আমি যেটা নিশ্চিত বলতে পারি সেটা হচ্ছে, এখানে বসে এক দল বুড়ি মহিলার মতো বকবক করে কোনো কাজই হাসিল করতে পারব না আমরা। অস্থির হয়ে উঠেছে রামেসিস, কামরার ভেতরে পায়চারি করছে অনবরত। সেরেনার বিপদের কথা শুনে যেমন কষ্ট পাচ্ছে তেমনি ওকে উদ্ধার করার একটা সম্ভাবনা দেখতে পেয়ে উত্তেজিতও হয়ে উঠেছে। তবে রওনা দেওয়ার আগে আরেকটু দেরি করলাম আমি, মদের বোতলের তূপের ওপাশ থেকে তেহুতির দেওয়া সেই উপহারটা বের করলাম, যেটা ওর মেয়েকে দেওয়ার জন্য ল্যাসিডিমনে থাকতে আমার হাতে তুলে দিয়েছিল সে। জিনিসটা আমার ছেঁড়া ময়লা পোশাকের ভেতরে পিঠের সাথে বেঁধে নিলাম আমি। তন্ন তন্ন করে তল্লাশি করা না হলে এখন কেউ ওটা খুঁজে পাবে না।
এবার ওয়েনেগকে কিছু জিনিসপত্রের একটা তালিকা দিলাম, যেগুলো ওর লোকদের অবশ্যই সাথে করে নিয়ে আসতে হবে। ডুগের সাথে যেখানে আমার দেখা হয়েছিল তার চাইতেও আধ লিগ দূরে একটা ঝরনা বয়ে গেছে পথের মাঝ দিয়ে। একটা পাথরের সেতু দিয়ে পথ করা হয়েছে সেখানে। ঠিক হলো ওখানেই দেখা হবে আমাদের। ওয়েনেগকে পই পই করে বলে দিলাম যে আমাদের দলের প্রত্যেক সদস্য যেন দুপুরের অন্তত এক ঘণ্টা আগেই সেখানে উপস্থিত থাকে। জানি যে এত অল্প সময়ের মাঝে প্রস্তুত হওয়া প্রত্যেকের পক্ষে সম্ভব নয়। কিন্তু ইচ্ছে করেই একটু অল্প সময় বেঁধে দিলাম ওদের, যেন পথে কেউ দেরি করে না বসে।
*
ওদিকে আমার ন্যাওটা ভেড়াগুলো তখন মদের দোকানের পেছনে উঠানে এসে অপেক্ষা করছে। আরো একবার শহরের দক্ষিণ ফটক দিয়ে বের হয়ে এলাম আমরা, অলস পায়ে পথ চলছি। স্বাভাবিকভাবেই ঝরনার ওপর সেই সেতুর গোঁড়ায় যেখানে আমাদের মিলিত হওয়ার কথা সেখানে সবার আগে আমিই পৌঁছে গেলাম। তবে কিছুক্ষণের মধ্যেই ওয়েনেগের যোদ্ধারা এক এক করে পৌঁছতে শুরু করল। ওয়েনেগকে আগেই বলে দিয়েছিলাম লোকজনের সন্দেহের চোখ এড়ানোর জন্য একসাথে দুজনের বেশি যেন কেউ না আসে। তাই করেছে ওরা, একজন দুজন করে এসে পৌঁছাচ্ছে। প্রত্যেকের কাছেই রয়েছে পর্যাপ্ত অস্ত্র। এই উত্তাল বিপদসংকুল সময়ে একা একা চলাফেরা করছে। এমন যে কারো জন্য অবশ্য এটাই স্বাভাবিক।
যেমনটা ভেবেছিলাম, নির্ধারিত সময়ের মাঝে পৌঁছতে পারল না সবাই। নির্দিষ্ট জায়গায় যখন শেষ ব্যক্তিটি এসে পৌঁছল তখন বিকেলের মাঝামাঝি। তবে শেষ পর্যন্ত তেরোজন দক্ষ এবং সশস্ত্র যোদ্ধাকে পেয়ে গেলাম আমি। সেতুর আগে পথের দুই পাশে জঙ্গলের মাঝে লুকিয়ে থাকতে বললাম তাদের সবাইকে।
এই তেরোজনের মাঝে সবাই হিকসসদের বিরুদ্ধে অন্তত একটা যুদ্ধে লড়াই করেছে আমার পাশে দাঁড়িয়ে। ফলে আমাকে সহজেই চিনতে পারল সবাই এবং আবার দেখতে পেয়ে দারুণ খুশি হয়ে উঠল। আসন্ন লড়াইয়ে কার ভূমিকা কী হবে সেটা কাউকে একবারের বেশি দুবার বুঝিয়ে দেওয়া লাগল না। এ ধরনের আগের লড়াইয়ে আগেও অংশ নিয়েছে ওরা এবং কেউই কখনো ব্যর্থ হয়নি।
নিজের জন্য এমন একটা জায়গা বেছে নিয়েছি আমি, যেখান থেকে লুক্সর থেকে আসা পথটার অনেকখানি অংশ স্পষ্ট দেখা যায়। অপেক্ষা করতে করতে অস্থির হয়ে উঠেছি, এই সময় দেখলাম দূরে ধুলো উড়ছে। শহর থেকে বেরিয়ে এসেছে রথের একটা সারি, পাহাড়ের ঢাল বেয়ে এখন উঠে আসছে আমাদের দিকেই। ভুগের সাথে আজ সকালে যেখানে আমার সৌজন্য সাক্ষাৎ হয়েছিল সেই জায়গাটা পেরিয়ে এলো ওরা দেখতে দেখতে। কাছে আসতে দেখলাম দ্রুত গতিতে রথ ছুটিয়েছে ওরা, তবে বেশ ঢিলেঢালা মেজাজে আছে সবাই। বুঝলাম আজ সকালে আমার সাথে দেখা হওয়ার ঘটনা থেকে ঠিকই কিছু একটা সন্দেহ করেছিল ডুগ। তবে এখন আর সেই সন্দেহ নেই তার মনে, কারণ ফেরার পথে কোনো বিপদের গন্ধ পাচ্ছে না সে। এবং পরিকল্পনা সাজানোর সময় ঠিক এই ব্যাপারটার ওপরেই নির্ভর করেছিলাম আমি। সত্যিকারের প্রতিভার অন্যতম প্রধান লক্ষণ হচ্ছে সঠিক দূরদৃষ্টি।
এবার আমার ফাঁদের আওতায় চলে এলো ওরা, কেউ এখনো কিছু বুঝতে পারেনি। চিৎকার করে একে অপরের সাথে ঠাট্টা করছে চালকরা, ঘোড়াগুলোকে তাড়া লাগাচ্ছে। দেখলাম এবারও তৃতীয় রথের ওপরই রয়েছে। সেরেনা। এটাও আমার পরিকল্পনা সাজানোতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছে। ইচ্ছে করেই অন্য যযাদ্ধাদের সামনে রেখেছি আমি, যাতে সবার আগে সেরেনার কাছে পৌঁছতে পারি।
সরাসরি সামনে তাকিয়ে আমাদের অবস্থান পার হয়ে গেল প্রথম রথের চালক। পথের দুই পাশে ঘন জঙ্গলের মাঝে লুকিয়ে থাকায় আমাদের উপস্থিতি সম্পর্কে এক চুলও সন্দেহ করেনি সে। তাকে অনুসরণ করে দ্বিতীয় রথও সেতুর ওপর উঠে পড়ল। এই রথে বসে আছে কালো আলখাল্লা পরা ডুগ। তার পরেই তৃতীয় রথ অর্থাৎ সেরেনার রথ চলে এলো আমার সামনে। আমার অবস্থান জানা না থাকায় কিছুই বুঝতে পারল না ও, যদিও এত কাছ থেকে ওকে দেখতে পেয়ে দ্রুত হয়ে উঠল আমার হৃদস্পন্দন। তার পরেই চতুর্থ ও শেষ রথটা উঠে পড়ল সেতুর ওপরে।
এবার আর ওদের ফেরার কোনো পথ নেই। সরু সেতুর ওপর এতটা জায়গা হবে না যে, কোনো একটা রথ সম্পূর্ণ উল্টো দিকে ঘুরে ছুটতে শুরু করবে। যে ফাঁদ পেতেছি আমি তা থেকে পালানোর কোনো উপায় নেই কারো।
