খোঁড়া কচ্ছপের গতিতে কাটতে লাগল দিনগুলো। প্রথমে সেরেনার হিসাব করা পনেরো দিন পার হয়ে গেল। তারপর রামেসিসের বিশ দিন, তবু মাথার ওপর দেখা পাওয়া গেল না কোনো পায়রার। এমনকি আমি নিজেও উদ্বিগ্ন হয়ে উঠতে লাগলাম। রাতে দুঃস্বপ্ন দেখলাম শিকারির হাতে নিহত পায়রার রক্তমাখা পালক ভাসছে বাতাসে। কিন্তু ঠিক তেইশ দিনের দিন সকালে আমাদের মাথার ওপরের আকাশে নীল আর বেগুনি রঙের ছোপ দেখা গেল অনেকগুলো। বোঝা গেল ফিরে আসছে পায়রারা। এক এক করে নিজেদের খোপে এসে ঢুকতে লাগল তারা আর জোরে জোরে গুনতে লাগলাম আমরা।
আমাদের ধারণা ছিল হুরোতাস আর তেহুতি হয়তো একটা একটা করে ছাড়বে পায়রাগুলোকে। খুব গুরুত্বপূর্ণ কিছু জানানোর থাকলে হয়তো বড় জোর দুটো কি তিনটে ছাড়তে পারে। কিন্তু আমরা সবাই প্রচণ্ড অবাক হয়ে দেখলাম একের পর এক পাখি শুধু এসেই যাচ্ছে। শেষ পর্যন্ত ছত্রিশ পর্যন্তই গোনা হয়ে গেল আমাদের। হতবাক হয়ে পরস্পরের দিকে তাকিয়ে রইলাম আমরা।
আমাদের এত বেশি অবাক হওয়ার পেছনে কাজ করেছে মূলত দুটো জিনিস। প্রথমটা হচ্ছে হুরোতাস এবং তেহুতি একই সাথে ছত্রিশটা পাখিকেই আমাদের কাছে ফেরত পাঠিয়ে দিয়েছে। আর দ্বিতীয়টা হলো এই দূরের পথ পাড়ি দেওয়ার পরেও একটা পাখিও ঘরে ফিরে আসতে ব্যর্থ হয়নি।
আমার অনুরোধ অগ্রাহ্য করে এমন সবিস্তারে চিঠি লেখা কেবল আমার মায়ের পক্ষেই সম্ভব, বিস্মিত কণ্ঠে বলে উঠল সেরেনা। স্বাভাবিকভাবেই যে মেয়েটাকে এত ভালোবাসি তার পক্ষে কিছু বলার প্রয়োজন বোধ করলাম আমি।
আহা সেরেনা। যে নারী তোমাকে জন্ম দিয়েছে তার ব্যাপারে এমনভাবে কথা বলতে পারো না তুমি, বললাম আমি।
আমার মায়ের পাঠানো চিঠি আর বাবার পাঠানো চিঠির মধ্যে একটু তুলনা করে দেখো, তাহলেই বুঝতে পারবে যে এমন কথা কেন বলেছি আমি, জবাব দিল সেরেনা। সুতরাং তাই করলাম আমি।
তেহুতির দারুণ সুন্দর নানা রঙের হায়ারোগ্লিফের লেখায় ভরে গেছে বত্রিশটা প্যাপিরাস। তার মেয়ে সংক্ষেপে চিঠি লেখার যে পরামর্শ দিয়েছিল সেটাকে হাওয়ায় উড়িয়ে দিয়েছে সে। চিঠির অনেক অংশে, এমনকি কবিতার মতো করেও লিখেছে তেহুতি এবং আমি নিজেও স্বীকার করতে বাধ্য হলাম যে লেখাগুলো আসলেই বেশ সুন্দর। পানমাসির হাতে অপহৃত হওয়া এবং উটেরিকের আস্তানায় বন্দি হয়ে থাকার পরেও যে তার মেয়ে সফলভাবে পালাতে সক্ষম হয়েছে এটা নিয়ে তেহুতির আনন্দের কোনো সীমা নেই। সেরেনার সাহস এবং বুদ্ধির দারুণ প্রশংসা করেছে সে এবং লিখেছে যে খুব শীঘ্রই তাদের দেখা হবে। সেইসাথে জানতে চেয়েছে যে দুষ্টু বুড়ো টাইটা সেই নীল তলোয়ারটা সেরেনাকে দিয়েছে কি না। মেয়েকে সে পরামর্শ দিয়েছে তলোয়ারটাকে ধারালো করে রাখতে এবং সেটা কীভাবে করতে হবে সে ব্যাপারে কিছু বুদ্ধিও দিয়েছে। তারপর সেরেনাকে নিশ্চিত করেছে যে রামেসিসের সাথে তার বিয়ের পোশাকটা তৈরির কাজ অবশেষে শেষ হয়েছে। এবং সত্যিই নাকি দেখার মতো একটা পোশাক হয়েছে সেটা। মেয়েকে ওটা পরা অবস্থায় দেখার জন্য নাকি আর তর সইছে না তার। এ ছাড়া মধুতে মাখানো ঝলসানো পাখি আর ঈল মাছের কিছু রন্ধনপ্রণালিও উল্লেখ করেছে সে, জানতে চেয়েছে সেরেনার বিয়েতে অতিথিদের এই খাবারগুলো পরিবেশন করলে সেরেনার কোনো আপত্তি আছে কি না। সব শেষে এই বলে শেষ করেছে যে, ছোট্ট প্যাপিরাসগুলোতে মোটেই জায়গা নেই, এটা নিয়ে তার দারুণ আফসোস হচ্ছে। তারপর আবারও মেয়ের নিরাপত্তা এবং সুস্বাস্থ্য কামনা করেছে এবং সব শেষে দাবি জানিয়েছে যে, সেরেনা যেন আরো অনেকগুলো পায়রা পাঠায় ল্যাসিডিমনে। এখনো নাকি অনেক গুরুত্বপূর্ণ খবর জানানো বাকি এবং তাদের মাঝে একটা খবরের উদাহরণ হচ্ছে; হুইসনের বউয়ের একটা ছেলে হয়েছে।
অন্যদিকে হুরোতাসের পাঠানো চারটি প্যাপিরাসকে বলা যায় সংক্ষিপ্ততা এবং পরিষ্কার ভাষার এক অনন্য উদাহরণ, একজন অভিজ্ঞ এবং দক্ষ যোদ্ধার মানানসই কাজ। সেরেনার তৈরি করা এবং আমার সম্পাদিত ভাষা কোডিস ব্রেভাসে নিজের চিঠি লিখেছে সে।
হুরোতাসের জন্য তেহুতির বরাদ্দ করা চার পৃষ্ঠার মাঝেই উটেরিকের বিরুদ্ধে নিজের যুদ্ধ পরিকল্পনার বিস্তারিত বিবরণ দিতে সক্ষম হয়েছে সে। দুই পর্যায়ে পরিচালনা করা হবে যুদ্ধ: সাগরে এবং স্থলে। পূর্ব নিয়ম অনুযায়ী অ্যাডমিরাল হুই নেতৃত্ব দেবে নৌবাহিনীর আর হুরোতাস নিজে পরিচালনা করবে রথ বাহিনী এবং পদাতিক সৈন্যদের।
যুদ্ধের শুরুর দিকে রথ বাহিনী অবস্থান নেবে সাজ্জাতু বন্দরে। জায়গাটা নীলনদ যেখানে ভূমধ্যসাগরে পতিত হয়েছে তার থেকে পঁয়ত্রিশ লিগ পুবে অবস্থিত। এটাই হচ্ছে স্থলপথে মিশরে আক্রমণ চালানোর জন্য সর্বোকৃষ্ট স্থান। ইতোমধ্যে হুরোতাস দুই শ ষাটটার মতো যুদ্ধের রথ এবং তাদের চালকদের সাজ্জাতুতে পাঠিয়ে দিয়েছে। সেখানকার শহর এবং অন্য জায়গাগুলো দখল করে নিয়েছে তারা। ওদিকে তাদের নামিয়ে দিয়ে জাহাজগুলো ফিরে গেছে ল্যাসিডিমন আরো একদল সৈন্য এবং রথ নিয়ে ফিরে আসবে আবার। সব মিলিয়ে সাজ্জাতুতে প্রায় নয় শ রথ জমা হবে, যা হবে ইতিহাসে সবচেয়ে বড় এবং সবচেয়ে ভয়ংকর রথ বাহিনী।
