কথাটা আসলে বলেছিল তোমার বাবা, আমি নই। আর আমি কখনো অপর ব্যক্তির কৌতুককে নিজের বলে চালিয়ে দিই না, গম্ভীর মুখে ব্যাখ্যা করলাম আমি। তারপর আবার ফিরলাম রামেসিসের দিকে। তোমার চেহারা দেখে মনে হচ্ছে আমার কথায় তোমার কোনো আপত্তি নেই রামেসিস।
অগত্যা তলোয়ারে ধার দিতে দিতে অধৈর্য হয়ে অপেক্ষা করতে লাগলাম আমরা। দিন গড়িয়ে সপ্তাহ বয়ে চলল। তারপর পরবর্তী অমাবস্যায় সাহসী ক্যাপ্টেন পেন্টু তার ছোট্ট জাহাজ আর্টেমিসের শপথ নিয়ে নোঙর করল আনন্দের বাগানের নিচে অবস্থিত গোপন ঘাটলায়। আমার মনে হলো জাহাজের নামটার কারণেই বোধ হয় দেবী আর্টেমিস আমাদের সহায় হয়েছেন এবং তার দয়াতেই এত অল্প সময়ের মাঝেই এই বিপদসংকুল পথ পাড়ি দিয়ে আবার নিরাপদে ফিরে আসতে পেরেছে জাহাজটা। এবার জাহাজের খোলে ভর্তি রয়েছে সেরেনার জন্য রানি তেহুতির পাঠানো বিভিন্ন উপহার। তার মাঝে রয়েছে সেরেনার প্রিয় সুগন্ধীর বারোটা বোতল এবং নানা রঙের অপূর্ব সুন্দর অনেকগুলো পোশাক, যেগুলোর সবগুলোই তৈরি হয়েছে তার প্রিয় দর্জির হাতে। তা ছাড়া প্রতিটি পোশাকের সাথে মিলিয়ে এক জোড়া করে জুতো, মূল্যবান পাথরে খচিত সোনা এবং রুপার তৈরি অনেকগুলো অলংকার এবং পরিপাটি হায়ারোগ্লিফিকসে লেখা অনেকগুলো প্যাপিরাস।
এই চিঠিগুলোর একটায় তেহুতি সবিস্তারে বর্ণনা করেছে যে, তার মেয়ের অনেকগুলো কষ্টের মাঝে একটা ব্যাপারে সে সবচেয়ে বেশি ব্যাকুল হয়ে ছিল। সেটা হচ্ছে নিজের পছন্দ অনুযায়ী পোশাক পরতে পারছে না তার মেয়ে সেরেনা। তেহুতির ভাষ্য অনুযায়ী, এই কষ্টের সাথে, এমনকি সন্তান জন্ম দেওয়ার কষ্টেরও কোনো তুলনা হয় না।
এ ছাড়া আর্টেমিসের শপথ, তার ডেকে করে নিয়ে এসেছে পঞ্চাশটা খাঁচাভর্তি পায়রা, যেগুলোর সবই ল্যাসিডিমনের দুর্গে জন্ম নিয়েছে। ফলে স্বাভাবিকভাবেই তারা আকাশে ওড়ার সুযোগ পেলেই রওনা দেবে নিজেদের জন্মস্থানের দিকে। বোঝা যাচ্ছে হুরোতাস এবং তেহুতি আমাদের সাথে যোগাযোগ চালিয়ে যেতে চাইছে।
সূর্য ওঠার আগেই কোডিস ব্রেভাস ব্যবহার করে হুরোতাসের কাছে তিনটি চিঠি লিখে ফেললাম আমি। সেগুলোকে রেশমের ছোট্ট থলেতে ভরে বেঁধে দিলাম পায়রাগুলোর বুকের সাথে। আমি ওদেরকে পাঠানোর জন্য যতটা উদগ্রীব হয়ে ছিলাম ওরাও যেন বাড়ি ফেরার জন্য ঠিক ততটাই আগ্রহী হয়ে ছিল। তবে ওদের পাঠানোর আগে আরেকটু অপেক্ষা করিয়ে রাখলাম এবং সেই অবসরে আরেকটা ছোট্ট চিঠিতে লিখলাম যে, আর্টেমিসের শপথ নিরাপদেই ফিরে এসেছে এবং হুরোতাস আর তেহুতির পাঠানো সব কিছুই আমরা সঠিকভাবে বুঝে পেয়েছি। সকালের সূর্যের প্রথম কিরণে রাতের অন্ধকার দূর হতে শুরু করার সাথে সাথে তিনটি পাখির প্রত্যেকটার মাথায় চুমু খেয়ে তাদের বাতাসে ছুঁড়ে দিলাম আমি। দ্রুত বেগে উড়ে আকাশে উঠে গেল সবাই, তারপর দু তিনটে চক্কর দিয়ে উত্তরমুখী হয়ে উড়তে শুরু করল। কিছুক্ষণের মধ্যেই হারিয়ে গেল আমার দৃষ্টিসীমা থেকে।
৫. অপেক্ষার পালা
এরপর কেবল অপেক্ষার পালা। ধৈর্য ধরে বসে রইলাম আমরা। লুক্সর প্রাসাদ এবং প্রধান বন্দরের ওপর দিনরাত চোখ রেখেছে ওয়েনেগ আর তার গুপ্তচররা কোনো অস্বাভাবিক কর্মকাণ্ড চোখে পড়ে কি না দেখছে। আমি বুঝতে পারছি খুব বেশি দিন অপেক্ষা করতে হবে না ওদের। পেন্টু আমাকে জানিয়েছে, সে যখন গিথিয়ন বন্দর ছেড়ে রওনা দেয় তার পরপরই যাত্রা শুরু করার কথা ছিল হুরোতাসের, এবং আমার আন্দাজই সত্যি হলো। সে এসে পৌঁছানোর মাত্র বারো দিনের মাথায় শহর থেকে বেরিয়ে আসা রাস্তাটা ধরে এগিয়ে আসতে দেখা গেল ওয়েনেগকে। আনন্দের বাগানের প্রাচীরের ওপর থেকে তাকে আসতে দেখলাম আমি। প্রায় আধ লিগ দূরত্ব থেকেও পরিষ্কার বোঝা যাচ্ছে দারুণ উত্তেজিত হয়ে আছে সে। প্রাচীরের ওপর আমাকে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখেই ঘোড়ার রেকাবের ওপর ভর দিয়ে উঠে দাঁড়াল সে, দুই হাত নাড়তে লাগল মাথার ওপর তুলে।
দৌড়ে সিঁড়ি বেয়ে নেমে এসে তার সাথে দেখা করার জন্য প্রধান দরজায় চলে এলাম আমি। এলাহি কারবার শুরু হয়ে গেছে পুরো লুক্সর শহরে! কথা শুনতে পাওয়ার মতো দূরত্বে আসার সাথে সাথে চিৎকার করে আমাকে জানাল ওয়েনেগ। ঢাক আর শিঙার আওয়াজে কান পাতা দায়! যুদ্ধের জন্য নিজের পশ্চাদ্দেশ সামলাতে ব্যস্ত হয়ে পড়েছে উটেরিক অথবা বলা যায় নিজের লোকদের পশ্চাদ্দেশ সামলাতে বলে নিজে বিছানার তলে গিয়ে লুকোতে ব্যস্ত হয়ে পড়েছে।
তার মানে অবশেষে হুরোতাস, তার হুই তাদের মিত্রদের নিয়ে মিশরের কাছাকাছি এগিয়ে এসেছে! যাও, রামেসিসকে খুঁজে বের করো! এক ঘণ্টা আগে ওকে রাজকুমারীর সাথে বাগানে দেখেছিলাম। ওকে বলবে উটেরিকের যুদ্ধপ্রস্তুতি কত দূর তা দেখার জন্য লুক্সর যেতে হবে আমাদের। সেইসাথে তার মতলবটা আসলে কী সেটাও জানার চেষ্টা করতে হবে। প্রথম দিন তোমার মদের দোকানে যে ছেঁড়া কাপড় পরে ঢুকেছিলাম আমরা সেই ছদ্মবেশই নেব আজকে। প্রস্তুত হয়ে প্রধান দরজায় চলে আসতে বলো ওকে। সেখানেই যেন আমার সাথে দেখা করে ও।
ইচ্ছে করেই ছদ্মবেশের জন্য ব্যবহৃত সেই ছেঁড়া কাপড়গুলো পরিষ্কার করিনি আমি। তবে প্রচণ্ড দুর্গন্ধ বের হতো ওগুলো থেকে, তাই একটা বাক্সে বন্ধ করে রেখে দিয়েছিলাম। এখন বাক্স খুলে বের করলাম ওগুলো। এবং দেখলাম গন্ধটা এখনো এত তীব্র যে একবার নাকের কাছে নিয়ে শুঁকতেই পানি বেরিয়ে এলো আমার চোখ দিয়ে। হাত আর মুখে কালি মেখে নিলাম আমি, তারপর মাথায় চড়ালাম মানুষের চুল আর পশুর লোম দিয়ে তৈরি একটা পরচুলা। এটাও আমার পোশাকের মতোই ময়লার ভাগাড়ে পরিণত হয়েছে এবং নানা ধরনের পোকামাকড় আর উকুনের আস্তানা। উকুনগুলোর কারণে অবশ্য সুবিধাই হয়েছে, কারণ এতে করে উৎসুক আগন্তুকরা দূরে থাকবে আমার কাছ থেকে।
