মিশরীয় সমাজের সম্পদশালী ব্যক্তিরা ছাড়াও বন্দিদের মাঝে আরো কিছু জনপ্রিয় এবং সফল রাজকর্মকর্তা এবং সেনা কর্মকর্তাকে পাওয়া গেল। সবার পরিচয় নিশ্চিত করার পর তাদের উদ্দেশ্যে একটি স্বাগত বক্তব্য রাখলাম আমি। সেই বক্তৃতায় তাদের নিশ্চিত করলাম যে রামেসিস এবং আমি যে ধরনের মানুষকে আমাদের সঙ্গে রাখতে চাই তাদের ভেতর সেই সব মানুষের সব গুণাবলিই আছে। নকল ফারাওয়ের হাতে তারা যে দুর্ভোগের শিকার হয়েছে তার জন্য দুঃখ প্রকাশ করলাম আমি, সেইসাথে এটাও বললাম যে, আমি এবং রামেসিসও তাদের মতোই একই অত্যাচারের শিকার হয়েছি। সব শেষে তাদের আহ্বান জানালাম আমাদের দলে যোগ দিতে, যারা রামেসিসকেই মিশরের একমাত্র যোগ্য ফারাও হিসেবে অধিষ্ঠিত করার লক্ষ্যে কাজ করে চলেছে। বললাম, তাদের বিরুদ্ধে যে অভিযোগ আনা হয়েছিল তা সম্পূর্ণ ভিত্তিহীন এবং বানোয়াট বলে ধরা হয়েছে। এখন তারা সবাই এই মহান দেশের মুক্ত ও স্বাধীন নাগরিক। এ ছাড়াও এ ব্যাপারে তাদের মতামত শোনার জন্য অত্যন্ত আগ্রহী আমি এবং রামেসিস।
মনে হলো যেন প্রত্যেকেরই আলাদা আলাদা মতামত আছে এবং তা প্রকাশ করার ব্যাপারে প্রত্যেকেই দারুণ আগ্রহী। কারণ আমার কথা শেষ হওয়ার সাথে সাথেই দারুণ হট্টগোল শুরু হয়ে গেল সবার মাঝে। সেই মুহূর্তে যদি রাজকুমারী সেরেনা সম্মেলন কক্ষে প্রবেশ না করত তাহলে হয়তো হট্টগোল সামলানো প্রায় অসম্ভব হয়ে পড়ত। সত্যি কথা বলতে এই মুহূর্তে সেরেনার উপস্থিতির ব্যাপারটা আমিই সাজিয়ে রেখেছিলাম।
কয়েক মুহূর্তের মধ্যেই সবার চিৎকার-চেঁচামেচি নিচুপ হয়ে গেল, প্রথমবারের মতো সেরেনাকে দেখতে পেল মিশরের অভিজাত সম্প্রদায়ের সদস্যরা। এটাও মনে রাখতে হবে যে, উটেরিকের হাতে বন্দি হওয়ার পর থেকে এ পর্যন্ত দীর্ঘ সময়ের মাঝে কোনো নারীর ওপর চোখ রাখেনি এরা, ফলে তাদের বিস্ময়টা হলো আরো বেশি।
এই মুহূর্তে তাদের সামনে প্রায় অলৌকিক পর্যায়ের একটা ঘটনা ঘটছে। রক্ত মাংসের মানুষকে দেখছে ঠিকই; কিন্তু তাকে স্বর্গীয় কেউ বলে ধরে নিয়েছে সবাই। সেরেনার মাঝে যে দেবত্ব বিদ্যমান তার কারণে ওর মাথার চুল আগের চাইতেও যেন উজ্জ্বল আর দীর্ঘ হয়ে গজিয়েছে। এখন সত্যিই তাকে দারুণ লাগছে দেখতে।
ওর হাত ধরল রামেসিস, তারপর সবার সামনে এগিয়ে নিয়ে এলো। এই নারীই আমার স্ত্রী হতে যাচ্ছে। এ হলো স্পার্টান ল্যাসিডিমনের রাজকুমারী সেরেনা, সবাইকে জানাল সে। সাথে সাথে মৃদু গুঞ্জন বয়ে গেল সবার মাঝে। গুঞ্জনের কিছুটা তৈরি করল আফসোসের দীর্ঘশ্বাস আর বাকিটা তৈরি হলো প্রশংসাসূচক বাক্যে।
সঠিক সুযোগ চিনতে কখনো ভুল হয় না আমার। এই মুহূর্তে দুই হাত ওপরে তুলে নীরবে সবাইকে জয়ধ্বনি দেওয়ার ইশারা করলাম আমি। প্রায় সাথে সাথে সবার মিলিত কণ্ঠস্বরের হর্ষধ্বনিতে প্রায় উড়ে যাওয়ার অবস্থা হলো আমার।
রামেসিস আর সেরেনার জয় হোক! মিশরের ফারাও এবং রানির জয় হোক!
*
মনে হলো যেন একেবারেই অশিক্ষিত আর মূর্ণ হওয়ার পরেও উটেরিক কোনো রহস্যময় উপায়ে সবচেয়ে দক্ষ এবং অভিজ্ঞ বত্রিশজন ব্যক্তিকে মৃত্যুদণ্ড দিয়ে পাঠিয়েছে আমাদের কাছে। এই বত্রিশজন মানুষকে দিয়েই একটি সরকারের মন্ত্রিসভা গঠন করা যেতে পারে। আমরাও তাই করলাম। মিশরের রাষ্ট্রীয় পরিচালনার কাজে রামেসিসকে সহায়তা করার কাজে নিয়োগ দিলাম তাদের প্রায় সবাইকে।
বন্দিদের মাঝে ছিল কৃষি, খাদ্য, পশুপালন, শিক্ষা, মৎস্যপালন, বন বিভাগ, খনিবিদ্যা, নির্মাণ, অর্থ ও করবিদ্যা, পানি সরবরাহ এবং সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ যেটা- সেনাবাহিনী ও নৌবাহিনী এবং যুদ্ধবিদ্যায় দক্ষ সব ব্যক্তির সমারোহ। ফারাওয়ের কাছ থেকে প্রস্তাবিত সকল পদে খুব আনন্দের সাথেই যোগদান করল তারা। তবে তাতে অবশ্য আমার খুব একটা উপকার হলো না, কারণ যতই অভিজ্ঞ বা দক্ষ হোক না কেন, নতুন কোনো সিদ্ধান্ত বাস্তবায়ন করতে গিয়ে কোথাও আটকে গেলে সবাই আমার কাছেই সাহায্য বা পরামর্শ চাইতে এলো।
কয়েক দিন পর পরই আনন্দের বাগানে এসে পৌঁছতে লাগল কয়েদিদের দল। সবাইকেই মৃত্যুদণ্ড দিয়েছে অপরাজেয় উটেরিক। অল্প সময়ের মাঝেই আমাদের লোকবল প্রায় কয়েক শতে পৌঁছে গেল। তাদের মাঝ থেকে ওয়েনেগ আর আমি মিলে কাঠমিস্ত্রি ও নির্মাণশ্রমিক আলাদা করে নিলাম। এবার তাদেরকে কাজে লাগানো হলো আমার নকশা অনুযায়ী চারটি দ্রুতগামী ছোট জাহাজ এবং দুটো বড় নৌকা তৈরির জন্য। ল্যাসিডিমনে অবস্থানরত রাজা হুরোতাস এবং আমাদের অন্যান্য মিত্রের সাথে যোগাযোগের কাজে ব্যবহার করা হবে এগুলো। প্রথম জাহাজটা প্রায় সমুদ্রে নামানোর উপযোগী হয়ে গেছে, এই সময় একদিন দারুণ উত্তেজিত অবস্থায় সেরেনা দেখা করতে এলো আমার সাথে। জানাল হুই চাচা আর তার প্রেমিকা পায়রাটা যে তিনটি ডিম পেড়েছিল সেগুলো ফুটে এখন বাচ্চা বেরিয়েছে। কয়েক সপ্তাহের মধ্যেই বড় হয়ে যাবে বাচ্চাগুলো এবং উড়তেও শিখে যাবে। তখন ল্যাসিডিমনে সেরেনার বাবা-মায়ের কাছে পাঠানো যাবে ওগুলোকে, এবং, আমাদের দুই পক্ষের মাঝে সংবাদ আদান-প্রদান অনেক সহজ হয়ে আসবে।
