যখন মনে হলো যে আমার এই বুদ্ধিতে কাজ হয়েছে, কমপক্ষে ত্রিশজনের মতো প্রহরী এসে জড়ো হয়েছে আমাদের সামনে উঠিয়ে রাখা টানা সেতুর ওপরে তখন রথের ওপর উঠে দাঁড়ালাম আমি। তারপর ভুগের নিখুঁত অনুকরণে ফেটে পড়লাম তীব্র রাগে। কালো কাপড় দিয়ে ঢাকা থাকায় আমার মুখ দেখতে পেল না কেউ; কিন্তু দেয়ালের ওপর দাঁড়িয়ে থাকা লোকগুলোকে উদ্দেশ্য করে অকথ্য ভাষায় কুৎসিত সব গালিগালাজ ঝাড়তে লাগলাম আমি। অনেকের নামও আমার জানা আছে, ফলে আরো বেশি বিশ্বাসযোগ্য হলো আমার অভিনয়। হবে না-ই বা কেন, স্বয়ং ভুগের কাছ থেকেই এগুলো শিখেছি আমি। মাঝে মাঝেই আমার মনে হয় যে ইচ্ছে করলে দারুণ অভিনেতাও হওয়া সম্ভব ছিল আমার পক্ষে। এবং এবারও সেই ধারণা সত্যি প্রমাণিত হলো। ডুগের আত্মীয়দের মাঝে কেউ একটুও সন্দেহ করল না যে তাদের সাথে যেই লোকটা কথা বলছে সে ডুগ ছাড়া অন্য কেউ হতে পারে।
শেষ পর্যন্ত তাদের মাঝে একজন সেই গৎ বাঁধা কথাগুলো উচ্চারণ করল: তাহলে নিজ দায়িত্বে প্রবেশ করো। কিন্তু জেনে রেখো ফারাও এবং মিশরের সকল শত্ৰু এই দেয়ালের ভেতরে প্রবেশ করার পর চিরতরে ধ্বংস হয়ে যায়। বাকিরা এবার সিঁড়ি বেয়ে নিচে নেমে এলো, তাদের প্রিয় আত্মীয়কে স্বাগত জানানোর জন্য ভিড় জমাল প্রাঙ্গণের ওপরে।
এদের মাঝে অস্ত্র রয়েছে কেবল অর্ধেকের কাছে। বাকিরা অস্ত্র নিয়ে আসার প্রয়োজন বোধ করেনি, কারণ তাতে দেরি হয়ে যেতে পারে। সে ক্ষেত্রে বন্দিদের নিয়ে মজা করার সুযোগ হারাতে হতো তাদের। উটেরিক টুরোর শাসনে পুরো দেশে যে অনিয়মের চূড়ান্ত চলছে, তার ছোট্ট একটা উদাহরণ এই কারাগারের বিশৃঙ্খলা।
ভুগের বড় ভাই গ্যাষিওকে চিনতে পারলাম আমি। আমাকে দেখেই স্বাগত জানানোর জন্য দ্রুত সামনে এগিয়ে এলো সে। বাকিদের তুলনায় অবশ্য এ অনেকটা আলাদা। দারুণ ধূর্ত আর চালাক একজন যোদ্ধা, সেইসাথে প্রতিপক্ষ হিসেবে অত্যন্ত বিপজ্জনক। এমনকি নিজের ভাইয়ের চাইতেও ভয়ানক সে। বুঝতে পারছি যে প্রকৃত পরিস্থিতি সম্পর্কে এই লোক যদি সামান্যতম ধারণাও পেয়ে যায় তাহলে মুহূর্তের মধ্যে মরণপণ লড়াইয়ে জড়িয়ে পড়তে হবে আমাদের। রথ থেকে নেমে পড়লাম আমি, তারপর তার ভাইয়ের অনুকরণে হেলেদুলে সামনে এগিয়ে গেলাম। আমার তলোয়ার এখনো খাপেই পোরা রয়েছে; কিন্তু ছোরাটা বের করে বাম হাতে রেখেছি। আলখাল্লার ভাঁজে ঢাকা রয়েছে সেটা। কাছাকাছি আসতেই গ্যাম্বিওর সামনে বাড়িয়ে দেওয়া ডান হাতটা শক্ত মুঠোয় ধরে ফেললাম আমি, এক ঝাঁকি দিয়ে ওর ভারসাম্য নড়িয়ে দিলাম। এবার আমাকে চিনতে পারল সে, চোখের তারায় ফুটে উঠল ভয়। বুঝতে পারল, সব শেষ। পাঁজরের নিচ দিয়ে ছুরির মাথাটা ঢুকিয়ে দিলাম আমি, ফুটো করে ফেললাম হৃৎপিণ্ড। ছুরিটা জায়গামতো ঢুকিয়ে রেখেই বাম হাতে তাকে জড়িয়ে ধরলাম, যাতে নড়াচড়া করতে না পারে। চারপাশের হইচইয়ে ঢাকা পড়ে গেল তার মরণ-আর্তনাদ। লোকটার মৃত্যুর জন্য অপেক্ষা করতে করতে তার আত্মাকে সেই সব নিরপরাধ মানুষের স্মৃতির উদ্দেশ্যে উৎসর্গ করলাম মনে মনে, যারা এই দেয়ালের মাঝে এদের হাতে নির্মম নির্যাতন ভোগ করে মৃত্যুবরণ করেছে।
কী হচ্ছে সেটা বুঝতে বুঝতে কারাগারের অন্য প্রহরীদের অনেক বেশি সময় লেগে গেল। প্রথম রথের চারপাশে ভিড় জমিয়েছে তারা, সেরেনাকে নিয়ে বিদ্রূপ করছে নানা রকম। কেউ কেউ চাইছে ওকে টেনে রথের ওপর থেকে নামিয়ে আনতে। সুন্দরী নারী কয়েদি পেয়ে তার ওপরই স্থির হয়ে আছে সবার মনোযোগ। বুঝতে পারলাম আরো একবার সেরেনাকে নগ্ন করে ফেলার জন্য তর সইছে না কারো। এবার পরের দুই রথে করে যারা এসেছে তারা লাফ দিয়ে মাটিতে নামল, তারপর সামনে এগিয়ে এলো। একই সঙ্গে নিজেদের তলোয়ার বের করে এনেছে তারা। যুদ্ধ হুংকারের মাধ্যমে প্রতিপক্ষকে সতর্ক হওয়ার কোনো সুযোগ না দিয়ে নীরবে কাজে নেমে পড়ল সবাই। কেউ কিছু বুঝে ওঠার আগেই কারাগারের প্রহরীদের মাঝে অর্ধেকেরও বেশি মারা পড়ল। শেষ পর্যন্ত যারা বাকি রইল তারা অস্ত্র ছুঁড়ে ফেলে দিয়ে হাঁটু গেড়ে বসে পড়ে প্রাণভিক্ষা চাইতে লাগল। কিন্তু এর মাধ্যমে অনেক বড় একটা ভুল করল তারা। কারণ তাদেরকে পা ধরে টেনে-হিঁচড়ে নিয়ে যাওয়া হলো অগ্নিকুণ্ডের মাঝে। সারা রাত ধরে জ্বলল সেই আগুন।
*
কারাগারের দখল নিজেদের হাতে নিয়ে আসার পর আমাদের প্রথম কাজ হলো মাটির নিচের বন্দিশালায় যে সমস্ত বন্দি রয়েছে তাদের মুক্ত করে ওপরে নিয়ে আসা। তাদের সংখ্যা হবে এক শ বিশেরও বেশি, যাদের মাঝে প্রায় ত্রিশজনের মতো নারী কয়েদিও রয়েছে। তবে সঠিক সংখ্যাটা গুনে নিতে পারলাম না আমি আর সেরেনা, কারণ ওপরে নিয়ে আসার প্রায় সাথে সাথেই মারা যেতে লাগল অনেকেই। বেশির ভাগই মারা গেল প্রলম্বিত ক্ষুধা এবং তৃষ্ণার কারণে। কিন্তু এর সাথে অন্যান্য কারণ হিসেবে যে ব্যাপারগুলো কাজ করল সেগুলো হচ্ছে দীর্ঘ সময় ধরে চাবুকপেটা করা, এক বা উভয় চোখই উপড়ে নেওয়া, নাড়িভুঁড়ি ছিঁড়ে ফেলা, জ্যান্ত চামড়া ছিলে নেওয়া, পায়ুপথে গরম ধাতব দণ্ড ঢুকিয়ে দেওয়া এবং সেইসাথে ডুগ এবং তার সাঙ্গোপাঙ্গ কর্তৃক উদ্ভাবিত আরো অন্যান্য অত্যাচারের পদ্ধতি। রামেসিস এবং আমি মিশরে ফিরে এসেছিলাম শুধু একটা কারণে। সেটা হচ্ছে
