উটেরিক সেরেনাকে কোথায় আটকে রেখেছে তার হদিস বের করা, সেইসাথে যদি সম্ভব হয় তাহলে সেরেনার মনে কিছু শক্তি এবং আশার সঞ্চার করা, যাতে এই ভয়াবহ বিপদেও মনোবল ধরে রাখতে পারে ও। কিন্তু কখনো আশা করিনি যে স্রেফ আমাদের দুজনের চেষ্টাতেই উটেরিকের কবল থেকে ওকে উদ্ধার করা যাবে। কিন্তু এখন যেহেতু সেই অসম্ভব ঘটনাটা ঘটেই গেছে সুতরাং এই মুহূর্তে আমার প্রধান কর্তব্য হয়ে দাঁড়াল সেরেনাকে আফ্রিকা থেকে বের করে নিয়ে যাওয়া এবং ল্যাসিডিমনে ওর পরিবারের কাছে ফিরিয়ে দেওয়া। আমি নিশ্চিত যে রামেসিসকে যদি এই ব্যাপারে কিছু বলার সুযোগ দেওয়া হয় তাহলে সেও আমার সাথে সম্পূর্ণ একমত হবে। কিন্তু রাজকুমারী সেরেনার মতামত বা ইচ্ছা জানার কোনো চেষ্টাই করিনি আমরা।
আমাদের দুজনকে কয়েক ঘণ্টা ঘুমানোর সুযোগ দিল সেরেনা, যাতে একটু বিশ্রাম নিয়ে চাঙ্গা হয়ে উঠতে পারি আমরা। তার পরেই আমাদের ঘুম থেকে তুলে ডেকে পাঠাল এক যুদ্ধকালীন মন্ত্রণা সভায়। প্রথমে আমার ধারণা হলো ও নিশ্চয়ই বাবা-মায়ের কাছে ফিরে যাওয়ার জন্য সবচেয়ে দ্রুত সহজ এবং নিরাপদ রাস্তাটা খুঁজে বের করার জন্যই এই সভার আয়োজন করেছে।
ভোরবেলা আমরা চারজন কারাগারের প্রাচীরের ওপর জড়ো হলাম। চারজন বলছি কারণ, সেরেনা আমাদের সাথে যোগ দেওয়ার জন্য ওয়েনেগকেও ডেকে এনেছে।
আমরা আমাদের প্রাথমিক লক্ষ্য অর্জন করেছি, প্রথমে সেরেনাই কথা শুরু করল। যেটা হচ্ছে একটি নিরাপদ ঘাঁটি তৈরি করা, যেখান থেকে সব কাজ পরিচালনা করা যায়। এবং এর জন্য তোমাদের তিনজনকে অসংখ্য ধন্যবাদ দিতে চাই আমি। অবাক হয়ে রামেসিস এবং ওয়েনেগের দিকে তাকালাম আমি। দেখলাম ওরাও আমার মতো একই রকম বিভ্রান্ত হয়ে পড়েছে। এখন আমাদের দ্বিতীয় দায়িত্ব হচ্ছে স্পার্টায় অবস্থানরত আমার বাবার সাথে যোগাযোগ স্থাপন করা, বলে চলল সেরেনা।
আমার মনে হয় তুমি আসলে বলতে চাইছ যে আমাদের দ্বিতীয় দায়িত্ব হচ্ছে তোমাকে মিশর থেকে বের করে নিয়ে যাওয়া, তারপর সমুদ্র পাড়ি দিয়ে ল্যাসিডিমনে তোমার বাবার কাছে তোমাকে ফিরিয়ে দেওয়া, ওকে বাধা দিয়ে বলে উঠলাম আমি। অবাক হয়ে আমার দিকে তাকিয়ে রইল সেরেনা।
দুঃখিত প্রিয় টাটা। কিন্তু তুমি কীসের কথা বলছ আমি বুঝতে পারছি না। আজ আমরা সত্যিই এক অসাধারণ বিজয় অর্জন করেছি। শুধু অসাধারণ বললে কম হয়ে যায়। বলা যায় অলৌকিক এক বিজয় ধরা দিয়েছে তোমাদের হাতে। শত্রু-অধ্যুষিত এলাকার ঠিক মাঝখানে একটা ঘাঁটি তৈরি করে নিতে পেরেছ তোমরা। এখানে আমরা সম্পূর্ণ নিরাপদ।
নিরাপদ ঠিক অন্তত যতক্ষণ না আমাদের এই অবস্থানের খবর লুক্সরে উটেরিক টুয়োর কানে পৌঁছাচ্ছে। দূরে দিগন্তের গায়ে ভেসে থাকা সোনালি প্রাসাদের ছায়াটার দিকে ইঙ্গিত করলাম আমি। এখান থেকে খুব বেশি পাঁচ কি ছয়… বড়জোর দশ লিগ দূরে হবে প্রাসাদটা।
বড় বড় চোখে নিষ্পাপ দৃষ্টি এনে আমার দিকে তাকাল সেরেনা। জানতে চাইল, কে এই খবর নিয়ে যাবে তার কাছে?
কারাগারের প্রহরীদের কেউ না কেউ– বলতে শুরু করেও থেমে গেলাম আমি। গতকাল বিকেলেই সকল প্রহরীকে হয় হত্যা করা হয়েছে না হয় আগুনে পুড়িয়ে মারা হয়েছে। অগত্যা নিজেকে শুধরে নিলাম আমি। বললাম, মানে উটেরিকের কোনো অনুচর যখন এখানে রসদ বা লুক্সর থেকে কয়েদি নিয়ে আসবে তাদের কথা বলছি।
দুঃখ-দুর্দশার ফটকের দরজার ভেতরে কাউকে ঢুকতে দেওয়া হয় না, আমাকে মনে করিয়ে দিল সেরেনা। সকল রসদ এবং নতুন কয়েদিদের সামনের উঠানে নামিয়ে দিয়ে যাওয়া হয়। এখন থেকে ডুগের ছদ্মবেশে তুমিই ওদের স্বাগত জানানোর দায়িত্ব পালন করবে। আমরা সবাই দেখেছি এই ভূমিকায় তুমি অদ্বিতীয়। তার পরই কণ্ঠস্বর বদল করে বলে উঠল, জেনে রেখো, ফারাও এবং মিশরের সকল শত্ৰু এই দেয়ালের ভেতর প্রবেশ করার সাথে সাথ চিরতরে ধ্বংস হয়ে যায়!
যদিও সেরেনা দারুণভাবে নকল করল কথাটা, তবু ওর কথায় রাজি না হওয়ার সিদ্ধান্ত নিলাম আমি। এবার পরবর্তী প্রশ্নটা ছুড়লাম ওর দিকে। উটেরিক যদি এর পরে আবারও তোমাকে লুক্সরে ডেকে পাঠায়? তখনো কি আমাকে ভুগের ভূমিকায় অভিনয় করতে বলো তুমি? তাকে কী বলব আমি?
উটেরিক আমার কাছে শপথ করেছে যে আর কখনো আমাকে চোখের সামনে দেখতে চায় না সে। সত্যি কথা বলতে, বুদ্ধির ছিটেফোঁটাও নেই তার মাথায়, খুব সহজেই তাকে বোকা বানানো যায়। প্রতিবার যখন তাকে নিয়ে আমি কোনো ঠাট্টা করছিলাম, তার পোষা ভাড়গুলো হেসে গড়িয়ে পড়ছিল। একবার তো রেগেমেগে ওখানেই আমাকে খুন করতে চেয়েছিল। কিন্তু আমি তাকে মনে করিয়ে দিলাম যে, মরে গেলে আমার কোনো মূল্য থাকবে না তার কাছে। শেষ পর্যন্ত রাগে-দুঃখে প্রায় কেঁদে ফেলার জোগাড় হয়েছিল তার, দেখে এমনকি আমিও দুঃখ বোধ করতে শুরু করেছিলাম। সব দেবতাকে সাক্ষী রেখে শপথ করেছে সে, বলেছে জীবনে আর কোনো দিন আমাকে দেখতে চায় না। তারপর দুপদাপ করে বেরিয়ে গেছে দরবার থেকে।
খুশি সামলে রাখা সম্ভব হলো না আমার পক্ষে, হো হো করে হেসে উঠলাম সেরেনার বর্ণনা শুনে। তবে এর পরও শেষ একটা চেষ্টা করে দেখলাম। স্থানীয় কৃষকদের ব্যাপারে কী করবে? যেসব রাখাল এখানে ভেড়া চরাতে আসে তারা? জানি যে এই প্রশ্নে কোনো কাজ হবে না, তবু একবার চেষ্টা করে দেখতে দোষ কী?
