এমনিতেও প্রতি রাতে সবাই ঘুমিয়ে পড়ার পরও অনেক রাত পর্যন্ত জেগে থাকে সেরেনা। কোডিস বেভাস নামে নতুন একটা লেখনী পদ্ধতি তৈরি করছে ও, যেটা আমাদের সমসাময়িক হায়ারোগ্লিফিকসের চাইতে প্রায় বারো গুণ ছোট এবং অনেক বেশি নিরাপদ। আমাদের মিশরীয় ভাষার প্রধান প্রধান দুই শ শব্দের জন্য কেবল একটিই প্রতীক ব্যবহার করা হয়েছে এই ভাষায়, যেটা বেশির ভাগ দরকারি কথাবার্তা লেখার জন্য যথেষ্ট। লেখার সাধারণ নিয়মগুলো ওর কাছ থেকে বিস্তারিত শোনার পর প্রায় সঙ্গেই সঙ্গেই এর স্বাভাবিক সৌন্দর্যে অবাক হয়ে গেলাম আমি। এই ভাষা আমি নিজে কেন আবিষ্কার করিনি এই ভেবে আফসোসও হলো। আমার সাহায্য নিয়ে বাবা মায়ের কাছে পাঠানোর জন্য এই ভাষায় একটা চিঠিও লিখে ফেলল সেরেনা। পঞ্চাশটি মস্তিষ্ক আলাদা আলাদা কাজ করার চাইতে দুটি দক্ষ মস্তিষ্ক একসাথে কাজ করলে তাতে অনেক বেশি ফল পাওয়া যায়।
এক শুভদিন দেখে মাঝরাতের কিছু পরে আমাদের প্রথম জাহাজটা নদীতে ভাসালাম আমরা। জাহাজের নাম রাখা হয়েছে আর্টেমিসের শপথ। চাঁদ তখন দিগন্তের ওপাশে সরে গেছে, শুধু কিছু তারার আলোয় আলোকিত হয়ে আছে নদীর বুক। আমাদের মাঝ থেকে সবচেয়ে দক্ষ ছয়জন নাবিককে রাখা হয়েছে জাহাজ পরিচালনার দায়িত্বে। বহুবার মিশর থেকে ল্যাসিডিমনের মাঝে যাতায়াত করেছে তারা। পেন্টু নামে এক দক্ষ নাবিককে দেওয়া হয়েছে জাহাজের ক্যাপ্টেনের দায়িত্ব। মানুষ এবং নাবিক- দুই হিসেবেই তার ওপর ভরসা আছে আমার। জাহাজে করে ছত্রিশটি পায়রা নিয়ে যাচ্ছে তারা। এ পর্যন্ত আনন্দের বাগানে এই পায়রাগুলোই জন্মাতে সক্ষম হয়েছি আমরা। খোলা সমুদ্রের ওপর দিয়ে লম্বা পথ পাড়ি দেওয়ার মতো শক্তি অর্জন করেছে সবগুলোই। এ ছাড়া মাছশিকারি ঈগল এবং অন্য শিকারি পাখিদের দৃষ্টি এড়ানোর মতো যথেষ্ট বুদ্ধিও রাখে মাথায়।
এই পাখিগুলোর পাশাপাশি আরো থাকছে প্রায় এক শ প্যাপিরাস পুঁথি, যাতে রয়েছে রাজকুমারী সেরেনার মনোমুগ্ধকর হায়ারোগ্লিফে লেখা একটি চিঠি। রাজা হুরোতাস এবং রানি তেহুতিকে উদ্দেশ্য করে লেখা হয়েছে চিঠিটা।
পরদিন সন্ধ্যার দিকে হঠাৎ আমার দরজায় আস্তে করে টোকা দিল কে যেন। খুব সাবধানে দরজা খুলে উঁকি দিলাম আমি। দেখলাম রামেসিস আর সেরেনা দাঁড়িয়ে আছে ওপাশে, শীতে কাঁপছে দুজনই।
আমরা তোমাকে বিরক্ত করছি না তো, হে জ্ঞানী? ভেতরে আসতে পারি? কেবল আমার কাছ থেকে প্রায় অসম্ভব কিছু আদায় করার দরকার হলেই এই সম্বোধনে আমাকে ডাকে রামেসিস। অনিচ্ছাসত্ত্বেও দরজাটা আরেকটু খুললাম আমি।
হাথোরের শপথ! তোমার প্রশ্নের জবাব হচ্ছে মোটেই না এবং অবশ্যই। অথবা উল্টোটাও ধরতে পারো। ইচ্ছে করেই একটু ধোঁয়াশা ধরনের জবাব দিলাম আমি, যাতে আমাকে পেয়ে না বসে ওরা। তবে একই সাথে সরে দাঁড়িয়ে ওদের ভেতরে ঢোকারও সুযোগ করে দিলাম।
ভেতরে ঢুকে কিছুক্ষণ বিব্রত চেহারায় পাশাপাশি বসে রইল ওরা। শেষ পর্যন্ত রামেসিস উঠে দাঁড়িয়ে বলল, আমাদের মনে হয়েছিল তুমি হয়তো আমাদের সাথে প্রার্থনা করতে রাজি হবে।
কী অদ্ভুত! চেহারায় বিস্মিত ভাব ফুটিয়ে তুললাম আমি। দেবতারা মাঝে মাঝে আমাদের সাথে কথা না বলেই নানা রকম সিদ্ধান্ত নিয়ে নেন। সত্যি কথা বলতে তারা প্রায়ই এমন সব কাজ করেন, যেটা আমাদের ইচ্ছের ঠিক উল্টো। হয়তো স্রেফ নিজেদের প্রাধান্য বোঝাতেই কাজটা করেন তারা।
একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলল রামেসিস। তারপর সেরেনার দিকে এমন দৃষ্টিতে তাকাল, যার অর্থ হচ্ছে আমি তোমাকে আগেই বলেছিলাম। সেরেনার চোখগুলো হঠাৎ বড় বড় হয়ে উঠল, তারপর আমাকে অবাক করে দিয়ে ভরে উঠল অশ্রুতে। আমি জানি যে ও কত দক্ষ অভিনেত্রী। কিন্তু এই মুহূর্তে আপাতত আত্মসমর্পণ করা ছাড়া পথ নেই আমার।
ঠিক আছে ঠিক আছে, হার মানলাম আমি। সাথে সাথে হাসি ফুটল রামেসিসের ঠোঁটে। এবং একই সাথে সম্পূর্ণ অলৌকিকভাবে শুকিয়ে গেল সেরেনার চোখের পানি। কিন্তু আমাদের প্রার্থনার বিষয়বস্তু কী হবে? দেবতাদের কাছে কীসের অনুরোধ জানাব আমরা? যদিও আমার মনে হচ্ছে। সেটা আমি আগেই জানি।
আমরা চাই আর্টেমিসের শপথের ওপর সদয় দৃষ্টি রাখুন দয়ালু দেব-দেবীগণ এবং তাকে নিরাপদে গিথিয়ন বন্দরে নোঙর করার অনুমতি দিন, ব্যাকুল কণ্ঠে জানাল সেরেনা। তারপর আমরা এটাও বলতে চাই যে, তারা যেন আমাদের পায়রাগুলোর ওপরে খেয়াল রাখেন, তাদেরকে নিরাপদে আমাদের কাছে ফিরিয়ে আনেন। সেইসাথে আমার বাবা-মায়ের পাঠানো খবর যেন অক্ষত অবস্থায় আমাদের হাতে পৌঁছায়।
এটুকুই? বাহ, বললাম আমি। তা বেশ তো। তাহলে গোল হয়ে হাতে হাত ধরে দাঁড়াই আমরা, কি বলো? সেরেনার হাতগুলো অত্যন্ত কোমল, এবং স্বাভাবিকভাবেই ওগুলো ধরতে আমার খুবই ভালো লাগে।
*
আর্টেমিসের শপথকে প্রথমে নীলনদ হয়ে ভূমধ্যসাগর পাড়ি দিয়ে ল্যাসিডিমনের গিথিয়ন বন্দরে পৌঁছাতে হবে। সেখানে হুরোতাস আর তেহুতি আমাদের চিঠি পড়বে এবং সেরেনার আবিষ্কৃত কোডিস ব্রেভাসে তার জবাব লিখবে। তারপর সেই চিঠিকে পায়রাগুলোর পায়ে বেঁধে আবার ফেরত পাঠাবে আনন্দের বাগান অভিমুখে। তাদের আবার বিপদসংকুল পথ পাড়ি দিয়ে এখানে পৌঁছতে হবে। এর জন্য সব মিলিয়ে কত সময় লাগবে সে ব্যাপারে আমরা তিনজনই আলাদা আলাদাভাবে একটা হিসাব করলাম। সেরেনা ধারণা করল পনেরো দিন। রামেসিস আরেকটু বাস্তববাদী হয়ে বলল বিশ দিন। আমি বললাম তেইশ দিন, অবশ্য যদি দেবতারা আমাদের সহায় হতে চান তাহলেই কেবল এটা সম্ভব।
