সৈন্যরা পার হয়ে যাওয়ার সাথে সাথেই আবার ভিড়ে ভরে যাচ্ছে রাজপথ। তাই এদিক-ওদিক খুব বেশি নড়াচড়ার উপায় নেই আমাদের। মানুষের সাথে কাঁধে কাঁধ আর পেটে পিঠ ঠেকিয়ে কোনোমতে এগিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করছি আমরা। অবশ্য রামেসিস আর আমি দুজনই এই শহরকে খুব ভালো করেই চিনি, এই শহরেই প্রায় সারা জীবন কেটেছে আমাদের। তাই জনতার ভিড়ের সবচেয়ে দুর্ভেদ্য অংশটাকে কাটিয়ে অলিগলি এবং মাটির নিচের পথ বেছে নিলাম আমরা। এসব পথের মধ্যে কিছু কিছু পথ এত সরু যে, পাশাপাশি দুজন চলার কোনো উপায় নেই, কোথাও আবার তার চেয়েও বেশি সরু হওয়ায় পাশ ফিরে হাঁটতে হলো। পথ চেনার জন্য মাথার ওপর জ্বলন্ত মোমবাতি জ্বেলে ধরে রাখেছি আমরা। যদিও জানি যে আশপাশের ভাঙাচোরা দালানগুলো যেকোনো সময় ধসে পড়তে পারে, আবর্জনার স্তূপের নিচে চাপা দিতে পারে আমাদের। ইতোমধ্যে আমাদের পায়ের নিচে এমন বহু লোকের সমাধি হয়ে গেছে, কারণ ধস নামা এসব অঞ্চলে খুবই স্বাভাবিক ঘটনা।
এসব সুড়ঙ্গ মাঝে মাঝেই হুট করে গিয়ে শেষ হচ্ছে নানা আকৃতি এবং উচ্চতার গুহা বা ভুগর্ভস্থ ঘরের মতো বিভিন্ন জায়গায়। সেসব ঘরে ভিড় জমিয়েছে ব্যবসায়ীরা, নিজেদের সাথে নিয়ে আসা অসংখ্য নাম না জানা পণ্য কেনাবেচায় ব্যস্ত তারা।
এই সব পণ্যের মাঝে একটা জিনিস আমার দৃষ্টি আকর্ষণ করল। সেটা হচ্ছে বোতলে ভর্তি হাথোরের প্রস্রাব। একটা শিশি তুলে নিয়ে রাজকুমারী সেরেনাকে উপহার দিতে চাইলাম আমি, কারণ জিনিসটা এখানে খুব কম দামে পাওয়া যাচ্ছে। তবে সেরেনা প্রত্যাখ্যান করল উপহারটা, বলল যে প্রস্রাবের দরকার হলে সে নিজেই উৎপাদন করতে পারবে।
এই ব্যবসায়ীদের মাঝে একজন হঠাৎ করে এগিয়ে এলো আমার দিকে। মুখে নানা রঙের আঁকিবুকি কাটা পুরুষ না মহিলা তা বোঝার কোনো উপায় নেই। এই যে দুষ্টু ছেলে। একটু আসা-যাওয়া চলবে নাকি? মানে আমি বলতে চাইছি একটু ঢোকা আর বেরোনো?
না না, এত তাড়াতাড়ি নয়। একটু আগেই নাশতা করলাম। এখন ওসব কাজ করলে হিক্কা উঠবে আমার, শান্ত গলায় জবাব দিলাম আমি।
লোকটা অথবা মেয়েলোকটা কয়েক মুহূর্ত সরু চোখে তাকিয়ে থাকল আমার দিকে। তারপর বলল, তোমাকে দেখে আমার বিখ্যাত ভবিষ্যদ্রষ্টা প্রভু টাইটার কথা মনে পড়ে যাচ্ছে। তবে তার চাইতে তোমার বয়স অনেক বেশি, দেখতেও অনেক বেশি কুৎসিত।
হাহ, তুমি কোনো দিন প্রভু টাইটাকে দেখার সুযোগ পেয়েছ বলে আমার মনে হয় না, পাল্টা জবাব ছুড়লাম আমি।
দেখিনি মানে? আমার নাকের নিচে তর্জনী ঘোরাল লোকটা। প্রভুকে খুব ভালো করেই চিনতাম আমি।
তাহলে তার সম্পর্কে এমন কিছু বলো, যেটা আর কেউ জানে না।
প্রভু টাইটার দণ্ডটা ছিল বিশাল বুঝলে? হাতির গুঁড়ের চাইতেও লম্বা, তিমি মাছের ইয়ের চাইতেও মোটা। কিন্তু এখন আর তিনি বেঁচে নেই।
তুমি যার কথা বলছ সে হচ্ছে টাইটার যমজ ভাই। আসল প্রভু টাইটা ছিলেন বাঁহাতি। এ ছাড়া আর কোনো তফাত নেই তাদের মধ্যে, লোকটাকে জ্ঞান দিলাম আমি।
বিভ্রান্ত দেখাল লোকটাকে। নাক খুঁটতে শুরু করল সে। তারপর মাথা নেড়ে বিড়বিড় করে বলে উঠল, কী অদ্ভুত! আমার কখনো মনেই হয়নি যে প্রভু টাইটার একটা যমজ ভাই থাকতে পারে। তারপর নাক খুঁটতে খুঁটতেই অন্য এক দিকে চলে গেল সে। এবার রামেসিস আর সেরেনা দুজনই তাদের চোখের ওপর থেকে পরচুলার আবরণ সরিয়ে আমার দিকে তাকাল।
তোমার মতো নির্বিকার মুখে মিথ্যে কথা বলাটা শিখতে পারলে খুব ভালো হতো, আফসোসের গলায় বলল রামেসিস।
তোমার এই যমজ ভাইয়ের নামটা কী বলো তো? সে যদি তোমার চাইতে কম বয়স্ক এবং সুদর্শন হয় তাহলে তার সাথে দেখা করতে চাই আমি, বেশ গম্ভীর গলায় বলে উঠল সেরেনা, এবং সাথে সাথে নিতম্বে রামেসিসের চিমটি খেয়ে লাফিয়ে উঠল।
*
মাটির নিচের বিভিন্ন অলিগলি দিয়ে ধীরে ধীরে ওপরে উঠে আসার রাস্তা করে নিতে লাগলাম আমি আর রামেসিস। শেষ পর্যন্ত একটা বাতিল পয়োনিষ্কাশন পথের দেখা পেয়ে সেটা ব্যবহার করে বেরিয়ে এলাম। দেখলাম কুচকাওয়াজের ময়দানের এক কোণে পড়ে থাকা বেশ কিছু ভাঙাচোরা জিনিসপত্র পড়ে আছে আর তার মাঝখানে এসে উঠেছি আমরা। জায়গাটাকে লোকজন প্রকৃতির ডাকে সাড়া দেওয়ার স্থান বানিয়েছে। আমরা যখন উঠে এলাম তখনো বেশ কয়েকজনকে ওই কাজে ব্যস্ত থাকতে দেখা গেল। তবে কেউ আমাদের দিকে খেয়াল করল না, আমরাও কাউকে বিরক্ত না করে নিজেদের কাজে এগিয়ে গেলাম।
তবে স্বীকার করতেই হবে যে, আজকের দিনে শহরের সবচেয়ে ব্যস্ত এবং কোলাহলপূর্ণ এলাকা হচ্ছে এই ময়দান। সঠিক রাস্তা ধরে এলে জীবনেও এখানে পৌঁছতে পারতাম না আমরা। পূর্বনির্ধারিত ব্যবস্থা অনুযায়ী আবর্জনাভর্তি জায়গাটার মুখেই দাঁড়িয়ে থাকতে দেখা গেল ওয়েনেগ আর তার চার সঙ্গীকে। আমাদের তিনজনকে দেখতে পেয়ে এগিয়ে এলো তারা, তারপর চারপাশ থেকে আমাদের ঘিরে ধরে সামনে এগিয়ে চলল। ভিড়ের মধ্যে আমরা যেন মানুষের পায়ের নিচে চাপা না পড়ি সে জন্যই এই ব্যবস্থা। পাথরে বাঁধাই করা পথ ধরে এগিয়ে চললাম আমরা। বেশ কিছু দূর এগোনোর পর একটা উঁচু সমতল জায়গা পাওয়া গেল, যেখান থেকে পুরো ময়দানের ওপর বেশ ভালোভাবে নজর রাখা যায়। মনে হচ্ছে যেন লুক্সরের সম্পূর্ণ জনসংখ্যা আজ এই ময়দানে এসে উপস্থিত হয়েছে।
