পায়রা হচ্ছে সত্যিকারের আশ্চর্য এক পাখি, সেরেনাকে বুঝিয়ে বলল ওয়েনেগ। ওদের অনেকগুলো গুণের মাঝে একটা হচ্ছে ওরা দারুণ একনিষ্ঠ।
একটু বিভ্রান্ত দেখাল সেরেনাকে, বুঝতে পারেনি কথাটা। এবার ওকে বুঝিয়ে বললাম আমি। সারা জীবন ধরে পরস্পরের প্রতি বিশ্বস্ত থাকে ওরা, এবং পুরুষ পাখি কখনো নিজের সঙ্গিনী ছাড়া অন্য কোনো মেয়ে পাখির দিকে তাকায় না পর্যন্ত।
তাই নাকি? ইস, কী সুন্দর… বলে রামেসিসের দিকে অর্থপূর্ণ দৃষ্টিতে তাকাল ও। সত্যিই, কী সুন্দর! সবুজ চোখে দুষ্টুমির হাসি নিয়ে সেরেনার দিকে তাকিয়ে সজোরে ঘাড় নাড়ল রামেসিস।
এবার ওয়েনেগ আর আমি মিলে প্রথম পুরুষ পায়রাটাকে ছেড়ে দিলাম পায়রার খোপের ভেতর। ইতোমধ্যে সেখানে ছয়টা মেয়ে পায়রা রাখা হয়েছে। পুরুষ পাখিটাকে দেখেই বাকিদের মাঝে দারুণ উত্তেজনা সৃষ্টি হলো, ভয় পেয়েছে এমন ভঙ্গিতে এদিক-ওদিক ছুটে বেড়াতে লাগল সবাই। সঙ্গিনী বেছে নিতে কিছুটা সময় নিল পুরুষ পায়রাটা। তবে যখন দেখলাম যে তার পছন্দ করা শেষ তখন ওয়েনেগের সহায়তায় বাকি পাঁচটা মেয়ে পায়রাকে বের করে নিলাম খোপ থেকে। পুরুষ পায়রাটাকে ছেড়ে দিলাম তার সঙ্গিনীর মন ভজাতে।
এবার পুরুষ পাখিটার দিকে খেয়াল করে দেখো- বলে চলল ওয়েনেগ।
এক মিনিট দাঁড়াও ওয়েনেগ, তাকে থামিয়ে দিল সেরেনা। এভাবে পুরুষ পাখি পুরুষ পাখি বলে ডাকতে পারো না তুমি। ও তো নিছক কোনো পাখি নয়, তাই না? একটা নাম থাকা উচিত ওর।
অবশ্যই অবশ্যই। ঠিকই বলেছেন আপনি মহামান্যা রানি। আগেই কথাটা চিন্তা করা উচিত ছিল আমার। তা ওকে কী নামে ডাকব আমরা? প্রশ্ন করল ওয়েনেগ। ডানাওয়ালা প্রভু বলে ডাকলে কেমন হয়?
ধ্যাত! বলে এক মুহূর্ত চিন্তা করল সেরেনা। ওর হাবভাব দেখেছ? দেখে মনে হয় না নিজেকে দারুণ এক প্রেমিক বলে ভাবে ও? তা ছাড়া আমরা সবাই চাই যে ও অনেকগুলো বাচ্চার জন্ম দিক, তাই না? এদিক দিয়ে চিন্তা করলে ওর জন্য একটা নামই সঠিক হয়। হুই চাচা! ওকে হুই চাচা বলে ডাকব আমরা!
হাসিতে ফেটে পড়লাম আমরা। নিজেদের সামলে নিতে বেশ কিছুটা সময় লেগে গেল আমাদের। শেষে ওয়েনেগই আবার কাজের কথায় ফিরে এলো। দেখেছ কীভাবে বুক চিতিয়ে ঘুরে বেড়াচ্ছে ও? সঙ্গিনীকে আকৃষ্ট করার চেষ্টা করছে। মেয়ে পাখিটা যে পালিয়ে বেড়াচ্ছে সেটা খুব একটা অস্বাভাবিক নয়। পালাচ্ছে ঠিকই; কিন্তু বেশি দূরে যাচ্ছে না বা বেশি জোরেও দৌড়াচ্ছে না, মনে করিয়ে দিলাম আমি।
তা তো অবশ্যই, বলল সেরেনা। ও একজন মেয়ে এবং ভালোই বুদ্ধি রাখে মাথায়।
এবার হুই চাচা তার লেজের পালকগুলো ছড়িয়ে দিয়ে প্রেমিকার পেছনে লেগেছে। মেয়ে পাখিটা ঠিক ওর সামনে সামনেই থাকছে, বেশি দূরে সরছে না কিন্তু।
ঠিক বলেছ! দারুণ চালাক একটা পাখি ও! হাততালি দিয়ে উঠল সেরেনা।
এত সহজে ধরা দিতে চায় না প্রেমিকের কাছে।
শেষ পর্যন্ত প্রেমিকের দিকে ফিরে তাকাল ও। এবার প্রেমিকার জন্য মুখ হাঁ করে দিচ্ছে হুই চাচা, বর্ণনা দেওয়া চালিয়ে গেলাম আমি।
এই কাজ কেন করছে সে? জানতে চাইল সেরেনা।
একে বলা হয় চিরন্তন চুম্বন। মেয়ে পাখিটাকে নিজের জীবনসঙ্গিনী হওয়ার আমন্ত্রণ জানাচ্ছে সে। এবার ওয়েনেগের কাছ থেকে পায়রার আচরণ ব্যাখ্যার ভার নিজের কাঁধে তুলে নিলাম আমি, কারণ ওদের সম্পর্কে আমি ওয়েনেগের চাইতে অনেক বেশি জানি।
দেখিস এত সহজে বোকা বনিস না, মেয়ে পাখিটাকে সাবধান করে দিতে বলে উঠল সেরেনা। মা কী বলেছে মনে রাখিস। কোনো পুরুষকে কখনো বিশ্বাস করতে নেই। কিন্তু মেয়ে পাখিটা ওর কথায় কোনো কর্ণপাত না করে নিজের পুরো মাথাটা পুরুষ পাখির গলা দিয়ে ভেতরে ঢুকিয়ে দিল। কয়েক মুহূর্ত পর মাথাটা বের করে আনল সে, তারপর পেট মাটিতে রেখে বসে পড়ল।
কপালে তোর খারাবি আছে রে! মৃদু দীর্ঘশ্বাস ফেলল সেরেনা। পুরুষ পাখিটা এবার মেয়ে পাখির পিঠের ওপর চড়ে বসল, তারপর কয়েকবার ডানা ঝাঁপটে লেজের পালকগুলো ছড়িয়ে দিয়ে ঢেকে নিল নিজেদের পেছনের অংশ। অবশ্য নাও থাকতে পারে, বলল সেরেনা, তারপর আস্তে করে হাত বাড়িয়ে দিল রামেসিসের হাতের দিকে।
ওদের ভালোবাসার এই বহিঃপ্রকাশ দেখেও না দেখার ভান করলাম আমি, ব্যাখ্যা দেওয়া চালিয়ে গেলাম তার বদলে: আশা করা যায় যে দশ দিন পরেই মেয়ে পাখিটা দুই কি তিনটে ডিম পাড়বে। সেগুলো ফুটে বাচ্চা বের হতে লাগবে আরো আঠারো দিন। আর দেড় মাসের মাঝেই বড় হয়ে উঠবে বাচ্চাগুলো। তারপর যেখানেই ওদের পাঠানো হোক না কেন ঠিকই পথ চিনে এই আনন্দের বাগানে ফিরে আসতে পারবে।
সে তো অনেক দিনের ব্যাপার, আনমনে বলে উঠল সেরেনা। তোমার কোনো ধারণাই নেই টাইটা, বাবা-মায়ের কাছ থেকে কিছু খবর পাওয়ার জন্য কত ব্যাকুল হয়ে আছি আমি। বিষণ্ণ ভঙ্গিতে মাথা নাড়ল ও। তবে তার পরেই সামলে নিল নিজেকে। তবে এখন আমাদের যেটা করতে হবে সেটা হচ্ছে পূর্ণবয়স্ক পাখিগুলোকে ল্যাসিডিমনে পাঠানোর একটা উপায় বের করা, যাতে আমার প্রিয় মানুষগুলোর কাছ থেকে চিঠি নিয়ে ফিরে আসতে পারে ওরা…
ওর কথার জবাবে আমি কিছু বলার আগেই হঠাৎ কারাগারের প্রাচীরের ওপর থেকে ট্রাম্পেটের জোরালো আওয়াজ ভেসে এলো। প্রহরীরা সাবধান করে দিচ্ছে সবাইকে। আলোচনার ইতি টানলাম আমি। ওই শব্দের অর্থ হচ্ছে লুক্সর থেকে কেউ আসছে এদিকে। যদি কোনো ঝামেলা হয়, তোমরা সবাই জানো যে কার ওপর কী দায়িত্ব আছে। এবার আমাকে ভুগের ছদ্মবেশ নিতে হয়, বলে দ্রুত পায়ে কক্ষ থেকে বেরিয়ে এলাম আমি।
