সব আনুষ্ঠানিকতা শেষ হতেই মেমননের পাল তুললাম আমি আর রামেসিস। দক্ষিণমুখী এই যাত্রার সময় নিজেদের কাজ ঠিক করে নিলাম আমরা, সেগুলো অনুশীলনও করে নিলাম কয়েকবার। বোকাসোকা এক পাগলাটে ভড়ের ছদ্মবেশ নিলাম আমি, আর রামেসিস হলো আমার ছন্নছাড়া মনিব। রাখালরা যে বাঁকানো লাঠির সাহায্যে পশু চরায় তাই দিয়ে আমাকে এদিক-ওদিক নিয়ে বেড়াল সে। জড়িয়ে জড়িয়ে কথা বলি আমি, খুঁড়িয়ে খুঁড়িয়ে হাঁটি। গিথিয়ন বন্দরের প্রধান দরজায় বসে থাকা দুই ভিক্ষুকের কাছ থেকে কিনে আনা পোশাক পরে নিলাম আমরা দুজন। আমাদের হয়ে আমার এক চাকর পোশাকগুলো কিনেছে তাদের কাছ থেকে, ফলে কেউ আমাদের চিনে ফেলবে সে ভয় নেই। তবে পোশাকগুলো সত্যিই দারুণ ভেঁড়া, ময়লা আর দুর্গন্ধময়। সৌভাগ্যক্রমে মিশরীয় উপকূল দৃষ্টিসীমার মাঝে আসার আগ পর্যন্ত ওই পোশাকের মাঝে ঢুকতে হলো না আমাদের।
রাত নামার আগ পর্যন্ত মেমননেই অপেক্ষা করলাম আমরা। তারপর অন্ধকার নেমে এলে আবারও দক্ষিণ দিকে চলতে শুরু করলাম, যতক্ষণ না ডাঙার আবছা রেখা বোঝা যায়। মাটি দেখা গেলে মেমননের ডেকের ওপর নিয়ে আসা ছোট্ট ডিঙি নৌকাটা নামিয়ে নিলাম। তারপর জাহাজের নাবিকদের সবার কাছ থেকে বিদায় নিয়ে ছেঁড়া কাপড়গুলো পরে উঠে পড়লাম ডিঙিতে। নাবিকরা আবার ল্যাসিডিমনের পথে রওনা দিল, আর আমরা চললাম নীলনদের নয়টা মুখের মধ্যে সবচেয়ে কম গুরুত্বপূর্ণ পথ ওয়াদি তুমিলাত লক্ষ্য করে।
ভোরের আলো ফুটলে দেখা গেল ইতোমধ্যে নদী ধরে চার-পাঁচ লিগ পথ এগিয়ে এসেছি আমরা। মিশরীয় নদীপথ ধরে ভেসে চলা আরো অনেকগুলো ছোট ছোট জলযানের মাঝে মিশে গেছে আমাদের নৌকা। তবে নদীর স্রোত এখন আমাদের গতিপথের বিপরীতে, ফলে সোনালি শহর লুক্সরে পৌঁছতে গিয়ে বেশ কয়েক দিন সময় লেগে গেল। এই সময়ের মাঝে আমাদের অগোছালো নোংরা চেহারা আরো বিশ্বাসযোগ্য হয়ে উঠল, দেখে মনে হতে লাগল যে আমাদের অবস্থা জন্ম থেকেই এ রকম। তাই রামেসিস যখন লাঠির মাথায় আমাকে ঠেলতে ঠেলতে ওয়েনেগের মদের দোকানে নিয়ে ঢোকাল তখন আমার এলোমেলো দৃষ্টি আর পদক্ষেপ দেখে প্রথমে ওয়েনেগ আমাদের দুজনকে চিনতেই পারল না। দোকানে ঢোকার সাথে সাথেই আমাদের বের করে দিতে চাইল সে। শেষ পর্যন্ত যখন আমাদের সত্যিকারের পরিচয় ওকে বোঝাতে সক্ষম হলাম তখন প্রথমে একেবারে অবাক হয়ে গেল সে এবং তার পরেই দারুণ খুশি হয়ে উঠল। প্রথম রাতের বেশির ভাগ সময় জেগেই কাটালাম আমরা। রাজকুমারী সেরেনাকে কোথায় আটকে রাখা হতে পারে তাই নিয়ে আলোচনা করলাম, সেইসাথে ওয়েনেগের দোকানের প্রধান পণ্য অর্থাৎ বিভিন্ন ধরনের মদ চেখে দেখলাম। সৌভাগ্যক্রমে সবগুলোই উৎকৃষ্ট স্বাদের। বোঝা গেল ওয়েনেগের রুচি বেশ অভিজাত। একই সাথে আরো। একটা কাজ করলাম আমি। রানি তেহুতি তার মেয়ে সেরেনাকে দেওয়ার জন্য যে উপহারটা দিয়েছিলেন সেটা মদের দোকানের নিচে অবস্থিত ভাড়ার ঘরে বেশ কিছু মদের বোতলের তূপের পেছনে লুকিয়ে রাখার ব্যবস্থা করলাম। অন্যান্য সকল সম্ভাবনা নিয়ে আলোচনা করার পর আমরা একমত হলাম যে, সেরেনাকে সম্ভবত কুখ্যাত জল্লাদ ডুগের কাছেই বন্দি করে রাখা হয়েছে। শেষবার ওকে এই লুক্সরের রাস্তায় ডুগের হাতে বন্দি অবস্থাতেই দেখা গেছে। অবশ্য এমনও হতে পারে যে, উটেরিক আর তার দোসররা আমাদের এটাই বিশ্বাস করাতে চায়। হয়তো সেরেনাকে অন্য কোনো কারাগারে বন্দি করে রাখা হয়েছে। উটেরিক সিংহাসনে বসার পর এমন শত শত কারাগার গজিয়ে উঠেছে পুরো দেশে। তবে এটাও ঠিক যে, প্রধান প্রধান বন্দিদের আটকে রাখার জন্য উটেরিকের প্রথম পছন্দ হচ্ছে দুঃখ-দুর্দশার ফটক। হয়তো কারাগারের নামটাই এর কারণ। এবং আমাদের মাঝে একমাত্র আমিই ওই কারাগারের ভেতরে ঢোকার সুযোগ পেয়েছি। ফলে আমার ওপর দায়িত্ব পড়ল স্মৃতিশক্তির ওপর নির্ভর করে কারাগারের অভ্যন্তরীণ অংশের একটা মানচিত্র তৈরি করার।
আমার দৃষ্টিশক্তিও অত্যন্ত শক্তিশালী। আলো যদি ভালো থাকে তাহলে এক লিগ দূরত্বের কোনো বস্তুর গঠনও আমি খুব সহজেই চিনতে পারি। এক ঘণ্টায় একজন পূর্ণবয়স্ক মানুষ হেঁটে হেঁটে যত দূরে যেতে পারে তাকে বলা হয় এক লিগ। ফলে আরো একটা কাজ পড়ল আমার ভাগে। সেটা হচ্ছে দিনের বেলায় কারাগারের চারপাশে ঘিরে থাকা পাহাড়গুলোর ওপরে বসে বসে কারাগারের ওপর নজর রাখা। সত্যি কথা বলতে আমি নিজেই কাজটা বেছে নিলাম আমার জন্য। অর্ধ দেবী-অর্ধ মানবী সেই নারীকে এক নজর দেখার জন্য অস্থির হয়ে আছি আমি, তা সে যত দূর থেকেই হোক না কেন। ওকে একবার দেখতে পেলে আমার সাহস আর প্রতিজ্ঞা আরো দৃঢ় হবে, উটেরিক এবং ডুগের হাত থেকে ওকে ছিনিয়ে আনার জন্য আরো সাহসের সাথে লড়াই করতে পারব আমি।
নিজের কিছু বন্ধুবান্ধবের সহায়তায় আমার জন্য দশ-বারোটা কালো রঙের ভেড়ার ব্যবস্থা করল ওয়েনেগ। এখন প্রতিদিন সকালে সেই রাখালের লাঠিটা ব্যবহার করে প্রাণীগুলোকে পাহাড়ে চরাতে নিয়ে যাই আমি, অবস্থান নিই লুক্সর এবং কারাগারের মাঝখানে অবস্থিত রাস্তাটার আশপাশে। এখানে বসে দিনের বেশির ভাগ সময় আমার কাটে ভেড়াগুলোর ওপর লক্ষ্য রেখে এবং রাস্তা দিয়ে যারা যাতায়াত করে তাদের ওপর আড়চোখে খেয়াল রেখে। খুব তাড়াতাড়িই আমি বুঝতে পারলাম কারাগারে যেসব বন্দিকে নিয়ে যাওয়া হয় তাদের মাঝে খুব কমই আবার এ পথে ফেরত আসে। সোজা কথায় কারাগার থেকে তারা আর বের হতে পারে না। ব্যাপারটা খেয়াল করে নিজের সৌভাগ্যে খুশি না হয়ে পারলাম না আমি।
