রথের আরোহীদের মুখে এবার স্বস্তির ছায়া পড়তে দেখলাম আমি। ওরা জানে যে মৃত্যু ওদের কতটা কাছাকাছি চলে এসেছিল।
যত দিন বেঁচে থাকবে তার প্রতিটা দিন মহামান্যা রাজকুমারীকে ধন্যবাদ জানানো উচিত তোমাদের, ওদের উদ্দেশ্য করে ধমকে উঠলাম আমি। তবে ইচ্ছে করেই কথাটা বলার সময় মৃদু হাসি ফোঁটালাম ঠোঁটের কোনায়। তারপর হঠাৎ করেই আমাদের পেছন দিক থেকে একটা উচ্চকিত গলার চিৎকার ভেসে এলো।
সেরেনা! তুমি ছাড়া আর কেউ হতে পারো না! তোমার গলা শুনেই চিনতে পেরেছি আমি। যেখানেই থাকি না কেন তোমার কণ্ঠস্বর চিনতে কখনো ভুল হবে না আমার। মুহূর্তের মধ্যে নিজের অবস্থান ছেড়ে দৌড়ে সামনে এগিয়ে এলো যুবরাজ রামেসিস।
দুর্ধর্ষ তলোয়ারবাজ সেরেনা, একটু আগেই যে নিজের তলোয়ারের আঘাতে কুখ্যাত ডুগের মাথা ধুলোয় লুটিয়ে দিয়েছে সেই এবার এমনভাবে চিৎকার করে উঠল যেন তাকে হঠাৎ গরম কয়লার ওপর দাঁড় করিয়ে দিয়েছে কেউ। রামেসিস! রামেসিস! আমি তো ভেবেছিলাম তুমি এখনো ল্যাসিডিমনেই আছো। ওহ, হাহোর আর হোরাসকে অসংখ্য ধন্যবাদ যে তুমি আমাকে উদ্ধার করতে এত দূর ছুটে এসেছ!
দৌড়ে এসে পরস্পরকে জড়িয়ে ধরল প্রেমিক-প্রেমিকা, এবং এমন অদম্য উৎসাহের সাথে তারা কাজটা করল যে ঝনাৎ করে বাড়ি খেল তাদের তলোয়ারের ফলা। খুব সম্ভব তাদের দাঁতও একইভাবে বাড়ি খেয়েছিল, যদিও সেটা বোঝা যায়নি। সেরেনাকে হাউমাউ করে কাঁদতে দেখে অবাক হলাম না আমি, তবে বেশ মেজাজ খারাপ হলো। রামেসিসের অবস্থাও খুব একটা ভালো মনে হলো না। ওদের দিক থেকে ঘুরে দাঁড়ালাম আমি, তারপর দুজনকে নিজেদের সামলে ওঠার সময় দিয়ে আক্রমণের পরবর্তী পর্যায় শুরু করার জন্য প্রস্তুত করতে শুরু করলাম বাকিদের।
*
ডুগের মৃতদেহটা স্রেফ সেতুর ওপর থেকে টেনে নিচের নালায় ফেলে দিয়ে তার শেষকৃত্য সম্পন্ন করা হলো। তবে তার মাথাটা রেখে দিলাম আমি, একটা ঘোড়ার খাবারের থলেতে ভরে রাখলাম। পরে দেখা যাবে কী করা যায় ওটা নিয়ে। তার পরনের কালো আলখাল্লা অবশ্য এখনই আমার কাজে লাগবে। কাপড়গুলো অবশ্য আমার হালকা-পাতলা শরীরের জন্য খুব বেশি ঢোলা হয়ে গেল। তবে কী আর করা, তাই ডুগেরই আরো কিছু বাড়তি কাপড় পরে কোনোমতে মানিয়ে নিলাম নিজেকে। কাপড়গুলোতে এখনো সেরেনার আঘাতের ফলে বের হওয়া রক্ত লেগে আছে। যে রথটার চাকা ভেঙেছে সেটাকে রেখে যাওয়া লাগল। বাকি তিনটি রথে গাদাগাদি করে উঠলাম আমরা সবাই, তারপর রওনা দিলাম দুঃখ-দুর্দশার ফটক নামের সেই কারাগারের দিকে। আগের আরোহীদের সাথে এখন যোগ হয়েছি আমি, রামেসিস এবং ওয়েনেগের তেরো যোদ্ধা। সৌভাগ্যক্রমে এখান থেকে আমাদের গন্তব্য খুব বেশি দূরে নয়। তা ছাড়া পথ কোথাও বেশি খারাপ হয়ে এলে অনেকেই নেমে রথ ঠেলতে হাত লাগাল।
সূর্য যখন পশ্চিম দিগন্ত স্পর্শ করেছে সেই সময় কারাগারের সামনে এসে পৌঁছলাম আমরা। সবচেয়ে সামনের রথটার ওপর বুকের ওপর দুই হাত ভাঁজ করে মহা আরামে বসে আছি আমি, মাথার ওপর টেনে দিয়েছি কালো কাপড়। আমার পেছনেই দাঁড়িয়ে আছে সেরেনা। পরনে সেই বন্দির পোশাক, হাতগুলো ইচ্ছে করেই সবাইকে দেখিয়ে সামনে বেঁধে রাখা। অভিনেত্রী হিসেবে ওর জুড়ি মেলা ভার। এই মুহূর্তে ওকে দেখে মনে হচ্ছে নিতান্ত অসহায়, হতাশ একটা মানুষ। তবে ইচ্ছে করলে ঝকঝকে সাদা দাঁত দিয়ে একটা টান মেরেই হাতের ফস্কা গেরো খুলে ফেলতে পারবে ও। তার ওপর ওর পায়ের কাছে কিছু খড় দিয়ে ঢেকে রাখা রয়েছে নীলচে সেই তলোয়ারটা। রামেসিস আমাদের দুজনের সঙ্গেই দাঁড়িয়ে রয়েছে। তলোয়ার খাপে পুরে রেখেছে সে, চেহারা ঢেকে রেখেছে একটু আগে সেরেনার বদৌলতে বেঁচে যাওয়া প্রহরীদের একজনের শিরস্ত্রাণের সাহায্যে। ফারাও টামোসের অন্যতম প্রিয় পুত্র হিসেবে তার চেহারা মিশরের প্রায় সবাই খুব ভালোভাবেই চেনে। এই মুহূর্তে তাই সবার সামনে মুখ দেখানো উচিত হবে না ওর।
সূর্যাস্তের সময়টাকে কারাগারের ফটকে পৌঁছানোর উপযুক্ত সময় হিসেবে নির্বাচন করেছি আমি, কারণ ওই সময়েই দৃষ্টিসীমা সবচেয়ে কম থাকে। তবে আমরা পৌঁছনোর সাথে সাথেই অবশ্য খুলল না দরজা। ভেতরে যেসব প্রহরীরা রয়েছে তারা বেশির ভাগই সদ্য মৃত ডুগের ভাই, ছেলে অথবা আত্মীয়স্বজন। সকালে যারা বেরিয়ে গিয়েছিল তাদের রথ এবং লোকসংখ্যার সাথে, এখন যারা ফিরে এসেছে তাদের সংখ্যায় মিল নেই দেখে নানা রকম প্রশ্ন ছুড়ল তারা। আমাদের দলের কয়েকজন তাদের বুঝিয়ে বলার চেষ্টা করল যে, ফেরার পথে খাদে পড়ে একটা রথ হারিয়েছে তারা এবং কয়েকজন মারা পড়েছে তাতে। এ ছাড়া সম্প্রতি যে কয়েদিকে এই কারাগারে আনা হয়েছে তার কারণে কারাগারের নিরাপত্তাব্যবস্থা আরো বাড়াতে চেয়েছেন ফারাও উটেরিক, এবং সে কারণেই বাড়তি লোক পাঠিয়েছেন তিনি।
ইচ্ছে করেই অবশ্য এই হইচই আর বিভ্রান্তি তৈরি হওয়ার সুযোগ করে দিয়েছি আমি। কারণ আমি চাই যত বেশি সম্ভব প্রহরী এবং কারাগার কর্মচারী এসে জড়ো হোক প্রবেশমুখে। তাতে করে একবারেই ওদের সবার ব্যবস্থা করে ফেলতে পারব আমরা, কারাগারের ভেতরে ঢুকে এক এক করে খুঁজে খুঁজে মারতে হবে না। অজস্র অলিগলি, উঠান আর কামরা রয়েছে এই কারাগারের ভেতরে।
