স্বাভাবিকভাবেই রামেসিসও আমার সঙ্গী হতে চেয়েছিল। কিন্তু স্রেফ দুটো প্রশ্ন করেই ওকে নিরুৎসাহিত করেছি আমি। প্রথম প্রশ্নটা হচ্ছে, কখনো দেখেছ যে দুজন রাখাল মিলে মাত্র বারোটা ভেড়াকে পাহারা দিচ্ছে? আর দ্বিতীয় প্রশ্নটা হচ্ছে,যদি এমনটা তোমার চোখে পড়ে তাহলে কি মনের ভেতর সন্দেহ জাগবে না?
হতাশার চোটে হাত দুটো মাথার ওপরে ছুড়ল রামেসিস। আচ্ছা, তোমার যে কখনো ভুল হয় না, এটা তোমার কেমন লাগে, টাইটা?
প্রথম প্রথম একটু অস্বস্তি লাগত। কিন্তু আস্তে আস্তে অভ্যাস হয়ে গেছে, ওকে আশ্বস্ত করলাম আমি।
*
এভাবে পাহারা দিতে দিতে বিশতম দিনে ভাগ্য আমার সহায় হলো। সেদিনও শহরের দক্ষিণ দিকের দরজা খুলে যাওয়ার সাথে সাথে ভেড়াগুলোকে নিয়ে বের হয়ে এলাম আমি। তখন সবে সূর্য উঠছে। ইতোমধ্যে আমাকে মোটামুটি চিনে ফেলেছে সবাই, ফলে আমি যখন বের হয়ে এলাম তখন কেউ খেয়ালই করল না। পালের মধ্যে বুড়ো ভেড়াটা পাহাড়ের দিকে যাওয়ার রাস্তা চিনে ফেলেছে। শহরতলির মাঝ দিয়ে বাকি ভেড়াগুলোকে পথ দেখিয়ে নিয়ে চলল সে। এই রাস্তাটা সাধারণত লুক্সরের সাধারণ নাগরিকরা এড়িয়ে চলে, কারণ তারা জানে এই রাস্তা কোথায় গেছে। এটাকে দুর্ভাগ্যের প্রতীক বলে গণ্য করে তারা। ভেড়ার পালের সাথে সাথে পাহাড়ের দিকে এগিয়ে চললাম আমি। তবে প্রথম তীক্ষ্ণ মোড়টা যেখানে ঘন জঙ্গল জন্মেছে সেখানে এসেই থমকে দাঁড়াতে হলো। কিছুই বুঝে উঠতে পারলাম না, প্রথমে শুধু ঘঘাড়ার খুরের শব্দ আর ব্রোঞ্জ-বাঁধাই করা চাকার ভারী আওয়াজ পাওয়া গেল। তার পরেই মোড় ঘুরে আমাদের সামনে এসে পড়ল চারটি রথ। আমাদের ঠিক উল্টো দিকে যাচ্ছে তারা, লুক্সর শহরের দিকে। সবার সামনের রথটা হুড়মুড় করে এসে পড়ল আমার মদ্দা ভেড়াটার ওপর। ঘাড় ভেঙে সাথে সাথে মারা পড়ল প্রাণীটা। আরো একটা ভেড়ির সামনের পা গুঁড়ো হয়ে গেল চাকার আঘাতে। করুণ সুরে ভ্যা ভ্যা করে ডাকতে লাগল প্রাণীটা। ইতোমধ্যে এই ছোট্ট ভেড়ার দলটার প্রতি বেশ মায়া জন্মে গেছে আমার। তাড়াতাড়ি সামনে গিয়ে প্রতিবাদ জানাতে চাইলাম আমি।
তবে সামনের রথের চালক ইতোমধ্যে আমাকে এবং আমার নোংরা জানোয়ারগুলোকে গালাগালি করতে শুরু করেছে, সেইসাথে সমানে চালাচ্ছে। হাতে ধরা চাবুকটা। আমি সামনে এগিয়ে যেতেই মাথার কাপড়ের আবরণটা সরিয়ে ফেলল সে। সাথে সাথে উন্মোচিত হলো ডুগের সেই ভয়ানক চেহারা। ময়লা কাপড়চোপড় এবং খোঁচা খোঁচা দাড়ি আর লম্বা এলোমেলো চুলে ঢেকে থাকায় আমার চেহারা চিনতে পারেনি সে। তবু সাবধানের মার নেই ভেবে তার দিক থেকে মুখ ঘুরিয়ে রাখলাম আমি, তারপর মরা ভেড়াটাকে টানতে টানতে রাস্তার পাশে সরিয়ে নিয়ে যাওয়ায় মনোযোগ দিলাম। তারপর একটা পাথর তুলে নিয়ে আহত ভেড়িটারও যন্ত্রণা চিরতরে বন্ধ করার ব্যবস্থা করলাম। রাস্তা পরিষ্কার হওয়ার সাথে সাথে রথ নিয়ে সামনে এগিয়ে গেল ডুগ, তবে যাওয়ার আগে আমার অর্ধনগ্ন পিঠের ওপর শেষ একটা চাবুকের বাড়ি মেরে যেতে ভুল করল না। কাতর স্বরে গুঙিয়ে উঠলাম আমি। দ্বিতীয় রথটাও চলে গেল আমার পাশ দিয়ে। কিন্তু তৃতীয় রথটা আমার পাশ দিয়ে যাওয়ার সময় রথের যাত্রীর দিকে হাঁ করে তাকিয়ে রইলাম আমি।
মাথা কামিয়ে ফেলা হয়েছে ওর, মারের চোটে ফুলে গেছে চোখ-মুখ। এক চোখ প্রায় বন্ধ হয়ে এসেছে। পরনে একটা খাটো টিউনিক। জায়গায় জায়গায় ছিঁড়ে গেছে সেটা, এবং শুকনো রক্ত আর নানা রকম ময়লা লেগে আছে সবখানে। কিন্তু তার পরও এখনো আমার চোখে পৃথিবীর সবচেয়ে সুন্দরী নারী বলে মনে হলো ওকে।
পথের পাশে দাঁড়িয়ে থাকা আমার দিকে এক নজর তাকাল সেরেনা। সেই মুহূর্তে আমাদের মাঝে দূরত্ব ছিল খুব বেশি হলে দুই কি তিন হাত। এক মুহূর্তের জন্য আমার ছদ্মবেশের কারণে আমাকে চিনতে পারল না ও, কিন্তু তার পরেই বদলে গেল ওর অভিব্যক্তি। আনন্দ এবং বিস্ময়ে বিস্ফারিত হয়ে উঠল চোখ জোড়া, এমনকি ফুলে ওঠা চোখেও সেই আনন্দ ফুটে উঠল পরিষ্কার। আমার নাম উচ্চারণের ভঙ্গিতে নড়ে উঠল ঠোঁট জোড়া, তবে কোনো শব্দ বের হলো না। –কুঁচকে ওকে নীরবে সাবধান করলাম আমি। সাথে সাথে নিজেকে সামলে নিল সেরেনা, অন্যদিকে সরিয়ে নিল চোখ। তার পরেই আমাকে ছাড়িয়ে সামনে এগিয়ে গেল ওর রথ। আর একবারও আমার দিকে তাকাল না সেরেনা, আমাকে চিনতে পেরেছে এমন কোনো লক্ষণও দেখা গেল না ওর মধ্যে। কিন্তু আমি খেয়াল করলাম, এখন আর হতাশায় বিপর্যস্ত মনে হচ্ছে না ওকে। কাঁধগুলো সোজা হয়ে উঠেছে আবার, কামানো মাথাটা এখন আগের চাইতে উঁচু হয়ে আছে। মনে হচ্ছে যেন নতুন করে একটা আশার চাদর ঘিরে রেখেছে ওকে এবং সেটা এত দূর থেকেও বোঝা যাচ্ছে পরিষ্কার।
আমার নিজের মনেও নতুন আশা মাথাচাড়া দিয়ে উঠল, কারণ আরো একটা জিনিস আমার চোখে পড়েছে। সেটা হচ্ছে ওর হাত বাঁধা হয়নি এবং সেখানে স্পষ্ট দেখা যাচ্ছে যে, প্রতিটা আঙুলই অক্ষত আছে। ফাঁস হয়ে গেছে উটেরিকের ধোঁকাবাজি। এ ছাড়া এটাও আমি স্পষ্ট বুঝতে পারছি যে, ওর চেহারায় যে আঘাতের চিহ্ন ফুটে উঠেছে সেগুলো খুব শীঘ্রই মিলিয়ে যাবে, কারণ ওর শরীর স্বর্গীয়।
