অন্যদিকে পদাতিক সৈন্যরা আফ্রিকান মাটিতে অবস্থান নেওয়ার পরেই নীলনদে হামলা চালানোর জন্য সুযোগ পেয়ে যাবে নৌবাহিনী। প্রাথমিকভাবে মেম্ফিস শহরের ওপর হামলা চালানোর পরিকল্পনা করেছে হুই। সেখানেই হুরোতাসের সাথে যোগ দেবে সে। শহরের ওপর নিজেদের দখল প্রতিষ্ঠা করতে পারলে সেখানে বসেই লুক্সরের উদ্দেশ্যে রওনা দিতে পারবে তাদের সেনাবাহিনী।
চিঠির শেষে কেবল একটা শব্দ দিয়েই একই সাথে শুভেচ্ছা এবং বিদায় জানিয়েছে হুরোতাস। এটা আসলে সৈনিকদের নিজস্ব একটা পরিভাষা, যেটা হচ্ছে তরবারি। আমাদের ভেতরে এর অর্থ হচ্ছে: যুদ্ধক্ষেত্রে মৃত্যু পর্যন্ত পরস্পরের সঙ্গী।
বত্রিশ পৃষ্ঠার বদলে মাত্র চার পৃষ্ঠা, মাথাটা একদিকে কাত করে আমার উদ্দেশ্যে বলল সেরেনা। এখন কি মনে হচ্ছে আমি বাড়িয়ে বলেছি?
এমন কথা তো কখনো বলিনি আমি। বুদ্ধি খাঁটিয়ে সেরেনার অভিযোগটা কাটিয়ে দিলাম আমি, তারপর তাকালাম রামেসিসের দিকে। খুব সংক্ষেপে নিজের কথা সেরেছে হুরোতাস।
তার কথা শুনে মনে হচ্ছে কাজটা খুব সহজ, প্রতিবাদ জানাল রামেসিস। তাই এবার আবার সেরেনার দিকে ফিরলাম আমি, মনে মনে খুশি যে আলোচনার বিষয়বস্তু নিয়ে ইতোমধ্যে তালগোল পাকিয়ে ফেলতে পেরেছি।
কী মনে হয় তোমার? হাসল সেরেনা, তারপর পরাজয় স্বীকারের ভঙ্গিতে দুই হাত চড়িয়ে দিল দুদিকে।
উটেরিক যখন বুঝতে পারবে যে তাকে আসলে তোমার এবং আমার বাবার বিরুদ্ধে লড়াইয়ে নামতে হবে, আমার ধারণা নিজের পেট থেকে বের হওয়া দুর্গন্ধময় পদার্থে সে নিজেই পা পিছলে পড়বে। দক্ষিণে অন্ধকার আফ্রিকার গভীর জঙ্গলের দিকে পালানো ছাড়া কোনো পথ থাকবে না তার। সেখানে গিয়ে নিজের স্বজাতি অর্থাৎ বাঁদরদের মাঝে আশ্রয় নিতে হবে তাকে।
প্রিয় রাজকুমারী, নিজের মতামত প্রকাশের জন্য খুব সুন্দরভাবে ভাষার ব্যবহার করতে শিখেছ তুমি! বলে এক হাতে ওর কাঁধ জড়িয়ে ধরে চাপ দিলাম আমি। কাজটা করলাম ওর কথায় আমার সম্মতি বোঝাতে। তবে এটাও স্বীকার করতে হয় যে, সেরেনার শরীরটা বেশ নরমও বটে।
তুমি খুব ভালো টাইটা, আদুরে গলায় বলে উঠল সেরেনা।
মৃদু হেসে আমাদের দিকে তাকিয়ে রইল রামেসিস। তুমি খুব সৌভাগ্যবতী সেরেনা। দু-দুজন পুরুষ তোমাকে ভালোবাসে।
টাইটার কথা তো আমি জানি। কিন্তু এই দ্বিতীয় পুরুষটি কে বলো তো?
*
ওয়েনেগ ছাড়াও আমার অন্য যেসব গুপ্তচর লুক্সরে ছিল তাদের কাছ থেকে জানা গেল যে, লুক্সর শহরে সেনা তৎপরতার এখন পর্যন্ত কোনো চিহ্ন নেই। তবু তাদের আমি এই বলে সাবধান করে দিলাম যে, খুব শীঘ্রই সেটা শুরু হতে যাচ্ছে এবং সামরিক ব্যস্ততা দেখা দিলেই বুঝতে হবে মিশরের বুকে উটেরিকের স্বৈরশাসনের বিরুদ্ধে হুরোতাস এবং তার ষোলোজন মিত্রের সম্মিলিত অভিযানের খবর জেনে গেছে সে।
আমার ধারণা হলো, উটেরিক নিশ্চয়ই তাড়াহুড়ো করে নিজের সৈন্যসামন্ত নিয়ে ছুটে যাবে মেফিস এবং আফ্রিকান উপকূলে। সেখানে নিজের শক্তি বাড়ানোর চেষ্টা করবে সে, একই সাথে ঠেকিয়ে রাখতে চাইবে রাজা হুরোতাসের আক্রমণকে।
লড়াই শুরু করার জন্য অধীর হয়ে আছে রামেসিস, যদিও উটেরিক এখনো লুক্সর থেকে নদীর ভাটি ধরে মেফিসের পথে যাত্রা শুরু করেনি। তার মতে, আনন্দের বাগানে ইতোমধ্যে প্রায় চার শ লোকের এক বাহিনী তৈরি করেছি। আমরা এবং এটাই যথেষ্ট। এরা সবাই উটেরিক আর তার চ্যালাদের হাতে নানাভাবে অত্যাচারের শিকার হয়েছে, এবং প্রতিশোধের জন্য পাগল হয়ে আছে তারা।
কিন্তু এই চার শ লোকের ছোট্ট বাহিনী দিয়ে কী করতে পারব আমরা, যেখানে আমাদের প্রতিপক্ষ উটেরিকের সৈন্যসংখ্যা প্রায় চার হাজার? ওকে প্রশ্ন করলাম আমি।
আমরা যদি মাঝরাতের পরে হামলা করি তাহলে উটেরিক নদীবন্দরে যে জাহাজগুলো নোঙর করে রেখেছে সেগুলোর বেশির ভাগে আগুন ধরিয়ে দিতে পারব। তা ছাড়া নদীর পাড়ে যে গুদামগুলো রয়েছে সেগুলোও পুড়িয়ে দিতে পারব আমরা। ওই গুদামগুলোতেই রয়েছে উটেরিকের বেশির ভাগ অস্ত্র আর রসদের সরবরাহ, জবাব দিল রামেসিস।
কিন্তু এটা করতে গেলে একই সাথে আমাদের অবস্থানের কথাও জানাজানি হয়ে যাবে। এখন পর্যন্ত উটেরিক বিশ্বাস করে যে সেরেনা দুঃখ-দুর্দশার ফটকে একা একা বন্দি হয়ে আছে এবং এ পর্যন্ত তার পাঠানো সকল বন্দির মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করেছে ডুগ আর তার অনুচররা। আর তুমি এবং আমি রয়েছি অনেক দূরে পৃথিবীর একেবারে উত্তর প্রান্তে। তুমি কি চাও উটেরিকের সেই ভুল ধারণা এত তাড়াতাড়ি ভেঙে যাক? প্রশ্ন করলাম আমি। এবার কিছুটা লজ্জিত দেখাল রামেসিসকে।
আমি ভেবেছিলাম- বলতে শুরু করল সে; কিন্তু আমি থামিয়ে দিলাম তাকে। যা-ই ভাবো না কেন, বেশি দূর ভেবে দেখোনি তুমি। এখন আমাদের যেটা করা দরকার সেটা হচ্ছে হুরোতাসের সাথে যোগাযোগ স্থাপন, তা পায়রার সাহায্যে হোক আর সংবাদবাহক মারফত হোক। তাহলে নিজেদের পরিকল্পনা সাজিয়ে নিতে পারব আমরা। কিন্তু তার আগ পর্যন্ত নিজেদের সামলে রাখতে হবে আমাদের, অপেক্ষা করতে হবে সেই সময়ের, যখন আস্ত গাড়ল উটেরিকের ওপর হামলা করলে তার ক্ষয়ক্ষতির পরিমাণ সবচেয়ে বেশি হবে। এতক্ষণ ধরে মনোযোগ দিয়ে আমাদের আলাপ শুনছিল সেরেনা। এই কথাটা শোনার সাথে সাথেই হাততালি দিয়ে উঠল ও। ওহ টাইটা, দারুণ একটা নাম দিয়েছ! আগে বলো কেন আমাকে?
