শুধু ময়দানের মাঝখানটা খালি। দড়ি দিয়ে ঘিরে রাখা হয়েছে জায়গাটাকে, তার ওপর জনতার ভিড় যেন জায়গাটার ওপর হামলে পড়তে না পারে সে জন্য খোলা তলোয়ার হাতে প্রহরীরা চারপাশ থেকে ঘিরে ধরে দাঁড়িয়ে রয়েছে। আমরা যেখানে দাঁড়িয়ে আছি তার ঠিক নিচেই রয়েছে একটা কাঠের তৈরি উঁচু মঞ্চ। তবে এই মুহূর্তে মঞ্চের ওপরটাও খালি। মঞ্চের সামনে রয়েছে এক দল বাদক, যাদের সদস্য সংখ্যা হবে প্রায় পঞ্চাশজন। এই মুহূর্তে নানা রকম উত্তেজনাকর যুদ্ধসংগীত আর দেশপ্রেমমূলক গানের সুর বাজাচ্ছে তারা।
ধীরে ধীরে চড়ায় উঠল তাদের বাজনা, তারপর একটা চূড়ান্ত বাজনার সাথে সাথে থেমে গেল। এবার বাদকদলের নেতা ধীরে ধীরে জনতার দিকে ঘুরে দাঁড়িয়ে এক হাত উঁচু করল। নিস্তব্ধ হয়ে এলো জনতার হইচই।
তারপর সেই নীরবতার মাঝে মঞ্চের ওপর উঠে এলো দীর্ঘদেহী এক ব্যক্তি। সমস্ত শরীর সোনা দিয়ে ঢাকা তার। মাথা থেকে পা পর্যন্ত ঢাকা পড়ে গেছে মূল্যবান ধাতুর আড়ালে। সোনার তৈরি শিরস্ত্রাণ আর মুখাবরণ, সেইসাথে সোনার বর্ম এবং জুতো। তার ওপর সূর্যের আলো এসে ঝলকানোর কারণে চোখ ঝলসে যাচ্ছে, বেশিক্ষণ তাকিয়ে থাকা যায় না। সন্দেহ নেই মানুষের মনোযোগ আকর্ষণের দারুণ এক উপায়।
তার পরেই আবারও পুরোদমে বাজনা শুরু করল বাদকদের দল। এবার বাজনাটা চিনতে পারলাম আমি। নিজের গুণাবলি সবিস্তারে বর্ণনা করে একটা গান লিখেছিল উটেরিক, সেই গানের সুর। গানটার নাম হচ্ছে অপরাজেয়। এই গানের সংকেত পেয়ে এবার একদল রাজকীয় দেহরক্ষী মাঠে নেমে এলো। সংখ্যায় হাজারখানেক হবে তারা, প্রত্যেকে গানের তালে তালে তলোয়ার দিয়ে ঢালের ওপর বাড়ি দিচ্ছে আর গানের অংশবিশেষ সমস্বরে গাইছে:
অযুত বীরের মৃত্যু হলেও
অপরাজেয় বেঁচে থাকে!
অযুত বছর পেরিয়ে গেলেও
অপরাজেয় বেঁচে থাকে!
গানটার অদ্ভুত এবং হাস্যকর কথাগুলো শুনতে শুনতে মিশরের সিংহাসনে এই মুহূর্তে বসে থাকা দানবটার প্রতি আমার ঘৃণা এবং ক্রোধ আরো বেড়ে উঠল। লোকটার পাগলামিকে আরো বাড়িয়ে তুলেছে তার ধূর্ততা আর চালাকি। পাশে বসে থাকা সেরেনার দিকে এক নজর তাকালাম আমি। প্রায় সাথে সাথেই আমার দৃষ্টি অনুভব করল ও এবং সোনালি মূর্তিটার দিক থেকে চোখ না সরিয়েই আমার নীরব প্রশ্নের জবাব দিল।
ঠিকই আন্দাজ করেছ তুমি টাইটা। উটেরিক উন্মাদ কিন্তু একই সাথে চালাকও বটে। মিশরীয় সমাজের অভিজাত সম্প্রদায় যাদেরকে তার বাবা ফারাও টামোস বিভিন্ন দরকারের জন্য প্রশিক্ষণ দিয়ে দক্ষ করে তুলেছিলেন এবং যারা হিকসসদের এই মিশরের বুক থেকে বিতাড়িত করেছিল তাদের সবাইকে সে সরিয়ে দিচ্ছে। কারণ ওরা সবাই তার পিতার সমর্থক ছিল। তাদের সবার আনুগত্য নিহিত রয়েছে ফারাও টামোসের প্রতি। তাই তোমার এবং রামেসিসের মতো তাদের সবার প্রয়োজনও উটেরিকের কাছে ফুরিয়ে গেছে। সে জানে যে তোমরা সবাই তাকে ঘৃণা করো, তাই তোমাদের ধ্বংস করে দিতে চায় সে। তার বদলে নিয়ে আসতে চায় পানমাসির মতো লোকদের, যারা তাকে পুজো করে।
এবার প্রথমবারের মতো মাথাটা ঘুরিয়ে আমার দিকে তাকাল ও, এবং হাসল। তুমি নিশ্চয়ই জানেনা যে আমাকে অপহরণ করেছিল যে পানমাসি সে এখন উটেরিকের সেনাবাহিনীর একজন প্রধান কর্মকর্তা? সত্যি কথা বলতে, রাজকীয় দেহরক্ষীদের প্রধান সে, যাদের তুমি ওই মাঠের মাঝখানে দেখতে পাচ্ছ। বলে থুতনি দিয়ে সামনে ইঙ্গিত করল ও। আঙুল দিয়ে ইশারা করলে যে ওর প্রতি মানুষের অনাকাক্ষিত মনোযোগ আকৃষ্ট হতে পারে এটুকু বোঝার মতো বুদ্ধি আছে ওর মাথায়। ওই যে, মঞ্চের ওপর ফারাওয়ের ঠিক পেছনেই দাঁড়িয়ে আছে পানমাসি।
সেরেনা দেখিয়ে দেওয়ার আগ পর্যন্ত লোকটাকে চিনতেই পারিনি আমি। মাথার শিরস্ত্রাণের কারণে চেহারা ঢেকে আছে তার, সেইসাথে আশপাশে দাঁড়িয়ে থাকা আরো কয়েকজন লোকের আড়ালে প্রায় ঢাকা পড়ে গেছে সে।
আর তোমার কী মতামত? প্রশ্ন করলাম আমি। ওই দুজন, উটেরিক আর পানমাসিকে একসাথে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখে তোমার রাগ হচ্ছে না? ওরাই তো তোমাকে অপমান করেছে, তোমার ওপর অত্যাচার চালিয়েছে।
আমার প্রশ্নটার উত্তর দিতে গিয়ে কয়েক মুহূর্ত চিন্তা করল সেরেনা, তারপর মৃদু গলায় জবাব দিল, না, রাগ নয়। শুধু রাগ বললে আসলে কিছুই বলা হবে। না। আমি যা অনুভব করছি তাকে বলা যায় তীব্র জ্বলন্ত ক্রোধ।
পরচুলার এক অংশ মুখের ওপর এসে পড়ায় কথাটা বলার সময় সেরেনার অভিব্যক্তি দেখার সুযোগ হলো না আমার। কিন্তু ওর কণ্ঠস্বরে এমন কিছু একটা ছিল যে, কথাটা সাথে সাথে বিশ্বাস করলাম আমি। সেই মুহূর্তে মাঠের মাঝখানে কুচকাওয়াজরত প্রহরীরা একযোগে মাটির ওপর পা দিয়ে আঘাত করল এবং তারপরেই স্থির হয়ে দাঁড়িয়ে গেল। সোনালি বর্ম পরা উটেরিকের উদ্দেশ্যে অভিবাদন জানানোর ভঙ্গিতে এক হাতে তলোয়ার উঁচু করল সবাই। অটুট নীরবতা নেমে এলো চারপাশে। কুচকাওয়াজে অংশগ্রহণকারী এবং দর্শক- সবাইকে যেন চাদরের মতো ঢেকে দিল সেই নীরবতা, যেন ইচ্ছে করলেই ছোঁয়া যাবে।
তারপর স্বর্ণবর্মে ঢাকা ফারাও এসে দাঁড়াল মঞ্চের কিনারে। ধীরে ধীরে অত্যন্ত যত্নের সাথে ডান হাত থেকে দস্তানাটা খুলে আনল সে, তারপর খালি হাতটা তুলে ধরল মাথার ওপরে। অনুভব করলাম আমার পাশে হঠাৎ শক্ত হয়ে উঠল সেরেনা। কিন্তু ওর মাঝে এমন প্রতিক্রিয়ার কোনো কারণ আন্দাজ করতে পারলাম না। নিজের বাহিনীর অভিবাদনের জবাব দেওয়ার সময় কোনো ফারাওয়ের পক্ষে এভাবে খালি হাত উঁচু করে ধরা অস্বাভাবিক কিছু নয়। তবে এরপর যেটা ঘটল সেটার জন্য আমরা কেউই প্রস্তুত ছিলাম না।
