*
বেশ উদ্বিগ্ন হয়ে আছি আমি। উটেরিকের সাথে সেরেনার শেষবার দেখা হওয়ার পর এই প্রথম কোনো আগন্তুককে কারাগারের আশপাশে দেখা গেল। উটেরিক হয়তো তার সিদ্ধান্ত বদলেছে, এখন আবারও সেরেনার ওপর নির্যাতন চালানোর জন্য তাকে প্রাসাদে নিয়ে যেতে লোক পাঠিয়েছে–এই চিন্তাটা জোর করে মাথা থেকে সরিয়ে রাখলাম। কোথাও না থেমে এক দৌড়ে সামনের উঠানে চলে এলাম আমি, তারপর দম নেওয়ার জন্য না থেমেই সিঁড়ি বেয়ে উঠে পড়লাম প্রাচীরের ওপর নজরদারির জন্য তৈরি করা স্তম্ভে। সাথে সাথেই দূরে রথের চাকায় ওড়া ধুলোর মেঘ চোখে পড়ল আমার। লুক্সর থেকে বেরিয়ে আসা পথটা ধরে এদিকেই আসছে ওরা।
কতগুলো রথ ওখানে? প্রহরীকে জিজ্ঞেস করলাম আমি। কাঁধ ঝাঁকাল সে।
বেশ কয়েকটা আছে, কমপক্ষে দশ-বারোটা তো হবেই। অনেক দ্রুত আসছে ওরা।
অনুভব করলাম, স্বস্তির একটা স্রোত বয়ে গেল আমার ওপর দিয়ে। স্রেফ সেরেনাকে জিজ্ঞাসাবাদ করার উদ্দেশ্যে নিয়ে যেতে চাইলে এতগুলো রথ পাঠাত না উটেরিক। ওদের কাউকে চিনতে পেরেছ? প্রশ্ন করলাম প্রহরীর উদ্দেশ্যে।
না, এখনো অনেক দূরে রয়েছে ওরা। তবে খুব সম্ভব নতুন কয়েদি এবং তাদের প্রহরীরাই আসছে। আমার মতামতের সাথে মিলে গেল তার মন্তব্য।
বরাবর যেটা হয়ে এসেছে, প্রবেশপথের মুখে আটকে দেবে ওদের। আমি গিয়ে পোশাক বদলে আসছি।
সব কাজ শেষ করে আমি যখন ফিরে এসে টানা সেতুর মাথায় চড়লাম, দেখলাম প্রধান দরজার সামনে ধুলো মাখা অবস্থায় দাঁড়িয়ে আছে এগারোটা যুদ্ধের রথ। প্রতিটি রথেই বেশ কয়েকজন যাত্রী রয়েছে, যাদের বেশির ভাগকেই বেঁধে রাখা হয়েছে শিকল দিয়ে।
কারা তোমরা? কে পাঠিয়েছে তোমাদের? কী চাও এখানে? ভুগের কণ্ঠস্বর নকল করে দেয়ালের ওপর থেকে তাদের উদ্দেশ্যে জানতে চাইলাম আমি।
অপরাজিত ফারাও উটেরিকের রাজকীয় রথচালক আমরা! এখানে এসেছি ফারাওয়ের নির্দেশে। একত্রিশজন কয়েদির সর্বোচ্চ শাস্তি নিশ্চিত করার জন্য তোমার হাতে তুলে দিতে চান ফারাও। আমরা তাদের নিয়ে এসেছি।
আমার নির্দেশে বন্দিদের রথ থেকে নামানো হলো, তারপর গোড়ালিতে শিকল দিয়ে একসাথে বাঁধা অবস্থায় সবাইকে দরজা দিয়ে ঢোকানো হলো ভেতরের প্রাঙ্গণে। অনেক ওপরে প্রধান ফটকের মাথায় ঝুলন্ত অবস্থায় ভুগের মাথার খুলির শূন্য কোটরগুলো চেয়ে রইল তাদের দিকে। ডুগের হায়ারোগ্লিফ প্রতীক ব্যবহার করে বন্দিদের রসিদে স্বাক্ষর করলাম আমি। তারপর তাদের নিয়ে আসা রথচালকরা আবার বের হয়ে গেল প্রধান দরজা দিয়ে। খালি রথ নিয়ে লুক্সরের পথে রওনা হয়ে গেল তারা। এবার বন্দিদের দীর্ঘ সারিটিকে পথ দেখিয়ে ভেতরের উঠানে নিয়ে এলাম আমরা, যেখানে রাজকুমারী সেরেনার নিজের হাতে লাগানো বাগান শোভাবর্ধন করেছে। বন্দিরা ভেতরে ঢোকার সাথে সাথে তাদের স্বাগত জানিয়ে বেজে উঠল নানা রকম উচ্ছ্বসিত বাজনা।
ক্লান্তি আর হতাশা কাটিয়ে উঠে অবাক চোখে এদিক-ওদিক তাকাতে শুরু করল বন্দিরা। যদিও এখনো বাগানের খুব কম গাছেই ফুল ফুটেছে; কিন্তু বন্দিরা যে অত্যাচারের যন্ত্রপাতি এবং ফাঁসিকাঠ দেখবে বলে আশা করেছিল তার কিছুই নেই ভেতরে। তার বদলে তাদের অপেক্ষায় দাঁড়িয়ে রয়েছে তিনজন কামার। সবার সামনে হাঁপর, সেইসাথে হাতে রয়েছে বাটালি এবং হাতুড়ি। প্রত্যেক বন্দি সামনে এগিয়ে যাওয়ার সাথে সাথে তার গোড়ালি থেকে বাটালির সাহায্যে শিকল কেটে ফেলল তারা। বন্দিরা আরো অবাক হয়ে গেল যখন দেখল তাদের প্রত্যেকের হাতে একটা করে মাটির পাত্রভর্তি ফেনা ওঠা বিয়ার, একটা রুটির টুকরো আর বড় একটা শুকনো সসেজ ধরিয়ে দেওয়া হলো। এবার তাদের হতাশা কেটে যেতে শুরু করল। এই খাবারগুলো যারা সবার মাঝে ভাগ করে দিল তাদের মধ্যে একজনকে সবাই খুব দ্রুত চিনে ফেলল- যুবরাজ রামেসিস, যাকে সবাই অনেক আগেই মৃত বলে ধরে নিয়েছিল। উল্লসিত চিৎকারে তাকে অভিবাদন জানাল সবাই। সবাই গোগ্রাসে খেয়ে নেওয়ার পর তারা যুবরাজের চারপাশে এসে জড়ো হলো এবং মৃত অবস্থা থেকে জীবিত হয়ে ফিরে আসতে দেখে তাকে নানা রকম প্রশংসা আর আনুগত্যের প্রতিশ্রুতি জানাতে লাগল। অবশ্য আমাকেও ওরা খুব ভালোভাবেই চেনে, বলা যায় রামেসিসের চাইতেও আমি ওদের কাছে বেশি পরিচিত। আমিও আমার যোগ্য প্রশংসা এবং ধন্যবাদের অংশ পেলাম।
এবার আমার লোকেরা বন্দিদের কয়েক ভাগে ভাগ করে ফেলল। তবে এবার দেখা গেল এক একজনের গা থেকে প্রচণ্ড দুর্গন্ধ বের হচ্ছে। কয়েক মাস আগে উটেরিকের বিশেষ গোয়েন্দা বাহিনীর হাতে ধরা পড়ার পর থেকে এরা সবাই সেই একই কাপড় পরে আছে। এবার আমার নির্দেশে ওদের সবাইকে রান্নাঘরের নিচে, কূপের পাড়ে নিয়ে যাওয়া হলো। তারপর সম্পূর্ণ নগ্ন হয়ে নিজেদের শরীর এবং কাপড়চোপড় ক্ষার দিয়ে ভালো করে পরিষ্কার করে নিল। দারুণ উৎসাহের সাথেই কাজটা করল তারা। যে অত্যাচারের কথা সবাই আশা করছিল তার বদলে এমন অপ্রত্যাশিত ভালো আচরণ পেয়ে দারুণ খুশি হয়ে উঠেছে সবাই।
সবার গোসল এবং কাপড় পরা শেষ হওয়ার পর তাদের মাঝ থেকে বারোজনকে চিনতে পারলাম আমি আর রামেসিস। এরা সবাই মিশরের বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ এবং প্রভাবশালী পরিবারের প্রধান। ফারাও টামোসের মৃত্যুর আগে তার সাথে এদের সবার সুসম্পর্ক ছিল এবং প্রচুর ধনসম্পদের মালিক ছিল সবাই। এবার ওদের প্রশ্ন করে জানতে পারলাম সবার বিরুদ্ধে একই অভিযোগ আনা হয়েছে, আর তা হচ্ছে দেশদ্রোহিতা। এবং সেই অভিযোগেই মৃত্যুদণ্ড দেওয়া হয়েছে সবাইকে। স্বাভাবিকভাবেই তাদের সবার সব সম্পদ গিয়ে ঢুকেছে ফারাওয়ের রাজকীয় কোষাগারে। নিজের পকেট ভারী করতে কখনো খুব একটা দ্বিধা করতে দেখা যায়নি উটেরিককে।
