দেবত্বের অধীকারী কারো শরীরে কখনো পচন ধরে না, আবার বলল ও। তারপর আরেকটা কথা বলল, এই আঙুলটা সেরেনার হতে পারে না। টেবিলের ওপর পড়ে থাকা জিনিসটার দিকে তাকিয়ে মাথা দোলাল হুরোতাস।
কারণ সেরেনার মাঝে ওই দেবত্বের চিহ্ন আছে।
তুমি জানতে! অবাক হয়ে বলে উঠলাম আমি। আরো একবার মাথা ঝাঁকাল হুরোতাস। কীভাবে জানলে? জানতে চাইলাম ওর কাছে।
আমিও একটা স্বপ্ন দেখেছিলাম, ব্যাখ্যা করল হুরোতাস। দেবী আর্টেমিস আমার স্বপ্নে দেখা দিয়েছিলেন। সেরেনার কীভাবে জন্ম হয়েছে সেটা তিনিই বলেছেন আমাকে। থেমে গেল হুরোতাস। হঠাৎ করে কেমন যেন বিষণ্ণ হয়ে উঠল ওর চেহারা, আগে কখনো এমন দেখিনি আমি। আর্টেমিস আমাকে বলেছিলেন: তোমার স্ত্রীর গর্ভে যে সন্তান বড় হচ্ছে সে তোমার হৃদয়জাত বটে; কিন্তু তোমার ঔরসজাত নয়।
এই কথা কি কখনো তেহুতিকে বলেছ তুমি? প্রশ্ন করলাম আমি। মাথা নাড়ল হুরোতাস।
না। কখনো বলবও না। তাতে হয়তো আমাদের দুজনের মাঝের বিশ্বাস আর সুখ নষ্ট হয়ে যাবে। সে জন্যই এখন তোমার কাছে ফিরে এসেছি আমি। আমি চাই তুমিই তেহুতিকে বুঝিয়ে বলো যে এটা উটেরিকের আরো একটা নোংরা চাল ছাড়া আর কিছুই নয়। আমি চাই আমার এবং তেহুতির মাঝে যে। বিশ্বাস বিরাজমান তাকে রক্ষা করার দায়িত্ব নাও তুমি। আমার হাতটা ধরে আস্তে করে ঝাঁকি দিল সে। আমার জন্য আমাদের জন্য এটুকু তুমি করবে না?
অবশ্যই! ওকে আশ্বস্ত করলাম আমি। তারপর বাইরে বেরিয়ে এসে প্রবেশ করলাম সূর্যের আলোয় আলোকিত বাগানে, যেখানে তেহুতিকে পাব বলে জানি। মাছে ভরা পুকুরটার পাশে নিজের প্রিয় জায়গায় বসে ছিল ও। কাছে গিয়ে দাঁড়াতে মুখ তুলে চাইল। সব হারানোর অভিব্যক্তি খেলা করছে ওর চেহারায়।
এখন আমি কী করব টাইটা? তোমাকে আর আমার ভাইপো রামেসিসকে ওই দানবটার হাতে কিছুতেই তুলে দিতে পারব না আমি। অথচ আমার একমাত্র মেয়ের অঙ্গগুলো সে এক এক করে ছিঁড়ে আনবে, এই চিন্তাও আমি সহ্য করতে পারছি না।
এই দুটো কাজের কোনোটাই তোমাকে করতে হবে না। ওর পাশে এসে বসলাম আমি, তারপর কাঁধের ওপর হাত রেখে জড়িয়ে ধরলাম। তেহুতি, তুমি নিশ্চয়ই জানো যে দেবত্বের অধিকারী শরীর পচনের অভিশাপ থেকে চিরকালের জন্য মুক্ত?
মাথা নাড়ল তেহুতি। কিছুই বুঝতে পারছি না আমি।
যে আঙুলটা আমাদের কাছে পাঠানো হয়েছে, লবণ মাখানো অবস্থাতেও পচন ধরেছে তাতে। বোঝা যাচ্ছে যে স্বর্গীয় কোনো চিহ্ন নেই ওতে, অর্থাৎ ওটা সেরেনার আঙুল নয়। অন্য কোনো দুর্ভাগা মেয়ের হাত থেকে আঙুলটা কেটে নিয়েছে উটেরিক।
আমার দিকে তাকিয়ে রইল তেহুতি। ধীরে ধীরে আবার সোজা হয়ে উঠল ওর ঝুলে পড়া কাঁধ দুটো। নতুন করে শক্তি ফিরে পেয়েছে সে। ঠিকই বলেছ তুমি, টাইটা। বোতলটা খোলার সাথে সাথেই পচনের গন্ধ পেয়েছিলাম আমি। কিন্তু তখন এটা নিয়ে তেমন চিন্তা করিনি। কিন্তু এখন তোমার মুখ থেকে শোনার পরে মনে হচ্ছে তোমার কথাই ঠিক।
হ্যাঁ। কিন্তু উটেরিককে এটা কিছুতেই বুঝতে দেওয়া যাবে না যে আমাদের বোকা বানাতে ব্যর্থ হয়েছে সে।
মোটেই না! সম্মতি জানাল তেহুতি। কিন্তু আমার স্বামীর ব্যাপারে কী করবে? কথা দাও টাইটা হুরোতাসকে কখনো বলবে না যে সেরেনার আসল বাবা কে।
তোমার স্বামী খুব ভালো একজন মানুষ, একজন দক্ষ রাজাও বটে। কিন্তু দেবতা আর ছাগলের মাঝে তফাত ধরার মতো বুদ্ধি তার মাথায় আছে বলে মনে হয় না। তুমি যে স্বপ্নের মাঝেই গর্ভবতী হয়ে পড়েছিলে এটা কখনো ওর মাথায় আসবে না। তা ছাড়া তোমার প্রতি ওর বিশ্বাসের কোনো সীমা নেই, তেহুতিকে আশ্বস্ত করলাম আমি। প্রয়োজন পড়লে দারুণ দক্ষ একজন মিথ্যাবাদীতে পরিণত হওয়ার ক্ষমতা আছে আমার।
*
ঠিক করলাম প্রথমে গোপনে মিশরে ঢুকব আমি, চেষ্টা করে দেখব যে সেরেনার সাথে দেখা করার। কারাগার থেকে যদি ওকে মুক্ত করতে নাও পারি, একটু সাহস এবং সান্ত্বনা জোগানোর চেষ্টা তো করতে পারব। কিন্তু এই সিদ্ধান্তের কথা রামেসিসকে জানাব কি না বুঝতে পারলাম না। শেষ পর্যন্ত দুর্গের মাঝে ওর নির্দিষ্ট কামরায় গিয়ে হাজির হলাম। সবগুলো জায়গা তন্ন তন্ন করে খুঁজে দেখলাম, আমরা ছাড়া আর কেউ আছে কি না। নিশ্চিত হওয়ার পর রামেসিসকে খুলে বললাম আমার সিদ্ধান্ত। এবং সব শেষে বললাম যে আমার এই পরিকল্পনার কথা আর কাউকে না জানাতে।
নীরবে আমার সব কথা শুনল রামেসিস। কথা বলা শেষ হতে আস্তে করে মাথা ঝাঁকাল ও।
আমিও ঠিক এই একই সিদ্ধান্ত নিয়েছিলাম। কিন্তু এমনকি তোমাকেও বলার কোনো ইচ্ছে ছিল না আমার, স্বীকারোক্তি জানাল ও।
তার মানে কি আমি ধরে নিতে পারি যে আমার সাথে আসছ তুমি? অবাক হওয়ার ভান করলাম আমি, যদিও এটাই শুরু থেকে আমার ইচ্ছে ছিল।
প্রশ্নটা জিজ্ঞেস করার কোনো দরকার ছিল বলে মনে হয় না টাটা। আমাকে জড়িয়ে ধরল রামেসিস এবং প্রায় সাথে সাথেই আবার ছেড়ে দিল। কখন রওনা দিচ্ছি আমরা?
যত তাড়াতাড়ি সম্ভব! জবাব দিলাম আমি।
এবার লুক্সরে অভিমুখে আমাদের যাত্রার কথা জানিয়ে সেখানে মদের দোকানে আস্তানা গেড়ে বসা ওয়েনেগের উদ্দেশ্যে তিনটি পায়রা ছেড়ে দিলাম। তারপর রামেসিসকে নিয়ে গেলাম রাজা হুরোতাস আর রানি তেহুতির কাছ থেকে বিদায় নিতে। আমরা সেরেনাকে উদ্ধার করতে যাচ্ছি শুনে দুজনেই দারুণ খুশি হলো। সেরেনার সাথে যখন আমাদের দেখা হবে তখন ওকে দেওয়ার জন্য একটা অসাধারণ উপহার আমার কাছে দিল তেহুতি। আমি ওকে প্রতিশ্রুতি দিলাম, জীবন দিয়ে হলেও এই উপহারকে রক্ষা করব আমি এবং প্রথম সুযোগেই তুলে দেব সেরেনার হাতে।
