ওয়েনেগের জবানিতে সেরেনার দুর্দশার বিবরণ পড়ার পরেই গিথিয়ন বন্দর থেকে বের হয়ে এলাম আমি, চলে গেলাম ট্যাগেটাস পর্বতমালার সর্বোচ্চ শিখরে। পাহাড়ে ওঠার পথে প্রায় পুরো রাস্তা দৌড়ে এলাম আমি, মনে মনে চাইছি যেন শারীরিক পরিশ্রমের মাধ্যমে মনের কষ্টকে কিছুটা হলেও দাবিয়ে রাখা যায়। পাহাড়ের চূড়ায় দাঁড়িয়ে অলিম্পাস পর্বতে বসবাসকারী দেবতাদের উদ্দেশ্যে তীব্র অভিশাপ বর্ষণ করলাম আমি, সাবধান করে দিলাম যে তারা যদি তাদের সন্তানকে রক্ষা না করে তাহলে তাদের দায়িত্ব এখন থেকে আমাকেই পালন করতে হবে।
দীর্ঘ পথ পাড়ি দিয়ে পাহাড়ে উঠেছি বলেই কি না কে জানে, কিন্তু পাহাড় থেকে নেমে এসে যখন দেখলাম যে রামেসিস আর হুইসন আমার জন্য ঘোড়ায় জিন পরিয়ে অপেক্ষা করছে, ততক্ষণে হারানো আত্মবিশ্বাস অনেকটাই ফিরে পেয়েছি আমি। প্রায় সাথে সাথেই দুর্গের দিকে রওনা দিলাম আমরা। দুর্গে পৌঁছেই চলে এলাম মন্ত্রণাকক্ষে। দেখলাম রাজা হুরোতাস এবং অ্যাডমিরাল হুই সেখানে অন্য রাজাদের সাথে গভীর আলোচনায় ব্যস্ত। আমি কক্ষের ভেতরে ঢুকতেই লাফ দিয়ে উঠে দাঁড়াল হুরোতাস দ্রুত এগিয়ে এলো আমার দিকে।
খবর শুনেছ? গর্জে উঠল সে। এক ব্যবসায়ীর মারফত সরাসরি উটেরিকের কাছ থেকে একটা চিঠি পেয়েছি আমরা। তুমি ঠিকই বলেছিলে, টাইটা! উটেরিকের চ্যালা পানমাসিই চুরি করে নিয়ে গেছে আমার সেরেনাকে। সেই কথা আবার বড় মুখ করে চিঠিতে লিখেছে শয়তানটা। সেরেনা না থাকলে আজ পানমাসি জীবিতই থাকত না, অথচ হারামজাদা সেই প্রতিদান দিল কি না এইভাবে! কিন্তু এখন আমরা নিশ্চিত যে কী ঘটেছে এবং এটাও জানি যে ওকে কোথায় বন্দি করে রাখা হয়েছে। কিন্তু সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ যে ব্যাপারটা সেটা হলো ওর গায়ে হাত দেয়নি কেউ। কিন্তু তীব্র অপমানের শিকার হতে হয়েছে ওকে।
হ্যাঁ। সান্ত্বনা দেওয়ার জন্য হুরোতাসকে জড়িয়ে ধরলাম আমি। হুইসন এই কথাগুলো আগেই বলেছে আমাকে। এটাও বলেছে যে সেরেনার বিনিময়ে অন্য কিছু চায় উটেরিক।
উটেরিককে আমি বিশ্বাস করি না। সে একটা বিষাক্ত সাপ। যত যা-ই বলুক না কেন, আমি প্রায় নিশ্চিত যে শেষ পর্যন্ত তার সঙ্গে আমাদের যুদ্ধে নামতেই হবে, জবাব দিল হুরোতাস। তবে তার আগে আমরা দেখব যে সে আসলে কী চায়। তবে সহজ কিছু চাইবে না এটা আগে থেকেই ধরে রাখা যায়। কিন্তু আমি তাকে জবাব দেব রক্ত আর অস্ত্রের মাধ্যমে, গম্ভীর মুখে শপথ করল সে। তারপর পেছনে বসে থাকা রাজাদের মাঝে তিনজনের দিকে আমার দৃষ্টি আকর্ষণ করল। এরা হচ্ছে গোত্রপ্রধান ফাস, পারভিজ এবং পো।
হ্যাঁ এদের সবাইকেই আমি চিনি, বলে তিনজনের উদ্দেশ্যে শুভেচ্ছা জানালাম আমি।
তাই তো আমিই ভুলে গিয়েছিলাম, একটু লজ্জিত দেখাল হুরোতাসকে।
ক্ষমা চাইছি, টাইটা। সেরেনাকে নিয়ে প্রচণ্ড দুশ্চিন্তায় আছি আমি।
ভালো খবরটা কি তেহুতিকে জানিয়েছ এখনো? প্রশ্ন করলাম আমি।
এখনো না, স্বীকার করল হুরোতাস। আমি নিজেই শুনেছি মাত্র ঘণ্টাখানেক আগে। তা ছাড়া ঘোড়া নিয়ে বের হয়ে গেছে তেহুতি এবং আমি জানি না যে কোথায় গেছে ও। চুপ করে আমার দিকে তাকিয়ে রইল হুরোতাস। কোনো কথা না বললেও বুঝতে পারলাম আমার কাছে আসলে কী চাইছে সে।
ও কোথায় গেছে আমি বোধ হয় জানি। যদি তোমার আপত্তি না থাকে তাহলে ওর সঙ্গে দেখা করতে যেতে চাই, বললাম আমি।
অবশ্যই! এখনই যাও, টাইটা। অত্যন্ত কষ্টে আছে ও। আমাদের মাঝে কেবল তুমিই জানো কীভাবে ওর মন ভালো করতে হবে।
*
হুরোতাস নদীর তীরে সেই রাজকীয় কুটিরে এসে পৌঁছলাম আমি। বাড়ির সামনে তৈরি করা আস্তাবলে ঘোড়াটা বেঁধে রাখলাম, তারপর শূন্য কামরাগুলোর মাঝে ঘুরে বেড়াতে শুরু করলাম। ডাকছি তেহুতির নাম ধরে। কিন্তু কোনো ৮ কামরাতেই কাউকে পাওয়া গেল না, সবগুলো শূন্য। তাই এবার বাড়িটা থেকে বের হয়ে নদীর তীরে চলে এলাম আমি।
নদীর ধারে যেই জায়গাটায় মা আর মেয়ে একসাথে অনেক সময় কাটিয়েছে। সেখানে উপস্থিত হওয়ার আগেই পানির শব্দ শুনতে পেলাম। বাকের কাছ এসে দেখলাম ঢেউয়ের মাঝে ভেসে রয়েছে তেহুতির মাথাটা, ঘন সাদা চুল লেপটে আছে তাতে। আমাকে দেখতে পায়নি ও। তাই এবার পানির কিনারে একটা পাথরের ওপর বসে পড়লাম আমি, তারপর ওকে দেখতে লাগলাম। জানি, অন্তরের ব্যথাকে শারীরিক কষ্ট দিয়ে ঢেকে রাখার চেষ্টা করছে ও। ট্যাগেটাস পর্বতমালায় চড়ার সময় আমিও এ কাজটা করেছিলাম।
নদীর এপার থেকে ওপারে বারবার সাঁতরে পার হতে লাগল ও, যতক্ষণ না ওকে দেখতে দেখতে আমার নিজেরই পেশিতে ব্যথা শুরু হলো। তারপর একসময় নদীর যে কিনারে আমি বসে আছি সেখানে চলে এলো ও, অল্প পানিতে এসে সোজা হয়ে দাঁড়াল। সম্পূর্ণ নগ্ন; কিন্তু ত্রিশ বছর আগে যেমনটা ছিল এখনো ঠিক তেমনই সুগঠিত পাকানো শরীর। নদীর কিনারে উঠে এলো এবার, এখনো পাথরের ওপর বসে থাকা আমাকে দেখতে পায়নি।
তারপর আমি উঠে দাঁড়ালাম। এবার আমাকে চোখে পড়ল ওর। থমকে দাঁড়িয়ে পড়ল, সাথে সাথে চোখের পাতায় খেলা করছে ভয়। তারপর আমি ওর দিকে তাকিয়ে হাসলাম। সাথে সাথে সুন্দর মুখটা আনন্দে ভরে উঠল। নদীর পানিতে ঝড় তুলে এক দৌড়ে আমার দিকে এগিয়ে এলো ও।
