পা দিয়ে মেঝেতে বাড়ি মারল সেরেনা। এই কারাগারের দেয়ালগুলো অনেক উঁচু, মনে করিয়ে দিল ও। কোনো রাখালের পক্ষেই এর ভেতরে কী চলছে তা দেখা সম্ভব হবে না। তা ছাড়া এখন পর্যন্ত এই ভয়ানক জায়গার আশপাশে কেবল একজন রাখালই পা রাখার দুঃসাহস দেখিয়েছে। আর তার নাম হচ্ছে। টাইটা। এমনকি অপরাজেয় ফারাও উটেরিক টুরোও এখানে আসার সাহস পাবে না। সে জন্যই আমাকে নিয়ে যেতে নিজের চ্যালাদের পাঠিয়েছিল সে। তোমার বাবা-মা? তোমাকে ফিরে পাওয়ার জন্য ব্যাকুল হয়ে রয়েছে তারা। সেরেনাকে ল্যাসিডিমনে নিরাপদ আশ্রয়ে ফিরিয়ে নিয়ে যাওয়ার জন্য দরকার হলে সব কিছু করতে রাজি আছি আমি।
আমার বাবা-মা আমাকে তখনই দেখতে পাবে যখন তারা মিশরে আসবে, শক্ত গলায় জবাব দিল সেরেনা।
কেন? আরো একবার সেরেনার জবাব শুনে অবাক হয়ে গেলাম আমি।
কারণ মিশরই এখন আমার বাড়ি। আমার ভবিষ্যৎ স্বামী এই মিশরের ফারাও হতে যাচ্ছে এবং আমি হতে যাচ্ছি তার রানি। এমনকি আমার উপাধিও ঠিক করে রেখেছি আমি। রানি ক্লিওপেট্রা বলে আমাকে জানবে মানুষ। আর এই নামের অর্থ নিশ্চয়ই তুমি জানো টাইটা? পিতার গর্ব। আশা করি এই খবর জানার পর সন্তুষ্ট হবে আমার বাবা।
আমিও! হেসে বলল রামেসিস।
ফাঁদে পড়ার পর তা থেকে বের হওয়ার কোনো পথ যখন না থাকে তখন তা খুব ভালো করেই বুঝতে পারি আমি। তাই এবার এক হাঁটুতে ভর দিয়ে বসে পড়লাম সেরেনার সামনে। বললাম, রানি ক্লিওপেট্রার জয় হোক!
তাহলে এবার একটু কাজের কথায় আসা যাক? অনেক কাজ পড়ে আছে। আমাদের, মিষ্টি গলায় বলল সেরেনা। তারপর ওয়েনেগের দিকে ফিরল। তোমার মদের দোকানে কতগুলো পায়রা আছে? আর ওগুলো উটেরিকের নাকের নিচ থেকে সরিয়ে এখানে এই দুঃখ-দুর্দশার কারাগারে আনতে…হঠাৎ করে থেমে গেল সেরেনা, কয়েক মুহূর্ত চিন্তা করল। বোঝা গেল এই জায়গার জন্য উটেরিক যে নাম ঠিক করেছে সেটা তার পছন্দ হচ্ছে না। …আনন্দের বাগান! হ্যাঁ এখন থেকে এটাই হবে এ জায়গার নাম! বলে উঠল ও। আজ থেকে আমাদের এই ঘাটির নাম হবে আনন্দের বাগান। আর সবার আগে আমি যে কাজটা করতে চাই সেটা হচ্ছে প্রবেশপথের ওখানে যে খুলিগুলো আছে সেগুলো সব সরিয়ে ফেলতে। ওগুলোকে যথাযথ উপায়ে সম্মানের সাথে কবর দেওয়ার ব্যবস্থা করব আমরা।
তবে একটা খুলি আমি প্রবেশমুখের দরজায় রেখে দিতে চাই মহামান্যা রানি, প্রতিবাদ জানালাম আমি। বাকি খুলিগুলোকে তুমি কবর দিতে পারো, আমার কোনো আপত্তি নেই।
কোন খুলির কথা বলছ তুমি? সন্দেহভরা গলায় প্রশ্ন করল সেরেনা।
কুখ্যাত ডুগের খুলি, বললাম আমি। হাসিতে ফেটে পড়ল ও।
এমন বুদ্ধি শুধু তোমার মাথাতেই আসা সম্ভব টাইটা। তবে সত্যিই দারুণ একটা প্রস্তাব দিয়েছ তুমি।
*
আরো একবার শুঁড়িখানার মালিকের ভূমিকায় ফিরে গেল ওয়েনেগ। সেদিন সন্ধ্যাতেই লুক্সরের প্রধান দরজা দিয়ে ভেতরে প্রবেশ করল সে। এমনিতে ডুগ তার নিয়মিত খদ্দের ছিল, তাই পরদিন সকালে যখন সে পাঁচটা গাধার পিঠে মদের বোতলের বস্তা চাপিয়ে প্রধান দরজা দিয়ে বের হলো তখন কেউ সেটা আমলে নিল না। তবে প্রতিটি বস্তার নিচেই রইল একটা করে ঝুড়ি, আর তাতে বারো-চৌদ্দটা করে পায়রা। প্রতিটি পায়রার চোখে ঠুলি পরানো হয়েছে, যাতে শহরের দরজা দিয়ে বের হওয়ার সময় কেউ বাক-বাকুম করে ডেকে না বসে। তাহলে প্রহরীদের চোখে ধরা পড়ে যাবে সব।
ওয়েনেগ যখন এই কাজে ব্যস্ত তখন আমি আর সেরেনা মিলে রাজা হুরোতাসের কাছে পাঠানোর জন্য একটা চিঠি লিখে ফেললাম। তবে একটু বেশিই বড় হয়ে গেল চিঠিটা, যা একটি পাখির পক্ষে বহন করা সম্ভব নয়। তাই ওয়েনেগ ফিরে আসার পর চিঠিটাকে ভাগ ভাগ করে পাঠানোর ব্যবস্থা করলাম আমরা। একটা চিঠি সম্পূর্ণ বহন করতে পাঁচটা পাখির প্রয়োজন হলো।
চিঠিতে লেখা হলো রামেসিস এবং আমার মাধ্যমে উটেরিক এবং ডুগের হাত থেকে সেরেনার উদ্ধার পাওয়ার খবর। স্বাভাবিকভাবেই হুরোতাসের কাছ থেকে কোনো জবাব পেলাম না আমরা, কারণ লুক্সর বা আনন্দের বাগানে জন্ম নিয়েছে এমন কোনো পায়রা নেই তার কাছে। ফলে সেরেনার উদ্ধার পাওয়ার খবরে হুরোতাসের দুর্গে কেমন আনন্দের ফোয়ারা বইছে তা কেবল কল্পনার চোখে দেখেই সন্তুষ্ট থাকতে হলো আমাদের।
কয়েক দিন পর পরই পায়রা পাঠাতে লাগলাম আমরা। পরের দিকে অবশ্য আমাদের চিঠিগুলো আরো বেশি সংক্ষিপ্ত হলো এবং উটেরিকের সেনাবাহিনীর বর্তমান অবস্থা আর তাদের যুদ্ধজাহাজ রথ ও সেনাবাহিনীর সংখ্যা এবং অন্যান্য খবরই বেশি থাকল তাতে।
ল্যাসিডিমনের দুর্গ এবং আনন্দের বাগানের মাঝে নিয়মিত যোগাযোগ রক্ষার জন্য ওয়েনেগের কাছে আরো সুবিধাজনক একটা ব্যবস্থার প্রস্তাব করলাম আমি। আমার প্রস্তাব অনুযায়ী প্রতিবার মদের দোকান থেকে এখানে আসার সময় কিছু কিছু করে পুরুষ এবং মেয়ে পায়রা নিয়ে আসতে লাগল সে, যেগুলো বাচ্চা ফোঁটানোর মতো যথেষ্ট বয়সে পৌঁছে গেছে। রাজকুমারী সেরেনাকে জানালাম যে আমরা আনন্দের বাগানে পায়রা উৎপাদন করতে চাই। তারপর সেগুলো স্থল এবং জলপথে পাঠিয়ে দেওয়া হবে ল্যাসিডিমনে, যাতে সেখান থেকে ছেড়ে দেওয়া হলে পাখিগুলো সরাসরি তাদের যেখানে জন্ম হয়েছিল সেখানে ফিরে আসতে পারে। তখন সেরেনার বাবা রাজা হুরোতাসের কাছ থেকে চিঠিও বয়ে আনতে পারবে তারা।
