প্রতিদ্বন্দ্বিতায় নামতে হবে বন্ধু ভ্যালেন্টাইনের সাথে।

কথায় কথায় পরদিন সিলভিয়ার সাথে তার প্রেমের কথা প্রোটিয়াসকে খুলে বলল ভ্যালেন্টাইন। সে এও বলল যে ডিউক তার মেয়ের বিয়ে ঠিক করেছেন স্যার থুরিও নামে এক সভাসদের সাথে, কিন্তু সিলভিয়ার মোটেই পছন্দ নয় স্যার থুরিওকে।

কিন্তু সিলভিয়া স্যার থুরিওকে পছন্দ না করলেও তাতে কি তোমার কোনও সুবিধা হবে? জানতে চাইল প্রোটিয়াস, ডিউক তো তার মত বদলে তোমার সাথে মেয়ের বিয়ে দেবেন না!

আমি জানি তিনি তা দেবেন না, একটুও দমে না গিয়ে বলল ভ্যালেন্টাইন, বিয়ের ব্যাপারে আমি আর সিলভিয়া, উভয়েই স্থির করে ফেলেছি আমাদের মন।। আজ রাতেই আমরা এখান থেকে পালিয়ে গিয়ে অন্যত্র বিয়ে করব। বলেই ভ্যালেন্টাইন একটা দড়ির সিঁড়ি বের করে দেখাল প্রোটিয়াসকে।

কোন কাজে লাগবে এটা? জানতে চাইল প্রোটিয়াস।

এর জবাবে বলল ভ্যালেন্টাইন, আজি সন্ধের পর ডিউকের প্রাসাদের কোনও এক জানালায় এটা বেঁধে দেব। এ ব্যাপারে সিলভিয়াকে আগেই বলে দেব যাতে সে জানালাকে চিনে রাখে। তারপর রাত বাড়ার সাথে সাথে সবার নজর এড়িয়ে সিলভিয়া এই প্ৰাসাদ থেকে নেমে আসবে। বাইরে তৈরি থাকবে ঘোড়া। সিলভিয়া নেমে এলেই আমরা পালিয়ে যাব ঘোড়ায় চড়ে।

নিজের মনে প্রোটিয়াস বলল, বা! সব কিছুই দেখছি আমার স্বার্থসিদ্ধির পথে এগুচ্ছে। সে স্থির করল সিলভিয়াকে নিয়ে ভ্যালেন্টাইন মিলান ছেড়ে পালিয়ে যাবার পূর্বেই সে ডিউককে তাদের পরিকল্পনার কথা জানিয়ে দেবে। সব শুনে ডিউক হয়তো ভ্যালেন্টাইনকে কঠিন সাজা, এমনকি মৃত্যুদণ্ডও দিতে পারেন। ভ্যালেন্টাইনের অবর্তমানে সিলভিয়ার সাথে প্রেমের আর কোনও বাধা থাকবে না। তবে একটা বাধা তখনও থাকবে – তা হল স্যার থুরিও। কিন্তু তিনি তো একটা গবেট, মোটা বুদ্ধির লোক। তাছাড়া সিলভিয়াও তাকে দুচোখে দেখতে পারেনা। তাই স্যার থুরিওকে সরিয়ে দিতে তার বেশি সময় লাগবে না। আর দেরি না করে পথের কীটা ভ্যালেন্টাইনকে সরিয়ে দিতে সে দেখা করল ডিউকের সাথে।

 

পাঁচ

মুখ তুলে তাকিয়ে ডিউক বললেন, আসুন প্রোটিয়াস, এখানে কোনও অসুবিধা হচ্ছে না তো?

না মহামান্য ডিউক, বলল প্রোটিয়াস, এই অসময়ে আপনাকে বিরক্ত করতে এসেছি একটা বিশেষ কারণে।

নিঃসংকোচে আপনি আপনার প্রয়োজনের কথা বলতে পারেন, বললেন ডিউক।

আমতা আমতা করে প্রোটিয়াস বলল, আজ্ঞে ভ্যালেন্টাইন আমার বাল্যবন্ধু। কিন্তু যে পরিকল্পনা সে করেছে তা আপনার পরিবারের ক্ষতি করতে পারে।

ব্যস্ত হয়ে ডিউক বললেন, তই নাকি? তাহলে খুলেই বলুন ভ্যালেন্টাইনের পরিকল্পনার কথাটা?

ভ্যালেন্টাইনের মুখেই আমি শুনেছি সে আপনার মেয়ে সিলভিয়াকে নিয়ে আজ রাতে পালিয়ে যাবার মতলব এটেছে, বলল প্রোটিয়াস, সন্ধ্যার পর চারিদিক যখন গাঢ় আঁধারে ঢেকে যাবে, ঠিক তখনই রাজপ্রাসাদের একটা জানালা থেকে দড়ির সিঁড়ি ঝুলিয়ে দেবে ভ্যালেন্টাইন। লেডি সিলভিয়া সেই সিঁড়ি বেয়ে নীচে নেমে আসবেন। তারপর এখান থেকে তিনি পালিয়ে যাবেন। ভ্যালেন্টাইনের সাথে। আর ওই দড়ির সিঁড়িটাকে তার আলখাল্লার ভেতরে লুকিয়ে রাখবে। ভ্যালেন্টাইন। আমি সত্যি কথা বলছি কিনা তা ওটা পেলেই আপনি বুঝতে পারবেন।

প্রোটিয়াসের মুখে সবকিছু শুনে কিছুক্ষণ অবাক হয়ে তার দিকে তাকিয়ে রইলেন ডিউক তারপর কিছুক্ষণ বাদে বললেন, সময় মতো কথাটা আমায় জানিয়ে আপনি আমার কী উপকারই যে করলেন তা বলে বোঝাতে পারব না। আপনি বলুন, এর প্রতিদানে আপনি কী পুরস্কার চান? হে মহামান্য ডিউক, বলল প্রোটিয়াস, পুরস্কারের আশায় আমি আপনার কাছে আসিনি। আপনাকে যা বলেছি তা কর্তব্যের খাতিরে বাধ্য হয়েই বলতে হয়েছে। তবে আপনি যখন পুরস্কারের কথা বলছেন, তখন আপনার কাছে চাইবার একটিমাত্র জিনিসই আছে আমার।

ডিউক জানতে চাইলেন, সেটা কি?

হে মহামান্য ডিউক, বলল প্রোটিয়াস, যত অপরাধই সে করে থাকুক ভ্যালেন্টাইন আমার ছেলেবেলার বন্ধু। আপনার কাছে আমার বিশেষ অনুরোধ, এ সব কথা যে আমি বলেছি তা যেন সে জানতে না পারে।

ডিউক বললেন, বেশ, আমি কথা দিচ্ছি ভ্যালেন্টাইনের পরিকল্পনার কথা আমি যে তোমার মুখ থেকে শুনেছি সেটা তার অজানা থেকে যাবে।

আপনি না বললেও আমিই যে এসব কথা বলেছি তা সে ঠিক জানতে পারবে, বলল প্রোটিয়াস, কারণ একমাত্র তিনজন অর্থাৎ ভ্যালেন্টাইন, আমি আর সিলভিয়াই জানি এ পরিকল্পনার কথা। ডিউক তাকে আশ্বাস দিয়ে বললেন, মিছিমিছিই। আপনি ভয় পাচ্ছেন প্রোটিয়াস। একবার হাতের মুঠোর মধ্যে ভ্যালেন্টাইনকে পেলে আমি তাকে বাধ্য করাব অপরাধ স্বীকার করতে। তাই সে আপনাকে কোনও মতেই সন্দেহ করতে পারবে না।

বিনীতভাবে প্রোটিয়াস বলল, এবার তাহলে আমি আসি?

আসুন আপনি বলে মুখ টিপে হাসলেন ডিউক, ভ্যালেন্টাইন আসবে সন্ধের পর। তার পূর্বেই তাকে হাতের মুঠোয় পাবার ব্যবস্থা আমায় করে রাখতে হবে। আর এও জেনে রাখুন প্রোটিয়াস, স্যার থুরিওর সাথে বিয়ে না হলে আমি সিলভিয়াকে আটকে রাখব দুর্গের ভেতর

 

ছয়

প্রোটিয়াস বিদায় নেবার পর ডিউক আর ইচ্ছে করেই অন্য কোথাও গেলেন না। হাতে নাতে ভ্যালেনটাইনকে ধরার জন্য এমন এক জায়গায় বসে রইলেন যেখান থেকে প্রাসাদের সামনের রাস্তাটুকু স্পষ্ট দেখা যায়। দেখতে দেখতে সন্ধ্যা নেমে এল। গাঢ় অন্ধকারে ছেয়ে গেল চারদিক। এভাবে কিছুক্ষণ সময় কাটাবার পর ডিউক দেখতে পেলেন খুব জোরে পা চালিয়ে প্রাসাদের ফটকের দিকে এগিয়ে আসছে ভ্যালেন্টাইন। তার পা ফেলার মধ্যে যে একটা চাপা অস্থিরতা রয়েছে সেটাও ডিউকের নজর এড়াল না। কাছাকাছি আসতেই তিনি লক্ষ করলেন যে ভ্যালেন্টাইনের পরনের ঢোলা আলখাল্লার একটা দিক কেমন যেন উচু হয়ে আছে। দেখে মনে হচ্ছে কিছু একটা যেন ভেতর থেকে ঠেলে বেরিয়ে আসতে চাচ্ছে। যে দড়ির কথা প্রোটিয়াস বলেছিল, ডিউক আঁচ করলেন সেটাই ওখানে গুজে রেখেছে ভ্যালেন্টাইন।

আরে, ভ্যালেন্টাইন মনে হচ্ছে, জোর গলায় ডাকলেন ডিউক, আপনাকে দেখে মনে হচ্ছে একগাদা জরুরি কাজ যেন এখনই সেরে ফেলতে হবে। আপনি একবার। এদিকে আসন, জরুরি কথা আছে।

ডিউকের গলার আওয়াজ শুনে দাঁড়িয়ে পড়ল ভালেন্টাইন। পায়ে পায়ে ডিউকের কাছে এসে বলল, আপনি সঠিক অনুমান করেছেন মহামান্য ডিউক। সত্যিই আমার একটা জরুরি কাজ রয়েছে। সেটা সেরেই আমি এখুনি আসছি।

জরুরি কাজ! সেটা কী জানতে পারি? বললেন ডিউক।

আমতা আমতা করে ভ্যালেন্টাইন বলল, আজ্ঞে বন্ধুদের জন্য কয়েকটি চিঠি লিখেছি। প্রাসাদের বাইরে আমার একজন চেনা লোক অপেক্ষা করছে সেগুলি নেবার জন্য।

ও সব পরে হবে, ভ্যালেন্টাইনের দিকে চেয়ে বললেন ডিউক, এমন দিয়ে আমার কথাটা শুনুন। আমি খুবই সমস্যার মধ্যে আছি একটা ব্যক্তিগত বিষয় নিয়ে। আমি জানি যে আপনি খুবই বুদ্ধিমান। তাই এ ব্যাপারে সবকিছু আপনাকে খোলাখুলি বলছি। এ বিশ্বাস আমার আছে যে বুদ্ধি বাতলিয়ে আপনি আমায় সাহায্য করতে পারবেন।

ডিউকের কথায় গলে গিয়ে ভ্যালেস্টাইন বলল, আপনি বলুন, আমি যথাসাধ্য চেষ্টা করব আপনাকে সাহায্য করার।

ডিউক বললেন, আপনি হয়তো শুনেছেন স্যার থুরিওর সাথে আমার মেয়ে সিলভিয়ার বিয়ের কথা আমি বহুদিন আগেই ঠিক করে রেখেছিলাম। কিন্তু যত দিন যাচ্ছে, সিলভিয়া কেমন যেন অবাধ্য হয়ে পড়ছে। আমার মনোনীত পাত্র তার মোটেই পছন্দ নয়। তাই আমি স্থির করেছি বুড়ে বয়সে আবার বিয়ে করব। সিলভিয়া যদি তার পছন্দমতো কাউকে বিয়ে করে, তাহলে সে বিয়েতে আমি কোনও যৌতুক দেব না। আর আমার মৃত্যুর পর আমার স্থাবর-অস্থাবর সম্পত্তির কানা-কড়িও সিলভিয়া পাবে না।

ভ্যালেন্টাইন ক্ৰমেই অধৈর্য হয়ে উঠছে ডিউকের কথা শুনতে শুনতে। মনে মনে ভাবছে সে, এই বুড়োটা আর কতক্ষণ তাকে এভাবে আটকে রাখবে। কিন্তু মনের ভাব বাইরে প্রকাশ করা চলে না। তাই সে ঘুরিয়ে বলল, মহামান্য ডিউক, আপনার সব কথাই তো শুনলাম। এবার বলুন কীভাবে আমি আপনাকে সাহায্য করতে পারি।

মন দিয়ে আগে আমার সব কথা শুনুন ভ্যালেন্টাইন-~~~ তাকে বিশ্বাস করে যেন গোপনীয় কথা বলছেন এভাবে চারদিকে দেখে গলা নামিয়ে বললেন ডিউক, একটি যুবতি মেয়েকে আমার খুব পছন্দ হয়েছে। মেয়েটি দেখতে সুন্দর, তার স্বভাবও খুব নম্র এবং শান্ত। আমি চাই যে মেয়েটি আমায় প্রেম নিবেদন করুক, অথচ গোল বেধেছে। সেখানেই। আপনারা সবাই এ যুগের তরুণতরুণী। প্রেম নিবেদনের পুরোনো রীতি এখন বাতিল। কী ভাবে তাকে প্রেম নিবেদন করা যায় তা আমি আপনার কাছ থেকে শিখতে চাই। এখন আপনি বলুন। এ ব্যাপারে কী ভাবে আমায় সাহায্য করতে পাবেন।

ভ্যালেন্টাইন বললেন, এ কালের যুবকেরা মাঝে মাঝে তাদের প্রেমিকদের সাথে দেখা করে, নানারূপ শৌখিন জিনিস উপহার দেয়। তাদের। প্ৰেমপত্র লিখে গোপনে তা পাঠিয়ে দেয়। কারও হাত দিয়ে। নামি রেস্তোরায় নিয়ে গিয়ে ভালো ভালো খাবার খাওয়ায়। তারা এ ভাবেই জয় করে প্রেমিকদের মন।

যে মেয়েটিকে আমি পছন্দ কয়েছি বললেন ডিউক, একটি শৌখিন উপহারও আমি তাকে পাঠিয়েছিলাম। সেটা সে গ্রহণ করেনি, ফেরত পাঠিয়ে দিয়েছে। মেয়েটির উপর তার বাবা-মার কড়া নজর। তা এড়িয়ে দিনের বেলা কেউ তার কাছে যেতে পারে না, আর মেয়েটিও পারে না বাড়ি থেকে বের হতে। এখন বলুন, কীভাবে তার সাথে দেখা হবে?

ভ্যালেন্টাইন বলল, দিনের বেলা দেখা না হলে রাতে তার সাথে দেখা করবেন।

আপনি বলছেন রাতের বেলা তার সাথে দেখা করতে, ভুরু কুঁচকে বললেন ডিউক, কিন্তু রাতের বেলা তো তার বাড়ির দরজা বন্ধ থাকে। তাহলে কীভাবে তার দেখা পাব?

দরজা যদি বন্ধই থাকে, তাহলে কি আর বাড়ির ভেতর ঢোকা যায় না? পরিণতির কথা না ভেবেই মুখ ফসকে বলে ওঠে ভ্যালেন্টাইন।

কিন্তু কীভাবে ঢোকা যাবে? জানতে চাইলেন ডিউক।

কেন! দড়ির তৈরি সিঁড়ি বেয়ে, জবাব দিল ভ্যালেন্টাইন, আপনি চাইলে ওরূপ একটা সিঁড়ি আমিই এনে দেব আপনাকে। আমার মতো। আপনিও একটা আলখাল্লা পরবেন। সিঁড়িটা ভাঁজ করে আলখাল্লার ভেতর গুজে নেবেন। তাহলেই আর কেউ টের পাবে না বাইরে থেকে। তারপর আপনি সহজেই আটকে দেবেন। সেই সিঁড়িটা প্রাসাদের কোনও খোলা জানালায়। আর ওই সিড়ি বেয়ে উপরে উঠে ঢুকে যাবেন বাড়ির ভেতরে। তবে তার আগে আপনাকে জানতে হবে পছন্দের মেয়েটি কোন ঘরে থাকে। আমার মনে হয় বাড়ির কাজের লোকদের দরাজ হাতে বিকশিশ দিলেই আগেভাগে তারা আপনাকে সেটা জানিয়ে দেবে।

ভ্যালেন্টাইনের কথা শেষ না হতেই বলে উঠলেন ডিউক, সাবাস, বেশ ভালো বুদ্ধি দিয়েছেন তো! দয়া করে এবার আর একটু উপকার করুন। আজ রাতের জন্য আপনারা ঢোলা আলখাল্লাটা ধার দিন আমায়।

ভ্যালেন্টাইন তখনও আঁচ করতে পারেনি। ডিউকের আসল মতলবটা। তাই সেইতস্তত করতে লাগল আলখাল্লাটা গা থেকে খুলে দিতে। কিন্তু ডিউকের আর তাঁর সইছে না। একরকম জোর করেই তিনি আলখাল্লাটা খুলে নিলেন তার গা থেকে। সেটা কেড়ে নিয়ে ভেতরে হাত ঢুকোতেই হাতে এল দড়ির সিড়ি আর ভঁাজ করা একটা কাগজ। ওগুলো বের করে ভ্যালেন্টাইনের সামনেই খুলে ফেললেন তিনি। দেখা গেল জিনিস দুটির মধ্যে একটি ভাজ করা দড়ির সিঁড়ি, অপরটি তার মেয়ে সিলভিয়াকে লেখা একটি চিঠি। সে চিঠির নীচে সই রয়েছে ভ্যালেন্টাইনের। চিঠিটা খুঁটিয়ে পড়লেন ডিউক। দেখলেন তাতে লেখা রয়েছে কীভাবে ভ্যালেন্টাইন সিলভিয়াকে নিয়ে মিলান থেকে পালিয়ে যাবে তার বিস্তারিত পরিকল্পনা।

চিঠিখানা পড়ে বেজায় রেগে গেলেন ডিউক। গালাগালি দিতে লাগলেন ভ্যালেন্টাইনকে, নচ্ছার! বেইমান! আমার কাছ থেকে এত উপকার এবং অনুগ্রহ পাবার পর শেষে কিনা এই প্রতিদান? এই মুহুর্তে আমি বিতাড়িত করছি আপনাকে আর সেই সাথে নির্বাসন দণ্ডও দিলাম। ভালো করে মন দিয়ে শুনুন ভ্যালেন্টাইন, এই মুহূর্তে মিলান ছেড়ে যেখানে খুশি আপনি চলে যাবেন। কাল সকলে এই শহরে আপনাকে দেখা গেলে প্রাণদণ্ডে দণ্ডিত হবেন আপনি।

ডিউকের দেওয়া নির্বাসন দণ্ড মাথায় নিয়ে ভ্যালেন্টাইন বাধ্য হলেন সে-রাতে মিলান ছেড়ে চলে যেতে। যাবার পূর্বে সিলভিয়ার সাথে দেখা করার সুযোগটুকুও পেলেন না তিনি।

 

সাত

ওদিকে প্রোটিয়াসের প্রেমিকা জুলিয়া মনখারাপ করে বসে আছে ভেরোনায়। মনখারাপ হবারই কথা, কারণ বহুদিন ধরে তার কোন ও যোগাযোগ নেই প্রোটিয়াসের সাথে। প্রোটিয়াস কথা দিয়েছিল যে মিলানে গিয়ে নিয়মিত চিঠি-পত্র দেবে তাকে। অথচ আজ পর্যন্ত সে একটিও চিঠি লেখেনি। এ সব দুঃখের কথা পরিচারিকা লুসেট্টার কাছে বলে মনকে হালকা করছে জুলিয়া। লুসেট্টার বহু সাস্তুনা সত্ত্বেও মনের ক্ষোভ বেড়ে গেল জুলিয়ার। সে বলল লুসেট্টাকে, যতই তুই আমায় বােঝাবার চেষ্টা করিস না কেন, আমি কিন্তু ভুলছি না ত্রে ও সব ছেদাে কথায়। আমি তোকে বলে রাখছি, এত দূরে বসে তার পথ চেয়ে দিন গোনা আর আমার পোষাবে না। যেভাবেই হোক, এবার আমায় প্রোটিয়াসের কাছে মিলানে যেতে হবে। এটাই আমার শেষ কথা। যদি পরিস তো মাথা খাটিয়ে বের করা কীভাবে সেখানে যাওয়া যায়।

আমি বেশ বুঝতে পারছি তোমার মানসিক অবস্থা, কিন্তু ভেবেছ কি, সেখানে কী করে যাবে? বলল লুসেট্টা।

জুলিয়া বলল, ভেবে দেখলাম মেয়েমানুষ নয়, পুরুষের বেশে গেলে কারও কুনজর আমার উপর পড়বে না। এমনভাবে তুই আমায় সাজিয়ে দেয়াতে সবাই ভাবে আমি কোনও ধনী লোকের বাড়ির চাকর, খুঁজতে বেরিয়েছি নিজের মনিবকে।

কিন্তু ছেলে সাজতে হলে তো মাথার সব চুল আগে কেটে ফেলতে হবে, বলল লুসেট্টা। না, আমি চুল কাটব না, বলল জুলিয়া, এমনভাবে তুই আমার লম্বা চুলগুলি বেঁধে দিবি যাতে সবাই মনে ভাবে পুরুষ হয়েও আমি মেয়েদের মতো চুল রেখেছি।

লুসেট্টা বলল, বেশ, তাই দেব। ঈশ্বরের কাছে প্রার্থনা করি তোমার মনস্কামনা পূৰ্ণ হোক।

তাহলে আর দেরি না করে সাজিয়ে দে আমায়, বলল জুলিয়া, যাবার পূর্বে আমি আমার জিনিসপত্র, বিষয়-সম্পত্তি সবকিছু দেখাশোনার সব কিছু দায়িত্ব দিলাম তোকে। এখানকার খবরাখবর জানিয়ে মাঝে মাঝে তুই আমায় চিঠি দিস।

 

মিলান শহরের সীমান্তের কাছেই ম্যান্টুয়া। কোথায় যাবে ভেবে না পেয়ে সীমান্ত পেরিয়ে ম্যান্টুয়ায় ঢুকে পড়ে নির্বাসিত ভ্যালেন্টাইন। ঢোকার সাথে সাথেই তাকে ঘিরে ধরে একদল ডাকত। তারা বলল, যদি প্ৰাণে বাঁচতে চাস, তাহলে সাথে যে টাকাকড়ি আছে তা ভালোয় ভালোয় দিয়ে দে।

অসহায়ভাবে তাদের দিকে তাকিয়ে বলল ভ্যালেন্টাইন, আমার নির্বাসন দণ্ড দিয়েছিলেন মিলানের ডিউক। কোনও টাকা-কড়ি নেই আমার কাছে।

ডাকাতদের একজন জানতে চাইল, তুমি কি ভেবেছ কোথায় যাবে?

ভাবছি ভেরোনায় যাব, উত্তর দিল ভ্যালেন্টাইন।

আর একজন ডাকাত জানতে চাইল, মিলানে তুমি কতদিন ছিলে?

মনে মনে হিসাব করে ভ্যালেন্টাইন বলল, তা কমদিন নয়, পুরো যোলো মাস। হয়তো আরও কিছুদিন থাকতাম, যদি কপাল খারাপ না হত।

প্রথম ডাকাত জানতে চাইল, তুমি কী এমন করেছিলে যার জন্য ডিউক তোমায় নির্বাসনে পাঠাল?

আমি একজনকে খুন করেছিলাম, ইচ্ছে করেই মিথ্যে কথাটা বলল ভ্যালেন্টাইন, মারপিট করতে করতে এমন বেধড়ক মারা তাকে দিয়েছি যে সে মরেই গেল। নির্বাসনের জন্য আমার কোনও দুঃখ নেই। কিন্তু মৃত লোকটার মুখ যখন আমার চোখের সামনে ভেসে ওঠে, তখনই যেন মুষড়ে পড়ে আমার মনটা। বারবার মনে হয় কাজটা ঠিক হয়নি। আমি মহাপাপ করেছি। ওকে খুন করে!

যা ঘটে গেছে তার জন্য মিছামিছিমিন খারাপ কোরো না, বলল ডাকাতদের একজন, যদিও আমরা ডাকাত কিন্তু তা সত্ত্বেও আমাদের অনেকেই ভদ্রঘরের ছেলে। আমিও ভেরোনা থেকে নির্বাসিত হয়েছি। ভদ্রঘরের এক যুবতির টাকা-পয়সা চুরির দায়ে।

আর এক ডাকাত বলল, আর আমিও ম্যান্টুয়া থেকে নির্বাসিত হয়েছি মানুষ খুনের দায়ে।

তুমিও যখন অপরাধ করে মিলান থেকে নির্বাসিত হয়েছ, তখন আর তোমাকে আমাদের একজন বলে ভাবতে বাধা নেই, বলল প্রথম ডাকাত, তুমি দেখতে ভালো, চমৎকার স্বাস্ত। আর কথাবার্তাও বেশ ভালো। কোনও সন্দেহ নেই যে তুমি বেশ বুদ্ধিমান আর ঠান্ডা মাথার লোক, তুমি আজ থেকে আমাদের সাথে থাকবে। তুমিই হবে আমাদের দলের সর্দার। তুমি যা বলবে আমরা তাই মেনে নেব। আমার এ প্রস্তাবে রাজি হলে ভালো, নইলে এক্ষুনি মেরে ফেলব তোমায়।

তোমার প্রস্তাবে আমি রাজি আছি তবে একটা শর্ত আছে আমার, বলল ভ্যালেন্টাইন, যদি তোমরা কথা দাও যে আমার শর্ত মেনে চলবে, তাহলে আমার আপত্তি নেই তোমাদের সর্দার হতো।।

ডাকাতরা জানতে চাইল, কী শর্ত?

সরল অসহায় গরিব লোক আর মেয়েদের উপর কোনও অত্যাচার করা চলবে না। টাকাকড়ি কেড়ে নেবার জন্য তাদের উপর কোনও অত্যাচার করতে পারবে না। এই আমার শর্ত বলল ভ্যালেন্টাইন।

ডাকাতরা সমবেতভাবে জোর গলায় বলে উঠল, আমরা কথা দিচ্ছি। তোমার শর্ত মেনে নেব।

তাহলে আমার আর আপত্তি নেই তোমাদের সর্দার হতে, বলে ওঠে। ভ্যালেন্টাইন।

 

আট

যে কারণে ভ্যালেন্টাইনকে নির্বাসন দণ্ড দিয়েছেন। ডিউক, তাতে প্রোটিয়াসের চেয়েও বেশি। খুশি হয়েছেন স্যার থুরিও, কারণ তার সাথে মেয়ে সিলভিয়ার বিয়ে ঠিক করেছেন। ডিউক। যেহেতু পথের কীটা দূর হয়েছে তাই ডিউকও খুব খুশি। আসলে কিন্তু ব্যাপারটা দাঁড়িয়েছে অন্যরকম। মিলান থেকে ভ্যালেন্টাইন নির্বাসিত হবার পর থেকেই সিলভিয়ার বিষনজরে পড়েছেন স্যার থুরিও। তাকে দেখতে পেলেই রেগে আগুন হয়ে উঠছে সিলভিয়া। এরই মাঝে কয়েকবার মেরে দীত ভেঙে দেব বলে স্যার থুরিওর দিকে তেড়ে গিয়েছিল সিলভিয়া। তবে সময়মতো ডিউক এসে পড়ায় সে যাত্রা বেঁচে যান তিনি। সিলভিয়া ধরেই নিয়েছে স্যার থুরিওর চক্রান্তেই নির্বাসনে যেতে হয়েছে ভ্যালেন্টাইনকে। তাই স্যার থুরিও যখন তখন ডিউকের কানের কাছে প্যান প্যান করে বলছেন যে ভ্যালেন্টাইনের নির্বাসনে কোনও লাভই হয়নি তার। আগের মতোই তার সাথে খারাপ ব্যবহার করছে সিলভিয়া।

শুনে মুখ টিপে হেসে বললেন ডিউক, অত হতাশ হলে কী চলবে স্যার থুরিও! প্রেমিকের স্মৃতি অনেকটা বরফের পুতুলের মতো। আঁচ পেলেই গলে যায়। ধৈর্য ধরে একদিন চেষ্টা কর সিলভিয়ার মন জয় করার। তা হলেই দেখবে ভ্যালেন্টাইনের স্মৃতিটা উবে গেছে তার মন থেকে। ডিউক তার কথা শেষ করতেই সেখানে এসে হাজির প্রোটিয়াস। তাকে দেখে বললেন ডিউক, প্রোটিয়াস, এ তো বেশ মুশকিলের ব্যাপার হল। সিলভিয়া কিছুতেই মন থেকে মেনে নিতে পারছে না। ভ্যালেন্টাইনের নির্বাসনের ব্যাপারটা। মুখ কালো করে একা একা বসে দিনরাত শুধু চোখের জল ফেলে – স্যার থুরিওকে দেখতে পেলেই তেড়ে মারতে আসে, যা তা গালিগালাজ করে। কে জানে এভাবে চললে শেষ পর্যন্ত ব্যাপারটা কোথায় গিয়ে দাঁড়াবে? বুঝলে প্রোটিয়াস, আমার একমাত্র ইচ্ছে যে তোমার বন্ধু ওই নচ্ছার, পাঁজি ভ্যালেন্টাইনকে ভুলে গিয়ে সিলভিয়া তার মনপ্রাণ সঁপে দিক স্যার থুরিওকে।

সব শুনে প্রোটিয়াস বলল, এ আর এমন কি কঠিন কাজ মহামান্য ডিউক? সুযোগ পেলেই সিলভিয়ার কনের কাছে বলতে হবে – ভ্যালেন্টাইন একটা ঠগ, জোচোর, মিথ্যেবাদী, কাপুরুষ। কানের কাছে সৰ্ব্বদা এমন শুনতে শুনতে ভ্যালেন্টাইন সম্পর্কে সত্যি সত্যিই সিলভিয়ার মনে গড়ে উঠবে সেরূপ একটি ধারণা।

প্রোটিয়াসের কথা শুনে বললেন ডিউক, তোমার সাথে আমি একমত। এ ব্যাপারে। কিন্তু যে ভ্যালেন্টাইনকে সিলভিয়া সত্যিই ভালোবাসে, তাকে গালিগালাজ দেওয়ার ব্যাপারটা কে সামলাবে? তুমি নিজে কি রাজি আছ একাজ করতে?

নির্বাসিত হলেও একসময় ভ্যালেন্টাইন ছিল আমার প্রিয় বন্ধু, বলল প্রোটিয়াস, আর যাই হোক, বিবেকহীন না হলে তার সম্পর্কে এরূপ গালিগালাজ করা কারও পক্ষে সম্ভবপর নয়। সেই সাথে আপনি আদেশ দিলে আমার পক্ষে তা অমান্য করা অনুচিত। আর আপনি এও মনে রাখবেন মনে থেকে ভ্যালেন্টাইনের স্মৃতি মুছে গেলেও সিলভিয়া যে সত্যিই স্যার থুরিওকে ভালোবাসবেন, তার কোনও নিশ্চয়তা নেই।

এবার আগ বাড়িয়ে বললেন অতি উৎসাহী স্যার থুরিও, সেক্ষেত্রে আমি আপনাকে একটা বাস্তব ব্যবস্থা দেখাতে পারি। একই সাথে যদি আপনি ভ্যালেন্টাইনের নিন্দা আর আমার প্রশংসা করেন, যদি আপনি সুখ্যাতি করে বলেন যে আমার মতো প্রেমিক মিলানের ভেতরে-বাইরে কোথাও পাওয়া যাবে না, তাহলে কাজ হবার সম্ভাবনা আছে।

তোমার উপর আমার ভরসা আছে প্রোটিয়াস, বললেন ডিউক, ভ্যালেন্টাইন বলেছিল যে তোমার প্রেমিকা আছে- সে ক্ষেত্রে তুমি নিশ্চিন্তে কথা বলতে পার আমার মেয়ের সাথে। স্যার থুরিওকে গালিগালাজ না করে মানসিক দিক দিয়ে সিলভিয়া যাতে তাকে বিয়ে করতে তৈরি হয়। সে কথা বোঝাতে পার তাকে। আর তুমি এটা করতে পারলে স্যার থুরিও সহজেই সিলভিয়াকে আকৃষ্ট করতে পারবেন তার নিজের দিকে।

প্রোটিয়াস ডিউকে বললেন, আমি কথা দিচ্ছি, সাধ্যমতো চেষ্টা করব। স্থির করেছি আজ। রাতে একদল গাইয়ে -বাজিয়ে নিয়ে আপনার প্রাসাদে যাব। আপনার মেয়ে সিলভিয়া যে ঘরে থাকে, তার জানালার ঠিক নীচে বাগানে দাঁড়িয়ে তারা নাচ-গান করবে। আর ওই ফাকে আমি জোর গলায় প্রশংসা করে যাব স্যার থুরিওর। তবে আমি একলা হলে কিন্তু হবে না, স্যার থুরিওকে থাকতে হবে আমার সাথে। এই ওষুধে কাজ হয় কিনা তা দেখা যাক।

 

এদিকে সত্যি সত্যিই পুরুষের ছদ্মবেশে মিলানে এসে গেছে জুলিয়া, আশ্রয় নিয়েছে এক ভদ্রগোছের সরাইয়ে। সরাইয়ের খাতায় সে নিজের নাম লিখেছে সেবাস্টিয়ান। জুলিয়াকে দেখে আর তার কথা-বার্তা শুনে সরাইয়ের মালিক তাকে ভদ্র, সম্রাস্ত পরিবারের সন্তান ৰূলেই ধরে নিয়েছে। সরাইয়ের মালিক ভালো লোক। তার নতুন খদের সেবাস্টিয়ান মনমরা হয়ে দিনরাত ঘরে বসে আছে দেখে সে ধরে নিল হয়তো কোনও কারণে মনে আঘাত পেয়েছে। সিলভিয়ার মন ভালো করার জন্য ডিউকের প্রাসাদে প্রোটিয়াস যে নাচ-গানের আয়োজন করেছে, তার খবর জানতে পেরেছে সরাইয়ের মালিকও। সেদিন সকালে সেবাস্টিয়ান রূপী জুলিয়াকে সে বলল, আজি সন্ধেয় আমি আপনাকে নিয়ে যাব ডিউকের প্রাসাদে। ডিউকের মেয়ের মন ভালো করার জন্য সেখানে গান-বাজনার আয়োজন করেছেন তার প্রেমিক প্রোটিয়াস। সেখানে প্রেমিকার জানালার নিচে দাঁড়িয়ে গান গাইবেন প্রোটিয়াস। আপনি খুব আনন্দ পাবেন সেখানে গেলে।

প্রোটিয়াস! তার প্ৰেমিক! সে কিনা আসবে ডিউকের মেয়েকে গান শোনাতে? তাহলে সেই হয়েছে প্রোটিয়াসের নতুন প্রেমিক? আসলে হঠাৎ করে পুরুষের ছদ্মবেশে এতদূর আসাটা ঠিক হয়েছে কিনা, সেটাই ভাবচ্ছিল জুলিয়াকে। কিন্তু সরাই মালিকের মুখে ডিউকের মেয়ের প্রেমিকের নাম প্রোটিয়াস শুনেই তেলে-বেগুনে জ্বলে উঠল জুলিয়া। সে ঠিক করল সন্ধের পর নিজে ডিউকের বাগানে গিয়ে দেখবে প্রোটিয়াস তার নতুন প্রেমিকাকে কী গান শোনায়, কী ব্যবহার করে তার সাথে — এসব কিছুই নিজের চোখে দেখবে সে।

 

নয়

এক অল্পবয়সি ছোকরার ছদ্মবেশে সাহসে ভর করে জুলিয়া এসে হাজির ডিউকের প্রাসাদে। কৌশালে ডিউকের মেয়ে সিলভিয়ার সাথে দেখা করে তার সাথে ভাব জমাল। সে বলল তার নাম সেবাস্টিয়ান। গ্রাম থেকে সুদূর মিলানে সে এসেছে কাজের খোজে। সে কথায় কথায় সিলভিয়াকে জানাল যে প্রোটিয়াসের অপেক্ষায় রয়েছে তার প্রেমিকা জুলিয়া। একেই সিলভিয়া জেনেছিল যে ভ্যালেন্টাইনের নির্বাসনের মূলে রয়েছে প্রোটিয়াস, এবার তার প্রেমিকার কথা শুনে সে বেজায় রেগে গেল প্রোটিয়াসের উপর। কিছুক্ষণ বাদে ডিউকের প্রাসাদে এল প্রোটিয়াস। সিলভিয়ার ঘরের খোলা জানোলা দেখে তার মনে পড়ে গেল বন্ধু ভ্যালেন্টাইনের কথা।

নিজের মনেই বলল প্রোটিয়াস, আমি আমার পুরোনো বন্ধু ভ্যালেন্টাইনের সাথে বেইমানি করেছি। সিলভিয়াকে পাবার আশায়। ডিউক তাকে নির্বাসনে পাঠিয়েছেন শুধু আমারই জন্য। এবার আমি চেষ্টা করছি সিলভিয়ার কাছ থেকে থোরিওকে সরিয়ে দেবার। আমি যখন সিলভিয়ার ংসা করি, তখন তা অসহ্য লাগে থুরিওর। তাই সে আমায় গালি দেয় খুচরো প্রেমের কারবারি বলে। সে এও বলে আমি নাকি জুলিয়ার প্রতি চরম বিশ্বাসঘাতকতা করেছি। কিন্তু থুরিও এখনও আমায় চিনতে পারেনি। এত সব কাণ্ড ঘটে যাবার পরও সিলভিয়াকে পাবার লক্ষ্য থেকে সরে আসতে আমি রাজি নই। আমার জেদের সাথে তুলনা চলে শুধু স্প্যানিয়েল কুকুরের। এবার দেখা যাক ব্যাপারটা কোথায় গিয়ে শেষ হয়, কোথাকার জল কোথায় দাঁড়ায়?

সন্ধে হবার কিছুক্ষণ বাদে থুরিও এসে হাজির সেখানে। প্রোটিয়াসকে দেখে সে অবাক হয়ে বলল, আরো স্যার প্রোটিয়াস, আপনি তো দেখছি আগে-ভাগেই হাজির?

কেন, আগে আসতে আমার কি কোনও নিষেধ আছে স্যার থুরিও? বলল প্রোটিয়াস, ভালোবাসা জিনিসটা কি আপনার একচেটিয়া না তাতে অন্য কারও অধিকার আছে?

হেসে স্যার থুরিও বললেন, ভালোবাসা? আপনি কাকে ভালোবাসেন বলছেন, সিলভিয়াকে?

অবশ্যই আমি তাকে ভালোবাসি, উত্তর দিলে প্রোটিয়াস।

বড়োই সুসংবাদ দিলেন মশাই, বললেন থুরিও, এবার তাহলে শুরু করা যাক গান-বাজনা। আশা করি তাতে আপনার আপত্তি নেই।

স্যার থুরিওর কথা শেষ হবার সাথে সাথেই সিলভিয়ার জানালার নিচে উপস্থিত শিল্পীরা হইচই করে বাজনা বাজিয়ে নাচতে-গাইতে শুরু করে দিল। তাদের সাথে প্রোটিয়াস নিজেও গাইতে লাগল।

খোলা জানালার কাছে দাঁড়িয়ে সিলভিয়া বলল, কে চোঁচাচ্ছে?

এবার নতজানু হয়ে সিলভিয়াকে অভিবাদন জানিয়ে বলল প্রোটিয়াস, হে আমার প্রিয়া! শুভ সন্ধ্যা।

গলাটা যেন চেনা চেনা মনে হচ্ছে, বলল সিলভিয়া, কথাটা কে বলল?

এভাবে শুধু একজনই তো তার হৃদয়ের কথা ব্যক্ত করতে পারে বলল প্রোটিয়াস, শীঘ্রই তাকে চিনতে পারবে তার কথা শুনে।

ওহো স্যার প্রোটিয়াস, আপনি! ব্যঙ্গের হাসি হেসে বলল সিলভিয়া, তাই বলুন।

হ্যাঁ, আমিই সে প্রোটিয়াস, তোমার ভৃত্য এবং একনিষ্ঠ সেবক।

সে তো বুঝতে পারছি। অধৈর্যের সুর সিলভিয়ার গলায়, পুরোনো বন্ধুকে নির্বাসনে পাঠিয়েও আপনার সাধ মেটেনি? আর কী চান আপনি?

হে আমার প্ৰেয়সী সিলভিয়া! গদগদ স্বরে বলে ওঠে প্রোটিয়াস, আমি কী চাই তাও তোমায় বলে দিতে হবে? হৃদয়ের ভাষা শুনেও তুমি কি বুঝতে পারছি না আমি কী চাই?

থামুন মিথ্যেবাদী, বেইমান, ঠগ কোথাকার, গলা চড়িয়ে প্রোটিয়াসকে ধমকে দিল সিলভিয়া, নিজের প্রেমিককে ভুলে গিয়ে আমার জন্য গান গাইতে আপনার লজ্জা করছে না? যান, বাড়ি গিয়ে খেয়ে-দেয়ে শুয়ে পড়ুন। শুয়ে শুয়ে প্রেমিকার কথা ভাবতে ভাবতে ঘুমিয়ে পড়ুন। ভবিষ্যতে আর কখনও আমায় পাবার জন্য এরূপ তোষামোদ করবেন না। আর তা করলেও আপনার কোনও লাভ হবে না।

প্ৰেয়সী, তুমি ঠিকই বলেছ, গালাগালি খেয়ে একটুও দমে না গিয়ে বলল প্রোটিয়াস, আমি সত্যিই ভালোবাসতোম একটি মেয়েকে। কিন্তু অল্প কিছুদিন হল সে মারা গেছে।

মিথ্যেবাদী! বলেই জানালার আড়ালে দাঁড়ানো পুরুষবেশী জুলিয়া সামলে নিলে নিজেকে। হায়! সবার সামনে এই মূহূর্তে যদি আমার আসল পরিচয়টা প্রকাশ করতে পারতাম! বলেই সে আক্ষেপ করে নিজের মনে। গলা নামিয়ে সে সিলভিয়াকে লক্ষ্য করে বলল, লেডি সিলভিয়া! উনি মিথ্যে কথা বলছেন। সার প্রোটিয়াসের প্রেমিকা আজও জীবিত।

চেঁচিয়ে বলে উঠল সিলভিয়া, স্যার প্রোটিয়াস, আপনি মিথ্যে কথা বলছেন। আপনার প্রেমিকা যে আজও জীবিত তা আমার অজানা নেই। আর সেই ভ্যালেন্টাইনের বাগদত্ত আমি, তাকে দেশ ছাড়া হতে হয়েছে আপনারই জন্য। ভ্যালেন্টাইনকে আমি কথা দিয়েছিলাম যে বিয়ে করব। সেই ভ্যালেন্টাইন। কিন্তু আজও জীবিত; তাই এ অবস্থায় যে প্ৰেম আপনি আমায় নিবেদন করছেন তা শুধু অন্যায় নয়, অবৈধও বটে।

ব্যঙ্গের হাসি হেসে বলল সিলভিয়া, বাঃ সার প্রোটিয়াস, প্রথমে আপনার বন্ধু তারপর প্রেমিক, কত সহজেই না। আপনি দুজনকে মৃত বলে চালিয়ে দিলেন; এরপর হয়তো আপনি বলবেন সিলভিয়াও মারা গেছে। আর এও জেনে রাখুন। স্যার প্রোটিয়াস, সত্যিই যদি ভ্যালেন্টাইন মারা গিয়ে থাকে, তাহলে তার প্রতি আমার প্রেম, ভালোবাসা- সবই আমি তার কবরে সমাধিস্থ করব?

তেমন পরিস্থিতি হলে তোমার সে প্ৰেম আমি ভ্যালেন্টাইনের কবর খুলে বের করে আন ব, বলল প্রোটিয়াস।

স্যার প্রোটিয়াস, আমার প্রেম খুবই পবিত্র, বলল সিলভিয়া, ভুলেও আপনি তা তুলে আনার চেষ্টা করবেন না। এই তো খানিক আগে বললেন যে আপনার প্রেমিক মারা গেছে। তাহলে কবর খুঁড়েই না হয় আপনার পুরোনো প্রেমটা বের করে আনবেন।

আক্ষেপ করে বলল প্রোটিয়াস, হায় প্ৰেয়সী! তুমি কি কখনও সদয় হবে না। আমার প্রতি? তাহলে তোমার একটা ছবিই দাও আমাকে। না হয় তোমার পরিবর্তে সেই ছবিকেই আমি ভালোবাসব।

জানালার আড়ালে দাঁড়িয়ে থাকা জুলিয়া দীর্ঘশ্বাস ফেলল। প্রোটিয়াসের কথা শুনে।

সিলভিয়া সত্যি সত্যিই ভারি মুশকিলে পড়েছে। একদিকে সে জানতে পেরেছে মিলান থেকে নির্বাসিত হয়ে তার প্রেমিক দিন কাটাচ্ছে ম্যান্টুয়ার জঙ্গলে, ভেতরে ভেতরে সে অস্থির হয়ে উঠেছে তার কাছে যাবার জন্য। অন্য দিকে স্যার থুরিওর সাথে বিয়ে দেবার জন্য তার বাবা যে ভাবে উঠে পড়ে লেগেছেন, তার জন্যও এক দুঃসহ পরিস্থিতির মধ্যে দিন কাটাচ্ছে সে। সে স্থির করল। এ দুঃসহ অবস্থা থেকে পরিত্রাণ পেতে একদিন সবার অজান্তে বাড়ি থেকে পালিয়ে সে চলে যাবে ম্যান্টুয়ার জঙ্গলে ভ্যালেন্টাইনের কাছে। কিন্তু ম্যান্টুয়া বহুদূরের পথ। তার মতো একজন যুবতির পক্ষে এতদূর পথ পাড়ি দেওয়ার ঝুকি প্রচুর। তাই সে গোপনে বাবার এক বৃদ্ধ কর্মচারী এগলামুরকে অনুরোধ করল যেন সে তাকে সেখানে পৌঁছে দেয়। সিলভিয়াকে খুবই স্নেহ করতেন এগলামুর। তাই তিনি এড়িয়ে যেতে পারলেন না সিলভিয়ার অনুরোধ। সন্ধের অন্ধকার গাঢ় হবার পর সিলভিয়া এগালামুরকে বললেন প্রাসাদ থেকে কিছুটা দূরে সাধু প্যাট্রিকের মঠে থাকতে — কিছুক্ষণ বাদে তিনি সেখানে এসে তার সাথে মিলিত হবেন। তারপর দুজনে বেরিয়ে পড়বেন। ম্যান্টুয়ার পথে।

 

দশ

পরদিন সকালে সত্যিই প্রোটিয়াস এসে হাজির ডিউকের প্রাসাদে, উদ্দেশ্য সিলভিয়ার ছবি নেওয়া। প্রাসাদে ঢোকার মুখে তিনি দাঁড়িয়ে পড়লেন অল্পবয়সি একটি ছেলেকে দেখে। ছেলেটির সুন্দর মুখ আর সরল চাওনি দেখে ছেলেটির প্রতি মায়া হল প্রোটিয়াসের। নাম জিজ্ঞেস করায় ছেলেটি বলল তার নাম সেবাস্টিয়ান। গ্রাম থেকে কাজের খোজে। সে এসেছে মিলানে। অল্প কদিন হল প্রোটিয়াসের কাজের লোকটা পালিয়ে গেছে। তাই সে ওকে বহাল করল সেই পদে। সুস্তির নিশ্বাস ফেলল। জুলিয়া, কারণ প্রোটিয়াস তাকে চিনতে পারেনি। ছেলেটি কাজের কিনা তা পরীক্ষা করতে তার আঙুল থেকে একটি আংটি খুলে ছেলেটিকে দিয়ে বলল প্রোটিয়াস, এবার মন দিয়ে শোনা। এই যে আংটিটা দেখছ এটা আমার প্রাক্তন প্রেমিক দিয়েছিল আমায়। এটা নিয়ে চলে যাও ডিউকের মেয়ে লেডি সিলভিয়ার কাছে। তাকে বলবে স্যার প্রোটিয়াস এটা দিয়েছেন। তাকে। আংটিটিা দেবার পর তার একটা ছবি চেয়ে নিয়ে আসবে।

জুলিয়ার জানা ছিল না যে কোনও পুরুষ তার প্রেমিকার সাথে এরূপ বেইমানি করতে পারে। প্রোটিয়াসের দেওয়া আংটিটা হাতে নিয়ে জুলিয়া মনে মনে বলল, আমার দেওয়া আংটিটা আমারই হাতে দিয়ে পাঠাচ্ছে আর একটি মেয়ের মন জয় করতে। কিছু না বলে সে আংটিটা নিয়ে এসে সিলভিয়াকে দিয়ে বলল, এই আংটিটিা আমার মনিব স্যার প্রোটিয়াসকে দিয়েছিল তার প্রাক্তন প্রেমিকা। এটা তিনি আপনার জন্য পাঠিয়েছেন। আপনার একটা ছবি চেয়েছেন তিনি।

প্রাক্তন প্রেমিকার আংটি? হেসে বলল সিলভিয়া, স্যার প্রোটিয়াসের কি লজ্জা-সরাম বলে কিছু নেই যে তার প্রেমিকার আংটি পাঠিয়েছেন আমার মন জয় করতে? ছিঃ! ছি:! স্যার প্রোটিয়াস। এবার মুখ তুলে বলল সিলভিয়া, এ আংটি আমি নিতে পারব না। এটা নিলে অসম্মান করা হবে স্যার প্রোটিয়াসের প্রেমিকাকে।

সেবাস্টিয়ানরূপী জুলিয়া বলল, আমি আপনাকে ধন্যবাদ জানাচ্ছি স্যার প্রোটিয়াসের প্রেমিকা জুলিয়ার হয়ে। কারণ একটি মেয়েই শুধু পারে অন্য মেয়ের সম্মান রক্ষা করতে।

সিলভিয়া জানতে চাইল, তুমি কি চেনো জুলিয়াকে?

নিশ্চয়ই চিনি, বলল জুলিয়া, যেমন সুন্দর তাকে দেখতে, তেমনি মধুর তার স্বভাব। সত্যিই এটা আশ্চর্যের বিষয়। এক সময় স্যার প্রোটিয়াস সত্যি সত্যিই ভালোবাসতেন জুলিয়াকে, গর্ববোধ করতেন তার জন্য। কিন্তু কে জানত জুলিয়ার ভাগ্য এত খারাপ হবে? এটুকু বলেই সে সিলভিয়ার কাছ থেকে চলে এল। এবার সে নিশ্চিত যে সিলভিয়া মোটেও ভালোবাসে না প্রোটিয়াসকে।

সে দিন রাতে প্ৰসাদ থেকে পালিয়ে সাধু প্যাট্রিকের মঠে হাজির হল সিলভিয়া। আগে থেকেই এগলামোর সেখানে অপেক্ষা করছিলেন তার জন্য। এবার সিলভিয়ার ইচ্ছানুযায়ী তিনি তার সাথে রওনা হলেন ম্যান্টুয়ার পথে। এদিকে সিলভিয়া যে এগালামুয়ের সাথে ম্যান্টুয়ায় রওনা হয়েছে সে খবর যথাসময়ে সাধু প্যাট্রিকের মুখ থেকে জানতে পারলেন ডিউক। রেগে মেগে তিনি প্রোটিয়াস আর স্যার থুরিওকে সাথে নিয়ে মেয়েকে ফিরিয়ে আনতে চললেন ম্যান্টুয়ায়।

ওদিকে অন্ধকার ম্যান্টুয়ার জঙ্গলের কাছে পৌছানো মাত্ৰই সিলভিয়া আর এগালামুর- কে ঘিরে ধরল। ডাকাতেরা। এগলামুর ছুটে পালাতে দুজন ডাকাত পেছু নিল তার। আর বাকি সবাই সিলভিয়াকে সাথে নিয়ে রওনা দিল সর্দার ভ্যালেন্টাইনের গুহার দিকে। কিন্তু তারা সেখানে পৌঁছাবার আগেই প্রোটিয়াস এসে হাজির। সিলভিয়াকে সেই রক্ষা করল। ডাকাতদের হাত থেকে। সিলভিয়া প্রোটিয়াসকে ধন্যবাদ জানাতেই সে ধরে নিল এবার সে সত্যিই সক্ষম হয়েছে তার মন জয় করতে। সাথে সাথেই সে গদগদ হয়ে বনের মাঝেই প্ৰেম জানাতে লাগল সিলভিয়াকে। সে বলল, আমি ভাষায় ব্যক্ত করতে পারবন না সিলভিয়া যে মন থেকে আমি তোমায় কতটা ভালোবাসি। এবার তুমি রাজি হলেই আমাদের বিয়ে হতে পারে।

সেবাস্টিয়ানের ছদ্মবেশে তার নতুন সহচর জুলিয়া এসে দাঁড়িয়েছে প্রোটিয়াসের পাশে; সে বেজায় ঘাবড়ে গেল প্রোটিয়াসের ধরন-ধারণ দেখে। যদি সিলভিয়া বিয়ে করতে রাজি হয়। প্রোটিয়াসকে, তাহলে সবচেয়ে বেশি ক্ষতি হবে তার। এ সময় গুহার ভেতর থেকে বের হয়ে এল ডাকাতদের সর্দার ভ্যালেন্টাইন। কিছুক্ষণ আগেই সে খবর পেয়েছে যে ডাকাতরা একটি মেয়েকে ধরেছে। খবরটা পেতেই সেই মেয়েটিকে ছেড়ে দেবার ব্যবস্থা করতে গুহার বাইরে এসেছে ভালেন্টাইন। এতদিন বাদে ভ্যালেন্টাইনকে দেখতে পেয়ে জেগে উঠল প্রোটিয়াসের বিবেক। অনুতাপের সাথে ভ্যালেন্টাইনের দুহাত জড়িয়ে ধরে সে বলল, হে বন্ধ ভাল্লেন্টাইন, বন্ধু হওয়া সত্ত্বেও তোমার সাথে যে বেইমানি করেছি তার জন্য আমি ক্ষমাপ্রার্থী, আমায় ক্ষমা কর তুমি।

মনের দিক দিয়ে প্রোটিয়াসের চেয়েও অনেক উদার ভ্যালেন্টাইন। প্রোটিয়াসের কথা শুনে সে ক্ষমা করে দিল তার সব অপরাধ। সেই সাথে এও বলল, আমি ক্ষমা করলামু তোমায়। সেই সাথে প্রেমিক হিসেবে সিলভিয়ার উপর থেকে আমার এতদিনের দাবিও তুলে নিলাম। এবার সিলভিয়াকে বিয়ে করতে তোমার আর কোনও বাধা নেই।

সেবাস্টিয়ানবেশী জুলিয়া কিন্তু বেশ ঘাবড়ে গেল ভ্যালেন্টাইনের কথা শুনে। তার ভয় হল, হয়তো সিলভিয়া এবার সত্যিই বিয়ে করতে চাইবে প্রোটিয়াসকে, আর সেরূপ কিছু ঘটে গেলে ইহজীবনে তার সাথে প্রোটিয়াসের মিলন হবে না। এ সব ভাবতে ভাবতে সে অজ্ঞান হয়ে পড়ে গেল মাটিতে। কিছুক্ষণ বাদেই জ্ঞান ফিরে এল। তার। ঠিক তখনই প্রোটিয়াসের চোখে পড়ল সেবাস্টিয়ানের হাতের আঙুলে জুলিয়ার দেওয়া আংটিটা। অবাক হয়ে বলল প্রোটিয়াস, আরে সেবাস্টিয়ান! এ আংটিটা কোথায় পেলে তুমি? এটা তো জুলিয়ার?

আপনি ঠিকই বলেছেন স্যার। এটা জুলিয়ারই আংটিং, বলে উঠল সেবাস্টিয়ানরূপী জুলিয়া, ংটিটা জুলিয়া নিজেই এখানে নিয়ে এসেছে।

প্রোটিয়াস অবাক হয়ে গেল তার কথা শুনে। এবার সে একদৃষ্টি কিছুক্ষণ চেয়ে রইল সেবাস্টিয়ানের মুখের দিকে। খুঁটিয়ে দেখার পর সে বুঝতে পারল তার প্রেমিকা জুলিয়াই তার সহচর সেবাস্টিয়ানরূপে এতদিন পর্যন্ত তার সাথে পাশে পাশে ঘুরে বেড়িয়েছে। প্রোটিয়াসের বুঝতে বাকি রইল না যে তার প্রতি প্রেমের প্রবল আকর্ষণেই জুলিয়া ছুটে এসেছে সুদূর ভেরোনা থেকে মিলানে। সব বুঝতে পেরে সে ফিরে পেল জুলিয়ার প্রতি তার হারানো প্রেম। সাথে সাথেই সে বলল ভ্যালেন্টাইনকে, সে তুমি যাই বল, লেডি সিলভিয়া কিন্তু তোমারই! আমার আর কোনও দাবি নেই তার উপর। আমি ফিরে পেয়েছি জুলিয়াকে। আমি সুখী হব বাকি জীবনটা তার সাথে কাটাতে পারলে। জুলিয়া আর সিলভিয়া, দুজনেই অনেক কষ্ট সয়েছে আমাদের জন্য। প্রোটিয়াসের কথা শেষ হতেই সেখানে হাজির মিলানের ডিউক আর তার সাথে স্যার থুরিও।

 

এগার

আমার বাগদত্তা সিলভিয়া, তারই সাথে ঠিক হয়েছে আমার বিয়ে, বলতে বলতে স্যার থুরিও এগিয়ে এলেন সিলভিয়ার দিকে।

রাগে চেঁচিয়ে উঠে বলল ভ্যালেন্টাইন, খবরদার থুরিও! এটা ম্যান্টুয়া, মিলান নয়, সে কথা মনে রেখ! আগেই বলে রাখছি তুমি কিন্তু বাঁচবে না। যদি বল সিলভিয়া তোমার বাগদত্তা। আমার ইশারামাত্র তোমার গর্দান নিয়ে নেবে। আমার অনুচরেরা। কেউ তোমায় বাঁচাতে পারবে না। ওদের হাত থেকে। আমার প্রণয়িনী সিলভিয়া, সে আমারই বাগদত্তা, তোমার কেউ নয়। যদি কোনও ভাবে তার আমর্যাদা কর, তার ফল কিন্তু ভালো হবে না। সে কথা মনে রেখ।

স্যার থুরিও একদম চুপসে গেলেন ভ্যালেন্টাইনের ধমক খেয়ে। ইতিমধ্যে ভ্যালেন্টাইনের অনুগত ডাকাতরা চারদিক দিয়ে ঘিরে ধরেছে তাকে! এক পলক তাদের দিকে তাকিয়ে পা পা করে পিছিয়ে এসে স্যার থুরিও দাঁড়ালেন ডিউকের পাশে।

আমার কোনও প্রয়োজন নেই। সিলভিয়ার মতো মেয়েকে, বললেন স্যার থুরিও, যে মেয়ের আমার প্রতি ছিটেফোটা টান নেই, খামোখা আমি কেন তার জন্য লড়তে যাব? বোকারাই শুধু বুক ফুলিয়ে এরূপ লড়াই করতে এগিয়ে যায়।

এবার তুমি থাম অপদাৰ্থ কাপুরুষ কোথাকার! থুরিওকে ধমকে দিয়ে বললেন ডিউক, আমি কখনই তোমার মতো অপােত্রর সাথে বিয়ে দেব না। আমার মেয়ের। তারপর ভ্যালেন্টাইনের দিকে তাকিয়ে বললেন, আমি জানি যে তুমি আইনভঙ্গকারী এক ডাকাত দলের অধিপতি, তবুও স্যার থুরিওকে তুমি যা বললে তা শোভা পায় শুধু প্ৰকৃত বীরের মুখে। আমি স্থির করেছি যে তুমিই সিলভিয়ার উপযুক্ত পাত্র। তাই তার সাথে বিয়ে দেব তোমার। এবার বলো, তুমি কি চাও?

আপনার কাছে আমার একটিই প্রার্থনা, ইশারায় সামনে দাঁড়ানো অনুচরদের দেখিয়ে বলল ভ্যালেন্টাইন, খুনে-ডাকাত হলেও এরা সবাই সম্রাস্ত বংশের। আপনার আদেশে আমার মতো ওরাও মিলান থেকে নির্বাসিত হয়েছিল। আমি এতদিন ওদের সাথে এই জঙ্গলে কাটিয়েছি। রোজ ওঠা-বসা করেছি। ওদের সাথে। তখনই লক্ষ করেছি মিলান আর ম্যান্টুয়ার লোকেরা যাদের ভয়ে কঁপে, ম্যান্টুয়ার গভীর জঙ্গলের সেই ডাকাতদের মধ্যে সভ্য মানুষের অনেক খাঁটি গুণ এখনও বজায় আছে। আমার অনুরোধ, আপনি ক্ষমা করুন ওদের, সুযোগ দিন ওদের সমাজে প্রতিষ্ঠিত হবার। আমার বিশ্বাস, তাহলে আপনি ওদের অনেককেই দায়িত্বপূর্ণ কাজে লাগাতে পারবেন। সে কাজ সফল করে তারাও বুক ফুলিয়ে মাথা উঁচু করে দাঁড়াতে পারবে সবার মাঝে। তাতে আপনার সুনাম বেড়ে যাবে –সেই সাথে মঙ্গল হবে মিলানেরও। আপনার কাছে। এ ছাড়া আমার আর কিছুচাইবার নেই। তাছাড়া ভেবে দেখুন। আপনার আদেশ শিরোধার্য করে তারা তো এতদিন ধরে নিজ পাপের প্রায়শ্চিত্ত করেই এসেছে।

ভ্যালেন্টাইনের কথা শুনে হাসিমুখে তাকে বললেন ডিউক, বেশ, তোমার প্রার্থনা আমি পূরণ করব। আমি এদের মাফ করে দিলাম। কথা দিচ্ছি, নূতন করে যাতে ওরা সমাজে প্রতিষ্ঠিত হতে পারে সে ব্যবস্থা আমি করব। এবার বাকি রইল একটি কাজ তা হল প্রোটিয়াসের বিচার–আমার মেয়েকে পেতে গিয়ে এতদিন পর্যন্ত যে অন্যায়। সে তোমার উপর করেছে, আজ সর্বসমুখে নিজমুখে তা স্বীকার করতে হবে তাকে। আর সেটাই হবে তার উপযুক্ত শাস্তি।

বিবেকের দংশন আর লজ্জায় এখন মাথা উঁচু করে দাঁড়াবার উপায় নেই প্রোটিয়াসের, তবু ডিউকের আদেশে ভ্যালেন্টাইনের প্রতি যত অন্যায় সে করেছে, সবার সামনে সে স্বীকার করল সে সব। আর ওদিকে ডিউকের মার্জনা আর প্রিয়জনদের কাছে যাবার সুযোগ পেয়ে সিলভিয়া ও ভ্যালেন্টাইনকে মাথার উপর তুলে ধরে নাচতে শুরু করেছে ডাকাতের দল।

এরপর সিলভিয়া-ভ্যালেন্টাইন এবং জুলিয়া-প্রোটিয়াস—এই দু-জোড়া প্রেমিক-প্রেমিকাকে সাথে নিয়ে মিলানে ফিরে এলেন ডিউক, ধুম-ধামের সাথে বিয়ে দিলেন তাদের।

দ্য টেমপেস্ট

(পুনর্কথন: মেরি ল্যাম্ব)

সমুদ্রের বুকে কোনও এক দ্বীপে বাস করতেন দুটি মানুষ – প্রসপেরো নামে এক বৃদ্ধ আর মিরান্দা নামে তাঁর পরমাসুন্দরী যুবতী কন্যা। মিরান্দা খুব অল্প বয়সে এই দ্বীপে এসেছিল। তাই বাবার মুখ ছাড়া আর কোনো মানুষের মুখ তার মনে পড়ত না।
তাঁরা বাস করতেন একটা পাথুরে গুহায়। এই গুহায় বেশ কয়েকটি খুপরি ছিল। তার মধ্যে একটি ছিল প্রসপেরোর পড়ার ঘর। এই ঘরেই তিনি রাখতেন তাঁর বইপত্তর। সে যুগে শিক্ষিত লোকমাত্রই জাদুবিদ্যার প্রতি আকৃষ্ট হতেন। প্রসপেরোও তার ব্যতিক্রম ছিলেন না। তাই তাঁর সংগ্রহের অধিকাংশ বইই ছিল জাদুবিদ্যা-সংক্রান্ত। জাদু জানতেন বলে তাঁর সুবিধাও হয়েছিল কত। ভাগ্যের বিড়ম্বনায় এই যে দ্বীপটিতে এসে তাঁকে বাসা বাঁধতে হয়েছিল, এই দ্বীপটি আগে ছিল সাইকোরাক্স নামে এক ডাইনির দখলে। সে সময়ে কিছু ভাল অশরীরীর দল তার অন্যায় আদেশগুলি পালন করতে না চাইলে ডাইনি তাদের গাছের কোটরে বন্দী করে রাখে। সাইকোরাক্স মারা যাওয়ার কিছুকাল পরে এই দ্বীপে এসে হাজির হন প্রসপেরো। তিনি নিজের জাদুবলে সেই সব অশরীরীদের মুক্তি দেন। কৃতজ্ঞতার বশে ওই অশরীরীর দলও তাঁর বশংবদে পরিণত হয়। এদের সর্দারের নাম ছিল এরিয়েল।
প্রাণোচ্ছ্বল ছোট্ট প্রেত এরিয়েল। তার স্বভাব-চরিত্র মন্দ ছিল না। কিন্তু ক্যালিবান নামে কুৎসিত দৈত্যটাকে জ্বালাতন করতে বড়ো ভালবাসত সে। ক্যালিবান ছিল তার পুরনো দুশমন সাইকোরাক্সের ছেলে। দেখতে শুনতে মানুষের থেকে বনমানুষের সঙ্গেই তার সাদৃশ্য ছিল বেশি। এই হতভাগ্য প্রাণীটাকে জঙ্গলে কুড়িয়ে পান প্রসপেরো। অবশ্য তার সঙ্গে খারাপ ব্যবহার করেন নি তিনি। বরং গুহায় নিয়ে এসে যত্ন করেন, কথা বলতে শেখান। কিন্তু মায়ের বদস্বভাব সে পেয়েছিল রক্তের সূত্রে। তাই কোনও ভাল কাজ তাকে শেখানো গেল না। অগত্যা তাকে রাখা হল ক্রীতদাসের মতো করে। কাঠ কুড়ানো আর সব কায়িক শ্রমের কাজগুলি তাকে দিয়ে করানো হতে লাগল। আর তাকে সব কাজ ঠিক ঠাক করিয়ে নেওয়ার দায়িত্বে প্রসপেরো নিয়োগ করলেন এরিয়েলকে।
প্রসপেরো ছাড়া এরিয়েলকে দেখতে পেত না কেউই। এরিয়েলের সে ছিল মহাসুযোগ। কাজে ফাঁকি দিলেই চুপি চুপি এসে ক্যালিবানকে চিমটি কেটে যেত সে। কখনও পাঁকে ঠেলে ফেলে দিত; কখনও বনমানুষের মতো মুখখানি করে ভেংচি কাটত; আবার কখনও কাঁটাচুয়ো হয়ে পড়ে থাকত ক্যালিবানের যাতায়াতের পথে। খালি পায়ে কাঁটা বিঁধে যাওয়ার ভয়ে সিঁটিয়ে থাকত ক্যালিবান। প্রসপেরোর আজ্ঞা পালনে কোনও রকম গাফিলতি দেখলেই এই রকম নানা উপায়ে ক্যালিবানকে হয়রান করে ছাড়ত এরিয়েল।
এই সব বাধ্য অশরীরীরা তাঁর আজ্ঞাবহ ছিল বলে বায়ুপ্রবাহ ও সমুদ্রের তরঙ্গ ছিল প্রসপেরোর নিয়ন্ত্রণে। একদিন তাঁর আদেশে এরা সমুদ্রের বুকে তুলল এক ভয়ানক ঝড়। সেই ঝড়ে বিক্ষুব্ধ সমুদ্র তরঙ্গের সঙ্গে প্রতি মুহুর্তে যুঝতে লাগল একটি মনোরম ও অতিকায় জাহাজ। রাক্ষুসে ঢেউগুলি যেন জাহাজটিকে গিলে খাওয়ার জন্য উদ্যত হয়ে উঠল। প্রসপেরো তাঁর মেয়েকে দেখালেন সেই দৃশ্য। বললেন, ওই জাহাজের মানুষেরাও তাঁদেরই মতো জ্যান্ত মানুষ। মিরান্দা বললে, “দোহাই তোমার বাবা, যদি নিজের জাদুবলে এই ঝড় তুলে থাকো, তবে এখনই একে সংবরণ করে নাও। দ্যাখো! জাহাজখানা যে ভেঙে গুঁড়িয়ে যেতে বসেছে। আহা বেচারারা! আমার ক্ষমতা থাকলে সমুদ্রটাকেই রসাতলে পাঠাতুম। এমন সুন্দর জাহাজখানা আর এতগুলি মূল্যবান প্রাণ নষ্ট হতে দিতুম না কিছুতেই।”
প্রসপেরো বললেন, “উতলা হোস্ না, মা। আমার আদেশ আছে। ওদের কিচ্ছুটি হবে না। জাহাজের কারো গায়ে আঁচড়টি পর্যন্ত লাগবে না। আর এই যা করছি, এ জানবি তোরই জন্য। তুই তো জানিস না যে তুই কে – কোথা থেকেই বা এসেছিস। আমি তোর বাপ; এই পোড়া গুহায় থাকি – এটুকু ছাড়া আমার সম্পর্কেই বা কতটুকু জানিস তুই? আচ্ছা, আগেকার দিনের কথা তোর কি কিছু মনে পড়ে, মা। বোধহয় পড়ে না, তাই না? কেমন করেই বা পড়বে? তুই যে তখনও তিন বছরেরও হোসনি।”
মিরান্দা বললে, “নিশ্চয়ই মনে পড়ে, বাবা।”
প্রসপেরো জিজ্ঞাসা করেন, “কেমন করে? আর কেউ কি কোনও দিন তোকে কিছু বলেছে? বল মা, আমায়, কি মনে পড়ে তোর!”
মিরান্দা বললে, “কেমন স্বপ্নের মতো মনে হয়। আচ্ছা বাবা, সেই সময় কি চার-পাঁচজন স্ত্রীলোক আমার পরিচর্যা করতেন?”
প্রসপেরো বললেন, “করতেন বই-কি, আরও অনেকেই করতেন। কিন্তু সে সব কথা আজও কিভাবে মনে আছে তোর? আচ্ছা, এখানে আসার কথা কি কিছু মনে পড়ে?”
মিরান্দা বললে, “না বাবা, আর কিছুই মনে পড়ে না আমার।”
“বারো বছর আগের কথা,” প্রসপেরো বলতে থাকেন, “আমি তখন মিলানের ডিউক। আর তুই ছিলি রাজকন্যা – আমার একমাত্র উত্তরাধিকারিণী। অ্যান্টোনিও নামে এক ভাইও ছিল আমার। পৃথিবীতে সে-ই ছিল আমার সবচেয়ে আস্থাভাজন লোক। লেখাপড়ার প্রতি আমার আগ্রহ ছিল চিরকালের। অবসরযাপনই ছিল আমার সবচেয়ে প্রিয় কাজ। সেই জন্য রাজসভার যাবতীয় দায়দায়িত্ব তারই হাতে তুলে দিয়ে আমি সারাক্ষণ ডুবে থাকতুম বইয়ের জগতে। জীবন উৎসর্গ করেছিলুম হৃদয়কে মহত্তর করে তোলার কাজে। উপেক্ষা করেছিলুম যাবতীয় কর্তব্যকর্ম। এদিকে আমার বকলমা পেয়ে আমার ভাই নিজেকেই ডিউক ভাবতে শুরু করল। প্রজাদের মধ্যে নিজেকে জনপ্রিয় করে তোলার একটা সুযোগ আমি তাকে দিয়েছিলাম। আর সেটাকেই হাতিয়ার করে সে লিপ্ত হল আমাকেই রাজ্যচ্যূত করার ষড়যন্ত্রে। মিথ্যাই সে আমার ভাই। ষড়যন্ত্র সফল করল সে কিনা আমারই চিরশত্রু নেপলস-রাজের সঙ্গে হাত মিলিয়ে!”
মিরান্দা জিজ্ঞাসা করলে, “কিন্তু বাবা, তাঁরা সেই মুহুর্তেই আমাদের ধ্বংস করলেন না কেন?”
প্রসপেরো উত্তর দিলেন, “আসলে মা, সে সাহস তাদের ছিল না। প্রজারা আমাকে মনেপ্রাণে ভালবাসত। অ্যান্টোনিও আমাকে জোর করে একটা জাহাজে তোলে। তারপরে কূল থেকে কয়েক যোজন দূরে মাঝসমুদ্রে একটা ছোটো ডিঙিতে আমাদের নামিয়ে দিয়ে জাহাজ নিয়ে চলে যায়। সেই ডিঙিতে না ছিল হাল, না ছিল কোনো পাল। ভেবেছিল, আমাদের ওভাবে ফেলে গেলেই বুঝি আমরা মারা পড়ব। কিন্তু গঞ্জালো নামে আমার এক অনুগত অমাত্য গোপনে সেই ডিঙিতে জল, খাবার, পোষাক আর আমার কিছু বই রেখে দিয়েছিল। এই বইগুলি আমার কাছে ছিল আমার রাজ্যের চেয়েও মূল্যবান।”
মিরান্দা বললে, “ওহ্ বাবা, তবে আমার জন্য তোমাকে কত না কষ্ট সইতে হয়েছিল।”
প্রসপেরো বললেন, “না সোনা, তুইই তো ছিলি আমার সেই ছোট্ট মানিক, যার মুখ চেয়ে বেঁচে থাকার একটা কারণ খুঁজে পেয়েছিলাম আমি। তোর মুখের নিষ্পাপ হাসি আমাকে সব প্রতিকূলতা জয় করার সাহস জোগাত। দ্বীপে এসে নামার সঙ্গে সঙ্গে আমাদের রসদ ফুরালো। সেই থেকে আমার কাজ হল তোকে লেখাপড়া শেখানো। আর আমার শিক্ষকতায় আজ তুই রীতিমতো বিদূষী এক রাজকন্যা।”
মিরান্দা বললে, “ঈশ্বর তোমার ভাল করুন, বাবা। এখন বলো তো, এই ঝড় তুমি কেন তুললে?”
প্রসপেরো বললেন, “শোন্ তবে, আমি ঠিক করেছি, আমার দুই পুরনো শত্রু, নেপলসের রাজা আর আমার সেই নিষ্ঠুর ভাইকে এই ঝড় তুলে এই দ্বীপে এনে ফেলব।”
এই বলে মেয়েকে তাঁর জাদুছড়িটি দিয়ে আলতো করে স্পর্শ করতেই ঘুমিয়ে পড়ল সে। অশরীরী এরিয়েল হাজির হল প্রভুকে ঝড়ের বিবরণ দিতে। কেমন করে জাহাজের যাত্রীদের জাহাজ থেকে বিচ্ছিন্ন করেছে সে, তার ফিরিস্তি শোনাতে। মিরান্দা এইসব অশরীরীদের দেখতে পেত না। তাই প্রসপেরোও চাইতেন না, তাঁকে এদের সঙ্গে কথা বলতে দেখে তাঁর মেয়ে ভাবুক, বাবা নিজের সঙ্গেই কথা বলছেন। সেই জন্য, এরিয়েল উপস্থিত হওয়া মাত্র, তিনি ঘুম পাড়িয়ে দিলেন মেয়েকে।
প্রসপেরো এরিয়েলকে জিজ্ঞাসা করলেন, “কি সংবাদ, আমার সাহসী বেতাল? তোমার কাজ শেষ করেছো?”
এরিয়েল তখন ঝড়ের এক চমৎকার বর্ণনা দিলে – কেমন করে জাহাজের নাবিকেরা ভয়ে কুঁকড়ে গেল; যুবরাজ ফার্দিনান্দ জলে পড়ে গেলেন; বাপের চোখের সামনে তাঁকে গ্রাস করে নিল সমুদ্রের বিশাল ঢেউ – সে সব কথা বেশ গুছিয়ে বললে সে।
তারপর এরিয়েল বললে, “সে অবশ্য এখন নিরাপদ। দ্বীপের এক কোণে দুই বাহুর উপর হাত রেখে বসে আছে। ভাবছে বাপটা বুঝি ডুবেই মোলো। তার নিজের কিন্তু একগাছি চুলেরও ক্ষতি হয়নি। এমনকি তার রাজপোষাকখানা জিভে জবজবে হয়ে গেলেও আগের চেয়ে অনেক বেশি ঝলমল করছে এখন।”
প্রসপেরো বললেন, “শাবাস এরিয়েল। এখানে নিয়ে আয় তাকে। আমার মেয়ে যেন সেই তরুণ যুবরাজকে দেখতে পায়। আচ্ছা, ওই রাজা আর আমার ভাই – তারা সব কোথায়?”
এরিয়েল বললে, “তারা সব ফার্দিনান্দকে খুঁজছে। পাবার আশা অবশ্য খুব একটা করছে না। আসলে কিন্তু জাহাজের একজন যাত্রীও হারিয়ে যাননি। কিন্তু সকলেই ভাবছে, সে-ই বুঝি একা এ যাত্রায় বেঁচে গেল। আর জাহাজখানা আমি অদৃশ্য করে নিরাপদে জাহাজঘাটায় লুকিয়ে রেখেছি।”
প্রসপেরো বললেন, “খুব ভাল কাজ করেছিস তুই, এরিয়েল। কিন্তু এখনও যে অনেক কাজ বাকি।”
এরিয়েল বললে, “আরও কাজ বাকি? আপনি যে বলেছিলেন আমাকে চিরতরে মুক্তি দেবেন। প্রভু, আপনাকে সে কথা একবার স্মরণ করিয়ে দিতে চাই। দোহাই আপনার, একবার ভেবে দেখুন, কত ভালভাবে সেবা করেছি আপনার, একটাও মিছে কথা কইনি, একটাও ভুল করিনি, কখনও কোনও কাজে না করিনি।”
প্রসপেরো বললেন, “কেন? ভুলে গেলি কোন যন্ত্রণা থেকে তোকে মুক্তি দিয়েছিলাম আমি? মনে পড়ে, সেই ভয়ঙ্করী ডাইনি সাইকোরাক্সের কথা? মনে আছে তোর, কোথায় তার জন্ম?”
এরিয়েল বলে, “আলজিয়ার্সে, প্রভু।”
প্রসপেরো বললেন, “ঠিক। আলজিয়ার্সে। মনে আছে, তোকে কোন অবস্থায় পেয়েছিলাম আমি। নাকি ভুলে গিয়েছিস! ওই অলক্ষুনে ডাইনিকে ওরা দেশ থেকে তাড়িয়ে দিলে। নাবিকেরা তাকে ফেলে গেল এই দ্বীপে। আর তুই, ভালমানুষ ভূত, তার আদেশ অমান্য করলি বলে সে তোকে গাছের কোটরে বন্দী করে রাখল। আমি যখন তোকে খুঁজে পাই, তখন আতঙ্কে চিৎকার করছিস তুই – মনে পড়ে তোর, মনে পড়ে সেই যন্ত্রণার কথা, যার থেকে তোকে মুক্তি দিয়েছিলাম সেদিন।”
নিজের অকৃতজ্ঞতায় লজ্জা পেয়ে এরিয়েল বললে, “মাপ করুন, প্রভু। আমি আপনার আজ্ঞাই পালন করব।”
প্রসপেরো বললেন, “তাই কর। মুক্তি আমি তোকে ঠিকই দেবো।” এই বলে পরের কাজগুলি এরিয়েলকে ভাল করে শিখিয়ে পড়িয়ে দিলেন তিনি। এরিয়েল প্রথমে গেল ফার্দিনান্দের কাছে। দেখল যুবরাজ সেই একই ভাবে বসে আছেন।
সে বলল, “কুমার বাহাদুর, এবার আপনাকে নিয়ে যাব মিরান্দা ঠাকরুণের কাছে। আপনার সুকুমার রূপ যাতে তাঁর চোখে পড়ে, করব সেই ব্যবস্থা। আসুন মহাশয়, আমাকে অনুসরণ করুন।” এই বলে সে একটি গান ধরল। গানটির মর্মার্থ: আপনার পিতা এখন অতল জলে নিমগ্ন, তাঁর অস্থিতে আজ প্রবালকীটের বাসা, চোখদুটি হয়ে গেছে মুক্তা। আর তাঁর কিছুই ক্ষয় হবার নেই। বরং সাগর এবার তাঁকে বদলে অদ্ভুতুড়ে কোনো পদার্থে পরিণত করবে। সাগরবালিকারা প্রহরশেষে ঘণ্টা বাজাবে। ওই শোনো, আমি শুনতে পাচ্ছি সে তান – ঢং ঢং ঢং।
হারিয়ে যাওয়া বাপের এই অদ্ভুত সংবাদে তাঁর অর্থহীন বিহ্বলতা কাটিয়ে উঠলেন। মন্ত্রমুগ্ধের মতো অনুসরণ করলেন এরিয়েলের কণ্ঠস্বর। সেই স্বর তাঁকে পৌঁছিয়ে দিল প্রসপেরো ও মিরান্দার কাছে। একটি বিরাট গাছের ছায়ায় বসেছিলেন তাঁরা। মিরান্দা জীবনে তার বাপ ছাড়া অন্য কোনো পুরুষকে দেখেনি।
প্রসপেরো তাকে জিজ্ঞাসা করেন, “মিরান্দা, কী দেখছিস মা ওদিকে?”
বিস্মিত মিরান্দা বললে, “বাবা, ও নিশ্চয়ই কোনও অশরীরী, তাই নয়? দ্যাখো দ্যাখো, কী সুন্দর দেখতে ওকে। সত্যি করে বলো বাবা, ও কি কোনও অশরীরী, নাকি আমাদেরই মতো মানুষ।”
প্রসপেরো বললেন, “না মা, ও কোনও অশরীরী নয়। আমাদের মতো খিদে, তেষ্টা, ঘুম – সবই ওর আছে। ওর অনুভূতিগুলিও আমাদেরই মতো। কেবল বিষণ্ণ বলে তোর ওকে একটু অন্যরকম লাগছে। নইলে ওকে তুই বলতিস, সুপুরুষ ব্যক্তি। আসলে নিজের হারিয়ে যাওয়া সঙ্গীসাথীদের খুঁজে বেড়াচ্ছে ও।”
মিরান্দা ভাবত সব পুরুষমানুষেরই বুঝি তার বাবার মতো গম্ভীর মুখ আর সাদা দাড়ি থাকে। তাই ওই রূপবান যুবকটিকে দেখে সে ভারি খুশি হল। ফার্দিনান্দও এই পরিত্যক্ত দ্বীপে এমন সুন্দরীর দেখা পেয়ে এবং আশ্চর্য সব শব্দ শুনে বিস্ময়ে অভিভূত হয়ে পড়েছিলেন। তিনি ভাবলেন যে নির্ঘাৎ কোনো মায়াবী দ্বীপে এসে উপস্থিত হয়েছেন তিনি আর এ দ্বীপের অধিষ্ঠাত্রী দেবী হলেন এই মিরান্দা। সেভাবেই তাকে সম্বোধন করলেন তিনি।
দুরু দুরু বুক নিয়ে মিরান্দা জানালে যে সে কোনও দেবী নয় – বরং সাধারণ এক মেয়ে। আপন পরিচয় সে যুবককে জানাতে যাচ্ছিল, কিন্তু এমন সময় প্রসপেরো এসে বাধা দিলেন তাঁদের কথাবার্তায়। তাঁরা একে অপরকে বেশ পছন্দ করছিলেন দেখে প্রসপেরোও খুশি হচ্ছিলেন। তিনি বেশ বুঝতে পারছিলেন যে, আমরা যাকে প্রথম দর্শনে প্রেম বলে থাকি, এ ক্ষেত্রে ঠিক তাই-ই ঘটেছে। তবু ফার্দিনান্দকে একটু বাজিয়ে দেখার জন্য তাদের প্রেমের পথে কিছু বাধা সৃষ্টি করতে চাইলেন তিনি। যুবরাজকে সম্বোধন করে কড়া ভাষায় অভিযোগ করলেন যে সে এক গুপ্তচর। প্রসপেরোর দ্বীপ প্রসপেরোর অধিকার থেকে কেড়ে নিতেই তার এখানে আগমন। “আমাকে অনুসরণ করো,” বললেন প্রসপেরো, “তোমার পা আর গর্দান একত্রে শৃঙ্খলিত করব আমি। তুমি পান করবে সমুদ্রের জল; কাঁকড়া-শামুক, উপড়ানো শিকড় আর ওক বীজের ভূষি হবে তোমার খাদ্য।” “না,” ফার্দিনান্দ বললেন, “যতক্ষণ না আমার অপেক্ষা অধিক শক্তিশালী কোনও শত্রুর হাতে পরাস্ত হই, ততক্ষণ পর্যন্ত আমি বাধা দেবো।” এই বলে তিনি তাঁর তরবারি কোষবিমুক্ত করলেন। প্রসপেরো একবার মাত্র তাঁর জাদুছড়িটি চালনা করে মুহুর্তে ফার্দিনান্দকে একেবারে নিশ্চল করে দিলেন।
মিরান্দা তার বাবাকে ধরে পড়লে; বললে, “কেন নিষ্ঠুর হও, বাবা? দয়া করো! আমি ওর জামিন হতে প্রস্তুত। দ্যাখো, আমার দেখা দ্বিতীয় পুরুষ ইনি আর আমার বিশ্বাস ইনি সত্যিই একজন ভাল মানুষ।”
“চুপ্ কর!” গর্জে উঠলেন প্রসপেরো, “আর একটি শব্দ করলে আমার কাছে বকুনি খাবি তুই, মেয়ে! এত স্পর্ধা তোর! একজন প্রতারকের হয়ে ওকালতি করছিস্! শুধু আমাকে আর ক্যালিবানকে দেখেই তোর মনে হল পৃথিবীতে ভাল মানুষ আর একটাও মেলে না। জেনে রাখ, ওরে বোকা মেয়ে, এই লোকটা ক্যালিবানের চেয়ে কিছু ভাল হতে পারে, কিন্তু পৃথিবীতে এর চেয়েও ঢের ভাল পুরুষ তুই খুঁজে পাবি।” কথাগুলি মেয়েকে তিনি বললেন তাকে বাজিয়ে দেখার জন্য। মেয়ে উত্তর দিলে, “আমার ভালবাসার কোনও উচ্চাকাঙ্ক্ষা নেই, বাবা। আর নেই বলেই, এঁর চেয়েও ভাল কাউকে দেখার প্রবৃত্তিও আমার নেই।”
“সঙ্গে এসো, যুবক,” যুবরাজকে আদেশ করলেন প্রসপেরো, “আমাকে অমান্য করার শক্তি আর তোমার নেই।”
“তা নেই বটে,” আশ্চর্য হয়ে বললেন ফার্দিনান্দ। তিনি বুঝতে পারেননি যে প্রসপেরোর জাদুবলেই তিনি তাঁর বাধাদানের সব ক্ষমতা হারিয়ে ফেলেছেন। অন্য কোনও উপায় না দেখে পিছু পিছু তিনি চললেন গুহার দিকে। কিন্তু চলতে চলতে পিছন ফিরে যতক্ষণ মিরান্দাকে দেখা যায়, ততক্ষণ বলে চললেন, “আমার সর্বশক্তি আবদ্ধ। আমি যেন স্বপ্নের ঘোরের মধ্যে রয়েছি। কিন্তু এই ব্যক্তির ভীতিপ্রদর্শন বা আমার সব দুর্বলতা, যা আমি এখন অনুভব করছি, তা সবই লাঘব হয়ে যেতে পারে, যদি বন্দীদশায় প্রত্যহ একবার এই অপরূপার দর্শন পাই আমি।”
প্রসপেরো ফার্দিনান্দকে বেশিক্ষণ গুহায় আটকে রাখলেন না। বরং বাইরে এনে অত্যন্ত ভারী কিছু কাজের দায়িত্ব তাঁর উপর চাপিয়ে দিলেন। খেয়াল রাখলেন যেন তাঁর কন্যা জানতে পারে ঠিক কিরকম পরিশ্রমের কাজ তিনি ফার্দিনান্দকে দিয়ে করাচ্ছেন। তারপরে পড়ার ঘরে চলে যাওয়ার ভান করে গোপনে নজর রাখতে লাগলেন যুবরাজ ও মিরান্দার গতিবিধির উপর।
প্রসপেরো একগাদা ভারী গাছের গুঁড়ি স্তুপীকৃত করার হুকুম দিয়েছিলেন ফার্দিনান্দকে। রাজপুত্রেরা কায়িক শ্রমের কাজে খুব একটা অভ্যস্ত হতেন না। তাই অল্পক্ষণ বাদেই মিরান্দা দেখতে পেল, ভয়ানক পরিশ্রমে প্রাণ যায় যায় অবস্থা ফার্দিনান্দের। “এত পরিশ্রম করবেন না,” সে বললে, “বাবা এখন পাঠাগারে। অর্থাৎ, ঘণ্টা তিনেকের জন্য সেখান থেকে তাঁর বের হবার সম্ভাবনা নেই। দোহাই আপনার, এই সুযোগে একটু বিশ্রাম নিয়ে নিন।”
“সাহস হয় না, সুচরিতে,” বললেন ফার্দিনান্দ, “বিশ্রাম নেওয়ার আগে আমার কাজ আমাকে শেষ করতেই হবে।”
“তবে আপনি একটু বসুন,” মিরান্দা বললে, “আমি কিছুক্ষণ না হয় আপনার হয়ে কাঠ বয়ে দিই।” কিন্তু ফার্দিনান্দ কিছুতেই সে প্রস্তাবে রাজি হলেন না। সাহায্যের বদলে মিরান্দা হয়ে দাঁড়াল তাঁর কাজের দীর্ঘসূত্রিতার কারণ। অনেকক্ষণ ধরে চলতে লাগল তাঁদের প্রেমালাপ। ফলে কাঠ-বহনের কাজটির গতি হল মন্দ।
মেয়ে ভেবেছিল বাবা পাঠাগারে। আসলে প্রসপেরো আদৌ সেখানে ছিলেন না। ফার্দিনান্দের ভালবাসার কিঞ্চিত পরীক্ষা নেওয়ার মানসেই তিনি তাঁকে এই পরিশ্রমে নিযুক্ত করেন। আর নিজে অদৃশ্য হয়ে পাশে দাঁড়িয়ে থেকে তাঁদের বাক্যালাপ শুনতে থাকেন।
ফার্দিনান্দ মিরান্দাকে তার নাম জিজ্ঞাসা করলে। প্রসপেরো মিরান্দাকে তার নাম আগন্তুককে জানাতে বারণ করেছিলেন। কিন্তু বারণ ভুলেই ফার্দিনান্দকে নিজের নাম বলে ফেলল সে।
কন্যার এই প্রথম অবাধ্যতায় প্রসপেরো একটু হাসলেন মাত্র। তাঁর জাদুবলেই মিরান্দা এত শীঘ্র প্রেমে পড়েছে। তাই কন্যা যখন তাঁর আজ্ঞালঙ্ঘন করে প্রেমের সাক্ষর রেখে গেল তখন তিনি রাগ করলেন না। ফার্দিনান্দ একটি দীর্ঘ ভাষণ দিয়ে বললেন যে তাঁর দেখা পৃথিবীর সকল নারীর উর্ধ্বে তিনি মিরান্দার প্রতি তাঁর প্রেমকে স্থান দিলেন। তা শুনে পরম সন্তোষ লাভ করলেন প্রসপেরোও।
তারপর ফার্দিনান্দ পৃথিবীর সকল নারীর সৌন্দর্যের উর্ধ্বে মিরান্দার সৌন্দর্যকে স্থাপনা করলে মিরান্দা প্রত্যুত্তরে জানালে, “হে প্রিয়, অপর কোনও স্ত্রীলোকের মুখ আমার মনেই পড়ে না। আমার পিতা ও আপনাকে ছাড়া আর কোনও পুরুষমানুষকেও কোনও দিন চাক্ষুস করিনি আমি। দূর পৃথিবীর কথাও আমার কিছুই জানা নেই। কিন্তু বিশ্বাস করুন, আপনাকে ছাড়া আর কাউকে সঙ্গী নির্বাচন করার বিন্দুমাত্র ইচ্ছা আমার মনে নেই। আপনার রূপধ্যান ভিন্ন অপর কোনও কল্পনা আর আমার প্রিয় হতে পারছে না। এই রে, আমি বোধহয় একটু বেশিই স্বাধীনতা নিয়ে ফেলেছি। আমার বাবার বারণ সব ভুলেই আপনার সঙ্গে আলাপ করে চলেছি।”
শুনে প্রসপেরো হেসে মাথা নাড়লেন। যেন বলতে চাইলেন, “ঠিক যেমনটি চেয়েছিলাম, তেমনটিই হচ্ছে। আমার মেয়ে নেপলস্-এর রাজমহিষী হতে চলেছে।”
তারপর ফার্দিনান্দ আরেকটি রাজসভাসুলভ অলংকারমণ্ডিত দীর্ঘভাষণের মাধ্যমে মিরান্দাকে জানালেন যে তিনি নেপলস্-রাজসিংহাসনের উত্তরাধিকারী। তাঁকে বিবাহ করলে অপাপবিদ্ধা এই মিরান্দা হবেন তাঁর রাজমহিষী।
মিরান্দা বললে, “হা ভগবান, কী বোকাই না আমি! যে জন্য আমার আনন্দিত হওয়ার কথা, তারই জন্য কাঁদছি। বন্ধু, খুব সরলভাবে আপনার কথার উত্তর দিই, আপনি আমাকে বিবাহ করলে আমি আপনার স্ত্রীই হব।”
প্রত্যুত্তরে ফার্দিনান্দ তাকে ধন্যবাদ জানাতে যাবেন এমন সময় বাধা পড়ল – প্রসপেরো আবির্ভূত হলেন তাঁদের সম্মুখে।
তিনি বললেন, “ভয় নেই মা, আমি সবই শুনেছি। যা বললে তুমি, তাতে আমার আপত্তি নেই। ফার্দিনান্দ, তোমাকে যদি খুব বেশি কষ্ট দিয়ে থাকি, তবে ক্ষতিপূরণে অনেক অনেক বেশি দামি আমার এই কন্যাটিকে দান করলাম তোমায়। তোমাকে এতখানি পীড়া দেওয়ার কারণ আর কিছুই নয়, তোমার ভালবাসাকে একটু পরখ করে দেখা। এই পরীক্ষায় তুমি সসম্মানে উত্তীর্ণ। তাই তোমার সত্য প্রেম যাকে যথাযথভাবেই জয় করেছে, আমার সেই কন্যাকে তুমি উপহার নাও। আমি সদম্ভে বলতে পারি, আমার এই কন্যাটি সকল প্রশংসার উর্ধ্বে – এই কথাটি অবজ্ঞা কোরো না কখনও।” এরপর প্রসপেরো বললেন যে তাঁর এখন বিশেষ কিছু কাজ আছে। তাই যতক্ষণ না তিনি ফিরে আসেন ততক্ষণ ফার্দিনান্দ ও মিরান্দা বসে একটু গল্পগুজব করে। মিরান্দা অবশ্য এই আদেশের মধ্যে অমান্য করার মতো কিছু পেল না।
ফার্দিনান্দ ও মিরান্দাকে রেখে এসে প্রসপেরো ডাক দিলেন এরিয়েলকে। এরিয়েলও হাজির হল চকিতে। প্রসপেরোর ছোটো ভাই ও নেপলসস্-রাজের কী হাল সে করেছে, তা প্রভুকে জানাবার জন্য ব্যগ্র হয়ে উঠেছিল এরিয়েল। বললে, নানারকম আশ্চর্য দৃশ্য দেখিয়ে ও নানান অদ্ভুত শব্দ শুনিয়ে সে ভয়ে অচৈতন্য করে এসেছে তাঁদের। ঘুরতে ঘুরতে ক্লান্ত ও ক্ষুধার্ত হয়ে পড়ে তাঁরা; তখন এরিয়েল তাদের সামনে মেলে ধরে এক এলাহি ভোজের আয়োজন। তারপর যেই না তাঁরা সেই সব ভোজনসামগ্রীর দিকে এগিয়েছেন অমনি অতিকায় ডানাবিশিষ্ট অতিভোজী দৈত্য হার্পির[১] ছদ্মবেশে তাঁদের সম্মুখে আবির্ভূত হয় এরিয়েল। আর সঙ্গে সঙ্গে অদৃশ্য হয়ে যায় সব ভোজ্যসামগ্রী। তারপর আশ্চর্য হয়ে তাঁরা শোনেন হার্পি তাঁদের স্মরণ করিয়ে দিচ্ছে প্রসপেরোকে রাজ্য থেকে বিতারণ, তাঁকে ও তাঁর শিশুকন্যাকে অকূল সমুদ্রে মৃত্যুর মুখে ঠেলে দেওয়ার তাদের সেই নিষ্ঠুর প্রয়াসই তাঁদের আজকের এই ভয়াবহ দুরবস্থার কারণ।
নেপলস্-রাজ ও প্রসপেরোর দুষ্ট ভাই তখন প্রসপেরোর প্রতি কৃত তাঁদের অন্যায়ের জন্য অনুতাপ করতে লাগলেন। এরিয়েল তার প্রভুকে জানালে যে সে নিশ্চিত তাঁদের এই অনুতাপ আন্তরিক। এমনকি এও বললে যে একজন অশরীরী হয়েও সে তাঁদের প্রতি দয়ার্দ্রচিত্ত না হয়ে পারছে না।
প্রসপেরো বললেন, “তবে তাদের এখানে নিয়ে আয়, এরিয়েল, যদি তুই এক অশরীরী হয়ে তাদের কষ্টে বেদনা অনুভব করতে পারিস, তবে আমি তাদেরই মতো একজন হয়েও আমি কেন তা পারব না? এখনি এখানে নিয়ে আয় তাদের, যা।”
এরিয়েল তখনই ছুটল নেপলস্-রাজ, অ্যান্টোনিও ও বুড়ো গঞ্জালোর দলটিকে ধরে আনতে। এক আশ্চর্য সুর বাজিয়ে সে তাদের বাধ্য করল তাকে অনুসরণ করতে। এভাবে এরিয়েল তাঁদের নিজ প্রভুর সন্নিকটে হাজির করল। এই গঞ্জালোই সেই ব্যক্তি যিনি প্রসপেরো ডিঙিতে রসদসামগ্রী ও বই রেখে তাঁর প্রাণ রক্ষা করেছিলেন।
ভয়ে দুঃখে অভিভূত হয়ে তাঁরা প্রথমে প্রসপেরোকে চিনতেই পারলেন না। তখন প্রসপেরো দয়ালু বুড়ো গঞ্জালোকে তাঁর জীবনরক্ষক বলে উল্লেখ করে তাঁর কাছেই প্রথমে আত্মপ্রকাশ করলেন। আর তার পরেই প্রসপেরোর ভাই ও নেপলস্-রাজ চিনতে পারলেন যে ইনিই তাঁদের পূর্বকৃত অপরাধের শিকার নির্বাসিত ডিউক প্রসপেরো।
অন্তরের অনুশোচনায় আর্দ্রনয়ন অ্যান্টোনিও দাদার কাছে ক্ষমা চাইলেন। তাঁর বিরুদ্ধে কৃত ষড়যন্ত্রে নেপলস্-রাজের হাত ছিল; তাই তিনিও ক্ষমা চাইলেন নির্বাসিত ডিউকের কাছে। উদারচিত্ত প্রসপেরো ক্ষমা করলেন উভয়কেই। তাঁরা প্রসপেরোর হৃতরাজ্য প্রসপেরোর হাতেই পুনরায় প্রত্যার্পণের প্রতিশ্রুতি দিলেন। তখন প্রসপেরো নেপলস্-রাজকে বললেন, “তোমার জন্যও একটি উপহার গচ্ছিত আছে আমার কাছে।” এই বলে তিনি একটি দরজা খুলে দিলেন। সবাই দেখল যুবরাজ ফার্দিনান্দ বসে দাবা খেলছেন মিরান্দার সঙ্গে।
নেপলস্-রাজ ও ফার্দিনান্দ উভয়েই মনে করেছিলেন অপর জনের সলিলসমাধি ঘটেছে। তাই পিতাপুত্রের এই অপ্রত্যাশিত পুনর্মিলনে তাঁদের আনন্দের সীমা রইল না।
মিরান্দা বললে, “কী আশ্চর্য! কোথাকার মহৎ সৃষ্টি এরা? তবে কী এমন কোনও এক সাহসী নতুন ভুবন আছে যেখানে এমন সব ব্যক্তিরা বাস করেন।”
তরুণী মিরান্দার রূপসৌন্দর্য দেখে ছেলের মতো বাবাও আশ্চর্যান্বিত হয়ে গেলেন। “কে এই নারী?” তিনি প্রশ্ন করলেন, “মনে হচ্ছে ইনি কোনও দেবী। মনে হচ্ছে যেন ইনিই আমাদের বিচ্ছিন্ন করে এমনভাবে পুনর্মিলিত করলেন।” মিরান্দাকে প্রথম দেখে সে যে ভুলটি করেছিল, তার বাবাকেও সেই একই ভুল করতে দেখে কৌতুক বোধ করল ফার্দিনান্দ। “না বাবা,” সে বললে, “ও এক মানবী। দৈবের ইচ্ছায় ও আমার। বাবা, আমি মনে করেছিলাম আপনার সলিলসমাধি ঘটেছে। তাই আপনার অনুমতির অপেক্ষা না রেখেই ওকে আমার জীবনসঙ্গিনী নির্বাচিত করে ফেলেছি আমি। মিলানের বিখ্যাত ডিউক এই প্রসপেরোর কন্যা ও। প্রসপেরোর খ্যাতির কথা আমি আগে শুনেছিলাম বটে, কিন্তু কখনও চাক্ষুস করিনি তাঁকে। আজ আমি ওঁর কাছ থেকে পেলাম এক নতুন জীবন। নিজ কন্যাকে আমার হস্তে অর্পণ করে আজ তিনি আমার দ্বিতীয় পিতা।”
তখন নেপলস-রাজ মিরান্দার উদ্দেশ্যে বললেন, “তবে তো আমিও ওর পিতা। কিন্তু মা, কথাটা আশ্চর্য শোনালেও, আমিও আজ সন্তানের নিকট ক্ষমাপ্রার্থী।”
প্রসপেরো বললেন, “আর ও কথা নয়। সমাপন যখন মধুর হল, তখন ওসব পুরনো কথা না তোলাই ভাল।” একথা বলে প্রসপেরো তাঁর ভাইকে আলিঙ্গন করলেন। জানালেন, সর্বান্তকরণে তিনি মার্জনা করেছেন তাঁর ছোটো ভাইকে। সঙ্গে এও বললেন যে এক চতুর মহাশক্তিশালী দৈবই তাঁকে তাঁর হতভাগ্য রাজ্য মিলান থেকে নির্বাসিত করেছিল; আবার আজ সেই দৈবের বশেই তাঁর কন্যা হলেন নেপলস্-সিংহাসনের উত্তরাধিকারিনী। সেজন্যই এই জনবিরল দ্বীপে আবার মিলন হল তাঁদের। যুবরাজ ফার্দিনান্দ মিরান্দার প্রেমে পড়লেন।
ভাইকে সান্ত্বনা দেওয়ার উদ্দেশ্যেই প্রসপেরো এই কথাগুলি বলা। কিন্তু এই দয়ার্দ্র বাক্যে অ্যান্টোনিও লজ্জা ও অনুতাপে দগ্ধ হয়ে গেলেন। তাঁর চোখ দিয়ে বইল জলের ধারা। তিনি বাক্‌রহিত হলেন। দুই ভাইয়ের পুনর্মিলনে আনন্দাশ্রু বইল গঞ্জালোর চোখেও। প্রণয়ীযুগলের জন্য তিনি কামনা করলেন আশিষ।
প্রসপেরো জানালেন যে তাঁদের জাহাজ জাহাজঘাটে সুরক্ষিত আছে। নাবিকরাও সব জাহাজেই আছেন। পরদিন তাঁদের সঙ্গে নিয়ে সেই জাহাজেই তিনি সকন্যা রওয়ানা হবেন গৃহাভিমুখে। “ততক্ষণ,” বললেন প্রসপেরো, “আমার এই ক্ষুদ্র গুহায় আশ্রয় নিয়ে বিশ্রাম করো তোমরা। আজকের সান্ধ্য বিনোদন হিসেবে তোমাদের শোনাতে চাই এই পাণ্ডববর্জিত দ্বীপে আসার পর থেকে ঘটে যাওয়া আমার জীবনের সকল কাহিনি।” এরপর প্রসপেরো ক্যালিবানকে ভোজন প্রস্তুত করার আদেশ করলেন। বললেন, গুহাটি গুছিয়ে-গাছিয়ে রাখতে। সকলেই অবাক হলেন, যখন তাঁরা শুনলেন এই কিম্ভুত বুনো দৈত্যটা নির্বাসনকালে প্রসপেরোর একমাত্র আজ্ঞাবহ ছিল।
দ্বীপ ছেড়ে যাওয়ার আগে প্রসপেরো এরিয়েলকে অব্যাহতি দিয়ে গেলেন তার কাজ থেকে। এরিয়েল ছিল প্রভুর বিশ্বস্ত ভৃত্য। তবু নিজের মুক্তির জন্য সে ছিল উন্মুখ। বনের পাখি যেমন সবুজ গাছের তলায় সুস্বাদু ফল আর সুগন্ধী ফুলের মাঝে বাধাহীন হয়ে ঘুরে বেড়ায়, ঠিক তেমনই ঘুরে বেড়াতে চাইত সে। তাই মুক্তি পেয়ে সে ভারী খুশি হল। “আমার সুদক্ষ এরিয়েল,” ছোট্ট অশরীরীটিকে মুক্তি দেওয়ার সময় বললেন প্রসপেরো, “তোর অভাব প্রতি পদে অনুভব করব আমি; যা, তুই এখন থেকে মুক্ত।” “ধন্যবাদ, প্রভু আমার,” বললে এরিয়েল, “কিন্তু বিদায় জানাবার আগে আপনার এই বিশ্বস্ত এরিয়েলকে তার শেষ কাজটি করতে দিন – আপনার জাহাজ নির্বিঘ্নের দেশে পৌঁছিয়ে দিতে দিন। তারপর মুক্তি নিয়ে আনন্দে বিহার করব আমি।” এই বলে সে একটি গান গাইল, তার মর্মার্থ এইঃ অলি যেথায় মধুপান করে, সেখানে আমিও পান করি; আমি ঘাসফুলের গলায় দুলি; পেঁচাদের গান গাইবার কালে গুটিয়ে শুয়ে থাকি আমি; আর বাদুড়ের পিঠে চেপে উড়ে বেড়াই। চৈত্র শেষের সুখে আমি রই মহাসুখে; যে ফুলটি ফোটে বৃক্ষতলে, আমি রই তারই তলে॥
তারপর প্রসপেরো মাটির গভীরে পুঁতে তাঁর জাদুগ্রন্থাবলি ও জাদুছড়িখানি। তিনি মনস্থ করেছিলেন আর কোনও দিন জাদুবিদ্যার প্রয়োগ ঘটাবেন না। এভাবে শত্রুদের জয় করে; ভাই ও নেপলস-রাজের সঙ্গে পুনর্মিলিত হয়ে তাঁর আনন্দের সীমা রইল না। বাকি রইল শুধু স্বদেশে প্রত্যাবর্তন করে স্বহস্তে শাসনভার পুনর্বার তুলে নেওয়া। এবং তাঁর কন্যার সঙ্গে যুবরাজ ফার্দিনান্দের বিবাহ দেওয়া। রাজা বলেছিলেন, নেপলস-এ ফিরেই সেই উৎসব তাঁরা মহাসমারোহে পালন করতে চলেছেন। অশরীরী এরিয়েলের নিরাপদ তত্ত্বাবধানে এক মনোরম সমুদ্রযাত্রার পর খুব শীঘ্রই সেখানে উপস্থিত হতে চলেছেন তাঁরা।

————-
১. হার্পিঃ পৌরাণিক দানবী। এর দেহের অর্ধেক নারী, অর্ধেক পাখির মতো। অন্য অর্থে হার্পি বলতে অতিলোভী ব্যক্তিকে বোঝায়। [অনুবাদক]

দ্য টেমিং অফ দ্য শ্রু

ব্যাপটিস্টা মিনোলা একজন ধনী লোক। ইতালির অন্তর্গত পাদুয়া শহরের অধিবাসী তিনি। তার কোনও পুত্র-সন্তান নেই, শুধু দুটি মেয়ে। একজনের নাম ক্যাথারিনা, অপরজন বিয়াংকা।

মেয়ে দুটি দেখতে পরমাসুন্দরী হলেও এখনও পর্যন্ত তাদের বিয়ে হয়ে ওঠেনি, আর খুব তাড়াতাড়ি বিয়ে হবার সম্ভাবনাও নেই। বড়ো মেয়ে ক্যাথরিনার বিয়ে হবার পথে অন্তরায় তার অতিরিক্ত বদমেজাজ। যখন তখন সে রেগে ওঠে, অকারণে গালিগালাজ দেয়, এমনকি মারধোরও করে। শুধু ছোটোরাই নয়, বড়োদেরও রেহাই দেয় না সে। ধনী-গরিব কাউকেও সে কেয়ার করে না। এক এক সময় শুধু বাইরের লোক নয়, নিজের বাবাকেও এমন কড়া কথা বলে যে তা শুনে পা থেকে মাথা পর্যন্ত জ্বলে ওঠে। এ সব জেনে শুনে কেউ আর এগিয়ে আসে না ও মেয়েকে বিয়ে করতে। কেবল নিজেদের শহরেই নয়, শহরতলি আর আশেপাশের গ্রামের ছেলেরাও জেনে গেছে তার বদমেজাজের কথা। কাজেই বিয়ের শখ থাকলেও কেউ আর ওদের বাড়ির ধারেপাশে ঘেঁসে না।

ক্যাথারিনার ছোটো বোন বিয়াংকা ঠিক তার উলটো। সে দেখতে যেমন সুন্দর তেমনি মিষ্টি তার স্বভাব। কিন্তু তার বিয়ের পথে বাধা হয়েছে তার নিজের দিদি। তার বাবা বলেন বড়ো মেয়ের বিয়ে না দেওয়া পর্যন্ত ছোটো মেয়ের বিয়ে দেবেন না তিনি।

বিয়াংকার পাণিপ্রার্থী পাদুয়া শহরের যুবকদের মধ্যে রয়েছে হর্টেনসিও আর গ্রেমিও। তারা উভয়েই ধনী এবং বিয়াংকাকে বিয়ে করার স্বপ্ন দেখে, একে অপরকে প্রতিদ্বন্দ্বী বলে মনে করে।  ব্যাপটিস্টার অভিমত জানা সত্ত্বেও তারা উভয়ে একসাথে গিয়ে দেখা করল তার সাথে— স্বতন্ত্র ভাবে প্রস্তাব দিল বিয়াংকাকে বিয়ে করার।

তাদের কথা শুনে দাঁত খিচিয়ে বলে উঠল ব্যাপটিস্টা, আমি তো আগেই বলেছি ছোটো মেয়ের বিয়ের কথা মোটেও ভাবছি না। আগে বড়ো মেয়ের বিয়ে দেব, তারপর সে কথা ভাবিব। যদি সাহস থাকে তো তাকে বিয়ে কর, নইলে তার উপযুক্ত একটা পাত্র এনে দাও। তবেই ভাবিব ছোটো মেয়ের বিয়ের কথা। ব্যাপটিস্টা যখন এ কথা বলছিল, তখন আশে-পাশেই ঘুরঘুর করছিল ক্যাথরিনা। আর বিয়াংকা। বাবার কথা শোনার পর তাদের দুজনকে আচ্ছা করে দুকথা শুনিয়ে দিল ক্যাথারিনা। সাথে সাথে বিয়াংকাও জানিয়ে দিল এখন মোটেই বিয়ের ইচ্ছে নেই তার। বাড়িতে থেকে লেখা-পড়া আর গান-বাজনা করে সময় কাটাৰে সে। বিয়াংকার কথা শোনার পর ব্যাপটিস্টা সিদ্ধান্ত নিলেন যে তিনি ছোটো মেয়ের জন্য একজন গৃহশিক্ষক রাখবেন। তিনি গ্রেমিও আর হর্টেনসিওকে বললেন, ইচ্ছে করলে তারা একজন উপযুক্ত গৃহশিক্ষককে পাঠিয়ে দিতে পারে।

এভাবে ব্যাপটিস্টার কাছ থেকে প্রত্যাখ্যাত হবার পর তারা নিজেদের মধ্যে প্রতিদ্বন্দ্বিতা আর রেফারেযি ছেড়ে বন্ধুর মতো আলোচনায় বসল। হর্টেনসিও প্রস্তাব দিল দাজ্জাল ক্যাথরিনার জন্য একজন উপযুক্ত পোত্র খোজা হোক। প্রথমে রাজি না হলেও শেষমেশ গ্ৰেমিও রাজি হলেন এ প্রস্তাবে স্থির হল ক্যাথরিনার উপযুক্ত পোত্র খুঁজে দেবার পর আবার দুজনে প্রতিদ্বন্দ্বিতীয় নামবেন। বিয়াংকার জন্য।

পাদুয়ার নিকটবতী পিসা শহরে বাস করতেন ভিনসেনসিও নামে একজন ধনী ব্যবসায়ী। তিনি তার একমাত্র পুত্ৰ লুসেনসিওকে পাদুয়ায় পাঠিয়েছিলেন ব্যবসার দরুন পাওনা টাকাকড়ি আদায়ের ব্যাপারে। তার ভূত্য অ্যানিও ছিল লুসেনসিওর সাথে। শুধু ভৃত্য নয়, তাকে পরম হিতৈষী বন্ধুর মতো দেখতেন লুসেনসিও। ব্যাপটিস্টা যখন হোর্টনসিও আর গ্ৰেমিওর সাথে বিয়াংকার বিয়ের ব্যাপারে কথাবার্তা বলছিলেন, ঘটনাচক্ৰে লুসেনসিও সে সময় এসে পড়েন। সেখানে। রূপসি বিয়াংকাকে দেখে খুব ভালো লেগে যায়। তার। আড়াল থেকে ব্যাপটিস্টার কথা শুনে তিনি স্থির করলেন। তিনি নিজেই বিয়াংকার শিক্ষক হবেন। শিক্ষক সেজে তিনি কীভাবে বিয়ে করার চেষ্টা করবেন। সে কথা তিনি জানিয়ে দিলেন তাঁর ভৃত্য ত্ৰানিওকে। সবশেষে তাকে বললেন, তুমি আমার ছদ্মবেশে পাদুয়ার আড়তে বসে টাকাকড়ি আদায়ের ব্যবস্থােটা চালিয়ে যাও আর ব্যাপটিস্টার সাথে মাঝে মাঝে দেখা করে বিয়াংকাকে বিয়ে করার প্রস্তাবটাও দিয়ে যাবে। দেখা যাক দুদিক থেকে চেষ্টা চালিয়ে যাবার ফল কী হয়!

মনিবের একমাত্র ছেলের হিতৈষী বন্ধু হিসেবে তার কথা ফেলতে পারল না। ব্র্যানিও। দামি পোশাক পরে লুসেনসিওর ছদ্মবেশে সে গিয়ে বসল। পাদুয়ার আড়তে। এদিকে আসল লুসেনসিও তখন ক্যাম্বিও নামে এক গরিব শিক্ষক সেজে ঢুকে পড়ার চেষ্টা করল ব্যাপটিস্টার বাড়িতে। সে সাহিত্য পড়াবে বিয়াংকাকে।

 

বাড়ি ফিরে আসার পর হর্টেনসিও দেখতে পেল তার পুরোনো বন্ধু পেত্রুসিও বেজায় পেটাচ্ছে তার নিজের চাকর গ্রেমিওকে। পেক্রসিও ভেরোনার অধিবাসী। সে খুব বদমেজাজি। সামান্য কারণেই রেগে ওঠা তার স্বভাব। যাই হোক হর্টেনসিও এসে পড়ায় এ যাত্ৰা মারের হাত থেকে রক্ষা পেল গ্রেমিও। বন্ধুকে দেখতে পেয়েই তাড়াতাড়ি নিজেকে সামলে নিল পেত্রুসিও। কথা শুনে জানা গেল খুব সামান্যতে সে এমন রেগে গিয়েছিল গ্রেমিওর উপর যে সে নিজেকে আর আয়ত্তের মধ্যে রাখতে পারেনি। কথায় কথায় হর্টেনসিও জানতে পারল যে অল্প কিছুদিন আগে পেত্রুসিওর বাবার মৃত্যু হয়েছে। উত্তরাধিকার সূত্রে সে আজ বড়োলোক বাবার রেখে যাওয়া ধনসম্পত্তি, বিরাট বাড়ি, ফলের বাগান, খেতি-খামার, গাড়ি-ঘোড়া আর দাস-দাসীর মালিক। এক কথায় সে আজ ভেনিসের সেরা ধনীদের একজন। এসব সত্ত্বেও আজ পর্যন্ত বিয়ে করেনি সে। এখন বাপের টাকা খরচ করে সে দেশভ্রমণে বেরিয়েছে। ইচ্ছে আছে। এই সুযোগে মনের মতো পাত্রী পেলে বিয়েটাও সে সেরে ফেলবে দেশভ্রমণের ফাঁকে। প্রথম সুযোগেই পাদুয়ায় পুরনো বন্ধু হর্টেনসিওর বাড়িতে এসেছে পেত্রুসিও।

হাসতে হাসতে মন্তব্য করল হর্টেনসিও, যাক, তাহলে এতদিনে তোমার বিয়ে করার সুমতি

হয়েছে। কিন্তু ভাই, যে সে মেয়ে হলে তো তোমার চলবে না।

অবাক হয়ে বলল পেত্রুসিও, কী বলছি তুমি? যে সে মেয়ে হলে চলবে না। তার অর্থ কী!

ঠিকই বলেছি আমি, হাসতে হাসতে মন্তব্য করল হর্টেনসিও, তুমি নিজে যেমন বদরাগী তেমনি তোমার প্রয়োজন একটা দজল ঝগড়াটে বউ —— অবশ্য বড়োলোক বাপের আদুরে মেয়ে হলেই ভালো হয়।

হর্টেনসিওর কথা শুনে পেত্রুসিও বলল, কী বললে, বড়োলোক বাপের আদূরে মেয়ে! তুমি নিশ্চয়ই ঠাট্টা করছি বন্ধু। তবে সত্যি সত্যি যদি তেমন ঝগড়াটে দাজ্জাল মেয়ে হাতের কাছে পেয়ে যাই, তাহলে তাকে বিয়ে করতে রাজি আছি আমি। আসলে টাকার উপর প্রচণ্ড লেভ পেক্রসিওর। অগাধ সম্পত্তির মালিক হয়েও সে সন্তুষ্ট নয়, তার চাই আরও টাকা।

অধীর আগ্রহের সাথে জানতে চাইল হর্টেনসিও, তুমি ঠিক বলছি তো পেত্রুসিও? দেখ! বড়োলোকের মেয়ে দেখতে সুন্দর, তবে স্বভাবে দজাল, এক নম্বর ঝগড়াটে–এরূপ মেয়ে হলে তুমি সত্যিই তাকে বিয়ে করবে?

কেন করব না? বলল পেত্রুসিও, ওরকম মেয়ে পেলে আমি এককথায় রাজি। মনে হচ্ছে তোমার হাতে আমন মেয়ে আছে। তা ভাই! বড়োলোক বাপ জামাইকে ভালোমতো দেবে-থোবে তো?

নিশ্চয়ই দেবে বলেই ব্যাপটিস্টার বড়ো মেয়ে ক্যাথরিনার কথা বন্ধুকে খুলে বলল হর্টেনসিও। তার কথা শুনে পেত্রুসিও বলল, বেশ! আমি রাজি আছি। ঐ দজাল মেয়েকে বিয়ে করতে। চলো, এখনই গিয়ে ওর বাবার সাথে কথা-বার্তা বলে সবকিছু পাকা করে আসি। তবে আমাকে ভালো যৌতুক দিতে হবে। ভালোমতো যৌতুক পেলে কীভাবে ওই দজল মেয়েকে চিট করতে হয় তা দেখিয়ে দেব ওর বাবাকে, অবশ্য তোমরাও দেখতে পাবে।

ক্যাথারিনাকে বিয়ে করতে পেত্রুসিও রাজি হওয়ায় এবার কায়দা করে নিজের কথাটা বলল হর্টেনসিও। সে মিন মিন করে বলল, বেশ ভাই, তাহলে আমার একটা উপকার কর তুমি। তুমি তো জানি ক্যাথরিনার ছোটো বোন বিয়াংকাকে আমি বিয়ে করতে চাই। কিন্তু এ ব্যাপারে। আমার প্রতিদ্বন্দ্বী হয়ে দাঁড়িয়েছে আর এক বন্ধু গ্রেমিও। তাই এখন বলা যাচ্ছে না শেষমেশ কার ভাগ্যে শিকে ছিড়বে। তবে একটা মতলব ভেবেছি আমি। যদি কোনওভাবে ঐ বুড়োর অন্দরমহলে ঢুকে মাঝে মাঝে বিয়াংকার সাথে কথা বলার সুযোগ পাই, তাহলে নিশ্চয়ই তার মন আমার দিকে কুঁকবে। তাহলে তাঁকে বিয়ে করাটাও আমার পক্ষে সহজ হবে। অবশ্য এ ব্যাপারে বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে বিয়াংকার বাবা ব্যাপটিস্টামিনোেলা। বুড়ো আমায় হাড়ে হাড়ে চেনে। ও আমায় কিছুতেই ঢুকতে দেবে না। অন্দরমহলে। তাই ভেবেছি শিক্ষকের বেশে এবার ঢুকে পড়ব ওর অন্দরমহলে। তুমি তো ক্যাথারিনার বিয়ের প্রস্তাব নিয়ে যােচ্ছ বুড়োটার কাছে। কথাবাতাঁর সুযোগে তুমি যদি গৃহশিক্ষক হিসাবে আমার কথা বল, তাহলে মনে হয় সে রাজি না হয়ে পারবে না।

পেত্রুসিও রাজি হয়ে গেল হর্টেনসিওর প্রস্তাবে। এবার দুজনে খাওয়া-দাওয়া সেরে সেজেগুজে রওনা দিল ব্যাপটিস্টার বাড়ি অভিমুখে।

পথে যেতে যেতে তাদের দেখা হল গ্ৰেমিও আর শিক্ষকের ছদ্মবেশধারী লুসেনসিওর সাথে। এর সামান্য কিছুক্ষণ আগে রাস্তায় লুসেনসিওর সাথে দেখা হয়েছে গ্রেমিওর। সে গ্রোমিওকে বলেছে গৃহশিক্ষকের একটা কাজ জোগাড় করে দিতে। ছদ্মবেশধারী লুসেনসিওকে তাই ব্যাপটিস্টার কাছে নিয়ে যাচ্ছে গ্ৰেমিও। যেতে যেতে ছদ্মবেশী লুসেনসিওকে তালিম দিচ্ছে গ্ৰেমিও—বিয়াংকাকে এমন প্রেমের কাব্য পড়াতে হবে যাতে সে আবেগ মধুর চোখে তার দিকে তাকায়। প্রতিদ্বন্দ্বী হর্টেনসিওকে মাঝপথে দেখে অবাক হলেও সে উচ্ছসিতভাবে জানায় যে অনেক কষ্টে সে একজন গৃহশিক্ষকের সন্ধান পেয়েছে আর অনেক অনুরোধ-উপরোধ করে সে তাকে নিয়ে যাচ্ছে ব্যাপটিস্টার কাছে।

গোঁফের ফাঁকে মুচকি হেসে বলল হর্টেনসিও, বাঃ! গ্ৰেমিও! তুমি তো বেশ কাজের ছেলে দেখছি! এরই মধ্যে গৃহশিক্ষক জোগাড় করে ফেলেছি? এরপর ইসারায় পেত্রুসিওকে দেখিয়ে বলল, একে জান তো?ইনি ভেরোনার এক বিশিষ্ট ধনী, নাম পেক্রসিও। আমার কাছে ক্যাথারিনার সব কথা শুনে ইনি স্থির করেছেন তাকে বিয়ে করবেন। তাই ক্যাথারিনার বাবার কাছে তাকে নিয়ে যাচ্ছি। সে ব্যাপারে কথাবার্তা বলার জন্য।

এবার চারজনে একসাথে রওনা দিল ব্যাপটিস্টার বাড়ির দিকে। ব্যাপটিস্টার বাড়ির কাছাকাছি আসতে আসতে লুসেনসিও দেখতে পেল তারই দামি পোশাক পরে ব্যাপটিস্টার বাড়ির দরজার কাছে এসে দাঁড়িয়ে রয়েছে তাঁর ভৃত্য ত্ৰানিও আর তার পেছনে রয়েছে অপর এক ভূত্য বায়েন্দেলো। বায়ন্দেলোর একহাতে রয়েছে কিছু বই আর অন্য হাতে বেহালা। সব কিছুই তাকে আগে থেকে জানিয়ে রাখা হয়েছিল, মইলে সে হয়তো ছদ্মবেশধারী লুসেনসিওকেই অভিবাদন জানিয়ে বসত। সে এমন আচবণ করল যাতে মনে হবে দামি পোশাক পরা ত্ৰানিওই তার আসল মনিব।

ত্ৰানিওর পোশাক-আসাক আর আচার-আচরণে হর্টেনসিও আর গ্ৰেমিও বুঝতে পারল এবার বিয়াংকার পাণিপ্রার্থী আরও একজন এসে জুটল। আলাপের শুরুতেই ত্ৰানিও জানিয়ে দিল সে পিসাের এক ধনী ব্যবসায়ীর ছেলে-নাম লুসেনসিও। বিয়াংকার রূপ-গুণের কথা শুনে সে এসেছে তার সাথে বিয়ের সম্বন্ধ করতে।

সে সময় বাড়িতেই ছিলেন ব্যাপটিস্টা। তিনি আদরের সাথে এদের নিয়ে ঘরে বসালেন।

আত্মপরিচয় দেবার পর পেত্রুসিও ব্যাপটিস্টাকে জানালেন যে তিনি তার বড়ো মেয়ে ক্যাথারিনাকে বিয়ে করতে চান এবং ভাবী পত্নীকে লেখাপড়া শেখাবার জন্য সাথে নিয়ে এসেছেন একজন নামি শিক্ষককে যিনি একাধারে গণিতজ্ঞ ও সংগীত বিশারদ, এই বলে তিনি ইশারায় দেখিয়ে দিলেন হর্টেনসিওকে।

 

পেত্রুসিওর ধনী পিতাকে ভালোভাবেই জানতেন ব্যাপটিস্টা। তার ভাবতেই অবাক লাগিছে এরূপ নামি লোকের একমাত্র ছেলে স্বেচ্ছায় বিয়ে করতে চায়। তার বদমেজাজি মেয়েকে, তিনি তৎক্ষণাৎ রাজি হয়ে গেলেন পেত্রুসিওর প্রস্তাবে। সেই সাথে মেয়েকে লেখাপড়া আর গানবাজনা শিখিয়ে ভদ্রস্থ করতে তিনি বহাল করলেন গৃহশিক্ষক লিসিয়া রূপী ছদ্মবেশধারী হর্টেনসিওকে।

এবার গ্রেমিও এগিয়ে এসে ব্যাপটিস্টাকে বলল বিয়াংকাকে কাব্য-সাহিত্য পড়বার জন্য সেও একজন অভিজ্ঞ শিক্ষককে নিয়ে এসেছে। সে ছদ্মবেশী লুসেনসিওকে দেখিয়ে বলল, এই ভদ্রলোকের নাম ক্যাম্বিও। ইনি গ্রিক-ল্যাটিনসহ অনেকগুলি ভাষায় সুপণ্ডিত। বর্তমানে রিমস বিশ্ববিদ্যালয়ে গবেষণারত। এরূপ পাণ্ডিত্যের কথা শুনে ব্যাপটিস্টা আর আপত্তি করলেন না। তাকে বিয়াংকার গৃহশিক্ষক হিসেবে রাখতে। এমনিতেই তার মন খুশিতে ভরেছিল বড়ো মেয়ে ক্যাথারিনাকে স্বেচ্ছায় বিয়ে করতে এক সুপাত্র আসায়।

নিজেকে লুসেনসিও হিসাবে পরিচয় দিয়ে এবার ত্ৰানিও এগিয়ে এসে প্রস্তাব দিল বিয়াংকাকে বিয়ে করার। সেই সাথে মেয়েদের শিক্ষার সুবিধার্থে বায়েন্দেলোর হাত থেকে বইগুলি এবং বেহালা নিয়ে ব্যাপটিস্টাকে উপহার দিল ত্ৰানিও। খুবই খুশি মনে উপহারগুলো নিলেন ব্যাপটিস্টা। এরপর ছদ্মবেশী হর্টেনসিওর হাতে বেহালাটা দিয়ে বললেন, যান, এবার অন্দরমহলে গিয়ে যত্ন করে বাজনোটা শেখান আমার বড়ো মেয়েকে। একইভাবে বইগুলো ছদ্মবেশী লুসেনসিওর হাতে দিয়ে বললেন, আপনিও ভেতরে গিয়ে এই কাব্যসাহিত্যগুলি যত্ন করে পড়ান ছোটো মেয়েকে। ত্ৰানিও যখন দেখলেন তার মতলব হাসিল হয়েছে, তিনি ব্যাপটিস্টার কাছ থেকে বিদায় নিয়ে চলে গেলেন বায়েন্দেলোকে সাথে নিয়ে। তারা চলে যাবার পর এবার নিশ্চিন্ত হয়ে পেত্রুসিওর সাথে কথাবার্তা বলতে লাগলেন ব্যাপটিস্টা।

এমন সময় বাপারে! মারে! বলে চেঁচাতে চেঁচাতে চটে বাইরে এল হর্টেনসিও। তার মাথায় অনেকটা জায়গায় কাটা। সেখান থেকে দরদরি করে রক্ত বের হচ্ছে।

তার এরূপ অবস্থা দেখে উত্তেজিত হয়ে জানতে চাইলেন ব্যাপটিস্টা, কী হল? আপনার এরূপ অবস্থা কে করল?

চেঁচিয়ে বললেন হর্টেনসিও, আপনার বড়ো মেয়ে ছাড়া এ কাজ কে আর করবে? দেখুন দিকি আমার মাথার অবস্থা!

ব্যাপটিস্টা বললেন, কী করেছে আমার বড়ো মেয়ে?

খেঁকিয়ে উঠে বললেন হর্টেনসিও, আবার জানতে চাইছেন কী করেছে। আপনার বড়ো মেয়ে? বেহালা বাজাবার সময় বারবার ভুল করছিল ক্যাথারিনা। আমি যেই হাত ধরে শিখিয়ে দিতে গিয়েছি আমনই রেগে উঠল সে। তারপর বেহালাটা হাতে নিয়ে পরপর কবার এমন মারল যে মাথা ফেটে রক্তারক্তি কাণ্ড।

তাকে বাধা দিয়ে বললেন ব্যাপটিস্টা, থাক, আর আপনাকে বলতে হবে না। আমি সব বুঝতে পেরেছি। মেয়ের এই আচরণে খুবই দুঃখ পেলেন তিনি।

মনে মনে এই ভেবে ভয় পেলেন ব্যাপটিস্টা যে এতদিনে যদিও বা পাত্র জুটল, কিন্তু এ সব কাণ্ড দেখে সে আবার ভোগে না পড়ে। তাই এই বিরক্তিকর পরিস্থিতিটা এড়িয়ে যাবার জন্য তিনি বললেন, যাক, আর দরকার নেই ক্যাথারিনাকে গান-বাজনা শিখিয়ে। আপনি বরঞ্চ আমার ছোটো মেয়েকে ওসব শেখান। আপনি ভেতরে গিয়ে আমার ছোটো মেয়ে বিয়াংকাকে বললেই ও পরম যত্নে মলম লাগিয়ে দেবে আপনার মাথার কাটা জায়গাগুলিতে। কথা শুনে তৎক্ষণাৎ ছুটে গেল অন্দরমহলে। বিয়াংকার ঘরে গিয়ে দেখল তাকে কাব্য পড়াচ্ছে লুসেনসিও আর শোনার ভান করে তার দিকে হাঁ করে চেয়ে রয়েছে বিয়াংকা।

মেয়ের আচরণের জন্য পেত্রুসিওর কাছে ক্ষমা চাইলেন ব্যাপটিস্টা-কারণ তার ভয় রয়েছে পাছে পেত্রুসিও আবার হাতছাড়া হয়ে না যান। তিনি তাকে আশ্বাস দিলেন বিয়ের পর বদমেজাজি। মেয়ে ঠান্ডা হয়ে যাবে। পেত্রুসিও বেশ উপভোগ করছিলেন ভাবী স্ত্রীর কাণ্ড-কারখানা, কিন্তু মুখ ফুটে তা প্রকাশ করলেন না ব্যাপটিস্টার কাছে। বরঞ্চ তিনি ব্যাপটিস্টাকে বললেন তিনি যেন যথা শীঘ্ৰ সম্ভব তার সাথে বদমেজাজি ক্যাথারিনার বিয়েটা সেরে ফেলেন। কিন্তু পেত্রুসিও বললে কী হয়, কিছুক্ষণ আগে দেখা তার শান্ত মেয়ের গুণপনার কথা এখনও পর্যন্ত ভুলতে পারেননি। ব্যাপটিস্টা! তাই পেত্রুসিও বারবার বলা সত্ত্বেও তার সত্বর বিয়ের ব্যাপারে কোনও আশ্বাস দিতে পারলেন না ব্যাপটিস্টা। কিন্তু পেত্রুসিও ধুরন্ধর ব্যবসায়ীর ছেলে। সে জানে কীভাবে লোককে বশে এনে তাকে চালাতে হয়। তাই ধৈর্য ধরে রইল সে। শেষমেশ তারই জয় হল। বিয়েতে ব্যাপটিস্টা নগদ কুড়ি হাজার টাকা দেবেন — এ প্রতিশ্রুতিও তার কাছ থেকে আদায় করে নিলেন। পেত্রুসিও। বিয়ের দিনক্ষণও ঠিক হয়ে গেল। কথা-বার্তা শেষ হয়ে যাবার পর ভাবী শ্বশুরের অনুমতি নিয়ে ভেতরে গিয়ে দেখা করল ক্যাথারিনার সাথে। বেহালা দিয়ে হর্টেনসিওর মাথা ফাটিয়ে দেবার পরও রাগ কমেনি ক্যাথারিনার। গানের মাস্টারের দালাল বলে সে যথেচ্ছ গালাগাল দিল পেত্রুসিওকে। চুপচাপ সে সব সয়ে গেল পেত্রুসিও। তাতে আরও রাগ বেড়ে গেল ক্যাথারিনার। সে দু-চার ঘা লাগিয়ে দিল ভাবী বরকে। হাসিমুখে সে সব সহ্য করে যাবার আগে পেত্রুসিও বলল, আজ আমি যাচ্ছি। তবে আগামী রবিবার সেজেণ্ডজে আসছি। তোমায় বিয়ে করতে। তুমি কিন্তু তৈরি থেক।

দীতে দাঁত চেপে উত্তর দিল ক্যাথারিনা, ও! তাহলে তোমার এই মতলব! ঠিক আছে, আগে তো আমায় বিয়ে কর তারপর দেখিয়ে দেব বিয়ের কী মজা। কীভাবে তোমার হাড়মাস আলাদা করতে হয় তা খুব জানা আছে আমার।

জবাবে কিছু না বলে চুপচাপ সেখান থেকে চলে এল পেত্রুসিও। সে এবার ভেনিসে বিয়ের পোশাক কিনতে যাবে আর সেখান থেকে নির্দিষ্ট সময়ে সে এসে যাবে ক্যাথারিনাকে বিয়ে করতে — এই কথাগুলি ব্যাপটিস্টাকে বলে সেদিনের মতো তার কাছ থেকে বিদায় নিল সে।

 

এদিকে অন্দরমহলে হর্টেনসিও আর লুসানসিওর মধ্যে বেজায় সংঘাতের সৃষ্টি হয়েছে বিয়াংকাকে কাব্য-সাহিত্য পড়ানো আর গান-বাজনা শেখানো নিয়ে। একদিকে মাথাভর্তি ব্যান্ডেজ নিয়ে বেহালায় তার বাঁধছে। হর্টেনসিও আর অন্যদিকে মোটা একটা কবিতার বই খুলে বিয়াংকাকে পড়াচ্ছে লুসেনসিও–

হিক ইবার্টি সিমোয়েস, হিক এস সিগিয়া টেলাস, এস্টেটিরাট প্রায়ামি, রিজিয়া সেলসা টেনিস। কিন্তু এসবের কিছুই মাথায় ঢুকছে না বিয়াংকার। সে বলল, মাস্টারমশাই! এসব কঠিন শব্দের অর্থ কী?

গলা নামিয়ে লুসেনসিও বলল, ঠিক আছে। আমি বলছি, তুমি মন দিয়ে শোন। হিক ইবার্ট সিমোয়েস অর্থাৎ আমি লুসেনসিও, হিক এস্ট-এর অর্থ পিসাের ভিনসেনসিও আমার বাবা। সিগিয়া টেলাসের মানে তোমাকে বিয়ের আশায় শিক্ষক সেজেছি আমি। হিক এস্টোটিরাট প্রায়ামি-এর অর্থ হল তোমার বাবার কাছে যে লোকটি নিজেকে লুসেনসিও বলে পরিচয় দিয়েছে সে আমারই ভৃত্য ত্ৰানিও। রিজিয়া শব্দের অর্থ আমাদের পাদুয়ার আড়তে বসে সে আমার পরিচয়ে ব্যবসা চালিয়ে যাচ্ছে। আর সবশেষে রইল সেলসা টেনিস অর্থাৎ তোমার বুড়ো বোপকে ধাপ্পা দেবার জন্যই এসব করতে হয়েছে আমাকে। মূল লাতিন কবিতার মনগড়া ব্যাখ্যা করে নিচু গলায় বিয়াংকাকে শোনাচ্ছে সে–এককথায় কাব্য-সাহিত্য পড়বার নামে সে ধাপ্পা দিয়ে চলেছে বিয়াংকাকে।

এবার হর্টেনসিওর পালা। সে বলল, বেহালার তার বাধা হয়ে গেছে আমার! আমি এবার গান শেখাব বিয়াংকাকে?

বিয়াংকা বলে উঠল, একবার শোনান তো দেখি কেমন তার বেঁধেছেন আপনি। বিয়াংকার কথা শুনেই বেহালায় টুংটাং আওয়াজ করল হর্টেনসিও। মোটেও ঠিক হয়নি তার বাঁধা, বলল বিয়াংকা, আবার নতুন করে বঁধুন। হর্টেনসিও শুরু করলেন নতুন করে তার বাঁধা।

লুসেনসিও বললেন বিয়াংকাকে, এবার বল দেখি এতক্ষণ ধরে যা শেখালাম তার অর্থ ক৩ঢ়ক বুঝেছি তুমি।

চারিদিক দেখে নিয়ে বলল বিয়াংকা, বেশ, তাহলে শুনুন। হিক ইবার্ট সিমোয়েস অর্থাৎ আমি তোমায় চিনি না। হিক এস্ট সিগিয়া টেলাস-এর অর্থ আমি তোমায় এতটুকুও বিশ্বাস করি না। হিক এস্টেটিরাট প্রায়ামি অর্থাৎ গানের মাস্টারমশায় যেন এসব শুনতে বা বুঝতে না পারেন। রিজিয়া মানে বেশি আশা করো না। আর, সেলসা টেনিসের অর্থ হল তবে একেবারে হাল ছেড়ে দিও না।

এবার অনিচ্ছাসত্ত্বেও হর্টেনসিওর দিকে ঘুরে বসল বিয়াংকা, কারণ তাকে রাখা দরকার। হর্টেনসিও খসখস করে একটা কাগজে লিখে বিয়াংকার হাতে দিয়ে বলল, এই রইল স্বরলিপি। এর উপর চোখ বুলিয়ে দেখ।

বিয়াংকা দেখল কাগজে লেখা রয়েছে :

সারেগা — তোমাকে পাবার জন্য পাগল হয়ে গেছে বেচারি হর্টেনসিও।

রেগামা–হর্টেনসিওকে বিয়ে না করলে সে আর প্রাণে বাঁচবে না।

গামাপা–প্ৰাণের চেয়েও তোমায় বেশি ভালোবাসে হর্টেনসিও।

পাধানি–একটা প্রার্থনা আছে তোমার কাছে।

ধানিপা–হে প্ৰাণেশ্বরী! দয়া করি আমায়। এর বেশি আমি আর কিছুই চাই না।

এভাবে কাব্য-সাহিত্য পড়ানো আর গান-বাজনা শেখানোর নামে বিয়াংকাকে ধাপ্পা দিয়ে হর্টেনসিও আর লুসেনসিও — দুজনেই প্রেম করতে শুরু করে দিল তার সাথে।

 

পেত্রুসিওর সাথে ক্যাথারিনার বিয়ে ঠিক হয়ে গেছে। তাই বিয়াংকার বিয়ের ব্যাপারে আলাপআলোচনা করতে আর কোনও আপত্তি রইল না ব্যাপটিস্টার। কিন্তু মুশকিল হল গ্রোমিও, হর্টেনসিও আর লুসেনসিও — তিনজনই চাইছে বিয়াংকাকে বিয়ে করতে। এদিকে আসল লুসেনসিও শিক্ষক সেজে কবিতার মোটা মোটা বই নিয়ে বিয়াংকার চারপাশে ঘুরঘুর করছে আর যে লুসেনসিও বিয়াংকাকে বিয়ে করতে চাইছে সে আসলে লুসেনসিওর ভৃত্য ত্ৰানিও।

বিয়াংকার বিয়ের উমেদারদের মধ্যে করে কত আর্থিক সঙ্গতি সেটা জানার জন্য ব্যাপটিস্টা তাদের বললেন, আমি কুড়ি হাজার মোহর যৌতুক দেব ছোট মেয়ের বিয়েটে। কিন্তু আমি জানতে চাই তোমাদের মধ্যে কে কত যৌতুক দেবে তার স্ত্রীকে। স্বামী যদি আগে মারা যায়, তাহলে কি স্বামীর স্থাবর-অস্থাবর সম্পত্তির মালিক হবে আমার মেয়ে? সবার সামনে তিন যুবককে এ সব প্রশ্ন করলেন ব্যাপটিস্টা। সাথে সাথে এও জানিয়ে দিলেন যে বেশি যৌতুক দেবে, তার সাথেই বিয়াংকার বিয়ে দেবেন তিনি।

গ্রেমিওর চেয়ে অনেক বেশি ধনী হর্টেনসিও। তাই ব্যাপটিস্টার সিদ্ধান্ত জেনে নিজেকে সরিয়ে নিল গ্রেমিও। আবার হর্টেনসিওর চেয়ে অনেক বেশি ধনী লুসেনসিও। কিন্তু তার বাবা এখনও বেঁচে আর সম্পত্তি দূর পিসা শহরে। ব্যাপটিস্টা বললেন, যদি লুসেনসিওর বাবা এখানে এসে বলেন যে তিনি তার সমস্ত সম্পত্তি লুসেনসিওকে আর তার অবর্তমানে আমার মেয়েকে দিতে রাজি হন, তাহলে আমি ছোটো মেয়ে বিয়াংকার বিয়ে দেব লুসেনসিওর সাথে।

ব্যাপটিস্টার এই সিদ্ধান্ত শুনে হর্টেনসিও স্থির করল বিয়াংকার আশা ছেড়ে দিয়ে অল্পদিনের মধ্যেই সে বিয়ে করে ফেলবে তার পরিচিত এক বিধবা মহিলাকে।

লুসেনসিওর হয়ে তাঁর ভৃত্য ত্ৰানিওই বিয়ের সব কথাবার্তা চালাচ্ছে। মনিবের আদেশেই সে তার দামি পোশাক পরে লুসেনসিও সেজেছে বিয়াংকাকে বিয়ে করার জন্য। ব্যাপটিস্টার কথা শুনে সে এবার এক কাজ করে বসল। সে নিজে যেমন নকল লুসেনসিও, তেমনি একজনকে লুসেনসিওর নকল বাবা সাজিয়ে হাজির করল ব্যাপটিস্টার সামনে। এর মধ্যে অবশ্য কোনও বদ মতলব নেই ত্ৰানিওর। মনিবের কাজ হাসিল করতেই সে একজনকে লুসেনসিওর নকল বাবা নিয়ে এসেছে।

 

দেখতে দেখতে ক্যাথারিনার বিয়ের দিন এসে গেল। তার আত্মীয়-স্বজনরা সবাই সেজেগুজে প্রতীক্ষা করছে বরের। কিন্তু যার অপেক্ষায় রয়েছে সবাই, সেই বর পেত্রুসিওর দেখা নেই। এদিকে বেলা বাড়ছে। পাদ্রিও বিয়ে দেবার অপেক্ষায় রয়েছেন। ঘাবড়ে গেলেন ব্যাপটিস্টা। শেষে কি কথা দিয়েও তার বড়ো মেয়েকে বিয়ে করতে আসবে না পেত্রুসিও? মনে মনে খুবই ভয় পেলেন তিনি। বিয়ে নিয়ে আত্মীয়-স্বজনরা ঠাট্টা করতে লাগল ক্যাথরিনাকে। রাগে-দুঃখে কেঁদে ফেলল সে।

সবাই যখন তার আশা ছেড়ে দিয়েছে, সে সময় একটা বুড়ো ঘোড়ায় চেপে শুধুমাত্র একজন ভৃত্যকে নিয়ে হাজির হলেন পেত্রুসিও। বরের দামি পোশাক নেই তার পরিধানে–তালি দেওয়া একটা কিস্তৃত আকারের আলখাল্লা পরেছেন তিনি। সাধারণত রাস্তার ভিখারিরা সে ধরনের পোশাক পরে থাকে। তার দু-পায়ে রয়েছে দু-রকম জুতো একটা ফিতে বাঁধা, অন্যটা বকলস আঁটা।

এমন বাহারি সাজ দেখে চুপ মেরে গেছে বাড়ির মেয়েরা। ক্যাথারিনা রেগেমেগে যা তা গালি-গালাজ করতে লাগিল পেক্রসিওকে।

পেত্রুসিও কিন্তু মোটেও রাগ করল না। ক্যাথারিনার কথায়। সে বলল, তুমি কি আমায় বিয়ে করবে না। আমার পোশাককে? আগে আমাদের বিয়েটা হয়ে যাক, তারপর পোশাক কিনতে আর কত সময় লাগবে?

শেষমেশ আত্মীয়-স্বজনরা বাধ্য হল পেত্রুসিওর মতে সায় দিতে। তারা উভয়কে গির্জায় নিয়ে এল বিয়ের অনুষ্ঠানের জন্য। সেখানে পেত্রুসিও যা শুরু করল তা নিছক পাগলামি ছাড়া আর কিছু নয়।

পাদ্রি জিজ্ঞেস করলেন ক্যাথারিনাকে, তুমি কি রাজি আছ পেত্রুসিওকে বিয়ে করতে? ক্যাথারিনা জবাব দেবার আগেই পেত্রুসিও চেঁচিয়ে বলে উঠল, হ্যা, হ্যা, ও রাজি আছে, হাজার বার রাজি আছে। পাদ্রি সাহেব চমকে উঠলেন তার চিৎকার শুনে। বাইবেলটা তার হাত থেকে ছিটকে মেঝেতে পড়ে গেল। সেটা তুলে নেবার জন্য পাদ্রি একটু নিচু হতেই পেত্রুসিও তাকে এমন ধাক্কা মোরল যে তিনি মাটিতে পড়ে গেলেন। তাকে সবাই ধরাধরি করে টেনে তুলল। শেষমেশ প্রচলিত নিয়ম অনুযায়ী তাদের বিয়েটাও হয়ে গেল। বিয়ের পর মেয়ে-জামাই আর আত্মীয়দের নিয়ে ব্যাপটিস্টা বাড়িতে ফিরে এলেন। এবার বর-কনেকে নিয়ে একসাথে খাবার

পালা। এ ব্যাপারে বহু লোককে আমন্ত্রণ জানিয়েছেন ব্যাপটিস্টা।

পেত্রুসিও বলল তার শ্বশুরকে, আমার পক্ষে এখন সম্ভব নয়। বিয়ের ভোজে যোগ দেওয়া। বাড়িতে আমার জরুরি কাজ পড়ে আছে। তাই এখনই আমায় ফিরে যেতে হবে। তবে আমি এক যাব না, আমার সাথে ক্যাথারিনাও যাবে।

পেত্রুসিওর কথা শুনে ক্যাথারিনা রেগে উঠে বলল, কী বললে তুমি! বিয়ের ভোজ না খেয়ে যেতে হবে? তোমার ইচ্ছে হয় তুমি যাও, ভোজ না খেয়ে আমি যেতে রাজি নই।

ব্যাপটিস্টা বোঝাতে লাগলেন ক্যাথরিনকে, নাঃ মা! তা হয় না। এখন তোমার বিয়ে হয়েছে। স্বামীর ইচ্ছানুসা চলতে হবে তোমাকে। তুমি যদি তা মেনে না নাও তাহলে সবাই দোষ দেবে তোমাকে। ও যখন বাড়ি যেতে চাইছে, তখন তোমাকেও যেতে হবে ওর সাথে।

বাবার কথা শুনে ভোজ না খেয়েই স্বামীর সাথে চলল ক্যাথারিনা। বিয়ে করতে আসার সময় দুটো হাড়জিরজিরে ঘোড়া নিয়ে এসেছে পেত্রুসিও। ঘোড়া দুটোর অবস্থা দেখলে করুণা হয়। গায়ের লোম উঠে গিয়ে মাঝে মাঝে সাদা মতো টাক পড়েছে। দুটো ঘোড়ার একটিতে উঠলেন পেত্রুসিও ও তাঁর ভৃত্য আর অন্যটিতে সদ্য পরিণীত স্ত্রী। কিছু সময় ভাল মতোই চলল ঘোড়া দুটো। তারপর পেছন থেকে পেত্রুসিওর তাড়া খেয়ে ঘোড়া এমনভাবে দৌড়াল যে মাটিতে ছিটকে পড়ে গেলেন ক্যাথারিনা — গায়ের দামি পোশাক ধুলো-কাদায় মাখামাখি হয়ে উঠল। ক্যাথারিনাকে ফেলে দিয়ে পালিয়ে গেল তার ঘোড়া। তখন নিজের ঘোড়ার পিঠে বউকে চাপিয়ে চললেন পেত্রুসিও। ধুলো-কাদা মাখা দামি পোশাক নিয়ে ঝুলতে ঝুলতে শ্বশুর বাড়িতে এসে পৌঁছোল ক্যাথারিনা। তার মাথা হোঁট হয়ে গেলা লজ্জায় আর অপমানে। কপূরের মতো যেন গায়েব হয়ে গেছে তার দাপট।

বাড়িতে পৌঁছে চাকর-বাকরদের ডেকে গালি-গালাজদিয়ে তাদের ভূত ছাড়িয়ে দিল পেত্রুসিও। তাদের অপরাধ তারা কেন সারিবদ্ধ হয়ে বউকে অভিনন্দন জানায়নি। শুধু গালি-গালাজ দিয়েই ক্ষাস্ত হল না সে–ক্যাথারিনার সামনেই চড় মোরল চাকর-বাকিরদের গালে। স্বামীর হাব-ভাব দেখে বেজায় ভয় পেল ক্যাথারিনা পাছে সে না মেরে বসে তাকে। শান্ত হবার জন্য সে মিনতি করতে লাগল। তার স্বামীকে।

নিজের রাগ ঝেড়ে দিয়ে পেত্রুসিও বলল, যাও, তোমাদের গিন্নি মার জন্য ভালো খাবারদাবার নিয়ে এস। তাড়াহুড়ার জন্য নিজের বিয়ের ভোজ খেতে পারেননি উনি।

হুকুম পেয়েই ভূত্যেরা কয়েক প্লেট ভালো খাবার এনে সাজিয়ে রাখল মনিব-মনিবানীর সামনে! প্লেটে হাত নিয়েই লাফিয়ে উঠে বললেন পেত্রুসিও, ছিঃ ছিঃ মাংসটা যে পুড়ে কালো হয়ে গেছে? এ খাবার কি কেউ খেতে পারে? বলিহারি তোদের বুদ্ধিকে! এ খেলে যে তোদের গিন্নিমা অসুস্থ হয়ে পড়বেন। এ যে বিষ! বলেই খাবারগুলিটান মেরে বাইরে ফেলে দিল পেক্রসিও। এদিকে ক্যাথারিনার অবস্থা তখন শোচনীয়। খিদেয় তার পেটের নাড়ি জুলছে। কোনও মতে কান্না চেপে সে বলল, মিছামিছি। তুমি নষ্ট করলে খাবারগুলো। মাংসটা তো ভালোই ছিল। কত যত্ন করে ওরা এসব রোধেছিল আর তুমি কিনা সে সব নষ্ট করে ফেললে?

মিষ্টি মিষ্টি করে ক্যাথরিনাকে বোঝাতে লাগলেন পেত্রুসিও, আমি বেশ বুঝতে পারছি কেটি খিদের সময় খাবার না পেয়ে কত কষ্ট হচ্ছে তোমার। কিন্তু অখাদ্য খাবার খাওয়ার চেয়ে বরঞ্চ উপোস করা ভালো। তাতে অন্তত শরীরের ক্ষতি হবে না। তুমি তো নিশ্চয়ই মান যে শরীরের কল-কব্জাগুলোরও প্রয়োজন আছে বিশ্রামের। সে সব কথা থাক। পথে আসতে তোমার খুব কষ্ট হয়েছে। চল, এবার ঘুমোনো যাক। তুমি মুখে বলছি না বটে, কিন্তু তোমার চোখ-মুখ দেখেই বোঝা যাচ্ছে ব্যথায় তোমার সারা শরীর যেন ছিড়ে পড়ছে। ভালো করে এক ঘুম দিয়ে দাও, দেখবে ব্যথা কোথায় পালিয়ে গেছে। সকালে ঘুম ভেঙে উঠে ভালো করে খেয়ে নেবে।

তখন আর কথা বলার মতো অবস্থায় নেই ক্যাথরিনা। এই পাগলের হাতে তার কী দুৰ্দশা হবে সে কথা ভেবে শিউরে উঠছে সে। ভয় আর উৎকণ্ঠায় শুকিয়ে আসছে তার চোখ-মুখ।

এবার পেত্রুসিও শোবার ঘরে ঢুকােল নতুন বউকে নিয়ে। চেঁচিয়ে বলে উঠল সে, এ কি হাল বিছানার? এই কি বালিশ, চাদর আর লেপের নমুনা? এত সাহস তোদের যে এই সমস্ত রাস্তার জিনিস তোরা আমার বউয়ের শোবার জন্য পেতেছিস! কী ভেবেছিস তোরা আমায়? রাস্তার ভিখিরিও এমন ইটের মতো শক্ত বিছানায় শোয়না। দেখছি কিছুক্ষণ আগে আমার হাতে মার খেয়েও বিন্দুমাত্র শিক্ষা হয়নি তোদের! আমারই খাবি, পরবি আর দু-হাতে আমারই টাকা ওড়াবি? এদিকে কাজের বেলায় বিলকুল ফাঁকি দিবি! দাঁড়া তোদের মজা দেখাচ্ছি আমি। ভালোয় ভালোয় কাল গিন্নিমা তোদের সবার কাজ-কর্ম বুঝে নিক, তারপর পরশু সকলে ঘাড় ধরে সবাইকে খেদিয়ে দেব। চাকরই হও বা যেই হোক, আমার কথা মতো না চললে সবাইকে দূর করে দেব আমি, সেটা কিন্তু আগেই বলে রাখছি? — বলতে বলতে মোলায়েম রেশমি চাদরে-চাকা বিছানা খাট থেকে তুলে নিয়ে বাইরে ফেলে দিলেন পেত্রুসিও। সারারাত খাটের শক্ত কাঠে ঠেস দিয়ে বসে রইল ক্যাথরিনা। খেতে না পেয়ে তার মাথা ঘুরছে। যখনই ক্যাথারিনা ঘুমোবার উপক্রম করছে, ঠিক তখনই পেত্রুসিও কোনও না কোনও প্রসঙ্গ নিয়ে চেঁচামেচি করছে যাতে ঘুম যাচ্ছে পালিয়ে।

এভাবেই কেটে গেল পরের দিন। পেক্রসিওর তাড়নায় রাতে জল ছাড়া আর কিছুই জোটেনি ক্যাথারিনার ভাগ্যে। ঠিক আগের মতোই আজ রাতেও তাকে ঘুমোতে দিল না পেত্রুসিও। দুদিন না খেয়ে, না ঘুমিয়ে আধমরা অবস্থা ক্যাথারিনার। কথায় কথায় যখন পেত্রুসিও বুঝতে পারল যখন-তখন ক্যাথারিনার মাথা গরম করার ভাবটা কমেছে, সে রান্না ঘরে গিয়ে কয়েক টুকরো পোড়া রুটি জোগাড় করে সুন্দর করে প্লেটে সাজিয়ে শোবার ঘরে ক্যাথারিনার সামনে নিয়ে গেল। ক্যাথারিনা তখন বিছানা ছেড়ে উঠে চোখে-মুখে জল দিয়েছে। সে প্লেটটা ক্যাথারিনার সামনে রেখে আদর করে বলতে লাগল, এই দেখ কেটি, নিজ হাতে কেমন খাবার তৈরি করেছি আমি। এই কদৰ্য খাবার দেখে জল এসে গেল ক্যাথারিনার চোখে। কিন্তু বেচারি কীই বা আর করতে পারে! ক্ষুধার মুখে ওই পোড়া রুটিকেই রাজভোগ ভেবে টপটপ খেয়ে ফেলল। যতই হোক, দু-দিনের অনাহারের জ্বালা তো বটেই।

পেত্রুসিও এরপর একজন নামি দর্জিকে ক্যাথারিনার কাছে নিয়ে এল। ক্যাথারিনার জন্য সে গাউন আর টুপি তৈরি করে নিয়ে এসেছে। তার খুবই পছন্দ হল দামি কাপড়ে তৈরি সে সব পোশাক। কিন্তু সে কথা স্বামীকে বলতে গিয়েই যত বিপত্তি। নাক কুঁচকে চড়া গলায় দর্জিকে বলতে লাগল পেত্রুসিও, এটা কী করেছ তুমি? এটা কি একটা গাউন আর এর নাম টুপি? এর চেয়ে রান্নার একটা বাটি কিনে আমার স্ত্রীর মাথায় পরিয়ে দিলেই তো সব কামেলা মিটে যেত। ছিঃ ছিঃ তুমি কি ভেবেছ আমার স্ত্রী কুলি-কামিনের মেয়ে আর তাই একটা বদখত আলখাল্লা এনে তাকে গাউন বলে গছাবার চেষ্টা করছ? নাঃ হে, আমার ঘরে ওসব রাদি মাল চলবে না।

দর্জি তো অবাক পেত্রুসিওর কথা শুনে। দেশ জুড়ে তার কত নাম-ডাক সেরা দর্জি হিসেবে। আমির-ওমরাহ, বড়ো ঘরের মেয়ের বউরা সবাই তারিফ করে তার তৈরি পোশাকের। আর এর মতো একজন সাধারণ ব্যবসায়ী বলে কিনা আমি বাজে দর্জি!

দর্জির মনের ভাব বুঝতে পেরে তাকে আড়ালে ডেকে নিয়ে বলল পেক্রসিও, ওহে! তোমার পোশাকগুলি নিয়ে এখনই চলে যাও। কিছুক্ষণ বাদে আমি ওগুলির দাম পাঠিয়ে দিচ্ছি।

পোশাকগুলি অপছন্দ করার পেছনে যে অন্য কারণ রয়েছে সেটা বুঝতে পারল দর্জি। তাই সে আর কোনও কথা না বলে পোশাকগুলি থলিতে পুরে নিয়ে চলে গেল তার দোকানে।

ক্যাথারিনাকে সাস্তুনা দিয়ে বলতে লাগল, নতুন পোশাক না হয় নাই হল, তার জন্য দুঃখ করো না। চলো, পুরনো পোশাক পরেই আমরা পাদুয়ায় যাই। বুঝলে কোটি, টাকাই সবকিছু। টাকাই আমার জীবনের ধ্যান, জ্ঞান, ঈশ্বর। অর্থবান লোক ছোড়া পোশাক পরে গেলেও লোকেরা তাকে মাথায় তুলে রাখে। বাপের বাড়ির কথা শুনে আনন্দে নেচে উঠল ক্যাথারিনার মন। বলল, চল, আমরা এখনই বেরিয়ে পড়ি পাদুয়ার উদ্দেশ্যে।

ঘড়ি না দেখেই পেত্রুসিও বলল, এখন সকাল সাতটা। মনে হয় এখনই বেরিয়ে পড়লে দুপুরের খাওয়ার পাট মিটে যাবার আগেই পাদুয়ায় পৌঁছাতে পারব আমরা।

স্বামীর কথায় অবাক হয়ে বলল ক্যাথারিন, কি বলছি তুমি? এখন সকাল সাতটা? ঘড়ির দিকে চেয়ে দেখ এখন বেলা দুটা বাজে। এ সময় বেরিয়ে পড়লে রাতের খাবার সময় হয়তো পৌঁছান যাবে।

যতটুকু বা বাগে এসেছিল পেত্রুসিও, বউয়ের কথা শুনে ততখানিই বিগড়ে গেল সে।

চোখ পাকিয়ে বউয়ের দিকে তাকিয়ে বলল পেক্রসিও, কী বললে এখন দুপুর দুটো বাজে, সকাল সাতটা নয়? সামান্য একটা ঘড়িও আমার ইচ্ছেমতো চলবে না? ঠিক আছে, এই ঘর ছেড়ে এক পাও বাইরে যাব না আমি। আমার ইচ্ছেমতো সময় যতক্ষণ পর্যন্ত না আমার ঘড়ি দেবে, ততক্ষণ পর্যন্ত পিসা, মিলান, ভেনিস–কোথাও যাব না আমি।

এতক্ষণে ক্যাথারিনা বুঝতে পেরেছে মাথা নিচু না করলে কোনও কাজই হাসিল হবে না। এ বাড়িতে ঢোকার সাথে সাথেই তার রাগ, বদমেজাজ–সবই হারিয়ে গেল। সে বুঝতে পেরেছে তার স্বামী তার চেয়ে অনেক বেশি রাগী আর বদমেজাজি। এর সাথে মানিয়ে চলতে গেলে তার জেদ, বদমেজাজ–এমনকি বুদ্ধি বিবেচনাও তাকে ত্যাগ করতে হবে। নইলে পদে পদে দুর্ভোগ আর অশান্তি ভোগ করতে হবে তাকে। তাই চটজলদি নিজেকে সামলিয়ে নিয়ে সে বলল, ঠিকই বলেছ তুমি। আমারই ভুল হয়েছে। এখন তো সকাল সাতটা বাজে। এ সময় বেরিয়ে পড়লে দুপুর নাগাদ নিশ্চয়ই আমরা পৌঁছে যাব পাদুয়ায়।

হেসে হেসে বউকে বলল পেত্রুসিও, তাহলে এখন দুপুর দুটো নয়, সকাল সাতটা বাজে! বেশ, তাহলে আমরা এখন বেরিয়ে পড়ি।

পাদুয়ায় পথে যেতে যেতে এক বৃদ্ধ ভদ্রলোকের সাথে আলাপ হল তাদের। কথায় কথায় জানা গেল ওই ভদ্রলোক পিসা নগরীর ধনী ব্যবসায়ী ভিনসেনসিও। কিছুদিন আগে ব্যবসা-পত্রের সাথে ছিল তার বিশ্বস্ত ভূত্য ত্ৰানিও। কিন্তু পাদুয়ায় যাবার পর থেকে তিনি কোনও খোঁজ পাচ্ছেন না তার ছেলে এবং ভূত্যের। ভিনসেনসিও জানালেন যে তাদের খোঁজ নিতে তিনি নিজেই পাদুয়ায় যাচ্ছেন।

পেত্রুসিও আর ক্যাথারিনার কাছে চেনাচেন ঠেকােল দুটো নামই –লুসেনসিও আর ত্ৰানিও। পেত্রুসিওর বুঝতে বাকি রইল না যে যুবক তার শ্যালিকাকে বিয়ে করবে বলে ধনুকভাঙা পণ করে আছে, সে আর কেউ নয়, এই বৃদ্ধেরই গুণধর পুত্র। লুসেনসিও যে পাদুয়ার ধনী ব্যক্তি ব্যাপটিস্টার ছোটো মেয়েকে বিয়ে করার সংকল্প করেছে সে কথা ইচ্ছে করেই আগে-ভাগে বৃদ্ধ ভিনসেনসিওকে জানিয়ে রাখল পেক্রসিও। এমনও ইঙ্গিত করতে ভুলল না যে ইতিমধ্যে হয়তো তাদের বিয়ে হয়ে গেছে।

আগেই বলা হয়েছে যে লুসেনসিওর নির্দেশ অনুযায়ী তাঁর ভৃত্য ত্ৰানিওই লুসেনসিও সেজেছে। ত্ৰানিও প্রেরিত নকল ভিনসেনসিও ইতিমধ্যেই ব্যাপটিস্টার সাথে দেখা করে তাকে জানিয়ে দিয়েছে যে বিয়াংকার সাথে লুসেনসিওর বিয়ে দিতে রাজি হলে পত্রিপক্ষের পক্ষ থেকে প্রচুর যৌতুক দেওয়া হবে। লোভী ব্যাপটিস্টাও টাকার গন্ধ পেয়ে রাজি হয়ে গেছেন এই বিয়ে দিতে। পাছে ছেলে হাতছাড়া হয়ে যায়। এ জন্য তিনি বলেছেন যে লুসেনসিওর বাগদানের দলিলটা তিনি সে রাত্রেই লিখে ফেলতে চান পাদুয়ায় ভিনসেনসিওর আড়তে বসে। ব্যাপটিস্টা বলে দিয়েছেন যে একজন কাজের লোককে সাথে নিয়ে আগেই সেখানে পৌঁছে যাবে বিয়াংকা আর তিনি পরে যাবেন। এ প্রস্তাবে মুখে সায় দিলেও ত্ৰানিওর ধােন্দা অন্যরকম। সে মতলব করেছে বিয়াংকা সেখানে পৌঁছান মাত্র তার মনিব লুসেনসিও তাকে নিয়ে সোজা চলে যাবেন গির্জায়। সেখানে দুজনে বিয়েটা সেরে ফেলবে। কাজটা যাতে নির্বিঘ্নে হয়ে যায়, সেজন্য গির্জার পাদরি আর দলিল লেখকের সাথে আগে-ভাগেই চুক্তি করে রেখেছে ত্ৰানিও।

ভিনসেনসিওর আড়তে বসে যখন ব্যাপটিস্টা আর নকল ভিনসেনসিও বিয়ের ব্যাপারে কথাবার্তা বলছেন, ঠিক সে সময় সেখানে এসে হাজির হলেন আসল ভিনসেনসিও। এবার বেজায় ঝগড়া আর কথা কাটাকাটি শুরু হয়ে গেল দু ভিনসেনসিওর মধ্যে। এ বলে আমি আসল, তুমি নকল, আর ও বলে তুমি নকল, আমি আসল। শেষে অবস্থা এমন দাঁড়াল যে আসল ভিনসেনসিওরই জেলে যাবার জোগাড়। ঠিক সে সময় বিয়ের পোশাকে সেজেগুজে সেখানে এল লুসেনসিও আর বিয়াংকা। কিছুক্ষণ আগে তারা গির্জায় গিয়ে গোপনে বিয়ে করেছে। এতদিন পরে বাবাকে সামনে পেয়ে তার সামনে হাঁটু গেড়ে বসে পড়ল লুসেনসিও, আশীৰ্বাদ চাইল। ধনী ব্যবসায়ীর সুন্দরী মেয়েকে তার ছেলে বিয়ে করেছে জেনে তাদের উভয়কেই আশীর্বাদ করল ভিনসেনসিও। নকল ভিনসেনসিও যখন দেখতে পেল যে সবাই আসলকেই পাত্তা দিচ্ছে, তখন ধরা পড়ার আগেই সেখান থেকে সরে পড়ল সে।

মনিব তার ছেলে-বাউকে আশীর্বাদ করছেন দেখে এবার এগিয়ে এল ত্ৰানিও। লুসেনসিওর সাথে বিয়ে দেবার জন্য সে যা যা করেছে সব খুলে বলে মনিবের কাছে মার্জনা চাইল সে। ত্ৰানিওর কাছ থেকে সব কথা শুনে হাসতে হাসতে পেটে খিল ধরে যাবার জোগাড় ভিনসেনসিও আর ব্যাপটিস্টার। ব্যাপটিস্টা ভাবতে পারেনি তার দুই মেয়ের বিয়েকে কেন্দ্র করে এত কাণ্ড ঘটে গেছে। এবার দুই বেয়াই তাদের ছেলেমেয়ের বিয়ের উৎসব করতে সত্বর এক বিরাট ভোজসভার আয়োজন করলেন।

নিমন্ত্রিত হয়ে স্ত্রী ক্যাথারিনাকে সাথে নিয়ে সেই ভোজসভায় এসেছে পেত্রুসিও। বিয়াংকার আশা ছেড়ে দিয়ে অল্পদিন আগে হর্টেনসিও বিয়ে করেছে তার পরিচিত এক সুন্দরী বিধবা যুবতিকে। ভোজসভায় সেও এসেছে স্ত্রীকে নিয়ে! সবাই পেট পুরে ভোজ খাবার পর পরিবেশিত হল নানা সুস্বাদু পানীয়। সাধারণত মেয়েরা ওসব খায় না। তাই ক্যাথারিনা। আর বিয়াংকা অন্দরমহলে চলে গেল হর্টেনসিওর বউকে সাথে নিয়ে।

মদিরা পানের সাথে সাথে শুরু হল। ঠাট্টা-তামাশা। বিশেষ করে সবাই লেগেছে পেক্রসিওর পেছনে–ক্যাথারিনার মতো দজাল মেয়েকে বিয়ে করে সে নাকি পস্তাচ্ছে, ভবিষ্যতে এর জন্য তাকে নাকের জলে চোখের জলে এক হতে হবে–এমনই সভার মনোভাব। তিন বউয়ের মধ্যে ক্যাথারিনাই সবচেয়ে খারাপ হবে — হাসি-মশকরার মধ্যে দিয়ে ঘুরিয়ে ফিরিয়ে সবাই একথা বোঝাতে চাইছে পেক্রসিওকে। কিন্তু এসব কথায় কান না দিয়ে এক মনে মন্দিরা পান করে চলেছে সে। শেষমেশ তার শ্বশুর ব্যাপটিস্টা যখন বললেন যে বউয়ের জন্যই সারা জীবন অশান্তি ভোগ করতে হবে, তখন সে আর প্রতিবাদ না করে পারল না। সবার সামনেই সে বলে বসল, লুসেনসিও আর হর্টেনসিওর বউ-এর চেয়ে আমার বউ ক্যাথরিন অনেক বেশি বাধ্য আর সুশীলা। সে বাইবেলের অনুশাসনের মতো মনে করে স্বামীর কথাকে। সে জানে স্বামীর আজ্ঞা পালন না করলে মহাপাতকী হতে হয়। পেক্রসিওর এ কথাকে রসিকতা বলে উড়িয়ে দিল সবাই।

তখন পেত্রুসিও বলল, আমার কথা আপনাদের বিশ্বাস হচ্ছে না? আমার কথা সত্যি না। মিথ্যা তা যাচাই করতে চান আপনারা? বেশ তো, তাহলে বাজি ধরুন — পেত্রুসিওর স্বর আত্মবিশ্বাসে ভরা।

ক্যাথারিনার স্বভাবের সাথে ভালোভাবেই পরিচিত লুসেনসিও আর হর্টেনসিও তারা নিশ্চিত বাজি হেরে যাবে পেত্রুসিও। তাই উভয়ে একশো মোহর করে বাজি ধরল। সবাই জানে পুরুষদের মন্দিরা পানের আসরে মেয়েরা থাকে না–আগে ভাগেই চলে যায়। তারা স্থির করল এই প্রচলিত রীতির বিরুদ্ধে বাজি ধরবে। ঠিক হল পেক্রসিও, লুসেনসিও আর হর্টেনসিও — যে যার স্ত্রীকে টেবিলে আসার জন্য ডেকে পাঠাবে। যার স্ত্রী আসবে সেই বাজি জিতবে।

সর্বপ্রথম লুসেনসিও ডেকে পাঠাল তার বউ বিয়াংকাকে। কিন্তু সেনা এসে জানিয়ে দিল অন্য কাজে ব্যস্ত থাকার দরুন সে আসতে পারবে না।

এবার হর্টেনসিও মিনতি জানিয়ে তার টেবিলে আসার জন্য অনুরোধ করল স্ত্রীকে। কিন্তু সে এল না। জানিয়ে দিল, পুরুষদের মদ্যপানের আসরে স্ত্রী লোকের যাবার নিয়ম নেই। তাই আমি যেতে পারব না।

সর্বশেষে এল পেক্রসিওর পালা। সে একজন ভৃত্যকে ডেকে বলল, যা, ভেতরে গিয়ে আমার স্ত্রীকে বল সে যেন সব কাজ ফেলে এখনই এখানে চলে আসে।

সবাই ধরে নিল বদমেজাজি ক্যাথারিনা তো আসবেই না, উলটো কড়া জবাব পাঠিয়ে দেবে। কিন্তু সবার ধারণাকে মিথ্যে প্রমাণ করে ক্যাথারিনা চলে এল সেখানে। এসেই বলল, কী হয়েছে, আমায় ডাকছ কেন?

পেত্রুসিও বলল, লুসেনসিও ডেকেছিল তোমার বোন বিয়াংকাকে আর হর্টেনসিও ডেকেছিল তার স্ত্রীকে। কিন্তু তারা কেউ আসেনি। স্বামী ডাকলে যে সব কাজ ফেলে ছুটে আসতে হয়, সে বোধ তাদের নেই। আর সে শিক্ষাও কেউ তাদের দেয়নি। তুমি এসে প্রমাণ করেছ যে ওদের চেয়ে তুমি অনেক সুশীলা। তোমার স্থান ওদের অনেক উপরে। যাও, এবার ভেতরে গিয়ে ওদের দুজনকে ডেকে নিয়ে এস। ভেতরে গিয়ে কিছুক্ষণ বাদে হর্টেনসিওর বউ আর ছোটোবোন বিয়াংকাকে সাথে করে নিয়ে এল ক্যাথারিনা।

সত্যিই বাজিমাত করে দিল পেত্রুসিও। তার শ্বশুর ব্যাপটিস্টাও খুশি হলেন এই দেখে যে তার বদমেজাজি মেয়ে কেমন শান্ত-শিষ্ট হয়ে গেছে পেত্রুসিওর মতো স্বামীর হাতে পড়ে। সবার সামনে তিনি জানিয়ে দিলেন মোটা পুরস্কার দেবেন বড়ো জামাইকে।

দ্য মেরি ওয়াইভস অব উইন্ডসর

জ্ঞাতিভাই স্লেন্ডার আর গ্রামের পাদরি স্যার হিউ ইভানসের কথা শোনার পর বিচারপতি ফ্যালো বললেন, খুবই অন্যায় করেছেন স্যার জন ফলস্টাফ। তবে বুদ্ধি দিয়ে এর মোকাবেলা করতে হবে, আইনের সাহায্যে নয়।

পাদরি জন ইভানস বললেন, হুজুর! আমার মাথায় একটা ভালো ফন্দি এসেছে। মাস্টার জর্জ পেজের মেয়ে অ্যানি বেসা আজকাল বেশ বড়োসড়ো হয়ে উঠেছে। ওর মতো সুন্দরী মেয়ে আর একটিও মিলবে না। আমাদের গ্রামে। মরার আগে ওর ঠাকুর্দা নাতনির জন্য নগদ সাতশো পাউন্ড টাকা আর একগাদা সোনা-রুপোর গয়না রেখে গেছেন। সে সব কিছুই অ্যানি তার বিয়েতে যৌতুক পাবে। এখন অ্যানিদের বাড়িতেই রয়েছেন স্যার জন ফলস্টাফ। আপনি সেখানে গেলেই তাকে পেয়ে যাবেন।

তই নাকি! তাহলে তো একবার যেতেই হয় সেখানে বলে জ্ঞাতিভাই স্লেন্ডার আর পাদরি স্যার ইভানসকে নিয়ে পেজের বাড়িতে এলেন বিচারপতি ফ্যালো। সে সময় ওখানেই ছিলেন স্যার ফলস্টাফ। বিচারপতি ফ্যালো তাকে বললেন, আপনি অন্যায়ভাবে আমার বাড়িতে ঢুকে আমার পালিত হরিণটাকে মেরে ফেলেছেন।

হ্যা, আমি আমার অপরাধ স্বীকার করছি, বললেন স্যার ফলস্টাফ, তবে আমি তো আর আপনার দারোয়ানের মেয়ের মুখে চুমো খেতে যাইনি?

দেখিছেন! আপনার অপদার্থ চাকারগুলো কী হাল করেছে আমার? কাদো কঁদো স্বরে বললেন স্লেন্ডার, ওরা আমায় শুড়িখানায় নিয়ে গিয়ে জোর করে মদ গিলিয়েছে। তারপর নেশা হলে আমার সব টাকা-কড়ি কেড়ে নিয়ে পালিয়ে গেছে।

পাদরি স্যার ইভানস বললেন, এসব ঘটনা আমি আমার ডাইরিতে নোট করে রাখছি। পরে বিচার করে উপযুক্ত ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

 

জর্জ পেজের যুবতি মেয়ে অ্যানি বেশ ডাগর-ডোগর দেখতে। সে ভালোবাসে ফেনটন নামে একটি ছেলেকে, আর ফেনটনও ভালোবাসে অ্যানিকে। বিয়ের স্বপ্নে বিভোর দু-জনে। কিন্তু অ্যানির বাবা মোটেও রাজি নন ফেনটনের সাথে তার মেয়ের বিয়ে দিতে। তিনি চান বিচারপতি ফ্যালোর জ্ঞাতিভাই স্লেন্ডারের সাথে অ্যানির বিয়ে দিতে। পেজ ভালোই জানেন স্লেন্ডার অ্যানিকে খুব পছন্দ করে। কিন্তু অ্যানি মোটেও পছন্দ করে না স্লেন্ডারকে। এদিকে অ্যানির মার পছন্দ আবার কেইয়াস নামে এর ফরাসি চিকিৎসককে–তারই সাথে তিনি মেয়ের বিয়ে দিতে চান। কেইয়াসও পছন্দ করে অ্যানিকে।

এদিকে অ্যানির মা মিসেস পেজ আর তার ঘনিষ্ঠ প্রতিবেশিনী মিসেস ফোর্ড–দুজনের সাথেই গোপন প্রেমের খেলা খেলছেন স্যার জন্য ফলস্টাফ। তার আসল উদ্দেশ্য উভয়ের সাথে প্রেমের অভিনয় করে মোটা টাকা হাতিয়ে নেওয়া। একদিন স্যার ফলস্টাফের কাজের লোক নাইস এবং পিস্তল মি. ফোর্ডের সাথে দেখা করে করে বলল যে তাদের মনিবা স্যার ফলস্টাফ গোপনে মিসেস ফোর্ডের সাথে মিলিত হবার ইচ্ছা জানিয়ে তাকে একটি চিঠি লিখেছেন। তারা চিঠিখানা দেখাল মি. ফোর্ডকে। ওদিকে স্যার ফলস্টাফও যে গোপনে মিসেস পেজের সাথে একই প্রেমের খেলা খেলছেন, সে কথা জানতে পেরে বেজায় রেগেন গেলে মিসেস ফোর্ড। তিনি স্থির করলেন উচিত শিক্ষা দিতে হবে স্যার ফলস্টাফকে। তিনি আগে থেকেই মিসেস পেজকে জানিয়ে দিলেন যে মি. ফলস্টাফ রাতে তাঁর বাড়িতে আসবেন।

এসব কিছুই জানা নেই। মি. ফলস্টাফের। রাতের বেলা তিনি সেজেগুজে এলেন মিসেস ফোর্ডের বাড়িতে। তার কিছুক্ষণ পরেই এলেন মিসেস পেজ। আড়াল থেকে তাকে দেখতে পেয়ে ভয়ে ভয়ে পাশের ঘরে লুকোলেন স্যার ফলস্টাফ। তাকে উদ্দেশ্য করে গলা চড়িয়ে মিসেস পেজ বলতে লাগলেন যে গ্রামের লোকেরা বেজায় চটে আছে। ফলস্টাফের উপর। তাকে উচিত শিক্ষা দিতে এদিকেই এগিয়ে আসছে তারা।

মিসেস পেজের কথাগুলি শুনতে পেয়ে স্যার ফলস্টাফ বেজায় ঘাবড়ে গেলেন। সুযোগ পেয়ে মিসেস ফোর্ড তাকে বসিয়ে দিলেন এক বড়ো ঝুড়িতে। এমন ভাবে ময়লা জামা-কাপড় বুড়ির উপর চাপিয়ে দিলেন যাতে বাইরে থেকে কেউ বুঝতে না পারে। এরপর মিসেস ফোর্ডের নির্দেশে তার বাড়ির কাজের লোকেরা সেই ঝুড়ি বাইরে নিয়ে গিয়ে ছুড়ে ফেলে দিল নদীর কর্দমাক্ত জলে। সেই নোংরা জলে মাখামাখি হয়ে বাড়ি ফিরে গেলেন স্যার ফলস্টাফ।

স্যার ফলস্টাফকে পুনরায় শিক্ষা দেবার জন্য এবার মিসেস ফোর্ড তার কাছে পাঠালেন ড. কেইয়াসের বাড়ির কাজের মেয়ে কুইকলিকে। মিসেস ফোর্ডের শেখানো অনুযায়ী কুইকলি স্যার ড.ফলস্টাফকে বলল সে দিন পাখি শিকারে যাবেন মি. ফোর্ড। কাজের লোক ছাড়া বাড়িতে আর কোনও পুরুষ মানুষ থাকবে না। মিসেস ফোর্ড তাকে অনুরোধ জানিয়েয়েছেন তিনি যেন রাত আটটা থেকে দশটার মধ্যে তার কাছে যান। কুইকলি ফিরে যাবার পর মি. ব্রুক নামে এক বিদেশির ছদ্মবেশে স্যার ফলস্টাফের কাছে এলেন মি. ফোর্ড! স্যার ফলস্টাফ তাকে বিশ্বাস করে নিজের গোপন প্রেমের সব কথা জানিয়ে দিলেন। এবার মজা দেখানোর পালা মি. ফোর্ডের।

রাতের বেলা আবার মিসেস ফোর্ডের কাছে এলেন মি. ফলস্টাফ। তাকে হাতে নাতে ধরার জন্য খানিক বাদে মি. ফোর্ডও এলেন নিজের বাড়িতে। ফলস্টাফের কাকুতি-মিনতিতে নরম হয়ে এবারও তাকে প্ৰাণে বঁচিয়ে দিলেন মিসেস ফোর্ড। মেয়েদের মতো ঢোলা গাউন আর টুপি পড়িয়ে বাড়িতে পরিচারিকার মাসি সাজিয়ে চলে যেতে বললেন তাকে। বাড়ির পরিচারিকার এই মাসির উপর আগে থেকেই রেগে ছিলেন মি. ফোর্ড। সিঁড়ি দিয়ে মাসি নেমে আসতেই খপ করে। তাকে ধরে ফেললেন মি. ফোর্ড। তারপর মনের সুখে কয়েকটা কিল বসিয়ে দিলেন তাঁর পিঠে। কিল খেয়ে বুড়ি পালিয়ে যাবার পর হাসতে হাসতে মিসেস ফোর্ড তার স্বামীকে বললেন, ওই বুড়ির ছদ্মবেশে ছিলেন স্বয়ং স্যার জন ফলস্টাফ।

এবার সবাই মতলব আঁটলেন আরও একবার স্যার জনকে ডেকে তাকে উচিত শিক্ষা দেবার। তাদের নির্দেশ অনুযায়ী কুইকলি গিয়ে স্যার ফলসফিকে বলল, তিনি যেন আর্ডেনের এক ওক গাছের কাছে যান। সে এও বলল যে তার প্রেমের আহ্বানে সাড়া দিয়ে তার দুই প্রেমিকা মিসেস ফোর্ড আর মিসেস পেজ–উভয়েই আসবেন সেখানে। তবে যাবার সময় তিনি যেন তার মাথায় এক জোড়া শিং এটে বনদেবতা থানের সাজে। সেখানে যান। — এই বলে বিদায় নিল কুইকলি।

মাথায় একজোড়া শিং এটে রাতের বেলা জঙ্গলে এলেন স্যার জন্য ফলস্টাফ। তাকে দেখতে পেয়েই ওক গাছের আড়াল থেকে বেরিয়ে এলেন মিসেস ফোর্ড। সাথে সাথেই তাকে জড়িয়ে ধরে চুমু খেলেন। ফলস্টাফ। সেই সময় বেজে উঠল। শিঙ্গা। একদল ছোটো ছেলেমেয়ে এসে তাদের ঘিরে ধরল। তাদের সবাইর হাতে রয়েছে জুলন্ত মোমবাতি। তাদের মধ্যে কেউ সেজেছে সাদা পোশাকের পরি, কেউবা ভূত-প্রেতি আর রানি সেজেছে স্বয়ং অ্যানি পেজ। অ্যানির নির্দেশে সেই ছেলেমেয়েরা জুলন্ত মোমবাতির ছ্যাক দিতে লাগল স্যার ফলস্টাফের শরীরে। অনেকে আবার খিমচে তুলে নিল তার গায়ের মাংস।

অ্যানি বলে উঠল, মার বদমাইশকে! আরও বেশি করে মার। ঠিক সে সময় স্লেন্ডার এসে হাজির সেখানে। অ্যানি ভেবে তিনি সাদা পোশাক পরা একটি মেয়েকে তুলে নিয়ে গেলেন। কিছুক্ষণ বাদে সেখানে এলেন ড. কেইয়াস। তিনিও অ্যানি মনে করে সবুজ পোশাক পরা একটি মেয়েকে তুলে নিয়ে চলে গেলেন। এ সময় পালাতে যাচ্ছিলেন স্যার জন্য ফলস্টাফ। কিন্তু পরম তৎপরতার সাথে তাকে ধরে ফেলে মি. পেজ। বললেন, পরপর দু-বার আপনি পালিয়ে বেঁচেছেন। কিন্তু এবার আর রক্ষণ নেই। আপনার বাপের নাম ভুলিয়ে দিয়ে তবে ছাড়ব।

কোনওমতে ঢ়োক গিলে আমতা আমতা করে বললেন স্যার ফলস্টাফ, আপনারা কী করতে চান আমায় নিয়ে?

বিশেষ কিছু নয়, বললেন মি. পেজ, আজ রাতে আমাদের সাথে আপনাকে ডিনার খেতে হবে। আর সে সময় আমার স্ত্রীর দিকে হাসিমুখে তাকিয়ে তার মন রাখতে মিষ্টি মিষ্টি কথা বলতে হবে।

এতক্ষণে বুঝতে পারলাম আমি একটা আস্ত নির্বোধ, বললেন স্যার জন ফলস্টাফ।

সাথে সাথে মিসেস পেজ আর মিসেস ফোর্ড, আপনি শুধু নির্বোধ নন, গোরু-ছাগলের চেয়েও নিকৃষ্ট জীব আপনি। মেয়েদের আপনি কী মনে করেন? জবাব দিতে না পেরে মুখ বুজে রইলেন স্যার জন্য ফলস্টাফ। এর মাঝে স্লেন্ডার এসে জানাল এ্যানি ভেবে সে যাকে তুলে নিয়ে গিয়েছিল, গির্জায় পৌঁছে দেখে সে এখানকার পোস্ট মাস্টারের ছেলে। স্লেন্ডারের পেছু পেছু ড. কেইয়াসও হাজির হলেন সেখানে। তিনিও জানালেন সবুজ পোশাক পরা যে মেয়েটিকে তিনি নিয়ে গিয়েছিলেন, গির্জায় গিয়ে দেখেন সেও একটি ছেলে, সদ্য গোফ গজিয়েছে তার।

এবার অ্যানি পেজ-দম্পতির সামনে এগিয়ে এলেন ফেনটনের হাত ধরে। বাবা-মার দিকে তাকিয়ে বললেন, আমরা পরস্পর পরস্পরকে ভালোবাসি। তোমরা আমাদের বিয়ের অনুমতি দাও।

তাদের উভয়কে বুকে জড়িয়ে ধরে পেজ দম্পতি বললেন, আমরা আশীর্বাদ করছি ঈশ্বর যেন তোমাদের সুখী রাখুন।

পেরিক্লিস, দ্য প্ৰিন্স অব টায়ার

চারদিক দিয়ে সারি সারি পাহাড়ে ঘেরা ছোট্ট একটি রাজ্য–নাম অ্যান্টিওক। সে দেশের রাজার নাম অ্যান্টিওকাস। রাজা ঠিক করেছেন তার রূপসি মেয়ের বিয়ে দেবেন। সেই অপরাপা সুন্দরী মেয়েকে বিয়ে করার উদ্দেশ্যে দেশ-দেশান্তর থেকে রাজা আর রাজপুত্ররা এসে সমবেত হয়েছেন অ্যান্টিওকে। এখানে এসেই তারা শুনলেন বিয়ের এক অদ্ভূত শর্তের কথা। শর্তটা এই — যে রাজকন্যার ধাঁধার সঠিক জবাব দিতে পারবে, রাজকন্যা তাকেই বিয়ে করবেন। আর ধাঁধার সঠিক জবাব দিতে না পারলে মৃত্যুদণ্ড হবে। রাজকন্যাকে বিয়ে করতে এ যাবত কত না রাজা ও রাজপুত্র এসেছে তার ঠিক নেই। তবে ধাঁধার সঠিক জবাব দিতে না পেরে তারা কেউ আর প্রাণে বাঁচেনি।

এবার টায়ারের রাজা পেরিক্লিস এলেন রাজা অ্যান্টিওকের সেই অসামান্যা সুন্দরী মেয়েকে বিয়ে করতে। রাজকুমারীর ধাঁধার সঠিক জবাব দিতে না পারলে তার প্রাণদণ্ড হবে – সে কথা নিজমুখে তাকে বলে দিলেন রাজা অ্যান্টিওক্যাস। মৃত্যুতে ভয় নেই পেরিক্রিসের। তাই এই ভয়ানক শর্তের কথা শুনেও তিনি রাজি হলেন সরাসরি রাজকন্যার সাথে দেখা করতে। এরপর অ্যান্টিওক্যাসের আর বলার কিছুই রইল না। তাঁর আদেশে অন্দরমহলের প্রহরীরা রাজকুমারীকে নিয়ে এসে হাজির করল পেরিক্রিসের সামনে। রাজকন্যার এই অপরূপ সৌন্দর্য দেখে বিস্ময়ে হতবাক হয়ে গেলেন তিনি। রক্ত-মাংসে গড়া কোনও মেয়ে যে এত সুন্দরী হতে পারে তা জানতেন না তিনি। জীবনে এরূপ সৌন্দর্যবতী যুবতির মুখোমুখি হননি তিনি।

রাজকুমারীর একজন সহচরী বললেন, মহারাজ! এবার আমাদের রাজকুমারী আপনাকে একটি ধাঁধা বলবেন তার সঠিক জবাব দিতে হবে আপনাকে। জবাব সঠিক না হলে তার পরিণতি অবশ্যই আপনারা জানা আছে। প্রহরীরা আপনাকে বধ্যভূমিতে নিয়ে যাবে আর জল্লাদ এককোপে আপনার মুণ্ডুটা কেটে ফেলবে। এবার বলুন আপনি কি ধাঁধা শুনতে রাজি আছেন?

পেরিক্লিস বললেন, আমি বুঝতে পারছি না বারবার একই শর্তের কথা বলে লাভ কি। তোমাদের রাজকুমারীকে বল ধাঁধাটা শুনিয়ে দিতে।

রাজকুমারী ধাঁধাটি শুনিয়ে দিলেন। মাথা খাটিয়ে বুদ্ধিমান পেরিক্লিস তার অর্থ ঠিকই বের করলেন তবে তা এতই নোংরা যে কথায় তা প্রকাশ করা যায় না। ধাঁধার সঠিক অর্থ হল অ্যান্টিওক্যাস তার সুন্দরী মেয়ের সাথে অবৈধ সম্পর্ক গড়ে তুলেছেন। পেরিক্রিসের বুঝতে বাকি রইল না। এই রূপসী রাজকন্যা আসলে এক ব্যভিচারিণী নারী।

ধাঁধার সঠিক জবাব পেরিক্লিস বুঝতে পেরেছেন জেনে রাজা অ্যান্টিওকাস ভয় পেয়ে গেলেন। বাবা-মেয়ের কুকর্মের কথা জেনে পেরিক্লিস তার মেয়েকে বিয়ে করা তো দূরের কথা, উলটে সবাইকে জানিয়ে দেবেন তার চরিত্রহীনতার কথা। এ ব্যাপারে নিঃসন্দেহ অ্যান্টিওক্যাস। ধাধার সঠিক অর্থ খুজে বের করার পর তার বেঁচে থাকাটা যে রাজার কাছে বিপজ্জনক, সেটা স্পষ্ট বুঝতে পেরেছেন পেরিক্লিস। তাই রাজা কিছু টের পাবার আগেই তিনি অ্যাস্টিওক ছেড়ে পালিয়ে এলেন নিজ রাজ্য টায়ারে। পেরিক্রিসের পালিয়ে যাবার খবর শুনে রেগে আগুন হয়ে উঠলেন অ্যান্টিওক্যাস। তিনি স্থির করলেন পেরিক্লিস কোনও কিছু রটিয়ে দেবার আগেই তিনি তাকে হত্যা করবেন। অ্যান্টিওকাস তার সভাসদ থেলিয়ার্ডকে ডেকে বললেন, যত তাড়াতাড়ি পারেন। আপনি টায়ারে চলে যান। সেখানে গিয়ে সবার অগোচরে বিষপ্রয়োগে হত্যার ব্যবস্থা করুন পেরিকিসকে। সঠিক ভাবে কাজটা না করতে পারলে আপনিও বাঁচবেন না। দেশে ফিরে এলেই আপনার শিরশ্ছেদ করা হবে।

প্ৰাণ নিয়ে অ্যান্টিওক্যাসের রাজ্য থেকে ফিরে এলেও শান্তি নেই পেরিক্রিসের মনে। কারণ অ্যান্টিওক থেকে টায়ার অনেক ছোটো রাজ্য। ইচ্ছে করলেই সেখানকার রাজা যে কোনও সময় তার বিশাল বাহিনী নিয়ে টায়ার আক্রমণ করতে পারেন। পেরিক্লিস জানেন সেরূপ কিছু ঘটলে তিনি তার দেশ ও প্রজাদের রক্ষা করতে পারবেন না। — কারণ তার এমন সৈন্যবাহিনী নেই যা অ্যান্টিওক্যাসের আক্রমণ ঠেকাতে পারে। পেরিক্লিস তার প্রধান অমাত্য হেলিকেন্যাসকে আদেশ দিলেন, আপনি এখনই বন্দরে গিয়ে সেখানে সেনাবাহিনী নিয়োগ করুন। দূর থেকে কোনও যুদ্ধজাহাজের মাস্তুল দেখা গেলেই আমায় সংবাদ দেবেন। যাবার আগে সেনাপতিকে এখনই আমার কাছে পাঠিয়ে দিন। রাজার নির্দেশ শুনে চমকে উঠলেন হেলিকেন্যাস। তিনি বুঝতে পারলেন কোনও কারণে যুদ্ধের আশঙ্কা দেখা দিয়েছে রাজার মনে। আসল ব্যাপারটা কী তা জানার জন্য তিনি একদৃষ্টি তাকিয়ে রইলেন রাজার মুখের দিকে।

তা দেখে উত্তেজিত হয়ে পেরিক্লিস বললেন, কী ব্যাপার! আমার কথা শুনতে পাননি। আপনি? বললাম সেনাপতিকে ডেকে আনুন। তা না করে আমার মুখের দিকে তাকিয়ে আপনি কি দেখছেন?

হেলিকেন্যাস উত্তর দিলেন, মহারাজ! আমি আপনার একজন অনুগত অমাত্য। আমার কাজ রাজ্য পরিচালনার ব্যাপারে আপনাকে যথাসাধ্য সাহায্য করা। আমি লক্ষ করছি অ্যান্টিওক থেকে ফিরে আসার পর থেকে আপনি ভীষণ মানসিক অশাস্তির মাঝে দিন কাটাচ্ছেন। মনে হচ্ছে কোনও কারণে আপনি ভয় পেয়েছেন —সর্বদাই একটা আতঙ্কের মাঝে সন্ত্রস্ত হয়ে আছেন। মহারাজ! আপনি যদি বিশ্বাস করে আমায় সব কথা খুলে বলেন, তাহলে আমি আপ্রাণ চেষ্টা করে দেখব কীভাবে আপনাকে এই সংকট থেকে মুক্ত করা যায়।

হেলিকেনাসের কথায় ভরসা পেয়ে অ্যান্টিওকে যে সব ঘটনা ঘটেছে তা তাকে খুলে বললেন রাজা। তিনি বললেন, অ্যান্টিওক্যাসের মধ্যে এমন একটা ধারণা জন্মেছে যে নিজের মেয়ের সাথে তার ব্যভিচারের কথাটা আমি চারদিকে রটিয়ে দেব। আমি জানি চুপচাপ বসে থাকার লোক নন। উনি। যে কোনওভাবেই হোক টায়ারে উনি আঘাত হানবেনই। বুঝলেন হেলিকেন্যাস, সে সব কথা ভেবেই ভয় পাচ্ছি। আমি। এখন আপনিই বলুন আমি কি করব।

আপনি যা ভাবছেন তা মোটেই অযৌক্তিক নয় মহারাজী, বললেন হেলিকেন্যাস, টায়ার যদি উনি আক্রমণ নাও করেন তাহলেও তিনি একবার না একবার আপনার প্রাণনাশের চেষ্টা করবেন। আমার পরামর্শ যদি চান তাহলে বলি কি আপনি কিছুদিনের জন্য এ রাজ্য ছেড়ে অন্য কোথাও আশ্রয় নিন। আপনি এখানে নেই জানলে আপনার উপর অ্যান্টিওক্যাসের যে রাগ জমে আছে তা স্বাভাবিকভাবেই উবে যাবে। এমনও হতে পারে আপনার অনুপস্থিতিতে তার মতো অহংকারী রাজা মারা গেলেন। যাইহোক, আপনি যোগ্য লোকের হাতে রাজ্য পরিচালনার ভার দিয়ে নিশ্চিন্তে কিছুদিনের জন্য বাইরে চলে যান। আমি কথা দিচ্ছি। দেহের শেষ রক্তবিন্দু থাকা পর্যন্ত দেশের স্বাধীনতা রক্ষা করে যাব।

পেরিক্লিস বললেন, ঠিক আছে, আপনার পরামর্শও আমি কিছুদিনের জন্য টায়ার ছেড়ে যাচ্ছি। আমার অনুপস্থিতিতে এ রাজ্য আপনিই পরিচালনা করবেন। আমি যেখানেই থাকি না। কেন, চিঠিপত্রের মাধ্যমে আপনার সাথে যোগাযোগ রাখব।

এবার হেলিকেন্যাসকে টায়ারের শাসক পদে নিযুক্ত করে রাজা পেরিক্লিস তার কয়েকজন বিশ্বস্ত অনুচর, প্রচুর খাবার-দাবার এবং অন্যান্য প্রয়োজনীয় জিনিসপত্র নিয়ে জাহাজে চেপে পাড়ি দিলেন অজানার পথে। পরদিন নতুন দায়িত্ব নিয়ে রাজসভায় এলেন হেলিকেন্যাস। সমবেত অমাত্য এবং সভাসদদের উদ্দেশ করে তিনি বললেন, কোনও বিশেষ কারণে নিজের অজান্তে আমাদের রাজা পেরিক্লিাস অন্যায় আচরণ করে ফেলেছেন অ্যান্টিওকের রাজা অ্যান্টিওক্যাসের প্রতি। সে আচরণের জন্য রাজা নিজে খুব অনুতপ্ত। অন্যায়ের শাস্তি স্বরূপ তিনি খালাসির বেশে সমুদ্রপথে কোনও এক অজ্ঞাত স্থানে যাত্ৰা করেছেন। বন্ধুগণ! আপনারা নিশ্চয়ই বুঝতে পারছেন এ অবস্থায় রাজার জীবনের কোনও নিরাপত্তা নেই। অনুগ্রহ করে আপনারা তার অন্যায় আচরণ বা তার অনুতাপের বিষয়ে আমায় কোনও প্রশ্ন করবেন না। যাবার সময়ে তিনি তার অনুপস্থিতিতে রাজ্য শাসনের দায়িত্বভার আমার ওপর দিয়ে গেছেন। সময় অভাবে তিনি আপনাদের সবাইকে আলাদা করে এ ব্যাপারে কিছু বলে যেতে পারেননি।

এসব কথা হেলিকেন্যাস যখন তার সতীর্থ অমাত্য আর সভাসদদের বলছিলেন, সে সময় সেখানে এসে হাজির হলেন অ্যান্টিওক্যাসের প্রধানমন্ত্রী থেলিয়ার্ড—উদ্দেশ্য বিষপ্রয়োগে রাজা পেরিক্লিসকে হত্যা করা। পেরিক্রিসের চলে যাবার কথা শুনে হাফ ছেড়ে বঁচিলেন তিনি। অ্যান্টিওকে ফিরে গিয়ে রাজাকে এ কথা জানালে নিশ্চয়ই তিনি তার প্রাণ নেবেন না – ভেবে স্বস্তির নিশ্বাস ফেললেন তিনি।

সভাসদদের অভিবাদন জানিয়ে থেলিয়ার্ড বললেন, রাজা অ্যান্টিওক্যাসের দূত হিসেবে আমি এক জরুরি বার্তা বয়ে নিয়ে এসেছি। রাজা পেরিক্রিসের জন্য। এসে শুনি তিনি নিরুদেশ যাত্রা করেছেন। দেশে ফিরে গিয়ে আমি রাজাকে সে কথাই বলব।

হেলিকেন্যাস বললেন, রাজার জন্য যে বিশেষ বার্তা আপনি বয়ে নিয়ে এসেছেন তা জানতে আমরা আগ্রহী নই। তবে আপনি আমাদের সম্মানীয় অতিথি। অনুগ্রহ করে আজকের দিনটা থেকে গেলে আমরা খুব খুশি হব।

তাদের কথা রাখতে শুধু সেদিনের রাতটুকুটায়ারের প্রাসাদে অতিথি হয়ে কটালেন থেলিয়ার্ড। পরদিন সকালে অ্যান্টিওকে চলে গেলেন তিনি।

একসময় টায়ারের অন্তর্ভুক্ত থার্সাস নগরী এতই সমৃদ্ধিশালী ছিল যে সেখানে কখনও খাদ্যাভাব হয়নি। দুঃখ যে কী তা সেখানকার লোকেরা কখনও অনুভব করেনি। নাগরিকদের প্রয়োজন মেটার পর থাসাঁসের উৎপাদিত ফসল পাঠিয়ে দেওয়া হত আশে-পাশের শহরে। কিন্তু সেই থার্সাসেই একদিন দেখা দিল অনাবৃষ্টি। বৃষ্টি না হওয়ায় ফসল ফলাল না খেতে, ফলে চরম খাদ্যাভাব দেখা দিল সেখানে। খাদ্য জোগাড় করতে সেখানকার লোকেরা ঘর-বাড়ি, গোরু-ঘোড়া সব কিছু বিক্রি আরম্ভ করল। কিন্তু এভাবে আর কতদিন চলে! শেষমেশ এমন অবস্থা দাঁড়াল থার্সাসে, যে ভিক্ষা দেবার লোকও রইল না। সেখানে। ক্ষুধার জ্বালায় অখাদ্য কৃখাদ্য খেতে শুরু করল সেখানকার লোকেরা! ফলস্বরূপ দেখা দিল মহামারী। কুকুর-বেড়ালের মতো বিনি চিকিৎসায় মরতে লাগল থাসাসের লোকেরা।

থার্সাসের মানুষদের এই চরম দুঃখ-দুৰ্দশা দেখে হতাশ হয়ে পড়লেন সেখানকার শাসনকর্তা ক্লিওন। অনেক ভেবেচিন্তেও তিনি হদিস পেলেন না। কীভাবে প্রজাদের দুর্দশা দূর করা যায়।

থার্সাসের লোকদের যখন এই অবস্থা, সে সময় কয়েকজন অনুচরসহ জাহাজে চেপে সেখানে এস হাজির হলেন রাজা পেরিক্লিস। তিনি রাজাকে অভিবাদন করে বললেন, থার্সাসে যে দুৰ্ভিক্ষ চলছে সে খবর আমি আগেই পেয়েছি। তাই আমি জাহাজে করে তাদের জন্য প্রচুর খাদ্য-শস্য নিয়ে এসেছি। এতে অন্তত কিছুদিনের জন্য তাদের খাদ্যাভাব মিটবে। তবে এর বিনিময়ে আমার কিছু চাইবার আছে মহারাজ।

রাজা ক্লিওন বললেন, যখন খাদ্যাভাবে আমার লোকেরা শেয়াল-কুকুরের মতো মরছে, সে সময় আপনি তাদের জন্য জাহাজভর্তি খাবার নিয়ে এসেছেন। এর বিনিময়ে আমার যদি কিছু করার থাকে তা আমি আশুই করব। আপনি নিঃসঙ্কোচে বলুন কী চাই আপনার।

বিশেষ কিছু নয় মহারাজ, বললেন রাজা পেরিক্লিস, ‘এই কয়েকজন অনুচরসহ আমি কিছুদিন আপনার রাজ্যে থাকতে চাই।

এ আর এমন কী! আপনার যতদিন ইচ্ছে থাকুন। এখানে, আমি বরঞ্চ খুশিই হব তাতে, বললেন রাজা ক্লিওন, আমি আপনাকে যে কোনও রকম সাহায্য করার প্রতিশ্রুতি দিচ্ছি।

পেরিক্লিস কিছুদিন কটালেন। থার্সারের রাজা ক্লেওনের রাজপ্রাসাদে। এর মাঝে তিনি চিঠিপত্রের মাধ্যমে নিয়মিত যোগাযোগ বজায় রেখে চলেছিলেন অমাত্য হেলিকেনাসের সাথে। তার একটা চিঠিতেই পেরিক্লিস জানতে পারলেন কিছুদিন আগে তাকে হত্যা করার জন্য রাজা অ্যান্টিওকাস তার মন্ত্রী থেলিয়ার্ডকে টায়ারে পাঠিয়েছিলেন। তার নিরুদ্দেশ যাত্রার খবর শুনে অ্যান্টিওকে ফিরে গেছেন থেলিয়ার্ড। খবরটা শুনে চিন্তায় পড়ে গেলেন পেরিক্লিস। কারণ তিনি এখানে আছেন জানতে পারলে অ্যান্টিওকাস আবার লোক পাঠাবেন তাকে হত্যা করতে। তাই রাজা ক্লিওনের কাছ থেকে বিদায় নিয়ে জাহাজে চেপে পুনরায় যাত্রা করলেন অজানার উদ্দেশে।

থার্সাস ছেড়ে যাবার পর দুটো দিন ভালোভাবেই কাটল। কিন্তু তৃতীয় তিন সকালে ঘন মেঘে। ছেয়ে গেল সারা আকাশ। কিছুক্ষণ বাদেই শুরু হল তুমুল ঝড়-বৃষ্টি। সমুদ্র উত্তাল হয়ে উঠল। হাওয়ার দাপটে। ঝড়ের তাণ্ডবে ভেঙে পড়ল জাহাজের মাস্তুল। পাহাড়ের মতো উচু উচু ঢেউগুলো জাহাজটাকে নিয়ে যেন ছেলেখেলা করতে লাগল। অশান্ত সমুদ্রের সাথে পাল্লা দিতে দিতে এক সময় জাহাজটা ভেঙে টুকরো টুকরো হয়ে গেল। রাজা পেরিক্লিস ভাঙা জাহাজের একটা বড়ো টুকরো আঁকড়ে ধরে অসহায়ভাবে ভাসতে লাগলেন সমুদ্রে। বহুক্ষণ এভাবে কাটাবার পর সমুদ্রের অশান্ত ঢেউ তাকে এনে ফেলল কুলে। একটানা অশাস্ত সমূদ্রের সাথে লড়াই করতে করতে ক্লান্ত হয়ে পড়েছিলেন পেরিক্লিস। কুলে আছড়ে পড়ার সাথে সাথেই জ্ঞান হারিয়ে ফেললেন তিনি। জ্ঞান এলে তিনি দেখলেন ঝড়-বৃষ্টি থেমে গেছে। রাতের অন্ধকার দূর হয়ে ভোরের আলো ফুটে উঠেছে। ঝড়ের তাণ্ডবে ভাঙা জাহাজের সাথে সাথে তার অনুচররাও যে কে কোথায় চলে গেছে তা কেউ জানে না। কিন্তু এভাবে জলের ধারে হাত-পা ছড়িয়ে কতক্ষণ আর বসে থাকা যায়! তাছাড়া ক্ষুধা-তৃষ্ণায় তার গলা শুকিয়ে এসেছে।

যে করেই হোক তাকে বাঁচতে হবে এই আশা নিয়ে সব ক্লাস্তি ঝেড়ে ফেলে উঠে দাঁড়ালেন। পেরিক্লিস। একপাশে পাহাড় আর অন্যপাশে সমুদ্রকে রেখে দৃঢ়তার সাথে এগিয়ে চললেন তিনি। বেলা বাড়ার সাথে সাথে সূর্যের তেজ বাড়তে লাগল। বহুদূর হাঁটার পরও কোনও লোকালয়ের দেখা মিলল না। সূর্য যখন ঠিক মাথার উপর উঠে বসেছে, সে সময় দেখা মিলল একদল জেলের। ঝড়-বৃষ্টির পর তারা সমুদ্রে মাছ ধরতে গিয়েছিল। এখন তারা ঘরে ফিরছে বড়ো বড়ো জাল আর মাছ নিয়ে। জলে ভেজা কাপড়-চোপড় পরা পেরিক্লিসকে দেখে তারা থমকে দাঁড়িয়ে পড়ল— জানতে চাইল তার পরিচয়। পেরিক্লিস তার আসল পরিচয় ইচ্ছে করেই গোপন করলেন তাদের কাছে। তিনি তাদের বললেন যে তিনি একজন বণিক। ঝড়ের তাণ্ডবে জাহাজ ডুবির ফলে সর্বস্ব হারিয়ে তিনি এসে পড়েছেন এই অজানা দ্বীপে। তার দুঃখের কথা শুনে সমবেদনা জানাল জেলেরা। তারা তাকে সাথে নিয়ে চলল নিজেদের বাড়িতে আশ্রয় দেবার জন্য। যেতে যেতেই পেরিক্লিস তাদের কাছে শুনতে পেলেন এই শহরের নাম পেন্টাপােলিস — এটি গ্রিসের অন্তর্গত। এর রাজার নাম সাইমোনাইডিস। সুশাসন আর বিচক্ষণতার জন্য প্রজারা তাকে আদর করে বলে মহান সাইমোনাইডিস। তার এক মেয়ে আছে— নাম থাইসা। সে যেমন রূপসি তেমনি গুণবতী।

জেলেদের কথা-বার্তায় সূত্র থেকেই পেরিক্লিস জানতে পারলেন আগামীকাল মেয়ে থাইসার জন্মদিন উপলক্ষে বিরাট এক উৎসবের আয়োজন করেছেন রাজা সাইমোনাইডিস। দূর দূর দেশ থেকে রাজা, রাজপুত্র আর নাইটরা এসে হাজির হবেন সেই উৎসবে। তাদের মধ্যে যিনি অস্ত্রবিদ্যায় পারদর্শিতা দেখাতে পারবেন, রাজকন্যা নিজে পুরস্কৃত করবেন তাকে। এ কথা শুনে খুবই দুঃখ পেলেন তিনি। ভাগ্য বিপর্যয় না হলে হয়তো এ উৎসবে তিনি আমন্ত্রিত হতেন।

কিছুক্ষণ বাদে জেলেদের মধ্যে একজন তার জালের মধ্য থেকে একটা জং-ধরা লোহার বর্ম বের করে সবাইকে দেখিয়ে বলল, সমুদ্রে মাছ ধরতে গিয়ে সে সেটা পেয়েছে। বর্মটার দিকে নজর পড়তেই চমকে উঠলেন পেরিক্লিস। ভালো করে সেটা নেড়ে-চেড়ে দেখে মনে মনে বললেন, আরে! এটাই তো আমার বাবার দেওয়া সেই বর্ম। বর্মটা দেবার সময় তিনি আমাকে বলেছিলেন, এই বর্মটা আমি তোকে দিয়ে গেলাম! বৰ্মটা যখন তুমি পরবে তখন এও আমার মতো তোমার প্রাণ বাচাবে। বাবার অন্তিম ইচ্ছানুযায়ী সব সময় এই বর্মটা পারতাম। ঝড়ের সময় এটা আমার কাছ থেকে হারিয়ে গেছে। দেখছি সমুদ্র এটা আমায় ফিরিয়ে দিয়েছে। যার জালে বর্মটা উঠেছে, পেরিক্লিস তার কাছে সেটা ভিক্ষে চাইলেন। তিনি জেলেকে বললেন, ভাই বর্মটা তুমি আমায় ভিক্ষে দাও। ওটা একসময় এক রাজার ছিল। ওটা পড়লে আমায় বড়ো লোকের মতো দেখাবে। তুমি আমায় রাজপ্ৰসাদের পথটা দয়া করে দেখিয়ে দাও। আমি কথা দিচ্ছি সময় সুযোগ এলে আমি অবশ্যই এর যোগ্য প্রতিদান দেব।

সেই জেলে বলল, তাহলে তুমি ঠিক করেছ রাজপ্রসাদে যে অস্ত্র প্রতিযোগিতা হবে তাতে তুমি যোগ দেবে?

তুমি ঠিকই ধরেছি! ওখানে অস্ত্ৰ প্ৰতিযোগিতায় আমি আমার পারদর্শিতা দেখাব, সায় দিয়ে পেরিক্লিস বললেন।

জেলে বলল, বেশ! সমুদ্রের অতল থেকে তুলে আনা এই বর্ম পরে যদি তোমার ভাগ্য ফেরে, তাহলে আমাদের কথা কিন্তু ভুলে যে ও না।

পেরিক্লিস বললেন, আমি কথা দিচ্ছি। তেমন সুদিন এলে আমি অবশ্যই তোমাদের কথা মনে রাখব। তবে শুধু বর্ম হলে তো হবে না, প্রতিযোগিতায় যোগ দিতে হলে একটা ঘোড়াও দরকার আমার।

পোশাক আর ঘোড়ার ব্যবস্থা আমরা করে দিচ্ছি। তুমি এবার তৈরি হও।

তোমরা যে আমার কী উপকার করলে তা আমি ভাষায় বোঝাতে পারব না, বললেন পেরিক্লিস, ঈশ্বর তোমাদের ভালো করুন।

এবার তার বাবার দেওয়া জং-ধরা লোহার বর্ম পরিধান করে জেলেদের জোগাড় করা তেজী ঘোড়ায় চেপে যথাসময়ে প্রতিযোগিতা ক্ষেত্রে উপস্থিত হলেন পেরিক্লিস। রাজার মেয়ে থাইসার জন্মদিন উপলক্ষে খুব সুন্দর করে সাজানো হয়েছে রাজপ্রাসাদের চারদিকটা। এ উপলক্ষে যে অস্ত্ৰ প্রতিযোগিতার আয়োজন করা হয়েছে তাতে যোগ দেবার জন্য দূর-দূরান্ত থেকে এসেছেন, রাজা, রাজপুত্র আর নাইটরা। প্রাসাদ প্রাঙ্গণের একদিকে বসেছেন তারা। বাইরে দাঁড়িয়ে তাদের ঘোড়াগুলির দেখভাল করছেন সহিসেরা। এতসব আয়োজন দেখে বল-ভরসা পেলেন পেরিক্লিস। প্রাসাদের বাইরে একটা খুঁটিতে ঘোড়াটাকে বেঁধে রেখে অভ্যাগতদের পাশে গিয়ে বসলেন তিনি। কিছুক্ষণ বাদে চড়া সুরে বেজে উঠল বাজনা। ধীর পায়ে কন্যা থাইসার হাত ধরে প্রাসাদ প্রাঙ্গণে এলেন রাজা সাইমোনাইডিস। তাদের অভ্যর্থনা জানাতে সমবেত অতিথিরা আসন ছেড়ে উঠে দাঁড়ালেন। প্রাসাদের একপাশে তৈরি হয়েছে একটা সুসজ্জিত মঞ্চ। সেখানে দুটি আসনে পাশাপাশি বসলেন তারা। সুন্দরী থাইসার পরনে ঢিলেঢালা রেশমের পোশাক, কানে-গলায় হাতে দুর্লভ হিরে মণিমুক্তাখচিত অলংকার। রাজা তার নিজ আসনে বসে সৌজন্য সহকারে হাত নাড়ার পর সবাই তার নিজ নিজ আসনে বসে পড়লেন।

এবার রাজার নির্দেশে শুরু হল ক্রীড়া প্রতিযোগিতা। স্পার্ট থেকে এসেছেন একজন নাইট যার ঢালের গায়ে আঁকা রয়েছে একটা ছবি আর উদ্ধৃতি। রাজা নিজে সেটা পড়ে শোনালেন মেয়েকে, তাতে লেখা — সেই তোমাকে প্রকৃত ভালোবাসে যে তোমারা জন্য প্ৰাণ দিতে পারে। এরপর এলেন। দ্বিতীয় নাইট যিনি আদতে ম্যাসিডনের রাজপুত্র। তিনি দেখালেন কীভাবে নারীর কাছে হেরে গেলেন একজন নাইট।

এরপর কয়েকজন নাইট একে একে মঞ্চে উঠে তাদের খেলা দেখালেন। সব শেষে এলেন পেরিক্লিস — তিনি হলেন ক্রীড়া প্রতিযোগিতার ষষ্ঠ নাইট। তাকে চিনতে না পারলেও তার আচার-আচরণ তার গভীর ব্যক্তিত্বের প্রভাবে তার প্রতি আকৃষ্ট হলেন রাজা সাইমোনাইডিস।

পেরিক্লিসকে দেখে মন্তব্য করলেন রাজকুমারী থাইস – এ নাইটকে দেখে মনে হচ্ছে ইনি যেন একটা শুকিয়ে যাওয়া গাছ, যার মাথায় কোনওমতে টিকে আছে কয়েকটা সবুজ পাতা।

মেয়ের কথা কানে যেতেই বলে উঠলেন রাজা, একে দেখেই বুঝতে পারছি চরম দুৰ্দশার মাঝেও কঠোর সংগ্রাম করে বেঁচে আছেন ইনি। তোমার সাহায্যে তার দুর্ভাগ্যকে জয় করার আশা নিয়েই এ প্রতিযোগিতায় যোগ দিতে এসেছেন ইনি।

একজন সভাসদ আবার আড়াচোখে পেরিক্রিসের দিকে তাকিয়ে ব্যঙ্গের সাথে মন্তব্য করলেন, দেখে তো মনে হয় না। কখনও যুদ্ধে গেছেন। লোকটা একেবারে কাণ্ডজ্ঞানহীন।

সভাসদদের কথা শুনে রাজা সাইমোনাইডিস বলে উঠলেন, বাইরের চেহারা দেখে কাউকে। বিচার করার অর্থ নিছক বোকামি ছাড়া আর কিছু নয়। যাই হোক, সবাই এসে গেছেন, আশা করি আপনারা এবার সংযত হবেন। চলুন, গ্যালারিতে যাই আমরা।

নিজের নির্দিষ্ট আসনে গিয়ে বসলেন রাজা সাইমোনাইডিস। তার পাশের আসনে বসলেন। রাজকুমারী থাইসা। অভাগত সবাই যে যার আসনে গিয়ে বসলেন। এবার অভ্যাগতদের খুঁটিয়ে দেখতে শুরু করলেন রাজা। খানিকবাদে তার নজর পড়ল পেরিক্লিসের উপর। দুঃখ-দুৰ্দশার চাপে তাকে ক্লান্ত দেখালেও বীরের মতো ব্যক্তিত্ব আর রাজার মতো সুন্দর মুখশ্ৰী ভীষণভাবে আকৃষ্ট করল রাজাকে।

দূর থেকেইশারায় পেরিক্লিসকে দেখিয়ে রাজা চাপা স্বরে তীর মেয়েকে বললেন, ওই যুবকও যে আজকের অস্ত্ৰ প্ৰতিযোগিতায় যোগ দিয়েছিল সে কথা বেশ মনে আছে আমার। আমি বুঝতে পারছি না। এত আনন্দের মাঝেও কেন ওকে এত বিযগ্ন দেখাচ্ছে! মনে হয় আমাদের কোনও আচরণে হয়তো উনি দুঃখ পেয়েছেন। যাই হোক, তুমি এক কাজ কর। তুমি নিজে একপাত্র সুস্বাদু সুরা নিয়ে গিয়ে ওকে পরিবেশন কর। সেই সাথে ওর নাম, পরিচয় সবকিছু জেনে নিও।

রাজার নির্দেশে একপােত্র সুস্বাদু সুরা নিয়ে গিয়ে নিজ হাতে তা পেরিক্লিসকে পরিবেশন করলেন থাইসা-সেই সাথে জানাতে চাইলেন তার নাম-ধাম ও পরিচয়! হাসিমুখে থাইসার দেওয়া সুরা হাতে নিয়ে পেরিক্লিস বললেন, আমার নাম পেরিক্লিস। আমি টায়ার রাজ্যের এক সন্ত্রান্ত বংশের সন্তান। সবরকম কলা এবং যুদ্ধবিদ্যায় পারদর্শী আমি। একদল যাত্রীর সাথে সমুদ্রপথে এক দুঃসাহসিক অভিযানে পাড়ি দিয়েছিলাম আমি। প্রচণ্ড ঝড়ের তাণ্ডবে জাহাজ ডুবি হয়ে সমুদ্রের অতলে তলিয়ে গেছে সবাই। করুণাময় ঈশ্বরের কৃপায় একমাত্র আমিই ভাসতে ভাসতে এ দেশের উপকূলে এসে পড়েছি।

রাজকুমারী থাইসা খুবই দুঃখ পেলেন পেরিক্লিসের ভাগ্য-বিড়ম্বনার কথা শুনে। ফিরে এসে বাবাকে বললেন, বাবা! উনি টায়ার রাজ্যের এক সম্রাস্ত বংশের সন্তান— নাম পেরিক্লিস। সব রকম কলা এবং যুদ্ধবিদ্যায় পারদশী উনি। ঝড়ের দাপটে জাহাজ ডুবি হয়ে সবাই সমুদ্রের অতলে। ডুবে গেছে। একমাত্র উনিই ভাসতে ভাসতে আমাদের দেশের উপকূলে এসে পৌঁছেছেন। মেয়ের মুখে সবকিছু শুনে রাজাও খুব দুঃখ পেলেন। তিনি মেয়েকে কথা দিলেন যে ভাবেই হোক পেরিক্রিসের দুঃখ-দুৰ্দশা মোচন করবেন। এবার অতিথিদের মনোরঞ্জনের জন্য রাজার অনুরোধে সবাই মহিলাদের সাথে নিয়ে শুরু করলেন সৈনিক নৃত্য। রাজা নিজেও যোগ দিলেন নাচের আসরে। কিছুক্ষণ বাদে পেরিক্লিসের সামনে রাজা বললেন, আমি তো শুনেছি টায়ারের লোকেরা মেয়েদের সাথে ভালো নাচতে পারে। খুব খুশি হব। আপনি যদি আমাদের সাথে নাচে যোগ দেন। রাজার অনুরোধ এড়াতে না পেরে পেরিক্লিসও মহিলাদের সাথে নাচতে শুরু করলেন। অনুষ্ঠান শেষে পেরিক্লিসের নাচের ভূয়সী প্রশংসা করে সবাইকে সেদিনের মতো বিশ্রাম নিতে বলে চলে গেলেন রাজা।

এবারে নজর ফেরানো যাক পেরিক্রিসের নিজ রাজ্য টায়ারের ঘটনাবলির দিকে। আগেই বলা হয়েছে নিজ রাজ্য ছেড়ে অজানার পথে পাড়ি দেবার আগে তিনি শাসনভার সাপে দিয়ে এসেছিলেন তাঁর মন্ত্রী হেলিকেনাসের উপর। হেলিকেন্যাস তার দায়িত্ব নিখুঁতভাবে পালন করলেও রাজা কোথায় আছেন, কবে ফিরবেন—এজাতীয় প্রশ্নের মুখোমুখি প্রায়ই হতে হয় তাকে! একদিন প্রাসাদের সভাকক্ষে এসকেন নামক জনৈক সভাসদ ওই জাতীয় প্রশ্ন করলেন তাকে; কথায় কথায় সেদিন নানা প্রসঙ্গ উঠল। হেলিকেন্যাস সভাসদদের জানালেন যে অ্যান্টিওকের ব্যভিচারী রাজা ও তার মেয়ে উভয়েই বাজ পড়ে মারা গেছে। কিছুদিন আগে অ্যান্টিওকাস নাকি তার মেয়েকে নিয়ে রথে চেপে কোথাও যাচ্ছিলেন। সে সময় তাদের উপর বাজ পড়ে — ছিড়ে টুকরো টুকরো হয় তাদের দেহ। এভাবেই নিজেদের পাপের সাজা পেলেন তারা। হয়তো ঈশ্বর এ ভাবেই পাপীকে শাস্তি দেন। হেলিকেনাসের কথা শুনে আশ্চর্য হয়ে গেলেন এসকেন। তিনি স্বপ্নেও ভাবেননি এভাবে পাপিষ্ঠ রাজাকে শাস্তি দেবেন। ঈশ্বর। এর পরই অন্যান্য সভাসদর রাজা পেরিক্লিস কোথায় আছেন? তিনি ফিরে আসবেন কিনা?-এ জাতীয় প্রশ্ন করে বিব্রত করে তুলতে লাগলেন হেলিকেন্যাসকে। অনেকে আবার এও বললেন রাজা পেরিক্লিস আর বেঁচে নেই এবং সে কথা ইচ্ছে করেই তাদের জানাননি হেরিকেনাস। তাদের বক্তব্য, এই যদি প্রকৃত পরিস্থিতি হয় তাহলে হেলিকেন্যাস যেন টায়ারের সিংহাসনে বসে রাজ্যশাসনের ভার নিজ হাতে তুলে নেন। তারা হেলিকেন্যাসকে আশ্বাস দিলেন যে তিনি সিংহাসনে বসলে সবাই তার আনুগত্য স্বীকার করে সৰ্ব্বতোভাবে সাহায্য করবেন তাঁকে।

কিন্তু সিংহাসনে বসতে মোটেই আগ্রহী নন হেলিকেন্যাস। তিনি সবিনয়ে সভাসদদের প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান করে বললেন যারা রাজা পেরিরিকসকে সত্যিই ভালোবাসেন, তারা যেন দেশ এবং রাজার স্বার্থ রক্ষার জন্য অন্তত এক বছর ধৈর্য ধরে অপেক্ষা করেন। যদি এই সময়ের মধ্যে রাজা পেরিক্লিস ফিরে না আসেন, তাহলে নিজের অনিচ্ছাসত্ত্বেও এই বয়সে রাজ্য শাসনের ভার নিজের হাতে তুলে নেবেন তিনি। সভাসদদের এটা পছন্দ না হলে তারা নিজেদের ইচ্ছেমতো একজনকে বেছে নিয়ে তার হাতে টায়ারের শাসনভার তুলে দিতে পারেন। তিনি তাদের এও বললেন তাদের প্রিয় রাজা পেরিক্লিস মারা গেছেন বলে যারা ধারণা করছেন, তেমন কোনও দুর্ঘটনার কথা জানা নেই তার।

হেলিকেনাসের কথা শেষ হতেই সভাসদরা একবাক্যে জানালেন তারা তার মত অনুযায়ী চলতে ইচ্ছক, তারাও তার মতো ভালোবাসেন রাজাকে। একথা জেনে হেলিকেন্যাস আশ্বস্ত হলেন যে তার উপর সভাসদদের আস্থা আগের মতেই অটুট আছে।

রাজা সাইমোনাইডিস বসে রয়েছেন তাঁর পেন্টাপলিসের রাজপ্ৰসাদে। তাঁর আমন্ত্রণে দেশ বিদেশ থেকে যে সব রাজা, রাজপুত্র আর নাইটরা এসেছেন, তারা সবাই জানেন তাদেরই একজনের সাথে রাজকুমারীর বিয়ে দেবেন। রাজা। হঠাৎ সে সময় রাজকুমারী থাইস। তাঁর বাবাকে চিঠি লিখে জানালেন যে বাবার পছন্দমতো কাউকে বিয়ে করা এ মুহূর্তে তাঁর পক্ষে সম্ভবপর নয়। এর পাশাপাশি থেইসা কাকে বিয়ে করতে চান সে কথাও জানিয়েছেন বাবাকে। মেয়ের লেখা চিঠিটা পেয়ে খুবই চিন্তিত হয়ে পড়েছেন রাজা।

সকালবেলা প্রাসাদে বসে মেয়ের লেখা চিঠিটা মন দিয়ে পড়ছিলেন রাজা, সেই সময় থেইসাকে বিয়ে করতে ইচ্ছক নাইটেরা এলেন রাজার কাছে তাদের দেখে চিঠি থেকে মুখ তুলে রাজা বললেন, মাননীয় নাইটগণ! আমি খুব দুঃখিত যে আমার মেয়ে থাইসা বিয়ের ব্যাপারে তার মত পালটিয়েছে। সে বলেছে আগামী এক বছরের মধ্যে সে কাউকে বিয়ে করতে পারবে না। আমি অনেক চেষ্টা করেও তার এই আকস্মিক পরিবর্তনের কারণ জানতে পারিনি?

নাইটদের মধ্যে একজন বললেন, আমরা কি একবার রাজকুমারীর সাথে দেখা করতে পারি?

গম্ভীর স্বরে রাজা সাইমোনাইডিস বললেন, আমি দুঃখিত মাননীয় নাইট, থেইসা তার নিজের মহলে নিজেকে এমন ভাবে আটকে রেখেছে যে কারও পক্ষে তার সাথে দেখা করা সম্ভব নয়। দেবী সিনথিয়ার নামে সে শপথ নিয়েছে ডায়নার মতো আগামী এক বছর কুমারী জীবন কাটাবে সে। দেহ মনের সমস্ত শক্তি দিয়ে এই শপথ পালন করবে সে।

রাজার কথা শুনে বিষন্ন মনে যে যার দেশে চলে গেলেন নাইটেরা। তারা সবাই চলে যাবার পর রাজা পুনরায় খুঁটিয়ে পড়তে লাগলেন মেয়ের চিঠিটা। চিঠির শেষে মেয়ে লিখেছে বিয়ে যদি করতেই হয় তাহলে টায়ার থেকে পেরিক্লিস নামে যে নাইট এসেছেন তাকেই বিয়ে করবেন তিনি। নইলে বাকি জীবন চোখে কালো কাপড় বেঁধে কাটাবেন যাতে সূর্যের আলো বা পর পুরুষের মুখ দেখতে না হয়।

তার পছন্দের মানুষটিকেই মেয়ে বিয়ে করতে চায় জেনে খুশি হলেন রাজা সাইমোনাইডিস। সত্যি কথা বলতে কী, গতরাতে তার নাচ-গান শুনে তিনি নিজেই পেরিক্লিসকে তার জামাতার আসনে বসিয়েছেন। থাইসা আর পেরিক্লিস যে একে অপরকে ভালোবাসে তা বুঝতে বাকি রইল না রাজার। তবুও তাদের ভালোবাসা যে কতটা খাঁটি তা যাচাই করে নিতে চাইলেন তিনি। এর ঠিক কিছুক্ষণ বাদেই সেখানে এসে হাজির হলেন পেরিক্লিস। রাজা প্রথমে তার নাচ-গানের প্রশংসা করে থাইসা সম্পর্কে তার অভিমত জানতে চাইলেন। থাইসার রূপ গুণ, দুয়েরই প্রশংসা করলেন পেরিক্লিস। তখন রাজা তাকে দেখালেন। থাইসার লেখা চিঠিটা।

চিঠিটা পড়ে খুবই আশ্চর্য হয়ে গেলেন পেরিক্লিস। এত সব নাইটদের ছেড়ে থাইসা যে কেন তাকে বিয়ে করতে পাগল হয়ে উঠেছে তা কিছুতেই বুঝতে পারলেন না তিনি। সেই সাথে তার মনে হল নিশ্চয়ই সাইমোনাইডিসের কুনজর পড়েছে তার উপর। তবুও চুপচাপ না থেকে তিনি খোলাখুলিভাবে রাজাকে জানালেন যে তিনি অন্তর থেকে শ্রদ্ধা করেন তার মেয়েকে। তাকে ভালোবাসার মতো দুঃসাহস তার নেই। রাজা বুঝতে পারলেন। থাইসার চিঠি পড়ে খুবই ঘাবড়ে গেছেন পেরিক্লিাস। তাকে আরও একটু যাচাই করে নেবার জন্য তিনি পেরিক্লিসকে শয়তান বলে অভিহিত করলেন। তিনি আরও বললেন ডাইনি বিদ্যার সাহায্যে সে তার মেয়েকে বশ করেছে। এর জবাবে ঈশ্বরের নামে শপথ নিয়ে পেরিক্লিস বললেন যে রাজার অভিযোগ সম্পূর্ণ মিথ্যে। এমন কোনও কাজ করেননি তিনি।

পেরিক্লিসের প্রতিবাদ সত্ত্বেও রাজা তাকে বিশ্বাসঘাতক বললেন। তিনি আরও বললেন নিজের সম্পর্কে যে যা কিছু বলেছে তা সর্বৈব মিথ্যে। রাজা তাকে বিশ্বাসঘাতক, মিথ্যেবাদী বলায় রাগে জুলে উঠলেন পেরিকিস। তিনি আরও বললেন সাইমোনাইডিস রাজা না হলে তিনি তাকে বাধ্য করতেন। ওইসব গালি-গালাজ ফিরিয়ে নিতে।

তাঁর উদ্দেশ্য সফল হয়েছে দেখে খুশি হলেন রাজা সাইমোনাইডিস। পেরিক্লিস যে সৎসাহসী তাতে কোনও সন্দেহ নেই তার। কিন্তু নিজের মনোভাব বাইরে প্রকাশ করলেন না তিনি। অনুচর পাঠিয়ে তিনি ডেকে আনলেন। থাইসাকে। মেয়ে সামনে এসে দাঁড়াতে তিনি তার মনোভাবও যাচাই করতে চাইলেন। তিনি মেয়েকে বললেন তার অমতে পেরিক্রিসের মতো একজন অচেনা অজানা বিদেশি যুবককে ভালোবেসে খুব অন্যায় করেছে সে। এজন্য তার প্রতি তিনি অসন্তুষ্ট হয়েছেন।

এভাবে পেরিক্লিসের সামনে বাবার বকুনি খেয়ে খুবই লজ্জা পেলেন থাইসা। তিনি চুপচাপ মুখ নিচু করে দাঁড়িয়ে রইলেন। থাইস। থাইসার অবস্থা দেখে আর চুপ করে থাকতে পারলেন না পেরিক্লিস। তিনি থাইসাকে বললেন, তুমি একজন সুন্দরী গুণবতী নারী। কিন্তু তা সত্ত্বেও অমি তোমায় প্রকাশ্যে প্রেম নিবেদন করিনি। কেন তুমি এ কথাটা বাবাকে বুঝিয়ে বলতে পারছি না?

তার কথার জবাবে থাইস বললে, আপনি যদি আমাকে প্ৰেম নিবেদন করেও থাকেন এবং তার ফলে আমি যদি আনন্দ পেয়ে থাকি, তাতে অন্যায় বা দোষণীয় কী আছে?

থাইসার জবাব শুনে চমকে উঠলেন পেরিক্লিস। রাজা বুঝতে পারলেন তাঁর মেয়ে সত্যিই ভালোবাসে পেরিক্লিসকে। এ অবস্থায় তাদের বাধা দেওয়া বৃথা। ভেতরে ভেতরে খুব খুশি হলেও বাইরে রাগ দেখিয়ে বললেন রাজা, এবার বিয়ে দিয়ে তোমাদের মনের আশা পূর্ণ করব। বিয়েতে তোমরা রাজি আছ তো?

তাঁরা দুজনে একসাথে বললেন, আমরা রাজি আছি। এবার আপনি খুশি হলেই সব দিক পূর্ণ হয়।

রাজা সাইমোনাইডিস বললেন, আমি সত্যিই খুশি হয়েছি। এবার তাড়াতাড়ি তোমাদের বিয়েটা দিয়ে দিই। তোমরা সুখে-স্বচ্ছন্দে এ প্রাসাদে বাস কর।

রাজার উদ্যোগে অল্প কয়েকদিনের মধ্যেই বিয়ে হল থাইসা আর পেরিক্লিসের। রাজার ইচ্ছায় তাঁরা প্রাসাদেই দাম্পত্য জীবন কাটাতে লাগলেন। পুরো একবছর না যেতেই গর্ভবতী হলেন থাইস।

 

পেরিক্রিসের নিজ রাজ্য টায়ারের অবস্থা কিন্তু ওদিকে ঘোরালো। এক ধরনের ক্ষোভ আর হতাশা জমাট বেঁধে উঠেছে রাজ্যের মন্ত্রী, সভাসদ আর অমাত্যদের মনে। রাজার দীর্ঘ অনুপস্থিতি আর তার কারণ জানতে চাইলে মন্ত্রী হেলিকেনাসের সদুত্তরের বদলে কেমন একটা গা-ছাড়া ভাব- এসব দেখে দেখে ক্ৰমেই তাদের সহ্যের সীমা ছাড়িয়ে যাচ্ছে। নানা রকম সন্দেহ জাগছে তাদের মনে। এভাবে কিছুদিন কাটাবার পর একদিন তাঁরা সবাই এসে হাজির হলেন হেলিকেনাসের কাছে। রাজা পেরিক্রিসের ব্যাপারে নানারূপ প্রশ্নে ব্যতিব্যস্ত করে তুললেন তাকে। তাদের সবারই এক কথা-রাজা পেরিক্রিসের খোজ না পাওয়া পর্যন্ত শাস্ত হবেন না তারা। তারা এও বললেন এভাবে রাজসিংহাসন শূন্য রেখে রাজ্যশাসন করাটা তাঁরা মেনে নিতে পারছেন না।

সভাসদদের মনোভাব বুঝতে পেরে হেলিকেন্যাস বললেন, আমি জানি আপনাদের ক্ষোভের সঙ্গত কারণ আছে! আপনারা জেনে রাখুন এবারে সময় হয়েছে তাকে ফিরিয়ে আনার। পৃথিবীর যে প্রান্তেই তিনি থাকুন না কেন, তাকে ফিরিয়ে এনে টায়ারের শূন্য সিংহাসনে বসানোই আমাদের প্ৰতিজ্ঞা। আপনারা এও জেনে রাখুন। যদি তাকে খুঁজে না পাওয়া যায়, তাহলে আপনারা নিজেদের মধ্যে পরামর্শ করে যে কোনও সভাসদকে রাজসিংহাসনে বসাতে পারেন। হেলিকেনাসের আশ্বাস, পেয়ে তখনকার মতো চলে গেলেন মন্ত্রী ও সভাসদরা। তিনি বুঝতে পারলেন এবার আর অপেক্ষা করার সময় নেই। যে করেই হোক ফিরিয়ে আনতে হবে রাজা পেরিক্লিসকে। তিনি সবকিছু জানিয়ে একটা চিঠি লিখে দূত মারফত পেন্টাপোলিসে পাঠিয়ে দিলেন।

চিঠি নিয়ে টায়ারের দূত এসে উপস্থিত হলেন পেন্টাপোলিসের রাজপ্রাসাদে। রাজা সাইমোনাইডিসের সাথে দেখা করে তিনি তাকে বললেন যে তাদের প্রিয় রাজা পেরিক্লিসের জন্য তিনি কিছু বার্তা নিয়ে এসেছেন। সসম্মানে দূতকে বসতে বলে তিনি পেরিক্লিসকে খবর পাঠালেন রাজসভায় আসার জন্য। সে সময় পেরিক্লিস তখন অস্তঃপুরে তার স্ত্রী থাইসার সাথে কথা বলে সময় কাঁটাচ্ছিলেন। হেলিকেনাসের দূত এসেছেন শুনে তিনি চলে এলেন রাজসভায়। তাঁকে আসতে দেখে টায়ারের দূত তার নিজের আসন ছেড়ে উঠে তাকে যথারীতি অভিবাদন জানিয়ে

হেলিকেনাসের চিঠি পড়ে তিনি জানতে পারলেন রথের উপর বাজ পড়ে মারা গেছেন পাপিষ্ঠ রাজা অ্যান্টিওকাস আর তার মেয়ে। তিনি এও জানতে পারলেন তার দীর্ঘ অনুপস্থিতির দরুন হেলিকেনাসের শাসন আর মানতে চাইছে না। টায়ারের মন্ত্রী আর সভাসদরা এবং তার খোজ না পেলে হেলিকেন্যাস বাধ্য হবেন সভাসদদের কাউকে সিংহাসনে বসাতে। হেলিকে নাসের কথার উত্তরে পেরিক্লিাস তাকে জানিয়ে দিলেন শীঘ্রই তিনি টায়ারে ফিরে যাবেন। রাজা সাইমোনাইডিসকে অভিবাদন জানিয়ে পেরিক্লিসের চিঠি নিয়ে টায়ারের দূত ফিরে গেল তার নিজ রাজ্যে।

দূত চলে যাবার পর রাজা সাইমোনাইডিসকে সবকিছু জানিয়ে পেরিক্লিস বললেন রাজসিংহাসন এবং দেশের স্বার্থরক্ষার জন্য তার অবিলম্বে টায়ারে ফিরে যাওয়া প্রয়োজন। পেরিক্রিসের দুঃসময়ের অবসান হয়েছে জেনে সাইমোনাইডিস আর আপত্তি করলেন না। এমনকি থাইসা গর্ভবতী জেনেও তিনি তাকে যাবার অনুমতি দিলেন। পরদিন এক শুভ সময়ে পেরিক্রিসের সাথে জাহাজে চেপে টায়ার অভিমুখে রওনা হলেন থাইসা। রাজা সাইমোনাইডিসের নির্দেশে গর্ভবতী থাইসার দেখাশোনার জন্য তার সঙ্গী হল ধাত্রী লাইকোরিডা।

পেন্টাপোলিস বন্দর ছেড়ে সমুদ্রপথে যাত্রা করে একসময় পেরিক্লিসের জাহাজ এসে পৌছােল মাঝসমুদ্রে। খানিক বাদে ঈশান কোণে দেখা দিল একটুকরো ঘন কালো মেঘ। দেখেই গভীর হয়ে গেল মাঝিমাল্লাদের মুখ। দেখতে দেখতে সেই একটুকরো কালো মেঘ ছেয়ে ফেলল। সারা আকাশ। মেঘের আড়ালে ঢাকা পড়ে গেল উজ্জ্বল সূর্য। শুরু হয়ে গেল প্রচণ্ড ঝড়-বৃষ্টি। এই প্রাকৃতিক গোলযোগের মধ্যেই জাহাজের কেবিনে থাইসা জন্ম দিলেন এক কন্যা-সন্তানের। মেয়েকে দেখাবার জন্য তাকে পেরিক্রিসের কাছে নিয়ে এলেন ধাত্রী লাইকোরিডা। আর তার কাছেই শুনলেন পেরিক্লিসএর কন্যার জন্ম দিতে গিয়ে মারা গেছেন, থাইসা। ধাত্রী জানালেন গর্ভবতী হবার পরই অসুস্থ হয়ে পড়েছিলেন থাইসা। ঝড়ের দাপট আর জাহাজের বাকুনি সহ্য করতে পারেননি তিনি।

থাইসার মৃত্যু-সংবাদ শুনে কান্নায় ভেঙে পড়লেন পেরিক্লিস। তিনি মনে মনে ভাবলেন কেন যে ঈশ্বর তাকে থাইসার মতো একজন সুন্দরা গুণবতী স্ত্র দিয়ে আবার তাকে ফিরিয়ে নিলেন। — এ প্রশ্ন নিজেকে করলেন তিনি। এখন কেইবা স্তন্যপান করিয়ে এই ফুলের মতো শিশুটিকে বড়ো করে তুলবে? সমুদ্রে জন্মেছে বলে পেরিক্লিস মেয়ের নাম রাখলেন মেরিনা।

ওদিকে ঝড়ের দাপট কিন্তু তখনও সমানে চলছে। সে সময় দু-জন নাবিক এসে বলল জাহাজে মৃতদেহ থাকার দরুন প্রকৃতির আক্রোশ কমছে না। মৃতদেহ সমুদ্রে ফেলে দিলেই সমূদ্র আবার শান্ত হয়ে উঠবে। পেরিক্লিস তাদের বোঝাতে চাইলেন এ নিছক কুসংস্কার। জাহাজ ডাঙায় ভিড়লেই তিনি মৃতদেহ সমাধিস্থ করবেন। তিনি বললেন নাবিকেরা যেন ততক্ষণ পর্যন্ত ধৈর্য ধরে অপেক্ষা করেন। কিন্তু তার অনুরোধে কোনও কাজ হল না।

দল বেঁধে নাবিকেরা বারবার এসে বলতে লাগল। মাঝসমুদ্রে ঝড় ওঠার পর যদি কোনও নাবিক বা যাত্রী মারা যায়, তাহলে তাকে সমূদ্রে ফেলে দেওয়াই প্রচলিত রীতি। তাদের বিশ্বাস রানির মৃতদেহ সমুদ্রে ফেলে দিলেই ঝড় থেমে যাবে।

পেরিক্লিস বুঝতে পারলেন হাজার চেষ্টা করেও তিনি এদের বোঝাতে পারবেন না। তার চোখের সামনেই প্রিয়তমা স্ত্রীর মৃতদেহ এরা সমুদ্রে ফেলে দেবে আর হিংস্র হাঙ্গর এসে তাটুকরো টুকরো করে তাকে খাবে। তিনি আক্ষেপ করে বলতে লাগলেন, হায় ঈশ্বর! স্ত্রীর মৃতদেহ সমাধিস্থ করার মতো জায়গািটুকুও তুমি আমায় দিলে না? শেষমেশ অনেক কষ্টে নিজেকে সামলিয়ে নিয়ে স্ত্রীর মৃতদেহসমুদ্রে ফেলে দেবার আদেশ দিলেন নাবিকদের। তারা একটা বড়ো বাক্স নিয়ে এসে তার ভেতর সুন্দর করে বিছানা পেড়ে গুইয়ে দিল থাইসার মৃতদেহ। ধাত্রী লাইকোরিডা সুগন্ধী ছিটিয়ে দিল বাক্সর ভেতর। এরপর পুরু কৰ্ক দিয়ে বাক্সের মুখটা এটে নাবিকেরা সেটা ফেলে দিল উত্তাল সমুদ্রের জলে। তা দেখে কান্নায় ভেঙে পড়লেন পেরিক্লিস। এ দৃশ্য সইতে না পেরে অন্যদিকে মুখ ফিরিয়ে নিলেন তিনি।

সত্যি সত্যিই মৃতদেহ জলে ফেলে দেবার পর শান্ত হয়ে গেল সমুদ্র। নাবিকদের কাছে তিনি জানতে পারলেন জাহাজ এসে পৌঁছেছে। থার্সাসের উপকূলে। থার্সাসের নাম শুনে উৎসাহিত হয় উঠলেন পেরিক্লিস। তিনি স্থির করলেন। থার্সাসের শাসক ক্লিওনের উপর তিনি মেয়ে মেরিনার লালন-পালনের ভার দিয়ে যাবেন। এতদিন বাদে উপকারী বন্ধুকে দেখে খুব খুশি হলেন ক্লিওন আর তার স্ত্রী ডাইওনিজা। সেই সাথে তারা চরম দুঃখ পেলেন যখন পেরিক্লিসের কাছে শুনলেন তার স্ত্রী থাইসা মারা গেছেন। জন্ম-মৃত্যু সবই বিধির বিধান। কারও হাত নেই তাতে। তারা পেরিক্লিসকে বোঝালেন যা ঘটেছে তা মেনে নিতে। তখন একমাত্র কাজ শিশুকন্যা মেরিনাকে বড়ো করে তোলা। তখন পেরিক্লিস বললেন বহুদিন বাদে দেশে ফিরে যাচ্ছেন তিনি। রাজ্য পরিচালনার পাশাপাশি মেয়ের প্রতি নজর রাখা তীর পক্ষে সম্ভব হবে না। তিনি মেয়েকে বড়ো করার ভার দিতে চান ক্লিওন আর তার স্ত্রী ডাইওনিজার হাতে।

এ কথা শুনে পেরিক্লিসকে আশ্বাস দিয়ে ক্লিওন বলে উঠলেন, এতো খুব আনন্দের কথা। অল্প কিছুদিন আগে আমার স্ত্রী ডাইওনিজও একটি কন্যাসন্তানের জন্ম দিয়েছে। আমরা তার নাম রেখেছি ফিলোটিনা। আপনার মেয়ের সমবয়সি। আমাদের কাছে মেরিনা থাকলে যেমন মাতৃস্নেহ পাবে তেমনি পাবে বোনের স্নেহ-ভালোবাসা। নিজের মেয়ের মতো একই রকম শিক্ষা দিয়ে আমরা তাকে বড়ো করে তুলব। এখন মেরিনা আমাদের কাছেই থাকি; একটু বড়ো হলে না হয়। আপনি ওকে নিয়ে যাবেন। আশা করি ততদিনে ওর লেখা-পড়া, নাচ-গান, কলাবিদ্যা শেখা অনেকটাই এগিয়ে থাকবে। আমার স্ত্রী কাছে থাকলে মাতৃহারা মেরিনা তার মায়ের অভাবও বোধ করবে না। মেয়েকে আমাদের হাতে সঁপে দিয়ে আপনি নিশ্চিন্ত মনে টায়ারে ফিরে যান পেরিক্লিাস। সেখানে আপনার অপেক্ষায় রয়েছে সবাই।

ক্লিওনের কথা শুনে আশ্বস্ত হলেন পেরিক্লিস। তিনি মেরিনাকে ক্লিওন এবং তার স্ত্রীর হাতে সঁপে দিয়ে নিশ্চিন্ত মনে টায়ারে ফিরে গেলেন। ধাত্রী লাইকোরিডা কোনওমতেই রাজি হল না। মেরিনাকে ছেড়ে থাকতে। সেও রয়ে গেল থার্সাসে।

 

ওদিকে সত্যি সত্যি থাইসা কিন্তু মারা ধাননি। আসলে প্রসবের পর তিনি দুর্বল হয়ে পড়েছিলেন। তার উপর প্রচণ্ড ঝড়ের তাণ্ডব তার ঘন ঘন বাজ পড়ার আওয়াজ শুনে তিনি মানসিক স্থিতি হারিয়ে অজ্ঞান হয়ে পড়েন। অনেকক্ষণ ধরে অজ্ঞান হয়ে পড়ে থাকার দরুন মাঝি-মাল্লারা ধরে নিয়েছিল তিনি মারা গেছেন। তাই সমুদ্রের রীতি অনুযায়ী তারা তাকে বাক্সে পুরে সমুদ্রের জলে ফেলে দেয়। অনেকক্ষণ ধরে জলের মধ্যে থাকার পর শেষ রাতের দিকে তার অচেতন অবস্থা কেটে যায়, স্বাভাবিক মানুষের মতোই ঘুমোতে থাকেন তিনি। ঘুমন্ত থাইসাকে নিয়ে ভাসতে ভাসতে সেই কাঠের বাক্সটি এসে ঠেকল এফিসাসের উপকূলে। শেষ রাতে স্থানীয় কিছু জেলে মাছ ধরতে গিয়েছিল সমুদ্রে। বাক্সটিকে জলে ভাসতে দেখে তারা সেটিকে তুলে নেয় নৌকায়। কৌতূহলের বশে বাক্সের ঢাকনা খুলে দেখতে পায় থাইসাকে। তার নাকের কাছে হাত নিয়ে দেখে স্বাভাবিক শ্বাস বইছে। উপকূলের খুবু কাছে থাকেন সেরিমন নামে রাজসভার এক জ্ঞানী সভাসদ। তিনি খুবই পরোপকারী। কারও অসুখ-বিসুখ হলে লোক-জন তার কাছেই ছুটে আসে। তিনিও সাধ্যমতো চিকিৎসা করে তাদের সুস্থ করে তোলেন। জেলেরা কাঠের বাক্সটি নিয়ে এল। তার কাছে। সেরিমন বাক্সের ঢাকনাটি খুলে থাইসকে বের করে বিছানার উপর শুইয়ে দিলেন। থাইসার পরনে মৃতদেহ সমাধিস্থ হবার পোশাক আর বাক্সের ভেতর নানারূপ সুগন্ধী শেকড়-বাকড় দেখে সেরিমন অনুমান করলেন যুবতিটি নিশ্চয়ই জাহাজে চেপে কোথাও যাচ্ছিলেন। কোনও কারণে সে পথিমধ্যে অসুস্থ হয়ে জ্ঞান হারিয়ে ফেলে। বহুক্ষণ জ্ঞান ফিরে না। আশায় সমুদ্রের রীতি অনুযায়ী মাঝি-মাল্লারা তার দেহে সমাধি দেবার পোশাক পরিয়ে বাক্সে পুরে জলে ফেলে দেয়। বাক্সের ভিতর একটি কৌটো দেখে কৌতূহলী হয়ে সেরিমন সেটা খুলে দেখলেন তাতে রয়েছে একটা গোটানো কাগজ আর হিরের আংটি। কাগজটা খুলে দেখলেন তাতে গোটা গোটা অক্ষরে চিঠির মতো কী যেন একটা লেখা রয়েছে। কাগজটা চোখের সামনে নিয়ে সেরিমন সেটা পড়তে লাগলেন। তাতে লেখা রয়েছে —এই মৃতদেহটি যার চোখে পড়বে সেই ব্যক্তির উদ্দেশে আমিটায়ারের রাজা পেরিক্লিস জানাচ্ছি যে মৃতদেহটি আমার স্ত্রী রানি থাইসার। সমুদ্রযাত্রার সময় প্রচণ্ড ঝড়-বৃষ্টির দরুন তার মৃত্যু হয়েছে। সমুদ্রের রীতি অনুযায়ী মাঝি-মাল্লারা তার দেহ বাক্সে পুরে জলে ফেলে দেয়। কৌটোর ভিতর একটি হিরের আংটি রয়েছে। যিনি এই মৃতদেহটি পাবেন তাঁর কাছে অনুরোধ তিনি যেন আংটিটি বেচে সেই অর্থ দিয়ে রানিকে সমাধিস্থ করার ব্যবস্থা করেন…।

চিকিৎসাশাস্ত্র নিয়ে চর্চা করার দরুন দ্রব্যগুণ সম্পর্কে যথেষ্ট জ্ঞান আছে সেরিমনের। তার সেবা-যত্নে একসময় সুস্থ বোধ করে চোখ মেলে তাকালেন থাইসা। সেরিমনের দেওয়া ওষুধ খেয়ে অল্প সময়ের মধ্যেই সুস্থ হয়ে উঠলেন। থাইস। পেরিক্লিসের লেখা চিঠি এবং হিরের আংটিটা থাইসাকে দেখিয়ে সেরিমন বললেন, এই চিঠিটা পড়ে আপনার পরিচয় জেনেছি। আমি। পুরোপুরি সুস্থ হয়ে উঠতে হলে আরও কিছুদিন আমার এখানে থেকে আপনাকে বিশ্রাম নিতে হবে। কাজেই আপনি ভাবনা-চিন্তা সব ছেড়ে দিয়ে নিশ্চিন্তে বিশ্রাম নিন। আপনি এখন এফিসাসে রয়েছেন। আমার নাম সেরিমন। আমি এখানকার রাজার একজন সভাসদ। চিকিৎসাশাস্ত্রে আমার যা সামান্য জ্ঞান আছে, আশা করি তা দিয়ে আপনাকে সুস্থ করে তুলতে পারব। আমার অনুরোধ, পুরোপুরি সুস্থ না হওয়া পর্যন্ত আপনি আমার এখানেই থাকুন।

হিরের আংটিটি সেরিমনকে দেখিয়ে থাইসা বললেন, আপনারা মতো মহৎ ব্যক্তির মুখেই এ কথা শোভা পায়। বিয়ের কিছুদিন বাদে আমি স্বামীর সাথে জাহাজে চেপে তাঁর রাজ্যে যাচ্ছিলাম। মাঝপথে প্রচণ্ড ঝড়-বৃষ্টি শুরু হয়। সেই ঝড়ের মাঝেই আমার কন্যাসন্তান জন্ম নেয়। তারপরআমি জ্ঞান হারিয়ে ফেলি। আমার শুধু এটুকুই মনে আছে। জ্ঞান ফিরে আসতেই দেখি আমি আপনার বাড়িতে শুয়ে আছি। জামা-কাপড় সব জলে ভেজা। এখন স্বামীর চিঠি পড়ে বুঝতে পারছি আমাকে মৃত ভেবে মাঝি-মাল্লারা আমার দেহটি বাক্সে পুরে সমুদ্রের জলে ফেলে দেয়। ঈশ্বরের দয়ায় প্ৰাণে বেঁচে আমি আপনার আশ্ৰয় পেয়েছি। আমি জানি না। স্বামী-কন্যার কী দশা হয়েছে। ঝড়-জলের হাত থেকে আমার স্বামী ও সদ্যোজাত কন্যাটি রক্ষা পেয়েছে কিনা জানি না। এখন আপনিই বলুন মহাত্মা সেরিমন, এভাবে বেঁচে থেকে কী লাভ? কীভাবে দিন কটাব আমি? বেশ বুঝতে পারছি চোখের জল আর দীর্ঘশ্বাসই এখন আমার একমাত্র সম্বল।

তাকে সাস্তুনা দিয়ে সেরিমন বললেন, আপনার মানসিক অবস্থা আমি বেশ বুঝতে পারছি রানি থাইসা। কিন্তু ঈশ্বরের উপর তো কারও হাত নেই। কাছেই ডায়ানা দেবীর মন্দির রয়েছে। আপনার মন চাইলে আপনি দেবীর আরাধনা করে দিন কাটিয়ে দিতে পারেন। দিন-রাত সাধনভজনে মেতে থাকলে আপনার মন শান্ত হবে। সেখানে আমার ভাইঝি। আপনার দেখাশোনা করবে।

থেরিসা বললেন, সেরিমন! আস্তরিক ধন্যবাদ ছাড়া আপনাকে আর কিছু দেবার নেই আমার। আপনার প্রতি আমার যে শুভেচ্ছা রইল তা এই সামান্য প্রতিদানের চেয়ে অনেক বড়ো। আমি দেবী ডায়ানার মন্দিরে গিয়ে বাকি জীবনটা তার আরাধনা করেই কাটিয়ে দেব।

সেরিমনের অনুরোধে কিছুদিন তার বাড়িতে থেকে ওষুধ-পত্র খেয়ে পূর্ণ বিশ্রাম নিলেন রানি থাইসা। তারপর একদিন পুরোপুরি সুস্থ হয়ে সেরিমনের কাছ থেকে বিদায় নিয়ে দেবী ডায়ানার মন্দিরের উদ্দেশে রওনা দিলেন রানি। তাকে পথ দেখিয়ে নিয়ে চলল সেরিমনের ভাইঝি।

 

টায়ার বন্দরে এসে নোঙ্গর করল পেরিক্রিসের জাহাজ। সংবাদ পেয়ে অমাত্য আর সভাসদদের নিয়ে জাহাজ ঘাটে এলেন হেলিকেন্যাস। রাজকীয় সংবর্ধনা জানিয়ে তাঁরা রাজপ্রাসাদে নিয়ে এলেন পেরিক্লিসকে। এতদিন বাদে রাজাকে ফিরে পেয়ে আনন্দে মেতে উঠল প্ৰজারা। তারা এই জেনে নিশ্চিন্ত হল যে, সিংহাসন আর খালি থাকবে না। সবার মাঝে ফিরে আসতে পেরে পেরিক্লিসও খুশি হলেন। সিংহাসনে বসে তিনি আগের মতোই মনোযোগ দিয়ে রাজকাৰ্য পরিচালনায় মগ্ন হলেন। কিন্তু এরই মাঝে যখন স্ত্রী-কন্যার মুখ মনে পড়ে, তখন আর নিজেকে ঠিক রাখতে পারেন না পেরিক্লিস। কাজ-কর্ম সব ছেড়ে চোখের জল সামলে নিয়ে চাপা দীর্ঘশ্বাস ফেলেন তিনি। পেরিক্লিস তখনও জানে না যে তার স্ত্রী থাইসা এখনও বেঁচে আছেন-দেবী ডায়ানার আরাধনা করে তিনি তার মন্দিরে দিন কাটান। ওদিকে থার্সাসের শাসক ক্লিওনের মেয়ে ফিলোটিনার সাথে একই ভাবে বড়ো হচ্ছে পেরিক্রিসের মেয়ে মেরিনা। দিনে দিনে শুক্লপক্ষের চাদের মতো বেড়ে উঠতে লাগল মেরিনা। যদিও ফিলোটিনা আর মেরিনা একই বয়সি, কিন্তু রূপ-গুণ কোনও দিক থেকেই মেরিনার পাশে দাঁড়াবার যোগ্য নয় ফিলোটিনা। একই সাথে নাচ-গান, শিল্প-কলা শেখে দুজনে, তবুও মেধার জোরে সবকিছুতেই ফিলোটিনাকে ছাপিয়ে যায় মেরিনা।

তাদের দু-জনের স্বভাবও আলাদা। থার্সাসের শাসকের তত্ত্বাবধানে বড়ো হলেও মেরিনার মনে কোনও অহংকার নেই। ছোটো-বড়ো, উচু-নিচু সবাই তার চোখে সমান। সে সহজভাবে তাদের সাথে মেলামেশা করে, চেষ্টা করে সবার মন জয় করার। সে খুবই বিনম্র। এর ফলে দেশের মানুষ ফিলোটিনার চেয়ে মেরিনার প্রশংসাই বেশি করে করতে লাগল। ফিলোটিনাকে হারিয়ে দিচ্ছে — ব্যাপারটা ক্লিওনের নজরে না এলেও তার স্ত্রী ডায়োনিজা কিন্তু সহজে ব্যাপারটা মেনে নিতে পারলেন না।

রূপ-গুণ, স্বভাব-চরিত্র সব দিক দিয়েই ফিলোটিনার চেয়ে অনেক উন্নত মেরিনা। তাই যতদিন সে তাদের আশ্রয়ে থাকবে, ততদিন ফিলোটিন আর দাঁড়াতে পারবে না মেরিনার পাশে। এ কথাটা বুঝতে পেরে হিংসায় জুলে উঠলেন ডায়োনিজা। শেষে পথের কঁটা দূর করতে এক গুপ্তঘাতককে দিয়ে মেরিনাকে হত্যার ব্যবস্থা করলেন ডায়োনিজা। অনেক টাকার বিনিময়ে লিওনাইন নামে এক গুপ্ত ঘাতক রাজি হল মেরিনাকে হত্যা করতে। ডায়োনিজা তাকে নির্দেশ দিলেন যে যেন সবার অলক্ষ্যে মেরিনাকে সাগরতীরে নিয়ে গিয়ে তাকে খুন করে মৃতদেহের গলায় পাথর বেঁধে যেন তাকে সমুদ্রে ফেলে দেয়। মেরিনাকে হত্যার উদ্দেশ্যে সবার অলক্ষে তাকে সমুদ্রতীরে নিয়ে এল লিওনাইন। খুন করার আগে সে মেরিনাকে বলল শেষবারের মতো প্রার্থনা করতে। তার কথা শুনে মেরিনা বুঝতে পারল তাকে হত্যা করার জন্যই লোকটিকে নিয়োগ করা হয়েছে। মেরিনার প্রশ্নের জবাবে সে কথা স্বীকার করল লিওনাইন। মেরিনা শুনে অবাক হয়ে গেল। যখন সে জানল যে ডায়োনিজা ছােটোবেলা থেকে মাতৃস্নেহে তাকে মানুষ করেছেন তাকে, তিনিই আবার লিওনাইনকে নিয়োগ করেছেন তাকে হত্যা করতে। লিওনাইনের কাছে প্ৰাণভিক্ষা চাইল মেরিনা। ঠিক সে সময় একদল জলদসু্য এসে হাজির সেখানে। লিওনাইন যখন মেরিনাকে হত্যা করার জন্য তৈরি হচ্ছে, সে সময় তারা জোর করে মেরিনাকে তাদের কাছ থেকে ছিনিয়ে নিয়ে চেপে বসল জাহাজে। জাহাজে ওঠার সাথে সাথে পাল তুলে ছেড়ে দিল জাহাজ। জলদসু্যরা কিন্তু মেরিনাকে বাঁচাবার উদ্দেশ্যে আসেনি। তাদের কয়েকজন যখন ডাঙায় ঘুরে বেড়াচ্ছিল, সে সময় তাদের চোখে পড়ে মেরিনাকে। তখনই তারা সিদ্ধান্ত নেয় ক্ৰীতদাসী হিসেবে একে বেচিতে পারলে বাজারে চড়া দাম মিলবে।

জলদস্যুদের সর্দার কিন্তু দাসবাজারের বদলে চড়া দামে মেরিনাকে বেচে দিল মিটিলেনের এক পতিতালয়ে। ও সবজায়গায় যে সব নতুন মেয়ে আসে, খন্দেরের মনোরঞ্জনের জন্য সেখানকার যে বয়স্ক পতিতা তাদের ছলা-কলা আর আদব-কায়দা শেখায়, সবাই তাকে মাসি বলেই ডাকে। সেরূপ এক মাসিও রয়েছে মিটিলেনের পতিতালয়ে। মেরিনাকে খদ্দেরের মনোরঞ্জন করার কায়দা-কানুন শেখাতে তার পিছনে উঠে-পড়ে লাগল সেই মাসি। ততদিনে মেরিনা বুঝতে পেরেছে সে এক নরক থেকে অন্য এক নরকে এসে পড়েছে। সুন্দর, সুখী জীবনের লোভ দেখানো সত্বেও সে কিছুতেই রাজি হয়না পতিতাবৃত্তি গ্রহণ করতে। এমন কি চাবুক মারার ভয় দেখিয়েও বাধ্য করা যায় না। তাকে। মেয়েটি যে এমন অবাধ্য হবে তা স্বপ্নেও ভাবতে পারেননি পতিতালয়ের মালিক এবং মাসি। তারা ভাবতে লাগলেন। কীভাবে মেয়েটিকে সর্বতোভাবে পতিতা করে গড়ে তোলা যায়। ওদিকে দালালদের মারফত মেরিনার রূপের কথা অনেক খন্দেরের কানেই পৌঁছেছে। তার দেহের স্বাদ পেতে অনেকেই পাগল হয়ে উঠেছে। ইচ্ছে করেই মেরিনাকে শুনিয়ে শুনিয়ে এ কথা বলাবলি করল মাসি আর দালাল। দালাল এও বলল রাতের বেলায় কোনও না কোনও খদের আনবে মেরিনার কাছে। তবুও মেরিনা তার সিদ্ধান্তে অটল – জুলন্ত আগুন, উদ্যত ছুরি কিংবা সমুদ্রের জল, এরা যদি একসাথে মিলেমিশে আমায় মেরে ফেলার ভয় দেখায় — তাতেও ভয় না পেয়ে আমি নিজের সতীত্ব রক্ষা করে যাব। এ কাজে দেবী ডায়ানা আমার সহায় হবেন।

ওদিকে মেরিনা অকস্মাৎ নিখোঁজ হয়ে যাওয়ায় মহা ফাপরে পড়েছেন থার্সাসের শাসক ক্লিওন। অনেক খোঁজাখুঁজি সত্ত্বেও মেরিনার হদিশ পায়নি তার লোকেরা। এ অবস্থায় কী যে করবেন তা ভেবে পাচ্ছেন না ক্লিওন। এমন সময় একজন অনুচর মারফত জানতে পারলেন কিছুদিন ধরেই ডায়োনিজা নাকি গুপ্তঘাতকের সাহায্যে মেরিনাকে হত্যা করার চক্রান্ত করেছেন। পেশাদার গুপ্তঘাতক লিওনাইনের সাথে তাকে বহুবার প্রাসাদের বাইরে কথা বলতে দেখা গেছে।

এ কথা শুনে আক্ষেপ করে বললেন ক্লিওন, এ তুমি কী করলে ডায়োনিজা! এখন আমি কোথায় খুঁজে পাব মেরিনাকে?

ক্লিওনের বিশ্বস্ত চর যে তার সাথে কথা বলছে তা দেখতে পেয়েছেন ডায়োনিজা! ক্লিওনের আক্ষেপ শুনে তিনি দ্রুত সেখানে এসে বললেন, কী সব যা তা বলছ! যা গেছে তা কি আর ফিরে আসে? জেনে রােখ, মেরিনার রূপের দৌলতে কেউ মুখ ফিরে তাকাত না আমাদের মেয়ের দিকে। সবাই শুধু মেরিনার রূপ-গুণের প্রশংসা করত। মেয়ের স্বার্থেই আমি এ কাজ করেছি।

অসহায়ভাবে ক্লিওন বললেন, কিন্তু এর পরিণাম কী হতে পারে তা কখনও ভেবেছ? পেরিক্লিস তার মেয়েকে দেখতে চাইলে কী বলবে তাকে?

বলব, রোগে ভুগে কদিন আগে মারা গেছে মেরিনা, জবাব দিলেন ডায়োনিজ, আগে ভাগেই মেরিনার নামে একটা স্মৃতিস্তম্ভ তৈরি করে রাখবে। পেরিক্লিস মেয়েকে দেখতে এলে তুমি কাঁদতে কাঁদিতে তারই সামনে স্মৃতিস্তম্ভে ফুল দেবে। অবশ্য তার আগে মেরিনার গুণের প্রশংসা খোদাই করিয়ে রাখবে ওই স্তম্ভের গায়ে।

দীর্ঘশ্বাস ফেলে ক্লিওন বললেন, সুন্দর হয়েও তুমি যে এত ফেরেববাজ, স্বার্থপর আর নিষ্ঠুর হতে পার তা আগে জানা ছিল না। আমার।

মুখে স্ত্রীকে গালাগালি দিলেও শেষপর্যন্ত কিন্তু স্ত্রীর প্রস্তাবকেই মেনে নিতে হল ক্লিওনকে। সমুদ্রের ধারে মেরিনার সমাধি গড়ে তাতে একটা সুন্দর স্তম্ভ গড়ালেন তিনি। শিল্পীদের দিয়ে মেরিনার প্রশংসাসূচক অনেক সুন্দর সুন্দর কথা খোদাই করালেন সেই স্তম্ভের গায়ে।

এদিকে বহুদিন মেয়ের খোঁজ-খবর না পেয়ে খুবই চঞ্চল হয়ে উঠেছেন রাজা পেরিক্লিস। ক্লিওনকে অনেক চিঠি দিয়েও কোনওটির উত্তর পেলেন না। শেষমেশ স্থির করলেন তিনি নিজেই মেয়েকে দেখে আসবেন।

একদিন মন্ত্রী হেলিকেন্যাসকে সাথে নিয়ে তিনি এসে হাজির হলেন থার্সাসে। সে খবর পেয়ে স্ত্রী ডায়োনিজকে সাথে নিয়ে ক্লিওন এলেন জাহাজঘাটে। জাহাজ থেকে পেরিক্লিস নেমে আসতেই স্ত্রীর শেখানো মতো ক্লিওন কাঁদিতে কাঁদিতে পেরিক্লিসকে জানালেন তার মেয়ে মেরিনার মৃত্যুর কথা। মেরিনা। আর বেঁচে নেই জেনে স্তম্ভিত হয়ে গেলেন পেরিক্লিস। মৃত স্ত্রী থাইসার একমাত্র সন্তানকে বুকে ধরে তিনি স্ত্রী-শোক ভুলতে চেয়েছিলেন। কিন্তু নিষ্ঠুর বিধাতার তা সহ্য হল না। তিনি তাকেও অকালে কেড়ে নিলেন। শোকে যেন পাথর হয়ে গেলেন পেরিক্লিস। বলার মতো কোনও কিছু খুঁজে পেলেন না তিনি।

ঠিক এই সুযোগের অপেক্ষায় ছিলেন ডায়োনিজা। মেয়ের শোকে পেরিক্লিসকে বিতুল অবস্থায় দেখে এখন কী করতে হবে সে ব্যাপারে চাপা গলায় প্রয়োজনীয় নির্দেশ দিলেন স্বামীকে। ক্লিওন তাকে নিয়ে গেলেন সমুদ্রতীরে নির্মিত মেরিনার সমাধিস্থানে — সেখানে তার ভূয়সী প্রশংসা করলেন। আগে থেকেই সাথে করে কিছু সাদা ফুল নিয়ে এসেছিলেন ডায়োনিজা। সেই ফুল স্ত্রীর হাত থেকে স্মৃতিস্তম্ভের গোড়ায় ছড়িয়ে দিলেন ক্লিওন। তা দেখে পেরিক্লিসও সেখানে কিছু ফুল ছিটিয়ে দিলেন। তারপর কাঁদতে কাঁদিতে ক্লিওনের কাছ থেকে বিদায় নিয়ে মন্ত্রী হেলিকেন্যাসকে সাথে নিয়ে জাহাজে চেপেটায়ারে ফিরে গেলেন পেরিকিস।

 

ওদিকে মোটা টাকা দিয়ে মেরিনাকে কিনে নেবার পর থেকেই বেজায় মুশকিলে পড়ে গেছেন পতিতালয়ের মালিক। দালালদের মুখ থেকে মেরিনার রূপ-যৌবনের নানা কথা শুনে সেখানকার খরিদাররা রোজই আসছে তার সাথে রাত কাটাতে। কিন্তু মেরিনা তার সংকল্পে অটল। রাত কাটানো তো দূরে থাক, সে কাউকে তার দেহও ছুতে দিতে রাজি নয়। যে খদের আসে মেরিনা তাকেই ধর্মোপদেশ দেয়, চরিত্র সংশোধন করতে বলে। ফলস্বরূপ খদোররা এসেও মুখ কালো করে বাড়ি ফিরে যায়। কিছুতেই মেরিনাকে বাগ মানাতে না পেরে অনেক খদের পতিতালয়ে আসই ছেড়ে দিল। এসব দেখে-শুনে মেরিনার উপর বেজায় রেগে গেল পতিতালয়ের মালিক। সে নিজে ছিল যৌনরোগে আক্রান্ত। সে মতলব করল জোর করে মেরিনার সতীত্ব নষ্ট করে ওই কুৎসিত রোগের বীজ সে তার দেহে ঢুকিয়ে দেবে।

একদিন নতুন নারীর খোজে। সেই পতিতালয়ে এলেন মিটিলেনের শাসক লাইসিমেকাস। তাকে দেখে ব্যস্ত হয়ে উঠল। পতিতালয়ের সবাই। দালাল মেরিনাকে নিয়ে এল। তার ঘরে। তাদের সাথে মাসিও এল; ইশারায় লাইসিমেকাসকে দেখিয়ে মাসি মেরিনাকে বলল, ইনি হলেন এই রাজ্যের শাসক। অসীম ক্ষমতা ওর। ইচ্ছে করলেই উনি যা খুশি তাই করতে পারেন। তুমি যদি ওকে খুশি করতে পার তাহলে আর ভাবতে হবে না তোমায়, সোনা-রূপা, হিরে-জহরত দিয়ে উনি তোমার সারা গা মুড়িয়ে দেবেন।

মাসির কথার অর্থ বুঝতে পারল মেরিনা। তবুও সে নিজের জেদ বজায় রেখে বলল, উনি ভালোবেসে আমায় কিছু দিতে চাইলে আমি তা শ্রদ্ধার সাথে নিতে রাজি আছি।

ও দিকে লাইসিমেকাস অধৈৰ্য হয়ে মেরিনার উদ্দেশে গলা চড়িয়ে বললেন, কী গো মেয়ে! তোমাদের কথা-বার্তা শেষ হল! আমি আর কতক্ষণ এখানে একা একা বসে থাকব?

তার কথা শুনে মাসি ছুটে এসে লাইসিমেকাসকে সেলাম জানিয়ে বলল, হুজুর! কিছু মনে করবেন না। আপনি। এই মেয়েটা এখনও আনকোরাই রয়ে গেছে। অনেক চেষ্টা করেও আমরা ওকে বাগ মানাতে পারিনি। তবে হুজুর যখন এসে গেছেন তখন আর চিন্তা নেই, আপনি ঠিক ওকে পােষ মানাতে পারবেন? — বলে মেরিনার হাত ধরে টানতে টানতে তাকে ঢুকিয়ে দিল লাইসিমেকাসের ঘরে। তারপর দালালকে সাথে নিয়ে অন্যদিকে চলে গেল মাসি। জীবনে বহু মেয়ে ঘেটেছেন লাইসিমেকাস। তিনি দেখেছেন তার ক্ষমতার পরিচয় পাবার পর সব মেয়েরই চোেখ-মুখের ভাবভঙ্গি পালটে যায়। তারা সবাই আপ্ৰাণ চেষ্টা করে তাকে খুশি করতে। কিন্তু এ মেয়েটা তাদের মতো নয় — এ সম্পূর্ণ বিপরীত। শিরদাঁড়া সোজা করে এমনভাবে সে তার সামনে এসে দাঁড়িয়েছে যে দেখে মনে হচ্ছে তাকে খুশি করার বিন্দুমাত্র আগ্রহ নেই এর। সেই সাথে ওর চোখের চাউনি কেমন নম্র আর বিনত, ঔদ্ধত্যের বিন্দুমাত্র চিহ্ন নেই তাতে। মেয়েটিকে খুঁটিয়ে দেখতে দেখতে কৌতূহল বেড়ে গেল। লাইসিমেকাসের। এক সময় তিনি মুখ ফুটে বলেই ফেললেন, কী নাম তোমার?

আমার নাম মেরিনা বলল সে।

মেরিনা! বেশ ভালো নাম, বললে লাইসিমেকাস, এখন বল -তে কতদিন ধরে তুমি এ ব্যবসায় রয়েছ?

ব্যবসা? কীসের ব্যবসার কথা বলছেন। আপনি? থতমত খেয়ে বলল মেরিনা।

তুমিই বল! সে কথা কি আমি নিজের মুখে বলতে পারি! বললেন লাইসিমেকাস।

মিনতি জানিয়ে মেরিনা বলল, দোহাই আপনার! দয়া করে বলুন কোন ব্যবসার কথা বলছেন আপনি?

লাইসিমেকাস জানতে চাইলেন, কিতদিন হল এ ব্যবসায় এসেছ তুমি?

মেরিনা জবাব দিলে, যতদিনের কথা আমার মনে আছে ততদিন এসেছি এ ব্যবসায়।

তার দিকে তাকিয়ে লাইসিমেকাস বললেন, তাহলে আমায় ধরে নিতে হবে খুব অল্পবয়সেই এ ব্যবসায় এসেছ তুমি। ধর তোমার বয়স তখন পাঁচ-সাত।

যদি সত্যি সত্যিই আমি এ ব্যবসায় এসে থাকি তাহলে আমার বয়স তখন আরও কম, জবাব দিল মেরিনা।

তখন লাইসিমেকাস বললেন, তুমি জান এ বাড়ির সবাই তোমাকে বিক্রির মাল বলে ভাবে?

লাইসিমেকাসের দিকে তাকিয়ে মেরিনা বলল, জায়গাটা যদি ততই খারাপ তাহলে কেন এখানে আসেন। আপনি? আপনি তো এখানকার শাসক, মান্যগণ্য লোক। অসীম ক্ষমতা আপনার হাতে।

আমার কথা কে বলল তোমায়? নিশ্চয়ই তোমার গুরুঠাকুরানি, জানতে চাইলেন। লাইসিমেকাস।

অবাক হয়ে মেরিনা বলল, গুরুঠাকুরানি! সে আবার কে?

লাইসিমেকাস বললেন, আরে ওই মেয়েটা যে তোমায় ছলা-কলা কায়দা-কানুন শেখায়, সে তোমায় খানিক আগে এখানে পৌঁছে দিয়ে গেল। বেশ বুঝতে পারছি আমার পরিচয় আর ক্ষমতার কথা শুনে তুমি আমার মুখ থেকে আরও বেশি করে প্ৰেম-পিরিাতের কথা শুনতে চাইছ। নাও, এবার আমায় নিরিবিলি জায়গায় নিয়ে চল।

গম্ভীর স্বরে মেরিনা বলল, আপনি যদি সত্যিই সদ্বংশের সন্তান হয়ে থাকেন তবে তার প্রমাণ দিন। আপনি এখানকার শাসক। আপনার কাছে আমি বিচারপ্রার্থী। আশা করি আপনার বংশ আর পদমর্যাদার উপযুক্ত বিচার করবেন। আপনি ৷

মেরিনার কথা শুনে বেজায় অস্বস্তির মধ্যে পড়ে গেলেন লাইসিমেকাস। তিনি বললেন, এ সব কী বলছি তুমি? এক রাতের স্ফুর্তি লুটতে এসে এ তো ভালো বিড়ম্বনায় পড়া গেল দেখছি! যাই হোক, তুমি শাস্ত হও মেরিনা। তুমি অন্য কিছু চাও।

মেরিনা বলল, তাহলে জেনে রাখুন। আপনি, আমি এক কুমারী মেয়ে যে ভাগ্যের কোপে পড়ে বাধ্য হয়েছে এখানে আসতে। এই বাড়িটার কথাই কিছুক্ষণ আগে আপনি বলছিলেন না? এ এমন একটা জঘন্য নরক যার প্রতিটি অধিবাসীই কৃৎসিত রোগে আক্রান্ত। একমাত্র ঈশ্বর ছাড়া আর কেউ আমাকে এই নরক থেকে উদ্ধার ক্রুতে পারবে না। এখন আমার অবস্থা এক ডানাভাঙা পাখির মতে- যার ক্ষমতা নেই ডানা মেলে উড়ে যাবার।

তুমি বেশ সন্দর কথা বলতে পার মেরিনা, বলে উঠলেন লাইসিমেকাস, তোমার কথা শুনলে যে কোন ও পতিতার মনেও ভালো হবার আকাঙ্ক্ষা জেগে উঠবে। — আমার কোনও সন্দেহ নেই সে বিষয়ে। যাই হোক, এই টাকাগুলো তুমি রেখে দাও, চেষ্টা করবে। এর সাহায্যে পালিয়ে যাবার।

ঈশ্বর আপনার ভালো করবেন, বলে। লাইসিমেকাসের দেওয়া টাকাগুলি রেখে দিল মেরিনা। দরজার দিকে যেতে যেতে লাইসিমেকাস বললেন, আমি চললুম। যদি কখনও তোমায় খবর পাঠাই তাহলে জানবে সেটা ভালো খবর। এই নাও, আরও কিছুটাকা রইল। এগুলো তুলে রােখ। দরকার মতো কাজে লাগিও — বলে আরও কিছু টাকা মেরিনার হাতে দিয়ে চলে গেলেন। লাইসিমেকাস।

সত্যিই মেরিনার কাজে লেগে গেল। লাইসিমেকসের দেওয়া টাকাগুলো। সে টাকা দিয়ে বিশ করল পতিতালয়ের মালিকের চাকর বোল্টকে। একদিন তারই সাহায্যে পতিতালয় থেকে পালিয়ে গিয়ে একজন সচ্চরিত্র লোকের আশ্রয় পেল মেরিনা। সেই ভদ্রলোক নিজের মেয়ের মতো ভালোবাসেন মেরিনাকে। কিন্তু তার আশ্রয়ে থেকেও বসে বসে সময় কাটে না মেরিনার। থার্সাসে থাকাকালীন সে নাচ-গান, শিল্প-কলা সবই আয়ত্ত করেছিল। এখন ছোটো ছোটো ছেলে-মেয়েদের সে সব বিদ্যে শিখিয়ে পয়সা উপার্জন করতে লাগল। বোল্টের সাহায্যে সে উপার্জিত টাকা পতিতালয়ের মাসিকে সাহায্য হিসেবে পাঠাতে লাগল।

 

নিজের মেয়ের সমাধিতে ফুল দিয়ে বিষণ্ণ মনে টায়ারে ফিরে আসছিলেন পেরিক্লিস। মাঝপথে তার জাহাজ এসে দাঁড়াল মিটিলেন বন্দরে। দূর থেকে পেরিক্রিসের জাহাজটিকে দেখে কৌতূহলী হয়ে উঠলেন মিটিলেনের শাসক লাইসিমেকাস। কোন দেশের জাহাজ, কে রয়েছেন জাহাজে এসব জানতে দু-জন সভাসদকে নিয়ে বড়ো নৌকায় চেপেটায়ারের জাহাজের কাছে এলেন তারা তখন জাহাজের ডেকে চেয়ারে বসে আরাম করছিলেন ক্লান্ত রাজা পেরিক্লিস মিটিলেনের একজন সভাসদ জনৈক নাবিককে সাথে নিয়ে উঠে এলেন জাহাজের ডেকে। এদের দেখতে পেয়ে এগিয়ে এলেন অমাত্য হেলিকেন্যাস। হেলিকেন্যাসকে উদ্দেশ্য করে সেই নাবিক বলল, প্ৰভু হেলিকে নাস! নৌকায় অপেক্ষা করছেন মিটিলেনের শাসক লাইসিমেকাস। তিনি আসতে চান আমাদের জাহাজে।

দুজন সভাসদকে ডেকে নিয়ে হেলিকেন্যাস বললেন, যান, আপনারা গিয়ে মিটিলেনের শাসক লাইসিমেকাসকে অভ্যর্থনা জানিয়ে ওপরে নিয়ে আসুন।

নিয়ে তারা উঠে এল জাহাজের ওপরে। সেখানে তাকে অভিবাদন জানালেন মন্ত্রী হেলিকেন্যাস। ইশারায় পেরিক্লিসকে দেখিয়ে তিনি বললেন, ইনিই আমাদের প্রভু টায়ারের রাজা পেরিক্লিস। শোকে তিনি এত কাতর। যে প্রায় তিনমাস ধরে খাওয়া-দাওয়া একরকম বন্ধই করে দিয়েছেন। কারও সাথেই কথা বলেন না তিনি।

লাইসিমেকাস বললেন, আমি কি একবার ওর সাথে দেখা করতে পারি?

নিশ্চয়ই পারেন, বললেন হেলিকেন্যাস, তবে ওর সাথে দেখা করে কোন ও ফল হবে না। কারণ আপনার সাথে উনি একটা কথাও বলবেন না। স্ত্রী ও একমাত্ৰ কন্যার বিয়োগে উনি খুবই কাতর হয়ে পড়েছেন।

লাইসিমেকাস এগিয়ে এসে অভিবাদন জানালেন পেরিক্লিসকে। জবাবে কিছু না বলে বিষণ্ণ মুখে বসে রইলেন পেরিক্লিস।

হেলিকেন্যাসকে ডেকে একপাশে সরিয়ে এনে লাইসিমেকাস বললেন, আমি একটা কথা

বলতে চাই আপনাকে। আমাদের মিটিলেনে একটি কুমারী মেয়ে আছে! রূপে-গুণে সে অতুলনীয় আর চমৎকার তার গানের গলা। আমার বিশ্বাস তার গান শুনলে রাজা পেরিক্লিস আবার তার কথা বলার ক্ষমতা ফিরে পাবেন। আপনার অনুমতি হলে ওই মেয়েটিকে নিয়ে আসার ব্যবস্থা করতে পারি। আমি।

কাজ হবে বলে মনে হয় না। যাই হোক আপনি যখন বলছেন তখন একবার চেষ্টা করে দেখতে পারেন।

হেলিকেনাসের নির্দেশে একজন সভাসদ বড়ো নৌকায় চেপে রওনা হলেন। কিছুক্ষণ বাদে তিনি ফিরে এলেন মেরিনাকে সাথে করে। তার আগেই ডেক ছেড়ে নিজের কামরায় চলে গেছেন রাজা পেরিক্লিস। হেলিকেন্যাস সেখানে পৌঁছে দিলেন মেরিনাকে।

পেরিক্লিসকে অভিবাদন জানিয়ে মেরিনা বললেন, মহারাজ! আপনার মতো আমিও বুকের মাঝে অসহ্য যন্ত্রণা আর দুঃখ বহন করে চলেছি। শুনেছি। আমার বাবাও নাকি রাজা ছিলেন। সমুদ্র ঝড়ে জাহাজ ডুবি হয়ে আমি বাবা-মার কাছ থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ি।

আপন মনে পেরিক্লিস বললেন, এই মেয়েটিও দেখতে ঠিক আমার স্ত্রী আর মেয়ের মতে, কথাগুলি অনুচ্চ স্বরে বললেও তা ঠিকই পৌঁছেছে মেরিনার কানে।

মেরিনার দিকে তাকিয়ে পেরিক্লিস বললেন, কী নাম তোমার?

আমার নাম মেরিনা, জবাব দিল সে।

মেরিনা নামটা শুনে কেমন যেন চমকে উঠলেন পেরিক্লিস। তিনি বললেন, তোমার নাম শুনে আমি যে কতটা চমকে গেছি তা তোমায় বোঝাতে পারব না। কে তোমার এই নাম দিয়েছিল?

মেরিনা জবাব দিল, মৃত্যুর আগে আমার ধাত্রী লাইকোরিডা নিজ মুখে বলে গেছে যে আমরা বাবা একজন নামি রাজা ছিলেন। আমার মাও নাকি ছিলেন রাজবংশীয়। সমুদ্রবক্ষে জন্মেছিলাম বলে জাহাজের মধ্যেই বাবা আমার নাম রেখেছিলেন মেরিনা। আমি এও শুনেছিলাম ঝড়-জলের তাণ্ডব সহ্য করতে না পেরে আমায় জন্ম দিয়েই মা মারা যান। মেরিনার কথা শুনে উত্তেজনায় থারথার করে কেঁপে উঠল পেরিক্রিসের ঠোট। তিনি চাপা স্বরে আপন মনে বলতে লাগলেন, মেয়েটি বলছে। ওর বাবা রাজা ছিলেন আর মাও নাকি রাজবংশীয়; সমুদ্রে জন্মেছিল বলে ওর বাবা নাম রেখেছিল মেরিনা। এ সব কি আমি স্বপ্ন দেখছি। এই তো কদিন আগে মারা গেছে সে। আমি নিজে তার সমাধিতে ফুল ছিটিয়ে এসেছি। তবু ওকে একবার বাজিয়ে নেওয়া যাক। মেরিনার দিকে তাকিয়ে তিনি বললেন, তোমার পুরো জীবনকাহিনি শুনতে চাই আমি! জন্মের পর তোমার কী হল, কী করে তুমি এখানে এলে — সব খুলে বল আমায়।

মেরিনা বলতে লাগল, আমাকে জন্ম দিয়েই মা মারা যান। শুনেছি তার মৃতদেহ নাকি সমুদ্রের জলে ফেলে দেওয়া হয়। তারপর আমার পিতা থাসাসের শাসকের কাছে রেখে দেন। আমাকে! আমাকে খাইয়ে-দাইয়ে বড় করে তোলেন ক্লিওন আর তার স্ত্রী। তারপর কেন জানি না আমাকে  গোপনে হত্যা করার জন্য একজন গুপ্তঘাতককে নিয়োগ করেন ক্লিওনের স্ত্রী। আমি বাড়ি থেকে বেরিয়ে ছিলাম ধাত্রী লাইকোডিয়ার সমাধিতে ফুল দেব বলে। মাঝপথে ঘাতক আমায় ভুলিয়েভালিয়ে নিয়ে গেছিল।সমূদ্রতীরে। আমি কাতর স্বরে প্রাণভিক্ষা চাইলাম সে ঘাতকের কাছে। সে সময় একদল জলদসু্য এসে আমাকে ছিনিয়ে নিয়ে গিয়ে জাহাজে তোলে, তারপর এক সময় এসে পৌঁছলাম এই মিটিলেনে।

এটুকু বলার পর মেরিনার নজরে এল শিশুর মতো কাঁদছেন তার শ্রোতা।

মেরিনা বলল, আমার জীবনকাহিনি শুনে আপনি কাঁদছেন! বিশ্বাস করুন রাজা পেরিক্লিসের মেয়ে আমি। জানি না। আমার বাবা এখনও বেঁচে আছেন। কিনা।

রাজা পেরিক্লিস গলা চড়িয়ে হেলিকেন্যাসকে ডেকে বললেন, প্রিয় হেলিকেন্যাস! একবার এস এ ঘরে?

রাজার ডাক শুনে হেলিকেন্যাস ঘরের ভিতর গিয়ে দেখলেন এতদিন বাদে রাজার মুখে হাসি ফুটেছে। তা দেখে খুশি হলেন তিনি।

পেরিক্লিস বললেন, শোন হেলিকেন্যাস, ও বলছে ওর নাম মেরিনা। সমুদ্রে জন্মাবার দরুন ওর বাবা নাকি এই নাম রেখেছিলেন। দেখা মা! ঈশ্বরের লীলা বোঝা ভার। একদিন সমুদ্রে জন্মেছিল বলে এতদিন বাদে সমুদ্ৰই তোমায় আজ ফিরিয়ে দিয়েছে আমার কাছে। দেখা মা! এতক্ষণ পর্যন্ত তুমি যা বলেছ তা সবই সত্যি। তবুও সংশয় রয়ে গেছে আমার মনে। তুমি যদি সত্যিই পেরিক্লিসের মেয়ে হও, তাহলে বলতো তোমার মা’র নাম কী?

নিশ্চয়ই বলব, তবে তার আগে বলুন আপনি কে? জানতে চাইল মেরিনা।

আমি টায়ারের রাজা পেরিক্লিাস, জবাব দিলেন তিনি।

উত্তেজনা চেপে রেখে মেরিনা বলল, আমার মার নাম থাইসা।

কী বললে, তুমি থাইসার মেয়ে? এগিয়ে এসে মেরিনাকে বুকে জড়িয়ে ধরে রাজা পেরিক্লিস বললেন, তুমি যে সত্যিই আমার মেয়ে তাতে কোনও সন্দেহ নেই। বুঝলে হেলিকেন্যাস, জীবনে শুধু দুঃখই নেই, আনন্দও আছে। আজ কত বছর বাদে ফিরে পেলাম নিজের মেয়েকে। যাও! মেয়ের জন্য নতুন পোশাক নিয়ে এস, বলে ঘরের বাইরে এসে দাঁড়ালেন পেরিক্লিস। সামনে লাইসিমেকাসকে দেখে বললেন, হেলিকেন্যাস! ইনি কে? এঁকে তো চিনতে পারছি না।

আজ্ঞে! ইনি হলেন মিটিলেনের শাসক লাইসিমেকাস। একমাত্র এরই জন্য এতদিন বাদে আপনি ফিরে পেয়েছেন মেয়েকে

তইতো আপনাকে দেখে পরমাত্মীয় বলে মনে হয়েছিল, বলেই আনন্দের সাথে লাইসিমেকাসকে বুকে জড়িয়ে ধরলেন পেরিক্লিস। ঈশ্বর আমাদের উভয়ের মঙ্গল করুন বলে কঠিন দৃষ্টিতে হেলিকানাসের দিকে তাকিয়ে বললেন পেরিক্লিস, বুঝতে পারছি মেরিনা যে সত্যিইআমার মেয়ে এ বিষয়ে তোমার সন্দেহ এখনও ঘোচেনি। রাজার কথার কোনও জবাব দিলেন না হেলিকেন্যাস।

বহুক্ষণ ধরে পেরিক্লিসের মনে একটা সূক্ষ্ম অনুভূতির বোধ হচ্ছে। কোথা থেকে মিষ্টি সুরের একটা গান ভেসে আসছে তার কানে। অথচ কেউ তা শুনতে পাচ্ছে না। সেই সূরা শুনতে শুনতে একসময় ঘূমিয়ে পড়লেন পেরিক্লিাস। ঘুমের মাঝে স্বপ্ন দেখলেন দেবী ডায়ানা যেন তাকে বলছেন, এফিসাসে চলে যাও তুমি! দেখবে সেখানে তোমার স্ত্রী আমার আরাধনা করছে। ধাও! সেখানে গিয়ে তাকে গ্রহণ কর।

ঘুম ভাঙার পর জাহাজে চেপে পেরিক্লিস রওনা হলেন এফিসাসের পথে। একসময় জাহাজ এসে থামল সেখানে। মেরিনা, হেলিকেন্যাস আর কয়েকজন সভাসদকে সাথে নিয়ে দেবী ডায়ানার মন্দিরে গেলেন পেরিক্লিস। ঘটনাচক্রে সে সময় উপস্থিত ছিলেন। এফিসাসের সভাসদ সেরিমন— যার পরামর্শে একদিন বাকি জীবন কাটাতে থাইসা এসেছিলেন এই মন্দিরে। দেবী ডায়ানার বেদির সামনে দাঁড়িয়ে উপস্থিত সবাইকে জোর গলায় নিজের জীবনের ইতিহাস শোনালেন পেরিক্লিস। থাইসাও তখন সেখানে ছিলেন। এতদিন বাদে স্বামীর গলা শুনে আর তাকে সামনে দেখে আনন্দে আত্মহারা হয়ে জ্ঞান হারিয়ে ফেললেন। থাইসা! সেরিমনের পরিচর্যায় কিছুক্ষণের মধ্যেই জ্ঞান ফিরে পেলেন তিনি। তখন থাইসকে দেখিয়ে পেরিক্লিসকে বললেন সেরিমন, যার খোজে আপনি এতদূর এসেছেন, এই থাইসাই আপনার সেই হারিয়ে যাওয়া স্ত্রী।

বহুদিন বাদে স্বামী-কন্যাকে এক সাথে ফিরে পেয়ে আনন্দের চোটে কী যে করবেন। থাইসা, তা ভেবে পাচ্ছেন না তিনি। এবার তাদের সবাইকে নিজের বাড়িতে নিয়ে এলেন সেরিমন। যে বাক্সতে পুরে থাইসাকে সমুদ্রে ফেলে দেওয়া হয়েছিল -সেই বাক্সটা আর তার ভেতরের সব জিনিস সযত্নে রেখে দিয়েছিলেন সেরিমন। তিনি সেগুলি দেখালেন পেরিক্লিসকে। বিয়ের রাতে স্বামীর কাছ থেকে যে হিরের আংটিটিা উপহার হিসেবে পেয়েছিলেন। থাইসা, এতদিন বাদে তিনি সেটা দেখালেন পেরিরিকসকে। আংটিটা একেবার দেখেই চিনতে পারলেন পেরিক্লিস। জন্ম দেবার পর থেকে যে মেয়েকে তিনি দেখেননি, সেই মেয়ে আজ এত বড়ো হয়েছে দেখে খুশি হলেন থাইসা। মাকে পেয়ে তার সামনে হাঁটু গেড়ে সশ্রদ্ধ ভঙ্গিতে বসেছিল মেরিনা, তাকে দু-হাতে বুকের মাঝে জড়িয়ে ধরে শিশুর মতো কাঁদিতে লাগলেন থাইসা।

এবার সেরিমনকে দেখিয়ে তিনি পেরিক্লিসকে বললেন, এনার দেখানো পথ অনুসরণ করে আমি এতদিন দেবী ডায়ানার আরাধনা করে এসেছি, আজ এতবছর পরে দেবী ডায়ানার কৃপাতেই তোমাদের ফিরে পেলাম আমি।

ইশারায় লাইসিমেকাসকে দেখিয়ে পেরিক্লিস বললেন, একবার এর দিকে চেয়ে দেখা থাইসা। ইনি হলেন মিটিলেনের শাসক লাইসিমেকাস। আমি স্থির করেছি। এর হাতেই সঁপে দেব মেরিনাকে ৷ এবার মেরিনার হাত লাইসিমেকাসের হাতে তুলে দিয়ে বললেন। থাইসা, তোমাদের দাম্পত্য জীবন সুখের হোক।

এর পরও কিছু অবশিষ্ট আছে। এ কাহিনির ক্লিওন আর তার স্ত্রী যে মেরিনাকে হত্যা করার চক্রান্ত করেছিলেন সে কথা জানতে পেরে তাদের উপর ক্ষিপ্ত হয়ে উঠলেন। থার্সাসের প্রজারা। এ অন্যায়ের প্রতিশোধ নিতে প্রজারা একদিন আগুন লাগিয়ে পুড়িয়ে ছারখার করে দিল তাদের প্রাসাদ। প্রাসাদ পুড়ে ছাই হয়ে গেলেও, ক্লিওন আর তার স্ত্রী কিন্তু প্ৰাণে বেঁচে গেলেন। সম্ভবত আরও বড়ো শাস্তি তাঁদের পাওনা ছিল বলেই বেঁচে গেলেন তারা।

মাচ অ্যাডু অ্যাবাউট নাথিং

মাচ অ্যাডু অ্যাবাউট নাথিং
মূল রচনা: উইলিয়াম শেকসপিয়র
পুনর্কথন: মেরি ল্যাম্ব
অনুবাদ: অর্ণব দত্ত

মেসিনার রাজপ্রাসাদে বাস করত দুই মেয়ে – মেসিনার গভর্নর লিওনেটোর কন্যা হিরো ও ভাইঝি বিয়াত্রিস।

বিয়াত্রিস ছিল মিশুকে স্বভাবের। কিন্তু তার বোন হিরো ছিল গম্ভীর প্রকৃতির মেয়ে। বিয়াত্রিস সবসময় তার বুদ্ধিদীপ্ত কথাবার্তার মাধ্যমে মাতিয়ে রাখত বোনকে। যা কিছু ঘটত, অবধারিতভাবে তাকে হাসির খোরাক করে তুলত বিয়াত্রিস।

সেবার এক যুদ্ধের শেষে ঘরে ফেরার পথে সেনাবাহিনীর একদল উচ্চপদস্থ তরুণ যোদ্ধা মেসিনায় লিওনেটোর সঙ্গে দেখা করতে এলেন। এঁদের মধ্যে ছিলেন অ্যারাগনের রাজকুমার ডন পেড্রো, তাঁর বন্ধু ফ্লোরেন্সের লর্ড ক্লডিও এবং পাদুয়ার লর্ড বেনেডিক। এই শেষোক্ত ব্যক্তিটি ছিলেন যেমন বুদ্ধিমান, তেমনই উচ্ছৃঙ্খল।

এঁরা সবাই আগেও মেসিনায় এসেছিলেন। অতিথিবৎসল গভর্নর তাঁর মেয়ে ও ভাইঝির সঙ্গে পরিচয় করিয়ে দিলেন তাঁর এই পুরনো বন্ধুদের।

প্রাসাদে পৌঁছেই বেনেডিক লিওনেটো ও রাজকুমারের সঙ্গে মশকরা জুড়ে দিলেন। লোকের কথার মধ্যে নাক না গলিয়ে থাকতে পারত না বিয়াত্রিস। সে বেনেডিকের কথার মাঝখানে বলে বসল, “এ কী সিনিওর বেনেডিক, আপনি তো বকেই চলেছেন! দেখুন, কেউই আপনার কথা শুনছেন না!” বিয়াত্রিসের মতোই প্রত্যুৎপন্নমতি বেনেডিক। কিন্তু এহেন অভিনব অভিবাদন তাঁর ভাল লাগল না। তাঁর ধারণা ছিল, এমন বাচালতা ভদ্রনারীর পক্ষে শোভনীয় নয়। তাঁর মনে পড়ে গেল, আগের বার যখন তিনি মেসিনায় এসেছিলেন, তখন এই বিয়াত্রিস বেছে বেছে তাঁরই পিছনে লেগেছিল। বেনেডিক ও বিয়াত্রিস যে পরিমাণ স্বাধীনতা নিয়ে রঙ্গতামাশা করতেন, ঠিক ততটা আর কেউই করতে পারতেন না। তাই এই দুই তীক্ষ্মবুদ্ধিধর বাগযোদ্ধার মধ্যে প্রায়ই ঝগড়া লেগে থাকত, যার অবশ্যম্ভাবী ফল হত পরস্পরের সাময়িক মনোমালিন্য ও বিচ্ছেদ। বিয়াত্রিসের উপস্থিতি তিনি এতক্ষণ খেয়াল করেননি। কিন্তু যে মুহুর্তে বিয়াত্রিস তাঁকে কথার মাঝপথে থামিয়ে কেউ তাঁর কথা শুনছেন না বলে খোঁটা দিল, অমনি তার উপস্থিতি হাড়ে হাড়ে উপলব্ধি করলেন বেনেডিক। তিনিও পালটা জবাব দিলেন, “এই যে শ্রীমতী অবজ্ঞা দেবী, আপনি এখনো বেঁচে আছেন?” ব্যস! পুরনো যুদ্ধ নতুন করে বেধে গেল। লম্বা লম্বা সব যুক্তির ঝনঝনা শোনা গেল। সাম্প্রতিক যুদ্ধে নিজের কৃতিত্ব সম্পর্কে বড়াই করতেন বেনেডিক। বিয়াত্রিস সেই কথা জানত। সে বলল, যুদ্ধে যতজনকে বেনেডিক মেরেছেন, সবাইকে সে একাই খেয়ে ফেলতে পারে। রাজকুমার বেনেডিকের কথায় মজা পাচ্ছেন দেখে সে বেনেডিককে বলে বসল ‘রাজকুমারের ভাঁড়’। বিয়াত্রিসের অন্য কথাগুলির চেয়ে এই কথাটিই সবচেয়ে বেশি বিঁধল বেনেডিকের। তিনি ভাবলেন, তাঁর হাতে নিহতদের খেয়ে ফেলার কথা বলে বিয়াত্রিস আসলে তাঁকে কাপুরুষ বলে ইঙ্গিত করল। তিনি ভুলেই গেলেন যে, আদতে তিনি একজন বড়ো মাপের যোদ্ধা। আসলে, ভাঁড়ামির অপমানে যে দারুণ বুদ্ধিমত্তা লুকিয়ে থাকে তার থেকে মারাত্মক আর কিছুই হয় না। কারণ, এই সব ক্ষেত্রে আনীত অভিযোগগুলির মধ্যে সত্যতা বিশেষ থাকে না। এই জন্যই বিয়াত্রিস তাঁকে ‘রাজকুমারের ভাঁড়’ বলায় তার উপর হাড়ে চটলেন বেনেডিক।

মৃদুস্বভাবা হিরো অবশ্য বিশিষ্ট অতিথিদের সামনে চুপ করেই রইল। সে তখন সুন্দরী যুবতী। তার রূপলাবণ্যে মোহিত হয়ে গেলেন ক্লডিও। অবশ্য রাজকুমার তখন বেনেডিক ও বিয়াত্রিসের মজার বাকযুদ্ধ শুনতে ব্যস্ত। লিওনেটোর কানের কাছে ফিসফিস করে বললেন, “এই সদারঙ্গময়ী তরুণীটি কিন্তু বেনেডিকের উপযুক্ত স্ত্রী হবে।” লিওনেটো উত্তরে বললেন, “বলেন কী! এরা তো বিয়ের হপ্তা না কাটতেই উন্মাদ হয়ে যাবে।” লিওনেটো উভয়ের ঝগড়াটে স্বভাবের দিকে ইঙ্গিত করলেন বটে, কিন্তু রাজকুমার এই দুই মহাবুদ্ধিধরকে পরিণয়সূত্রে বাঁধার কথা ভুলতে পারলেন না।

ক্লডিওকে নিয়ে প্রাসাদে ফেরার সময় রাজকুমার বুঝলেন এই বেলা শুধু বেনেডিক ও বিয়াত্রিসের বিয়ে দিলেই চলবে না। ক্লডিও যখন হিরোর উচ্ছ্বসিত প্রশংসা শুরু করলেন, তখন তার অর্থ বুঝতে বাকি রইল না রাজকুমারের। ক্লডিওকে জিজ্ঞাসা করলেন, “হিরোকে তোমার মনে ধরে?” ক্লডিও উত্তরে বললেন, “প্রভু, শেষবার যখন মেসিনায় এসেছিলুম, তখন ওকে দেখি সৈনিকের দৃষ্টিতে। তখন ভালবাসার কথা ভাববার সময় ছিল না। কিন্তু এখন চারিদিকে শুধুই শান্তি আর আনন্দ। যুদ্ধের চিন্তা যখন আর নেই, তখন সেই শূন্যস্থান অধিকার করছে নানা মধুর ভাবনা। এখন দেখছি হিরোর রূপ। এখন মনে হচ্ছে, যুদ্ধে যাওয়ার আগেই ওর প্রেমে পড়েছিলুম আমি।” নিজমুখে এভাবে ক্লডিও হিরোর প্রতি নিজের ভালবাসার কথা স্বীকার করলে ভারি সন্তুষ্ট হলেন রাজকুমার। তক্ষুনি লিওনেটোর কাছে গিয়ে ক্লডিওকে জামাই হিসেবে গ্রহণ করার আর্জি জানালেন তিনি। লিওনেটোও রাজি হয়ে গেলেন। ক্লডিও ছিলেন দুর্লভ পদমর্যাদার লর্ড তথা রাজকুমারের অন্যতম প্রধান মিত্র। কোমল স্বভাবের মেয়ে হিরোকে ক্লডিওর প্রতি অনুরক্তা করে তুলতে বেশি সময় লাগল না রাজকুমারের। এরপর রাজকুমার ও ক্লডিও লিওনেটোর সঙ্গে কথা বলে শীঘ্র বিবাহের জন্য একটি তারিখ স্থির করে ফেললেন।

তখনও বিয়ের কয়েকটি দিন দেরি। এই ক’টা দিন ক্লডিওর কাছে অতীব দীর্ঘতর মনে হতে লাগল। সাধারণত, এমন মধুর অনুষ্ঠানের জন্য অপেক্ষা করতে করতে যুবকেরা অধৈর্য হয়ে ওঠে। রাজকুমার তাই ক্লডিওর বিরহযন্ত্রণা কমানোর চেষ্টা করলেন। এবং এই সুযোগে কীভাবে বেনেডিক ও বিয়াত্রিসকে প্রেমপাশে বদ্ধ করা যায়, তার ছক কষতে শুরু করলেন। রাজকুমারের এই খেলায় ভারি মজা পেলেন ক্লডিও। লিওনেটোও তাঁদের সাহায্য করার প্রতিশ্রুতি দিলেন। এমনকি হিরোও জানালো যে, খুড়তুতো বোনটিকে উপযুক্ত স্বামী খুঁজে দিতে সে সর্বতোভাবে সাহায্য করবে।

রাজকুমারের পরিকল্পনা ছিল এই রকম: তাঁরা রাজপুরুষেরা মিলে বেনেডিকের মাথায় ঢুকিয়ে দেবেন যে, বিয়াত্রিস তাঁর প্রেমে হাবুডুবু খাচ্ছে। আর হিরো বিয়াত্রিসকে বুঝিয়ে দেবে যে, বেনেডিক তার প্রেমে পড়েছে।

রাজকুমার, লিওনেটো ও ক্লডিও আগে নামলেন মাঠে। একদিন কুঞ্জবিতানে বই পড়ছিলেন বেনেডিক। রাজকুমার তাঁর সহকারীদের নিয়ে কুঞ্জবিতানের পিছনে এসে এমন জায়গায় বসলেন যাতে তাঁদের কথা স্পষ্ট বেনেডিকের কানে যায়। খানিক বিশ্রম্ভালাপের পর রাজকুমার বললেন, “এদিকে এসো, লিওনেটো। তখন কী বলছিলে? তোমার ভাইঝি বিয়াত্রিস নাকি সিনিওর বেনেডিকের প্রেমে পড়েছে? ও মেয়ে আবার কারোর প্রেমে পড়তে পারে নাকি? আশ্চর্য হলাম!” “আমিও ভাবতে পারিনি, প্রভু,” লিওনেটো উত্তর দিলেন। “ওর আচরণ দেখে তো মনে হত, বেনেডিককে ও আদৌ পছন্দ করে না। অথচ সেই বেনেডিককেই তার পছন্দ। এ তো দারুণ ব্যাপার,” বললে ক্লডিও। সে আরও জানালো, হিরোও তাকে একই কথা বলেছে। বিয়াত্রিসের বেনেডিককে এত পছন্দ যে, বেনেডিক তাকে গ্রহণ না করলে সে দুঃখে মরেই যাবে। কিন্তু লিওনেটো ও ক্লডিও দু’জনেই বলল, বিয়াত্রিসকে ভালবাসা বেনেডিকের পক্ষে অসম্ভব। কারণ, তিনি সমস্ত সুন্দরী মেয়েকেই পরিহাস করেন। বিশেষত, এই মেয়েটিকে তিনি বিশেষ অপছন্দ করেন।

রাজকুমার বিয়াত্রিসের প্রতি সহানুভূতি দেখাচ্ছিলেন। তিনি সব শুনলেন। বললেন, “বেনেডিককে একথা বললেই ভাল হয়।” ক্লডিও বলল, “কী লাভ? সে এটা নিয়ে মজা করবে, বেচারি মেয়েটা আরও কষ্ট পাবে।” রাজপুত্র বললেন, “অমন করলে ওকে ফাঁসি দেওয়া হবে! বিয়াত্রিস ভারি ভাল মেয়ে। অসাধারণ বুদ্ধিমতী মেয়ে। শুধু একটাই বোকামি সে করেছে বেনেডিককে ভালবেসে।” এই বলে রাজকুমার তাঁর সহকারীদের সঙ্গে কথা বলতে বলতে সেখান থেকে চলে গেলেন। সব শুনেটুনে বেনেডিক বসলেন ভাবতে।

বেনেডিক কান খাড়া করে এই কথোপকথন শুনছিলেন। বিয়াত্রিস তাঁকে ভালবাসে শুনে তিনি মনে মনে ভাবলেন, “এও সম্ভব নাকি?” তারপর ভাবলেন, “না, হয়েও পারে। সবাই কেমন গম্ভীর হয়ে বিষয়টা নিয়ে আলোচনা করছিল। ওরা আবার হিরোর থেকে ব্যাপারটা জেনেছে। বিয়াত্রিসের উপরে ওদের ভারী দরদ দেখছি! আমাকে ভালবাসে! কেন? নিশ্চয় প্রতিশোধ নিচ্ছে। আমি তো কোনোদিন বিয়ের কথা ভাবিইনি। বলেছিলাম, আমি আইবড়ো অবস্থাতেই মরব। তার মানে নিশ্চয়ই এই নয় যে আমাকে বিয়ে করে বাঁচতে হবে। ওরা বলছিল, মেয়েটা সুন্দরী ও গুণবতী। কথাটা ঠিকই। কিন্তু অমন বুদ্ধিমতী মেয়েকে শুধুমাত্র আমাকে ভালবাসার জন্য বোকা বলার কী আছে? এই যে বিয়াত্রিস এদিকেই আসছে। আজ তো ওকে ভারী সুন্দর লাগছে! দেখি চুপিচুপি, ওর মধ্যে ভালবাসার কোনো চিহ্ন দেখতে পাই কিনা।” বিয়াত্রিস বেনেডিকের দিকে এগিয়ে এল এবং স্বভাবসিদ্ধ খোঁচা দিয়ে বলল, “আমার ইচ্ছের বিরুদ্ধে আমাকে পাঠানো হয়েছে, আপনাকে নৈশভোজে আমন্ত্রণ জানানো জন্য।” বেনেডিক কোনোদিন বিয়াত্রিসের সামনে নরম কথা বলেননি। কিন্তু সেই মুহুর্তে তিনি বলে ফেললেন, “সুন্দরী বিয়াত্রিস, এতটা কষ্ট করার জন্য তোমাকে ধন্যবাদ জানাই।” তারপর বিয়াত্রিস তাঁকে আর দু-তিনটে কড়া কথা শুনিয়ে সেখান থেকে চলে গেল। বেনেডিক ভাবলেন, এই অশোভন কথাগুলির মধ্যে অন্য কোনো গোপন অর্থ নিহিত রয়েছে। তিনি উচ্চকণ্ঠে বলে উঠলেন, “আমি যদি ওকে দয়া না করি, তাহলে আমি দুষ্ট। আমি যদি ওকে ভাল না বাসি, তাহলে আমি একটা ইহুদি। যাই, ওর একটা ছবি জোগাড় করি।”

বেনেডিক পাতা ফাঁদে পা দিলেন। এবার বিয়াত্রিসকে ফাঁদে ফেলার পালা হিরোর। সে তার দুই সহচরী আরসুলা আর মার্গারেটকে ডেকে পাঠাল। মার্গারেটকে বলল, “ভাই মার্গারেট, বৈঠকখানায় যাও। সেখানে বিয়াত্রিস রাজপুত্র ও ক্লডিওর সঙ্গে কথা বলছে। বিয়াত্রিসের কানে তুলে দাও, আমি আর আরসুলা বাগানে ওর সম্পর্কে কী যেন বলাবলি করছি। সেই যেখানে হানিসাকল লতা সূর্যালোকের দ্বারা পুষ্ট হয়ে সূর্যের আলোকেই অকৃতজ্ঞ গোলামের মতো ঢুকতে বাধা দেয়, সেই কুঞ্জবিতানে আমরা রয়েছি। ওকে আমাদের কথায় আড়ি পাততে উসকানি দিও কিন্তু।” এই সুস্নিগ্ধ কুঞ্জবিতানেই খানিকক্ষণ আগে বেনেডিককে ফাঁদে ফেলা হয়েছিল। হিরো এখানেই বিয়াত্রিসকে পাঠানোর কথা বলল মার্গারেটকে।

মার্গারেট বলল, “আমি ওকে আনছি ওখানে। এখুনি যাচ্ছি।”

আরসুলাকে পুষ্পবিতানে নিয়ে গিয়ে হিরো বলল, “উরসুলা, বিয়াত্রিস এলেই আমরা এই পথে এদিক-ওদিক হাঁটতে থাকব। তখন শুধু কথা হবে বেনেডিককে নিয়ে। আমি ওঁর নাম করলেই, তুমি ওঁকে সেরা পুরুষমানুষ বলে ওঁর গুণগান শুরু করে দেবে। আমি তোমাকে বলব, বেনেডিক কীভাবে বিয়াত্রিসকে ভালবাসেন, সেই কথা। নাও, শুরু করো। ওই দ্যাখো, বিয়াত্রিস কেমন ল্যাপউইং পাখির মতো চুপিচুপি আসছে আমাদের কথা শুনতে।” তারা কথা শুরু করল। হিরো কোনো কথার উত্তর দেওয়ার ভঙ্গিতে উরসুলাকে বলল, “না, সত্যি বলছি, আরসুলা, ওর স্বভাব খুব খারাপ। পাহাড়ি বুনো পাখির মতো উচ্ছৃঙ্খল।” আরসুলা বলল, “কিন্তু তুমি ঠিক জানো যে, বেনেডিক বিয়াত্রিসকে ভালবাসে?” হিরো বলল, “রাজপুত্র ও আমার ভাবী-স্বামী ক্লডিও তাই বলছিলেন। তাঁরা আমাকে ওকে সবকিছু খুলে বলতে বলেছিলেন। আমি রাজি হইনি। বেনেডিক যে বিয়াত্রিসকে ভালবাসেন, সে কথাটা ওকে না জানানোই ভাল।” আরসুলা বলল, “ঠিক বলেছ, ভালবাসার কথা ও কী বুঝবে। শুধু বিষয়টা নিয়ে তামাশা করবে।” হিরো বলল, “সত্যি বলতে কী, এত বুদ্ধিমান, এত মহৎ, তরুণ এবং দুর্লভ গুণের অধিকারী মানুষ আমি আর দেখিনি। আর ও কিনা তাকে অশ্রদ্ধা করে।” আরসুলা বলল, “ঠিক বলেছ, এমন দুর্ব্যবহার সহ্য করা যায় না।” হিরো বলল, “যায় তো না-ই। কিন্তু ওকে বোঝাবে কে? আমি বললে, আমার কথা তো তামাশা করে উড়িয়ে দেবে।” আরসুলা বলল, “না না, তুমি তোমার খুড়তুতো বোনকে ভুল বুঝছ। সত্যিকারের বিচার না করে সে সিনিওর বেনেডিকের মতো এক দুর্লভ ভদ্রলোককে প্রত্যাখ্যান করবে না।” হিরো বলল, “কেমন নামজাদা মানুষ বলো। আমার প্রিয়তম ক্লডিওকে বাদ দিলে সারা ইতালি খুঁজেও অমন মানুষ মিলবে না।” এইভাবে হিরো তাঁর সঙ্গিনীকে বিষয় পরিবর্তনের ইঙ্গিত করলেন। আরসুলা বলল, “তোমার বিয়ে কবে, দিদিমণি?” হিরো তাকে বলল, পরের দিনই ক্লডিওর সঙ্গে তার বিয়ে। সেজন্য সঙ্গিনীকে সে তার নতুন পোষাকগুলি দেখিয়ে পরের দিন কী পরবে তা নিয়ে আলোচনা করতে চাইল। বিয়াত্রিস রুদ্ধশ্বাসে তাদের কথা শুনছিল। ওরা চলে যেতেই বলে উঠল, “আমার কানে এ কী আগুন ঢেলে দিয়ে গেল? এ কী সত্য? বিদায়, অশ্রদ্ধা ও অবজ্ঞা! বিদায়, কুমারীর গৌরব! বেনেডিক, ভালবাসো! তোমাকে আমার মূল্য চোকানোর সময় এসেছে। আমার বুনো হৃদয় তোমার প্রেমহস্তে বেঁধে দেবো আমি।”

দুই কট্টর দুষমন পরিণত হল প্রাণের বঁধুয়ায়। রাজকুমারের মজাদার কূটবুদ্ধির শিকার হয়ে তাঁরা একে অপরের প্রেমে পড়ে গেলেন। কিন্তু সবটা ভাল হল না। এরপর থেকে হিরোর দুর্ভাগ্যের সূচনা হল। পরদিন, অর্থাৎ তার বিয়ের দিনই হিরো ও তার বাবা লিওনেটোর জীবনে ঘনিয়ে এল এক মহাদুঃখ।

ডন জন নামে রাজকুমারের এক সৎ ভাই ছিল। চাপা স্বভাবের খিটখিটে লোক ছিল সে। সবসময় মাথায় খেলাত দুষ্টুবুদ্ধি। ভাই রাজকুমারকে সে ঘৃণা করত। আর রাজকুমারের বন্ধু বলে ক্লডিওকেও বিশেষ অপছন্দ করত। ক্লডিও আর রাজকুমারের মনে দুঃখ দেওয়ার জন্য সে ক্লডিও ও হেরোর বিয়ে ভেস্তে দেওয়ার পরিকল্পনা করল। কারণ সে জানত, রাজকুমারের বড়ো সাধ এই বিয়েটা হোক। সেই সঙ্গে ক্লডিওরও মনের একান্ত বাসনা এই পরিণয়। বদমায়েশি করার জন্য ডন জন পাঠাল বোকাশিও নামে একটা লোককে। বোকাশিও তারই মতো শয়তান। ডন জন আবার তাকে ভাল ইনামের লোভ দেখিয়ে উসকাল। বোকাশিও হেরোর সহচরী মার্গারেটকে প্রেম নিবেদন করেছিল। ডন জন সেটা জানত। কী করতে হবে তা বোরাশিওকে শিখিয়ে দিল সে। মার্গারেটকে বলতে বলল, রাতে হিরো যখন ঘুমাবে, তখন হিরোর পোষাক পরে মার্গারেট যেন হিরোর শয়নকক্ষের জানলায় এসে দাঁড়ায়। তাহলেই ক্লডিও বিশ্বাস করবে, ও-ই হল হিরো। আর তাহলেই ডন জনের উদ্দেশ্য হবে সিদ্ধ।

এরপর ডন জন গেল রাজপুত্র ও ক্লডিওর কাছে। গিয়ে বলল, হিরো নষ্ট মেয়ে। মধ্যরাতে সে ঘরের জানলায় দাঁড়িয়ে অন্য এক পুরুষের সঙ্গে কথা বলে। সেদিন বিবাহের পূর্বসন্ধ্যা। ডন জন তাদের সেই রাতেই হাতে নাতে প্রমাণ করে দিতে চাইল তার কথা। তাঁরা রাজি হয়ে গেলেন। ক্লডিও বললেন, “আজ রাতে যদি কিছু দেখতে পাই, তাহলে আমি তাকে বিবাহ করব না। কাল আমাদের বিবাহের দিন। কালই ওর চরিত্র উদ্ঘাটন করব।” রাজপুত্র বললেন, “যেহেতু ওকে লাভ করার জন্য আমি তোমাকে সাহায্য করেছিলাম। তাই ওকে অপমান করার প্রয়োজন হলে, সেই কাজে আমিই তোমাকে সাহায্য করব।”

সেদিন রাতে ডন জন তাঁদের হিরোর শয়নকক্ষের কাছে নিয়ে গেলেন। তাঁরা দেখলেন, বোরাশিও জানলার নিচে আর মার্গারেট হিরোর জানলায় দাঁড়িয়ে। মার্গারেট কথা বলছে বোরাশিওর সঙ্গে। ক্লডিও ও রাজপুত্র হিরোকে যে পোষাকে দেখেছেন, মার্গারেটকেও সেই পোষাক পরতে দেখে তাকেই হিরো মনে করলেন।

ক্লডিও সব দেখে শুনে (অর্থাৎ, যা তিনি দেখছেন বলে ভেবেছিলেন) তো রেগে অস্থির। নিষ্পাপ হেরোর প্রতি তাঁর ভালবাসা এক মুহুর্তে ঘৃণায় পরিণত হল। ঠিক করলেন, গির্জায় সকলের সামনে হাঁড়ি ভাঙবেন তিনি। রাজপুত্রও রাজি হলেন। ভাবলেন, রাত পোহালে যার সঙ্গে ক্লডিওর মতো এক মহান পুরুষের বিয়ে, সে যখন দুষ্টা স্ত্রীলোকের মতো রাতের অন্ধকারে অন্য পুরুষের সঙ্গে কথা বলে তখন তার এই রকম শাস্তি হওয়াই উচিত।

পরদিন সবাই এল বিয়ের উৎসবে। ক্লডিও ও হিরো দাঁড়ালেন পাদ্রির সামনে। পাদ্রি অনুষ্ঠান শুরু করতেই ক্লডিও মধুরভাষ্যে নির্দোষ হিরোর দোষকীর্তন শুরু করলেন। হিরো তো থ। সে বিনয়ের সঙ্গে বলল, “স্বামী, আপনি ঠিক আছেন তো? এমন কথা কেন বলছেন?”

লিওনেটো খুব ভয় পেলেন, তিনি রাজপুত্রকে বললেন, “প্রভু, আপনি কিছু বলছেন না কেন?” রাজপুত্র বললেন, “আমি কী বলব? আমি অত্যন্ত অসম্মানিত হয়েছি। আমার প্রিয় বন্ধুর সঙ্গে আমি এক অযোগ্যা স্ত্রীলোকের বিবাহ দিতে যাচ্ছিলাম। লিওনেটো, আমার সম্মানের নামে শপথ করে বলতে পারি, আমি, আমার ভাই ও ক্লডিও, কাল মধ্যরাতে ওর ঘরের জানলার নিচে দাঁড়িয়ে থাকা একটি পুরুষের সঙ্গে ওর কথোপকথন শুনেছি।”

সব শুনে তো বেনেডিকও হতবাক। তিনি বলে উঠলেন, “এ তো বিবাহসভা মনে হচ্ছে না।”

“হা ভগবান!” ভগ্নহৃদয় হিরো এই কথা বলেই অজ্ঞান হয়ে গেলেন। মৃতবৎ পড়ে রইলেন তিনি। রাজপুত্র ও ক্লডিও গির্জা ছেড়ে চলে এলেন। তাঁদের এতটাই ক্রুদ্ধ হয়েছিলেন যে, হিরো সুস্থ হওয়া পর্যন্ত অপেক্ষাও করলেন না। ভ্রুক্ষেপও করলেন না যে কী মনোবেদনায় লিওনেটোকে তাঁরা ফেলে যাচ্ছেন।

বেনেডিক কিন্তু রয়ে গেলেন। বিয়াত্রিস বোনের শুশ্রুষা করছিল। তাকে সাহায্য করলেন বেনেডিক। বললেন, “কেমন আছে ও?” বিয়াত্রিস বলল, “মনে হচ্ছে যেন মরে গেছে।” বিয়াত্রিস তার বোনকে খুব ভালবাসত। তাই খুব দুঃখ পেয়েছিল সে। সে তার বোনের স্বভাবচরিত্র জানত। তাই তার বিরুদ্ধে আনা কোনো অভিযোগই সে বিশ্বাস করেনি। তবে হতভাগ্য বাবার অবস্থা তা ছিল না। তিনি তাঁর মেয়ের এই লজ্জাজনক অপরাধের কথা বিশ্বাস করে ফেলেছিলেন। তাই মেয়েকে মৃত মনে করে তিনি বিলাপ করতে করতে বললেন, মেয়ে যেন তাঁর আর চোখ না খোলে।

কিন্তু বৃদ্ধ পাদ্রি ছিলেন বিচক্ষণ মানুষ। তিনি মানবচরিত্র গভীরভাবে নিরীক্ষণ করেছিলেন। যখন হিরোকে দোষারোপ করা হচ্ছিল, তখন তিনি তার মুখের অবস্থা পর্যবেক্ষণ করছিলেন। তিনি তাকে লজ্জায় রাঙা হতে দেখেছিলেন। দেখেছিলেন, দেবসুলভ এক পাণ্ডুরতা। সেই সঙ্গে তার চোখে দেখেছিলেন এক আগুন, যে আগুনই বলে দিচ্ছিল রাজপুত্রের আনা অভিযোগগুলি ভুল। তিনি বেদনার্ত বাবাকে বললেন, “আমার বিদ্যাভ্যাস, আমার পর্যবেক্ষণ শক্তি, আমার বয়স, আমার শ্রদ্ধাবোধ, আমার বৃত্তি সব কিছুই ভুল প্রমাণিত হবে যদি এই মিষ্টি মেয়েটি দোষী প্রমাণিত হয়। ও নির্ঘাত কোনো বিশ্রী ভুলের শিকার হয়েছে।”

জ্ঞান ফিরলে তিনি হিরোকে জিজ্ঞাসা করলেন, “বাছা, যে লোকটির সঙ্গে কথা বলার জন্য তোমার বিরুদ্ধে অভিযোগ আনা হল, সে কে?” হিরো বলল, “ওঁরাই জানেন! আমি তো অমন কাউকে চিনি না।” তারপর লিওনেটোর দিকে তাকিয়ে বলল, “বাবা, যদি প্রমাণ করতে পারো, কোনো লোক রাতের অন্ধকারে আমার সঙ্গে কথা বলে, অথবা গতকাল রাতে আমি কোনো প্রাণীর সঙ্গে বাক্যালাপ করেছি, তাহলে যা ইচ্ছে কোরো, আমাকে ত্যাগ করো, ঘৃণা কোরো, যন্ত্রণা দিয়ে হত্যা কোরো, যা ইচ্ছে কোরো!”

পাদ্রি বললেন, “নিশ্চয় কোনো অত্যাশ্চর্য ভুল বোঝাবুঝি হয়েছে। রাজপুত্র ও ক্লডিও ভুল বুঝেছেন।” লিওনেটোকে তিনি উপদেশ দিলেন যে, হিরোকে মৃত ঘোষণা করতে। তাঁরা হিরোর মৃতপ্রায় অবস্থা দেখেই গিয়েছিলেন। সুতরাং হিরোকে মৃত প্রমাণ করতে বেগ পেতে হবে না। সেই সঙ্গে তিনি তাঁকে উপদেশ দিলেন শোকপালন করতে, একটি স্মৃতিসৌধ নির্মাণ করতে, এবং কবর দেওয়ার সব আচার-অনুষ্ঠান পালন করতে। লিওনেটো জিজ্ঞাসা করলেন, “এসব করে কী হবে?” পাদ্রি বললেন, “এসব করে কী হবে? তাঁর মৃত্যুসংবাদ নিন্দাকে করুণায় পরিণত করবে। এটাই ভাল হবে। তবে আমি শুধু এটুকু ভালই আশা করছি না। ক্লডিও যখন শুনবেন যে তাঁর কথা শুনে হিরো মারা গিয়েছে, তাঁর চরিত্র সম্পর্কে একটি কল্পনা তাঁর মনে প্রবেশ করবে। তিনিও শোকাচ্ছন্ন হবেন। তিনি মনে করেন তাঁর আনা অভিযোগগুলি সঠিক। কিন্তু ভালবাসা কখনও তাঁর মনে আশ্রয় নিয়ে থাকলে, তিনি ভাববেন তিনি অভিযোগগুলি না তুললেই ভাল করতেন।”

বেনেডিক তখন বললেন, “লিওনেটো, পাদ্রির উপদেশ গ্রহণ করুন। আমি রাজপুত্র ও ক্লডিওকে ভালবাসি। কিন্তু এই গোপন কথাটা আমি তাদের কাছে প্রকাশ করব না।”

তাঁরা সবাই লিওনেটোকে বোঝালেন। লিওনেটো পরম দুঃখে বললেন, “আমার মন এত ভেঙে পড়ছে যে, সামান্য সুতোয় বেঁধেও আমাকে চালনা করা যাবে।” দয়ালু পাদ্রি লিওনেটো ও হিরোকে সান্ত্বনা দিতে দিতে সেখান থেকে নিয়ে চলে গেলেন। বিয়াত্রিস ও বেনেডিক রইলেন। তাঁদের বন্ধুরা তাঁদের প্রেমের ফাঁদে ফেলার পর এই ছিল তাঁদের প্রথম সাক্ষাৎ। সেই বন্ধুদের মন তখন অন্যদিকে। কেউ যে আনন্দকে নির্বাসিত করেছিল সেখান থেকে।

কথা শুরু করলেন বেনেডিক। বললেন, “লেডি বিয়াত্রিস, তুমি কী কাঁদছ?” বিয়াত্রিস বলল, “হ্যাঁ, আরও কিছুক্ষণ কাঁদব।” বেনেডিক বললেন, “আমি নিশ্চিত যে তোমার বোনকে ভুল বোঝা হচ্ছে।” বিয়াত্রিস বলল, “ওকে যে নির্দোষ মনে করে, সেই তো আমার যোগ্য সঙ্গী।” বেনেডিক তখন বললেন, “বন্ধুত্ব প্রদর্শনের কী এমন কোনো উপায় রয়েছে? আমি তোমার চেয়ে ভাল আর কাউকেই বাসি না। এ কী অদ্ভুত ব্যাপার নয়?” বিয়াত্রিস বলল, “আমি যদি বলি, আমি তোমায় ছাড়া আর কিছুই ভালবাসি না, তাহলে হয়ত বিশ্বাস করবে না। কিন্তু আমি মিথ্যে বলছি না। আমি কোনো স্বীকারোক্তি দিচ্ছি না, আবার কিছু অস্বীকারও করছি না। আমার বোনের জন্য আমার ভীষণ দুঃখ হচ্ছে।” বেনেডিক বললেন, “আমার তরবারির শপথ, তুমি আমাকে ভালবাসো, আর আমি শপথ করে বলছি, আমিও তোমাকে ভালবাসি। বলো, কী করতে হবে। আমি তাই করব।” বিয়াত্রিস বলল, “ক্লডিওকে হত্যা করো।” বেনেডিক বললেন, “না, এই জগতের বিনিময়েও নয়।” বেনেডিক তাঁর বন্ধু ক্লডিওকে ভালবাসতেন। তিনি বিশ্বাস করতেন, ক্লডিওকে ভুল বোঝানো হয়েছে। বিয়াত্রিস বলল, “ক্লডিও কী শয়তান নয়? সে আমার বোনকে বদনাম দিয়েছে, কটুকথা বলেছে, অপমান করেছে। আহা! আমি যদি পুরুষ হতাম!” বেনেডিক বললেন, “শোনো বিয়াত্রিস।” কিন্তু বিয়াত্রিস ক্লডিওর হয়ে কোনো কথাই শুনতে রাজি হল না। সে বেনেডিকের উপর তার বোনের অপমানের প্রতিশোধ নেওয়ার জন্য চাপ দিতে লাগল। বলল, “জানলায় দাঁড়িয়ে অন্য পুরুষমানুষের সঙ্গে কথা বলেছে! হা ভগবান! আমার মিষ্টি হিরো! এ কী অন্যায় তার প্রতি! কী অপমান! কী অমর্যাদা! আহা! আমি যদি পুরুষ হতাম, বা আমার যদি কোনো পুরুষ বন্ধু থাকত! সৌজন্য আর মঙ্গলকামনার মধ্যে দিয়েই বীর্য নিঃশেষিত হয়ে যায়! আমি একজন সদিচ্ছাবান পুরুষ হতে পারি না, তাই আমি শোকার্তা নারী হয়েই মরতে চাই!” বেনেডিক বললেন, “দাঁড়াও বিয়াত্রিস, আমার এই হাতের দিব্যি আমি তোমাকে ভালবাসি।” বিয়াত্রিস বলল, “আমাকে ভালবাসলে ওই হাতটা দিব্যি কাটার বদলে অন্য কাজে লাগান।” বেনেডিক বললেন, “নিজের আত্মাকে প্রশ্ন করো বিয়াত্রিস, ক্লডিও কী হিরোকে ভুল বোঝেনি?” বিয়াত্রিস বলল, “হ্যাঁ, আমার চিন্তা আছে, আত্মাও আছে।” বেনেডিক বললেন, “যথেষ্ট হয়েছে। আমি ওকে দ্বন্দ্বযুদ্ধে আহ্বান করব। তোমার হাত চুম্বন করে বিদায় নেবো। এই হাতেই ক্লডিও আমাকে এক প্রিয় বস্তু দেবে! আমার কথা শুনলে, যাও। তোমার বোনের শুশ্রুষা করো।”

বিয়াত্রিসের অনুরোধ প্রত্যাখ্যান বেনেডিকের পক্ষে সম্ভব ছিল না। বিয়াত্রিস তার বাকচাতুর্যের মাধ্যমে বেনেডিকের ক্রোধ জাগিয়ে তুলল। বেনেডিক বন্ধু ক্লডিওর বিরুদ্ধে যুদ্ধে অবতীর্ণ হতে রাজি হলেন। এদিকে লিওনেটো তাঁর কন্যার মৃত্যুসংবাদ রটিয়ে দিলেন। মেয়ের প্রতি কৃত দুর্ব্যবহারের জন্য তিনি রাজপুত্র ও ক্লডিওকে অসিযুদ্ধে আহ্বান জানালেন। তাঁরা লিওনেটোর বয়সকে সম্মান করতেন। তাঁরা বললেন, “আমাদের সঙ্গে বিবাদ করবেন না। আপনি বয়স্ক মানুষ।” তখন এলেন বেনেডিক। তিনিও হিরোকে অপমান করার জন্য ক্লডিওকে অসিযুদ্ধে আহ্বান করলেন। ক্লডিও ও রাজপুত্র পরস্পরকে বললেন, “বিয়াত্রিস নিশ্চয়ই একে আমাদের পিছনে লাগিয়েছে।” ক্লডিওকে বেনেডিকের আহ্বান গ্রহণ করতেই হত। কারণ, সেই মুহুর্তে হিরোকে নির্দোষ প্রমাণ করার জন্য কোনো স্বর্গীয় ন্যায়ের অবতারণা সম্ভব ছিল না। দ্বন্দ্বযুদ্ধের অনিশ্চিত ফলই ছিল একমাত্র ভরসা।

বেনেডিকের আহ্বান সম্পর্কে রাজপুত্র ও ক্লডিও কথা বলছেন, এমন সময় এক ম্যাজিস্ট্রেট বোরাশিওকে বন্দী করে ধরে আনলেন রাজপুত্রের সামনে। ডন জনের বদমায়েশি নিয়ে আরেকজনের কাছে বড়াই করতে গিয়ে ধরা পড়েছিল সে।

ক্লডিওর সামনে বোরাশিও সব স্বীকার করল। জানাল, মার্গারেটকে সে-ই হিরোর পোষাক পরে জানলায় দাঁড়াতে বলেছিল, যাতে সবাই তাকে হিরো মনে করে। ক্লডিও ও রাজকুমার তাই-ই ভেবেছিলেন। যেটুকু সন্দেহ রয়ে গিয়েছিল, সেটুকুও কেটে গেল ডন জনের পলায়নের সংবাদে। বদমায়েশি ধরা পড়ে যাওয়ায় ভাইয়ের রাগের হাত থেকে বাঁচতে সে মেসিনা ছেড়ে পালিয়ে যায়।

ক্লডিও বুঝলেন যে, হিরোর বিরুদ্ধে আনা তাঁর অভিযোগগুলি ভিত্তিহীন ছিল। আর এই কড়া কথাগুলিই হিরোর মৃত্যুর কারণ হয়েছে ভেবে কিন্তু দুঃখে কাতর হয়ে গেলেন। তাঁর মনে পড়ল হিরোর ছবি। মনে পড়ল, তাকে প্রথম ভালবাসার কথা। রাজকুমার জিজ্ঞাসা যখন করলেন, কথাগুলি তাঁর মনে ইস্পাতের ফলার মতো বিঁধেছে কিনা, ক্লডিও উত্তরে বললেন, বোরাশিও কথা শুনে তাঁর মনে হচ্ছিল, তিনি যেন নিজের গলায় বিষ ঢালছেন।

অনুতপ্ত ক্লডিও বৃদ্ধ লিওনেটোর কাছে তাঁর সন্তানকে অপমান করার জন্য ক্ষমা চাইলেন। বললেন, লিওনেটো যা শাস্তি দেবেন, তাই তিনি মেনে নেবেন। তিনি নিজের বাগদত্তার প্রতি নিষ্ঠুর আচরণ করেছেন, তার জন্যই তাঁকে শাস্তি সহ্য করতে হবে।

লিওনেটো তাঁকে শাস্তি দিলেন। শাস্তি হল, পরদিন ক্লডিওকে হিরোর খুড়তুতো বোনকে বিয়ে করতে হবে। কারণ সে-ই এখন লিওনেটের উত্তরাধিকারিণী এবং সে-ও অনেকটা হিরোরই মতো। ক্লডিও লিওনেটোর কাছে শপথ করে বলল, এই অপরিচিতা যদি ইথিওপও হন, তাহলেও তিনি তাঁকে বিবাহ করবেন। তাঁর হৃদয় বিদীর্ণ হয়ে গেল। সারা রাত তিনি কাঁদলেন। লিওনেটো হিরোর জন্য যে সমাধিসৌধটি বানিয়েছিলেন, সেখানে বসে বিলাপ করতে লাগলেন।

সকালবেলা রাজকুমার ক্লডিওকে নিয়ে গেলেন গির্জায়। সেখানে সেই পাদ্রি, লিওনেটো ও তাঁর ভাইঝি আগেই উপস্থিত হয়েছিলেন দ্বিতীয় বিবাহোৎসবে। লিওনেটো ক্লডিওর হাতে সমর্পণ করলেন প্রতিশ্রুত বধূকে। বধূর মুখে ছিল একটি মুখোশ, যাতে ক্লডিও মুখটি চিনতে না পারেন। ক্লডিও মুখোশ-পরিহিতা মেয়েটিকে বললেন, “এই পবিত্র পাদ্রির সামনে তোমার হাতটা আমায় দাও। আমি তোমার স্বামী হব, যদি আমাকে বিবাহ কর।” অপরিচিতা বলল, “যতদিন বাঁচি, তোমার স্ত্রী হয়েই যেন বাঁচি।” এই বলে সে মুখোশটি খুলল। সে প্রমাণ করল যে, সে লিওনেটোর ভাইঝি নয়, স্বয়ং তাঁর কন্যা লেডি হিরো। আমরা নিশ্চিত যে, তাকে দেখে ক্লডিও খুব অবাক হয়েছিলেন। তিনি হিরোকে মৃত মনে করেছিলেন। তাই আনন্দে নিজের চোখকেই বিশ্বাস করতে পারছিলেন না। রাজপুত্রও সমান আশ্চর্য হয়েছিলেন। তিনি বলে উঠলেন, “এই কী সেই হিরো নয়, যে হিরো মারা গিয়েছিল?” লিওনেটো বললেন, “প্রভু, সে তো মারা গিয়েছিল, কিন্তু তার বদনামটা বেঁচে ছিল।” পাদ্রি বললেন, অনুষ্ঠানের শেষে তিনি এই আপাত কেরামতের ব্যাখ্যা দেবেন। তিনি বিবাহের অনুষ্ঠান চালিয়ে গেলেন। মাঝখান থেকে উদয় হলেন বেনেডিক। তিনি একই সময় বিয়াত্রিসকে বিয়ে করতে চাইলেন। বিয়াত্রিস তখন আপত্তি জানাল। বেনেডিক বললেন, হিরোর কাছ থেকে তিনি জেনেছিলেন যে বিয়াত্রিস তাঁকে ভালবাসে। একটা মজাদার ব্যাখ্যা দেওয়া হল। দেখা গেল দু’জনকেই কৌশলে প্রেমের ফাঁদে ফেলা হয়েছিল। তাঁরা কেউ কাউকে ভালবাসতেন না। কিন্তু মিথ্যা এক ঠাট্টার বশে তাঁরা একে অপরের প্রেমের পাশে বাঁধা পড়েছিলেন। কিন্তু এই প্রেম যতই ঠাট্টার ফসল হোক না কেন, এতটাই শক্তিশালী হয়ে উঠেছিল যে কোনো গম্ভীর ব্যাখ্যাও তাকে টলাতে পারল না। বেনেডিক যেহেতু বিবাহের প্রস্তাব দিয়েছিলেন, কোনো কিছুই তাঁকে বিবাহের সিদ্ধান্ত থেকে টলাতে পারল না। তিনি ঠাট্টাটা বজায় রাখলেন। বললেন, দয়া করেই বিয়াত্রিসকে বিয়ে করছেন তিনি। কারণ তিনি শুনেছিলেন, তিনি বিয়াত্রিসকে বিয়ে না করলে, সে দুঃখেই মরে যাবে। বিয়াত্রিস বলল, সে বেনেডিকের প্রাণ বাঁচাতে তাঁকে বিয়ে করতে রাজি হয়েছিল কারণ সে শুনেছিল, তার জন্য নাকি বেনেডিক খাওয়াদাওয়া ছেড়ে দিয়েছেন। এইভাবে দুই পাগলের চার হাত এক হল ক্লডিও ও হিরোর বিবাহের পর। বৃত্ত সম্পূর্ণ করার জন্য, সব বদমায়েশির মাথা ডন জনকে মেসিনায় আবার ধরে আনা হল। ওই খিটখিটে লোকটাকে শাস্তি দেওয়ার জন্য মেসিনায় তার ব্যর্থ ষড়যন্ত্র এবং সেখানকার আনন্দময় ভোজসভার সাক্ষী করে রাখা হল তাকে।

মার্চেন্ট অব ভেনিস

আসলে ইতালি দেশটা একটা উপদ্বীপ। উত্তর ছাড়া অন্য তিন দিক দিয়েই একে বেষ্টন করে। আছে ভূমধ্যসাগরের জলরাশি। আদ্রিয়াতিক উপসাগর হিসেবেই পরিচিত সমুদ্রের পূর্ব অংশটি। ভূগোলের ছাত্ররা সবাই এটা জানে। তারা এও জানে এরই উপর অবস্থিত মধ্যযুগীয় ইউরোপের শ্রেষ্ঠ বাণিজ্য নগর ভেনিস।

শুধু উপরে নয়, আদ্রিয়াতিক সাগরের ভেতরে অবস্থিত ভেনিস নগরী। এভাবেই কথাটা ঘুরিয়ে বলা চলে আদ্রিয়াতিক শুধু যে ভেনিসের নাড়িতে আর রন্ধেরন্ধে প্রবেশ করেছে তাই নয়, সমুদ্র আর নগর যেন একাকার হয়ে মিশে গেছে। এই প্রাকৃতিক বৈশিষ্ট্যকে সুন্দর একটা অনুষ্ঠানের মাধ্যমে স্বীকৃতি দেবার প্রথা প্রচলিত ছিল ভেনিস নগরে। প্রতি বছর একটা বিশেষ দিনে বিবাহ বন্ধনের প্রতীক হিসেবে একটা মহামূল্য রত্নাঙ্গুরীয় জলে নিক্ষেপ করতেন ভেনিসের শাসনকর্তা ডোগবা ডিউক।

ভেনিস শহরের বৈশিষ্ট্য এই যে এখানে কোনও রাজপথ ছিল না। ছোটো, বড়ো অসংখ্য খাল ব্যবহৃত হত লোক চলাচলের জন্য। সমুদ্রের জল সেই সব খাল দিয়ে অবাধে প্রবেশ করত গৃহস্থের অন্দরে। দু-বার জোয়ারের সময় দোকানের সিঁড়িগুলি পর্যন্ত দৈনিক ধুয়ে দিত সমুদ্রের জল। অন্যান্য শহরের রাস্তায় যেমন অগুনতি গাড়ি-ঘোড়া চলে, ভেনিসের জলপথে তেমনি দেখা যেত অসংখ্য গণ্ডোলা নৌকা। সেগুলির কোনটা থাকত যাত্রী-বোঝাই আবার কোনওটা মালে ভর্তি।

ভেনিসের এই বৈশিষ্ট্য এখনও বর্তমান। যদিও কাল ধর্মের প্রভাবে সে বাণিজ্যিক সমৃদ্ধি আজ প্রায় অবলুপ্ত বললেই চলে। মধ্যযুগে ব্যবসায়িক সমৃদ্ধির কোনও সীমারেখা ছিল না। বণিকেরা সবাই ছিলেন ধনকুবের। তাদের জাহাজ পৃথিবীর সবদেশে যাতায়াত করত। ব্যাসানিও ছিলেন সম্পূর্ণ ভিন্ন চরিত্রের মানুষ। তার জীবনের একমাত্র উদ্দেশ্য ছিল স্মৃর্তি করা। ঘুমের সময়টুকু বাদ দিয়ে নাচ-গান, শিকার, জুয়ো খেলা –এরূপ একটা না একটা আনন্দে মেতে থাকতেন তিনি। পূর্বপুরুষের কষ্টার্জিত অৰ্থ এভাবেই বন্ধু-বান্ধবদের সাথে উড়িয়ে দিতেন তিনি। আন্তনিওর পক্ষে সম্ভব হত না। এ সব উৎসবে যোগ দেবার। কারণ বিলাসী হলেও তিনি ছিলেন কাজের লোক। কাজ-কর্ম নষ্ট করে এ সব উৎসবে যোগ দেবার কোনও সার্থকতা খুঁজে পেতেন না তিনি।

আয় থেকে অনেক বেশি ছিল ব্যাসানিওর ব্যয়। কাজেই তার ধনভাণ্ডার যে একদিন শেষ হবে সে তো জানা কথা। দেখতে দেখতে একদিন খালি হয়ে গেল তার ধনভাণ্ডার। কিন্তু তাতেও তার চৈতন্য হল না। ধার করেও নিজের ঠাট বজায় রাখতে লাগলেন ব্যাসিনিও।

একে একে সবই বিক্রির পর্যয়ে চলে এল —মফস্‌সলের জমিদারি, শহরের অতিরিক্ত ঘরবাড়ি, অপ্রয়োজনীয় জাহাজ, ব্যবহৃত আসবাবপত্র, সবই মহাজনের কাছে ধার নিতে হল তাকে আর সবশেষে আন্তনিওর কাছে ধার।

ধার করে এই রাজসিক ব্যয়ভার বেশিদিন টেনে নিয়ে যাওয়া সম্ভব নয়। তাই মাঝে মাঝে অর্থকষ্ট দেখা দিতে লাগল ব্যাসানিওর। এর একটা উপায় খুঁজে বের করতেই হবে তাকে। হয় তাকে অর্থের ব্যবস্থা করতে হবে, নইলে বাবুগিরি ত্যাগ করতে হবে। খুবই সঙ্কটের মাঝে পড়ে গেল ব্যাসানিও। আর কতই বা ধার নেওয়া যায় আন্তনিওর কাছ থেকে! বন্ধুর কাছে হাত পাততে খুবই লজ্জা হয় ব্যাসানিওর।

কী করে নিজের ভাগ্য ফেরানো যায় সে কথাই সব সময় চিন্তা করেন ব্যাসানিও। বন্ধুরা তো সবাই সুখের পায়রা। তাদের কাছে সাহায্য চেয়ে কোনও লাভ নেই। প্রকৃত হিতৈষী বলে যদি কেউ থাকে তবে তা আন্তনিও। তিনি সর্বদাই বলেন, তুমি এর একটা উপায় বের কর বন্ধু। আর সে কাজে সাফল্য অর্জন করতে গেলে যা যা সাহায্য, সহযোগিতার দরকার আমার কাছ থেকে তুমি তা পাবে। কিন্তু বেচারা ব্যাসানিওর মাথায় কোনও মতলবই আসছে না।

শেষে একদিন ভগবান মুখ তুলে চাইলেন তার দিকে। বেলমন্ট গ্রামে মারা গেলেন এক ভদ্রলোক। তিনি ছিলেন সে গ্রামের জমিদার, সেই সাথে কোটিপতি। এই ভদ্রলোকটির বাড়িতে একসময় দু-চার দিনের জন্য আতিথ্য গ্রহণ করেছিলেন ব্যাসানিও।

এই মৃত জমিদারের আপনজন বলতে ছিলেন তার একমাত্র মেয়ে পোর্সিয়া। পিতার অগাধ সম্পত্তির উত্তরাধিকারিণী ছিলেন তিনি। তখনও পর্যন্ত বিয়ে হয়নি তার। যার গলায় তিনি বরমাল্য দেবেন। সে হবে পৃথিবীর অন্যতম শ্রেষ্ঠ ধনী। শুধু ধন-সম্পদে নয়, রূপ-গুণেও তিনি ছিলেন সেরা। প্ৰভাতের মতো নির্মল আর পবিত্র ছিল তার সৌন্দর্য। মন থেকে তাকে এখনও পর্যন্ত মুছে ফেলতে পারেননি ব্যাসানিও। তার মনে হয় সে সময় পোর্সিয়ার সামান্য কৃপাদৃষ্টি পড়েছিল তার উপর।

সম্প্রতি পিতৃবিয়োগ হয়েছে পোর্সিয়ার। পিতার অগাধ সম্পত্তির একমাত্র অধিকারিণী তিনি। আর ব্যাসানিওকে আজ কপর্দকশূন্য বললেও কম বলা হয়। দেনার দায়ে মাথার চুল বিকিয়ে গেছে তার। খুব শীঘ্র প্রচুর টাকার ব্যবস্থা না হলে পাওনাদারদের হাতে লাঞ্ছনার সীমা থাকবে না তার। কারাবাস তো স্বাভাবিক ব্যাপার, আর তা হলে অভিজাত বংশের সন্তান ব্যাসানিওর পক্ষে আত্মহত্যা ছাড়া গতি নেই।

এই সংকট থেকে মুক্তি পাবার একমাত্র উপায় পোর্সিয়াকে বিয়ে করা। তাহলে শুধু সংকটমোচন নয়, জীবনে আর অর্থকষ্টের সম্মুখীন হতে হবে না। তাকে। বিলাস-ব্যসনে অপার আনন্দে কেটে যাবে তার জীবনের দিনগুলি।

এ কি নিছক দুরাশা? এক সময় পোর্সিয়া তাকে অনুগ্রহ করতেন বলে মনে পরে ব্যাসানিওর। কিন্তু সময় বদলে গেছে। তখন পোর্সিয়া নিজে ধনী হয়ে ওঠেনি। ব্যাসানিও তখন ছিলেন বিত্তশালী, স্মৃর্তিবাদ। আজ অভাবে তিনি ক্লান্ত। চেহারা, মেজাজ রুক্ষ। পোর্সিয়াকে আকর্ষণ করার শক্তি অপহৃত। তবু ভরসা পোর্সিয়া হালকা মানসিকতার মেয়ে নয়। সে একবার মন দিয়েছিল কাকে তাকে নিশ্চয়ই এত তাড়াতাড়ি ভুলে যায় নি। সুতরাং ভাগ্য নিয়ে পরীক্ষা দেওয়া যেতে পারে।

এই ভেনিসীয় বণিকদের মধ্যে সবার শ্রদ্ধার পাত্র ছিলেন আন্তনিও। একদিকে তিনি ছিলেন প্রচুর ধন-সম্পদের অধিকারী, অন্যদিকে সেই ঐশ্বর্যের সদ্ব্যবহারে মুক্তহস্ত ছিলেন তিনি। তার দরজা থেকে কখনও বিমূখ হয়ে কেউ ফেরেনি। আর্তের সেবায় এগিয়ে যাওয়াটাকেই তিনি নিজের পবিত্র কর্তব্য বলে মনে করতেন।

অভিজাত বংশের সন্তান আন্তনিওর পক্ষে বিলাস-ব্যসনে থাকাটাই স্বাভাবিক। অনেক সময় তার ইচ্ছে না থাকলেও বন্ধু-বান্ধবের চিত্ত বিনোদনের জন্য বড়ো বড়ো ভোজের আয়োজন করতে হত। দেহ-সৌষ্ঠব বজায় রাখার জন্য মহার্ঘ্য বেশভূষায় সজ্জিত হতেন তিনি। অভাবগ্ৰস্ত অভিজাত যুবকদের সাহায্য করতে তিনি সব সময় প্রস্তুত থাকতেন। অনেকেই তার কাছ থেকে ধার নিয়ে আর পরিশোধ করত না। কেউ ঋণ পরিশোধ করতে এলেও তার কাছ থেকে কোনও সুদ নিতেন না তিনি।

আন্তনিওকে সর্বদাইঘিরে থাকতেন স্যালারিও, ব্যাসানিও, গ্রাসিয়ানো, লোরেঞ্জ প্রভৃতি অভিজাত বংশীয় যুবকেরা! আন্তনিওর মন ছিল যেমনি উদার তেমনি ছিল তার প্রচুর অর্থ–এই দুকারণে সবাই ইচ্ছে করত তাকে বন্ধুভাবে পেতে। সবার সাথে সুমধুর ব্যবহার করতেন স্নেহশীল আন্তনিও, যদিও তার কিছুটা পক্ষপাতিত্ব ছিল বন্ধু ব্যাসানিওর উপর।

ব্যাসানিও ছিলেন আন্তনিওর মতো এক অভিজাত বংশের সন্তান। ধন-সম্পদ তারও কিছু কম ছিল না। কিন্তু একটা বিষয়ে তার সুস্পষ্ট পার্থক্য ছিল আন্তনিওর সাথে। টাকা-পয়সা যতই ব্যয় করুন না কেন, ব্যবসাকে কখনও অবহেলার চোখে দেখতেন না আন্তনিও। সর্বদা সাত-সমুদ্র আলোড়িত করে ফিরত তাঁর বাণিজ্য তরী। ব্যবসা পরিচালনা করার জন্য প্রচুর পরিশ্রম করতেন তিনি।

কিন্তু ভাগ্য পরীক্ষা কি করে? কোটিপতি পোসিয়ার পাণি-প্রার্থনা করতে গেলে কমসে কম লাখাপতির মতো জাকজমকের প্রয়োজন। একটা প্ৰবাদ আছে যে রাজা কোয়ান্টুরা এক ভিখারিণী মেয়েকে বিয়ে করেছিলেন। কিন্তু ইতিহাস, শাস্ত্র বা রূপকথায় এমন কোনও উদাহরণ নেই যে একজন রানি সিংহাসন থেকে নেমে এসে একজন ভিক্ষুকের পায়ে আত্মসমর্পণ করেছেন।

মনে মনে একটা হিসাব করতে বসলেন ব্যাসানিও। পোসিয়ার পাণিপ্রার্থী হয়ে বেলমেন্টে যেতে হলে দামি সাজ-পোশাকের প্রয়োজন। সেই সাথে দশ-বারো জন জমকালো পোশাক পরা ভৃত্য, কিছু যানবাহন এবং প্রয়োজনীয় অর্থ থাকা চাই যা দিয়ে পাথেয় ও পারিতোষিক দেওয়া সম্ভব হবে। সুষ্ঠুভাবে এসব করতে গেলে অন্ততপক্ষে তিন হাজার ডুকাট স্বর্ণমুদ্রার প্রয়োজন।

হিসাব কষার পর কয়েকদিন বিষন্ন মনে চুপচাপ রইলেন ব্যাসানিও। ভাবতে লাগলেন কোথায় পাওয়া যাবে এই তিন হাজার ডুকাট স্বর্ণমুদ্রা? এক পয়সা যার সম্বল নেই সে এত টাকার অলীক স্বপ্ন দেখে কী করে?

তা ছাড়া কেইবা তাকে ধার দেবে এত টাকা? কিন্তু আশা মোহিনী। সে বারবার ব্যাসানিওর মনকে উত্তেজিত করে বলতে থাকে–একবার দেখিনা আন্তনিওর কাছে এ প্রস্তাবটা রেখে। সে ভালো লোক, তোমায় সত্যিই ভালোবাসে। আন্তনিওর কাছ থেকে তুমি টাকাটা হয়তো পেলেও পেতে পোর। তাছাড়া তুমি তো আর সে টাকাটা মেরে দিচ্ছ না। পোর্সিয়ার সাথে বিয়ে হলেই তুমি আন্তনিওর ধারা আর সেই সাথে আগের সমস্ত ধার শোধ করে দিতে পারবে। শেষমেশ বন্ধ আন্তনিওর কাছে যেতে বাধ্য হলেন ব্যাসানিও।

তিনি আন্তনিওকে বললেন, বন্ধু, তোমার কাছে ঋণের শেষ নেই আমার। অর্থ আর কৃতজ্ঞতার ঋণ উভয়ই সমান। কোনওদিন যে এসব শোধ করতে পারব সে আশা আমার নেই। এদিকে আমার যে কত শোচনীয় অবস্থা সে খবর জানা নেই তোমার। অবিলম্বে আমি যদি প্রচুর অর্থ জোগাড় করতে না পারি, তাহলে সবার সামনে অপমানিত হতে হবে আমাকে। এমন কি পাওনাদারদের নালিশের ফলে আমার কারারুদ্ধ হওয়াও আশ্চর্য নয়। এখনই এর একটা বিহিত না করলে নয়। আর তুমি ছাড়া আর কারও পক্ষে এ ব্যবস্থা করা সম্ভব নয়।

বন্ধুর এই করুণ অবস্থা দেখে খুবই কাতর হয়ে পড়লেন আন্তনিও। ভাবলেন, কীভাবে এ বিপদের নিরসন হতে পারে? ব্যাকুল হয়ে জানতে চাইলেন ব্যাসানিওর মাথায় কোনও উপায় এসেছে কিনা। পোর্সিয়া ঘটিত ব্যাপারটা তখন আন্তনিওকে খুলে বললেন ব্যাসানিও। পোর্সিয়া যে এক সময় ব্যাসানিওর প্রতি অনুরক্তির আভাস দিয়েছিলেন সে কথাও বন্ধুকে জানাতে ভুললেন না ব্যাসানিও। তিনি হিসাব কষে বন্ধুকে দেখিয়ে দিলেন যে পোর্সিয়ার পাণিপ্রার্থী হতে গেলে সবার আগে দরকার তিন হাজার ডুকাটি স্বর্ণমুদ্রা। পোর্সিয়ার সাথে বিয়ে হলেই তিনি যে বন্ধুর প্রাপ্য সব টাকা শোধ দিয়ে দেবেন। সে কথাও বন্ধুকে জানাতে ভুললেন না ব্যাসানিও।

ধৈর্য ধরে ব্যাসানিওর সব কথা শুনলেন আন্তনিও। তারপর অসহিষ্ণুভাবে বললেন তাকে, তুমি কি আমায় চেন না যে আজ এভাবে দুঃখের কঁদুনি গাইছ? জেনে রাখ, আমার হাতে এক পয়সা থাকলে তার আধিপয়সা থাকবে তোমার প্রয়োজনের জন্য। আমি ধার হিসেবে টাকাটা তোমায় দেইনি। আর তুমি তা ফেরত দেবে সে আশাও আমি মনে স্থান দেইনি। টাকাটা ফেরত দিতে এলেও আমি তা নেব না। যদি না সে সময় প্রচণ্ড অর্থকষ্টে পড়ি।

তবে এখন এসব আলোচনা না করাই ভালো। তোমার মাথায় যে মতলবটা এসেছে তা নেহাত খারাপ নয়। অনেক দুঃস্থ যুবক মুক্তি পেয়েছে প্রেমের দেবতার কৃপায়। পাত্র হিসেবে তুমি যে অনুপযুক্ত সে কথা বলার সাহস কারও নেই। তুমি বিলাসী হলেও দুশ্চরিত্র নও। লেখাপড়া না জানলেও তুমি যে ভেনিসের প্রথম সারির অভিজাতদের একজন, সে কথা বলার অপেক্ষা রাখে না। তাছাড়া তুমি বলছি যে বেলমন্টে থাকাকালীন পোর্সিয়া তোমার উপর কৃপাদৃষ্টি দেখিয়েছে, সে কথা সত্যি হলে তো সোনায় সোহাগা। আর তা সত্যিই না হলেও হতাশ হবার কিছু নেই। কারণ তোমাকে অগ্রাহ্য করা কোনও মেয়ের পক্ষে সম্ভবপর নয়। অনেক সময় জুয়া খেলে লাখ লাখ টাকা তুমি নষ্ট করেছ। আর এখন তিন হাজার ডুকাট টাকাও লোকসান হয়, সেটা এমন কিছু বেশি। নয়। কিন্তু মুশকিল হয়েছে কী জান অত টাকা তোমার নেই, আর আমারও নেই।

আন্তনিওর কথা শুনে যেন আকাশ থেকে পড়লেন ব্যাসানিও। তিনি বললেন, কী বলছি হে? তিন হাজার ডুকাট টাকা তোমার কাছে নেই? এ কথা কি বিশ্বাসযোগ্য? অন্য কেউ হলে না হয় ভাবতাম আমায় সাহায্য করবে না বলে অর্থাভাবের অজুহাত দিচ্ছে। কিন্তু তোমার সম্বন্ধে সে কথা মনে আনাও পাপ। তোমাকে আমি বহুদিন ধরে চিনি। তোমার সম্বন্ধে আমার চেয়ে ভালো আর কে জানে?

আন্তনিও বললেন, তুমি যদি আমায় চেন, তাহলে বিশ্বাস কর আমার কথা। এই মুহূর্তে তিন হাজার ডুকাটি আমার হাতে নেই। তা বলে কি নিঃস্ব, মোটেই নয়। আমার সম্পত্তি আছে বইকি। গুদামভরা পণ্য রয়েছে, সমুদ্রে ভেসে বেড়াচ্ছে আমার বিশাল বিশাল জাহাজ। নিঃস্ব না হলেও এখন আমার হাতে নগদটাকা নেই। তিন হাজার ডুকাট কেন, দু-মাস বাদে এলে আমি ত্ৰিশ হাজার ডুকাটিও অক্লেশে তুলে দিতে পারব তোমার হাতে। কিন্তু এই মুহূর্তে তিন হাজার কেন, তিনশো। দিতেও আমি অপারগ। আন্তনিওর কথা শুনে নিরাশ হয়ে বলল ব্যাসানিও, দুমাস বাদে পোর্সিয়া কি আর আমায় বিয়ে করতে রাজি হবে? তুমি তো জান না পৃথিবীর নানা দেশ থেকে পাণিপ্ৰথীরা এসে হাজির হয়েছে। বেলমন্টের প্রাসাদে। তাদের অনেকেই নানা গুণ–সম্পন্ন, নেপলসের রাজাও রয়েছেন তাদের মাঝে। তাছাড়া রয়েছেন জার্মানির কাউন্ট প্যালাটাইন, ফরাসিদের একজন, ব্রিটেনের একজন এবং স্কটল্যান্ডের একজন জমিদার, এমনকি মিশরের একজন প্রতিনিধিও এসেছেন। খানকতক মমি উপহার নিয়ে। এতসব প্রার্থীকে বাতিল করে পোর্সিয়া দুমাস অবিবাহিতা থাকবেন। এ আশা আমি করি না।

এতসব নামি প্রার্থীর কথা শুনে সত্যিই ভয় পেয়ে গেল আন্তনিও। সত্যিই তো, যে কোনও সময় ঠিক হয়ে যেতে পারে পোর্সিয়ার বিয়ে। তাহলে তো ছাই পড়বে ব্যাসানিওর সব আশায়।

শেষমেশ তাকে বলতেই হয়, বন্ধু, তাহলে তুমি এক কাজ কর। খোজ নিয়ে দেখ কোথায় ধার পাওয়া যায় তিন হাজার ডুকাট। অবশ্য শুধু হাতে কেউ তোমায় এত টাকা ধার দেবে না। তুমি সবাইকে বলবে এই ধারের জন্য জামিন থাকবেন আন্তনিও। আশা করি তা হলে ধার পেতে অসুবিধে হবে না তোমার। দুমাসের মধ্যে আমার জাহাজগুলি ফিরে আসবে সে আশা আমি রাখি। তাহলেই সে ধার শোধ করে দেব। আমার পক্ষে কষ্টকর হবে না।

ব্যাসানিও বললেন, আর এর মধ্যে যদি পোর্সিয়ার কৃপা পেয়ে যাই তাহলে জাহাজ আসা পর্যন্ত তোমায় অপেক্ষা করতে হবে না!

আন্তনিও হা হা করে হেসে উঠে বললেন, সে তো বটেই। আশা করি জাহাজ ফিরে আসার জন্য অপেক্ষা করতে হবে না তোমায়। কিন্তু খারাপ দিকটাও ভাবা দরকার। ধর, যদি পোর্সিয়া তোমায় অপছন্দ করে তাহলেও নিরাশ হবার কিছু নেই। তুমি মহাজনের কাছে তিন মাসের সময় চাইবে। তাহলেই যথেষ্ট। আর দুমাসের মধ্যে আমার জাহাজগুলি তো এসেই যাবে। তখন এই ধার শোধ দেওয়া আমার পক্ষে মোটেই কষ্টকর হবে না।

তোমার নাম করলে আর কেউ সুদ চাইবে না, কারণ তুমি তো ধার দিয়ে সুদ নেও না, বললেন ব্যাসানিও।

আন্তনিও বললেন, আমি জানি খ্রিস্টান মহাজনেরা সুন্দ নেবে না, কারণ টাকা ধার দিয়ে সুদ নেওয়া বাইবেলে নিষিদ্ধ। তাছাড়া ভেনিসের জন সাধারণের কাছে আমার একটা ব্যক্তিগত খাতির আছে। তুমি খোজ নিয়ে দেখা খ্রিস্টান মহাজনের কাছে ধারা পাওয়া যায় কিনা। না পেলেও তাতে ভয় পাবার কিছু নেই। কোনও ইহুদি যদি ধার দিতে চায় তাহলে আমরা সেটা নেব। আমরা যে কোনও সুন্দ দিতে রাজি। কারণ আমাদের প্রচুর অর্থের প্রয়োজন।

আন্তনিওর মহত্ত্বে নূতন করে মুগ্ধ হয়ে আবার ধারের চেষ্টায় বেরিয়ে পড়লেন ব্যাসানিও। আগে যারা ব্যাসানিওকে দেখলে ঘরের দরজা বন্ধ করে দিত, এবার তারাই আন্তনিওর নাম শুনে খাতির করে তাকে বসিয়ে ধারের প্রস্তাবনা ভালোভাবে জেনে নিত। কিন্তু দুৰ্ভাগ্য ব্যাসানিওর, সে সময় কোনও খ্রিস্টান বণিকের হাতেই টাকা ছিল না। তাদের সবার জাহাজও সে সময় আন্তনিওর মতো সমুদ্রে ঘুরে ঘুরে ব্যবসা করত। দু-মাসের মধ্যেই সব জাহাজ বন্দরে ভিড়বে। তখন আন্তনিওর নাম করে যােত ইচ্ছে ধার নেওয়া যেতে পারে। কিন্তু জাহাজ না ফেরা পর্যন্ত আন্তনিওর মতো সবাই সাময়িকভাবে নিঃস্ব। কাজেই তিন হাজার ডুকাট বের করা এখন কারও পক্ষে সম্ভবপর নয়।

হতাশ হয়ে পড়লেন ব্যাসানিও। পোর্সিয়াকে বিয়ে করা আর বোধ হয় তার ভাগ্যে নেই। এই ভেনিস শহরে দুমাসের আগে টাকা পাবার কোনও আশা নেই। আর এই দুমাসের মধ্যে পোর্সিয়ার পাণিপ্রার্থীরা কেউ সফল হবে না, এ আশা বাতুলতা ছাড়া আর কিছু নয়।

বণিকদের দ্বারে দ্বারে ধার চেয়ে বিফল হয়ে একদিন অপরাস্তুে যখন বাড়ি ফিরে আসছেন। ব্যাসানিও, এমন সময় খাল ধার থেকে কে যেন ডেকে উঠল তাকে। সাথে সাথে ফিরে দাড়ালেন তিনি। দেখলেন এক লম্বা দাড়িওয়ালা নুঢুক্ত দেহ তির্যকদূষ্টির বৃদ্ধ ডাকছে তাকে। তিনি চিনতে পারলেন লোকটিকে —ও আর কেউ নয় ইহুদি শাইলক। প্যালেস্টাইনের অধিবাসীদের বলা হয়। ইহুদি। প্ৰভু যিশুর আবির্ভাব ও ধর্মপ্রচারের আগে ইহুদি ধর্ম প্রচলিত ছিল প্যালেস্টাইনে। এই ইহুদি পুরোহিতদের প্ররোচনায় যিশুখ্রিস্টকে ক্রুশবিদ্ধ করেছিল রোমের শাসকেরা।

টাকা-পয়সার লেনদেনই ছিল ইহুদিদের প্রধান উপজীবিকা। ইউরোপের সমস্ত দেশেই ছড়িয়ে ছিল তারা। সমাজ ও রাষ্ট্রে আর্থিক ব্যবস্থাপনার উপর প্রচুর প্রভাব ছিল তাদের। ব্যবসা-বাণিজ্যের বড়ো একটা ধার ধারত না তারা। দুর্দশাগ্ৰস্ত লোককে টাকা ধার দিয়ে চড়া হারে সূদ নিত তারা। এই ভেনিস শহরে শাইলকের মতো নির্মম সুদখোর আর কেউ ছিল না। এমনকি অন্যান্য ইহুদিরাও তার এই অস্বাভাবিক অর্থ-লালসার জন্য ঘৃণা করত শাইলককে।

হঠাৎ ব্যাসানিওকে ডাকলেন কেন শাইলক?

নিশ্চয়ই এর কারণ আছে।

ভেনিসীয় বণিকদের টাকা-পয়সা লেন-দেনের জায়গািটার নাম রিয়ালতো। একটা বড়ো খালের উপরিস্থিত সুপ্ৰশস্ত পুল হল এটা। এই পুলের উপর জড়ো হয়ে আর্থিক বিষয়ে আলোচনা করতেন বণিকেরা। শাইলকের প্রতি বণিকদের যতই বিতৃষ্ণা থাক না কেন, এখানে আসতে তার কোনও বাধা ছিল না। কারণ তাকে বাধা দেবার অধিকার কারও নেই। এখানকার আলোচনা থেকেই শাইলক জানতে পেরেছেন তিনহাজার ডুকাটি ধারের জন্য হন্যে হয়ে ঘুরে বেড়াচ্ছেন ব্যাসানিও। আর লোকের মুখে মুখে একথাও ছড়িয়ে পড়েছে যে এই ধারের জন্য জামিন হতে রাজি আছেন। মাননীয় আন্তনিও।

ব্যাসানিওকে ডেকে জানতে চাইলেন শাইলক, কেমন আছেন ব্যাসানিও?

শাইলকের প্রতি প্রচণ্ড ঘৃণা ছিল ব্যাসানিওর এবং তাকে তিরস্কার করতেও ছাড়তেন না। কিন্তু এ সময় শাইলেককে এখানে দেখে ক্ষীণ আশার আলো দেখা দিল তার অস্তরে। হোক না ইহুদি, শাইলকও তো টাকা ধার দিয়ে থাকে। আর আন্তনিও তো বলেই দিয়েছেন। খ্রিস্টানদের কাছে না পেলে ইহুদিদের কাছে টাকা ধার করলেও তার কোন আপত্তি নেই। শাইলক যখন এখানে উপস্থিত আছে তখন তার কাছে প্রস্তাবটা করে দেখতে ক্ষতি কী।

সরলহাদয় ব্যাসানিও কিন্তু জানতেন না তার প্রয়োজনের কথা আগে থেকেই জেনে গেছেন শাইলক। শুধু তাই নয়, আন্তনিও যে এর মধ্যে জড়িয়ে আছেন সে ব্যাপারে নিশ্চিত হয়েই ধূর্ত শাইলাক আজ এসেছে এখানে।

যদিও ব্যাসানিওকে ডেকে থামিয়েছে শাইলক, কিন্তু সে প্রকাশ করেনি কেন ডেকেছে তাকে। শাইলক চায় যার প্রয়োজন প্রস্তাবটা তার মুখ থেকেই আগে আসা উচিত।

ব্যাসানিও কিন্তু এত সব বুঝলেন না। তিনি আগ বাড়িয়ে পা দিয়ে বসলেন শাইলকের ফাদে। তিনি হাসিমুখে শাইলককে বললেন, এই যে শাইলাক! খুবই ভালো হল তোমার সাথে দেখা হয়ে। তুমি তো শহরের শ্রেষ্ঠ মহাজনদের একজন। তা তুমি কি আমায় তিনহাজার ডুকাটি ধার দিতে পার? খুব বেশিদিনের জন্য নয়, মাত্র তিনমাসের জন্য টাকাটা ধার চাইছি আমি। আন্তনিও জামিন হবেন। এর জন্য তুমি যা সুদ চাইবে তিনি তাই দেবেন।

ব্যাসানিওর কথা শুনে যেন আকাশ থেকে পড়লেন শাইলক, বললেন, টাকা? আন্তনিও? তার আবার টাকার অভাব! জামিন না হয়ে তিনি নিজেই তো টাকাটা দিতে পারেন। ইচ্ছে করলে তিনি আমার মতো দু-পাঁচটা সুদখোর ইহুদিকে অনায়াসেই কিনে নিতে পারেন।

ব্যাসানিও উত্তর দিলেন, তা অবশ্যই তিনি পারেন। তবে বর্তমানে তিনি কিছু অসুবিধার মধ্যে রয়েছেন। জাহাজগুলি ফিরে না। আসা পর্যন্ত নগদটাকার আমদানি নেই। অথচ আমার এখনই প্রয়োজন তিন হাজার ডুকাট। আমি বলি কি তুমি তো অনায়াসেই এ টাকাটা আমায় ধার দিতে পার।

এ কথা শুনে চিন্তিত হয়ে পড়লেন শাইলক। কিছুতেই তার মাথায় ঢুকছে না মাত্র তিনমাসের জন্য কেন, তায় আবার জামিন আন্তনিও। সুদও যা খুশি। একটু ভেবে বললেন, কত টাকার প্রয়োজন আপনার, তিন হাজার ডুকাট? সে যে অনেক টাকা। কিন্তু…।

বিরক্ত হয়ে বললেন ব্যাসানিও, ও নিয়ে আপনি ভাবছেন কেন? আন্তনিওই তো জামিন রয়েছেন।

বাধা দিলে বললেন শাইলক, ঠিকই বলেছেন। আপনি। লোক হিসেবে আন্তনিও মোটেই খারাপ নন।

ব্যাসানিও খুব রেগে গেলেন শাইলকের কথা বলার ধরনে। শাইলক তাকে টাকা ধার দিক বা নাদিক, ওর মতো ঘূণ্য লোকের কাছ থেকে আন্তনিও সম্পর্কে বিদ্রুপ বা সমালোচনা, কোনওটাই শুনতে রাজি নন তিনি। তাই তিনি বলে উঠলেন, আন্তনিও যে ভালো লোক সে কথা কি ভেনিসের মানুষ জানে না? এতে কি আপনার কোনও সন্দেহ আছে?

সাথে সাথেই জিভ কেটে বললেন শাইলক, আরে নামশাই, আন্তনিও সম্পর্কে আমার কোনও সন্দেহ নেই। কিন্তু উনি ভালো লোক এ কথার অর্থটা আপনার ঠিক বোধগম্য হয়নি। ভালো লোক আমরা তাকেই বলি যার আর্থিক অবস্থা ভালো। আর যতদূর জানি আন্তনিওর আর্থিক অবস্থা এমন কিছু খারাপ নয় যাতে তাকে তিনহাজার ডুকাট ধার দেওয়া চলে না।

শাইলকের কথা শুনে বারুদের মতো জ্বলে উঠলেন ব্যাসানিও, মাত্র তিন হাজার ডুকাটি? আপনি কি জানেন তার এক একখানা জাহাজে মাল থাকে ত্ৰিশ হাজার ডুকাটের?

ব্যাসানিওর কথা শুনে গম্ভীর হয়ে বলল শাইলক, তা হতে পারে। তবে জাহাজ তো কাঠ ছাড়া আর কিছু দিয়ে তৈরি হয় না। আপনি নিশ্চয়ই শুনেছেন কাঠের জাহাজ মাঝে মাঝে সমুদ্রে ডুবে যায়। তাছাড়া চড়ায় বেঁধে জাহাজ অচল হয়ে যেতে পারে, চোরা পাহাড়ে ধাক্কা লেগে তলা ফেসে যেতে পারে, জলে ডুবে যেতে পারে, আগুনে পুড়ে যেতে পারে–এরূপ যে কোনও ঘটনা ঘটে যেতে পারে। তার উপর আবার রয়েছে বোম্বোটেদের উৎপাত। না বাবা, আর যার সাহস থাক শাইলক রাজি নয় নগদটাকায় মাল কিনে জাহাজে পাঠাতে। হাঁ, কী যেন বলছিলেন আপনি? এক হাজার ডুকাট ধার চান?

ব্যস্ত হয়ে বললেন ব্যাসানিও, এক হাজার নয়, তিনহাজার। আর তাও মাত্র তিনমাসের জন্য।

শাইলক বলনেল, মাত্র তিনমাস? আমি তো ভেবেছিলাম এক বছরের জন্য কারণ সেটাই আমাদের রীতি কিনা। যা হোক, আমি না হয় তিনমাসের কথাই মেনে নেব। যদিও আন্তনিওর জাহাজগুলি সমুদ্রে ঘুরে বেড়াচ্ছে, তা সত্তেও আন্তনিওর জমিনে টাকা ধার দেব আমি। তবে কি জানেন, আমি একবার দেখা করতে চাই আন্তনিওর সাথে। সে ব্যবস্থা করা সম্ভব কি?

এ যেন মেঘনা চাইতেই জল। এ সময় অদূরে খালের ধারে দেখা গেল আন্তনিওকে। এ সময় তাকে এখানে দেখতে পেয়ে সেটাকে দৈব যোগাযোগ বলে মেনে নিলেন ব্যাসানিও। তিনি আশায় রইলেন এই ভেবে যে এবার তার কার্যোদ্ধার হবে। কিন্তু আন্তনিওকে দেখেও না দেখার ভান করল শাইলক। সে এমন ভাব দেখাতে লাগল যেন ধারের ব্যাপারটা নিয়ে সে চিন্তামগ্ন।

কাছে এসে আন্তনিও ব্যাসানিওর কাছে জানতে চাইলেন সে কোনও আশার আলো দেখতে পেয়েছে কিনা। ব্যাসিনিও জনাস্তিকে তার বন্ধুকে জানাল এই মাত্র শাইলকের সাথে কথা হয়েছে এবং মনে হয় সে রাজি আছে। তখন শাইলককে উদ্দেশ করে বললেন আন্তনিও, ওহে শাইলাক! তুমি আমাদের এই উপকারটা করবে কি?

সুপ্তোত্থিতের মতো আন্তনিওর দিকে তাকিয়ে বলল শাইলক, এক বছরের জন্য এক হাজার ডুকট, তাই না? বাধা দিয়ে বললেন ব্যাসানিও, না হে, তিন মাসের জন্য তিন হাজার ডুকাট। আর তার জন্য জামিন হবেন আন্তনিও — এ কথা তো বারবার বলেছি তোমায়! একটু আগেই তো তুমি বলেছিলে আন্তনিওর সাথে দেখা হলে ভালো হয়। এই তো তিনি এসে গেছেন। এবার তোমার যা জিজ্ঞেস করার তা করে নাও।

ব্যাসানিওর কথা যেন শুনতেই পেল না। শাইলক। সে আপন মনে বিড়বিড় করে কী যেন বলছিল। ব্যাসানিও স্পষ্ট শুনতে পেলেন শাইলকের কথা। সে বলছিল, আমি কুত্তা? কুত্তার কি টাকা থাকে? সে কি কাউকে তিন হাজার ডুকাট ধার দিতে পারে? তিন মাস কেন, এক মাসের জন্যও সে তা পারে না। অথচ এই কুত্তার কাছেই এসেছেন অভিজাত বংশীয় মাননীয় খ্রিস্টান ভদ্রলোকেরা….।

ব্যাসানিও রেগে গিয়ে বললেন, কী বলছি তুমি?

শাইলক উত্তর দিলেন, বলছি আমি তো একটা কুত্তা। মহামান্য আন্তনিও হাজার বার আমায় কুত্তা বলে গালাগাল দিয়েছেন। প্রকাশ্যে হাজার লোকের সামনে তিনি একাজ করেছেন। অথচ আমার কী অপরাধ তা আমি জানি না। তিনি বলেছেন টাকা ধার দিয়ে সুদ নেওয়া কুত্তার কাজ। আমার অভিমত অকারণে আমি কেন টাকা ধার দেব। লোকের উপকারের জন্য? বেশ তো, আমি যখন লোকের উপকার করতে যাব, তখন লোকেরাও উচিত প্রতিদানে আমার উপকার করা। বিনামূল্যে কারও কাছ থেকে কিছু নেওয়া কি উচিত? উপকার চাইলে তার দাম দিতে হবে। সেই দামটাই সুদ। দাম না দিয়ে রুটি, মাংস কিছুই কেনা যায় না। অথচ যারা রুটি বেচে, মাংস বেচে টাকা নেয়, কই মহামান্য আন্তনিও তো কখনও তাদের কুত্তা বলেন না!

শাইলকের কথা শুনে রীতিমতো রেগে গেলেন আন্তনিও। তিনি বললেন, এ কথা ঠিক যে আমি তোমায় কুত্তা বলেছি। তবে রুটি বেচে পয়সা নেওয়া আর ধার দিয়ে সূদ নেওয়া এক কথা নয়। আর তোমার সুদের চাপাটাও খুব কম নয়। আমি নিজের চোখেই দেখেছি। ওই চাপে পড়ে কত লোক পথের ফকির হয়ে গেছে। আমি নিজে সুদ নেই না, সেজন্য প্রচণ্ড ঘৃণা করি সুদখোর লোককে। তাদের মধ্যে আমি সবচেয়ে বেশি ঘৃণা করি তোমাকে। আমি তোমায় কুত্তা বলেছি আর চিরকাল বলব সে কথা। তোমার কাছে ধার চাইছি বলে তুমি মনে কর না যে অন্যভাবে আমি তোমায় সম্বোধন করব।

কুটিল হেসে শাইলক বলল, তবুও তুমি আমার কাছ থেকে ধারা পাবার আশা করা? কেন করব না, বললেন আস্তানিও, কারণ ওটাই তো তোমার পেশা। তোমার কাছ থেকে টাকা নিলে তো তোমারই উপকার হয়। কেউ টাকা ধার না নিলে সুন্দ পাবে কোথায়? আর সুদ না পেলে তুমি দু-দিনেই গুকিয়ে যাবে, তবে অভাবে নয়, মনস্তাপে। টাকা ধার নিয়ে আমি তার সুন্দ দেব, তাহলে কেন ধার দেবে না তুমি? আমি সুদ দেব আবার কুত্তা বলে তোমায় গালাগাল দেব। তবুও তুমি হাসিমুখে ধার দেবে! এবার বল কত সুদ চাও তুমি। আমি তোমায় এত চড়া সুন্দ দিতে রাজি আছি যা তুমি আজ পর্যন্ত কারও কাছ থেকে পাওনি। চড়া সুদ আমি এজন্যই দেব যাতে রিয়ালতোর উপর দাঁড়িয়ে বলতে পারি, তোমরা সবাই দেখ ওই কুত্তা শাইলক আমার কাছ থেকে কীরূপ চড়া সুন্দ আদায় করেছে। তুমি স্বপ্নেও ভেব না। ধার চাইছি বলে আমি তোমায় বন্ধুভাবে মেনে নিচ্ছি। আর তুমিও আমায় বন্ধু ভেবে ধার দিও না। মনে কর শক্রকে বিপদে ফেলার আশায় তুমি তাকে ধার দিচ্ছি।

এরপর গভীর হয়ে বললেন আন্তনিও, কিন্তু তোমার সিদ্ধান্তটা তো জানা গেল না। স্পষ্ট করে বল তুমি আমায় টাকা ধার দেবে কিনা?

গভীর মনস্তাপের সাথে বলল শাইলক, টাকা দেব না কেন? তোমাদের যখন দরকার তখন নিশ্চয়ই দেব। তবে আমার নিয়ম হচ্ছে ধার দিয়ে সুদ নেওয়া আর তোমাদের হচ্ছে সুদ না নেওয়া। বেশ তো তোমাদের নিয়মই আমি মেনে নিচ্ছি। এক পয়সাও সুদ নেব না আমি। এতে যদি তোমাদের বন্ধুত্বের কিছুটাও পেতে পারি, আমার বিবেচনায় সেটাই পরম লাভ।

শাইলকের কথা শুনে প্ৰথমে বিশ্বাস করে উঠতে পারেননি আন্তনিও। তবে কি শাইলক সম্পর্কে একটা ভুল ধারণা এতদিন ধরে মনে পুষে রেখেছেন তিনি? তবে কি সত্যিই ও খারাপ লোক নয়? বেশ তো, ফলেন পরিচিয়তে। এই ধারের ব্যাপারটাতেই বোঝা যাবে ওর আসল পরিচয়।

শাইলক বলল, বেশ তো শুভস্য শীঘ্ৰং। তবে আমার কাছে তো অত টকা নেই। কাছেই আমার এক আত্মীয় আছে তার নাম তুবাল। যা কম পড়বে তা ওর কাছ থেকে নিয়ে নেব। যাই, ওর বাড়ি থেকে বাকি টাকাটা নিয়ে আসি। তোমরা এর মধ্যে উকিলের কাছে গিয়ে দলিল লেখা পড়ার কাজটা সেরে ফেল। সুন্দ-ফুদ নয়, দলিলে শুধু একটা কথা লেখা থাকবে-অবশ্য সেটা তামাশা ছাড়া আর কিছু নয়— দলিলে তোমরা শুধু লিখে দিও যদি তিনমাসের মধ্যে টাকাটা পরিশোধ না হয় –অবশ্য আন্তনিওর কাছ থেকে টাকাটা আমি নেব, ব্যাসানিওকে অকারণ জড়ােব না। এর মধ্যে — যে জমিনদার প্রকারান্তরে সেই দেনাদার। তাই দলিলটা আন্তনিওই দেবেন। –আর সুদের পরিবর্তে স্রেফ তামাশার জন্যই একটা শর্ত লেখা হবে তাতে যে….।

অসহিষ্ণভাবে আন্তনিও বললেন, পরিষ্কার করে বলো না বাপু, দলিলে কী লেখা হবে। তোমার প্যাচালো কথা-বার্তা শুনে আমার সন্দেহ তো বেড়েই যাচ্ছে।

শাইলক বলল, না, না, সন্দেহের কিছু নেই। এতে। সন্দেহ করলেই তো সব কাজ পণ্ড হয়ে যায়। দলিলে যা স্পষ্ট করে লিখতে হবে তা হল নির্দিষ্ট দিনে ধার শোধ দিতে অপারগ হলে আন্তনিওর শরীরের যে কোনও জায়গা থেকে এক পাউন্ড মাংস আমি কেটে নিতে পারব। তোমরা যখন ইহুদিকে পিশাচ বলেই মনে কর, তখন এরূপ একটা পৈশাচিক শর্তই দলিলে লেখা থাক।

চমকে উঠলেন ব্যাসানিও, না, এরূপ একটা শর্ত কিছুতেই দলিলে লেখা যাবে না। আমি কিছুতেই এমন দলিলে সই করতে দেবনা আন্তনিওকে।

ব্যাসানিওর কথায় ক্ষুন্ন হয়ে বলল শাইলক, আরে, আমি কি সত্যিই তোমার বন্ধুর দেহের মাংস কেটে নেব? এতে আমার লাভ? গোরু-শুয়োরের মাংস হলে না হয় খাওয়া যেত। মানুষের মাংস কুকুরকে দিলেও সে মুখ ফিরিয়ে নেবে। আসলে পরিহাসের ছলে তোমাদের মনোভাব পরীক্ষা করছিলাম আমি। দেখছি, বিনা সুদে টাকা ধার দিতে রাজি হয়েও তোমাদের মনের অবিশ্বাস দূর করতে পারিনি আমি। যাই হোক, তোমরা যখন আমায় বিশ্বাস কর না তখন কী দরকার আমার সাথে কাজ-কারবার করে।

কথাটা বলেই নিজের বাড়ির দিকে যাবার উপক্রম করল শাইলক। আন্তনিও তাকে ডেকে ফেরালেন। তিনি নিজেও কম আশ্চর্য হননি শাইলকের কথা শুনে, তবে ভয় পাবার পাত্র তিনি নন। সুযোগ পেলেই শাঁইলক যে দেহের মাংস কেটে নিয়ে তার মৃত্যু ঘটাবে এটা আন্তনিওর বদ্ধমূল ধারণা। তবুও তিনি ভয় না পেয়ে বোঝাতে লাগলেন ব্যাসানিওকে, এতে ভয় পাবার কী আছে? একথা ঠিকই যে অভিসন্ধি নিয়ে ঐ রূপ একটা শর্ত আরোপ করতে চাইছে লোকটি। কিন্তু তাতে আমাদের কিছু এসে যাবে না। দুমাসের মধ্যেই আমাদের জাহাজগুলি বন্দরে ফিরে আসবে —অবশ্য দলিলে লেখা থাকবে তিন মাস। তাহলে পুরো একমাস সময় হাতে থাকবে আমাদের। ওই সময়ের মধ্যে জিনিস বেচে তিনহাজার ডুকাট তো সামান্য ব্যাপার, লক্ষ ডুকাট জোগাড় করতে পারব আমি। বন্ধু, এ নিয়ে তুমি আর ভেব না।

ব্যাসানিওর আপত্তি সত্ত্বেও আন্তনিও শাইলককে বললেন তিনি তার শর্তেই টাকা ধার করতে রাজি আছেন। এরপর দু-বন্ধু উকিলের কাছে দলিল লেখাতে গেলেন। স্থির হল খানিকক্ষণ বাদেই শাইলক ওই উকিলের বাড়িতে গিয়ে টাকা দেবেন। আর দলিলটা নিয়ে আসবেন।

বাড়ির দিকে যেতে যেতে নিজ মনে বলতে লাগল শাইলক, এবার দেখা যাবে কে কুত্তা। আমার সমস্ত অপমানের প্রতিশোধ এবার কড়ায় গণ্ডায় বুঝে নেব।

 

০২.

শাইলকের কাছ থেকে টাকা পেয়ে মনের আনন্দে ব্যাসানিও লেগে পড়লেন বেলমন্ট যাত্রার আয়োজনে। শৌখিন