প্রতিদিন পাহাড়ের মাথায় চড়ে বসি আমি, সাগরের দিকে তাকিয়ে লক্ষ্য রাখি যে একটা বিশেষ পালের দেখা পাওয়া যায় কি না। সেই সিরীয় ব্যবসায়ীর যেকোনো দিন মিশর থেকে ফিরে আসার কথা। ফারাও উটেরিকের শর্তগুলো আমাদের শোনানোর জন্য বয়ে আনবে সে। অবশেষে একদিন তার জাহাজের হালকা নীল পালের দেখা পাওয়া গেল। এই রং করা হয়েছে এক বিশেষ প্রজাতির সাগর-শামুকের রস থেকে। ধারণা করা হয় বিপজ্জনক সমুদ্র এবং জলদস্যুদের হাত থেকে জাহাজকে রক্ষা করার ক্ষমতা রাখে এই রং। আমার বিশ্বাস করতে মন চাইল যে, এই রং হয়তো সৌভাগ্য বয়ে আনবে আমাদের জন্য। কিন্তু জাহাজটা কাছে আসার পর বুঝতে পারলাম সেই সম্ভাবনা নেই বললেই চলে।
বন্দরে জাহাজের এত বেশি ভিড়, সেখানে ব্যবসায়ীর জাহাজ ভেড়ানোর কোনো জায়গায় পাওয়া গেল না। ফলে একটা ছোট মাছ ধরার নৌকা নিয়ে তার সাথে দেখা করতে গেলাম আমি। ব্যবসায়ীর নাম বেন জাকেন। আমাকে সে জানাল, ফারাও উটেরিক বুবাস্টিস-সুমহান এবং সুউচ্চ-এর পক্ষ থেকে সে একটা চিঠি এনেছে ঠিকই। সন্দেহ নেই নিজের নামের সাথে আরো একটা বিশেষণ যোগ করেছে উটেরিক। কিন্তু চিঠিটা আমার হাতে দিতে রাজি হলো না ব্যবসায়ী। বলল, চিঠিটা রাজা হুরোতাসের হাতে তুলে দেওয়ার জন্য তাকে স্পষ্টভাবে বলে দেওয়া হয়েছে এবং নিজের দায়িত্বে সে কোনো অবহেলা করতে রাজি নয়। ধারণা করলাম, চিঠির বদলে হুরোতাসের কাছ থেকে বড় অঙ্কের পুরস্কার আশা করছে সে, এবং সেটা সংগ্রহেও কোনো রকম অবহেলা করার ইচ্ছে নেই তার। তাকে বোঝানোর চেষ্টা করলাম যে, চিঠিটা অন্তত একবার আমাকে দেখতে দেওয়া উচিত, যাতে কোনো খারাপ খবর থাকলে সেটা অপেক্ষাকৃত নরম ভাষায় রাজা হুরোতাস এবং রানি তেহুতিকে জানানো যায়। কিন্তু কোনোভাবেই রাজি করানো গেল না ব্যাটাকে।
অগত্যা বেন জাকেনকে নিয়ে জাহাজ থেকে নেমে এলাম আমি, তারপর দুর্গের উদ্দেশ্যে রওনা দিলাম। সেখানে পৌঁছে দেখলাম অধীর আগ্রহে আমাদের জন্য অপেক্ষা করছে সেরেনার বাবা-মা। পুরস্কারের পরিমাণ নিয়ে একটু ঝগড়া করার চেষ্টা করল বেন জাকেন, কিছুটা সময় নষ্ট হয়ে গেল তাতে। কিন্তু শেষ পর্যন্ত অধৈর্য হয়ে উঠল হুরোতাস এবং তার রাগ দেখে আর কিছু বলার সাহস পেল না ব্যবসায়ী। তবে চলে যাওয়ার সময় বিড়বিড় করে অভিযোগ জানাতে শুনলাম তাকে।
মন্ত্রণাকক্ষে এখন আমি হুরোতাস আর তেহুতি ছাড়া আর কেউ নেই। এবার উটেরিকের পাঠানো শ্বেতপাথরের পাত্রটার মুখে লাগানো সিল ভাঙল হুরোতাস। ভেতরে রয়েছে গোল করে পাকানো একটা প্যাপিরাসের চিঠি আর সিল করা একটা অর্ধস্বচ্ছ সবুজ কাঁচের পাত্র। আমার জানা মতে এ ধরনের পাত্রে জ্ঞানী চিকিৎসকরা তাদের গুরুত্বপূর্ণ ওষুধ বা নমুনা সংরক্ষণ করে থাকে।
আপাতদৃষ্টিতে একেবারেই সাধারণ এই জিনিসগুলো টেবিলের ওপর রাখল হুরোতাস। নীরবে ওগুলোর দিকে কিছুক্ষণ তাকিয়ে রইলাম আমরা। তারপর তেহুতি মৃদু স্বরে বলে উঠল, আমার ভয় লাগছে। ওর ভেতর কী আছে আমি জানি না, জানতেও চাই না। কিন্তু এটা ঠিকই বুঝতে পারছি যে ভালো কিছু হতে পারে না।
হুরোতাস বা আমি কেউই ওর কথার জবাবে কিছু বললাম না। কিন্তু আমি জানি আমাদের তিনজনই এই মুহূর্তে একই রকম বোধ করছে। শেষ পর্যন্ত হুরোতাসই নড়ে উঠল প্রথম। নিজেকে একটা ঝাঁকি দিল সে, যেন এইমাত্র জেগে উঠেছে কোনো দুঃস্বপ্ন দেখে। হাতের তালু দিয়ে মুখ মুছল, চোখ পিটপিট করল কয়েকবার। তারপর হাত বাড়িয়ে প্যাপিরাসটা তুলে নিয়ে তাতে লাগানো মোমের সিলমোহরটা পরীক্ষা করল। তারপর কোমরের খাপে ঝোলানো ছুরিটা বের করে সেটার মাথা ঢুকিয়ে দিল সিলের ভেতর। চাড় দিতেই প্যাপিরাস থেকে আলগা হয়ে উঠে এলো সেটা। এবার কাগজটা খুলে আলোর দিকে ধরল সে। মৃদু মচমচ শব্দ করে উঠল সেটা। হায়ারোগ্লিফে লেখা কথাগুলো বিড়বিড় করে পড়তে শুরু করল হুরোতাস।
না! তীক্ষ্ণ স্মরে বলে উঠল তেহুতি। জোরে জোরে পড়ো। ওতে কী লেখা আছে আমিও জানতে চাই।
থমকে গেল হুরোতাস। আমি চাই না কোনো কারণে কষ্ট পাও তুমি।
জোরে জোরে পড়ো! আবার বলে উঠল তেহুতি। ভ্রূ কুঁচকে উঠল হুরোতাসের। কিন্তু তার পরেই হার মেনে নিল সে, জোরে জোরে পড়তে শুরু করল।
জারাস এবং হুই,
মিশরের রাজকীয় সেনাবাহিনী থেকে পালিয়ে যাওয়া দুই কাপুরুষ দলত্যাগীর প্রতি।
সেরেনা নামের বেশ্যাটা এখন আমার কবজায়। আমার কারাগারের সবচেয়ে দুর্ভেদ্য প্রকোষ্ঠে রাখা হয়েছে তাকে, যেখানে ওকে তোমরা জীবনেও খুঁজে পাবে না। তবে নিম্নোক্ত শর্তগুলো যদি তোমরা মানতে রাজি থাকো তাহলে ওকে মুক্তি দিতে পারি আমি।
শর্ত এক। তোমরা আমাকে তিন কোটি রৌপ্যখও পরিশোধ করবে। আমার বাবা ফারাও টামোসের সময়ে তোমরা যখন এই মিশরের সেনাবাহিনীতে সাধারণ সৈনিক ছিলে তখন তোমরা দল ত্যাগ করে পালিয়ে যাও। তার পর থেকে এ পর্যন্ত তোমাদের কারণে আমার এই পরিমাণ আর্থিক ক্ষতি হয়েছে। তার ক্ষতিপূরণ হিসেবে এই অর্থ পরিশোধ করতে হবে তোমাদের।
শর্ত দুই। তোমরা যাকে ভুলবশত যুবরাজ রামেসিস বলে সম্বোধন করো তাকে সশরীরে আমার হাতে তুলে দিতে হবে। এই অপরাধী আসলে এক নীচু বংশজাত ক্রীতদাস, যে কি না দাবি করে যে তার শরীরে মিশরের রাজরক্ত প্রবাহিত হচ্ছে। মিশর সেনাবাহিনীতে নিজের অবস্থান ত্যাগ করে পালিয়ে গেছে সে। তাকে যাতে সর্বোচ্চ শাস্তি দেওয়া যায় সে জন্য তাকে অবশ্যই আমার কাছে হস্তান্তর করতে হবে। শর্ত তিন। তোমরা যাকে ভুলবশত প্রভু টাইটা বলে সম্বোধন করো তাকেও সশরীরে আমার হাতে তুলে দিতে হবে।
