ধীরে ধীরে নড়েচড়ে উঠল জনতার স্রোত। ধীর দ্বিধান্বিত পায়ে বের হওয়ার দরজার দিকে এগোতে শুরু করল সবাই। আমরা তিনজনও তাদের সাথে যোগ দিলাম। কিন্তু বেশি দূর এগোতে পারলাম না আমরা, তার আগেই দরজার সামনে দাঁড়ানো সশস্ত্র প্রহরীরা বাধা দিল সবাইকে। জনতার গুঞ্জন ছাপিয়ে তাদের উচ্চকিত গলার নির্দেশ ভেসে এলো আমাদের কানে।
পিছিয়ে যাও! যে যেখানে ছিলে সেখানে ফিরে যাও সবাই! হত্যাকারীকে খুঁজে পাওয়ার আগ পর্যন্ত কেউ নড়তে পারবে না ময়দান থেকে। এই বলে হাতের বর্শা উল্টো করে ধরল তারা, তারপর হাতলের দিক দিয়ে গুঁতো দিতে দিতে জনতাকে দরজার কাছ থেকে সরে যেতে বাধ্য করল। অপরাজেয় ফারাও উটেরিককে যে ব্যক্তি তীর ছুঁড়ে খুন করেছে তার পরিচয় জানি আমরা, বলল তারা।
অগত্যা বিড়বিড় করে গাল বকতে বকতে আবার আগের জায়গায় ফেরত এলাম আমরা।
আমার পাশ ঘেঁষে বসল সেরেনা। রামেসিসের দিক থেকে অন্যদিকে মুখ ঘুরিয়ে বসল ও। রামেসিস তখনো তার পাশে বসা লোকটার কাছে নিজের অসন্তোষ প্রকাশ করতে ব্যস্ত। এবার মৃদু স্বরে কথা বলে উঠল সেরেনা, এত আস্তে যে আমি ছাড়া আর কেউ শুনতে পেল না সেটা। সে ছিল না ওখানে, বলল ও।
বুঝলাম না। কে ছিল না, কোথায় ছিল না? ওর দেখাদেখি একই রকম মৃদু স্বরে জিজ্ঞেস করলাম আমি।
ওই যে, সোনার বর্ম পরা লোকটা। ও আসলে উটেরিক ছিল না। তীরের আঘাতে মরেনি উটেরিক, আবার বলল সেরেনা। ওই লোকটা ছিল উটেরিকের নকল।
তুমি কীভাবে বুঝলে সেটা? লোকটার মুখ তো মুখোশে ঢাকা ছিল। সেরেনার হাত চেপে ধরে ওকে আমার আরো কাছে নিয়ে এলাম আমি। অনুভব করছি উটেরিকের ওপর প্রতিশোধ নেওয়ার একটা সুযোগ এখনো থাকতে পারে বুঝে স্বস্তির স্রোত বয়ে যাচ্ছে আমার শরীরে।
তার ডান হাত দেখেছি আমি, জবাব দিল সেরেনা।
তবু কিছুই ঢুকছে না আমার মাথায়, প্রতিবাদ জানালাম আমি। এর সাথে উটেরিকের হাতের কী সম্পর্ক–বলতে বলতে হঠাৎ থেমে গিয়ে তাকিয়ে রইলাম সেরেনার দিকে। সাধারণত কোনো কিছু বুঝতে আমার এত দেরি লাগে না। তুমি বলতে চাইছ দস্তানা খুলে ফেলার পর লোকটার হাত দেখে তুমি বুঝতে পেরেছ যে ওটা উটেরিকের হাত ছিল না?
ঠিক বলেছ! জবাব দিল সেরেনা। উটেরিকের দুই হাতই অত্যন্ত কোমল, কোনো দাগ নেই তাতে। দেখলে মনে হতে পারে বাচ্চা মেয়ের হাত এবং সেগুলো নিয়ে দারুণ গর্ব করে সে। উটেরিকের ঘনিষ্ঠ যারা তারা বলে সে নাকি দিনে তিনবার নারিকেলের দুধ দিয়ে হাত ধোয়।
তুমি এগুলো কীভাবে জানলে সেরেনা? প্রশ্ন করলাম আমি। উটেরিকের হাত সম্পর্কে এত কিছু জানার সুযোগ কীভাবে পেলে?
যতবার আমাকে চড় মারার জন্য হাত তুলেছে সে ততবার তার হাত খুব কাছ থেকে দেখার সুযোগ হয়েছে আমার। যতবার আমার নাক মুচড়ে ধরেছে, যতবার তার আঙুল আমার যোনি বা পায়ুপথে ঢুকিয়ে দিয়েছে আর তার সুন্দরী প্রেমিকরা হি হি করে হেসে উঠেছে ততবার তার হাত খুব কাছ থেকে দেখেছি আমি, তিক্ত স্বরে বলে উঠল ও। কণ্ঠস্বরেই বোঝা গেল কী প্রচণ্ড ক্রোধ আর ঘৃণা কাজ করছে ওর ভেতরে। সোনার মুখোশ পরা যে লোকটা তীরের আঘাতে মারা পড়েছে তার হাত ছিল কর্কশ, কড়া পড়া। কৃষকদের হাত যেমন হয়। উটেরিক ছিল না ওটা, আর যেই হোক।
এখন তোমার কথার অর্থ পরিষ্কার হয়েছে আমার কাছে। কিন্তু তোমার ওপর যে অত্যাচার হয়েছে তার এমন পুঙ্খানুপুঙ্খ বিবরণ দিতে তোমাকে বাধ্য করেছি আমি, সে জন্য আমি আন্তরিকভাবে দুঃখিত।
আমি কিছু মনে করিনি। কিন্তু রামেসিসকে কখনো বোলো না এসব কথা। আমি চাই না যে ও এই ব্যাপারে কিছু জানুক। আমাকে প্রতিশ্রুতি দাও টাইটা, ওকে কখনো কিছু বলবে না তুমি।
আমি প্রতিশ্রুতি দিচ্ছি তোমাকে। জানি যে কথাগুলো খুব মেকী শোনাল বলার সময়, সেরেনার হাতে চাপ দিয়ে আমার প্রতিশ্রুতির গুরুত্ব বোঝানোর চেষ্টা করলাম আমি।
এক ঘণ্টা ধরে বসে থাকতে হলো আমাদের, তারপর আরো এক ঘণ্টা। এর মাঝে একমাত্র সান্ত্বনা বলতে রইল ফারাওয়ের মৃত্যুতে বাদকদের বাজানো শোকার্ত বাজনা। ওদিকে জনতার মাঝে রাগান্বিত গুঞ্জন এতক্ষণে ক্রোধে রূপ নিতে শুরু করেছে। এমন কিছু কথা কানে এলো আমার, যেগুলোকে অনায়াসে রাজদ্রোহিতার সমান বলে ধরা যায়। ফারাও এখন আর জীবিত নেই ফলে নাগরিকদের যারা আগে অত্যন্ত সতর্কতার সাথে নিজেদের মতামত প্রকাশ করত এখন তাদের অনেকেই বেপরোয়া হয়ে উঠেছে।
তারপর হঠাৎ করেই বাদকদের বাজনার ধরন বদলে গেল, শোকার্ত সুরের বদলে দ্রুত লয়ের চটুল তালের বাজনা বাজাতে শুরু করল তারা। জনতার মধ্যে যারা এতক্ষণ অসন্তোষ প্রকাশ করছিল তারা সবাই চুপ হয়ে গেল, চেহারায় বিভ্রান্ত ভাব। দেখলাম গত দুই ঘণ্টা যাবৎ যেসব পুরুষ এবং মহিলা ফারাও আর তার মৃত্যু সম্পর্কে নানা রকম উল্টোপাল্টা মন্তব্য করছিল তারা এখন উদ্বিগ্ন চোখে এদিক-ওদিক তাকাচ্ছে, বোঝার চেষ্টা করছে যে কারা তাদের কথাগুলো শুনতে পেয়েছিল। এখন মনে হচ্ছে কথাগুলো বলার জন্য দারুণ আফসোস হচ্ছে তাদের।
মঞ্চের নিচে দাঁড়িয়ে থাকা পাথুরে দালানটা থেকে বেরিয়ে এলো জেনারেল পানমাসি এবং আরো চার উচ্চপদস্থ কর্মকর্তা। ঘণ্টাদুয়েক আগে ওই দালানের ভেতরেই কম্বলে মুড়িয়ে ফারাওয়ের মৃতদেহ নিয়ে গিয়েছিল তারা। তাদের আগমনের সাথে সাথে নতুন করে উচ্ছল বাজনায় ফেটে পড়ল বাদকদের দল। মঞ্চের ওপর উঠে কাঁধে কাঁধ ঠেকিয়ে পাশাপাশি দাঁড়াল সবাই। শেষ পর্যন্ত বাজনার শব্দ থামতে জেনারেল পানমাসি সামনে এগিয়ে এলো, তারপর হাতে ধরা চোঙাটা মুখের সামনে ধরে কথা বলতে শুরু করল। যন্ত্রটা থাকার কারণে তার পুরো ময়দান জুড়ে ছড়িয়ে পড়ল তার কণ্ঠস্বর। এ ছাড়া যারা মঞ্চ থেকে বেশি দূরে রয়েছে তাদের কাছে পানমাসির বক্তব্য পৌঁছে দেওয়ার জন্য কিছু দূর পরপর দাঁড় করিয়ে দেওয়া হলো অন্যান্য অল্পবয়সী সৈনিকদের। মিশরের অনুগত নাগরিকগণ, আপনাদের জন্য সুখের সংবাদ নিয়ে উপস্থিত হয়েছি আমি। আমাদের প্রিয় ফারাও উটেরিক, যাকে একটু আগে আপনারা সবাই মাটিতে লুটিয়ে পড়তে দেখেছিলেন তিনি তার অপরাজেয় নামকে সত্যি প্রমাণিত করেছেন। মৃত্যুকে ফাঁকি দিয়ে এখনো আমাদের মাঝে বেঁচে আছেন তিনি! এবং বেঁচে থাকবেন অনন্তকাল!
