এই ঘৃণিত ব্যক্তি প্রকৃতপক্ষে একজন শবসাধক এবং ডাকিনিবিদ্যার মতো ভয়াবহ এবং নিকৃষ্ট জাদুর উপাসনাকারী। একই সাথে সে একজন নীচ ক্রীতদাস, যে তার মনিবের কাছ থেকে পালিয়ে গেছে। তাকে যাতে সর্বোচ্চ শাস্তি দেওয়া যায় সে জন্য তাকে অবশ্যই আমার। কাছে হস্তান্তর করতে হবে।
আমার এই দাবিগুলো পুরোপুরি পূরণ করার জন্য তোমাদের এক মাস সময় দেওয়া হলো। আমার দাবি মানা না হলে প্রত্যেক মাসে তোমাদের কাছে এমন একটা জিনিস পাঠাব আমি, যেটা দেখে তোমাদের শিক্ষা হওয়া উচিত। সেই জিনিসগুলোর প্রথমটা এই চিঠির সঙ্গে পাঠানো হচ্ছে। সবুজ কাঁচের পাত্রে রয়েছে তা।
মিশরের ফারাও উটেরিক বুবাস্টিস (যার আরেক পরিচয় অপরাজেয়)
*
তিনজনই এবার একসাথে দৃষ্টি ফেরালাম নিরীহ চেহারার সবুজ রঙের কাঁচের বোতলটার দিকে। সবাই যেন কোনো রহস্যময় জাদুতে পাথর হয়ে গেছি। শেষ পর্যন্ত তেহুতিই নীরবতা ভঙ্গ করল।
আর সহ্য করতে পারছি না আমি। এই উটেরিককে আমি চিনি। আমার ভাই ফারাও টামোসের প্রথম সন্তান সে, সম্পর্কে আমার ভাইপো। ছোটবেলা থেকেই দুর্বল আর চুপচাপ প্রকৃতির ছিল, তাই ভেবেছিলাম হয়তো ওকে দিয়ে কারো কোনো ক্ষতি হবে না। কিন্তু দুর্ভাগ্যক্রমে ওকে চিনতে ভুল হয়েছিল আমার। ওর মাঝে আসলে সব রকমের শয়তানির প্রকাশ ঘটেছে, ফিসফিস করে বলল সে। কথার মাঝখানে কান্নায় ভেঙে এলো ওর কণ্ঠস্বর, ফলে কথাগুলো প্রায় বোঝাই গেল না। কিন্তু যতটা সময় কথা বলল ও তার মাঝে একবারও দৃষ্টি সরাল না কাঁচের পাত্রটার ওপর থেকে। আমাদের কাছে সেই উটেরিক কী পাঠাতে পারে ভাবতে গেলেই শিউরে উঠছি আমি। তুমি কি পাত্রটার মুখ খুলবে টাইটা?
কাউকে না কাউকে তো খুলতেই হবে, বললাম আমি। তারপর পাত্রটা তুলে নিয়ে মুখের ছিপিটা পরীক্ষা করলাম। দেখলাম নরম কাঠ কেটে তৈরি করা হয়েছে সেটা, তারপর মুখের সাথে মোম দিয়ে শক্ত করে লাগিয়ে দেওয়া হয়েছে। সাবধানে ধরে মোচড় দিতেই সিলটা ভেঙে গেল। মৃদু হিসসস শব্দের সাথে নিজে থেকেই বেরিয়ে এলো ছিপিটা, যেন ভেতরের বাতাস চাপ দিয়ে ওটাকে বের করে দিয়েছে। ভেতরের যা ছিল সব টেবিলের ওপর উপুড় করে ঢেলে দিলাম আমি। তিন জোড়া চোখ রুদ্ধশ্বাসে চেয়ে রইল টেবিলের ওপর এসে পড়া জিনিসটার দিকে।
জিনিসটা আর কিছুই নয়, একটা মানুষের তর্জনী। একেবারে গোড়া থেকে কেটে ফেলা হয়েছে। সরু সুগঠিত একটা আঙুল। ত্বকের ওপর কোনো দাগ নেই, সম্পূর্ণ মসৃণ। এমন একজন নারীর আঙুল, যাকে জীবনে কখনো অবহেলা বা শারীরিক পরিশ্রমের মুখোমুখি হতে হয়নি।
তীব্র ক্ষোভ আর হতাশামিশ্রিত একটা আর্তনাদ বের হয়ে এলো তেহুতির মুখ দিয়ে। কয়েক পা পিছিয়ে গিয়ে দেয়ালের কাছে গিয়ে দাঁড়াল ও, ভয়াবহ আতঙ্ক নিয়ে তাকিয়ে আছে টেবিলের ওপর পড়ে থাকা বীভৎস জিনিসটার দিকে।
আমার মেয়ে সেরেনাকে পঙ্গু করে দিতে শুরু করেছে উটেরিক। এই কাজ করতে একবারও ওর হাত কাঁপল না? ঘুরে দাঁড়িয়েই কামরা থেকে দৌড়ে বের হয়ে গেল তেহুতি। হুরোতাস আর আমি বিস্ময় আর বিষণ্ণতা চোখে নিয়ে তাকিয়ে রইলাম ওর দিকে।
শেষ পর্যন্ত আমিই নীরবতা ভঙ্গ করলাম। ওর কাছে যাও, বললাম হুরোতাসকে। হয়তো ও নিজেও বুঝতে পারছে না; কিন্তু এই মুহূর্তে তোমাকেই ওর সবচেয়ে বেশি দরকার। যাও ওর কাছে। সান্ত্বনা দাও ওকে। আমি এখানেই অপেক্ষা করব তোমার জন্য। মাথা ঝাঁকিয়ে সম্মতি জানাল হুরোতাস, তারপর দ্রুত পায়ে বেরিয়ে গেল কামরা থেকে। পেছনে খোলাই রইল দরজাটা।
ধীরে ধীরে আতঙ্কের প্রাথমিক রেশটা কাটিয়ে উঠলাম আমি, তারপর এগিয়ে গেলাম টেবিলের দিকে। এবার আগের চাইতে তীক্ষ্ণ চোখে সম্পূর্ণ চিকিৎসকের দৃষ্টিতে পরীক্ষা করলাম বিচ্ছিন্ন আঙুলটা। বুঝতে পারলাম এটা দেখতে যা মনে হচ্ছে আসলেও তাই। নকল হওয়ার কোনো সুযোগ নেই। সত্যিই একজন তরুণীর আঙুল এবং খুব সম্ভব অভিজাত বংশের কেউ। সেরেনার হাতটা কখনো ভালোভাবে খুঁটিয়ে দেখিনি আমি; কিন্তু আঙুলটা দেখে মনে হচ্ছে ওরই। শুধু… কী একটা ব্যাপার যেন মিলছে না। ব্যাপারটা নিয়ে কিছুক্ষণ চিন্তা করলাম আমি। তারপর মনে পড়ল কাঁচের বোতলের ছিপি খুলে ফেলার সাথে সাথে হিসসস শব্দে কিছুটা বাতাস বের হয়ে এসেছিল। এবার বিচ্ছিন্ন আঙুলটার আরো কাছে ঝুঁকে এলাম আমি, ভালো করে শুঁকে দেখলাম। ওপরে লবণের মিহি আস্তরণ রয়েছে, পচনের হাত থেকে রক্ষা করার জন্য লাগানো হয়েছে নিশ্চয়ই। তার পরও পচন ধরার খুব মৃদু একটা গন্ধ ইতোমধ্যে বের হতে শুরু করেছে আঙুলটার থেকে।
পুরো ব্যাপারটার রহস্য উদ্ঘাটন করতে আমি এতই চিন্তামগ্ন হয়ে পড়েছিলাম যে, হুরোতাস কখন দরজা দিয়ে আবার ভেতরে এসে ঢুকেছে খেয়ালই করিনি। যতক্ষণ না মৃদু স্বরে কথা বলে উঠল ততক্ষণ পর্যন্ত ওর উপস্থিতি টেরই পেলাম না আমি।
দেবত্বের অধিকারী ব্যক্তির শরীরে কখনো পচন ধরে না, বলল ও।
চরকির মতো ঘুরে দাঁড়ালাম আমি, অবাক হয়ে তাকিয়ে রইলাম হুরোতাসের দিকে। প্রশ্ন করলাম কী বললে?
আমার ধারণা, আমার কথা ঠিকই শুনেছ তুমি, বন্ধু। আস্তে করে মাথা। দোলাল হুরোতাস।
হ্যাঁ, তা শুনেছি, কিছুটা বিভ্রান্তি নিয়ে সম্মতি জানালাম আমি। কিন্তু তুমি যা বললে… তা দিয়ে আসলে কী বোঝাতে চেয়েছ?
