দুই আঙুল মুখের ভেতর পুরে তীক্ষ্ণ স্বরে শিস দিলাম আমি। আগে থেকেই ঠিক করা ছিল যে এই শব্দের সাথে সাথে আক্রমণ করা হবে। অনেক অনুশীলন করে এই শিস দেওয়া আয়ত্ত করেছি আমি। কাছ থেকে শুনলে কানে তালা লেগে যায়, এত তীক্ষ্ণ শব্দ। কিন্তু এমনকি যুদ্ধের হট্টগোলের ভেতরেও অনেক দূর থেকে শোনা যায় এই শিস। এই শব্দেরই অপেক্ষা করছিল আমার লোকেরা। সাথে সাথে কাজ শুরু করে দিল তারা।
সেতুর অন্য প্রান্তে হাতুড়ি নিয়ে দুজনকে মোতায়েন রেখেছিলাম আমি। সেতুর দুই পাশে নিচু জায়গায় হামাগুড়ি দিয়ে বসে ছিল তারা। আমার শিসের শব্দ শুনেই লাফ দিয়ে বেরিয়ে এলো লুকানোর জায়গা ছেড়ে, সামনে এগিয়ে এলো। দুজনের হাতেই রয়েছে ভারী পাথরের তৈরি বিশাল হাতুড়ি। প্রথম রথের দুই চাকার সবগুলো শিক চূর্ণ হয়ে গেল তাদের হাতুড়ির আঘাতে। ভেঙে পড়ল চাকাগুলো। বিনা মেঘে বজ্রপাতের মতো এমন আকস্মিক আক্রমণের মুখে সম্পূর্ণ অপ্রস্তুত হয়ে পড়ল চালক আর তার সঙ্গী। গাড়ি থেকে উড়ে দূরে গিয়ে পড়ল তারা। তাদের গাড়ির ভাঙা অংশে সম্পূর্ণ রুদ্ধ হয়ে গেল সেতু ছেড়ে নামার পথ, ফলে পেছনের বাকি রথগুলো একটার সাথে আরেকটা ধাক্কা খেয়ে থেমে গেল সাথে সাথে।
এবার সেতুর ওপর পুরোদমে আক্রমণ চালালাম আমি। আমাদের যুদ্ধ হুংকারে আরো চমকে গেল রথের চালক আর তাদের ঘোড়াগুলো। এদিক-ওদিক পালানোর চেষ্টা করল তারা, ফলে আরো জট বেঁধে গেল রথের দড়িদড়ায়। একটা ঘোড়া পা ফসকে সেতুর ওপর থেকে পড়ে গেল নিচে। কিন্তু সম্পূর্ণ পড়তে পারল না, দড়িতে পঁাচ খেয়ে ঝুলে রইল মাঝপথে। ভয়ে তারস্বরে চেঁচাচ্ছে আর সেইসাথে অন্য ঘোড়াগুলোকেও নিজের ওজনের কারণে টেনে নিচ্ছে নিচের দিকে। রথচালকরা সবাই পরস্পরের উদ্দেশ্যে চেঁচামেচি জুড়ে দিয়েছে। তাদের মাঝে সবচেয়ে জোরে চেঁচাচ্ছে ডুগ। সবাই প্রচণ্ড পরিমাণে বিভ্রান্ত, কেউ বুঝতে পারছে না কী করবে।
ওদিকে ইতোমধ্যে রানি তেহুতির দেওয়া উপহারটা বের করে ডান হাতে নিয়ে নিয়েছি আমি। খাপ থেকে বের করার সাথে সাথে সূর্যের আলোতে ঝলক দিয়ে উঠেছে তলোয়ারটার নীলচে ফলা। পৃথিবীতে আর কোনো ধাতুর তৈরি তলোয়ারের সাধ্য নেই তীক্ষ্ণতার দিক দিয়ে একে হারায়। এই তলোয়ার যেন প্রলয়ের আরেক নাম।
সেরেনা! হট্টগোল ছাপিয়ে চিৎকার করে উঠলাম আমি। চরকির মতো ঘুরে তাকাল সেরেনা এবং দেখতে পেল আমাকে।
টাটা! চিৎকার করে উঠল ও। আমি জানতাম তুমি আসবে। মনে হলো যেন এই মুহূর্তে আরো বেড়ে গেল ওর সৌন্দর্য এবং বাড়িয়ে দিল আমার উৎসাহ। ধরো! বলেই তলোয়ারটা মাথার ওপর এক পাক ঘোরালাম আমি এবং ছুঁড়ে দিলাম ওর দিকে। ডান হাত সম্পূর্ণ বাড়িয়ে দিল সেরেনা, তারপর তলোয়ারটা মাথার ওপর আসতে শূন্যেই খপ করে ধরে ফেলল। এবার অন্য হাতটা রথের কিনারে রেখে এক লাফে বেরিয়ে এলো ভেতর থেকে। মনে হলো যেন ফুলের ওপর হালকা পায়ে এসে নামল কোনো ছোট্ট পাখি। নেমেই তীরবেগে ছুটতে শুরু করল ও।
ডুগ! ছুটতে ছুটতেই ডেকে উঠল সেরেনা। ওই কুৎসিত নামটাও যেন অদ্ভুত সুন্দরভাবে বেজে উঠল ওর কণ্ঠস্বরে। স্বাভাবিকভাবেই ওর দিকে ফিরে তাকাল ডুগ। হালকা পায়ে ছুটে তার কাছে পৌঁছে গেল সেরেনা, পাগুলো যেন মাটিকে স্পর্শই করছে না। ওর হাতে ধরা উজ্জ্বল ধাতব ঝিলিকটা দেখতে পেল ডুগ এবং বুঝতে পারল যে অনেক দেরি হয়ে গেছে, এখন আর ওর নিজের তলোয়ার বের করার সময় নেই। বুঝে নিল সাক্ষাৎ মৃত্যু ছুটে আসছে ওর দিকে। সাথে সাথে রথের ভেতর ঝুঁকে বসে আত্মরক্ষার চেষ্টা করল সে। মৃত্যুর পূর্ব মুহূর্তেও কাপুরুষতার পরিচয় দিয়ে গেল ব্যাটা। বাতাসে লাফিয়ে উঠল সেরেনা, তারপর শূন্যে থাকতেই তলোয়ারের ফলা নামিয়ে আনল রথের ভেতরের অংশে। দেখলাম নীলচে ফলাটা প্রায় অর্ধেক ঢুকে গেল ভুগের কালো আলখাল্লা ভেদ করে। ব্যথায় আর্তনাদ করে উঠল ডুগ, মাথাটা ঝটকা দিয়ে উঠে গেল ওপরে। যন্ত্রণায় বিকৃত হয়ে আছে মুখ, ফলে এর আগে যা দেখেছিলাম তার চাইতেও কুৎসিত লাগছে তাকে দেখতে।
সাবলীল ভঙ্গিতে তার পিঠ থেকে তলোয়ারটা বের করে আনল সেরেনা। ফলার অর্ধেক অংশ লাল হয়ে গেছে ভুগের রক্তে। এবার তলোয়ারটা উল্টো দিকে আঘাত করার ভঙ্গিতে নিখুঁতভাবে ঘুরিয়ে ধরল ও। লাফিয়ে উঠে একটা চক্কর দিল সেরেনা, মনে হলো ওর হাতের তলোয়ারটা যেন পরিণত হয়েছে এক ফালি সূর্যের আলোতে।
লাফ দিয়ে ডুগের দেহের বন্ধন থেকে ছিন্ন হলো তার মাথা, গড়িয়ে পড়ল রথের ভেতরে। দীর্ঘ একটা মুহূর্তের জন্য মাথাহীন ধড়টা হাঁটু গেড়ে বসে রইল, তার পরেই ফিনকি দিয়ে উজ্জ্বল রক্ত বেরিয়ে এলো তার কাটা গলা থেকে। ধপ করে রথের ভেতর পড়ে গেল ডুগের মৃতদেহ।
এসো ছেলেরা! এবার আমার বাকি যোদ্ধাদের উদ্দেশ্য করে ডাক দিলাম আমি। সেরেনার শ্বাসরুদ্ধকর তলোয়ারবাজি দেখে বিস্ময়ে হতবাক হয়ে গেছে সবাই। বাকি কুকুরগুলোর ব্যবস্থা করা যাক! অন্যান্য রথের আরোহীর দিকে ইঙ্গিত করে নির্দেশ দিলাম এবার।
না, টাইটা! প্রায় সাথে সাথেই চিৎকার করে আমাকে বাধা দিল সেরেনা। ছেড়ে দাও ওদের। ওরা সবাই ভালো লোক। ওদের কারণেই আমার ওপর নির্যাতন চালাতে গিয়েও পারেনি ডুগ।
