আর্টেমিসের কাছে আমি প্রার্থনা করলাম, সেরেনাকে যদি সত্যিই দুঃখ-দুর্দশার ফটকে বন্দি করে রাখা হয়ে থাকে তাহলে দেবী যেন ওর ওপর অত্যাচার চালানো থেকে কুখ্যাত ডুগকে বিরত রাখেন। যদিও জানি যে ফারাও উটেরিক নিজে কখনো সেরেনার ওপর চড়াও হবে না; কিন্তু সেটা জানা সত্ত্বেও খুব একটা স্বস্তি পেলাম না। ফারাও উটেরিকের পছন্দ অন্যদিকে, সেরেনার সৌন্দর্য তাকে আকৃষ্ট করবে না বলেই আমার ধারণা।
নীলনদের অববাহিকায় পৌঁছানোর পর আরো তিন দিন সেখানে পাহারা দিলাম আমরা। দিনের বেলায় নদীর মুখ থেকে দূরে সাগরের মাঝে অবস্থান করলাম, রাতের বেলায় সরে এলাম কাছাকাছি। চতুর্থ দিন রামেসিস আর আমি দুজনই একমত হলাম যে, এখানে আর পাহারা দিয়ে লাভ নেই। আমরা জানি যে এই সময়ের মধ্যে সেরেনা প্রায় নিশ্চিতভাবেই মিশর পৌঁছে গেছে। ওর অপহরণের পর কম দিন তো পার হয়নি। তাই এবার উত্তর-পশ্চিম দিকে জাহাজের মুখ ঘুরিয়ে নিলাম আমরা, গন্তব্য সেই ল্যাসিডিমনের গিথিয়ন বন্দর। তবে এবার আর বাতাস আমাদের সাহায্য করল না। ফলে অসহ্য রকমের ধীর গতিতে চলতে লাগল জাহাজ, দিনগুলো যেন আর কাটতেই চায় না।
৪. গিথিয়ন বন্দর
শেষ পর্যন্ত আমরা যখন গিথিয়ন বন্দরের দেখা পেলাম, দেখলাম যে বন্দর থেকে বেরিয়ে আসা একটা মাছ ধরার নৌকা আমাদের ডাক দিচ্ছে। জাহাজ থামিয়ে নৌকাটা আমাদের কাছাকাছি আসা পর্যন্ত অপেক্ষা করলাম আমরা। কাছে আসলে দেখা গেল যে মানুষটা আমাদের ডাক দিয়েছে সে আসলে অ্যাডমিরাল হুইয়ের অবশিষ্ট তিন ছেলের একজন। হাসিখুশি ধরনের একটা ছেলে, নাম হুইসন।
টাটা চাচা! কাছে আসার সাথে সাথে চিৎকার করে ডাক দিল সে। সেরেনার খবর পাওয়া গেছে। ভালো আছে ও। নৌকা আরো কাছাকাছি আসার সঙ্গে তার চিৎকারের মাত্রাও বাড়তে লাগল। এক সিরীয় ব্যবসায়ী ব্যবসার কাজে মিশরে গিয়েছিল। লুক্সরে উটেরিকের দরবার থেকে আমাদের রাজা হুরোতাসের কাছে একটা চিঠি নিয়ে এসেছে সে। উটেরিক গর্ব করে বলেছে যে তার লোকেরা আমাদের বোন সেরেনাকে তুলে নিয়ে গেছে, এখন সে বন্দি হয়ে আছে লুক্সরে। উপযুক্ত প্রতিদানের বিনিময়ে সেরেনাকে মুক্তি দিতে রাজি আছে উটেরিক; কিন্তু তার নিজের শর্ত অনুযায়ী।
কথাগুলো শোনার সাথে সাথে স্বস্তির শীতল পরশ বয়ে গেল আমার ওপর দিয়ে; তার পরেই প্রচণ্ড হতাশা ঘিরে ধরল। স্বস্তি পেলাম এটা শুনে যে সেরেনা এখনো বেঁচে আছে। আর হতাশা বোধ করলাম কারণ, এখন দর কষাকষির জন্য উটেরিকের পাল্লাই বেশি ভারী।
মেমননে উঠে এলো হুইসন। গিথিয়ন বন্দরে প্রবেশ করলাম আমরা, একই সঙ্গে আলোচনা চালিয়ে গেলাম এ পর্যন্ত যা কিছু জানা গেছে তার গুরুত্ব এবং উপযযাগিতা নিয়ে। জাহাজ নোঙর করার পরেই রামেসিস আর হুইসনকে জাহাজে অপেক্ষা করতে বলে আমি তীরে নামলাম। উদ্দেশ্য আমার পায়রাগুলোর দায়িত্বে যে লোক নিয়োজিত আছে তার কাছ থেকে এ পর্যন্ত আসা খবরগুলো সংগ্রহ করব। আমাকে দেখেই হাতে বেশ কিছু প্যাপিরাস নিয়ে দৌড়ে এলো সে। সবগুলোই এসেছে লুক্সরে অবস্থানরত ওয়েনেগের কাছ থেকে। কিন্তু চিঠির কথাগুলো পড়তে পড়তে জলে ভিজে এলো আমার চোখ।
ওয়েনেগ জানিয়েছে, আঠারো দিন আগে পানমাসি এবং তার বন্দিনী রাজকুমারী সেরেনা লুক্সরে পৌঁছেছে। অর্থাৎ মেমননকে নিয়ে আমরা নীলনদের মুখে পৌঁছানোর তিন দিন আগেই নিজের ডেরায় পৌঁছে গেছে ধুরন্ধর শয়তানটা।
ফারাও উটেরিক বুবাস্টিসের নির্দেশে বন্দরে জড়ো হয়েছিল কয়েক শ নারী পুরুষ। তাদের মাঝে ওয়েনেগও ছিল। তাদের সবার সামনে সেরেনাকে সম্পূর্ণ নগ্ন অবস্থায় তীরে নামানো হয়। পায়ে কোনো জুতো ছিল না তার, অদ্ভুত সুন্দর চুলের রাশি লম্বা হয়ে ঝুলছিল কোমর পর্যন্ত; কিন্তু তাই বলে এত লম্বা নয় যে তার নিতম্ব ঢাকতে পারবে।
ওয়েনেগ লিখেছে, সেরেনার সৌন্দর্যে এবং তার প্রতি নিষ্ঠুরতার মাত্রা দেখে উপস্থিত সবার মাঝে কেমন অটুট নীরবতা নেমে এসেছিল। যদিও দর্শকদের মাঝে কেউই জানত না যে কে এই তরুণী।
বন্দরে নামানোর পর প্রহরীদের একজন সেরেনাকে হাঁটু গেড়ে বসতে বাধ্য করে। রাজপরিচারকদের একজন এসে এরপর সেরেনার লম্বা চুলের গোছা কেটে ফেলে। এই সময় দর্শকদের মাঝে মৃদু প্রতিবাদের গুঞ্জন ওঠে।
জ্বলন্ত চোখে তাদের দিকে তাকায় উটেরিক, বোঝার চেষ্টা করে যে কে তার মতামতের বিরোধিতা করছে। তার দৃষ্টির সামনে চুপ হয়ে যায় সবাই। এবার অন্যদিকে ফিরে প্রধান অত্যাচারকারী এবং জল্লাদ কুখ্যাত ডুগকে সামনে ডেকে পাঠায় ফারাও। প্রায় নাচতে নাচতে তার সামনে এসে দাঁড়ায় লোকটা। সাথে সাথে আসে তার কিছু মুখোশপরা সাঙ্গোপাঙ্গ, যাদের সাথে ছিল একটা ষাঁড়ে টানা আবর্জনা ফেলার গাড়ি। সেরেনাকে ওই গাড়িতে তুলে নেয় তারা। গাড়ির ভেতর একটা খাড়া খুঁটির সাথে পিছমোড়া করে বেঁধে ফেলা হয় সেরেনাকে, যাতে নিজের নগ্নতা সে ঢাকতে না পারে। এবার মিছিল করে লুক্সরের পথে পথে ঘোরানো হয় তাকে। মিছিলের শুরুতে ছিল এক ঢাকবাদক। পথের দুপাশে অনেক লোক জড়ো হয়েছিল। ডুগের লোকদের ইশারায় সেরেনার ওপর নানা রকম অভিশাপ আর অপমান ছুঁড়ে দিতে থাকে তারা। শেষে পাহাড়ের ওপরে দুঃখ-দুর্দশার ফটক নামের সেই ভয়ংকর কারাগারে নিয়ে যাওয়া হয় তাকে। কারাগারের দরজার ওপাশে অদৃশ্য হয়ে যায় সেরেনা আর তার পেছনে বন্ধ হয়ে যায় দরজা। এরপর থেকে তাকে আর দেখেনি ওয়েনেগ।
