ডুগের রথ বাহিনী মোড় ঘুরে ওপাশে মিলিয়ে যাওয়া পর্যন্ত চেহারায় নিরীহ এবং অসহায় ভাব ফুটিয়ে রেখে অপেক্ষা করলাম আমি। তার পরেই একটা উল্লসিত চিৎকার ছেড়ে হাতের লাঠিটা একদিকে ছুঁড়ে ফেলে এদিক-ওদিক দৌড়ে বেড়াতে শুরু করলাম পাগলের মতো। নিজেকে শান্ত করতে বেশ কিছুক্ষণ সময় লেগে গেল আমার। তারপর লাঠিটা যেখানে ফেলেছিলাম সেখান থেকে কুড়িয়ে নিয়ে শহরের দিকে দৌড়াতে শুরু করলাম। পালের ভেড়াগুলো হঠাৎ করে আমাকে এভাবে পালাতে দেখে ভয় পেয়ে গেল, ব্যা ব্যা করে ডাকতে ডাকতে পিছু নিল আমার। তবে দৌড় প্রতিযোগিতায় ওদের হারিয়ে দিলাম আমি। ওয়েনেগের মদের দোকানে যখন পৌঁছলাম তখনো বেশ অনেকটা পেছনে পড়ে রয়েছে ভেড়ার দল।
মদের দোকানের নিচে গোপন আস্তানায় খুঁজে পাওয়া গেল ওয়েনেগ আর রামেসিসকে। লুক্সরে নিজের আগমনের মূল উদ্দেশ্যের সাথে সম্পর্ক আছে এমন সব জিনিস এখানেই রাখে ওয়েনেগ, একেবারে উটেরিকের নাকের নিচে। এগুলোর মাঝে রয়েছে ল্যাসিডিমন এবং লুক্সরের মাঝে সংবাদ আদান প্রদানের জন্য ব্যবহৃত কবুতরের বেশ কয়েকটা খাঁচা এবং প্রচুর পরিমাণে তীর-ধনুক এবং অন্যান্য অস্ত্রশস্ত্র।
ওকে পেয়ে গেছি আমি! ভেতরে ঢুকেই দুজনকে উদ্দেশ্য করে চেঁচিয়ে উঠলাম আমি।
অবাক হয়ে আমার দিকে তাকাল দুজন, তারপর একই সাথে লাফ দিয়ে উঠে দাঁড়িয়ে জানতে চাইল কাকে?
সেরেনাকে, আবার কাকে! উত্তেজিত গলায় জবাব দিলাম আমি।
বলো, দ্রুত পায়ে আমার দিকে এগিয়ে এলো রামেসিস। কোথায় ও? আমার কাঁধ চেপে ধরে ঝাঁকাতে শুরু করল সে। ও ঠিক আছে তো? ওর ওপর কোনো অত্যাচার করেনি তো শয়তানগুলো? যত দ্রুত সম্ভব…
রামেসিসের উত্তেজনা কমে আসার জন্য কিছু সময় অপেক্ষা করতে হলো আমাকে। তারপর বললাম, ডুগ আটকে রেখেছে ওকে সেই দুঃখ-দুর্দশার ফটকে। আজ সকালে রথে করে সেরেনাকে নিয়ে এদিকেই আসছিল সে… এই বলে দ্রুত কয়েক কথায় রামেসিসকে বুঝিয়ে বললাম যে, ডুগ সম্ভবত সেরেনাকে নিয়ে লুক্সরে উটেরিকের প্রাসাদে গেছে। হয়তো আরো এক দফা জিজ্ঞাসাবাদ চালানো হবে সেরেনার ওপর। এটাও বললাম যে, সেরেনার কপালে এর পরে কী ঘটতে পারে বলে আমার ধারণা।
ওকে মারধর করা হয়েছে। মুখ আর হাত-পায়ে মারের দাগ লেগে আছে এখনো, তবে চিরস্থায়ী কোনো ক্ষতি হয়েছে বলে মনে হয় না। এবং উটেরিক যেমন হুমকি দিয়েছিল সেই অনুযায়ী ওর কোনো আঙুল বা শরীরে অন্য কোনো অংশ কেটে ফেলা হয়েছে বলেও আমার মনে হয়নি। আমি যতটা দেখলাম ওর দৃষ্টি অথবা মানসিক অবস্থা সম্পূর্ণ স্বাভাবিক ছিল। নিজের অবস্থান সম্পর্কে সম্পূর্ণ সজাগ এবং সতর্ক ছিল ও। সেটাই অবশ্য স্বাভাবিক, কারণ বন্দি হিসেবে ওর গুরুত্ব উটেরিকের কাছে অনেক বেশি। কিছুতেই ওর বড় কোনো ক্ষতি হতে দিতে পারে না সে। এই কথাগুলো বলার পর কিছুটা শান্ত হয়ে এলো রামেসিস আর ওয়েনেগ। এবার আমার ঠাণ্ডা মাথায় সাজানো পরিকল্পনার কথা খুলে বললাম ওদের কাছে।
সেরেনাকে বন্দিদশা থেকে মুক্ত করার জন্য এর চাইতে ভালো সুযোগ আর আমাদের সামনে আসবে বলে আমার মনে হয় না। কারাগার থেকে নিরাপদ কোনো জায়গায় সরিয়ে আনতে হবে ওকে। ডুগ যদি একবার ওকে নিয়ে আবার কারাগারের দরজার ওপাশে ঢুকে পড়তে পারে তাহলে সেরেনাকে উদ্ধার করার কোনো উপায়ই থাকবে না। এবং আমি একটুও বাড়িয়ে বলছি না, কারণ কারাগারের ভেতরে আমি ঢুকেছি এবং জানি যে কাজটা কত কঠিন! কেউই আমার সাথে তর্ক করার কোনো চেষ্টা করল না। কিন্তু রামেসিসের চেহারায় একই সাথে আশা আর নিরাশা খেলা করতে শুরু করল।
তাহলে বলো কী করতে হবে আমাদের, অনুনয়ের সুরে বলল সে।
আমার পরিকল্পনাটা এ রকম, ওদের বললাম আমি। আমরা জানি যে এই মুহূর্তে সেরেনা কারাগারের বাইরে রয়েছে। উটেরিক তার পোষা জল্লাদ ডুগকে নির্দেশ দিয়েছে সেরেনাকে তার প্রাসাদে নিয়ে আসতে। তার উন্মাদ মস্তিষ্ক কেন এই কাজ করতে চাইল তা আন্দাজ করা আমার পক্ষে সম্ভব নয়, হয়তো সেরেনার ওপর আরো অত্যাচার চালাতে চায় সে; অথবা অপমান করতে চায়, কে জানে। তবে এটা ঠিক যে, আজ সন্ধ্যার আগেই সেরেনাকে নিয়ে কারাগারে ফিরে আসার চেষ্টা করবে ডুগ। তাই আমরা নিশ্চিত থাকতে পারি আজ দুপুর থেকে সূর্যাস্তের মাঝে কোনো একসময়ে ওই একই রাস্তা ধরে ফিরে যাবে ডুগ, যেখানে সকালে তার সাথে দেখা হয়েছে আমার। এই পর্যন্ত বলে ওয়েনেগের দিকে ফিরলাম আমি। প্রশ্ন করলাম, আজ দুপুরের আগে কতজন দক্ষ এবং বিশ্বাসী লোক জোগাড় করতে পারবে তুমি?
মাত্র কয়েক মুহূর্ত নীরবে চিন্তা করল ওয়েনেগ, আঙুলে কর গুনল কয়েকবার। তার পরই জবাবটা প্রস্তুত হয়ে গেল তার মুখে। বারোজনের কথা নিশ্চিত বলতে পারি, বলল সে। ভাগ্য যদি ভালো থাকে তো পনেরোজন। তবে এরা সবাই উটেরিকের চরম শত্রু এবং জাত যোদ্ধা। তবে এটা জানা নেই যে, ওদের সবার কাছে নিজস্ব ঘোড়া আছে কি না।
মাথা ঝাঁকালাম আমি। অস্ত্র থাকলেই চলবে। ভালো ঘোড়া কোথায় পাওয়া যাবে সেটা আমি জানি। তার মানে আন্দাজ করা যাচ্ছে যে ভুগের দলবলের বিরুদ্ধে আমাদের শক্তি সমান সমানই থাকবে। উপরন্তু ওদেরকে চমকে দেওয়ার মাধ্যমে বাড়তি সুবিধা থাকবে আমাদের হাতে।
