ধন্যবাদ! ধন্যবাদ টাইটা! হাসছে ও, আবার একই সাথে স্বস্তির অশ্রু নেমেছে চোখে।
আমিও হাসলাম ওর দিকে তাকিয়ে। কীভাবে বুঝলে ভালো খবর এনেছি আমি?
তোমার মুখ দেখে! তোমার হাসিভরা মুখটা দেখেই বুঝে নিয়েছি আমি! কাছাকাছি এসেই ঠাণ্ডা হয়ে আসা শরীরটা নিয়ে আমার ওপর ঝাঁপিয়ে পড়ে জড়িয়ে ধরল ও। পরস্পকে আলিঙ্গন করলাম আমরা। এবার তেহুতি জানতে চাইল কোথায় ও?
উটেরিকের কারাগারে বন্দি হয়ে আছে ও, জবাব দিলাম আমি। দুঃখ-দুর্দশার ফটক নামটা তেহুতির সাথে উচ্চারণ করতে কিছুতেই মন চাইল না আমার।
হাসিটা মুছে গেল ওর মুখ থেকে। প্রশ্ন করল লুক্সরে?
ভালো আছে ও, কোনো ক্ষতি হয়নি, তেহুতিকে আশ্বস্ত করলাম আমি। নির্দিষ্ট কিছু শর্তের বদলে ওর মুক্তি দিতে রাজি হয়েছে উটেরিক।
ওহ, আমি যদি যেতে পারতাম আমার মেয়ের কাছে! ফিসফিসিয়ে বলে উঠল তেহুতি। কথাটা শুনে মাথা নাড়লাম আমি।
না! ওখানে একবার গেলে তুমি আর ফিরে আসতে পারবে না। কিন্তু সেরেনা ঠিকই ফিরে আসবে। হয়তো একটু সময় লাগবে; কিন্তু আমি শপথ করে বলছি যে, ওকে ফিরিয়ে আনব তোমার কাছে, বললাম আমি। সব ব্যবস্থা করা হয়ে গেলেই এখান থেকে রওনা দেব আমি। যেখানে ওকে বন্দি করে রাখা হয়েছে সে পর্যন্ত হয়তো পৌঁছতে পারব না; কিন্তু ওকে অন্তত এটুকু জানাতে পারব যে আমি কাছেই আছি। আর তাতে ওর সাহস বেড়ে যাবে অনেক এবং কষ্টের মাত্রা কিছুটা হলেও কমে আসবে।
আমরা সবাই তোমার কাছে অনেক ঋণে ঋণী, টাইটা। কীভাবে তোমার প্রতিদান দেব বলো তো?
বেশি কিছু নয়, শুধু তোমার মুখের হাসি আর একটা ছোট্ট চুমু হলেই চলবে তেহুতি। এখন তোমার বোনের কাছে যেতে হবে আমাকে। ওর-ও আমাকে দরকার।
আমিও যাব তোমার সাথে। আগামীকাল হচ্ছে সেই দিন, যেদিন ও আর ওর স্বামী মিলে ওদের ছোট ছেলে পালমিসকে সমাধিস্থ করবে। কুচক্রী উটেরিকের আরো এক শিকারে পরিণত হয়েছে ওদের ছেলে।
*
পালমিস ছিল এমন একটা ছেলে, যাকে সবাই ভালোবাসতো। কমপক্ষে কয়েক শ শোকার্ত মানুষ যোগ দিল আমাদের শোকযাত্রায়। ট্যাগেটাস পর্বতমালার এক নির্দিষ্ট জায়গায় কিছু গুহার উদ্দেশ্যে চলেছি আমরা, যেখানে রাজা হুরোতাস এবং অ্যাডমিরাল হুইয়ের সকল ঘনিষ্ঠ ব্যক্তি এবং আত্মীয়স্বজনদের কবর দেওয়া হয়েছে। পালমিসের মৃতদেহকে মমি করে রাখা হয়েছে একটা শবাধারে। দশটা কালো ষাঁড়ের সাহায্যে টানা একটা কাঠের গাড়িতে রয়েছে সেই শবাধার।
তার পেছন পেছন আসছে বেকাথা। এক হাত ধরে আছে তার স্বামী হুই, গম্ভীর হয়ে আছে তার চেহারা। আরেক পাশে হাঁটছে তেহুতি। পাগলের মতো কাঁদছে বেকাথা, কিছুতেই সামলানো যাচ্ছে না তাকে। তার বাকি তিন ছেলে রয়েছে ঠিক তার পেছনেই, আর তাদের পেছনে রয়েছে তাদের নিজ নিজ বাহিনীর সৈনিকরা। সবার পরনে পূর্ণাঙ্গ যুদ্ধের সাজ, কণ্ঠে নিজ নিজ বাহিনীর বীরত্বসূচক গান, যুদ্ধের সময় যা গায় তারা। একজন দক্ষ সাহসী তরুণ যোদ্ধা, যার জীবন নির্ধারিত সময়ের অনেক আগেই শেষ হয়ে গেছে, তার জন্য এর চাইতে সঠিক শেষকৃত্য আর কিছুতেই হতে পারে না।
এমনকি আমি নিজেও আবেগপ্রবণ হয়ে পড়া থেকে নিজেকে সামলাতে পারছি না, যদিও আমার চোখের সামনে বহু যুবককে মারা যেতে দেখেছি, দেখেছি তাদের মৃতদেহকে কবরে শুইয়ে দিতে বা আগুনে পুড়িয়ে দিতে। প্রতিশোধের জন্য জ্বলছে আমার বুকের ভেতরটা। অ্যারেসের উপত্যকায় প্রবেশ করল আমাদের দলটা। জিউসের পুত্র অ্যারেস, যিনি যুদ্ধ এবং নির্মমতার দেবতা। উপত্যকার দুই পাশে খাড়া উঠে গেছে পাহাড়ের সারি, ফলে সার্বক্ষণিক ছায়া ঘিরে রয়েছে জায়গাটাকে। কবরের প্রবেশপথের সামনে এসে দাঁড়াল শবাধার টানা গাড়িটা। পাহাড়ের গায়ে একটা গভীর এবড়োখেবড়ো ফাটল বলা যায় প্রবেশপথটাকে। এরপর আর গাড়ি নিয়ে যাওয়া সম্ভব নয়। তাই গাড়ির চালকদের শহরে ফিরে যাওয়ার অনুমতি দেওয়া হলো। যে পথে এসেছিল সে পথেই আবার ফিরে গেল তারা। এবার পালমিসের সহযোদ্ধারা এগিয়ে এলো সামনে। শবাধারটিকে অনন্ত বিশ্রামে শায়িত করল তারা। আবারও তার ওপর ঝাঁপিয়ে পড়ল বেকাথা, কাঁদছে অঝোরে। শেষ পর্যন্ত তেহুতি আর হুই এগিয়ে গিয়ে প্রায় টেনে সরিয়ে আনল তাকে। তারপর যে পথে এসেছিলাম সেই পথেই আবার দুর্গে ফিরে এলাম আমরা।
*
যুদ্ধের জন্য অধীর হয়ে আছে আমার হৃদয়, তাই মনে হতে লাগল যেন ইচ্ছে করেই যুদ্ধের প্রস্তুতি নিতে দেরি করছে সবাই। গোত্রপ্রধান আর অন্য রাজারা সবাই একে একে তাদের সেনাবাহিনী নিয়ে পৌঁছতে লাগল, গিথিয়ন উপসাগরে নোঙর করল তাদের যুদ্ধজাহাজ। সাদা পালে ছেয়ে গেল উপসাগরের ঘন নীল পানি। তীরের কাছাকাছি বিভিন্ন জায়গায় নোঙর করল তারা। গিথিয়ন বন্দরে এখন এত বেশি জাহাজ যে ইচ্ছে করলে শুধু এক জাহাজ থেকে আরেক জাহাজের ডেকে পা রেখেই বন্দরের এ মাথা থেকে ও মাথায় চলে যাওয়া যায়। হুরোতাস নদীর তীরে খোলা মাঠগুলো ধীরে ধীরে ভরে উঠতে লাগল অসংখ্য সশস্ত্র যোদ্ধার জন্য আশ্রয় হিসেবে গড়ে তোলা তাবু আর ছাউনিতে। উপত্যকার বাতাসে প্রতিধ্বনিত হতে লাগল ঢাল আর শিরস্ত্রাণের সাথে তলোয়ারের সংঘর্ষের ঝনঝন আওয়াজ। প্রশিক্ষকরা চিৎকার করে নির্দেশ দিতে লাগল যোদ্ধাদের, প্রত্যেকেই চাইছে তার বাহিনীকে সর্বোচ্চ দক্ষ করে তুলতে।
