*
Done page 222
এই কথা শোনার পরেই নীরবতা নেমে এলো জনতার মাঝে। সবাই দেখেছে তীরের আঘাতে মাটিতে লুটিয়ে পড়েছে। উটেরিক, সাথে সাথে মৃত্যু হয়েছে তার। এমন আঘাত থেকে বেঁচে ফিরতে পারে না কেউ। সবাই ধরে নিয়েছে তাদের ভুল বোঝানোর জন্য কোনো একটা ছলনার আশ্রয় নেওয়া হচ্ছে। মাথা নিচু করে রইল সবাই পা দিয়ে মাটি খুঁড়তে লাগল। খুব সাবধানে পরস্পরের সাথে চোখাচোখি করা থেকে নিজেদের বিরত রেখেছে তারা, কেউ চায় না যে তাদের বিরুদ্ধে কোনো রাজদ্রোহমূলক আচরণের অভিযোগ আনা হোক।
এবার ঘুরে দাঁড়াল পানমাসি, মঞ্চে ওঠার সিঁড়ির দিকে ফিরল। তার পরেই মাটিতে হাঁটু গেড়ে বসে পড়ল সে। অন্য চার কর্মকর্তাও সাথে সাথে তাকে অনুসরণ করল, মঞ্চের কাঠের মেঝেতে কপাল ঠেকাল যেন কার উদ্দেশ্যে।
সেই একই সোনালি বর্ম পরা ব্যক্তি আবার উদয় হয়েছে সিঁড়ির গোঁড়ায়, যাকে দুই ঘণ্টা আগে রক্তমাখা কম্বল মোড়ানো অবস্থায় মঞ্চ থেকে নামিয়ে নিয়ে যেতে দেখেছি আমরা। এখন দীর্ঘ আত্মবিশ্বাসী পদক্ষেপে হাঁটছে সে। দেখে মনে হচ্ছে না যে একটু আগেই এক মারণ আঘাত হানা হয়েছে তার ওপর। শুধু বর্মের ওপর এখনো রক্তের দাগ লেগে আছে আর আততায়ীর তীর যেখানে তার সোনার বর্ম ভেদ করে ভেতরে ঢুকেছিল সেখানে একটা ফুটো। শক্ত পায়ে হেঁটে এসে মঞ্চের সামনে দাঁড়াল সে, তারপর মাথা থেকে খুলে ফেলল শিরস্ত্রাণ। সবার সামনে উন্মোচিত হলো ফারাও উটেরিকের সুপরিচিত চেহারা।
ভিড়ের মাঝে উপস্থিত যেসব ব্যক্তি একটু আগে ফারাওয়ের মৃত্যুতে মনে মনে আনন্দে নাচছিল এবার তারাই আনুগত্যের ভারে যেন নুয়ে পড়বে বলে মনে হলো। আদুরে কুকুরছানার মতো কুঁইকুঁই করতে করতে ফারাওয়ের এই অলৌকিক প্রত্যাবর্তনে নিজেদের আনন্দ প্রকাশ করতে লাগল তারা।
অহংকারী চোখে জনতার দিকে তাকাল উটেরিক। প্রসাধনের মাধ্যমে আরো সুন্দর করে তোলা হয়েছে তার চেহারা, প্রায় মেয়েদের মতোই লাগছে দেখতে। তার সাথে যোগ হয়েছে গর্ব আর অহংকারের হাসি। বোঝা যাচ্ছে জনতার এই প্রশংসা দারুণ উপভোগ করছে সে। শেষ পর্যন্ত এক হাত উঁচু করে সবাইকে চুপ করতে ইশারা করল সে।
সেরেনাকে ফিসফিস করে বললাম আমি, তুমি ঠিকই বলেছিলে। আসলেই ওর হাতগুলো মেয়েদের মতো।
মাথা ঝাঁকিয়ে সম্মতি প্রকাশ করল সেরেনা।
কিন্তু তীরের আঘাতে কে মারা পড়ল তাহলে? নিজের মনেই বলে উঠলাম আমি। তা হয়তো কখনোই জানা যাবে না, জবাব দিল সেরেনা। ইতোমধ্যে হতভাগ্য লোকটার মৃতদেহকে আগুনে পুড়িয়ে ফেলা হয়েছে, আর তা না হলে পায়ে পাথর বেঁধে ফেলে দেওয়া হয়েছে নীলনদের বুকে। তার পরেই মঞ্চের ওপর দাঁড়ানো ফারাও কথা বলতে শুরু করল। কী বলে তা শোনার জন্য ইশারায় আমাকে চুপ থাকতে বলল সেরেনা।
আমার প্রিয় জনগণ, আমার প্রিয় প্রজারা, আমি আবার তোমাদের কাছে ফিরে এসেছি! আততায়ীর তীর আমাকে যে আঁধারের মাঝে ডুবিয়ে দিতে চেয়েছিল সেই আঁধার থেকে ফিরে এসেছি আমি। সাথে সাথে সমস্বরে চিৎকার করে উল্লাস প্রকাশ করল জনতা। তারপর আবার হাত উঁচু করল ফারাও। সাথে সাথে চুপ হয়ে গেল সবাই।
এখন আমরা জানি, আমাদের মাঝেই লুকিয়ে আছে বিশ্বাসঘাতকের দল! হঠাৎ করেই রাগ আর অভিযোগের উন্মত্ততা ফুটে উঠল উটেরিকের কণ্ঠে। সেই বিশ্বাসঘাতকরা আমাকে খুন করার পরিকল্পনা করেছিল, সফল করতে চেয়েছিল নিজেদের কুটিল ষড়যন্ত্রকে। সাথে সাথে জনতার মাঝ থেকে অস্থির গুঞ্জন উঠল, যেন এমন ষড়যন্ত্রের কথা শুনে সত্যিই দারুণ কষ্ট পেয়েছে তারা। এই বিশ্বাসঘাতক খুনিদের পরিচয় কী আমি জানি। তাদের সংখ্যা ত্রিশজন, এবং আমার বিশ্বাসী প্রহরীরা তাদের সবাইকে আটক করেছে। এখন তাদের। অপরাধ অনুযায়ী দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির ব্যবস্থা করা হবে। এবার জেনারেল পানমাসির ইশারায় দর্শকরা সবাই বুনো আনন্দে ফেটে পড়ল। সবার উল্লাস থামার পর ফারাও বলে চলল, এই অপরাধীদের মধ্যে প্রথমেই আছে সেই ব্যক্তি যে আমাকে লক্ষ্য করে তীর ছুঁড়েছিল। সে আর কেউ নয়, বরং আমারই মন্ত্রীদের একজন, যার ওপর আমি সম্পূর্ণ বিশ্বাস স্থাপন করেছিলাম। আমার প্রহরীরা সাক্ষী আছে যে, আমার বুকে যে তীর এসে বিঁধেছিল সেটা এই ব্যক্তিই ছুঁড়েছে। এই বলে শেষ কথাটা গলা চড়িয়ে বলে উঠল সে, সেই বিশ্বাসঘাতক ইরাসকে সামনে নিয়ে আসা হোক!
রাজমন্ত্রী ইরাসের কথা বলছে ও! আতঙ্কিত কণ্ঠে ফিসফিস করে বলে উঠল রামেসিস। তা কী করে হয়? উনি বৃদ্ধ একজন মানুষ, অভিজাত এবং ভদ্র বলে সবার কাছে পরিচিত। তিনি কখনো খুনের মতো কাজ করবেন না। এমনকি ধনুক থেকে তীর ছোঁড়ার মতো শক্তিও তার গায়ে আছে বলে আমার মনে হয় না।
রামেসিসকে শান্ত রাখার জন্য, সেইসাথে ও যেন উঠে না দাঁড়ায় সেটা নিশ্চিত করতে ওর হাতটা নিজের হাতে চেপে ধরল সেরেনা। ইরাসকে বাঁচানোর কোনো উপায় নেই আমাদের হাতে প্রিয়তম, ফিসফিস করে বলল ও। তাকে যে লোকটা এখন সামনে নিয়ে আসছে খুব সম্ভব সেই ছুঁড়েছিল ওই তীরটা। লোকটার নাম অরকোস, উটেরিকের সবচেয়ে কুখ্যাত জল্লাদদের একজন সে। একই সাথে ধনুর্বিদ্যাতেও লোকটার জুড়ি মেলা ভার।
বিষণ্ণ ভঙ্গিতে মাথা ঝাঁকাল রামেসিস। অরকোসকে খুব ভালো করেই চিনি আমি। এটাও জানি যে, উটেরিকের বেশ কিছু নিষ্ঠুর এবং বর্বর সিদ্ধান্তের বিরোধিতা করেছিলেন ইরাস। খুব সম্ভব সে জন্যই এই চড়া মূল্য দিতে হচ্ছে তাকে।
