আস্তাবলের পাশ দিয়ে যাওয়ার সময় একটু থেমে ঘোড়ার পানি খাওয়ার পাত্রে নিজের প্রতিবিম্ব দেখে নিলাম আমি। এবং সন্তুষ্ট হলাম, কারণ যথেষ্ট কুৎসিত লাগছে আমাকে দেখতে। এবার দ্রুত আনন্দের বাগানের প্রধান দরজার দিকে এগিয়ে গেলাম। রামেসিস সেখানে অপেক্ষা করছিল আমার জন্য। ও নিজেও একই রকম কুৎসিত ছদ্মবেশ নিয়েছে, দুর্গন্ধে কাছে যাওয়া যায় না। কিন্তু আমার চাইতে অন্তত ভালো লাগছে ওকে দেখতে। কিন্তু ওর পাশে দাঁড়িয়ে। থাকা বুড়িটাকে আমি মোটেই চিনতে পারলাম না। ইয়া মোটা শরীর, চেহারা ঢাকা পড়েছে এলোমেলো ময়লা পাকা চুলের ওপাশে। হেলেদুলে এগিয়ে এলো বুড়ি, এবং যখন বুঝতে পারলাম যে তার উদ্দেশ্য হচ্ছে আমাকে জড়িয়ে ধরা, সভয়ে পিছিয়ে গেলাম আমি।
খবরদার বুড়ি, দূরে থাকো! তাকে সাবধান করে দিয়ে বলে উঠলাম। তোমাকে আগেই বলে দিচ্ছি আমার শরীরে কিন্তু কুষ্ঠ আর বসন্ত- দুটো রোগই আছে।
দুটোই? ইস, তুমি এত লোভী কেন, টাটা? তবে অসুবিধা নেই, আমি অত বাছবিচার করি না। যেকোনো একটা আমাকে দিলেই হবে। সুরেলা হাসির দমকে কেঁপে উঠল বুড়ি। এবার একটু স্থির হয়ে দাঁড়াও তো, তোমাকে একটা চুমু খাই।
সেরেনা! চেঁচিয়ে উঠলাম আমি। তুমি হঠাৎ এত মোটা হয়ে গেলে কীভাবে?
মায়ের পাঠানো পোশাকগুলো থেকে কয়েকটা আমার কোমরে জড়িয়ে নিয়েছি। তোমার কাছ থেকেই তো শিখেছি বুদ্ধিটা। তবে একটা ব্যাপার স্বীকার করতেই হচ্ছে: তোমার চুলগুলো দারুণ পছন্দ হয়েছে আমার!
এবার দুর্গের পেছনের দরজা দিয়ে সবার অলক্ষ্যে চুপি চুপি বের হয়ে এলাম আমরা, যেদিকটা শহর থেকে সবচেয়ে দূরে। তারপর জঙ্গলের আড়ালে আড়ালে ঘুরপথে গিয়ে সম্পূর্ণ অন্য দিক দিয়ে লুক্সরের দিকে এগিয়ে চললাম। শহর থেকে বেশ অনেকটা পথ দূরে থাকতেই যুদ্ধের বাজনা ভেসে এলো আমাদের কানে। শহরের ভেতর থেকে ভেসে আসছে ঢাক, বাঁশি আর ট্রাম্পেটের কান ফাটানো নিনাদ। শহর ঘিরে থাকা পাহাড়ের মাথায় উঠে এলাম আমরা। নিচে তাকানোর পর প্রথম যেটা চোখে পড়ল সেটা হচ্ছে। নীলনদে নোঙর করে থাকা যুদ্ধজাহাজের বহর। দেখে মনে হলো কমপক্ষে কয়েক শ হবে তাদের সংখ্যা, সহজে গুনে শেষ করা অসম্ভব। এত কাছাকাছি নোঙর করে রয়েছে যে, নদীর ওই অংশে পানিই দেখা যাচ্ছে না।
যদিও সবগুলো জাহাজের পাল নামানো রয়েছে এখন তবে মাস্তুল এবং খোলের প্রায় সম্পূর্ণ অংশে নানা রকম আকার আকৃতি এবং রঙের পতাকায় ভর্তি। জাহাজগুলোর মাঝে সরু জায়গায় চলাচল করছে ছোট ছোট দাঁড়টানা নৌকা। সেসব নৌকার ওপর ভর্তি নানা আকৃতির পিপে আর মালামাল, বড় জাহাজগুলোতে আনা-নেওয়া করা হচ্ছে সেগুলো। এই সুবিশাল আয়োজন দেখে দ্রুত হয়ে উঠল আমার হৃদস্পন্দন।
বেশির ভাগ মানুষই আমাকে চেনে সাধু-সন্ন্যাসী প্রকৃতির মানুষ হিসেবে, যার হৃদয় মহৎ, যার আচরণ ভদ্র এবং ক্ষমাশীল। কিন্তু আর কেউ না জানলেও আমি জানি যে এই শান্ত চেহারার আড়ালে লুকিয়ে আছে এক ক্রুদ্ধ যোদ্ধা, এক বেপরোয়া মানুষ। সেই মুহূর্তে ফারাও উটেরিকের প্রতি আমার ঘৃণা এত তীব্র হয়ে উঠল, মনে হলো যেন সেই ঘৃণার উত্তাপে আমার নিজের হৃদয়েই আগুন ধরে যাবে।
নদীর তীর এবং আমাদের মাঝখানে শহরের দিকে তাকালাম আমরা। দেখলাম নদীবক্ষের মতোই একই রকম যুদ্ধকালীন উত্তেজনা আর প্রস্তুতির এলাহি কারবার চলছে শহর প্রাচীরের ভেতরেও। প্রতিটি ভবনের ছাদ এবং মিনার, প্রতিটি দেয়াল এবং শহর প্রাচীরের ওপর উড়ছে নানা রঙের এবং আকৃতির পতাকা।
শহর প্রাচীরের বাইরে প্রতিটি রাস্তা গিজগিজ করছে মানুষ আর গাড়ি-ঘোড়ায়। রথ, নানা আকৃতির গাড়ি আর বাহনের ভিড় জমেছে সেখানে। কোনোটা টানছে মানুষ, কোনোটা ঘোড়া বা গরু, এমনকি ছাগলে টানা গাড়িও আছে তাদের মধ্যে। আর এই বিশাল হট্টগোলের কেন্দ্রবিন্দু হচ্ছে লুক্সর। পাহাড়ের গায়ে জন্মানো ঘন জঙ্গলের মাঝ দিয়ে এবার নামতে শুরু করলাম আমরা তিনজন। জঙ্গলের ভেতরে বেশ কিছুক্ষণ চলার পর একটা পথ পাওয়া গেল, যেটা শহরের পেছন দিকের একটা প্রবেশপথের দিকে এগিয়ে গেছে। এবার একজন একজন করে জঙ্গল থেকে বেরিয়ে এলাম আমরা, তারপর ছেঁড়া কাপড়ের ছদ্মবেশ ঠিকঠাক করতে করতে এগোতে লাগলাম সামনের দিকে, কেউ দেখলে ভাববে জঙ্গলের মাঝে প্রকৃতির ডাকে সাড়া দিতে গিয়েছিলাম। একটু এগিয়ে গিয়ে লুক্সর অভিমুখে এগিয়ে যাওয়া জনতার স্রোতের সাথে মিশে গেলাম আমরা। কেউ খেয়াল করল না আমাদের দিকে, এবং শহরের দরজায় পৌঁছানোর পর কেউ কোনো প্রশ্নও জিজ্ঞেস করল না। জনতার ভিড়ে মিশে শহরে ভেতর ঢুকে পড়লাম তিনজন।
বাইরের রাস্তাগুলোর তুলনায় ভেতরের রাস্তাগুলোতে মানুষ বরং আরো বেশি। শুধু ভারী অস্ত্রশস্ত্রে সজ্জিত সৈনিকদের সারি বাদে আর কেউই কোথাও নিজের প্রয়োজনমতো যেতে পারছে বলে মনে হয় না। পথ ধরে এগিয়ে গিয়ে বন্দরে অপেক্ষারত জাহাজগুলোতে উঠছে সৈন্যদের দল। তাদের সামনে সামনে যাচ্ছে সেনা কর্মকর্তারা, হাতে চাবুক। গালিগালাজের তুবড়ি ছুটিয়ে, সেইসাথে চাবুকপেটা করে রাস্তা থেকে উৎসুক জনতাকে সরিয়ে দিচ্ছে তারা, সেইসাথে পথ করে দিচ্ছে সৈন্যদের জন্য।
