ময়দানের যে জায়গায় মঞ্চটা তৈরি করা হয়েছে তার ঠিক উল্টো দিকে একটা ছোট টিলার মতো রয়েছে। জায়গাটা দর্শকদের জন্য খুবই সুবিধাজনক একটা জায়গা এবং শুধু বিশেষ সুবিধার অধিকারী দর্শকরাই ওখানে বসার সুযোগ পায়। মঞ্চের সামনে থেকে টিলার চূড়া পর্যন্ত মাঝখানের জায়গাটুকুর দৈর্ঘ দুই শ কদমের বেশি হবে না।
হঠাৎ করেই দূরের টিলাটার ওপর বসে থাকা জনতার মাঝখান থেকে উড়ে আসতে শুরু করল একটা ছোট্ট কালো রঙের বস্তু। আমার দৃষ্টিশক্তি অত্যন্ত তীক্ষ্ণ এবং শক্তিশালী, ফলে এই জনতার ভিড়ের মাঝখানেও জিনিসটা দেখতে কোনো অসুবিধা হলো না আমার। মাটি থেকে শূন্যে ওঠার সাথে সাথেই জিনিসটা দেখতে পেলাম আমি। প্রথমে মনে হলো কোনো পাখি হবে; কিন্তু পরক্ষণেই নিজের ভুল ধরতে পারলাম।
ওই দেখো! বলে উঠলাম আমি। কে যেন তীর ছুঁড়েছে!
কোথায়? প্রশ্ন করল রামেসিস। কিন্তু আমার প্রায় সাথে সাথেই তীরটা সেরেনারও চোখে পড়েছে।
ওই যে টিলার ওপরে, আঙুল দিয়ে ইশারা করল ও। তীরটা তখন সর্বোচ্চ বিন্দুতে পৌঁছে আবার নিচে নামতে শুরু করেছে। ঠিক আমাদের দিকেই আসছে।
দ্রুত হিসাব কষে ফেললাম আমি। আমাদের এখান পর্যন্ত পৌঁছবে না। অনেক উঁচুতে ছোঁড়া হয়েছে তীরটা। কিন্তু সোজা উটেরিকের দিকে যাচ্ছে ওটা! বলতে বলতে উঠে দাঁড়ালাম আমি। তীরের লক্ষ্য যে উটেরিক, আমার এক নম্বর শত্ৰু, সেটা বুঝতে পেরে দারুণ অবাক হয়ে গেছি। এখন যদি সে তীরের আঘাতে মারা পড়ে তাহলে আমার এবং আমার প্রিয় মানুষদের ওপর সে যে অত্যাচার চালিয়েছে তার কোনো প্রতিশোধই নিতে পারব না আমি। একবার মনে হলো চিৎকার করে তাকে সাবধান করে দিই। কিন্তু তীব্র গতিতে ছুটে আসছে তীরটা, আমি কিছু করার আগেই যা ঘটার ঘটে যাবে। এখনো ডান হাত তুলে ধরে দাঁড়িয়ে আছে উটেরিক।
সোনালি শিরস্ত্রাণ আর বর্মটা যেন আহ্বান করছে তীরটাকে আর সেই আহ্বানে সাড়া দিয়ে ছুটে আসছে ওটা। মনে হচ্ছে যেন মৃত্যুকে আলিঙ্গন করার জন্য দাঁড়িয়ে রয়েছে উটেরিক। আমি দেখলাম শক্ত পাথর খোদাই করে তৈরি করা হয়েছে তীরের মাথাটা, এমনভাবে তৈরি যে খুব সহজেই যেকোনো বর্ম ভেদ করে ঢুকে যাবে। আর সোনার তৈরি বর্মের ক্ষেত্রে তো কথাই নেই। এমনভাবে ভেদ করবে, যেন ওটা প্যাপিরাসের তৈরি। মনে হছে যেন ধীর হয়ে এসেছে সময়ের গতি। আমি এবং বাকি সবাই, এমনকি উটেরিকের কর্মচারীরা পর্যন্ত যেন জমে গেছে নিজ নিজ জায়গায়, নড়তে পারছে না কেউ। শেষ কয়েক ফিট দূরত্ব ঝাপসা মনে হলো তীরটাকে। তার পরেই বড় কোনো ঘণ্টার মতো শব্দ তুলে আঘাত হানল ওটা। আঘাতের চোটে কয়েক পা পিছিয়ে গেল উটেরিক। কিন্তু যে দু-এক মুহূর্ত সে দাঁড়িয়ে থাকতে পারল তার মাঝেই আমি দেখে নিলাম তীরটা তার বুক ভেদ করে পিঠ দিয়ে বেরিয়ে এসেছে। মনে হলো যেন তীরটা তাকে পাথরের মূর্তিতে পরিণত করেছে।
কিন্তু তার পরেই মঞ্চের কাঠের মেঝের ওপর হুড়মুড় করে পড়ে গেল উটেরিক। এত জোরে পড়ল যে কয়েক জায়গায় ভেঙে গেল মেঝে। স্থির হয়ে পড়ে রইল সে, নড়াচড়া করল না আর। তীরটা তার হৃৎপিণ্ড ফুটো করে দিয়েছে। সাথে সাথে মারা গেছে সে।
*
নিঃশ্বাস ফেলতে ভুলে গেছে পুরো পৃথিবী। তার পরেই হঠাৎ প্রচণ্ড চিৎকার-চেঁচামেচি শুরু হয়ে গেল পুরো ময়দানে। কয়েকজন আর্তনাদ করে উঠল এমনভাবে, যেন এই পুরো বিশ্বের প্রধান মারা গেছে এই মাত্র। দৌড়ে সামনে এগিয়ে এলো উটেরিকের সেনা কর্মকর্তারা। সবার সামনে দেখা গেল জেনারেল পানমাসি আর তার সাথে আরো কয়েকজন চাটুকার আর অনুগত কর্মচারী। তাদের মাঝে একজন কোথা থেকে যেন একটা কম্বল নিয়ে এলো। সেটা দিয়ে মুড়িয়ে ফেলা হলো মৃতদেহটা। তবে তার দেহ থেকে তীরটা বের করার চেষ্টা করল না কেউ, তার চেহারা এবং শরীর ঢেকে রাখা বর্ম খোলার প্রতিও আগ্রহ দেখা গেল না কারো মাঝে।
তারপর তাদের মাঝে ছয়জন মিলে মৃতদেহটা কাঁধে তুলে নিয়ে মঞ্চের পেছনে সিঁড়ি দিয়ে নেমে এলো নিচে। দেহটাকে পাশের পাথর দিয়ে তৈরি দালানের ভেতর নিয়ে গেল তারা। শোকার্ত বাজনা বাজাতে শুরু করল বাদকদল। মনে হলো যেন বিভ্রান্ত হয়ে পড়েছে জনতা, বুঝতে পারছে না কী করবে। কেউ কেউ হাউমাউ করে কাঁদতে শুরু করেছে, সেইসাথে মুঠো মুঠো চুল ছিঁড়ে আনছে মাথা থেকে। তবে অনেককেই দেখলাম অনেক কষ্টে খুশি চেপে রেখেছে। কাপড়ের কোনা দিয়ে চেহারা ঢেকে রেখেছে তারা, একই সাথে চোখে পানি আনার জন্য জোরে জোরে চোখ ডলছে।
তবে এই বিশাল জনতার মাঝে যে কয়েকজন উটেরিকের মৃত্যু দেখে সত্যিই দুঃখ পেল তাদের মাঝে আমিও ছিলাম। নিজেকে সান্ত্বনা দেওয়ার জন্য রামেসিস আর সেরেনাকে নিজের কাছে জড়িয়ে ধরলাম আমি। প্রচণ্ড হতাশ লাগছে আমার, মনে হচ্ছে সত্যি সত্যি কেঁদে ফেলব যেকোনো মুহূর্তে।
এমনটা হওয়ার কোনো কথাই ছিল না, ফিসফিস করে ওদের বললাম আমি। নিজের নিষ্ঠুরতা আর অমানবিক আচরণের জন্য কোনো শাস্তি না পেয়েই পালিয়ে গেল উটেরিক।
তবে রামেসিস অবশ্য দারুণ খুশি হয়ে উঠেছে। আর যা-ই হোক, উটেরিক মারা গেছে। চিরতরে বিদায় হয়েছে আপদ। অবশ্য ওর খুশি হওয়াই স্বাভাবিক, কারণ এখন ওর ফারাও হওয়া কেউ ঠেকাতে পারবে না। কিন্তু তীরটা কে ছুড়ল? তাকে একটু দেখতে ইচ্ছে করছে আমার। এই সাহসী কাজ করার জন্য তাকে ধন্যবাদ এবং যথাযোগ্য পুরস্কার দিতে চাই আমি।
